Premer Golpo – সেরা 5 টি প্রেমের গল্প – Top 5 Bengali Love stories


গল্প – 1

“ভালোবেসে_সখী_নিভৃতে_যতনে”
.
অঙ্কগুলো করার সময় মনটা কোথায় ছিল? আর একমাসও বাকি নেই ফাইনাল পরীক্ষার, এখন এইরকম ভুল?
দীপুদার কথাগুলো মাথা নীচু করে শুনছি আর খাতার শেষ পাতায় হিজিবিজি কাটছি। মুখ তুলে তাকালে দীপুদা ঠিক বুঝে যাবে আমার মনের মধ্যে একটা ঝড় চলছে। শৌভিকের সাথে তিন বছরের প্রেমটা, মনে হচ্ছে শেষ হয়ে যাবে। দিন দিন কেমন যেন পাল্টে যাচ্ছে শৌভিক। অন্তরা কালকে বলছিল….
আমি কথাগুলো তোকে বলছি টুসকি। আমি বলে যাচ্ছি আর তুই আপনমনে খাতায় হাবিজাবি কাটছিস? দীপুদা এমন জোর গলায় কখনও বকেনি আগে, চমকে উঠলাম দীপুদার বকুনিতে। মুখ তুলে একবার তাকালাম দীপুদার মুখের দিকে, তারপরেই একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতলায়। মায়ের প্রশ্নের মুখ থেকে পালিয়ে বাঁচতে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। ভীষণ ভীষণ কান্না পাচ্ছে, কিছুতেই সামলাতে পারছি না নিজেকে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর কলকাতার ভালো কলেজে একসাথে পড়তে যাওয়ার প্ল্যান, সারাজীবন একসাথে কাটানোর স্বপ্ন, গত তিনবছরের কত ছোট ছোট ভালোলাগার মুহূর্ত, শৌভিক সব ভুলে গেল!!!! বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করছে। চোখ মুছে বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখটা দেখি, কুহেলী কি আমার থেকে দেখতে অনেক বেশি সুন্দর? তাইজন্য শৌভিক আমাকে ভুলে কুহেলীর সাথে….
ভাবতে গিয়েই আবার কান্না পাচ্ছে। বাইরে বোনের গলা পাচ্ছি। মাকে বলছে, আমি অঙ্ক ভুল করেছি বলে দীপুদা বকেছে; তাই আমি রাগ করে চলে এসেছি ওপরে।
দীপুদা বছর খানেক হলো আমাদের শহরে চাকরি পেয়ে এসেছে। আমাদের বাড়ির একতলায় ভাড়া থাকে, দীপুদা আর ওর মা। ওর মাকে আমরা বড়মা ডাকি। বাড়িতেই অঙ্কের মাষ্টার থাকতে আর বাইরে পড়তে যাওয়া কেন? আমাদের দুবোনকে অঙ্কটা দীপুদাই দেখিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে কেমিস্ট্রিটাও পড়ায় আমাকে। দীপুদা আজ ঐভাবে বকলো, আবার কান্না পাচ্ছে আমার। কোনরকমে নিজেকে সামলে চোখে-মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে আসি বাথরুম থেকে। আবার মায়ের একচোট বকুনি, পড়া ভুল করলে বকাও যাবে না। বকেছে বলে, তেজ দেখিয়ে পালিয়ে এসেছিস তুই? এত তেজ ভালো নয়। যা এখনি গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আয় দীপুর কাছে। ঐভাবে ক্ষমা চাওয়া যায় কারও কাছে!!!! মায়ের কথা অগ্রাহ্য করেই দাঁড়িয়ে রইলাম বারান্দার গ্রিল ধরে। দেখলাম সাইকেল নিয়ে দীপুদা স্কুল চলে গেল।
বাবা অফিসে, বোন স্কুলে, মা টিভিতে সিরিয়াল দেখছে। টেষ্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে, আমি তাই বাড়িতে। গ্রীষ্মের দুপুর যে এতো দীর্ঘ আগে বুঝিনি। আর মাত্র একত্রিশদিন বাকী পরীক্ষা, অথচ পড়ায় এতটুকু মন বসাতে পারছি না। শৌভিক এমনটা কেন করলো আমার সাথে কিছুতেই বুঝতে পারছি না। বায়োলজি স্যারের প্রাইভেট থেকে বেরিয়েই আমাদের কথা হত। ইদানিং পড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে তাড়াহুড়ো করে চলে যাচ্ছে শৌভিক। আমাকে এড়িয়ে চলার জন্যই যে ওর অত তাড়াহুড়ো বুঝতে আমার অসুবিধা হচ্ছে না। নিজেকে কতবার চেষ্টা করছি শক্ত করার, শৌভিকের অবহেলার প্রত্যুত্তরে ওকেও অবহেলা করার, কিন্তু পারছি কৈ!!!! শৌভিককে যে ভীষণ ভালোবাসি আমি। পরীক্ষার আর দেরি নেই, পড়াশুনোটা ঠিকমত না করলে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট তো দূরের কথা মনে হচ্ছে পাশটাও করতে পারব না। ফিজিক্স নোটের খাতাটা বুকে নিয়ে এটাসেটা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি। ঘুম ভাঙলো মায়ের ডাকে। পড়তে বসে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, আবার একচোট বকুনি কপালে নাচ্ছে আমার। ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে দেখি মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আহ্ মায়ের ঠাণ্ডা হাতের ছোঁয়া, কি অসম্ভব শান্তি। অনেকদিন পর মুখ গুঁজলাম মায়ের বুকে। লম্বা শ্বাস নিয়ে মা মা গন্ধটা টেনে নিলাম বুকের মধ্যে। মাকে জড়িয়ে ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছা করছে, মনে হচ্ছে সব বলে দি মাকে। শৌভিকের সাথে আমার তিনবছরের প্রেমের কথাটাও। পারলাম না বলতে, কখন যে মায়ের সাথে এতটা দূরত্ব হয়ে গেছে বুঝিনি।
মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কি চেহারা করেছিস নিজের চোখমুখের। সামনে পরীক্ষা বলে এত চিন্তা করতে হবে না। মন দিয়ে পড়, তোর সাধ্যমত ভালো করার চেষ্টা কর, পরিশ্রমে ফাঁকি দিস না, দেখবি রেজাল্ট ভালোই হবে।
মায়ের থেকে মাথাটা তুলে একবার তাকালাম মায়ের দিকে। ছোটবেলায় তো না বলতেই সব কষ্ট বুঝে যেত মা। এখন তো কৈ আমার মনের কষ্টটা বুঝতে পারল না মা। মা কি তবে আর ভালোবাসে না আমায়!!!! কেউ ভালোবাসেনা আমায় আর। বুকভরা অভিমান নিয়ে মায়ের বুক থেকে সরে এলাম। চুলকটা হাতখোঁপা করে পড়তে বসলাম। আমাকে শক্ত হতেই হবে। কাউকে ভালো বাসতে হবে না আমাকে।
কদিন পর পড়ার শেষে বোনকে ছুটি দিয়ে আমাকে বলেছিল, জীবনে ভালোবাসার জন্য অনেক সময় আছে, পরীক্ষা কিন্তু আর একমাসও বাকি নেই। সত্যি ভালোবাসা জীবনে যখন আসবে তখন বুঝবি, ভালোবেসে কাছে না পেলেও ভালোবাসা হারিয়ে যায় না। দীপুদা কি করে সব বুঝেছিল জানিনা।
মানে ?
আমি প্রেম করি ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে একটু ন্যাকার মতোই প্রশ্ন করেছিলাম।
প্রেমে ঘা খেয়েছিস, চোটটা সামলে উঠতে পারছিস না। এতে কিন্তু ক্ষতিটা তোরই হচ্ছে। সে দেখ নিজের আখের ঠিক গুছিয়ে দিচ্ছে?
তুমি শৌভিককে চেনো? বোকার মতো বলে ফেলেছিলাম দীপুদাকে।
না আমি কাউকে চিনি না, কিন্তু তোকে তো চিনি।
উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট ভালো হয়নি। কলকাতার বদলে বর্ধমান উমেনস্ কলেজে ভর্তি হলাম। শৌভিক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল রাজ্যের বাইরে। ওর সাথে সম্পর্কটা ততদিনে একটু একটু করে সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। প্রথম প্রেম ভাঙার আঘাতটাও সামলে ফেলেছি ততদিনে। নতুন কলেজ, নতুন বন্ধু-বান্ধব, বাড়ির চেনা গণ্ডীর বাইরে বেরিয়ে প্রথম হোস্টেল জীবন; সে এক অন্য অনুভূতি। উচ্চ-মাধ্যমিকের রেজাল্ট মনোমত না হওয়ার দুঃখ কিছুটা মিটল অনার্সের রেজাল্টে। ভর্তি হলাম মাস্টার ডিগ্রিতে। সায়নের সাথে বন্ধুত্বটা গভীর হতে হতে দুজনেই দুজনের মনের কাছাকাছি এসেছি তখন। চোখে চোখ মিলিয়ে স্বপ্ন দেখি তখন নিজেদের কেরিয়ার গড়ার। কিশোরীবেলার মতো সুখী সংসারের বোকা বোকা স্বপ্ন দেখি না তখন আর। তবে দুজনের জীবনে দুজনে তখন ভীষণ অপরিহার্য হয়ে গেছি। ভুলটা ভাঙলো, ফাইনাল পরীক্ষার কিছুদিন আগে। আমার তরফ থেকে যেটা ছিল ভালোবাসা, সায়নের কাছে সেটা নিছক বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। হাসি মুখেই মেনে নিলাম সায়নের বন্ধুত্ব। নিজের একান্ত অনুভূতিগুলোকে গোপন করতে শিখে গেছি আস্তে আস্তে।
পরীক্ষা শেষ। আমি চেষ্টা করছি চাকরীর। মা-বাবা উঠে পড়ে লেগেছে আমার বিয়ের জন্য। বিয়ের সাথে চাকরি করার কোন বিরোধ নেই। চাইলে ওসব চাকরীবাকরী বিয়ের পরেও হয়। দীপুদার স্কুলেরই এক মাস্টারমশায়ের মা-বাবা দেখতে এলেন একদিন। দীপুদারা অনেকদিন হলো ভাড়া উঠে গেছে, বাড়ি করেছে পাশের পাড়ায়। ওনাদের আমাকে পছন্দ হতেই শুরু হয়ে গেল বিয়ের তোড়জোড়। ছেলে নিজেও একদিন এসে দেখে গেল আমাকে।
বিয়ে করার মন ছিল না তখনই আমার, কিছুটা অনিচ্ছাতেই বসতে চলেছি বিয়ের পিঁড়িতে।
দুদিন আগে থেকেই আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করেছে, বাড়ি জুড়ে উৎসবের আমেজ। পড়াশুনোর জন্য অনেকদিন বাড়ির বাইরে থেকেছি, কিন্তু এবার জন্য সত্যি সত্যি সব ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাকে। মেয়েবেলাটা এই বাড়িতে ফেলে রেখে আমার বিদায় নেবার পালা। স্মৃতির হাতছানিতে বারবার হারিয়ে ফেলছি নিজেকে। গলার কাছে জমাট বাঁধা কষ্ট। দোতলার ছাদে-উঠোনে প্যাণ্ডেল হয়ে গেছে। রাত পোহালেই বিয়ে। ভিড়ের মধ্যে থেকে একটু একা হতেই উঠে গেলাম তিনতলার ছাদে। অসহ্য গুমোট গরম, আকাশ জুড়ে কালো মেঘ। হয়তো বৃষ্টি নামবে। ছাদে লাইটের মিস্ত্রিরা কাজ করছে। বাড়ির সামনেটা রঙিন আলোর মালায় সাজানোর প্রস্তুতি চলছে।
আমি অন্যদিকে দাঁড়িয়ে ভাবছি ছোটবেলার কথা। নতুন জীবনের কোন স্বপ্ন আসছে না মনের মধ্যে, শুধু যা ছেড়ে যেতে হবে তার হাহুতাশ যেন গ্রাস করে ফেলছে আমাকে। নতুন জীবনে কিভাবে মানিয়ে নেব নিজেকে!!!!
অত চিন্তা করিস না, তাপসদা ভীষণ ভালোমানুষ। পিছন ফিরে দেখি দীপুদা দাঁড়িয়ে। দীপুদা কখন ছাদে এলো!!!! লাইটের মিস্ত্রিদের কাজ বোঝাতে এসে অন্ধকারে আমাকে একা দেখে দীপুদাও অবাক।
বিয়ের কনেকে এমন মনমরা হয়ে থাকলে মানায়? পরিস্থিতি সহজ করার চেষ্টা করে দীপুদা।
সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা একজন মানুষ, নতুন পরিবেশ। ভয় করছে দীপুদা, মানুষটাকে যদি বুঝতে না পারি?
অনেকদিনের চেনা মানুষকেও কি ঠিকমত বুঝতে পেরেছিস্ ?
দীপুদা কি বলতে চাইল সঠিক না বুঝলেও যেন চমকে উঠলাম। মুখ থেকে একটা শব্দই বেরিয়ে এলো। মানে?
সব কথার মানে জানতে নেই। রাত পোহালে তোর বিয়ে। এখন এইভাবে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে নেই, নীচে যা। মাথায় হাত রেখে বলে, মনটা শান্ত কর। এত চিন্তা করলে কাল যতই সাজুগুজু কর ফটোতে পেঁচির মত লাগবে দেখবি।
রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোর থেকেই শুরু একের পর এক বিয়ের অনুষ্ঠান। সবকিছুতে আমিই অনুষ্ঠানের মধ্যমণি। মনখারাপের সাথে একটা ভালোলাগায় অনুভব করছি বুকের মধ্যে। গোধূলি লগ্নে বিয়ে। সব অনুষ্ঠান মিটতে মিটতে অনেকটাই রাত হল। সবাই ক্লান্ত। সারাদিনের শেষে বাড়ি জুড়েও একটা নীরবতা। আমরা বাসরঘরে। আমার মামাতো, পিসতুতো দিদি-বৌদিরা আর ওর কয়েকজন বন্ধুর তখনও উৎসাহে কোন ভাটা পড়েনি। নিজেদের মধ্যে গানের লড়াই শুরু করেছে ওরা। ঘুমে আমার দুচোখ বুজে আসছে। ডেকরেটারের লাল মখমলি বালিশেই মাথা রেখেছি।
তোমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো, বরযাত্রীদের খোঁজ নিতে দীপুদা ঘরে ঢুকতেই সবাই মিলে পাকড়াও করলো দীপুদাকে। এই যে কনের দাদা, সারাদিন অনেক খেটেছ। এবার একটু বোসো দেখি আমাদের কাছে। আমরাও তো বন্ধু হয় নাকি!!!! দীপুদা কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই আমার দিকে তাকায়, আমি চোখদুটো আরও শক্ত করে বুজেনি। বন্ধুরা দীপুদাকে ধরেছে আবৃত্তি করার জন্য। দীপুদা একসময় ভালো আবৃত্তি করত, কতদিন শুনি নি।
দীপুদা কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না, শেষ অবধি অবশ্য রাজি হতেই হল। বুদ্ধদেব গুহ’র “মাধুকরী”র কিছুটা অংশ….
“আজ চিঠি লিখবোনা তোমাকে, তার বদলে একটি স্বপ্নহার পাঠাচ্ছি, লেখক , কবি না তবুও তার নাম গোপন থাক। কি যে দেখেছিলাম তোমার ঐ মুখটিতে কুরচি। এত যুগ ধরে কত মুখইতো দেখলো এই পোড়া চোখ দু’টি। কিন্তু, কিন্তু এমন করে আর কোনো মুখ’এইতো আমার সর্বস্বকে চুম্বকের মত আকর্ষণ করেনি। ভালো না বাসলেই ভালো…… বড় কষ্ট ভালোবাসায়।
ভালোবাসাতো কাউকে পরিকল্পনা করে বাসা যায় না। ভালোবাসা হয়ে যায়, ঘটে যায়। এই ঘটনার ঘটার অনেক আগের থেকেই মনের মধ্যে প্রেম পোকা কুড়তে থাকে। তারপর হঠাত’ই এক সকালে এই দুঃখ সুখের ব্যাধি দূরারোগ্য ক্যান্সারের মতই ধরা পড়ে। তখন আর কিছুই করার থাকে না। অমোঘ পরিণতির জন্যে অশেষ যন্ত্রনার সংগে শুধু নীরব অপেক্ষা তখন। কেউ যেনো কাউকে ভালো না বাসে। জীবনের সব প্রাপ্তিকে এ যে অপ্রাপ্তিতেই গড়িয়ে দেয়। তার সব কিছুই হঠাৎ মূল্যহীন হয়ে পরে। …। তখন আর কিছুই করার থাকে না। অমোঘ পরিণতির জন্যে অশেষ যন্ত্রণার সংগে শুধু নীরব অপেক্ষা তখন। কেউ যেনো কাউকে ভালো না বাসে। জীবনের সব প্রাপ্তিকে এ যে অপ্রাপ্তিতেই গড়িয়ে দেয়। তার সব কিছুই হঠাৎ মূল্যহীন হয়ে পরে। হুস থাকলে এমন মূর্খ্যামী কেউ কি করে, বলো? সে জন্যে বোধহয়, হুসের মানুষদের কপালে ভালোবাসা জোটে না। যারা হারাবার ভয় করে না কিছুতেই, একমাত্র তাঁরাই ভালোবেসে সব হারাতে পারে। অথবা অন্যদিক দিয়ে দেখলে মনে হয়, যাকিছুই সে পেয়েছিলো বা তাঁর ছিলো, সেই সমস্ত কিছুকেই অর্থবাহী করে তোলে ভালোবাসা। যে ভালোবাসেনি তাঁর জীবন বৃথা। তবুও বড় কষ্ট ভালোবাসায়।”
দীপুদা চলে গেল ঘর থেকে। উৎসাহী বাসর জাগিয়েরাও ঘুমিয়ে গেল একটু একটু করে। ঘুম এলো না আমার চোখে। মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে দীপুদা বলি, কথাগুলো বলতে কেন এতো দেরি করলে দীপুদা!!!!
কিন্তু এতটাই দেরি হয়ে গেছে, এই কথাটুকু বলার সময়টাও পেরিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই।
নতুন সংসার, নতুন জীবন। দীপুদা কলেজে চাকরি পেয়ে আমেদাবাদ চলে গেছে। বড়মা একাই থাকে। বাপের বাড়ি গেলে দেখা করে আসি বড়মার সাথে। জীবন বয়ে চললো নিজের গতিতে। স্বামী-সংসার নিয়ে সুখী আমি। ফেলে আসা মেয়েবেলা অলস দুপুরে মাঝে মাঝে কড়া নাড়ে মনের ঘরে। সেই অবসরটাও চুরি করে নিল ফেসবুক। এই নেশাটা আমাকে ধরানোর সম্পূর্ণ দায় আমার কর্তাটির। পাঁচবছরের বিবাহবার্ষিকীতে একটা স্মার্টফোন উপহার দিয়ে ফেসবুকে একাউন্ট খুলে দেয়। আর নাকি সারাদিন বাড়িতে একা লাগবে না আমার। কথাটা নেহাত মন্দ বলেনি। শুরু হলো পুরনো বন্ধুদের খোঁজার পালা। কাউকে পেলাম, কাউকে খুঁজেই পেলাম না। সবাই প্রায় সংসারী, দু-একজন চাকরি করছে। এক দুপুরে হঠাৎই খুঁজে পেলাম দীপুদাকে। দীপুদা এখন বেনারসে। ইস এই কবছরে কেমন বুড়িয়ে গেছে যেন। বিয়ে করেনি, স্ট্যাটাস সিঙ্গেল। বিয়ে যে করেনি সেকথা অবশ্য জানতাম। দেখা হলেই বড়মা দুঃখ করে, দীপুটা বিবাগী সন্ন্যাসী হয়েই কাটিয়ে দিল জীবনটা। সংসারে আর স্থিতু হলো না।
“ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো…..”
বন্ধুত্বের আবেদন পাঠাতে গিয়েও থমকে গেলাম। পুরনো ঘটনাগুলো একটা একটা করে ভেসে আসতে লাগল চোখের সামনে। ভালোবাসায় সত্যি ভীষণ কষ্ট দীপুদা। ভালোবাসাটা যখন বুঝলাম তখন সত্যিই আর কিছু করার ছিল না। তখন আর কিছুই করার থাকে না। কবির ভাষায়, “অমোঘ পরিণতির জন্যে অশেষ যন্ত্রণার সংগে শুধু নীরব অপেক্ষা তখন।”
সে রাতে স্বামীর বুকে মাথা রেখে অনেক কেঁদেছিলাম। মানুষটাকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি এই ক’বছরে। কোন কিছুর বিনিময়ে সে ভালোবাসা হারাতে পারব না আমি।
তবু সারাদিনে হাজার কাজের মাঝেও একটিবার দীপুদার প্রোফাইলটা ঘুরে দেখার নেশাটা ছাড়তে পারিনি আজও…..
জানিনা এই নীরব ভালোবাসাটুকুও কি পাপ!!!!

গল্প – 2
       ও যে মানে না মানা

দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে, কাঁচের ভিতর দিয়ে ছেলেটার সাইড ফেসটা দেখে চমকে উঠলো কুহু। এটা কি করে হতে পারে! সাত্যকি তো অনেকদিন হলো তার জীবন থেকে চলে গেছে। হ্যাঁ হাতে কড় গুনেই দেখলো কুহু। এই অক্টোবর আসলে পুরো তিন বছর হবে।

দোকানের বাইরে হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কুহুকে দেখে দোকানের দারোয়ান বললো,” ভেতরে যান ম্যাডাম! আমাদের স্টকে অনেক নতুন জামা কাপড় এসেছে। দেখুন! ভেতরে এসে।” এবার আর কুহু ওখানে দাঁড়ালো না। সত্যিই তো অতো বড় দোকান থেকে কিছু কেনার মতো ক্ষমতা তো তার নেই। ওই তো সামান্য প্যারাটিচারের চাকরী! নিজের খরচ চালানোই দুষ্কর। নামী শপিং মলের অতো বড় দোকান থেকে জামাকাপড় কেনার টাকা তার কই? নেহাৎ আজ তার  স্কুলের  বন্ধু ভাস্বতীর সাথে  দেখা করতে এসেছিলো তাই। না হলে বাড়ীর প্রায় পাশেই এই ঝাঁ চকচকে শপিংমলটাতে কোনদিনও আসেনি কুহু।  অনেকের কাছে, উইন্ডো শপিংয়ের কথা শুনেছে। কিন্তু কিছু না কিনে দোকানে দোকানে ঘুরতে বড্ড লজ্জা লাগে ওর।

দারোয়ানের কথায় চমকে উঠে দোকান কাছ থেকে সরে আসে কুহু। এমন সময় দেখে দোকানের ওই ছেলেটি দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তাকাবো না ভেবেও ছেলেটির দিকে চোখ  চলে যায় কুহুর। এতো মিল আসে কি করে। এতো পুরো সাত্যকি। শুধু সাত্যকির থেকে একটু বেঁটে, গোঁফ আছে আর গালের বাঁদিকে একটা তিল। ছেলেটিকে দেখে শরীর অবশ হয়ে যায় কুহুর। ছেলেটা বোধহয় কিছুটা বুঝতে পারে। সামান্য একটু হেসে চলে যায়।

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ী এসে সাত্যকির ছবির সামনে দাঁড়ায় সে। শাড়ীর আঁচল দিয়ে সাত্যকির ছবিটা মুছতে মুছতে ভালোবাসার স্পর্শ  ছোঁয়ায় সারা ছবিতে। কেন যে তার সাথেই এই ঘটনাটা ঘটলো? খবরের কাগজে মাঝে মাঝেই পড়তো জঙ্গী হামলায় জওয়ান নিহত। কিন্তু সেই খবরটা নিজের জীবনে ঘটলে যে কেমন হয়, সেটা সে প্রতিদিন বুঝতে পারছে। সাত্যকির ছবিটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে পুরোনো স্মৃতিতে ডুবে যায় সে।

ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে দাদুর বাড়ীতে মানুষ হয় কুহু। মা, দাদু আর সে নিজে। এই ছিলো তাদের সংসার। পড়াশোনায় ছোটবেলা থেকেই ভালো ছিলো সে। ইচ্ছে ছিলো ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করার। কিন্তু মাষ্টার্সে ভর্ত্তি হওয়ার পর হঠাৎ করেই কুহুর মা  দুদিনের জ্বরে মারা যায়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে কুহুর দাদুরও শরীর ভেঙে পড়ে। তিনি কুহুর বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। দাদুর এক বন্ধুর সাহায্যে আর্মিতে চাকুরে সাত্যকির  সাথে কুহুর বিয়ে ঠিক হয় ও এম.এ পড়তে পড়তেই কুহুর বিয়ে হয়ে যায়।

 বিয়ের রাতে কুহু, সাত্যকিকে বলে, সে পড়াশোনা করতে চায়।কুহুর প্রস্তাবে সাত্যকি  রাজি  হয়ে যায়।তার সাথে এও বলে, যতোদিন না কুহুর পড়াশোনা শেষ হচ্ছে, ততদিন কুহু তার দাদুর কাছেই থাকবে। অপ্রত্যাশিত এই প্রাপ্তিতে সাত্যকিকে বড় আপন মনে হয় কুহুর। সে রাতে সে নিজেকে উজার করে সাত্যকির ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়।   স্বপ্ন, স্বপ্ন ভালোবাসা মাখানো দিনগুলো খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।  কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে সাত্যকি নিজের বাড়ীর আপত্তি অগ্রাহ্য করেই কুহুকে ওর দাদুর কাছে দিয়ে আসে।

দেখতে দেখতে কুহুর এম.এ পরীক্ষা হয়ে যায়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার কদিন পরে সাত্যকির বাড়ী আসবে বলে কুহুকে জানায়। কুহুর জীবনে আবার বসন্তের দখিনা বাতাস বইতে থাকে। সে ঠিক করে এবার সাত্যকি এলে তাদের বিলম্বিত হানিমুনটা সেরে ফেলবে।  কিন্তু সাত্যকি রাজি হয় না। সে বলে,” সৈনিকের জীবন আমার। তোমাকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় যাওয়ার আগে  আমাদের ভালোবাসার বাসাটা বানিয়ে নেই।” কুহু ঠিক বুঝতে পারে না। তখন সাত্যকি কুহুকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে বলে, ” তোমার সাথে একান্তে ঘর বাঁধবো বলে আমি একটা ছোট ফ্ল্যাট বুক করেছি। কদিনের মধ্যেই ওখানে গৃহপ্রবেশ করবো। তাই এবার আর হবেনা। সামনের বার আমরা বেড়াতে যাবো।” কুহু খুশিতে ঝলমলিয়ে ওঠে।

ফ্ল্যাটের গৃহপ্রবেশের দিন সাত্যকির বাবা,মা আসে। কুহু তাদের যত্ন করে তাদের আর্শীবাদ পেতে চায়। কিন্তু সাত্যকির মা কুহুকে বলেন,” তোমাকে আমি আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ দিচ্ছি। আমার ছেলেকে তুমি আমার থেকে আলাদা করে নিয়ে এলে। তুমি কোনদিনও সুখী হবে না। ” কুহুর বুক কেঁপে ওঠে।  রাতেরবেলা সাত্যকিকে সে কথা বললে, সাত্যকি বলে,” ভাগ্যে যা আছে তাই হবে কুহু। তবে আমাকে একটা কথা দেও, তুমি কোনদিনও এই ফ্ল্যাট ছেড়ে কোথাও যাবেনা। এই ফ্ল্যাটটা আমি তোমার নামে কিনেছি।” কথাগুলো শেষ করে কুহুকে বুকে চেপে ধরে সাত্যকি। নতুন ফ্ল্যাটে কুহু আর সাত্যকি ভালোবাসায় মাখামাখি কতোগুলো রঙ্গীন দিন কাটানোর পর সাত্যকি তার কর্মক্ষেত্রে চলে যায়।

এর কিছুদিন পর কুহুর মার্ষ্টাসের রেজাল্ট বের হয়। কুহু খুব ভালো রেজাল্ট করে। সাত্যকি খুশি হয়ে জানায় সে পূজাতে আসছে। সেই  সময়ই তারা তাদের বিলম্বিত হানিমুন সারবে। কুহু খুশিতে দিন গুনতে থাকে। কিন্তু মহালয়ার ভোরে কুহু সাত্যকির মৃত্যু সংবাদ পায়। পূজার দিনে সবাই যখন আনন্দে রঙ্গীন হয়ে উঠেছিলো, তখন কুহুর জীবনের সব রং মুছে যায়।

সাত্যকির মৃত্যুর পর সাত্যকির অফিস থেকে পাওয়া সব টাকাই ওর বাবা, মা নিয়ে নেয়। এমন কি সাত্যকির ভাইও এখন সাত্যকির চাকরিটা করে।  তাও কুহুর পাওনা পেনশনের টাকাটা সাত্যকির মা এসে মাসের প্রথমে নিয়ে যান। মুখচোরা কুহু কিছু বলতে পারেনা। ফ্লাটটা নেওয়ারও  অনেক চেষ্টা করেছিলো ওরা।  কিন্তু সাত্যকিকে কথা দিয়েছিলো বলে, কুহু এই ফ্ল্যাট ছেড়ে যায় নি। আজ একবছর হলো কুহুর দাদুও কুহুকে একা করে দিয়ে পরলোক গমন করেছেন। এসব কথা ভাবতে ভাবতে কতো রাত হয়ে গিয়েছিলো তা সে নিজেও জানে না। যখন হুঁশ ফেরে তখন  সাত্যকির ছবিটা বিছানার পাশের টেবিলে রেখে তার পাশে একটা ধূপ ধরিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে সে।

পরদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে ওই শপিং মলটা অদৃশ্য চুম্বকের মতো কুহুকে টানতে থাকে। যাবো না ভেবেও মলটাতে ঢুকে পড়ে ও। ওই দোকানটার সামনে এসে দাঁড়ায় সে। বাইরে থেকে লক্ষ্য করে। না! আজ আর ওই ছেলেটি কাউন্টারে নেই।  আজ আর দারোয়ানও কুহুকে লক্ষ্য করছে  না। পূজা  আসছে বলে দোকানেও ভীড় শুরু হয়ে গেছে। দারোয়ান তাই নিয়েই ব্যস্ত। বেশ কিছু  সময় অপেক্ষা করে কালকের ছেলেটিকে আর দেখতে পায় না কুহু। একটু মন খারাপ নিয়েই সে মল থেকে বেরোনোর জন্য সিঁড়ির কাছে আসে। এমন সময় দেখে, সিঁড়ির সামনের কফিশপ থেকে কালকের সেই ছেলেটি বের হয়ে আসছে। কুহু আবার কালকের মতো অবাক চোখে ওই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটি আবার কুহুর দিকে তাকিয়ে হেসে চলে যায়।

পর পর কয়েকদিন রোজই কুহু শপিং মলে যেতে থাকলো, আর ওই ছেলেটাকে দেখতে লাগলো। একদিন বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ওই ছেলেটিকে না দেখে কুহু ওই   জামাকাপড়ের দোকানটায় ঢুকে এটা ওটা দেখতে থাকে। এমন সময় দোকানের এক কর্মচারী এসে বলে,”  ম্যাডাম,  আমাদের স্যার,  কদিনের জন্য বাইরে ছবি তুলতে গেছেন।  উনি যে থাকবেন না সেটা আপনাকে বলতে বলে গেছেন। ” কথাগুলো শেষ হবার আগেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় কুহু। দৌড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যায় সে।

বাড়ী এসে কান্নায় ভেঙে পরে কুহু। সাত্যকির ছবিকে আঁকড়ে ধরে ভাবে, কি বোকা সে! একই রকম দেখতে হলেই কি মানুষটা এক হয়। তার সাত্যকি এই পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। কেন যে সে এটা বুঝতে পারে না। ছেলেটা কতো খারাপ ভাবলো ওকে। লজ্জায় সিঁটিয়ে যায় কুহু।

এরপর কটা দিন কেটে গেছে। আজ থেকে কুহুর স্কুলে পূজার ছুটি। সাত্যকির মৃত্যুর পর পূজার দিনগুলো ঘর বন্দী হয়েই থাকে সে। স্কুল থেকে বাড়ী ফেরার পথে  দেখে ওই ছেলেটি আসছে। কুহুকে  দূর থেকে দেখে এক গাল হেসে হাত দেখিয়ে দাঁড়াতে বলে সে। কুহু লজ্জায় আরক্ত হয়ে ওঠে। এমন সময় উল্টো দিক থেকে একটা রিকশা আসতে দেখে, তাতে চড়ে সে বাড়ী চলে আসে।

ঘরে ঢুকে সবে একটু বসেছে, এমন সময় কলিংবেলের আওয়াজ। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে ওই ছেলেটি। কুহুকে সে  বললো, “ভেতরে আসতে পারি?” কুহু একটু ঘাবরে গিয়ে বললো,”কেন?” তখন ছেলেটি বললো,” ভয় নেই। আমি আপনার কোন ক্ষতি করবো না। আমাকে প্লীজ ভেতরে আসতে দিন।” কুহু আর না করতে পারলো না।

 ভেতরে এসে ছেলেটি  কুহুকে  বললো,” আমি নীলেশ ত্রিপাঠী। হ্যাঁ আমার নামটাই কেবল অবাঙ্গালী। আমরা তিন পুরুষ ধরে কলকাতার বাসিন্দা।  তাই  বাংলা আমাদের মর্জায়।” কথাগুলো বলে হাসতে থাকে ছেলেটি। সেই দেখে কুহু বলে, ” আপনি কি বলতে চান?” নীলেশ এবার কুহুর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলে,” ম্যাডাম আমি জানি আপনি কেন আমায় দেখতেন।” এবার কুহু একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। নীলেশ আর কোন কথা না বলে সাত্যকির ছবিটার দিকে এগিয়ে যায়। টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে  সাত্যকির ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলে, ” খুব মিল না আমাদের দুজনের?”  নীলেশ ছবির দিকে তাকিয়েই বলতে থাকে,” জানেন ম্যাডাম, সাত্যকিদার সাথে এই মিলটার জন্যই সবাই আমাদের দুইভাই বলতো। সাত্যকিদাও খুব ভালোবাসতো আমায়। আমার পড়াশোনায় একদম মাথা ছিলোনা। আর সাত্যকিদা ছিলো খুব ভালো ছাত্র।  দাদা আমাকে কতো পড়িয়েছে ছোটবেলায়। মাত্র দুবছরের ছোট ছিলাম আমি। দাদার সাথে সব কথা শেয়ার না করলে আমার ভাত হজম হতো না।  সাত্যকিদার বাবা  আমাদের স্কুলের স্যার ছিলেন। আমার মতো গবেটের সাথে সাত্যকিদার মেলামেশাটা উনি পছন্দ করতেন না বলে, আমরা লুকিয়েই বন্ধুত্ব রাখতাম। তাই দাদার অনেক অনুরোধেও আপনাদের বিয়েতে যাইনি। এই ফ্ল্যাটটার সন্ধান আমিই দাদাকে দিয়েছিলাম।  মলের ওই দোকান দুটো আমার। ভেবেছিলাম দাদা আমার কাছাকাছি থাকবে। তখনও কি জানতাম। দাদা আর”…গলা দিয়ে বিষণ্ণতা ঝরে পড়ে নীলেশের। তারপর আবার বলে,” আমি জানি আপনি আমার মধ্যে  দাদাকে খুঁজতেন”। কুহু এবার কেঁদে ফেলে।

অষ্টমীর দিন দুপুরবেলা হঠাৎ করেই কুহুর ফ্ল্যাটের কলিংবেলটা বাজতে থাকে। কুহু দরজা খুলে দেখে নীলেশ আর একজন মধ্যবয়সীনি ভদ্রমহিলা। কুহু ওদের ভেতরে নিয়ে আসে। নীলেশ বলে,” আমার মা। আপনার সাথে আলাপ করাতে নিয়ে এলাম।” কুহু ভদ্রমহিলার পায়ে হাত দিয়ে নমষ্কার করে। ভদ্রমহিলা কুহুকে আশীর্বাদ করে বলেন,” তোমার গার্জিয়ান কেউ নেই?  আমার একটু কথা ছিলো তার সাথে।” বিষণ্ণ মুখে কুহু বলে,” না মাসিমা। এই পৃথিবীতে আমার নিজের বলে আর কেউ নেই। একান্ত নিজের যে ছিলো, সে অনেকদিন আগেই আমাকে একা করে চলে গেছে।” বলে সাত্যকির ছবির দিকে তাকায় কুহু। সেই দেখে নীলেশের মা বলেন,” আমি সব জানি। সাত্যকিকে আমিও খুব ভালোবাসতাম।” ওনার স্বর ভারী হয়ে আসে।  তারপর উনি কুহুকে ওনার পাশে বসিয়ে বলেন ” তাহলে তোমার সাথেই আমি কথাগুলো বলি।” কুহু একটু চুপ করে থেকে বলে, ” বলুন”।  নীলেশের মা কুহুর হাত দুটো চেপে ধরে বলেন,” শোন, তোমাকে আমার ছেলে পছন্দ করেছে। একা একা এভাবে তো আর জীবন কাটানো যায় না। তোমাকে আমি আমার ছেলের বৌ করতে চাই। তুমি সময় নিয়ে ভাবো। তারপর উত্তর দিও।” কুহু হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,” ভাবার দরকার নেই  মাসিমা। আমি সাত্যকিকে ভালোবাসি। তাই আমার পক্ষে আর কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয। হ্যাঁ! ওদের চেহারায় মিল দেখে আমি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।  কিন্তু  চেহারায় মিল হলেই তো মানুষটা এক হয়ে যায় না। এটা আমি বুঝি।” নীলেশের মুখে কালো মেঘের ছায়া পড়ে।আর কথা না বাড়িয়ে  মাকে নিয়ে চলে যায়।

 এর বেশ কিছুদিন পর, এক সকালে  স্কুলে যাওয়ার তাড়ায় আলমারি খুলতে গিয়ে একটা প্যাকেট কুহুর পায়ের কাছে পড়ে। কুহু তুলে দেখে নীলেশের মায়ের উপহার দেওয়া শাড়ীটা। সেদিন নীলেশের মাকে ফিরিয়ে দিলেও ওনার উপহারটা ফেরাতে পারেনি কুহু। অনেকদিন পর নীলেশের কথা আবার মনে পড়ে মনটা একটু হলেও চঞ্চল হয়ে উঠলো ওর। সেদিনই স্কুল থেকে ফেরার পথে কুহু দেখে নীলেশের দোকানের সেই কর্মচারী। কোথায় যেন হন্তদন্ত হয়ে যাচ্ছে। কি মনে হতে কুহু ওকে ডাকলো। তখন ছেলেটি ওকে বললো,” আমাদের স্যার খুবই অসুস্থ। ওনার ওয়াইল্ড লাইফ ফটো তোলার শখ আছে। ছবি তুলতেই এবার একটা দুর্গম জঙ্গলে  যান উনি। আর ওখানে গিয়ে মশার কামড় খেয়ে খুব খারাপ রকম জ্বর হয়েছে ওর। বাঁচবে কিনা ঠিক নেই।” কুহুর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। একটু ধমক দিয়েই বলে,” কেন বাঁচবেনা! ঠিক বাঁচবে।” ছেলেটি বলে অনেকে ওকে বারণ করেছিলো। কিন্তু কারোর কথা শোনে নি। কুহু কোন হাসপাতালে নীলেশ আছে তা জেনে নিয়ে পাগলের মতো দৌঁড়তে থাকে।

আজ তিনদিন হয়ে গেলো কুহু হাসপাতালের করিডোরে এক ভাবে বসে আছে। খাওয়া, ঘুম কোন কিছুরই অনুভূতি নেই ওর। খালি দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নীলেশের মা এসে কুহুর মাথায় হাত  বুলিয়ে দিয়ে বলেছেন,” ভয় পাস না। তোর এই ভালোবাসাই আমার ছেলেকে মরণের ঘর থেকে ফিরিয়ে আনবে। আমার ভরসা আছে ঈশ্বরের প্রতি।” কিন্তু কুহুর মন মানেনি। ভালো তো সে সাত্যকিকেও বাসতো। কিন্তু থাকলো কি সে? আর সে ভরসা করে না, কোন কিছুতেই। মনে মনে এই কথাগুলো ভেবেই চোখের জল ফেলছিলো সে। এমন সময় নার্স এসে জানায় নীলেশের জ্ঞান এসেছে। ওর ফঁাড়াও কেটে গেছে।

কুহু দৌড়িয়ে নীলেশের বেডের কাছে যায়। নীলেশের চোখ তখনও বন্ধ। কুহু গিয়ে নীলেশের কপালে হাত দিলে নীলেশ চোখ খোলে,কুহু জিজ্ঞেসা করে “কেমন আছো?” নীলেশ বলে, ” যমে নিলো না, আমায়।” কুহু নীলেশের ঠোঁট আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে।” তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে কুহু বলে,” কি করবো বলো? সাত্যকিকে কথা দিয়েছি যে,ওই ফ্ল্যাট ছেড়ে যাবো না। কি করে তোমাকে বিয়ে করে তোমার বাড়ী যাই বলো?” নীলেশ অতি কষ্টে বলে,” দাদাকে দেওয়া কথার খেলাপ করলে আমিই সব থেকে বেশি কষ্ট পাবো কুহু। তুমি ওখানেই থাকবে। আর দাদার জন্য যে জায়গাটা তোমার মনে আছে, সেটা যেন সবসময়ই একই রকম থাকে। সেখানে আমার কোন অধিকার নেই। শুধু তার পাশে যদি একটু জায়গা আমাকে দেও। না হয় বন্ধু হিসাবেই সারাজীবন থাকবো। স্বামীর অধিকারের দরকার নেই। দেবে একটু জায়গা তোমার মনে?” এতোগুলো কথা একসাথে বলে হাঁফাতে থাকে নীলেশ। কুহু নীলেশের দুর্বল হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলে,” দেবো, । একবার নিজের ভালোবাসা হারিয়েছি। আর হারাতে চাইনা।” নীলেশের রোগক্লিষ্ট মুখে হাসির আভাস ছড়িয়ে পড়ে আস্তে আস্তে বলে,”  পাগলি, তোমার সাথে একসাথে বুড়ো হতে চাই।”…

গল্প – 3
   গোপন_ভালোবাসা 
.
একটানা পড়ার একঘেয়েমি কাটাতে দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ায় মৈনাক । বিকালটা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে , একটু পরেই সন্ধ্যের অন্ধকার নামবে । কল্যানদার কোচিং এর ক্লাস টেনের ব্যাচটার ছুটি হয়েছে । ছেলেমেয়েগুলোর কলকল কথার আওয়াজে গলিটা একেবারে মুখরিত । মাধ্যমিকের সময় মৈনাক ও কল্যানদার কাছে পড়ত , সায়েন্স গ্রুপটা খুব ভালো পড়ায় । মাধ্যমিকে অতো ভালো রেজাল্টের পর বাবা মৈনাককে সায়েন্স নিয়ে পড়তে বলেছিল , তারপর জয়েন্ট । জয়েন্টে একবার চান্স পেয়ে গেলে ভবিষ্যতের ভাবনা বেশিটাই সুরক্ষিত হয়ে যায় । মৈনাক জানে বাবার শখ ও ডাক্তারী পড়ুক , কিন্তু ওকে যে সাহিত্য অনেক বেশি টানে । বাবা অবশ্য জোর করেনি , আর্টস্ নিয়ে ভর্তি হয়েছে মৈনাক ।
        আজো মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হতেই অস্বস্তিতে পড়ে যায় মৈনাক । চট্ করে চশমা ঠিক করার অজুহাতে চোখাচোখিটাকে আড়াল করার চেষ্টা করে । এই নিয়ে বেশ কয়েকদিন হলো , মেয়েটা যেন ইচ্ছা করেই খেয়াল করে মৈনাককে । একদিন তো ঠোঁটের ফাঁকে একচিলতে মিষ্টি হাসিও দেখেছিল । তবু সবটুকুই না দেখার ভান করে মৈনাক । সেদিন দীপাঞ্জন এসেছিল , দুই বন্ধুতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিল । তখনি মেয়েটার তাকানোটা নজরে পড়েছিল দীপাঞ্জনের , ঐ বলেছিল এ চাহুনি নাকি প্রেমের চাহুনি । যে কোন ছেলেকে ঘায়েল করতে এই একটু ঘুরে তাকানোই নাকি যথেষ্ট । দীপাঞ্জন বন্ধুমহলে কথাটা ফাঁস করে দিতে , মৈনাককে নিয়ে সবাই একটু হাসি-ঠাট্টাই করে আজকাল । হাই পাওয়ারের চশমা পড়া মৈনাক নাকি শুধু বইয়ের পাতাই পড়তে শিখেছে , চোখের পাতার লেখা পড়তে শেখেনি এখনো । মেয়েদের প্রতি আকর্ষণটুকুও নেই দেখে বন্ধুরা বেশ নাককুঁচকে ছিল ওর জেনেটিক গুণাগুণ নিয়ে । বন্ধুদের ইয়ার্কিগুলো মনে পড়তে আপন মনেই হাসতে থাকে মৈনাক । ছেলেগুলো অত বদমাইস না মুখে কিচ্ছু আটকায় না ।
সন্ধ্যেটা হয়েই গেল , আবার পড়তে বসতে হবে । বাবা অফিস থেকে ফিরে যদি দেখে ওরা ভাই বোনে পড়তে বসেনি , তাহলে খুব রাগ করে । বোনকে হয়তো প্রতিভা মাসি পড়াতে এসেছে , এই সময়েই তো আসে রোজ । মা তখন খুব অসুস্থ , বোন অনেক ছোট , একাএকা পড়াশুনো করতে পারতো না । একদিন বাবাই প্রতিভা মাসিকে নিয়ে এসেছিল , বোনকে পড়ানোর জন্য । সেই থেকে আজ সাতটা বছর প্রতিভামাসি এবাড়িতে আসছে । মা চলে যাওয়ার পর ওদের
দু-ভাইবোনকে খুব আগলে রেখেছিল । ছুটি তো এখন ক্লাস সেভেন , অন্য টিচার আছে , তবু প্রতিভা মাসিকে ছাড়া চলবে না । আসলে খুব ভালোবাসে প্রতিভা মাসিকে । মৈনাকেরও ভালো লাগে প্রতিভামাসিকে । খুব ভালো লাগে , একটু বেশিই ভালো লাগে । আজকাল সমবয়সী স্টাইলিস্ট মেয়েগুলোর থেকে অনেক ভালো লাগে  প্রতিভা মাসিকে । উফ্ বুকের মধ্যে একটা লজ্জা লজ্জা মনখারাপের ভালোলাগা । যেন মনখারাপের কষ্টটুকুতেই জমানো যত সুখ । এই কিছুদিন আগে যখন জ্বর হয়েছিল ,
প্রতিভা মাসি ছুটিকে পড়াতে এসে ওর জ্বর শুনে ওরকাছে এসেছিল । আহ্ মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই কি শান্তি । তবে মায়ের হাতের ছোঁয়ার মতো নয় , একটা অন্যরকম ভালোলাগা ।
হয়তো এরই নাম প্রেম । অসমবয়সী পরিণতি হীন ভালোবাসা , কখনো কোন পরিণতি নেই জেনেও যেন খুব ভালোবাসতে ইচ্ছা করে মৈনাকের ।
ছুটির পড়ার ঘরের দরজার পরদা সরিয়ে কিছুক্ষণ আনমনে দাঁড়িয়ে থাকে । এই একটু একটুখানি চোখের দেখাতেই যেন অনেকটা অক্সিজেন টেনে নেয় মৈনাক । এবার পড়তে বসতে হবে , নাহলে বাবা এসে পড়বে অফিস থেকে ।
পিছন ফিরতেই বাবার মুখোমুখি , বাবা কখন যে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারেনি । খুব অপ্রস্তুতে পড়ে যায় মৈনাক । অকারণ অপরাধ বোধে মুখ নীচু করে চলে যায় নিজের ঘরে ।
                    স্কুল থেকে পিকনিকের কথাটা বাবাকে বলতে ভুলে যাচ্ছে রোজ , কালকেই টাকা জমা দেওয়ার লাস্ট ডেট । রাতের খাওয়ার পর কথাটা বাবাকে কথাটা বলতে বাবার ঘরে যায় মৈনাক । বাবা অত তাড়াতাড়ি ঘুমায় না , অনেক রাত অবধি পড়াশুনো করা , ডায়েরী লেখা বাবার অভ্যাস । বাবাই ছোটবেলায় ওদের দু-ভাইবোনকে ডায়েরী লেখার অভ্যাস ধরিয়েছিল । বাবা ঘরে নেই , হয়তো টয়লেটে গেছে । ডায়েরী লিখতে লিখতে উঠে গেছে , পেনটাও খোলা । এখনি এসে পড়বে নিশ্চই ।
মৈনাক যে কাজ কখনো করেননি , আজ সেই কাজটাই করে ফেলে । পড়তে থাকে ডায়েরীর পাতাটা….
বহুবছর আগে তোমার সাথে একটা ভুল করেছিলাম , ঠিক ভুল হয়ত নয় , কথা দিয়ে কথা না রাখা । তবু অনেক বছর পর যেদিন শহরের রাস্তায় তোমাকে দেখেছিলাম , আমি কিন্তু তোমাকে এড়িয়ে যাইনি । একই শহরে আমার চেনা একজন মানুষ তার অসুস্থ মাকে নিয়ে অসুবিধায় রয়েছে জেনে খুব খারাপ লেগেছিল । শর্মিলার সাথে কথা না বলেই মেয়েকে পড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছিলাম তোমাকে । তোমাকে তো আমি জানি , শুধু শুধু অর্থ সাহায্য করলে তুমি নিতে না ।
ছুটিকে পড়ানোর জন্য শুরু হলো তোমার এবাড়িতে যাতায়াত । আবার দৈনন্দিন দেখা শুরু হলো তোমার সাথে । কখনো নতুন করে দুর্বল হতে চাইনি তোমার প্রতি , তবু মৃত্যুশয্যায় শর্মিলা একদিন বলেছিল” প্রতিভা মেয়েটা খুব ভালো , একটু ভালোবেসো ওকে ” ।
শর্মিলার কথাতে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম , কোন উত্তর দিতে পারিনি । হৃদয়ের গোপনে লুকানো ভালোবাসার তলানিটুকুও কি দেখতে পেয়েছিল শর্মিলা !!!!!
শর্মিলা চলে গেল , তুমি থেকে গেলে । শর্মিলার সেদিনের কথার পর থেকে তোমাকে ইচ্ছা করেই এড়িয়ে চলি । তুমি আমার অতীত , কিন্তু মৈনাক আর ছুটি আমার বর্তমান । আমার নিজের থেকেও ওরা দুজন আমার কাছে অনেক মূল্যবান ।
ভেবেছিলাম এইভাবেই হয়তো কেটে যাবে দিনগুলো । কিন্তু হলো না , আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখতে পাচ্ছি । আজ মৈনাকের চোখে আমি সর্বনাশের মেঘ দেখেছি । বাবা হয়ে একে আর বাড়তে দিতে পারিনা আমি ।
কাল তোমার সাথে কথা বলতে হবে । আর তুমি এবাড়িতে এসো না প্রতিভা । তবে কখনো কোন প্রয়োজন হলে আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করো ।
লেখাটা এখানেই শেষ নাকি আরো কিছু বাকি আছে কে জানে !!!!!
মৈনাকের চারপাশ কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসে মুহুর্তের জন্য । নিজেকে সামলে কোনরকমে পালিয়ে আসে নিজের ঘরে । অসহ্য কষ্ট হচ্ছে বুকের মধ্যেটায় , ভিজে আসছে চোখের কোণটা ।
আবছা হয়ে আসছে সবকিছু , আবছা লাগছে প্রতিভা মাসি – বাবা – ছুটি সবার মুখগুলো । অনেকদিন পরে আজ মা-কে খুব মনে পড়ছে মৈনাকের ।

গল্প – 4

   দাও রাঙিয়ে

অ্যাম্বুলেন্সের তীব্র সাইরেনের শব্দে কান চেপে মায়ের শরীরের সাথে লেপ্টে দাঁড়ালো সাত বছরের টুবলু। শ্রীপর্ণা ,ছেলেকে জাপটে ধরে আরো খানিকটা ফুটপাতের দিকে সরে এলো। একেবারে ফাঁকা রাস্তা, দুপাশে অগণিত পুলিশ আর  ভলেন্টিয়ার দাঁড়িয়ে আছে ব্যারিকেড করে।

 মুহূর্তে চোখের সামনে দিয়ে দ্রুত গতিতে অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশভ্যান আর তার সাথে দুই একটা গাড়ি বেরিয়ে যাওয়ার পর,পাশে দাঁড়ানো কর্মরত ট্রাফিক পুলিশকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখে শ্রীপর্ণা জিজ্ঞেস করে জানল যে, এটা গ্রিন করিডোর এর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ব্যাংকের উচ্চ পদ থেকে অবসর প্রাপ্ত সুপ্রিয়া দেবী,নিজের আর স্বামীর সম্পত্তি ছাড়াও দুই পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে যা পেয়েছেন তাতে তাকে কলিযুগীয় কুবেরের স্ত্রী সংস্করণ বললে কিছু বেশি বলা হবে না।

সম্পত্তি রাখার জন্য অগণিত সিন্দুক আর লকারের প্রয়োজন হলেও , আত্মাটা তার একটা দেশলাইয়ের বাক্সও ভরে না। প্রতিষ্ঠিত দুই ছেলে বহুবছর প্রবাসী,তাই স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি একাই থাকেন চ্যাটার্জি ম্যানশনে।

চ্যাটার্জি ম্যানশনের ছ মাস ধরে সাফ সাফাই এবং বাকি কাজের দায়িত্বে রয়েছে ববিতা। সে প্রতিদিন তার 5 বছরের মেয়ে রিঙ্কিকে নিয়ে আসে সাথে করে। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢোকার তার কোনো অধিকার না থাকায়, সে চুপ করে বসে থাকে গাড়ি বারান্দা লাগোয়া একটা বেঞ্চিতে।

যে বয়সে বাচ্চাদের দুষ্টুমি করার এবং খেলার জন্য ছুটে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সের একটা বাচ্চা কি করে এতটা সময় চুপ করে বসে থাকে  একা একা… একথা জানতে চাওয়ায়, ববিতার কাছ থেকে পাওয়া উত্তরে, সুপ্রিয়া দেবী ভ্রু তুলে মুখ থেকে, “ওওও”শব্দ করেই নিজের কৌতূহল দমন করলেন। তার থেকে বেশি ভাবার সময় বা ইচ্ছা কোনটাই তার নেই।

বছর দুয়েক ধরে ছেলেরা দেশে ফিরবে মায়ের সাথে দেখা করতে , এই বলে সান্ত্বনা দিয়ে আসছে। ছোট ছেলের ইচ্ছে, সুপ্রিয়া দেবী তার সাথে স্থায়ীভাবে প্রবাসী হয়ে যান।

আজ অনেকদিন পর দুই ছেলের ফোন এলো সামান্য সময়ের ব্যবধানে। অতি মূর্খ ব্যক্তির পক্ষেও বোঝা অসম্ভব নয় যে, তারা নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করেই ফোন করেছে সুপ্রিয়া দেবীকে। তাদের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার এবং প্রায় একই ।

তারা জানিয়ে দিয়েছে যে, কেরিয়ারের এই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা দেশে ফিরতে পারবে না ছুটি নিয়ে।সুপ্রিয়া দেবী যেন তাদের ভাগের টাকা ট্রান্সফার করে দেন তাদের একাউন্টে।ইচ্ছে হলে বাড়িতে লোক রেখে কিংবা বাড়ি বিক্রি করে বৃদ্ধাশ্রমে আনন্দে থাকতে পারেন সুপ্রিয়া দেবী… এই পরামর্শ দিতেও ভুলল না দুই ছেলে।

জীবনে আজ প্রথমবার ভাঙলেন তিনি। বিষাদগ্রস্ত মনটার আর ইচ্ছে হলো না রাতের খাবার খেতে। পরদিন সকালে বাসি খাবার টা ফেলে দিতে গিয়ে এই প্রথমবার  মনে পড়ে গেল ববিতার ছোট্ট মেয়েটার কথা।তিনি ববিতাকে ডেকে বললেন রিঙ্কি যদি খায় , তবে যেন এই খাবারটা তাকে দিয়ে দেয়। কেউ যেন ঠোঁটের কোণায় তুলি দিয়ে এক টুকরো হাসি এঁকে দিলো ববিতার।

ব্যালকনিতে ইজিচেয়ারে বসে সুপ্রিয়া দেবীর উদাস, উদ্দেশ্যহীন দৃষ্টি  এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বাগানে একটা বড় গাছের নিচে এসে ধাক্কা খেলো।সেখানে ফুটে ওঠা দৃশ্য যেন প্রাণ সঞ্চালন করল পাথরের মূর্তিতে।

তিনি দেখলেন রিঙ্কি মনের আনন্দে তার দেওয়া খাবার খাচ্ছে।হয়তো খাবারের গন্ধে, একটি কুকুর পাঁচিল টপকে রিঙ্কির কাছে এসে পড়ায়,  সে … সেই অযাচিত অতিথিকে নিজের অর্ধেক খাবার খাইয়ে দিল পরম আনন্দে আদর করে।

সুপ্রিয়া দেবী বিস্মিত , হতবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন,ওইটুকু একটা মেয়েকে তার বাড়তি খাবার টুকু দিতে সময় লেগে গেছে ছয় মাস। অথচ ক্ষুধার্থ রিঙ্কি  অবলীলায় তার খাবারের ভাগ দিল একটি রাস্তার কুকুরকে! ববিতা বলেছিল তার হৃদয়ে অনেক বড় ফুঁটো। তাইও সে খেলাধুলো, লাফালাফি করতে পারেনা। হয়তো খুব বেশি দিন বাঁচবেওনা। তাহলে ওইটুকু মেয়ে, তার ওই ফুঁটো হৃদয়ে এত ভালোবাসা রাখে কি করে…?

কখন কোন অজানা মাধ্যম অবলম্বন করে রিঙ্কির হৃদয়ের ভালোবাসা এসে লেগে গেছে সুপ্রিয়া দেবীর ঠোঁটের কোনায়… তা সে নিজেও জানেন না। বালিতে মিশে থাকা অভ্রের মত চোখের কোনাটা চিকচিক করে কেমন দীপ্তি ছড়িয়েছে তাও তিনি দেখতে পেলেন না।

পরবর্তী পাঁচ বছর কেটেছিল সুপ্রিয়া দেবীর জীবনের সবথেকে আনন্দময় সময়। সুপ্রিয়া দেবীর শুধু বাড়িতেই নয় হৃদয়েও এখন রিঙ্কির অবাধ যাতায়াত। রিঙ্কিকে ঘিরেই সুপ্রিয়া দেবী সন্তান এবং নাতি-নাতনির অভাব পূরণ করেন। তার সাথে মাঝে মাঝে তাদের বস্তিতে যান বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। রিঙ্কির বন্ধু পঞ্চু চোখে দেখতে পায় না, তার অনেক টাকা হলে সে তার বন্ধুর চোখ সারিয়ে দেবে, সে স্বপ্নের কথাও জানতে বাকি রইলোনা সুপ্রিয়া দেবীর।

অনেক টাকা খরচ করে রিঙ্কিদের বস্তির স্কুলের রূপ বদল করে দিলেন সুপ্রিয়া দেবী, পঞ্চুর চোখেও রং ভরলেন। তিনি এখন “মসিহা্” , অসহায়দের একমাত্র সাহারা। দিনরাত্রি চ্যাটার্জি ম্যানশনে অবাধ মানুষের যাতায়াত। বাড়ির বাগানটা যেন বাচ্চাদের খেলার পার্ক, তাদের চেঁচামেচিতে বিকেল বেলায় কাক-পক্ষীর টেকা দায় । তার আফসোস, এসব আগে কেন হল না…!

রিঙ্কির যে ফুঁটো হৃদয়ের ছোয়ায় তার হয়েছিল, যাকে বলে…”হৃদয় পরিবর্তন” সেই হৃদয় নিয়ে সুপ্রিয়া দেবীর চিন্তার শেষ নেই। একবার তিনি অপারেশন করিয়েছেন, কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু হবার নয়।

ঈশ্বর হয়তো সব দিক থেকে মারে না। তিনি খুঁজে পেলেন এমন একজনকে যার সাথে রিঙ্কির শরীরের প্রয়োজনীয় সবকিছু মিলে গেল , যা যা দরকার হৃদয় প্রতিস্থাপনের জন্য। তিনি উকিলের মাধ্যমে সমস্ত কাগজপত্রের কাজ করিয়ে রাখলেন নিখুঁতভাবে। সে সব জানতে দিলেন না কাউকে ঘুণাক্ষরে।

ববিতা খামোখা চিন্তিত হয়ে পড়বে তাই তাকেও জানতে দিলেন না কিছু। শুধু বললেন বাড়ির সব কাজ মিটিয়ে  চলে আসতে তার কাছে। ভোর ছটায় যেন তাকে মনে করে ডেকে দেয়। বিশেষ কাজ আছে তার।নিতান্তই সিধেসাধা অনুগত ববিতা কোন প্রশ্ন না করে শুধু আদেশ পালন করে যায় মুখ বুঝে।

অভ্যেস মত ভোর পাঁচটায় উঠে নিজের কাজ সেরে ছটায় ববিতা ডাকতে গেলো সুপ্রিয়া দেবীকে। তার পূর্বনির্ধারিত আদেশ অনুযায়ী, ববিতা প্রথম ফোন করল উকিল বাবু কে। তিনিই এসে করলেন সব ব্যবস্থা।

ছেলেকে স্কুলে দিয়ে এসে টিভিতে লাইভ টেলিকাস্ট দেখছে শ্রীপর্ণা । আজ সমস্ত খবরের চ্যানেল গুলোতে সুপ্রিয়া দেবীর জীবন কাহিনী শোনানো হচ্ছে ফলাও করে।

সকালবেলা গ্রিন করিডোর করে সুপ্রিয়া দেবীর দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে শহরের সব থেকে বড় হাসপাতালে। কারণ তার ইচ্ছা অনুযায়ী হৃদয় দান করা হবে রিঙ্কিকে, আর যত বেশি সম্ভব তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাজে লাগানো হবে। এমনকি তিনি তার অস্থি কাঠামোটাও দান করে গেছেন ।

পুলিশের কাছে দেওয়া ববিতার স্বীকারোক্তি দেখানো হচ্ছে বারবার। সে সুপ্রিয়া দেবীকে ডাকতে গিয়ে বুঝতে পেরেছিল যে, এই ঘুম আর ভাঙার নয়। তাই সুপ্রিয়া দেবীর আদেশ অনুযায়ী, (তার যখন কিছু হবে) সর্বপ্রথম ফোনটা গিয়েছিল উকিলবাবুর কাছে।তিনি এসে উদ্ধার করেছিলেন বালিশের তলা থেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর স্বীকারোক্তি এবং খালি ঘুমের ওষুধের শিশি।

বলাবাহুল্য তার ছেলেরা পাঁচ বছরের মধ্যে আর দেশে ফেরেনি। ফোন করাও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে বেশ কয়েক বছর। তাদের একাউন্টে যথেষ্ট পরিমাণ টাকা ট্রান্সফার করে বাকিটা দান করে গেছেন দুস্থ মানুষ এবং বিভিন্ন সংস্থাকে।

হাসপাতালের বাইরে থেকে লাইভ টেলিকাস্ট চলছে… অগণিত মানুষের ভিড় সেখানে। রিঙ্কি আর পঞ্চুদের বস্তির প্রায় সব মানুষ ভিড় করেছে সেখানে। পঞ্চুকেও দেখা গেল একটা কোনায় হাতজোড় করে চুপ করে বসে আছে।

বিজ্ঞাপন বিরতিতে মাঝেমাঝেই আগামীকাল দোল উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে বড় বড়  তারোকারা।
শ্রীপর্ণা একা একা বসে ভাবতে লাগলো যে আসল রং তো সুপ্রিয়া দেবী লাগালেন, এতগুলো ধূসর জীবন রঙিন করে গেলেন যাবার বেলায়।

তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গুনগুন করে আপন মনে শ্রীপর্ণা গেয়ে উঠলো…

   ”  রাঙিয়ে দিয়ে, যাও …যাও… যাও গো…”

গল্প – 5
” এক প্রেমের গল্প!”
             

  ‘এই সপ্তাশ্ব, অত টগবগিয়ে ছুটছিস কোথায়? সূর্যের রথ টানতে? দাঁড়া-দাঁড়া তোর সঙ্গে আজ আমার একটা হেস্তনেস্ত আছে। তুই কী পেয়েছিস আমাকে? তুই আমার সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই করবি?’
  হঠাৎ-ই স্বর্ণবর্ণার হুমকিতে সপ্তাশ্ব তো হতভম্ব! স্বর্ণবর্ণা দিকে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে! যদিও তারা একই কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ে তবুও ওদের মধ্যে কোন বন্ধুত্বের সম্পর্কই নেই এমন কি ওদের মধ্যে কোনদিন,’হাই হ্যালো’ হয়েছে কিনা তাও সপ্তাশ্ব মনে করতে পারলো না! অথচ স্বর্ণবর্ণা এমন ভাবে কথা বলছে যেন ওদের মধ্যে কত দিনের বন্ধুত্ব! তবুও সপ্তাশ্ব মনে করার চেষ্টা করে, কখনও স্বর্ণবর্ণার সম্পর্কে কারোর কাছে কোন মন্তব্য করেছে কিনা! যদিও ওর সে অভ্যাস নেই।
  এই অবসরে আমরা স্বর্ণবর্ণা ও সপ্তাশ্বের পরিচয়টা জেনে নিতে পারি।
  স্বর্ণবর্ণা নামেই মধ্যেই ওর পরিচয়ের কিছুটা ইঙ্গিৎ আছে। নামের মতই ওর গায়ের রঙ যেন গলন্ত সোনা! এক বিখ্যাত স্বর্ণ ব্যাবসায়ী পরিবারের কন্যা। পড়াশোনায় সপ্তাশ্বের মত টপার না হলেও খুব মেধাবী। একটু নাক উঁচু্ তবুও কয়েকজন বেশ ঘনিষ্ঠ সহপাঠিনীর আছে এবং কথাবার্তায় তুখড়।
  অন্যদিকে সপ্তাশ্ব, উচ্চ মাধ্যমিকে ওর স্থান ছিল তৃতীয়। ওর বাবা কলেজে, মা স্কুলে পড়ান। কোন অহং বোধ নেই। একটু অন্তরমুখী সেই কারনে বন্ধু বিশেষ নেই। অল্প কথা বললেও কথায় ধার আছে এবং রসিকও।
  ‘কিরে! নির্বাক হয়ে ঢ্যাব ঢ্যাবিয় আমার মুখে কী দেখছিস? আমাকে কি নতুন দেখলি নাকি! আমি কি দীপিকা পারুকন নাকি করিণা কাপুর!’
  ‘দীপিকা-করিনা কোন ছাড়, তুই তো স্বয়ং দেবী দূর্গা!’
  ‘কী বিড়বিড় করে বলছিস! জোরে বল।’
  ‘তোর কোন কথাই আমার মাথায় ঢুকছে না! আমি তোর কী সর্বনাশ-টা করলাম যে তুই আমার সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত করতে চাইচিস!’
  ‘তবে রে।’ ওর দিকে ছুটে গিয়ে মুখের সামনে আঙুল নেড়ে, ‘আমার সর্বনাশ-টা করে এখন নেকা সাজা হচ্ছে, তাই না! জানিস, তোকে আমি জেলে পুরে দিতে পারি!’
  ‘তা পারিস। স্বর্ণ সম্রাজ্যের হাত অনেক হাত অনেক দূর।’
  ‘দ্যাখ, তোতে-আমাতে কথার মধ্যে আমার ফ্যামেলিকে টানছিস কেন। এটা কোন কাটসি নয়। তুই আমার যে বারোটা বাজিয়েছিস তাতেই তোকে আমি নিজেই জেলে পুরে দিতে পারি, জানিস?’
  ‘কী করে তোর বারোটা বাজালাম সেতাই তো বুঝতে পারছি না!’
  ‘তুই কাল রাতে আমার ঘরে ঢুকে আমার সর্বনাশ-টা করিসনি?’
  ‘কাল রাতে তোর ঘরে ঢুকলাম মানে ঢুকতে পারলাম! অবাক কাণ্ড! স্বর্ণ প্রাসাদে ডজন-ডজন পাহারাদাররা আমাকে ঢুকতে দিল কেন? তারা কি গাঁজা খেয়ে ঘুমোচ্ছিল!’
  ‘তারা তাদের ডিউটি ঠিকই করেছে। তুই-ই তো আমার স্বপ্নের মধ্যে আমার ঘরে ঢুকে আমার সর্বনাশ-টা করেছিস। তোকে আমি ছেড়ে দেব?’
  ‘যাঃ বাবা! স্বপ্নের মধ্যে কোন মেয়ের ঘরে ঢুকে তার সর্বনাশ করা যায়! কস্মিনকালেও কেউ এমন কথা শুনেছে! আমিও এমন কথা কোনকালে শুনিনি!’
  ‘শুনিসনি! শোন তুই হাড়ে হাড়ে বজ্জাৎ!’
  ‘অনেক হয়েছে। এবার তোর কী সর্বনাশ-টা করেছি তা বলবি তো!’
  ‘কাল রাতে একটা লাল গোলাপ নিয়ে আমার ঘরে ঢুকিসনি’
  ‘তোর স্বপ্নের মধ্যে। আমার নয়।’
  ‘আমার স্বপ্নের মধ্যে হলেও তুই তো ঢুকেছিলিস।’
  ‘বেশ, তা মেনে নিলাম।’
  ‘লাল গোলাপ নিয়ে।’
  ‘তাও মেনে নিলাম।’
  ‘এই সবাই শুনলি তো! ও আমার ঘরে ঢুকেছিল।’
  ‘স্বপ্নে কিন্তু…’
  ওর কথার পাত্তা না দিয়ে, গোলাপটা আমার দিকে বাড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বসে, ‘I love you Swarnabarna.’ বলে প্রেমের প্রোপোজাল দিসনি?’
  ‘তাও স্বপ্নে তবুও জানতে চাইছি, তুইও তো আমার প্রোপোজালটা এ্যাক্সেপ্ট করে , ‘আমিও তোকে ভালবাসি সপ্তাশ্ব।’ বলে আমাকে জড়িয়ে ধরিসনি?’
  লজ্জা পেয়ে ‘এই এই, তুই এই কথা জানলি কী করে?’
  ‘ওই স্বপ্নেই।’
  সবাই হৈ হৈ করে উঠৈ, ‘প্রেমের প্রোপোজা এ্যান্ড এ্যাক্সেপ্ট, দু’টোই যখন হয়ে গেছে তা’ল তোরা এখন লাভার্স কাপ্ল্। দু’জনেই মেনে নিচ্ছিস?’
  ‘স্বর্ণবর্ণা যদি মেনে নেয় ত’লে আমিও মেনে নিচ্ছি।’
  ‘তা’লে এই উপলক্ষে সপ্তাশ্ব আমাদের খাইয়ে দে।’ স্বর্ণবর্ণা বলে ওঠে।
  ‘তোর প্রেমের মূল্য তো দিতে হবে না! তবে একটা শর্ত আছে।’
  ‘শর্ত!’
  ‘রেস্টুরায় যা বিল হবে সেই টাকাটা তুই আমাকে ধার দিবি। আমি দশটা ইন্স্টলমেন্টে শোধ দেব উইথ ওয়ান পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট।’
  ‘আমি রাজি তবে আমারও একটা শর্ত আছে।’
  ‘বলে ফেল, বলে ফেল। এখন সব শর্তেই রাজি।’
  ‘প্রেমটা তো স্বপ্নের মধ্যেই করে ফেললি তা না হয় মেনে নিলাম। স্বপ্নের মধ্যে আবার মালা নিয়ে হাজির হোস না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *