Mohongorer Uromegh – Bengali Novel – বাংলা উপন্যাস

। ১।
 খুব ভোর ভোর উঠতে হয় সাজুকে।উঠে উঠোন ঝাড়দিয়ে ঘর দোর পরিষ্কার করে দোকানে যায়।সাজু র একটা গালভরা নাম আছে ,শিঞ্জিনি চক্রবর্তী।দশ ক্লাস পর্যন্ত পড়েছে সাজু।তারপর আর পড়া হয়নি।বাবা র খুব অসুখ করল।মা তো সেই ছোটবেলাতেই মারা গেছে।মোহন গঞ্জের  একপ্রান্তে রাস্তার ধারে তাদের দোকান।চা,কফি ঘুগনি ডিমপাউরুটি আরো টুকটাক কিছু খাওয়ার পাওয়া যায় তাদের দোকানে।গঞ্জের সঙ্গে শহরটাকে যেই রাস্তাটা জুড়ে দিয়েছে ,সেই রাস্তার ধারে সাজুর দোকান।এখন বাস ও চলে ওই রাস্তা দিয়ে,ফলে সাজুদের দোকানে মোটামুটি বিক্রিবাটা হয়।আগে এমনটা ছিল না।এই রাস্তা এত সুন্দর মিশকলো ছিল না।রুক্ষসুক্ষ এক রাস্তা ,ভাঙাচোরা।তারপর বেশ কয়েকবছর আগে এই রাস্তা টা সুন্দর হলো।বাস চলতে শুরু করলো।নাহলে মোহনগঞ্জের মানুষের দিনে দুটো ট্রেন ই ভরসা ছিলো শহরে যাতায়াতের।বাবার অসুখ করার পর বাবা আর তেমন করে খাটতে পারেনা।সাজুই দোকানদারি করে।বাবা এসে মাঝে মাঝে বসে ঠিকই তবে কাজে তেমন সুরাহা হয়না।কিন্তু সাজু তাতেই খুশি,অন্তত এসে বসলে সাজুর একটু বল হয় বুকে।ভালো লাগে,আসলে গাছ ফল দেয়ার ক্ষমতা হারালেও যে ছায়া টা দিয়ে যায়।বাবা তার সেই ছায়া দেয়া গাছ,ফল সে নিজেই জোগাড় করে নেবে।সাজু একটু একটু করে টাকা জমায়,বাবার অসুখের জন্য শহরে নিয়ে যেতে হবে।অনেক টাকার ব্যাপার ,বলেছে ডাক্তার দাদু।ডাক্তার দাদুর কে চেনাশোনা আছে,তাঁর কাছে যেতে হবে বাবাকে নিয়ে।সে বাবার ঠিকঠাক চিকিৎসা করতে পারবে।ডাক্তারদাদুর সুপারিশে খরচ কিছু কম হবে,কিন্তু তাও হাজার দশেক লাগবে।সকাল সকাল উঠে ঘরের কাজকর্ম সেরে সাজু রোজকার মতো দোকানে এলো।উনুনে আঁচ দিয়ে বড় একটা জায়গায় ঘুগনি সিদ্ধ বসিয়ে দিয়ে কেরোসিনের স্টোভ ধরালো।একটু পরেই প্রথম বাস যাবে,বেশ কিছু লোক হবে।চা বিস্কুট তো সবাই খাবেই,আবার অনেকে নানান খাবার ও খাবে।ঘুগনি অবশ্য তৈরি হতে সময় লাগবে।সেটা পরের বাস এর লোকেরা পাবে।এখানে প্রতি দেরঘন্টা অন্তর অন্তর বাস চলে।সাড়ে সাতটা নাগাদ এলো প্রথম বাস।এই বাস টা মোহনগঞ্জের উপর দিয়ে শহরে যায় ,আসে অবশ্য করিমপুর থেকে।যাবে সেই দিনাজপুর।একটা লোক এলো দোকানে,প্রথমে চা চাইল।এর আগে কোনোদিন দেখেনি সাজু।কেমন যেন দেখতে,দৃস্টি খুব বিশ্রী।চা টা খেতে না খেতেই উঠে এসে একটা কেমন ফ্যাশফ্যাশে গলায় বলল
— খাবার আচে নাকি কিচু?
— এখন শুধুই ডিম ভাজা ,পোচ হবে।পাউরুটি এখনো আসেনি।
–দুটো ডিম দাও,বেশ ঝাল ঝাল করে ভেজে।
–হম।
কি বিচ্ছিরি কথার ছিড়ি।এখানে চেনাশোনা ছাড়া সবাই সাজু কে আপনি বলে।আর বাকিরা তো তুই করেই বলে।চেনা নেই শোনা নেই তুমি তুমি করে কথা বলাটা সাজুর একদম ভালো লাগেনি।এই রে লোকটা আবার আসছে কেন।
— বলচি, এখানে কিচুদিনের জন্য ঘর পাওয়া যাবে।চেনো নাকি কাউকে,যে ঘর ভাড়া দেবে!?

খুব অবাক হয়ে তাকালো সাজু।এই একবারে সাধারণ এক জায়গায় এর আগে কোনোদিন কেউ ঘর ভাড়া চায়নি।আসলে এখানে দেখার মতো কিছুই নেই।একেবারে সাধারণ মানের একটা জায়গা।গঞ্জের পিছনের দিকে একটা ভাঙাচোরা প্রাসাদমত আছে বটে।তবে এই বাইশ বছরে ওই ভাঙা গড়ের কেউ খোঁজ করেনি,অন্তত সাজু জানেনা। মন্ডল জেঠু ঘর ভাড়া দেয়।তবে এই বিটকেল উটকো বাইরের লোক কে কয়েকদিনের জন্য দেবে কিনা জানেনা সাজু। এমনি তো জেঠি মারা যাওয়ার পর মন্ডল জেঠু সকালের চা টা এখানেই খায়।আসবে একটু পরেই।ততক্ষণ ওই বিটকেল কে কি বসতে বলবে! ঠিক করে উঠতে পারছিল না সাজু।ইতিমধ্যে দোকানে ভালোই লোকজন হয়েছে।পাউরুটি ও এসে গেছে।সাজু তাড়াতাড়ি লোকটাকে বললো,
–মন্ডল জেঠু ঘর ভাড়া দেয়, তবে ঘর ফাঁকা আছে কিনা জানিনা।
আসল কথা টা বললো না বিটকেল কে।
–অ,তা কোতায় পাবো তাকে।
–এখানে আসবে ,মানে রোজ আসে।চা খেতে।
–হেহে,ভালো।বসি তাহলে।
নির্লজ্জের মতো বাইরের বেঞ্চে একটা পাশে ধপ করে বসে পড়লো।
এরপর সাজু ব্যাস্ত হয়ে পড়লো।প্রায় পৌনে নোট নাগাদ মন্ডল জেঠু এলো।
–সাজু মা ,দে দেখি এককাপ চা ।বলছি আজ একটু চিনি ….
–না জেঠু চিনি তোমাকে দেয়া যাবে না,মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলেদিল সাজু। গঞ্জের সবার খবর সাজু রাখে।আর সবাই সাজু কে খুবই ভালোবাসে।সাজুর স্বভাবই ই যে মিস্টি।
শুধু একজনই আছে ,একমাত্র সেই সাজুকে ভালোবাসেনা।শুধু তাই নয়,এক্কেবারে দুচোখে দেখতে পারে না।কিন্তু সাজু যে কেন তার জন্যে এত ভাবে,সাজু নিজেই জানে না।সে সব সময় সাজুকে হেলা করে-অপমান করে, তবে সাজুর রাগ হয়না।প্রচন্ড অভিমান হয়,কিন্তু কেন যে হয়। একটু পরেই আসবে সে,চা খায়না সে।ঘুগনি পাউরুটি খাবে ,আর দুটো ডিম সিদ্ধ তাও কুসুম ছাড়া।সে জানেও না ,সেই তার না খাওয়া কুসুমদুটো সাজু খায়।কেন যে খায়,এঁটো খেলে কি যেন বাড়ে…ইশ ভাবতেই কেমন যেন একটা হয় সাজুর।যদিও সে ফিরেও তাকায় না সাজুর দিকে,তাতে কি।সাজু তো তার দিকে শুধু তাকিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবে।
হটাৎ লোকটার দিকে নজর যেতেই মন্ডল জেঠুর দিকে তাকাল সাজু।জেঠু চা খাচ্ছে,উঠে বেরোলো দোকান থেকে সাজু।জেঠুর কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলল,
–ওই বিটকেল মতো লোকটা ঘর ভাড়া খুঁজছে,আমার একদম ভালো লাগেনি  লোকটাকে।বলিনি ঘর ফাঁকা আছে।তুমি দেখো কথা বলে।
মন্ডল জেঠু একটু অবাক হয়েই তাকালো সাজুর দিকে।ইশারা করে দেখিয়ে দিল সাজু বিটকেল কে। এই রে সে আসছে যে,তাড়াতাড়ি দোকানে পালালো সাজু।এসে যদি বসতে হয় আর খাবে না সে,চলে যাবে হনহন করে।তারপর সারাদিন খাওয়া হবে কিনা কেজানে।সারাদিন কোথায় থাকে ,কি খায় বা কি করে তাও জানেনা সাজু।
নেহাত ই পুতুল পিসির একমাত্র ভাইপো তাই সবাই চেনে।মাঝে তো বেশ কিছুদিন কলকাতায় হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করেছে সে।তারপর তো চাকরি ও পেয়েছে শুনেছিল সাজু।গত তিনমাস হয়েছে সে এখানে এসেছে।কি সুন্দর দেখতে আর কি সুন্দর নাম রূপঙ্কর ,রূপঙ্কর সেন। সাজু কিন্তু মনে মনে একটা অন্য নাম দিয়েছে।রুপাই,সাজুর রুপাই…..

।২।
 পিসিমনির শরীর টা কাল রাতে আবার খারাপ হয়েছিল।ডাক্তার দাদু বলেছেন,আর কিছু করার নেই।এভাবেই যতদিন বাঁচে আর কি।মা বাবা আলাদা হওয়ার পর একরকম জেদ করেই কারোর সাথে না থেকে এখানে,এই মোহনগঞ্জে চলে এসেছিল রূপ।এখানকার স্কুল এ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ে তারপর কলকাতায় বাকি পড়াশুনা।তাও পিসিমনি আর দাদু জোর করলো তাই।নাহলে রূপের যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না।কলকাতায় হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা ,চাকরির পরীক্ষা অতঃপর চাকরি সবই হয়েছে।শুধু পিসিমনি যে কিনা রূপকে মানুষ করবে বলে নিজে বিয়ে টাও করলো না সে গুরুতর ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ল।সেই তুলনায় দাদু এখনো শক্ত সামর্থ।নিযেথেকেই পিসিমনিকে দেয়া কথা রেখেছে রূপ,সে ঠিক চেষ্টা করে এই মোহনগঞ্জের কাছাকাছি ই ফিরে এসেছে।যদিও অফিস দিনাজপুরে ,তবুও এখন থেকে যাতায়াত টা কোনো অসুবিধা ই নয়।গাড়িতে ঘন্টা দুয়েক।মাঝে মাঝেই চলে আসতে পারবে।পিসিমনি বা দাদু কেউই যাবে না নিজের জায়গা ছেড়ে,তাই তাকেই যাতায়াত করতে হবে।কি যে আঁকড়ে পরে আছে ওরা কেজানে।দিনাজপুরে ওর সুন্দর থাকার জায়গা আছে তাও ওরা এখানেই পুরোনো বাড়িতেই স্বচ্ছন্দ।
   সেই ছোটবেলার মোহনগঞ্জ এখন অনেক অনেক বদলে গেছে।শহুরে হওয়া লেগে গেছে।প্রত্যেক ঘরে ঘরে এখন রঙিন টিভি,কেবল কানেকশন।পুবের দিকের মাঠে একটা অস্থায়ী ভিডিও পার্লার ও গজিয়েছে।শুনেছে লুকিয়ে চুরিয়ে নীলছবি দেখায় সেখানে।কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারছেনা।এখন প্রত্যেকের হাতে মোবাইল।অথচ তার ছোটবেলায় তাদের বাড়ি ছাড়া আর দুটো বাড়িতে টেলিফোন ছিল।তখন একটা অন্যরকম ব্যাপার ছিল এই গঞ্জে।সন্ধ্যে বেলা দুর্গামণ্ডপে গঞ্জের বয়োজ্যেষ্ঠ রা জমায়েত হতেন,নানা রকম আলোচনা হতো।ছোটরা বিকেলে মাঠে খেলতে যেত।এখন যেন সব কেমন ছাড়ো ছাড়ো ভাব।সবাই ওই বাক্সবন্দী হয়ে গেছে।পুরোনো লাইব্রেরি টার ও করুন অবস্থা।কেউ আর টাকা দিয়ে, বই দিয়ে সাহায্য করেনা, সদস্যপদ ও কমে কমে তলানিতে।তাই রোজগার ও নেই নতুন বই কেনাও নেই।আর একটা ব্যাপার ইদানিং প্রচুর বাইরের লোকের আনাগোনা শুরু হয়েছে এই মোহনগঞ্জে।রূপ অবশ্য একটা বিশেষ কাজ নিয়ে এসেছে এখানে।ঠিকঠাক মেটাতে পারলে কলকাতায় বদলির সুযোগ আছে।সেটা নিয়ে অবশ্য সেরকম কোনো ভাবনা নেই রূপের।যতদিন পিসিমনি দাদু আছে ততদিন অন্তত সে চেষ্টা করবে তাদের কাছাকাছি থাকার।রূপের আর কোনো আপনজন নেই,অন্তত রূপ তাই মনে করে।বাবা মা নামক দুটো সম্পর্ক নিয়ে তার কোনো আবেগ নেই,বরং ঘেন্না আছে।দুটো স্বার্থপর মানুষ যারা শুধুই নিজেরটা বুঝেছিল।একবারও ছোট্ট রূপের কথা ভাবেনি।নির্দ্বিধায় যে যার সুখ খুঁজেনিয়েছিল।যাক,সকাল সকাল ওই মানুষদুটোর কথা ভেবে দিন খারাপ করে কোনো লাভ নেই।তাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে অফিস থেকে পাঠিয়েছে ,সেটার দিকে মনোনিবেশ করাই ভালো।
  সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে নিমাইকাকুর চায়ের দোকানে এসে পড়েছে রূপ।নিমাইকাকুর আজকাল শরীর ভালো যায় না,তাই নিমাই কাকুর সাথে কমই দেখা হয় রূপের।আগে ছোটবেলায় দাদুর সাথে রোজ আসতো রূপ এই দোকানে।নিমাই কাকু; দাদু ;মন্ডল কাকু; ডাক্তার দাদু; সেন মামা আরো কতজন আসতো।নানা রকম গল্প হতো।সেই থেকে এই দোকানে সকালে আসা অভ্যাস হয়ে গেছে।পিসিমনির ইনসমিয়া আছে,ভোরের দিকে ঘুম আসে।কোনোদিন ই তাড়াতাড়ি উঠতে পারতো না।বিন্তি মাসি ও একটু বেলায় আসতো কাজে।সকালের চা ,জলখাবার টা বরাবর এখানেই খেত রূপ।একটা অভ্যাস মতো হয়ে গেছে।যদিও এখন আর বিন্তি মাসি বেঁচে নেই,তার বদলে রিনিদি আসে।রিনিদি বিন্তি মাসির ছেলের বউ।ছেলে রাজুদা কোথায় কোন রাজ্যে কাজ করে রিনিদিও ঠিক বলতে পারে না ।আসে ও না টাকাও পাঠায় না।শুধু মাঝে মাঝে ফোন করে নিজের অস্তিত্বের কথা জানায়।আর রিনিদি সেই ফেলে রেখে যাওয়া বরের মঙ্গলে শাঁখা সিঁদুর পরে হয়তো অপেক্ষাও করে।নিমাইকাকুর একটা পাকা মেয়ে আছে।সবাই খুব ভালোবাসে তাকে।কিন্তু ভীষণ পাকা।সব কিছুতে গার্জেন গিরি ফলায়।পিসিমনি আর দাদু ও ওকে মাথায় তুলেছে।পুচকি মেয়ে কিন্তু কথাবার্তা যেন বাড়ির গিন্নি।যখন তখন তাদের বাড়িতে আসে, সে আসুক কিন্তু তার ঘরে কেন ঢুকেপরে কে জানে।তার সব কিছুতেই যেন ওর আগ্রহ।এটা কি,ওটা কেন এত্তো এত্তো প্রশ্ন সব সময় কিলবিল করে ওর মনে।একদম পছন্দই নয় ওই সাজু নামের মেয়েটাকে। আরে!মণ্ডলজেঠু র পাশে ওই লোকটা না,অবাক ব্যাপার এখানে কি করছে লোকটা।ভালোভাবে মনে আছে রূপের ঠিক তিনমাস আগে একে দেখেছিল দমদমে,এয়ারপোর্ট এ।যদিও একই ফ্লাইট এ সে ও ওই লোকটা এসেছিল দিল্লি থেকে কিন্তু লোকটাকে সে প্লেনের ভিতরে খেয়াল করেনি।পরে ব্যাগ নেয়ার লাইনে তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আর আড়চোখে তার ই দিকে দেখছিল।পরিষ্কার মনে আছে লম্বা সরু মতো চেহারা।মুখে ব্রণ র দাগ ভর্তি।আর কি অদ্ভুত দৃস্টি।এখানে কি করছে লোকটা।তবে তার কাছে যে খবর আছে সেটা সত্যি!!লোকটা কি সেই কারণেই এখানে এসেছে,নাকি একেবারে কাকতালিও ব্যাপার।খুব চিন্তায় পড়ে গেলো রূপ।অনুমান আর খবর যদি সত্যি হয় তবে তো বেশ চিন্তার বিষয়।একটা ফোন এক্ষুনি করতে হবে তাকে।এদিক ওদিক তাকিয়ে মোবাইল টা বেরকরে ডায়াল লিস্টে র শেষ নম্বরটা ছুঁয়ে ফোন টা কানে ধরল,বৃথা চেষ্টা।ওপারে ফোন বন্ধ।কি করা যায় ভাবতে ভাবতে ই সামনে মেয়েটা..
–আপনার ডিমসিদ্ধ।ঘুগনি টা একটু পরে দিচ্ছি।আজ একটু দেরি হয়ে গেল,দশ মিনিটের মধ্যেই হয়ে যাবে।একটু বসুন।না খেয়ে আবার চলে যাবেন না।
উফ একসাথে কত কথা বলে মেয়েটা,বাবারে।বকবক করে মাথা টা না খেলে শান্তি নেই।
–হুম।
তাড়াতাড়ি দোকানে চলে গেল।রূপ ডিমসিদ্ধ দুটোর কুসুম রেখে সাদা অংশ টা খেয়ে প্লেট রাখতে গিয়ে দেখল উনুনের গনগনে আঁচে ঘুগনি ফুটছে,একটা লম্বা খুন্তি দিয়ে মেয়েটা সেটা নাড়ছে।উনুনের তাপে মুখটা লাল হয়ে গেছে,দেখে কেমন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো রূপের।আহারে,এইটুকু বয়সে কত খাটে মেয়েটা।আগুনের তাপে লাল হয়ে গেলেও অদ্ভুত মায়াময় লাগছে ওকে।কি যেন একটা আকর্ষণ আছে ওই মুখে,চোখ সরাতে ইচ্ছা করছে না।সেদিন দরজার কাছে মুখোমুখি ধাক্কা লেগেছিল।তখন ও মুখ টা এরকম ই লাল হয়ে গিয়েছিল মেয়েটার।ধমক খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল সেদিন।মাঝে মাঝে ওকে দেখে রূপের সব ঝগড়া মিটিয়ে নিতে ইচ্ছা করে।ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর সব বকবক শুনতে ইচ্ছা করে।কিন্তু তারপর ই সব ইচ্ছাকে দূরে সরিয়ে এক কঠিন খোলসে মনটাকে ঢুকিয়ে দেয় রূপ।ইদানিং ওই মনটা যে কেন প্রায়ই খোলসথেকে বেরিয়ে আসতে চায় কে জানে।
–এই যে রূপবাবু,তোমাকেই খুঁজছিলাম যে।একটা বিশেষ দরকার আছে তোমার সাথে ।
মন্ডল কাকুর কথায় সম্বিৎ ফেরে রূপের।তাড়াতাড়ি সাজুর দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয় সে।একটু অবাক হয়েই বলে,
–আমাকে খুঁজছিলেন?? হ্যা বলুন না,কি দরকার।
–বোঝোই তো,আজকাল বয়স হয়েছে।ঠিক সাহস করে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনা।আবার টাকার ও একটু প্রয়োজন হয় পড়েছে।বুঝতে পারছিনা কি করব।
–বলুন না কিভাবে সাহায্য করব।এত ইতস্তত  করছেন কেন।
— আরে ওই যে লম্বামত লোকটাকে দেখছো না,ওই যে।
মণ্ডলকাকু ওই সিঁড়িঙ্গেটার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখল।চমকে উঠে রূপ বলে উঠলো,
–হ্যা হ্যা,
–এসে সাজুকে ঘর ভাড়ার কথা জিজ্ঞেস করেছিল।তা সাজু খোলসা করে বলেনি ঘর আছে,বুদ্ধিমতী মেয়ে কিনা!!কি করি বলত।আমিতো ঘর ভাড়া দিয়ে থাকি।ঘর ফাঁকাও আছে।কিন্তু এই উটকো লোক কে দিতে ভরসা পাচ্ছি না।এদিকে মেয়েকে কিছু টাকা পাঠানোর ও দরকার আছে।
–কি বলছে,কেন ভাড়া চায়।
–বলছে গড়ের ওদিকে জঙ্গলে কিসব গাছ গাছড়া নিয়ে গবেষণা করবে।ও নাকি গাছের শিকড়বাকর নিয়ে কিসব ওষুধ বানায়।
   মোহনগঞ্জের পশ্চিমদিকে একধারে একটা ভাঙা প্রাসাদমত আছে।চলতি কথায় লোকে গড় ই বলে।প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে একসময় রাজা মদনমোহন চৌধুরী ওই রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন।তাঁর ই নামে এই জায়গার নামকরণ হয় মোহনগঞ্জ।আর ওই গড়কে আগে সবাই মোহনগড় বলত।ওই প্রাসাদের চারিধারে তিনটে ঝিল এমনভাবে ছিল যেন প্রাসাদকে ঘিরে রেখেছে পরিখার মতো।সে বহুযুগ আগের কথা।এখন না আছে রাজা,না আছে প্রাসাদ।আর ঝিলগুলো শুকিয়ে এখন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।এমনকি মোহনগড় নামটাও হারিয়েগেছে বিস্মৃতির অতলে।এখনওই ভাঙা চোরা ধ্বংসস্তুপকে সবাই গড় ই বলে থাকে।
লোকটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষন কিজানি ভেবে বললো,
–কদিনের জন্য চাইছে ভাড়া?
–এই মাসখানেক,বলছে যত টাকা চাইব দেবে।ওখানে নাকি কিসব গাছ আছে।যা পেলে মানুষের উপকারে লাগবে।
–বেশ ,দিন তবে।কিন্তু ভোটার কার্ড ,আধার কার্ড দেখে নেবেন।বুঝতেই তো পারছেন,দিনকাল ভালো নয়।
–ও,হ্যা সে তো বটেই।বলছো দেব তবে??
— দিন,তবে একটু নজর রাখবেন।একেবারে অচেনা তো।
লোকটার গতিবিধি খেয়াল করতে হবে।অনুমান আর খবর যদি ঠিক হয় তবে একে ভাড়া দিয়ে গঞ্জে রাখা টা দরকার।
–এই নিন,আপনার ঘুগনি।
হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল যে।কি কোনো বাড়তি কথা তো বললো না।কি হলো হটাৎ।
বকবকানি র কিন্তু বেশ একটা সুন্দর নাম আছে,পিসিমনির থেকে কায়দা করে জেনেছে রূপ।শিঞ্জিনী…পায়ের অলংকার..

।৩।
–সাজু ,এই সাজু ।
— তুই??!!এখানে কি করছিস?কবে এসেছিস?বাবা জানে??
–চুপ,একদম আস্তে।না কেউ জানে না।আমি লুকিয়ে এসেছি।তোর সাথে একবার দেখা করতে এলাম আর এই নে,এখানে হাজার পাঁচেক আছে।বাকিটা খুব তাড়াতাড়ি দিয়ে দেব তোকে।বাবার অপারেশন টা করিয়ে নিস।
–না ,তার দরকার হবেনা রে।আমি জমিয়েছি কিছু।আর কিছুদিনের মধ্যে বাকিটাও জমে যাবে।
–ও,আমার টাকা নিবি না!টাকার কিন্তু কোনো জাত হয়না সাজু।
–নারে,তারজন্য নয়।এখন তো দোকান মোটামুটি ভালোই চলে।দুটো মানুষের কতই বা খরচ বল।আর তুই তো জানিস,বাবা যদি জানতে পারে তাহলে খুব রাগ করবে রে।
–বুঝেছি,নিবিনা।
–তুই কোথায় থাকিস এখন?এখানে কবে এসেছিস?
–কাল রাতে এসেছি,থাকছি আপাতত গড়ের ভিতর।
–গড়ের ভিতরে তো জঙ্গল রে,সাপখোপের আড্ডা।ওখানে কি করে থাকিস।তোকে এখনো পুলিশ খুঁজছে রে??
— ছাড় তো,সালা ওদের আর কি কাজ।যত্ত সব হারামি।
–এমনি এমনি কাউকে পুলিশ খোঁজেনা।সেরকম কিছু করেছিস তুই।যাক গে,তোকে আর এসব বলে কাজ নেই।খাওয়ার জুটছে কিছু?নাকি ..
–কাল রাতে পাউরুটি খেয়েছিলাম।
–এখন তো প্রায় সন্ধ্যে রে।দাঁড়া কিছু খাওয়ারের ব্যবস্তা করছি।বাড়ির ভিতরে আসবি না?
–নাহ,কিছু খাওয়ার লাগবে না।আমার ক্ষিদে নেই।
–না,দাঁড়া ।কিছু খেয়ে যা।আর পারলে তুই ধরা দে।ওসব ছেড়ে দে।ভালোভাবেও তো রোজগার করা যায় বল।
–আমি যাই।পরে দেখা হবে।
–না না না, যাবিনা একদম।দুমিনিট দাঁড়া।
সাজু ভিতরে গিয়ে রান্নাঘরে দেখলো ভাত কিছুটা আছে,তরকারি ও।তাড়াতাড়ি একটা ডিম কোনোরকমে ভেজে নিয়ে বাড়ির পিছনের দিকের ভাঙা পাঁচিল টার কাছে নিয়ে এলো।
-এই নে, তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।
গোগ্রাসে খাবার গুলো গিলে ফেললো ছেলেটা।সঞ্জয়,সাজুর দাদা।সেই সাত বছর আগে অসৎ সঙ্গে পরে বাড়িছাড়া।সেই শোকে মা চলে গেল।বাবাও মুখ দেখতে চায়না।এই পৃথিবীতে যদি কেউ তাকে চায়,তাকে ভালোবাসে তবে এই সাজু।একমাত্র বোন।এই বোনটার টানে টানেই সে ছুটে আসে এই মোহনগঞ্জে।সেই বয়ঃসন্ধির করা ভুলের মাশুল সে আজও দিয়ে যাচ্ছে।তবে এবারে দাদা বলেছে ওই জিনিস গুলো ঠিকঠাক শহরে পৌঁছে দিলেই ছুটি।আর এসব করতে হবে না।সব ঠিক করা আছে,যা টাকা জমিয়েছে এতদিনে একটা ফাস্টফুড এর দোকান খুলবে দিনাজপুরে।পুলিশকেও নাকি দাদা ম্যানেজ করে দেবে।আস্তে আস্তে সে ও মুলস্রোতে ফিরবে।আসলে এবারের কাজ টা সে ছাড়া কেউ ঠিক করে করতে পারবেনা।মোহনগঞ্জের আশপাশটা তার হাতের তালুর মতো চেনা।আর জিনিস গুলো তো ওপার থেকে আসবে এই মোহনগঞ্জেই।ওই ভাঙা গড়ে এনে রাখতে হবে।তারপর রাতারাতি গাড়ি করে সোজা দিনাজপুরে। দাদার বলা লোকের কাছে দিয়ে দিলেই কাজ শেষ।সে মুক্ত,দাদার কাজ আর করতে হবেনা।দাদা কথা দিয়েছে,সব ঠিক করে দেবে।সে ভালপথে রোজগার করলে বাবাও আর বেশিদিন দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না।সাজুর একটা ভালো বিয়ে দেবে।মেয়েটার পড়াশুনার অনেক ইচ্ছা ছিল।তা তো হলোনা,এর জন্যে  সে নিজেকেই দায়ী করে।তার একটা ভুল সব পাল্টে দিলো।কেন যে সেদিন ওই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লো,তারপর জীবনটাই পাল্টে গেল।যাইহোক এখন তো সব ঠিক ই হয়ে যাবে।যেখানে গেছে সে সেখান থেকে ফেরার শেষ চেষ্টা করছে।এটাই শেষ কাজ তার।ভাবতে ভাবতে কখন যে গড়ের কাছে পৌঁছে গেছে বুঝতেই পারেনি সঞ্জয়।আগামীকাল অমাবস্যা,জিনিসগুলোর আসার  কথা,এলেই জানাতে হবে দাদাকে।সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি আসবে ,সঞ্জয় কে জিনিসগুলো নিয়ে দিনাজপুরে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিতে পারলেই কাজ খতম। মুক্তির আনন্দে সঞ্জয় এতটাই আত্মভোলা হয়ে হাঁটছিল যে খেয়াল ই করেনি একটা ঢ্যাঙ্গা লোক তাকে অনুসরণ করছে সাপের মত,নিঃশব্দে।সে বুঝতেই পারেনি মুক্তি এত সহজে আসেনা।অনেক অনেক সাধনা করতে হয় মুক্তির জন্য।সে গড়ের মধ্যে ঢোকার আগে এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলো না।নিশ্চিন্তে ঢুকে পড়ল ভিতরে।একটা ঘরের বেশ কিছুটা অক্ষত আছে,সেই ঘরেই সে আপাতত আশ্রয় নিয়েছে।সাজু তো পেট ভরে খাইয়ে দিয়েছে,কাল পর্যন্ত এতেই হয়ে যাবে তার।এর থেকেও খারাপ অবস্থায় থাকার অভ্যাস আছে সঞ্জয়ের।সাজুটার চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে।ও,তার পাপের টাকা নেবে না।সৎপথে উপার্জন করে আগে বাবাকে সুস্থ করার সাথে সাথে সাজুর ও যত্ন নিতে হবে তাকে।বড্ড আদুরে ছিল বোনটা তার, আর এখন কি হয়েছে।অনেক দিন পর পেটে ভাত পড়াতে ঘুম পেয়ে গেল সঞ্জয়ের।সে ঘুমিয়ে পড়লো।জানতেও পারলো না অলক্ষে একজোড়া চোখ তাকে দেখছে।
  সঞ্জয় ঘুমিয়ে পড়ার পরই বিপিন তালুকদার ফোন টা হাতে নিল।এই ছেলেটার দিকে সর্বক্ষণ তীক্ষ্ণ নজরে রাখার নির্দেশ আছে তার উপর।বস বলেছে , এবার প্রায় পনের কোটি টাকার মাল আসবে।ছেলেটা যদি কিছু তেরিবেড়ি করে তবে তাকেই ব্যাবস্থা করতে হবে।তার জন্যই ওই বুড়োটাকে টাকার লোভ দেখিয়ে মিথ্যা ভুজুং ভাজুং দিয়ে এখানে থাকার ব্যবস্থা করেছে সে।সে নাকি গাছ নিয়ে গবেষণা করে।সালা ক্লাস থ্রি পর্যন্ত বিদ্যা যার,সে নাকি করবে ওষুধ আবিষ্কার। যত সব বোকা লোকজন থাকে এখানে।তবে সকালের ওই চায়ের দোকানে দেখা ছেলেটা কে?ওর কথা তো বস কিছু বলেনি।ওই মালটাকে খুব একটা সুবিধার লাগলো না।কোথায় যেন দেখেছে মালটাকে।মনে পড়ছে না।বস কি কিছুই জানে না।কি জানি সালা।বস কে ফোন করলো কিন্তু পেলো না,পরে রাতে একবার ঐ মালটার কথা জিজ্ঞেস করবে বিপিন।বসের কাজের এই সঞ্জয় ছেলেটার একটা দুর্বলতা বস তাকে আগেই বলে রেখেছে,বোন টাকে হেভি ভলিবাসে ছেলেটা।সে তো বুঝতেই পারলো বিপিন।মেয়েটা কিন্ত বেশ ।সুন্দর সরেস দেখতে,গড়ন খানাও ডাঁসা।একবার যদি পেত বিপিন,ভেবেই তার শরীর ইন্দ্রিয় কঠিন হয়ে গেল।কাজ যদি ঠিকঠাক মেটে একবার অন্তত ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা আছে বিপিনের।কিন্তু মনে ওই লম্বা দোহারা ছেলেটার কথা বার বার পাক খাচ্ছে।কেন যেন মনে হচ্ছে ওটাকে দিয়ে বিপিনের বিপদ হতে পারে।নাহ,ব্যাপারটাকে নিয়ে একবার বসকে বলতেই হবে।এতগুলো টাকার ব্যাপার।এবারে নাকি একদম অন্য জিনিস আসছে।ভালো টাকা দেবে বলেছে কাজ মিটলে।কাজ সাবাড় করতে পারলে পুরো পঞ্চাশ হাজার পাবে বিপিন।লোভে চোখ দুটো চক চক করে উঠলো বিপিনের।টাকার গন্ধে গন্ধে সে বিভোর হয়ে নিজের ডেরায় পৌঁছে গেছে।হটাৎ ফোন টা কেঁপে উঠলো।তড়িঘড়ি কানে ধরলো,ওপর থেকে ভেসে এলো কিছু কথা,শুনে কপালে ভাঁজ পরে গেল বিপিনের।গম্ভীর হয়ে সে কথাগুলো শুনতে লাগলো।এতটাই মগ্ন হয়ে সে ফোনের নির্দেশ শুনতে লাগলো একজন যে তার কথা শুনছে সে জানতেও পারলো না।পাপ কাজে অসাবধানতা চূড়ান্ত সর্বনাশ ডেকে আনে।পাপীরা হয়তো সেই সর্বনাশের ভয় পায় না।
       এদিকে জানলায় কান লাগিয়ে যে চুপিসারে বিপিনের ফোনালাপ শুনছে তার হৃদস্পন্দন এতটাই বেড়ে গেছে যে সে নিজে পরিষ্কার তা শুনতে পাচ্ছে,কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়েই রয়েছে,কি করবে কাকে বলবে বুঝতেই পারছে না।এই অবস্থা একজনের কথাই তার মনে পড়ল,কিন্তু কিকরে যাবে তার কাছে।এখন তো একদম অন্ধকার হয়ে গেছে।আরও একজন আছে,কিন্ত সে কি শুনবে তার কথা নাকি পাত্তা দেবেনা।কিন্তু বলতে যে তাকে হবেই,সামনে যে বড় বিপদ……

।৪।
  এদিকটায় আগে খুব আসতো রূপ।একটা ফলসা গাছ ছিল,গাছ ভরে ফলসা হতো।একটা জামরুল গাছ ও ছিল।এখনো আছে হয়তো।গঞ্জের লোকজন এদিকটায় খুব একটা আসেনা।ভূতপ্রেতের ভয়,এখানে নাকি জমিদারের বউয়ের আত্মা ঘুরে বেড়ায়।যত্ত সব আজগুবি ধারণা।কিন্তু খবর অনুযায়ী এখানেই আসবে জিনিসগুলো।ভূতপ্রেতের মিথ্যা রটনা টা কাজে লাগিয়ে এখানে বেশ কিছুদিন ধরেই বেআইনী কিছু কার্যকলাপ হচ্ছে।আসলে বর্ডার এর কাছে এমন একটা পরিত্যাক্ত জায়গা চট করে পাওয়া যায়না,তাই চোরাচালানকারী দের খুব সুবিধা হয়েছে।আজ বিকেলে দিনাজপুরে গিয়েছিল রূপ।দরকারি যা যা কাজ মেটাবার মিটিয়ে এসেছে।আজও অফিস থেকে বলল,সে যদি চায় কলকাতায় বদলি হতে পারে।দেখা যাক,কি করা যায়।চলে গেলেও হয়।জোর করে যদি একবার পিসিমনিকে নিয়ে যাওয়া যায়,একটু ভালো চিকিৎসা হতে পারে।পিসিমনি যেতে রাজি হলেও দাদু হবেনা।সে নাহয় রিনিদি আছে,ভোলাদা আছে।মাঝে মাঝে এসে দেখে গেলেও হবে।আচ্ছা,চলে গেলে ওই মেয়েটাকে তো আর দেখতে পাবে না।কিন্তু রূপের তো আনন্দ হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না কেন।বার বার ওর ওই লাল হয়ে যাওয়া মুখ টা মনে পড়ছে।তার উপর পিসিমনির কথাটা শোনার পর থেকে রূপ ও কি মনে মনে সেটাই ভাবছে।কিন্তু পিসিমনি আগেকার মানুষ,বয়সের পার্থক্য নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই নেই তাঁর।কিন্তু রূপ তো জানে আট বছরের পার্থক্য টা আজকের দিনে অনেকটাই।আর মেয়েটাই বা তা মেনে নেবে কেন।পিসিমনি কি ওরও মাথায় এইসব ঢুকিয়েছে নাকি!মেয়েটা তো পড়াশুনা ও বেশিদূর করতে পারেনি,আর রূপ তো রীতিমত  উচ্চশিক্ষিত।কিন্তু এগুলো কি আদৌ কোনো ফ্যাক্টর,মনে হয় না।রূপের বাবা মা দুজনেই উচ্চশিক্ষিত ,বয়সের একদম যথাযথ পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একসাথে থাকতে পারেনি তাঁরা।ছোটবেলা টা বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল ওদের ঝগড়া আর ওঅভিভাবকচিত আচরণে।কিন্তু রূপ কেন এই মেয়েটার কথা ভাবছে,সে তো ঠিক ই করেছে বিয়ে কোনোদিনই সে করবে না।সবথেকে বড় শিক্ষা সে নিয়েছে তার বাবা মার কাছ থেকে।এই মেয়েটা কেন,কোনো মেয়েকেই সে বিয়ে করবে না।তবুও খেয়ালে বেখেয়ালে এই মেয়েটার কথাই বার বার মনে হয় তার।ওকে দেখলেই বুকের ভিতরে কেমন চিনচিনে ব্যাথা করে,একটা অন্য রকম অনুভূতি হয়।কিন্তু পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেয় রূপ,এই অনুভূতিগুলোকে প্রশ্রয় দিলে কোনো লাভ নেই।এগুলো কষ্টই দেবে।তার থেকে বরং কাজে মনোযোগ দেয়া ভালো।যে কাজ তাকে দেয়া হয়েছে তা দায়িত্ব নিয়ে পালন করাটাই এখন তার প্রধান কর্তব্য।আজ কালের মধ্যেই কাজ টা করতে হবে,এরকমই খবর আছে ।দেখা যাক কি হয়।সে সব রকম ভাবে প্রস্তুত হয়ে ই এসেছে।এদিক ওদিকে ভালো ভাবে নজর রাখতে রাখতে গড়ের চারপাশে ঘুরে দেখতে লাগলো রূপ।ঘন অন্ধকার এ সেরকম কিছু দেখাও যাচ্ছে না,তবুও …আরে ঐদিকে ওরা কারা!!হ্যা ঠিকই দেখেছে একটা মেয়ে না!কে ও,আর সাথে ছেলেটাই বা কে।এত জায়গা থাকতে এখানে কি করতে এসেছে ওরা।প্রেম করার কি আর জায়গা নেই নাকি!!অদ্ভুত তো!!একটু এগিয়ে গিয়ে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়ালো রূপ।দূর থেকে যা দেখলো তাতে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।এবার পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে মেয়েটিকে,হাতে একটা মোবাইল হালকা ভাবে আলো ছড়াচ্ছে,সেই আলোয় ওই মায়াবী মুখটা!!
আর রূপের দিকে পিছন করে দিয়ে একটি ছেলে,হাত পা নেড়ে মেয়েটিকে কি যেন বোঝাবার চেষ্টা করছে।গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কি বলছে ছেলেটা মেয়েটাকে।এত রাতে এখানে কি করছে ওরা।এবার মেয়েটা কাঁদছে,আর ছেলেটা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।এসব কি দেখছে রূপ! এবার মেয়েটা চলে যাচ্ছে।রূপের চোখ টা এত জ্বালা করছে কেন,বুকের ভিতরে সেই চিনচিনে ব্যাথা টা খুব প্রবল ভাবে অনুভূত হচ্ছে কেন।কিছু বোঝার আগেই তাকিয়ে দেখে সেই ছেলেটা আর নেই ওখানে।যাহ, এর মধ্যে কোথায় গেল।কি করবে রূপ ,গড়ের ভিতর ঢুকবে।কিন্তু ওতো অন্য উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে।সেটা না করে ওই মেয়েটার প্রেমিক কে খুঁজে কি হবে।কিন্তু সে কি শুধুই প্রেম করতেই এখানে এসেছিল।নাকি অন্য উদ্দেশ্যও আছে।অনেকগুলো ভাবনা একসাথে গুলিয়ে যেতে লাগলো রূপের।নাহ,এই মুহূর্তে গড়ের ভিতর যাওয়ার নির্দেশ নেই কোনো।মানে কাজ টা হয়তো হবে আগামীকাল ,কারণ আগামীকাল অমাবস্যা।তার আগে ওদের তৎপর করে দেয়া যাবেনা।ততক্ষণ পর্যন্ত ওকে অপেক্ষা করতেই হবে,নাহলে জিনিস গুলোই সে ধরতে পারবে না।অপরাধীকে অপরাধ করার আগেই ধরে কোনো লাভ অন্তত এই সময় নেই।কাল রাত পর্যন্ত তাকে ধর্য্য ধরে থাকতেই হবে।কিন্তু বুকের কষ্টটা যে কমছে না,ওই মায়াবী মুখটা…তাহলে ওর চোখে যে ভাষা দেখেছিল রূপ তা কি মিথ্যা? এতটা ভুল দেখলো রূপ।আজ একটু আগে যা দেখলো তা তো ভুল নয়।তবে কোনটা ভুল? চোখের ওই আকুলতা ভুল নাকি এই অন্ধকারে দেখা দৃশ্য ভুল।নাহ, কলকাতা যাওয়ার প্রস্তাব টা ভালো করে ভাবতে হবে রূপকে।এত বড় সুযোগ আছে যখন হাতছাড়া করবে না।যে করেই হোক পিসিমনি কে বোঝাতে হবে।নপুরের নিক্কনের থেকে এই মুহূর্তে ট্রাফিকের আওয়াজ টাই রূপের কাছে মধুর হবে বলে মনে হচ্ছে…..
     আজ একটু কুঁচো মাছ রান্না করেছিল সাজু।মণ্ডলজেঠু আর পুতুলপিসির বাড়ি বাটি করে অল্প অল্প করে দিয়ে ও এসেছিল।সন্ধ্যে নামার পর আর দোকানে যায়না সাজু।ওই সময়টাতে শুধুই চা বিস্কুট বিক্রি হয়।বাবা সামলে নেয়।তেমন একটা ভিড় ও হয়না।দুপুরে মাছ দিতে গিয়ে পুতুল পিসির সাথে গল্পে বসে গিয়েছিল।পুতুল পিসি ও কোন কল্পনার জগতে বাস করে।তার আদরের ভাইপোর সাথে নাকি সাজুর বিয়ে দেবে পিসি।পিসিও ইচ্ছা করলো আর ভাইপো ও নাকি এক কথায় বিয়ের পিড়িঁতে বসে পরলো।সাজুর এত ভালো কপাল হলে তো হয়েই গিয়েছিল।এমনিতেই ওকে দেখলেই সব ওলটপালট হয়ে যায় সাজুর,মনে মনে অনেকদূর পর্যন্ত ভেবে ফেলে সে।তার উপর পিসির এরকম কথায় সাজুর মনটা আরো উচাটন হচ্ছে।কেন তাকে মিথ্যা স্বপ দেখাচ্ছে পিসি!যা কোনোদিন ও হওয়ার নয় তাই নিয়ে বলে বা ভেবে কি হবে।মাছ দিয়ে বেরোবার সময় দেখেছে ফিটফাট হয়ে সে কোথায় যেন যাচ্ছে।এত ভালো দেখতে,ভালো চাকরি করে নিশ্চই কেউ আছে জীবনে।তার সাথেই হয়তো দেখা করতে যাচ্ছে।সাজু আর কথা বলেনি,দূর কথাই বলেনা ঠিক করে।যে তাকে পছন্দই করেন তার সাথে যেচে কথা বলে কি হবে।কিন্তু গন্ডগোল টা বাধলো মণ্ডলজেঠু র বাড়িতে সন্ধ্যেবেলা গিয়ে।প্রথম থেকেই ও বিটকেল টাকে পছন্দ হয়নি সাজুর।ওকে কেন যে থাকতে দিলো জেঠু কে জানে।পরিষ্কার শুনেছে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছে,বলছিল দরকারে মেরে ফেলবে।কাল রাতে কি হবে।কার উপর নজর রাখছে।দাদাভাই এর ক্ষতি করবে নাকি।কি জিনিসই বা আসবে কাল।কিচ্ছু বুঝতেই পারছে না সাজু।প্রথমেই মনে হয়েছিল দাদাভাইকে সব বলতে হবে কিন্তু অন্ধকারে কিভাবে যাবে ভেবে পাচ্ছিল না সাজু।তাই আবার দৌড়ে পিসির বাড়ি গিয়েছিল।ওই রূপাইকে বলতে ।কিন্তু সে তো তখনো ফেরেনি।কি করবে সাজু,ছুটে গিয়েছিল দাদাভাই এর কাছেই ওই অন্ধকারে সমস্ত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেই।যেটুকু শুনেছে সবটা বলেছে।দাদাভাই ও শুনে খুব চিন্তায় পরেগেছে।অন্ধকারেও বেশ বুঝেছে সাজু।যদিও দাদাভাই ওকে অনেক বুঝিয়েছে ,আশ্বস্ত করেছে।কিছু ক্ষতি হবেনা বলেছে।কিন্তু সাজুর মন খুব কু গাইছে।কালকে কি হবে কেজানে।হে ঈশ্বর সব কিছু ঠিক রেখো।দাদাভাই কে সুস্থ্য রেখো।কিন্তু তাকে সব কথা রুপাই কে বলতেই হবে।সাজুর মন বলছে যে একমাত্র সেই পারবে সব কিছু ঠিক করতে।কিভাবে পারবে কেন পারবে তা সাজু জানেনা,কিন্তু এই বিপদ থেকে উদ্ধার একমাত্র ওই পারবে….

।৫।
বাড়িতে ফিরে নিজের ঘরে গুম হয়ে বসে রইলো রূপ।কিছুতেই ওই মেয়েটার মুখ টা ভুলতে পারছেনা।সাজু কে তো রূপের পছন্দই নয়,তবে ও কার সাথে এনগেজ থাকলো কি সিঙ্গল থাকলো তাতে ওর কি!রূপের বিয়ে সংসারের উপর আস্থা নেই সেটা তার বাবা মায়ের জন্য।কিন্তু সাজুর তো শৈশব টা সুন্দর ছিল।ওরা দুই ভাইবোন কি সুন্দর মিলেমিশে থাকতো।সঞ্জু তো বোন অন্ত প্রাণ ছিল।একটা ভুল করে ফেললো সঞ্জু।সব এলোমেলো হয়ে গেল।সেটা আলাদা ব্যাপার,তাই সাজুর সংসারের ইচ্ছা থাকতেই পারে।কিন্তু এমন কাকে ও ভালোবাসে যার সাথে অতো রাতে গড়ের কাছে গিয়ে দেখা করতে হয়!
অদ্ভুত,দেখে তো খুব সরল মনের ভালো মেয়েই মনে হয়।পেটে পেট এত!!রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে রূপের।কিন্তু এরকম টা হওয়ার কথাই নয়।ওদিকে কালকের দিনটি এবং মূলত রাত নিয়ে চিন্তার শেষ নেই রূপের।কি যে হবে ,তবে যাই হবে মোকাবিলা তো করতেই হবে।তার জন্যই তো তার এখানে আসা।
–রূপ দাদা ও রূপ দাদা।
ভোলাদা বাইরে থেকে ডাকছে।এত রাতে ডাকছে কেন।পিসিমনির কিছু হলো।এসে থেকে তো যায় ও নি দেখা করতে।
–হ্যা ,বলো।কি হয়েছে।পিসিমনি ঠিক আছে তো??
–তোমাকে ডাকছে।
–এক্ষুনি যাচ্ছি।
তাড়াতাড়ি নিচের তলায় পিসিমনি কাছে গেল রূপ।
–বাবু,এসেছিস।শোন না ,সাজু এসেছিল তোকে খুঁজছিল।বললো খুব দরকার।
–আমার ওর সাথে কোনো দরকার নেই।আর আমার সাথেই বা ওর কি দরকার?
–তা তো জানিনা।খুব চিন্তায় আছে দেখলাম।
–দূর,ছাড়ো তো।কাল আসবে তো কোনো না কোনো কারণে।কথা বলে নেব।
–ওহ,ওদিকে ওর শরীর টাও ভালো না।বলছিল জ্বর জ্বর ভাব।কিজানি,মেয়েটার জন্য এত চিন্তা হয়।দাদা টা তো একটা আহাম্মক, নিজের জীবন তা নষ্ট করলো।মা টাও মরলো তার জন্য।মেয়েটা অসুস্থ্য বাবা ,দোকান নিয়ে হিমসিম খাচ্ছে।
–মোটেই না,সে ঠিক ই আছে।আনন্দে ই আছে।তুমি জানোনা।
–বাজে বকিস না তো বাবু,একটা কথা বললে শুনিশ না আবার বড়ো বড় কথা।বলি পেটে পড়েছে কিছু নাকি!
–না,শরীর টা ভালো নেই।রাতে কিছু খাব না।
–ও,গলায় ঢেলেছো।বুঝেছি।
–নাআআ।আমি কিছুই গলায় ঢালিনি।শুয়ে পর।আমি খুব ক্লান্ত।কাল দরকারি কাজ আছে।
-কি যে করিস তাও বলিস না।জানিনা বাপু।আমি এবার মানে মানে যেতে পারলে বাঁচি।তার আগে দাদা কে ডেকে সব বলে বুঝিয়ে দিয়ে যাবো ।
এই দাদার কথা শুনেই রূপের মাথা আরো গরম হয়ে গেল।গটগট করে বেরিয়ে গেল নিজের ঘর থেকে।উপরে উঠতে গিয়েও কি যেন মনে হলো,উঠলোনা।সোজা বেরিয়ে গেল।

সকাল থেকেই সাজুর শরীর টা ঠিক ছিল না, গা হাত পা ব্যাথা , জ্বর জ্বর ভাব।তাও একটা ক্যালপল খেয়ে নিয়েছিল।বিকেলের দিকে কমেও গিয়েছিল ,কিন্তু এখন খুব কষ্ট হচ্ছে।মাথা টা যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে,গা হাত পা টাটিয়ে উঠেছে।গাটাও খুবগরম।একবার দেখবে নাকি,থার্মোমিটার এ।বাবা ও আজ তাড়াতাড়ি এসে খেয়ে শুয়ে পড়েছে।ঘড়িতে দেখলো সাড়ে নটা।ক্যালপল আর একটাই আছে।ওটাই খেতে হবে।সাজু দেখলো জ্বর মেপে,প্রায় একশ দুই।এদিকে ওই বিটকেলের কথাগুলো তো রুপাই কে বলা দরকার।এত রাতে যাবে কিভাবে।এক পাও যে হাঁটার ক্ষমতা নেই সাজুর।ওফ কি কষ্ট হচ্ছে।মনে হচ্ছে এখুনি মাথা ঘুরে পরে যাবে।ক্যালপল টাও যে নিয়ে খাবে তাও ক্ষমতা নেই।চুপ করে চেয়ারে বসে আছে।হটাৎ দরজায় আওয়াজ হলো।কি হলো ,এখন আবার কে এলো।পরিষ্কার ঠক ঠক আওয়াজ পেলো।দাদাভাই এলো নাকি।কিন্তু সামনের দরজা দিয়ে তো দাদাভাই আসেনা।আবার ঠক ঠক।নাহ,গিয়ে দেখতে হবে।কোনো ক্রমে টলতে টলতে গিয়ে দরজা খুলে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো।দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে তার স্বপ্নের পুরুষ,রুপাই।কিন্তু কিছু বলার আগেই মাথা টা প্রচন্ড ঘুরে গেল,টাল সামলাতে না পেরে পরেই যাচ্ছিল কিন্তু রুপাই হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলল।তারপর আস্তে আস্তে ধরে ধরে সাজুকে নিয়ে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে শুয়ে দিলো।সাজুর তারপর আর কিছুই মনে নেই।
পরের দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙল দেখলো বাবা পাশে আধশোয়া হইবে ঘুমাচ্ছে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো সাজু,সাড়ে নটা।কাল শেষ বার যখন ঘড়ি দেখেছিল তখন ও সাড়ে নটাই বেজেছিলো।মাঝখানে পুরো বারো ঘন্টা কেটে গেছে।কিছুই মনে পড়ছে না কিভাবে।ধড়মড় করে উঠতে গিয়ে উঠতে পারলো না।শরীর খুব দুর্বল লাগছে।মাথা টাও ঝিম ঝিম করছে।এদিকে রুপাই কে সব বলতে হবে,কিকরে বলবে।ভেবেছিল দোকানে এলে বলবে।দোকান তো আজ খোলাই হলো না।সে নিশ্চই এসে ফিরে গেছে।কাল সারা রাত সাজু তার স্বপ্ন দেখছে।কিন্তু সাজুর হালকা হালকা মনে পড়ছে যে কাল রাতে সে এসেছিল।দরজা খুলে দিল সাজু।তারপর ….নাহ মনে করতে পারছে না।হয়তো সেটাও স্বপ্ন ছিল।পাশে ক্যালপল এর ছেঁড়া মোড়ক টা চোখে পড়ল সাজুর।এটা কখন খেলো ও।
–মা,তুই উঠেছিস।এখন কেমন লাগছে রে।রায় কাকু কে খবর দেয়া হয়েছে।আসবে একটু পরেই।
বাবার ডাকে চিন্তার জাল ছিঁড়ে যায় সাজুর।দেখে বাবা সোজা হয়ে উঠে বসেছে।তার দিকে তাকিয়ে আছে।বোঝার চেষ্টা করছে সে কেমন আছে।
–খুব দুর্বল লাগছে ,উঠতে পারছি না।আজ তো দোকান বন্ধ গেল বাবা।কি যে হলো,বুঝতেই পারলাম না।তুমি এখানে কিকরে এলে গো তুমি তো শুয়ে পড়েছিল কাল তাড়াতাড়ি।
–হ্যা,আমাকে তো ওবাড়ির রূপবাবু ডাকলো,বললো তোর খুব জ্বর।তুই নাকি ওবাড়ি গিয়েছিলিস।বলেছিলিস রূপের সাথে জরুরি দরকার।ও ছিল না,দিনাজপুর গিয়েছিল।
–হ্যাঁ, আমি পিসিকে বলে এসেছিলাম আসলে বলতে।
–হম,এসে পুতুলের কাছে শুনে তোর কাছে এসেছিল।তুই নাকি দরজা খুলে দিয়েই অজ্ঞান হয়ে গেছিলি।আমি তো ঘুমাচ্ছিলাম।ও নাকি অনেকবার ডেকেছে আমাকে।আমার সাড়া না পেয়ে রান্নাঘরে গিয়ে বাটি এনে জলপট্টি দিয়েছে।ওষুধ খাইয়েছে।তারপর আমাকে ঘরে গিয়ে আবার ডেকেছে।তখন তো উঠে এলাম।তুই তখন ঘুমিয়ে পরেছিস।তারপর ও অনেকক্ষন ছিল পাশে বসে।অনেক করেছে রে ছেলেটা।তোর জ্বর কমার পর এই সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাড়ি যায়।
তারমানে সে সত্যি এসেছিল,সাজু স্বপ্ন দেখেনি।সে এলো,তার এত সেবাও করলো!!ভাবতেই অবাক লাগছে সাজুর।সে যে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা এতকিছু।এতকিছুর মধ্যে নিজের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে সাজু।সে যে একেবারে ঘরোয়া ভাবে ছিল।এই অবস্থায় সে দেখে নিলো তাকে।এবার কিকরে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে সাজু।এটা ভেবেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় সাজু।

সকাল হতে না হতেই অফিস থেকে জরুরি তলব।কোনোরকমে নাকে মুখে গুজেই দৌড়াতে হচ্ছে।গাড়ি অবশ্য পাঠিয়েছে ,কিন্তু তাও।কাল রাতের পর মেয়েটার আর খোঁজ নেওয়া হলো না।ডাক্তারদাদু কে অবশ্য খবর পাঠিয়ে দিয়েছিল ,কিন্তু কাল যা অবস্থা দেখে এসেছিল ওর তারপর ভেবেছিল সকালে একবার যাবে।তা আর হলো কই।আজকে এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে,তারমধ্যে অফিসে ডেকে পাঠিয়েছে।আর ওই মেয়েটার ও এরকম অবস্থা।কালকের কথা মনে পড়তেই কান টা গরম হয়ে গেল রূপের।জ্বরের ঘোরে মেয়েটা কি বললো তাকে!!ঢোকা মাত্রই তো প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেল।ধরে নিয়ে যেতে গিয়েই বুঝেছিল রুপাই,গায়ে অনেক জ্বর।তবে সেটা যে একশো তিনের কাছাকাছি সেটা বুঝলো শুয়ে দেয়ার পর চেক করে।এদিকে সে তখন এলোমেলো বকে যাচ্ছে।
“তুমি খুব বাজে লোক”
“দাদাভাই কে বাঁচাও”
“পিসিমনি বিয়ে দেবে”
“তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসনা”
“ওই লোকটা খুব শয়তান”
“মেরে ফেলবে বলেছে”
“তোমার জন্য রান্নাকরে দিলাম,খেলে না”
” এঁটো খেলে ভালোবাসা বাড়ে”
আরো কত কি আবোল তাবোল,কোনো কথার সাথে কোনো কথার মিল নেই।নিমাইকাকু কে ডাকলো কোনো সাড়া পেলো না,অসুস্থ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছিলো বেঘোরে।এদিকে জ্বর তো বেড়েই যাচ্ছে।রূপ নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে বাটিতে করে জল নিয়ে মাথায় জলপট্টি দিয়েছে।গামছা ভিজিয়ে যতটা সম্ভব গা হাত পা মুছে দিয়েছে।একদম শরীর এলিয়ে দিয়েছিল সাজু।কোনো বোধ ই ছিল না।বার বার রূপকে আঁকড়ে ধরছিল।একেবারেই এলোমেলো অবস্থায় ছিল সাজু।রূপের কেমন যেন ঘোর লেগে গিয়েছিল।একবার খুব ইচ্ছা করেছিল ওর ওই তপ্ত ঠোঁটের স্বাদ নিতে।কিন্তু মনকে পরক্ষনেই ধিক্কার জানিয়েছে মস্তিষ্ক। সাজুর জ্বরের প্রলাপে রূপ এটুকু বুঝেছে যে পিসিমনি ওর মাথাটা যথেষ্ট পরিমাণে বিগড়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।মেয়েটা তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে,কিন্তু একটা অনিশ্চয়তাও আছে ওর মধ্যে।কিন্তু মেয়েটা আরো বেশ কিছু কথা বলছিল সেগুলো কেনই বলছিল।আর ওর জরুরি কথা তাও তো জানা হলো না।আর স
সাজু যদি রূপকেই ভালোবাসে তবে কাল রাতের গড়ের কাছে ওই ছেলেটা কে।ভেবেছিল সকালে ওকে গিয়ে দেখেও আসবে আর ওর কথাগুলো ও শুনবে কিন্তু তা আর হলো কই।এখন তো অফিসে দৌড়াচ্ছে।কানে শুধু একটাই কথা বেজে চলেছে..
“তুমি রূপ না, রুপাই …
সাজুর রুপাই”…….

।৬।
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ জিনিস গুলো আসার কথা,এখন আটটা চল্লিশ বেজে গেছে।মোবাইল এ সময় দেখে সঞ্জয়।কথা আছে জিনিসগুলো সাড়ে বারোটা পর্যন্ত নিজের কাছে লুকিয়ে রেখে,তারপর দাদার পাঠানো গাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।ওই তো,আসছে কারা যেন।এসে গেছে মাল গুলো!মাফলার দিয়ে মুখ পুরো ঢাকা,দুটো লোক আসছে।
–পাঁচ তিন দুই।
–দুই তিন পাঁচ।
–এই নিন।
–এইটা??মানে এত ছোট বক্স!!
–হ্যা,এবার এটাই পাঠিয়েছে।
–কি আছে এতে??
–কি হবে জেনে??যা বলা হয়েছে করবেন।
লোক দুটো একটা ছোট বক্স মতো হাতে ধরিয়ে দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।খুব অবাক লাগছে সঞ্জয়ের ,এত ছোট বক্স এ কি আছে,আর এত হালকা ই বা কেন।যা আসার কথা ছিল তা তো এত হালকা হওয়ার কথা নয়।দেখবে নাকি খুলে,কিন্তু তা তো নিয়মবিরুদ্ধ।দাদা জানতে পারলে খুব রেগে যাবে।মাঝখানথেকে সঞ্জয়ের সব কিছুই ভেস্তে যাবে।মনটা অহেতুক এরকম কিন্তু কিন্তু করছে কেন,এর আগে তো বহুবার দাদার কাজ করেছে সে।এবারে কেন যেন মনে হচ্ছে এই কাজ টা করা ঠিক হবে না। অসৎ উপায় সে রোজগার করে ঠিকই কিন্তু সমস্ত মানবিকতা সে খুইয়ে বসেনি।বাবা আর সাজু তার থেকে টাকা নেয়না,তাই সে নিজের রোজগারের বেশ কিছুটা অর্থ একটা অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেয়।দোনামনা করে বাক্স টা খুলেই ফেললো সঞ্জয়, একি!! এগুলো তো..সর্বনাশ।এই জিনিসের ব্যবসা কবে থেকে শুরু করলো দাদা! না ,সঞ্জয় এই জিনিসের কারবারে থাকবে না।এই জিনিসের চোরাচালান সে করবে না।কিন্তু এই মুহূর্তে কি করবে সে,বাক্সটা একটা গোপন জায়গায় রেখে বাইরে এলো ।এদিকে হটাৎ হরে খুব ঠান্ডা ঠান্ডা হওয়া দিচ্ছে,বৃষ্টি আসছে নাকি তাও এই অসময়!
  এতক্ষণ অন্ধকারে গা মিশিয়ে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিল বিপিন।বস কে এক্ষুনি বলতে হবে ,ও মাল টা খুলে দেখে নিয়েছে।বস সন্দেহ করেছিল,ও মালটা দেখে ঝামেলা পাকাতে পারে।কিন্তু ও গেল কোথায়,বোনটার কাছে নাকি।সে গেছে যাক।এই ফাঁকে দেখে নিতে হবে যে মালটা কোথায় লুকালো।বিপিন ঠিক করেছে ওইমালটা ও সরাবে।ওই ছেলেটা ঝামেলা করুক র নাই করুক ও বলবে বানিয়ে যে ছেলেটা দুগ্গিবাজি করছিল।এই বলে মোটা টাকা নেবে বস এর কাছ থেকে।ভিতরে ঢুকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও বক্সটা পেলো না।সালা সাপের ও ভয় আছে এখানে।আর ও কি কি সালা লুকিয়ে আছে কে জানে।পয়সার লোভে সালা জানটাই না চলে যায়।এক কাজ করবে,একটু পড়ে ছেলেটা আসবে তো ।তখন দেখবে লুকিয়ে কোথায় রেখেছে মালটা।ধরা পড়ে গেলে নাহয় ,মেশিন তো আছে সাথে।আর বস তো বলেই দিয়েছে,দরকার পড়লে নিকেশ করে দিতে হবে ।
   আজই তো সেই দিন,রূপ অফিস থেকে ফিরে সমস্ত রকম প্রস্তুতি নিয়ে গড়ের কাছে চলে এসেছে।সাথে পুরো বারো জনের ফোর্স।আজকের এই অপারেশন টার জন্য গত তিনমাস  ধরে সে এই মোহনগঞ্জে রয়েছে।ঠিক দেড় বছর আগে সে ভারত সরকারের  সিবিআই তে  জুনিয়ার গোয়েন্দা পদে যোগ দিয়েছে।নারকোটিক ডিপার্টমেন্ট এ একটা গুরুত্তপূর্ণ কাজের সাথে সে যুক্ত। আপাতত মাদক চোরাচালান নিয়েই সে কাজ করছে।অনেক দিন ধরেই প্রতিবেশী রাজ্য থেকে এই পথে মাদক আসছে,যা পরবর্তী কালে গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে।এটা বন্ধ করাই এখন প্রধান কাজ তাদের দপ্তরের।কিন্তু তার এই চাকরির কথা পিসিমনি ছাড়া কেউ জানে না।আজকের এই চোরাচালান ধরতে পারলে তার পদোন্নতি পাকা।কিন্তু পদোন্নতির থেকেও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই দল টাকে ধরা।এমনিতেও কালকে রাতের ঘটনার পর কলকাতায় যাওয়ার কথা আর ভাবছেই না সে।তার দলের বারোজন বিভিন্ন জায়গায় পজিশন নিয়ে নিয়েছে।শুধু তার নির্দেশের অপেক্ষা।আজ রূপ সশস্ত্রই এসেছে।বাকিরাও তাই।এখানে একটা বড় ধরনের গন্ডগোল হবে এমনটাই খবর আছে।কিন্তু এই অসময় এমন মেঘ করেছে কেন।বৃষ্টি এলে কাজের অনেক অসুবিধা হয় যাবে।এই অকাল বৃষ্টি অপরাধীদের না সুবিধা করে দেয়।আর তার কাছে যা খবর আছে রাত বারোটা একটা নাগাদ জিনিসগুলো আসবে।তখন ই হাতেনাতে ধরতে হবে,এখন প্রায় সাড়ে নয়টা।এখন শুধুই সঠিক সময়ের অপেক্ষা।
   যে কাল রাতে এত সেবা করলো,আজ সকাল থেকে একবার ও পাত্তা নেই তার।একটি বার ও দেখতে এলো না সাজুকে।এদিকে সেই দরকারি কথাটা তো বলাই হলো না।দাদাভাই ও এসে ফিরে গেল কিনা কে জানে।সকাল থেকে এতটাই দুর্বল ছিল যে উঠতেই পারেনি উপরন্তু আবার জ্বর ও এসেছিল।ডাক্তার দাদু এসেছিল,অনেক ওষুধ দিয়েছে।আর বলেছে তিনদিন এর পর ও জ্বর থাকলে রক্ত পরীক্ষা করতে হবে।কেনই যে এরকম বিচ্ছিরি শরীর খারাপ করলো কে জানে।আর ওষুধের জন্য হোক বা দুর্বলতার জন্যই হোক সাজু একেবারে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পরেছিলো।যখন ঘুম ভাঙল অনেক টা দেরি হয়ে গেছে।কিন্তু ওই বিটকেল টা ফোনে আজকের দিনের কথাই তো বলেছিল।সে যদি রুপাই কে না বলতে পারে তাহলে না জানি কি হবে।সাতপাঁচ ভেবে সাজু অতিকষ্টে উঠে বসলো।আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে,মোটামুটি একটু রেডি হয়ে বেরোবার প্রস্তুতি নিতে লাগলো।খুবই দুর্বল লাগছে,কিন্তু বেরোতে যে হবেই।দাদাভাইকে যে বাঁচাতে হবে।বেরোতে গিয়ে থমকে গেল সাজু,এমন বৃষ্টির মতো হওয়া দিচ্ছে কেন,এই সময় তো বৃষ্টি  হয়না।
  সাজু পুতুল পিসির বাড়ি গেল প্রথমে,গিয়ে শুনলো রুপাই নেই।কিজানি কোন জরুরি কাজে গেছে।আর ফিরতে অনেক নাকি রাত হবে,এমনটাই বলে গেছে পিসিকে।মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে সাজুর,তাড়াতাড়ি করে বেরিয়ে গড়ের দিকে হাঁটা দেয় সে।এদিকে পিসি যে পিছনে কত কি বলে গেল কিছুই শোনে না সে।হটাৎ করেই কেমন যেন ঝড়ো হাওয়া দিতে শুরু করলো,আর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ও চমকাতে লাগলো।সাজু কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কি করবে,গড়ের দিকে যাচ্ছিল ঠিক ই কিন্তু খুব ই দিশেহারা লাগছিলো তার।সেখানে গিয়ে কি দেখবে সে,দাদাভাই ঠিক আছে তো।আর রুপাই টার ও বেছে বেছে আজকের দিনটাতেই জরুরি কাজ পরতে হলো।খুব কান্না পাচ্ছে সাজুর,আর অভিমান ও হচ্ছে কেন জানিনা।একদিকে দাদাভাই কে নিয়ে দুশ্চিন্তা আর একদিকে রুপাই এর উপর তীব্র অভিমান তার ভিতর টাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।টলমল পায়ে বিহ্বল হয়ে সে গড়ের দিকে যাচ্ছে।মন বড় কু গাইছে,না জানি কোন বিপদ অপেক্ষা করে আছে সেখানে।
  ওই তো দাদাভাই,কিন্তু সাথে ওটা কে।হায় ভগবান এত সেই বিটকেল টা।কি হবে এবার,কিকরে বাঁচাবে সে দাদাভাইকে।নিজের কানে শুনেছে সাজু,বিটকেল কাকে একটা নিকেশ করবে বলছে,আর তার স্থির বিশ্বাস সেটা দাদাভাই ই।আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায় সাজু,ওই তো কি একটা  হাতে আছে দাদাভাইয়ের ।একটা বক্স মতো,কি আছে ওতে।আর বিটকেল ই বা কি বলছে ওকে।
  ওদিকে কাদের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে,তবে কি সময়ের আগেই জিনিসটা চলে এসেছে।কান খাড়া হয়ে গেল রূপের।হ্যা,ঠিক শুনছে সে কারা যেন চাপা গলায় কথাকাটাকাটি করছে।আস্তে আস্তে পা ফেলে ফেলে ঐদিকে এগোতে থাকে রূপ।ওয়াকিটকি তে বাকিদের ওই দিকে যেতে নির্দেশ ও দেয়।কি মনে করে রিভলভার টাও রেডি করে নেয়।খুব প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করা বারণ যদিও।কিন্তু এক্ষেত্রে মনে হয় লাগবে।উফ ঝড় ওঠার আর সময় পেলো না,কি যে হবে কেজানে। একি, সত্যি তো জিনিসটা এসে গেছে,কিন্তু ওরা কি নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করছে! এই মুহূর্তে ওদের হাতেনাতে ধরতে হবে,নাহলে একবার বৃষ্টি শুরু হলে খুব অসুবিধা হয় যাবে।শাপদের মতো এগোতে লাগলো রূপ।
  এদিকে সাজুও অন্য দিকে থেকে সঞ্জয়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো।হটাৎ গুলির শব্দে মোহনগড় অঞ্চল খান খান হয়ে উঠলো।সাজু পরিষ্কার দেখলো দাদাভাই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো,আর ওই বিটকেল বাক্সটা হাতে নিয়ে দৌড়াবার চেষ্টা করলো।সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে সাজু একটা মাঝারি মতো পাথর তুলে মারতে যাবে এমন সময় মাথা টা কেমন যেন ঘুরে গেল।পাথর টা হাত থেকে পড়ে গেলো।তাড়াতাড়ি দৌড়ে ওকে ধরতে যাবে ,এমন সময় জঙ্গলের মধ্যে দশ বারোটা টর্চ জ্বলে উঠলো।সাজুর মুখের উপর একটা আলো এসে পড়ল,রুপাই!!
সে এখানে কি করছে! বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই প্রচন্ড জোরে বৃষ্টি এলো।সাজু দিগ্বিগিক জ্ঞান হারিয়ে দাদাভাইয়ের কাছে এসে দেখলো তার গুলি লেগেছে।কান্নায় ভেঙে পরলো সাজু।এই সময় একটা বলিষ্ঠ হাত তাকে তুলে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল।সে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলো।
   সঞ্জয়ের তখনো প্রাণ ছিল,তাড়াতাড়ি তাকে হাসপাতালে পাঠাবার  ব্যাবস্থা করলো রূপ।বিপিন বেশিদূর যেতে পারেনি,রূপের লোকেদের হাতে ধরা পড়েছে।আর সেই বাক্সবন্দী সাদা গুঁড়ো বিষ মাটিতে মিশে গেছে কারণ মোহনগড়ে তখন একটা উড়োমেঘ এসে প্রবল বিক্রমে সমস্ত কোণায় কোণায় তার প্রতিপত্তি দেখতে শুরু করেছে।আর হ্যা,এই বৃষ্টিতে শুধু জড় বস্তুই নয় একাধারে সিক্ত হচ্ছিল দুটো পাগলপারা মনও……

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *