Briddhashrom – Bengali Story – Bengali Novel 2020

.

 (পর্ব ১)

আজ অফিস থেকে ফিরতে অনেকটা দেরি দীপকের, জানে এই নিয়ে স্ত্রী মায়া অনেক জেরা করবে। ক্লান্ত হলেও দীপকের মাথায় ঘুরছে অসমাপ্ত অফিসের কাজ। দরজার বেল বাজায়। মায়া দরজা খুলে বলে, “কি ব্যাপার এতো দেরি হল আজ?”
মায়ার হাতে ল্যাপটপের ব্যাগটা দিয়ে দীপক বলে, “আগামী কালের ক্লায়েন্ট প্রেজেন্টেশনের প্রস্তুতিতে সময় লেগে গেল।”
“প্রেজেন্টেশন না সংগীতা?” মায়া আড় চোখে দীপকের দিকে তাকায় । দীপক প্রতিক্রিয়াহীন, এই প্রশ্ন আগে অনেকবার শুনেছে।
মহিলা সহকর্মীদের নিয়ে স্ত্রীদের একটু বেশী দুশ্চিন্তা। বন্ধুদের কাছেও দীপক শুনেছে তাদেরও একই সমস্যা । একজন তো রসিকতা করে বলেছিলো ‘বুড়ো হয়েছিস সেদিন জানবি যেদিন তোর বৌ একদম সন্দেহ করা ছেড়ে দিয়েছে’। কথাটা হঠাৎ মনে পড়ে যেতে দীপক মনে মনে হাঁসে ‘তাহলে এখনো বুড়ো হয় নি! ‘
মায়াকে বলে, ” শোন, আমার এখনও অনেক কাজ বাকি আছে, একটু চা হলে খুব ভালো হয়। “
ততক্ষনে পিছন থেকে ওদের সাত বছরের মেয়ে মিমি দৌড়ে এসেছে, “বাপি আমি আজ অঙ্কতে সব গুড পেয়েছি “
দীপক বলে, “ভেরি গুড, কিন্তু মিমি তুমি এখনও ঘুমও নি? কাল স্কুল আছে না?”
দীপক ল্যাপটপ নিয়ে আপিসের কাজে বেডরুমের বিছানায় ব্যাস্ত, মায়া আসে চায়ের কাপ নিয়ে।
মায়া সুন্দরী, পাকা গমের মত গায়ের রঙ, একমাথা ঘন কালো কোঁচকানো চুল, টানা দুচোখের মাঝে উন্নত নাক, পুরু ঠোঁট। কলেজে প্রথম দেখেই মায়াকে পছন্দ হয় দীপকের ।
“ওঃ তুমি এখনো চেঞ্জই করো নি?”
“এইটুকু শেষ করেই করছি।”
“তোমার ইনক্রিমেন্টের সময় হয়ে এলো, এবারে কেমন বাড়বে আশা করছো?” মায়া জিজ্ঞেস করে l
“জানি না, কোম্পানির অনেক সেল বাড়িয়েছি, অনেক কিছু নির্ভর করছে এই প্রেজেন্টেশন ও ক্লায়েন্টদের রেসপন্সের ওপর,”
চায়ের কাপটা খাটের পাশের ছোট টেবিলে রেখে মায়া বসে দীপকের পাশে। দীপকের ঘাড়ে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মায়া বলে, “তোমার অপিসের কাজ যা বেড়েছে তোমার একটা হোম অফিসের খুব দরকার।”
“এই মুহুর্ত্তে আমার কোনই অসুবিধা হচ্ছে না, তাছাড়া হোম অফিস হবেই বা কোথায়? এ ফ্ল্যাটে তো দুটো মাত্র ঘর।”
“তখন ৩ বেডের ফ্ল্যাটটা নিলে না এখন বোঝো। মিমিও বড় হচ্ছে, ক’বছরের মধ্যে ওরও একটা ঘরের দরকার হবে সেটা ভাবো?” মায়ার সুরে অভিযোগ।
“সে সময় ৩ বেডের ফ্লাট নেবার মত অর্থের জোর ছিল না। এখন তো গাড়ি,বাড়ি, ফার্নিচার সব মিলিয়ে ই এম আই এর সাগরেই প্রায় ডুবে আছি আর ফ্ল্যাটের দাম গত ৫ বছরে যা বেড়েছে …. উপায় নেই। এখন এর মধ্যেই কষ্ট করে চালিয়ে নিতে হবে।”
“একটা ঘরকে তো উনিই আটকে রেখে দিয়েছেন। ২৪ ঘন্টা টিভি! বাব্বাঃ ৭০ তেও আমাদের থেকে বেশি সুস্থ । খুব শিগগির ঘর খালি হচ্ছে না।”
“বাবা বয়স্ক মানুষ আর কি করবেন? সকাল, সন্ধে হাঁটতে যান, মিমি কে স্কুল বাস থেকে রিসিভ করেন, মিমির স্কুলের হোমওয়ার্ক করিয়ে দেন।”
“তুমি কি কখনও এটা ভেবে দেখেছ আমার বাবা-মা কোনদিন এবাড়িতে একটা রাত থাকতে পারেন না। কারণ শোবার জায়গা নেই। ওসব জানি না নয় বড় ফ্লাট নাও, নাহলে বাবাকে কোনো হোমে পাঠাও!” বলে মায়া ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

(পর্ব ২)

ডিনারের পর দাঁত মাজার সময় দীপক আয়নায় তাকিয়ে দেখে আগের তার সেই মেদহীন পেটানো ৫’ ১০” যৌবনের চেহারাটা অনেক পালটে গেছে। রোজই নিজেকে দেখে কিন্তু আজ যেন নিজের বর্তমানের সঙ্গে তার নতুন করে পরিচয় হল। একসময় আড়চোখে অনেক মহিলাই তার সুঠাম কাঁধ, চওড়া ছাতি, ঢেউ খেলানো বাইসেপ, সরু কোমরের দিকে তাকাতো। এখন কপালের দুপাশের চুলে পাক ধরেছে, বাইসেপ কেমন নেতিয়ে গেছে আর স্যান্ডো গেঞ্জি ফুড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে মধ্যপ্রদেশ । যৌবনে জীবনের মুখ্য লক্ষ্য ছিল সুন্দরী জীবন সঙ্গী, ভালো চাকরী, সুখী পরিবার। তখন একবারের জন্য মনে হয় নি সঙ্গীর সঙ্গের নিত্য সমস্যা, সংসারের সাথে দায়িত্বের ভার, চাকরিতে পদোন্নতির সঙ্গে অপিসের অনুপ্রবেশ বেডরুমে, আর সময়ের সঙ্গে যৌবনের বেপরোয়া ভাবের বিদায় নিয়ে জীবনে সিদ্ধান্তগুলো কঠিন থেকে আরও কঠিনতর হতে থাকবে।
দীপকের যখন ১২ বছর বয়স মা আক্রান্ত হন দুরারোগ্য ক্যান্সারে। বাবা জলের মতো টাকা খরচ করেও মাকে বাঁচাতে পারেন নি। বাবা আর বিয়ে করেননি। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দীপককে ভালো করে মানুষ করা, শিক্ষিত করা। দীপক শিক্ষা লাভ অবশ্যই করেছে তবে সবসময় বাবার অনুপ্রেরণা আর অর্থের যোগান না থাকলে নাম করা প্রফেসরদের কাছে তালিম, ভালো রেজাল্ট শুধু নিজের মেধায় হয়তো হোতো না। শুরুতে চাকরিতো ‘ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়াবার মত’ সেইসময়ও বাবা পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছে, “চাকরির জগৎটা এমনই, অভিজ্ঞতা ছাড়া কেউ পাত্তা দেবে না, এখন তোমার পেশাদার জীবনের গুঁড়ি শক্ত করার সময়, ফল ঠিক সময়ে ফলবে।” হয়েছেও তাই সময়ের সাথে ধীরে ধীরে দীপক আজ এখানে পৌঁচেছে। আজ তার ওপরে চাপ বাবাকেই বাড়ি থেকে তাড়াবার।
বিয়ের আগে মায়ার কণ্ঠে যেন জাদু ছিল । দীপক মুখিয়ে থাকতো কখন তার সুমধুর কণ্ঠ বাজবে ওর কানে। বিয়ের পরে পরেই মনে হত ও যেন মায়ার GOD, ভগবান, আহা সময়টা যদি ওখানেই আটকে থাকতো। এখন মায়ার মুখ খোলা মানে স্কুলের দিদিমনি যেন ক্লাসের ছাত্রকে পড়াচ্ছে আর GOD এর অক্ষরগুলো কখন নিজেদের মধ্যে জায়গা বদল করে ফেলেছে সময়ের সাথে দীপক তা বুজতেই পারে নি। ইদানিং দীপক লক্ষ্য করেছে মায়া প্রায়ই ওর ওপর চাপ দিচ্ছে বাবাকে বৃদ্ধাবাসে পাঠাবার জন্য।
অভিযোক থেকে হুমকিও, “বিয়ের আগে তো বলতে আমার জন্য সব করতে পারো, এখন আমি পুরোনো হয়ে গেছি না? আমিও আমার রাস্তা ঠিক করে নেবো, দেখো! “
দীপক একমাত্র সন্তান। একটা ভাই বা বোনের অভাব এইসময় ও খুব অনুভব করে। বাবা-মায়ের তরফের এমন কোনো ঘনিষ্ট আন্তীয়ও নেই যাদের কাছে বাবাকে কিছুদিনের জন্য রাখা যায়।
শোবার আগে বারান্দায় একটা সিগারেটে টান দিতে দিতে সে ভাবতে থাকে, কেমন করে বলবে বাবাকে বৃদ্ধাবাসে থাকার কথা? মায়ার মাঝে মাঝে যা গলার ভলিউম হয়? কি পরিকল্পনা চলছে হয়তো বাবার তা অজানাও নয়। মায়াকেই বা কি বলে বিরত করবে? চিন্তার জট কিছুতেই যেন খুলতে চায় না। এক এক সময় মনে হয় সব ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে ।
সামনেই হোলি, ওর বারান্দার তলায় রাস্তায় ঢোল খঞ্জনী বাজিয়ে একদল বিহারী রিক্সাওলা হোলির গান গাইছে “ছারারারা….”
দিনানি দিনখাওয়া মানুষগুলো অন্ততঃ গলা ছেড়ে গান গাইতে পারে। ওরা কম শিক্ষিত, কঠোর পরিশ্রমের পরেও সহজে একটু সুখ খুঁজে নিতে পারে । শেষ কবে দীপক নিজের মনে গানের দু কলি আউড়েছিলো মনে করতে পারে না। সভ্য উচ্চ শিক্ষিত সমাজে প্রতিষ্টিতদের ঘরে যত সমস্যার লাইন!! আর্থিক, সমাজিক, পারিবারিক একটা সরতেই আরও পাঁচটা এসে হাজির হয় । সমস্যার জাল থেকে যেন কোনও মুক্তি নেই । অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে দীপক প্রাচুর্য্যের মধ্যে খুবই সুখী। কর্পোরেটে চাকরী, গাড়ী, বাড়ী, সুন্দরী শিক্ষিত বৌ, বাচ্চা, বাবা । কিন্তু সত্যি কি এই জীবনই দীপকের কামনা ছিল?

  (পর্ব  ৩)
কিছুদিন যাবৎ দীপক উভয় সঙ্কটে, ভালো ছেলে হবে? না ভালো স্বামী? প্রায়ই অন্যমনস্ক থাকে  অপিসের  কাজেও ঠিকমত মন দিতে পারছে না। অনেক অন্তর্দ্বন্দের পর ঠিক করল বাস্তববাদের মত  সিদ্ধান্ত নেবে। ম্যানেজমেন্টে শেখা SWOT অর্থাৎ শক্তি, দুর্বলতা, সুযোগ, বিপদ,  নিজের জীবনে এইগুলো বিবেচনা করে দেখবে।  কিন্তু যত বারই  বিশ্লেষণ করে প্রতিবার দেখে বৌয়ের পাল্লাই এইমুহূর্তে অনেক বেশী ভারী। 
অবশ্য বাবার বিশাল ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বা রাজারহাটে কাটা দশেক জমি থাকলে ব্যাপারটা হয়তো অন্যরকম হত । সেদিন নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে স্বার্থপর মনে হলেও পরমুহূর্তেই ওর বুদ্ধি যুক্তি দিল এই দুনিয়ায় স্বার্থ ছাড়া কে কি করে? বিবেক দেখিয়ে সমাজে বাহবা কুড়োনো যায় কিন্তু তা দিয়ে কি জীবনের বাস্তব প্রয়োজন গুলো মেটে?
অনেক সাত পাঁচ ভেবে বাবার বৃদ্ধাশ্রম যাত্রা মনস্থ করে ফেলে। সেদিন সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমের কথা বলতে গিয়ে কেমন যেন ওর কথার খেই হারিয়ে যাচ্ছিল। অনেকক্ষন লেগে গেলো শুরুটা করতে এবং অনেক কষ্টে, শেষমেষ কথাগুলো বাবাকে ও বলে। বাবা চুপ করে সব শুনে গেলেন, কোনো প্রতিবাদ বা ‘যাবো না’ বললেন না। শুধু বৃদ্ধাবাসের নামটা  জানতে চাইলেন।  সেই মুহূর্ত্তে দীপক অনুভব করল বাবার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে কথাবলার ক্ষমতাটুকু ওর লোপ পেয়েছে, কোনো রকমে বৃদ্ধাবাসের নামটা বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় । জানলার বাইরে রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বাবা ম্লান হেঁসে ফিসফিস করে নিজের মনে একটা বাংলা গানের এক লাইন আওড়ালেন, “আমারও কপালে সেই বৃদ্ধাশ্রম…”
এক শনিবার বাবাকে নিয়ে দীপক রওনা দিল বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশ্যে। মায়াকে বলে গেল বাবার যদি ভালো লাগে তাহলেই বৃদ্ধাশ্রমে ওনাকে রেখে রবিবার সে ফিরবে। দীপকের অস্বস্থি ওর চোখ মুখের ভাষায় মায়া বুঝলেও সেদিকে বিশেষ দৃষ্টিপাত না করে নিজের মন শক্ত করে শুধু  ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। সেই মুহুর্ত্তে মায়ার নিজের বিবেকের কাছে খানিকটা অভদ্র লাগলেও জেতার আনন্দটা অনেক বেশী।
যাবার সময় ছোট্ট মিমি ছুটে এসে দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলে, “দাদাই তুমি চলে যাচ্ছ? আর কোনোদিন আসবে না?”
দাদু মিমির মাথায়  বুলিয়ে বলে, “দিদিভাই এখন থেকে তুমি আসবে আমাকে দেখতে,”
“তুমি দুষ্টুমি করেছো? তাই তোমাকে বোর্ডিংয়ে পাঠানো হচ্ছে,বুঝি?”
দাদু হেঁসে বলেন, “তুমি কিন্তু লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থেকো, সকলের কথা শুনো কেমন!”
“কিন্তু দাদাই আমাকে পড়াবে কে? গল্পই বা শোনাবে কে?”
“এখন থেকে তোমাকে দুজন গল্প শোনাবে, মা আর বাবা,” দাদুর গলা ভারী হয়ে আসে, “এখন আসি দিদিভাই,” কোনরকমে বলেই পকেট থেকে রুমাল বের করতে করতে উনি দরজার দিকে পা বাড়ান।
মিমি ফেলফেল করে চেয়ে থাকে দাদুর দিকে। 
সেদিন বাবা হীন ঘরটাতে বেশ ক’বার গেছে মায়া। অনেকদিনের জমা আবর্জনা পরিষ্কারের পর যেমন জায়গাটা খালি লাগে, তেমনই ঘরটা খালি লাগে মায়ার। নিজের মনে একটা নকশা আঁকে কোথায় মিমির খাট, পড়ার টেবিল রাখবে। কিন্তু মায়ার এই স্বপ্ন ক্ষণস্থায়ী প্রমান হল যখন রবিবার বিকেলে দীপক ফিরলো বাবাকে সঙ্গে নিয়ে । মায়া শশুরকে ফিরে  আসতে দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে গেলেও দীপকের শুকনো মুখ দেখে অনুমান করলোন ওখানে গিয়ে নিশ্চয় শশুরমোসাই বেঁকে বসেছেন, থাকবেন না, অগত্যা দীপক কি আর করবে? এই যদি মনে আগে থেকেই ছিল, তাহলে যাবার আগে এত নাটকের কি দরকার ছিল?
দীপকের মুখ শুকনো দেখে মায়া অনুমান করে নিশ্চয় তাকে দেওয়া কথা সে রাখতে পারে  নি, তাই।
এটাও ভাবে তাহলে কি দীপকের ওপর তার নিয়ন্ত্রনের মুঠি আজকাল আলগা হয়ে যাচ্ছে? 
বাড়ি ফেরার পর থেকে  সারা সন্ধে দীপক কোন কথা বললো না, এমনকি মিমির সঙ্গেও। কেমন যেন হঠাৎ ওর ফিউজ ওড়ে গেছে। বিষন্ন, অনুতাপ, অবসাদ মেশানো ওর মুখে । জানার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব হলেও রাতের জন্য অপেক্ষা করে রইলো মায়া ।
  সকলে শুয়ে পড়লে রাতে মায়া দীপককে বলে, “আগেই জানতাম এসবই  নাটক, এতো সহজে কি উনি ঘর ছাড়বেন? লোক দেখানোর জন্য ওখানে গিয়ে তারপর নিশ্চয়  মত পালটে ফেলেছেন?”
“থাম! না জেনে মন্তব্য কোরো না, প্লিজ! যা ভাবছ বরং তার উল্টো! ওনার ওখানে থাকতে কোনই আপত্তিই ছিল না।”
আচমকা দীপকের এমন চাঁচা ছোলা উত্তরে মায়া খানিকটা হোঁচোট খেলেও মুহুর্ত্তে নিজেকে সামলে অধৈর্যের সুরে প্রশ্ন করে, “তাহলে? ফিরে এলেন যে?”
“আমিই বাবাকে ওখানে না রেখে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।”
দীপকের উত্তরে মায়া হঠাৎ বাজ পড়ার মত চমকে ওঠে, “তুমি?” 
কিছুক্ষন দুজনেই চুপ করে থাকে, মায়া নিজের মনে ভাবে, পথে সুযোগ পেয়ে বাবা নিশ্চই দীপকের  মগজটা ভালো মত ধোলাই করেছে। ফেরার পর থেকেই দীপক তার সঙ্গে কেমন যেন ব্যাঁকা সুরে কথা বলছে, যা একেবারে ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। মায়াও এতো সহজে হারার পাত্রী নয়। পরিস্থিতির সঙ্গে মানাতে নিজের সুর অনেক নরম করে বলে, “একটু খুলে বলবে কি হয়েছে? ফেরার পর থেকে  তোমারই বা এত গোমড়া মুখ কেন?”
দীপকের গলায় যেন বিস্ময়, শোক, হতাশা, সব মিশে গেছে,  “এসময় আমার কি মনে হচ্ছে জানো? আমি কেন গঙ্গায় ঝাঁপ দেবার সাহস জোগাতে পারলাম না,” বলেই হাউ হাউ করে দীপক কেঁদে ওঠে। 
অবাক মায়া, দীপককে কখনও এমন কাঁদতে দেখে নি, “কি হেঁয়ালি বকছো? গঙ্গায় ঝাঁপ দেবে? কিছুই বুঝতে পারছি না?”
দীপকের পিঠে কিছুক্ষন আলতো হাত বুলোয় মায়া, দীপক নিজেকে খানিকটা সামলে নিলে  বলে, “কি হয়েছে? আমাকে সব খুলে বলো, প্লিজ!”
 (পর্ব ৪)
দীপক কিছুক্ষন চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে, “বলতে পারি যদি তুমি মন্তব্য না করে মন দিয়ে সব শোন।”
দীপকের এমন শান্ত দৃঢ় স্বর মায়ার কাছে অস্বস্থিকর লাগলেও তাকে জানতে হবে তার অনুপস্থিতে এমন কি হয়েছে?
“কথা দিচ্ছি আমি চুপ করেই সব শুনবো,” মুখে বললেও মনে একটা ধাক্কা খেল মায়া। ওর মতামত ছাড়া যে দীপক কিছুই প্রায় করে না, তারই কথার সুরে দুদিনে হঠাৎ আমূল পরিবর্তন, একটা চাপা অবজ্ঞার ভাব ।
দীপক বলে, “সেদিন আমি খানিকটা গিয়ে রাস্তা গোলমাল করে ফেলেছিলাম বাবাই আমাকে সঠিক রাস্তাটা বলে দিলেন। আমি অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলাম উনি আগে কখনও ওখানে গেছেন কিনা? বাবা না শোনার ভান করে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। ভাবলাম অভিমান করে আছেন তাই আর ঘাঁটালাম না । ওখানে পৌঁছে দেখলাম বৃদ্ধাবাসটা বেশ কয়েক বিঘে জমির ওপর একেবারে সবুজে মোড়া। বড়-ছোট নানা গাছ ও ফুলের বাগানে সুন্দর সাজানো এক্কেবারে যেন নন্দন কানন, আমার কল্পনার বৃদ্ধাবাসের সঙ্গে কোনোই মিল নেই । বড় লোহার গেট আর দারোয়ান পেরিয়ে ঢুকতেই অপিস, সামনেই দেখা যাচ্ছে একটা মাঝারি আকারের পার্ক, বসন্তের সকালে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার দল সেখানে গল্পে মত্ত, হাল্কা নীল পোশাকে পুরুষ-মহিলা কর্মীবৃন্দ কাজে ব্যাস্ত। পার্কের ওদিকটায় মন্দির, পিছনের দিকে বেশ কয়েকটা দোতলা বাড়ি নিশ্চই বৃদ্ধদের ওখানেই থাকার ব্যবস্থা। ওটা যে বৃদ্ধাবাস না জানা থাকলে মনে হত কোনো রিসোর্টে এসে পড়েছি।”
“শুনে তো মনে হচ্ছে বেশ মোটা মাসিক দক্ষিণা, বাবার পেনশনের টাকায় কুলোবে? তাই কি তুমি ফিরে এলে?” মায়া জিজ্ঞেস করে।
দীপক চুপ করে গিয়ে মায়ার দিকে স্থির ভাবে তাকায়, ভাবখানা, শুনবে না বলবে, সেটা আগে ঠিক কর।
দীপকের তাকানোর ভাষা মায়া চকিতে বুঝে বলে, “দীপক রেগো না, এটা মন্তব্য নয়, প্রশ্ন!”
“ওটাও তোমার প্রশ্নের মধ্যেই রয়েছে। না ওদের চার্জ জানার কোনও সুযোগই হয় নি।”
মায়া অবাক “তার মানে? দুদিন ধরে কি করলে?” ভাবটা যেন তোমাকে এখনও মানুষ করতে পারলাম না।
“ওদের নিয়ম হল, যিনি থাকবেন তিনি দু তিন দিন থেকে ঠিক করবেন থাকার ইচ্ছে আছে কি না। তাঁর শারীরিক সমস্যা, কতগুলো ওষুধ খান, খাদ্যতালিকার বিধিনিষেধ, সব বুঝে চার্জ ঠিক করে ওরা।”
“ওরে বাব্বাঃ! এসব তুমি আগে জানতে না?”
“ফোনে শুধু বলেছিল যিনি থাকবেন তাকে নিয়ে আসুন দুদিনের থেকে সব দেখে তিনিই ঠিক করবেন থাকবার ইচ্ছে আছে কি না? যাবার এক সপ্তাহ আগে দুজনের দুদিনের গেষ্ট চার্জও ওদের একউন্টে জমা করে দিয়েছিলাম।”
“তুমি কি একটু সস্তার কিছু খুঁজে পেলে না? যেখানে এতো পাঁচ তারা ব্যাপার স্যাপার নেই। মানে যেটা আমাদের আয়ত্বের মধ্যে ।”
“মায়া উনি আমার বাবা, আমি ওনার একমাত্র সন্তান, উনি আমাকে কোনদিনও অবহেলা করেন নি, বরং আমিই স্বার্থপরের মত …”
দীপককে মাঝপথে থামিয়ে মায়া বলে, “আচ্ছা-আচ্ছা, ওনার পেনশন আর তোমার টাকা যা খুশি কর । শুধু মনে রেখো তোমার বৌ মেয়ে আছে, তাদের দায়িত্ব তোমারই ।”
মায়ার অভিযোগের কোনও উত্তর না দিয়ে দীপক চুপ করে যায়। ঘরের মধ্যে একটা অসহ্য নিস্তবতা। শুধু সিলিং ফ্যানটার বনবন করে ঘোরার শব্দ। কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর মায়া বলে, “দুজনেই ফিরে এলে কেন, সেটা কি বলবে ?” সুরটা এমন যেন শোনার তেমন খুব আগ্রহ নেই।
একটু থেমে দীপক বলে, “বৃদ্ধাশ্রমের মাঝবয়সী ম্যানেজার আমাদের দেখেই উঠে দাঁড়িয় বলে ‘নমস্কার গাঙ্গুলী স্যার’ অবাক হলাম, আমাকে চিনলো কেমন করে? মুহূর্তে ভুল ভাঙলো ওনি বাবাকে চেনেন। খাতায় সই করিয়েই আমাদের নিয়ে গেল ডাইনিং রুমে l হাল্কা সুস্বাদু পাঁচ পদ দিয়ে দুপুরের খাওয়া সারার পর আমাদের স্থান হলো সুসজ্জিত একটা গেস্টরুমে। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না, বিকেলে উঠে দেখি ঘরে বাবা নেই। গেষ্টরুমের বাইরে এলাম, বসন্তের বিকেলে সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া। বেশ লাগছিলো বৃদ্ধাশ্রমটা ঘুরে দেখতে। মনে একটা স্বস্তি বাবা নিজের বয়সী আর পাঁচ জনের মধ্যে ভালোই থাকবেন এখানে, হেঁটে পার্কে পৌঁছে একটা বেঞ্চে বসলাম।”
“তুমি নিশ্চয় দীপক?” অচেনা মানুষটির হঠাৎ উপস্থিতি ও প্রশ্নে অবাক হলেও বললাম,”হ্যাঁ, কিন্তু আপনি?”
পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি, ছিপছিপে একহারা চেহারা, একমাথা চুল সবই প্রায় সাদা, কালো ফ্রেমের চশমার পিছনে উজ্জ্বল দুটি চোখ। হেঁসে বললেন, “ছোটবেলায় দেখেছো, এখন হয়তো আর মনে নেই, আমি ডাঃ বক্সী,”
দীপক বেশ ভালো করে ওনাকে দেখে কিছুতেই চিনতে পারে না, “বাবার দু একজন বন্ধুদের চিনি কিন্তু আপনাকে কখনও তো দেখিনি।”
ডঃ বক্সী বলেন, “বহু বছর প্রবাসী, রিটারমেন্টের পরতো বছরে ছমাস মেয়ের কাছে চলে যাই ইংল্যান্ডে। গাঙ্গুলীদার কাছে শুনলাম তুমি এসেছো তাই আলাপ করতে ছুটে এলাম।”
“আচ্ছা, আপনি বাবাকে চিনলেন কেমন করে? মানে, বাবা তো ডাক্তার নন আর আপনিও এখানে প্রাকটিস করতেন না।”
“সে অনেক বড় গল্প, ছোট করে বলি আমরা একই পাড়া, একই ক্লাব, একই স্কুলে পড়েছি। গাঙ্গুলীদা ছিলেন আমাদের সিনিয়ার । গাঙ্গুলীদা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আমি ডাক্তার। এই জায়গাটা রায়চৌধুরীদের জমিদারির একাংশ, ল্যান্ডসিলিং আইনের থেকে বাঁচতে ওরা এই জমিটা একটা ট্রাস্টকে দান করে। জমিদার বাড়ির বড়ছেলে গাঙ্গুলীদার বন্ধু, তার অনুরোধে এই বৃদ্ধাশ্রমের নকশা গাঙ্গুলীদাই করেন। যেহেতু বিলেতে কিছু বছর থেকেছি ডাক্তারি পড়ার সময় তাই পশ্চিমের স্বাস্থ্যবিধির নানা খুঁটিনাটি বিষয়ক পরামর্শের জন্য আমারও ডাক পড়ল l আমারা হয়ে গেলাম এই মডার্ন বৃদ্ধাশ্রমের উপদেশক মন্ডলির সদস্য। প্রায় প্রতিসপ্তাহে আমরা আসতাম এখানকার কাজ দেখতে, ধীরে ধীরে রূপ নিতে লাগলো বৃদ্ধাশ্রম, মনে প্রাণে কখন একাত্ম হয়ে গেলাম এর সাথে। মনে মনে একটা লক্ষ্য অবশ্যই ছিল, বুড়ো বয়সে যেন কারোর বোঝা হতে না হয়, অন্তত একটা মাথা গোঁজার আস্তানা ..”
অবাক হয়ে দীপক বলে, “আপনার নাম হয়তো কখনও বাবার মুখে শুনেছি, কিন্তু এই বৃদ্ধাশ্রমের কথা কখনও কোনোদিন শুনি নি বাবার মুখে,” মনে মনে দীপক ভাবে বাবা এখানকার নাম শুনে তাই আর কোনও আপত্তি করেন নি। রাস্তাটাও এত ভালো চেনেন।
মিচকি হেঁসে ডাঃ বক্সী বলেন, “গাঙ্গুলীদা কর্মে বিশ্বাসী ছিলেন চিরকালই, কম কথা বলেন, অত্যন্ত স্বাভিমানীও, হয়তো তুমি কখনও জানতেই চাও নি, উনিও তাই আর কিছু বলেন নি ।”
 (পর্ব ৫)
ডঃ বক্সীর কথায়, নিজের জীবনে একটু উঁকি দিয়েই দীপক দেখতে পায়, মায়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পর থেকে ওর সকল সত্তা জুড়ে ছিল শুধু মায়া। হানিমুনের পর প্রথম দিন অপিস গিয়ে প্রতি মিনিটে মায়াকে চোখে হারিয়েছে । প্রতি মিনিটে মায়ার কণ্ঠ শোনার প্রবল ইচ্ছে ওকে বাধ্য করেছে মায়াকে বারবার ফোন করতে । পুরোনো দিনের ছেলেমানুষির কথা ভাবলে এখন ওর নিজেরই হাঁসি পায় । সময়ের সাথে ফোনে কথা কমতে কমতে এখন অতি প্রয়োজনের যোগাযোগ যন্ত্রে গিয়ে ঠেকেছে । সেই আবেগ এখন কোথায়? তবুও ওর বর্তমান জগৎ বলতে শুধু মায়া, মিমি আর অপিস। সেখানে বাবাকে কোথাও খুঁজেই পাওয়া যায় না। কলেজের দিনগুলো থেকে বিনা প্রয়োজনে বাবার সঙ্গে কদণ্ড সময় কাটিয়েছে নিজেই মনে করতেই পারে না। প্রসঙ্গ ঘোরাতে তাই বলে, “আপনি কি এখন এখানেই থাকেন?”
“এখানে প্রতি বছর মাসখানেক থাকি, মূলত বন্ধু-বান্দব, আন্তীয়, ওই বলতে পার কলকাতার শিকরের টানে।”
“বাকি সময়টা?” দীপক জানতে চায়।
“বছরে ছমাস থাকি মেয়ের কাছে ইংল্যান্ডে, মেয়ে ডাক্তার ওখানেই সেটলড। বাকি সময়টা পন্ডিচেরিতে, আমাদের সবথেকে শান্তির জায়গায়। এই তো আমাদের সারা বছরের রুটিন।”
“আমাদের মানে?”
ডঃ বক্সী হেঁসে বলেন, “ওহঃ, আমি ও আমার স্ত্রী কমলা। সঙ্গে দেখছো না কারণ সে এখন মন্দিরে সন্ধ্যা পুজোর জোগাড়ে ব্যাস্ত। কমলাও তোমাকে দেখতে চায়, সন্ধ্যারতির সময় মন্দিরে তোমাদের দেখা হবে l”
দীপক বলে, “নিশ্চই, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? কলকাতার লোক দেশ বিদেশ ঘুরে নিজেদের নীড় কলকাতাতেই ফিরে আসেন, অথচ আপনি কলকাতা ছেড়েই দিলেন। ছমাস বিদেশে থাকেন তবুও দেশে ফিরে পন্ডিচেরিতে বেশি সময়টা থাকেন। অপছন্দ কাকে? বাংলা না বাঙ্গালী?”
দীপকের কথা শুনতে শুনতে ক্রমশঃ ডঃ বক্সীর মুখ গম্ভীর হয়ে যায় । অস্ত যাওয়া সূর্য পশ্চিমের আকাশকে শেষ বারের মতো রাঙিয়ে দিয়েছে সে দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকেন চুপ করে, হয়তো মনে মনে ভেবে নেন কোথা থেকে শুরু করবেন। খুব আবেগের সুরে বলেন, “তোমার শেষ প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি, বাংলার সঙ্গে বন্ধন এতই নিবিড় ও গাঢ় অজান্তেই হৃদয় সবসময় এখানে পৌঁছে যায়। বাংলায় কথা বলতে, পড়তে, মন সর্বদা আকুল থাকে বিদেশেও। ওখানে একজন বাঙালিকে দেখলে মন নেচে ওঠে, কথা বলতে ইচ্ছে করে নির্ভেজাল মাতৃভাষায়। কতবার যেচেই আলাপ করেছি নিজের দেশের লোকের সঙ্গে, অকারণে । শুনে অবাক লাগছে?”
দীপক বলে, “কিছুটা,”
একটু থেমে ডঃ বক্সী আবার বলেন, “পাইকপাড়ায় থাকতে ৭০ এর দশকে কলকাতার ভয়াবহ রূপটা চাক্ষুষ দেখেছি, সবাই ভেবেছিলাম ৮০ দশক অনেক প্রতিশ্রুতিবান হবে, হল কী? শহরের কেন্দ্র থেকে বাঙালির যাত্রা শুরু হল মফস্বলে আর শিল্পপতিরা শহরের অধিকার নিয়ে নিলো। শিক্ষিত বাঙালি হলো তাদের দাস। সকলের তো সরকারি চাকরী জোটে না। দুর্নীতি দমনের বদলে তাকে উৎসাহ দেওয়াটা এমন পর্যায়ে পৌঁছলো যে সরকারি অপিসে কিছু গুঁজে না দিলে কাজ হয় না l সরকারি ডাক্তারকে হাসপাতালে কম তার প্রাইভেট চেম্বারে বেশি পাওয়া যায়। ৪-৫টা প্রাইভেট শিক্ষক না হলে ভাল নম্বর আসে না। ক্রমবর্ধমান অবনতি শিক্ষা, স্বাস্থ্যে, প্রশাসনে, কারোর কোন গ্রাহ্যই নেই । আগেকার রাজার জায়গা নিয়েছে নেতা।”
“আমাদের কদিন বাইরে গেলেই মনে হয় কবে নিজের বাড়িতে ফিরব, কলকাতা ছাড়তে আপনার একটুও কষ্ট হলো না?”
দীপকের প্রশ্নে ডঃ বক্সী হেঁসে বললেন, “সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অভ্যাসের বাঁধুনি থেকে বের হওয়া অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু আমাদের চোখ দুটো সামনে দেখার জন্য। পিছনে তাকিয়ে বসে না থেকে ভবিষ্যতের কথা ভেবে চলে গেলাম মুম্বাই। নতুন জায়গার ভীতি ছিল, কিন্তু কি জানো মানুষ তরল পদার্থের মত যে পাত্রে রাখবে তারই আকৃতি সে আপনি নেবে। বাইরে গিয়ে বুঝলাম কত সযোগের থেকে বঞ্চিত আমরা। আমরা বাঙালীরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, শিক্ষিত অথচ একটু আলোর সারি জ্বালিয়ে, মেলায় ঘুরিয়ে, গান শুনিয়ে, খেলা দেখিয়ে কত সহজে আমাদের আসল সমস্যাগুলোর থেকে ভুলিয়ে রাখা যায় সেটাকি কখনো ভেবে দেখেছো? আচ্ছা দীপক, গাঙ্গুলীদা বলছিলেন ওনার বাড়িতে আজকাল খুব একা লাগে তাই বৃদ্ধাবাসে থেকে এখানকার কাজে সাহায্য করতে চান ?”
হঠাৎ এই প্রশ্নের জন্য দীপক তৈরী ছিল না, এতো সরাসরি প্রশ্নটা, কোনরকমে বলে, “হুঁ”
দীপক ভালই বোঝে যাতে তাকে বা মায়াকে সকলের সামনে ক্ষুদ্রমনা স্বার্থপর না দেখায় তাই বাবার জগতের কাছে এই সত্য গোপন।
এতক্ষন ধৈর্য ধরে মায়া সব শুনছিলো এবার সে অস্থির হয়ে বলে, “তুমি তখন থেকে ডঃ বক্সীর গল্প শুনিয়ে যাচ্চো, বাবাকে নিয়ে ফিরে এলে কেন সেটা তো বললে না এখনও? ওই ডাক্তারের গল্প পরে শুনবো।”
দীপকের গলায় তার বিরক্তি স্পষ্ট, “আমার মনে হচ্ছে পুরোটা সোনার তোমার কোন আগ্রহই নেই। সবটা শোনার যখন ইচ্ছে হবে তখন শুনো।”
প্রশ্ন করে মায়া মনে মনে আক্ষেপ করে, “না না আমি ভাবলাম তুমি হয়তো অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছ, আমি শুনছি তুমি থেমো না প্লিজ,”
“বাবা থাকতে চেয়েছিলেন, আমিই তাকে রেখে আসতে পারি নি,” মায়াকে অবাক করে দীপকের উত্তর। মায়া লক্ষ্য করে দীপক চশমা খুলে চোখ মুছছে । সে ভাবে খুব ভুল করেছে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজে দীপককে একা ছেড়ে। দুটো বুড়ো মিলে ওর মগজটা আবেগে এক্কেবারে ডুবিয়ে দিয়েছে। বলতে যাচ্ছিল ‘এমন ভাঙ্গা মেরুদন্ড নিয়ে অপিসের দ্বায়িত্তশীল কাজ কর কেমন করে?’ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নেয়।
 (পর্ব ৬)
একটা দীর্ঘ নিঃস্বাস নিয়ে মায়া বলে, “তারপর কি হল বল?”
“জান মায়া ডঃবক্সী আমার জীবনের এমন কিছু ঘটনা ফিরিয়ে আমাকেই দেখালেন যার সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণাই ছিল না,”
ডঃ বক্সী বলেন, “দীপক, তোমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোমাকে জোর করে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হল কেন জানো?”
ডঃ বক্সীর প্রশ্নের উত্তর দীপকের জানা ছিল না, আমতা আমতা করে বলে, “কি জানি কলকাতার স্কুলগুলোর মান খারাপের দিকে যাচ্ছিল, তাই হয়তো,”
“মোটেও তা নয়। বৌদি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলেন, কলকাতার ডাক্তারা পরামর্শ দিল মুম্বাইয়ে টাটা হাসপাতালে গিয়ে কিমো নিতে। তাতে চার থেকে ছয় মাস বা তার বেশীও সময় লেগে যেতে পারে। এক পেশেন্টদের লম্বা লাইন, তাছাড়া প্রতিবার একটা কিমোর পর আরেকটা কিমোর আগে রুগীর শরীরে এরিথ্রোসাইট, লিউকোসাইট, প্লেটলেটের প্রবলভাবে হ্রাসের প্রবণতা থাকে। এইসব ছাড়াও লিভার, কিডনী…. বলতে পার রুগীর সেদিনের শারীরিক অবস্থা বিচার না করে কিমো দেওয়া হয় না। এই কারণে অনেক সময় তা পিছিয়েও যায়। তোমাকে সঙ্গে নিলে তোমার পড়ার ক্ষতি ও ওই কম বয়সে তোমার শুধুই উৎকণ্ঠা হত । তোমাকে রেখেই বা যাবে কার কাছে? অগত্য গাঙ্গুলীদা ও বৌদি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঠিক করেন তোমাকে বোর্ডিংয়ে পাঠাবেন ।”
দীপকের ছোটবেলায় মনে মনে ভীষণ অভিযোগ ছিল ‘বাবা আমাকে ভালোবাসে না, তাই বোর্ডিংয়ে পাঠিয়েছে,’ বাবার সঙ্গে তার দূরত্বের সূত্রপাত এই থেকেই ।
ডঃ বক্সীর কথায় দীর্ঘ বছরের পর আজ দীপক বোঝে একরকম জোর করেই তাকে বোর্ডিংএ পাঠানোর কারণ।
“মায়ের অসুখের কথা কিছুই জানতাম না শুধু জানতাম বাবা মাকে কোথায় বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলো। কোথায় কত দিনের জন্য, কেন? তার কিছুই জানতাম না, মনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম আমাকে ওরা না নিয়ে একাই বেড়াতে গেল।“
“ক্যান্সার নিয়ে মানুষের জ্ঞান কম, এমনিতেই কঠিন রোগ শুনলে মানুষ মানুষকে এড়িয়ে চলে, ভাবে ছোঁয়াচে, শুরু হয় বিভেদ, খুঁত খোঁজা তাই বৌদির রোগকে গোপন রাখা সকলের কাছে । বিশেষ করে আন্তীয় প্রতিবেশীদের কাছে। আমার মুম্বাইয়ের বাড়িতে তিন মাস থেকে চিকিৎসার পর বৌদি বেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে ফিরলেন কলকাতায় । সে বছর শীতের ছুটিতে কোথায় যেন তোমরা বেড়াতেও গেলে না?”
ডাক্তার বক্সীর কথা শেষ হবার আগে দীপক বলে, “পুরী! আমার মনে আছে ওই দু সপ্তাহ একসঙ্গে আমরা খুব আনন্দ করেছিলাম। পরের বছর মা তো চলেই গেলেন আমাকে ছেড়ে … “
“তুমি বৌদিকে খুব মিস কর না?”
“ভীষণ! কতটা বলে বোঝাতে পারবো না,”
“অনেক পুরনো কথা, আজ ভাবলে মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। বৃদ্ধাশ্রমটা তখন সবে শুরু হয়েছে, ৫-৬ জন বয়স্ক লোক থাকতেও এসেছেন। মন্দিরে পাথর লাগানোর কাজ চলছে জোরকদমে, দারোয়ান বা পাঁচিল তখন ছিলই না। একসকালে আবিষ্কার হল একটা দু-তিন দিনের কচি বাচ্চা ছেলেকে কে রেখে গেছে মন্দিরের সিঁড়িতে। আশ্রমে হুলুস্থুল পরে গেল। বাচ্চাটিকে দেখে তো মনে হয় না আশেপাশের গ্রামের কারুর। কেউ বলে পুলিশে খবর দাও কেউ যুক্তি দিল অনাথাশ্রমে পাঠাও। সেদিন গাঙ্গুলিদা সাত সকালে কোনো কাজে এসেছিলেন বৃদ্ধাবাসে, তিনি সব দেখে শুনে স্বেচ্ছায় বাচ্চাটিকে নিয়ে যেতে চাইলেন। তখনকার এতো নিয়মের মারপ্যাচ ছিল না, আশপাশের গ্রামে কারুর বাচ্চা হারিয়েছে নাকি খোঁজ খবর নিয়ে গাঙ্গুলীদকে ওই বাচ্চাটা দেওয়া হল।”
ডঃ বক্সীর কথা শুনতে শুনতে দীপকের চোয়াল শক্ত হতে থাকে। মনের মধ্যে ওর নানা চিন্তা ঘোরপাক খেতে থাকে, ‘বুঝতে ওর কোনোই অসুবিধা হয় না মায়ের মৃত্যুর পরে ও বোর্ডিংয়ে, খালি বাড়িতে, তখন বাবাও বেশ জোয়ান, চাকরিটাও মন্দ করতেন না । নিশ্চয় এমনি কোনও গোপন অভিসারেই উৎপন্ন ওই বাচ্চাটা । উনি সেদিনই ভোরে বৃদ্ধাবাস পৌঁছলেন কেন? কোনো চিন্তা না করেই বাচ্ছাটাকেও অতি সহজেই নিয়ে নিলেন। উনিই সাতসকালে সবার অলক্ষে বাচ্চাটিকে রেখেছিলেন কিনা কে জানে? বরং এত গোপন না করে একটা সৎ মাকেই ঘরে আনতে পারতেন। বাবার এই সদ্য জানা কুৎসার পরিচয় কেমন করে দেবে সে মায়াকে? এখন বুজতে কোনই অসুবিধে হয় না ফ্ল্যাটটা কেনার সময় আর মাত্র ১ লাখ দিলেই ৩ বেডরুমের ফ্ল্যাটটা অনায়াসে হয়ে যেত। দুটো পরিবার সামলে বাবার আর হাতে টাকা থাকবে কি করে? বাবার কাছে সেসময় টাকার সাহায্য চাওয়াটাই ভুল হয়েছিল। ভিতরে যে এতো তখনতো জানাই ছিল না। দীপক সাদা মনে ভেবেছিলো বাবার প্রভিডেন্ট ফান্ডের থেকে যদি কিছু টাকা দেন। এখনতো তাহলে পেনসনের বেশীভাগ টাকাটা যায় ওখানে? সৎ ভাইটি থাকে কোথায়? সে করে কি? সৎ মাও আছে নাকি? ওঃ এখানে না এলে আর ডঃ বক্সী সঙ্গে আলাপ না হলে তো কিছুই জানা হত না, সেই তিমিরেই থেকে যেত। মনে সবসময় একটা দ্বিধা ছিল, বাবাকে বৃদ্ধাবাসে রেখে যাব? এখন সিদ্ধান্ত নিতে কোনোই অসুবিধে নেই, থাকুক পড়ে চরিত্রহীন বুড়ো এখানে,’
সূর্যের আলো প্রায় নিভু নিভু, পাখিরা কিচির মিচির কোলাহল তুলে নিজেদের বাসায় ফিরছে। মন্দিরের ঘন্টা ঢং ঢং করে বেজে ওঠে।
ডঃ বক্সী বলেন, “চল মন্দিরে যাওয়া যাক সন্ধ্যা আরতি শুরু হচ্ছে।”
দীপকের সন্ধ্যা আরতিতে এই সময় কোন রুচি নেই। তাকে যেকোন ভাবে সবটা জানতেই হবে। পারলে এখনই গিয়ে ওই ভাইকে এনে বাবার সামনে দাঁড় করিয়ে বাবার ভাল সেজে থাকা মুখোশ টেনে খুলে দেবে।
“মন্দিরে পাওয়া সেই ছেলেটি এখন কোথায় জানেন?” মন্দিরের দিকে হাঁটার পথে দীপক জানতে চায়।
“গাঙ্গুলীদকে অনেকবার বলেছিলাম তোমার কাছে আর গোপন না করে সব খুলে বলে দিতে। প্রতিবারেই উনি বলব বলে আর বলেন নি।”
ততক্ষনে ওরা মন্দিরের দরজায় পৌঁছে গেছে l ঢাক, কাঁসরের আওয়াজে কেউ কারোর কথা আর শুনতে পায় না। গভীর উৎকন্ঠায় দীপক অপেক্ষা করে থাকে সন্ধ্যা আরতি সমাপ্ত হওয়ার ।
 (পর্ব  ৭)
দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মায়া বলে, “বুঝতে পারতাম না হঠাৎ সকালে বেড়িয়ে সারাদিন কাটিয়ে বিকেলে ফেরেন, কোথায় যান? এখন বুঝতে পারছি। আচ্ছা তোমার সেই ভাইয়ের সন্ধান পেলে?”
শোবার ঘরের অস্পষ্ট নাইট ল্যাম্পের নীল আলোতে ধূমপানরত খাটে  আধশোয়া দীপকের প্রতিক্রিয়া বুজতে পারে না।
মায়ার কথায় কোনও গুরুত্ত্ব  না দিয়ে দীপক বলে, “মন্দিরের ভেতরটা ঝকঝকে পরিষ্কার, সুগন্ধি ধূপের গন্ধে মোমো করছে। বিগ্রহের সামনে পূজারী ঘন্টা বাজিয়ে পঞ্চ প্রদীপ নাচিয়ে পুজার্চনায় ব্যস্ত। স্বেত পাথরের মেঝেতে পাতা পরিষ্কার শতরঞ্জির ওপর বসা ৩০-৩৫ জন ভক্ত । সেখানে কিছু নীল বস্ত্রে কর্মীবৃন্দও রয়েছে যারা সবাইকে বসার জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছে । দুপাশে দেয়াল বরাবর কয়েকটা লম্বা বেঞ্চ তাতে কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বসে, সম্ভবত তাদের  মাটিতে বসতে অসুবিধে। বাবার কথা মনে হতেই  চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম তিনি প্রথম সারিতে তার পাশেই  ডঃ বক্সী। সেই  মুহূর্তে বাবার সঙ্গে বাক্কালাপ করার কোনোও রুচি নেই আমার । শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালবাসা আজ যেন ভেঙে খান খান।  সত্যিটা এতদিন চেপে রেখেছিলেন? এটা  কি একধরণের প্রতারণা নয়? আমার  মনে হয় আরতি পর্বটা যেন অকারনে অতি দীর্ঘ, উসখুস করছি কতক্ষনে তা শেষ হবে? মন্দিরে অস্থির চিত্ত একমাত্র আমারই  বাকিরা সম্পূর্ণ আরতিতে নিমজ্জিত। ধৈর্যের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে প্রায় চল্লিশমিনিট পর পুজো পর্ব শেষ হল। এবারে ভাবি আমি আমার প্রশ্নের উত্তর পাব। পায়ে পায়ে ডঃ বক্সীর দিকে এগিয়ে যাই ।
“আমাকে দেখেই ডঃ বক্সী স্ত্রীকে হাঁক দেন, “কমলা এই দেখো দীপক?”
লাল পাড়ের গরদের শাড়ী পড়া বয়স্ক অথচ আধুনিয়া যিনি এগিয়ে এলেন তাকে দেখে মাকে ভীষণ মনে পরে গেল। অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে আমার  সাথে কথা বলেন তিনি, “কেমন আছ? স্ত্রী কেমন আছে? মিমি কেমন আছে? কোন স্কুলে পড়ছে?” এমন স্নেহশীল একান্ত ভাব যেন আমাকে অনেক যুগ ধরে অত্যন্ত ঘনিষ্ট ভাবে চেনেন।  
ওনার সঙ্গে সৌজন্যমূলক কথোপকথনের ফাঁকে আমার চোখ খুঁজে বেড়ায় শুধু ডঃ বক্সীকে, কিন্তু প্রসাদ প্রার্থীদের ভিড়ের মধ্যে তাঁকে দেখতেই  পাই না। আশ্রমে রাতের খাওয়ার সময়ও অনেক চোখ ঘুরিয়ে ডাইনিং হলেও ডঃ বা মিসেস বক্সীকে খুঁজে পাই না। তাহলে ওরা কি আশ্রম ছেড়ে চলে গেল আমায় এমন উৎকণ্ঠায় রেখে?”
দীপক খাটের পাশে ছোট টেবিলে রাখা জলের বোতলে খানিকটা গলা ভিজিয়ে নেয়, এইসময় মায়া কিছু বলতে যাচ্ছিল, দীপক আবার তার গল্প শুরু করায় সে চুপ করে যায়।
“মাঝরাতে আমার  ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুম আর কিছুতেই আসতে চায় না, বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকি, রহস্যের সমাপ্তি টুকু না জানলে যেন মনে কোন শান্তি নেই। ঘুমের ওষুধটাও সঙ্গে নিয়ে যাই নি । ওদিকে পাশের খাটে বাবা দিব্বি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন, কি নিশ্চিন্ত! একবার ভাবি  ওনাকে জাগিয়েই  রহস্য উন্মোচন করি । পরমুহূর্তে হাত ঘড়িটায় রাত ২ টো বাজে দেখে আর ওনাকে ওই রাতে ঘাঁটাতে ইচ্ছে হল না।  সকালে ঘুম ভাঙতে দেখে বাবা বিছানায় নেই, নিশ্চয় প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন। একটা সিগারেট ধরিয়ে বাইরে এসে অনুভব করি মন জুড়োনো বসন্তের মিঠে হাওয়া। একটা কোকিল অবিরাম ডেকে চলেছে, সামনের লাল ফুলে ভরা কৃষ্ণচূড়া গাছটায় বোধহয় বসে আছে। হঠাৎ মন নেচে ওঠে দূর থেকে দেখি ডঃ বক্সী এদিকেই হেঁটে আসছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে বলি,  গুড  মর্নিং”
“বল সুপ্রভাত! বিনা ব্যবহারে সুন্দর বাংলা কথাটা যে হারিয়ে যাবে,”
“ওহ হ্যাঁ …সুপ্রভাত! কাল আপনাকে আর দেখলাম না, ডাইনিং হলেও না,” 
“আমি আর কমলা অনেক বছর শনিবার রাতে উপোস করি। চলো আর একটু হেঁটে খিদেটাকে বাড়িয়ে নেওয়া যাক । আজ রবিবারের জমপেশ জলখাবার, কড়াইশুঁটির কচুরী, আলুরদম, জিলিপি। রাঁধুনি  বলেছে  এতো  ফরমাস করলে সাহায্যকারী লাগবে, তাই কমলা, গাঙ্গুলীদা আরও দুজন আজ হেঁসেলে সাহায্য করছে।” বলে হেঁসে ওঠেন। 
ডাক্তারবাবুর সঙ্গে হাঁটলেও আমার মন পরে আছে  কিন্তু না জানা ভাই রহস্যে। ভাবি  কোথা থেকে শুরু করবে, একটু হেঁটেই  জিজ্ঞেস করি, “কাল পুজোর আওয়াজে আর আপনার কথা শোনাই হলো না।”
“কি কথা? ওহ, মনে পড়েছে, তোমার ভাই? আমি দেখেছি তাকে, সে ভালোই আছে।”
চমকে ওঠে দীপক, “আপনি দেখেছেন তাকে? কোথায় থাকে? কি করে?”
ডঃ বক্সী খুব গম্ভীর হয়ে বলেন, “গাঙ্গুলীদার অনুমতি ছাড়া কেমন করে বলি তোমাকে? মানে উনি নিজে এতদিনে যখন তোমাকে কিছু বলেন নি।” 
“বাবাতো এত কাল গোপন রেখেছেন, আপনিও আমার কাছে গোপন করে রাখবেন?” গলায় একটা পরাজয়ের সুর। 
কিছুক্ষন চুপ করে হেঁটে ওরা পার্কটায় পৌঁছোয়, ডাক্তারবাবু একটা বেঞ্চে বসে দীপককে বসতে ইঙ্গিত করলেন, দীপক বাধ্য ছেলের মত ওনার পাশে বসলো। 
“জানো দীপক আমরা শিক্ষিত বুদ্ধিমান যতই হই, আমরা কিন্তু অনুকরণের মাস্টার। সাহেবদের বেলেল্লাপনা গুল কেমন সহজেই অনুকরণ করি, গরমেও কোট সুট পরে অপিস যাই, আর ভালোগুলো দেখতেই পাই না। উচ্চ শিক্ষা, কর্ম, কঠোর পরিশ্রম, উচ্চাকাঙ্খা আসলে কিসের জন্য? সবই শেষমেষ আমাদের পরিবারের সুখের জন্য, তাই না? ইংল্যান্ডে যখন থাকি, প্রতিদিন আমার মেয়ে-জামাই, যতই ওদের সারাদিনের কর্মজীবনের জটিল সমস্যা থাকুক, সন্ধ্যেতে  বাড়ি ফিরে পরিবারের সকলের সাথে সময় কাটায়, প্রতিদিন নিয়ম করে। আমরা একসাথে ডিনার করি সারাদিনের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলি। ওদেশে এটাই বলতে পারো একটা পারিবারিক  রীতি। এতে কি হয় জানো? নিজেদের মধ্যে অনেক সহজে ভাবের বিনিময় হয়। রোজের যোগাযোগ ছাড়া অনেক কিছুই না বলা গোপন থেকে যায় নিজেদের মধ্যেই, পারিবারিক জীবনের জন্য যা অস্বাস্থ্যকর। এটা  বিনা পয়সার উপদেশ, নেবে না প্রত্যাখ্যান করবে তা তোমার ওপর,” বলে উনি হাঁসেন। “বৌদি ছিলেন স্নেহময়ী আমাদের সকলের বড় দিদির মত। যখন উনি মাস ৫-৬ অন্তরসত্ত্বা সেঅবস্থায় সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যান। মিসক্যারেজ। অস্ত্রপ্রচার।  ডাক্তার জানিয়ে দেয় বৌদি আর কখনও মা হতে পারবেন না। বৌদি প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে ভুগতে থাকেন, গাঙ্গুলীদার পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া । প্রায় দু বছর পরে পরিবারে দুঃখের অন্ধকার দূর করলে তুমি, তাই তোমার নাম দীপক। মন্দিরের সিঁড়িতে তোমাকেই সেদিন পাওয়া গেছিলো। বৌদি সানন্দে তোমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। সবসময় গাঙ্গুলিদা বা বৌদির মুখে শুধু তোমার প্রশংসাই শুনে এসেছি।” 
দীপক বলে, “ডঃ বক্সীর কাছে সব শুনে নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার, পাথরের মত হতভম্ব হয়ে বসে থাকি অনেক্ষন l অপরাধ বোধ, লজ্জা, দুঃখে ক্রমাগত চোখে ভিজে যায় । ক্ষমা চাইবার ভাষাও খুঁজে পাই না। যার কাছে আমার চিরকৃতজ্ঞ থাকার কথা তাকেই নিমেষে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করতে উদ্ধত হয়েছিলাম।”
বেডরুমের ক্ষীণ আলোতেও ময় স্পষ্ট বোঝে দীপক চোখের জল মুছছে। মায়া চুপ করে থাকে একটা অপরাধ বোধের ছায়া  ক্রমে ওকেও যেন ঢেকে দিচ্ছে ।  দীপক বলে, “আজ বাড়ীর পথে গাড়ি চালাতে চালাতে বার বার আমার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল । বাবা চুপ করেই বসে ছিলেন এক মনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ উনি বলেন, দীপক ফ্ল্যাটটা কেনার সময় তুমি আমার কাছে কিছু টাকা সাহায্য চেয়েছিলে, সেসময় দিতে পারি নি বলে আমার সবসময় একটা অস্বস্থি হয়।” 
আমি  চুপ করে থাকি  ভেবে পাই না কি বলবো । 
বাবাই বলেন, “তখন মিমি সবে জন্মেছে, ওর নামে একটা মোটা টাকা ফিক্সড ডিপজিট করি, বড় হয়ে যাতে উচ্চশিক্ষার সময় ওর অর্থের অভাব না হয়, এরপর যখন তুমি…..”
“এসব কিছুই তো আমাকে তুমি বলো নি!”
বাবা শুকনো হেঁসে বলেন, “জানতে গেলে কথাও বলতে হয়, তোমার কি আমার সঙ্গে কথা বলার অবকাশ হয়?”
মনে মনে নিজের দোষ স্বীকার করে আমি  চুপ করে যাই ।  
মায়া এতক্ষন চুপ করে সব শুনছিল এবার সে বলে, “মিমি একদিন বলছিল, আমরাতো সকলে হাঁসপাতালে নার্সিং হোমে জন্মেছি, কিন্তু বাপিকে ভগবান নিজে দিয়েছেন দাদুকে। এখন বুজলাম বাবা কি বলতে চেয়েছিলেন। দীপক আমাকে ওই বৃদ্ধাশ্রমে একদিন  নিয়ে যাবে? তোমার গল্প শুনতে শুনতে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে, বিশেষ করে ওই মন্দিরের সিঁড়িগুলো । “
“নিশ্চই আমার জন্মদিনের দিন। ”   
মায়া  দীপকের কাঁধে মাথা রাখে, অনেকদিন পরে ওর চোখও ভিজে গেছে আজ ।
                        ….   সমাপ্ত ….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *