Body – Thriller story – Rohossher Golpo

– রতন! এসি টা চালা তো!
– হ্যাঁ স্যার!
– আর সকাল সকাল এতো দেরী করবি না, একদম গাড়ি বসিয়ে দেবো একটা পেনের দাগে!
– স্যার আসলে সকালে বউয়ের…
– এতো অসুবিধে হলে তোর আসার দরকার নেই আর।

বলেই আজকের খবরের কাগজটা খুলে নাড়াচাড়া শুরু করে দিলেন অজিতেশ বাবু‌। সিনিয়ার ব্যাচের অফিসার। এখন অনেকগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বড় পদে আছেন।

সত্যি কথা বলতে কি! অফিসের ড্রাইভার রতনটাকে নিয়ে বড় বিপদ! ওর বউয়ের কিছুদিন আগেই হঠাৎই ক্যান্সার ধরা পড়েছে। লাস্ট স্টেজ। রীতিমতো জোরদার ট্রিটমেন্ট করানোর সমস্ত বন্দোবস্ত করতে চেয়েও করে উঠতে পারছে না রতন। আসলে অফিসের চাপটাও মারাত্মক।
সকাল থেকে স্যারের ডিউটি করেও কোনোকোনো দিন রাতেও ডাক পড়ে যায়।
না বলার উপায়ও নেই। এত বড় বড় লোকজন অফিসাররা স্যারের কথা ফেলতে পারে না যেখানে, সেখানে সে তো সামান্য একটা ড্রাইভার। যে কোনোদিন একটা পেনের দাগে যেটুকু মাসশেষে জোগাড় হয় সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে। তাই খুব এই ব্যাপারে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে রতন।

বাড়িতে আছে বলতে বউ আর দুই ছোটো ছোটো ছেলে মেয়ে। বউয়ের বয়স প্রায় পঁয়ত্রিশ সাঁইত্রিশের কাছাকাছি হবে। একেই অভাবী সংসার তার উপর এরকম এক বিধ্বংসী বজ্রপাত। হাসিমুখে থেকে কাউকে কিছু বুঝতে না দিলেও শুধু রতনই বোঝে তার ভেতরের চিৎকারটা। দুটো বাচ্চার ভবিষ্যতটা আরও সবকিছু যেন সামনে গাড়ির বৃষ্টিভেজা কাচটার মতো প্রতিদিন ঝাপসা করে দেয় চিন্তাগুলো।

– রতন! কাল জরুরি মিটিং আছে। সারাদুপুর ডিউটি করবি।
– স্যার বলছিলাম কালকের কেমোটা…
– বাড়ির অন্য কাউকে বল নিয়ে যেতে।
– না মানে! অবস্থা খুব খারাপ। ছেলে মেয়ে দুটো ছোট…
– যেটা বললাম মনে রাখিস।
– ঠিক আছে স্যার! ওকে ভর্তি করেই চলে আসবো।

আজ সকাল থেকে চোখদুটো যেন মেলে রাখতে পারা যাচ্ছে না আর। সারারাত চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি রতন। চারটে মানুষের রান্নাখাওয়া সব দায়িত্ব তার একার ঘাড়ে।

আগে তাও মা ছিলেন সাথে। বছর দুয়েক আগে হঠাৎই চলে গেলেন। এক ভাই আছে, কোলকাতায় বড় চাকরি করে। যোগাযোগ রাখা তো অনেক দূর, লজ্জায় ভাই বলে পরিচয়টাও দেয় না কখনো।
মনে মনে একটু হেসে ডাক দিলো রতন,

– বাবাই! যা তো মা কে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বস। আমি তালাগুলো দিয়ে আসছি।

রাস্তায় খুব জ্যাম আজ। কিসব মিছিল বেরিয়েছে। চারদিকে গাড়ির লাইন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে আজ স্যারের মিটিং। এরপর ভর্তি করে বেড পেতেও তো অনেক সময় লেগে যাবে। একা হাতে এত কাজ সামলে কি করে যে কি হবে মাথায় আসছে না আজ।

– হ্যালো! রতন কোথায় তুই?
– জ্যামে ফেঁসে গেছি স্যার! টাইম লেগে যাবে।
– মজা করছিস নাকি! বারবার কাল বলে দিলাম। আমি কিচ্ছু শুনবো না। আধঘন্টা সময় দিলাম।
– স্যার তিনঘন্টা লেগে যাবে।

বলে আজ প্রথমবারের জন্য রতনই ফোনটা কেটে সুইচ অফ করে দিল।

হয়তো কাল থেকে অফিসে রতনের আর দরকার নাও পড়তে পারে! গতকালই শেষ ডিউটিটা করে নিয়েছে।
এত জরুরি মিটিং অফিসের। রতনই তো একমাত্র ভরসা। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ধর্মসংকটে। বউবাচ্চাগুলোরও তো একমাত্র ভরসা রতনই।

তাই আজ হয়তো ওই ড্রাইভারের ভূমিকা থেকে বেরিয়ে একজন স্বামী আর একজন বাবার ভূমিকাটা পালন করা অনেক বেশি দরকারী ছিল।

– হ্যালো রতন!
– আপনি রেডি হোন। আসছি স্যার।
– সেকেন্ড হাফে এসে তোর এ মাসের গত পনেরো দিনের গাড়ির বিলটা নিয়ে যাস।
– আচ্ছা স্যার!

কি অদ্ভুত দুনিয়াটা! ভগবানকেও মাঝে মাঝে কত নিষ্ঠুর মনে হয়। মানুষের জন্ম দিয়ে হঠাৎ কোনোএকদিন কাউকে পাহাড়ের এক গভীর খাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন! কি দরকার! এর থেকে তো পৃথিবীতে শুধু সুখী মানুষদেরই জন্ম হওয়া ভালো।
বাড়িতে রোগব্যাধি জন্মমৃত্যু তো কেউ নিজে হাতে নিয়ে আসে না! তবু আসে! অযাচিত অতিথির মতো আসে আর তছনছ করে দিয়ে চলে যায় সমস্ত সংসারটাকে।

হাসিমুখে সেকেন্ড হাফে অফিসে ঢুকলো রতন। বাকি ড্রাইভার মহলে একটা চাপা কানাঘুষোর ফিসফিস শব্দগুলো যেন কয়েকশো ডেসিবেলে কানের পর্দা ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে আজ।

– স্যার আসবো?
– আয়। বিলটা দিয়ে যা। আর অ্যাকাউন্টস থেকে টাকাটা নিয়ে চলে যাস।
– আচ্ছা স্যার। আসছি।
– হমম আয়।
– স্যার একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?
– বল।
– স্যার আমার অন্যায়টা কি এত বড় কিছু ছিল?

– রতন! এটা অফিস। অফিসটাকে চালাতে হয় আমাকে।
– স্যার আপনারা অফিস চালান, আর আমরা তো আপনাদের নিয়ে চলি। ভালো থাকবেন স্যার। নমস্কার!

– ইয়ে! রতন তোর বউ কেমন আছে?
– কালকের কেমোটা আর নিতে পারেনি স্যার! অফিস থেকে টাকাটা পেলেই হাসপাতালে গিয়ে বডিটা ছাড়িয়ে নেবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *