ভৌতিক রহস্য গল্প – Bengali Horror Story – Horror Suspense Story

ভৌতিক রহস্য গল্প - Bengali Horror Story - Horror Suspense Story

                                প্রথম পর্ব

মাসের শেষের দিকের কাজের প্রেসার, মেলের মেলবন্ধনে মেল বক্স এক্কেবারে ভর্তি। সব কাজ শেষ করে উঠতে উঠতে হাত ঘড়িতে প্রায় রাত সাড়ে নটা তখন। বাইরের কাচে চোখ পড়াতেই দেখলাম, বেশ লালচে হয়েছে আকাশের বর্ণ। সকালের তাড়াহুড়োতে ছাতাটাও আনা হয়নি। এবার বৃষ্টি নেমে পড়লেই ফেঁসে যাব। ভাবতে ভাবতে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে লিফটে করে নিচে নামতেই পেছন থেকে চেনা গলার ডাক এলো ‘চলে আয়।’
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, দিব্যেন্দু ওর পক্ষীরাজে চেপে  স্টার্ট দিচ্ছে। আমি যেন আকাশের মেঘ জল হয়ে পরার আগেই মনের আশার মেঘের জলের সন্ধান পেয়ে গেলাম। মুচকি হেসে পেছন পথে কয়েক পা এগিয়ে ওর কাছে আসতে আসতে বললাম “আইটিতেও একই অবস্থা তাহলে।”

“বন্ধু আইটি হোক বা ফিন্যান্স … চাকরিতে মান্থ এন্ডিং এর গুঁতো কম বেশি সবাইকেই টের পেতে হয়। তার উপর কাল স্যার অস্ট্রেলিয়া বেরিয়ে যাচ্ছেন। আমায় গুচ্ছের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে, টিমের দায়িত্ব গুঁজে দিলেন আজ। তাই অগত্যা … ।” বলে আমাকে নিয়ে এগোতে থাকল দিব্যেন্দুর পক্ষীরাজ। কলকাতার রাস্তায় যানজট দশটার দিকেও যথেষ্ট বিরক্তিভাজন করে। সে তুলনায় আজ যেন কতকটা খালি লাগছিল রাস্তাটা। দুবন্ধু মিলে টুকটাক গল্প করতে করতে বেশ চলছিলাম। এমন সময় বিরাটি ফ্লাইওভার পেরিয়ে নিচে নামতে গিয়ে বাঁপাশে কিছু একটা দেখে গাড়িটাতে বলপূর্বক ব্রেক কষে থামিয়ে দিল দিব্যেন্দু। আর ঢালু রাস্তার একপাশে ‘ক্যাঁচ’ করে  চাকার ঘষটানির আওয়াজ সহ দাঁড়িয়ে পড়ল ছুটন্ত ইয়ামাহাটা। আমি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকিয়ে দেখি একটা বাইকের পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে রাস্তার উপর পড়ে রয়েছে কেউ। দিব্যেন্দু বাইকটা সাইড করিয়ে নামতে গেলে আমি বাঁধা দিয়ে বলি
“ঝামেলায় জড়িয়ে যাবি খামোখা। কোনো লরি টরি মেরে দিয়ে গেছে বোধ হয়। ছেড়ে দে।”

দিব্যেন্দুর মতান্তর হয় আমার সঙ্গে। ওর বক্তব্য যদি বেঁচে থাকে ছেলেটা? অগত্যা, দুজন বাইকটাকে সাইড করিয়ে নেমে এগিয়ে যেতেই দেখি একটা মাঝ বয়সী ছেলে ভাঙাচোরা বাইকের পাশে পড়ে রয়েছে। তার চোখমুখের অবস্থা আর শরীরে আশপাশের রক্তাধিক্য দেখে আমি মুহূর্তে ওয়াক তুলতে তুলতে সরে আসি সেখান থেকে। আমার সারাটা শরীরে যেন কেমন একটা শিহরণ অনুভূত হয় কোনও এক পরিচিত কারণে। দিব্যেন্দু কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এসে জানায় ‘ছেলেটা মরে গেছে’। তারপর ফেরার পথে স্থানীয় মিউনিসিপালিটি হাসপাতালে ব্যাপারটা জানিয়ে আমাকে নামিয়ে দেয় নিমতা মোড়ে। আমার সারাটা শরীর তখনও পাক দিচ্ছে। না চাইতেও মনে পড়ে যাচ্ছে ক্ষনিক দেখা বডিটার বর্ণনাগুলো। বিশেষ করে টেনিস বলের মতো বেরিয়ে আসা চোখদুটো। সেই স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়েই বড় রাস্তা থেকে মিনিট আড়াই হেঁটে পৌঁছলাম বলাই সাহার বাড়িতে। সল্টলেকে চাকরিটা হওয়ার পর থেকে এই আটমাস এ বাড়িতেই ভাড়া আছি আমি। দিব্যেন্দুই ঠিক করে দিয়েছিল এ বাড়িটা। ওর বাড়িটা এ বাড়ির থেকে আরও মিনিট পনেরো এগিয়ে। আমি কলিংবেল প্রেস করতেই বাড়িয়ালার ছোটো ছেলে এসে দরজা খুলে দিল।

সিঁড়ির ঘর দিয়ে উপরে উঠে বড় টানা এসবেস্টসের ছাউনি পেড়িয়ে আমার ঘর। পাশেই লাগোয়া বাথরুম। একার জন্য এই যথেষ্ট। প্রায়শই সপ্তাহের শেষে কাচড়াপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দুদিন থেকে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি আমি। তারপর ব্যাগটা নামিয়ে রেখে জামাকাপড় বদলে হাতমুখ ধুতে বাথরুমে ঢুকতেই হঠাৎ পাওয়ার কাট হল। বাথরুমে বেসিনের উপর বরাবর লাগানো ছোট্ট অস্বচ্ছ আয়নাটাতে তখন সবে চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে মুখ তুলে চেয়েছি আমি। হঠাৎ বাইরের একটা আলোর ঝলকানিতে মনে হল যেন আমার সারাটা মুখ জলে নয়, রক্তে ধোয়া হয়েছে। টপটপ করে সাদা বেসিনের উপর আমার কণ্ঠনালি চুয়ে ঝড়ছে তার এক একটা লবণাক্ত বিন্দু। আতঙ্কে একটা চিৎকার করে উঠতেই, গলাটা কেমন যেন বুজে এল আমার। বাইরের বিদ্যুৎপ্রভার আঁকাবাঁকা আলোতে দেখতে পেলাম আয়নায় নিজের বারিধৌত মুখটা। বুঝতে পারলাম, রাস্তায় আলগোছভাবে পড়ে থাকা দৃশ্যটা একাকীত্ব পেয়ে আমার শরীরের রোমকূপ আর মনের ভীতিগুলোকে বারংবার জাগ্রত করে তুলছে। আর অজান্তেই আমি প্রবেশ করে যাচ্ছি এক পরিচিত সিকোয়েন্সে।

এমন সময় মোবাইলের আওয়াজে আচমকা নড়েচড়ে উঠলাম। আওয়াজটা অনুসরণ করে ঘরে ফিরে দেখি, খাটের স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে রাখা প্যান্টের পকেট মধ্যস্থ আবছায়া আলোতে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। বুঝলাম, আমার দেরি দেখে মাই ফোন করেছে হয়তো। ভেজা হাতটা কোনওরকমে পরনের বারমুডায় বলপূর্বক ঘঁষে ফোনটা ধরলাম। আর ডান কাঁধ কাৎ করে সেটা কানে চেপে রেখে, দুহাত দিয়ে টেবিলের উপরে রাখা মোমবাতি আর দেশলাই হাতড়াতে লাগলাম। ওপাশে মায়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর

“কিরে শরীর ঠিক আছে তো তোর? এতো রাত হল ফোন করিস নি যে।”

মা বরাবরই খুব সকালে ওঠে। আর বিবিধ নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে সাড়ে আটটায় খেয়ে সাড়ে নটার দিকে শুতে চলে যায়। আমি তাই তারমধ্যেই কল করার চেষ্টা করি রোজ। আজ প্রায় এগারোটা বাজতে চলেছে। তাই …

“তুমি ঘুমোওনি এখনো? আমিতো বাসে ফিরিনি আজ .. ” বলেও থেমে গেলাম। জানি বাকি কথা শুনলে অযথা দূরে থেকে মায়ের আতঙ্ক বাড়বে। তাই বললাম
“আমার আসলে দেরি হয়ে গিয়েছিল বেরোতে। অনেক কাজ ছিল। ফিরেছি দিব্যেন্দুর সঙ্গে অফিসের গল্প করতে করতে। আর এখানে এসে দেখি লোডশেডিং। তাই দেরি হয়ে গেল আর কি..”

ওপারে দেখি মা নিশ্চুপ। কিছুক্ষণ পর ‘মা, মা …’ বলে ডাকতে বলে উঠল “বাবু আমি তোকে একটা কথা বলতে চাইছিলাম কদিন ধরেই। কিন্তু বলব বলব করে ঠিক বলা হয়ে ওঠেনি।”

দেখলাম মায়ের গলায় ঈষৎ দ্বিধা, ঈষৎ ভীতির ছাপ। আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম বলো না, কি বলবে।

“কদিন ধরেই তোর দাদুকে খুব মনে পড়ছে রে। আর ওই বাড়ির অনেককিছুই চোখের সামনে কেন জানি ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে মানুষটা প্যারালাইজড অবস্থায় কল্যানের মৃত্যুর পর কী অবস্থায় আছেন কে জানে …?”

আমি বেশ বিরক্তি আর রাগের সঙ্গে  চটজলদি উত্তর দিলাম
“সে খবর কে জানে জানিনা, তবে ওই কর বাড়ির কোনো খবর জানতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নই আমি। এটা তোমায় পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছি মা। আর তুমি কি সবকথা ভুলে গেলে? বাবা কী পরিস্থিতিতে কিভাবে চলে গেল। যাক গে, এসব আমিও এখন আর মনে করতে চাইনা। যে যার কর্মফল ভোগ করছে। তুমিও এসব ফালতু চিন্তা কোরো না এখন।”

“না মানে, আজ তোর দাদুর মতো কাউকে দেখেছি ” আমতাআমতা করে বলল মা।

“মানে! কোথায়?” আমার বিস্মিত প্রশ্ন।

“আমি তোর ফোনের অপেক্ষাই করছিলাম। তো চোখটা লেগে এসেছিল। তারপর হঠাৎ ঘুম ভাঙাতে যেন মনে হল ঘরের সোফাতে একটা কঙ্কালসার মানুষের আবছায়া উপস্থিতি।”

“কী বলছো এসব! ওই শয়তানটা নয়তো?” দ্বিতীয় কথাটা অস্ফুটে বেরিয়ে এলো আমার কেঁপে ওঠা গলা বেয়ে।

“নারে, একেবারেই নয়। আমি এই দেড়মাসে কিচ্ছুটি টের পাইনি একলা ঘরে। ওই ঘটনা নিয়ে কিচ্ছু নয়। আমার তোর দাদুর কথাই মনে হল যেন .. বা হয়তো চোখের ভুল হতে পারে।”

“প্রিমোনিশান মানে পূর্বাভাস পাওয়ার মতো ব্যাপারটা আবার হচ্ছে নাতো তোমার?”

“বলতে পারবো না। যাক গে, তুই কবে আসছিস এখানে?”

“এইতো কাল বাদে পরশু। শুক্রবার অফিস ফেরত ট্রেনে চাপব।”

“আচ্ছা। খাবি কী এখন?”

“অফিস থেকে দেরি দেখে খেয়েই বেরিয়েছিলাম। এবার শোব, বড্ড টায়ার্ড। তুমিও শুয়ে পড়ো। আর এসব হাবিজাবি কথা আর ভেব না। আর আবার যদি প্রিমোনিশান হয় তো বিগত বছরের বিতৃষ্ণাগুলোকে মনে কোরো। সব অনুভূতি পালিয়ে যাবে।” বলে ফোনটা রাখলাম। মাকে কতোটা কী বোঝাতে পারলাম জানিনা, তবে আমার মনের কোথাও যেন একটা গোপন বোঝা ভয়ার্ত পোষাকে অজান্তে নড়েচড়ে বসল। এমন সময় কারেন্ট এল। আর বাইরের দরজাটা ভেজিয়ে লাইট অফ করে জলের বোতলটা মাথার কাছে নিয়ে শুয়ে পড়লাম আমি।

মাথার মধ্যে অবচেতনেই একে একে ভিড় করতে লাগল পুরানো সব না-মেলা সম্পর্কীয় হিসেবগুলো। স্মৃতির ভিড় ঠেলে যেন তারা আমার চোখের তাড়ায় এক এক করে উঁকি দিতে থাকল। আমার তখন তেরো চৌদ্দ বছর বয়স হবে। বাবার হাতে গড়া যৌথ ব্যবসা থেকে কাকু তার নিজের অংশ বুঝে নিতে চাইল। সে ব্যবসাতে যদিও তার ২০%  অবদানও ছিল না। ফলস্বরূপ তুমুল ঝামেলা হয়েছিল। এরইমধ্যে ঠাকুমা মারা গেলেন। আর আমরাও শ্যামনগরের পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কাচড়াপাড়ায় মামাবাড়ির কাছে আশ্রয় নিলাম। তারপর ধীরে ধীরে আবার নতুন করে ব্যবসা দাঁড় করিয়ে বাবা জমি কিনল। বাড়িও হল আড়াইখানা ঘর নিয়ে। তারপরই বাড়িতে এল কোর্টের চিঠি। বাবা নাকি জোর করে দাদুকে দিয়ে বাড়ির পেছনের অংশ লিখিয়ে নিয়েছে। যত সব জাল দলিল, জাল সই সহ নোংরামির চূড়ান্ত। সব ছোটোকাকা আর তার শালা মৃদুলের বুদ্ধিতে হয়েছিল। যাতে আমার নির্ভেজাল বাবা ব্যবসার মতো বাড়িটাও সম্পূর্ণ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আমার তখন উচ্চমাধ্যমিকের বছর। চোখের সামনে বাবা মাকে মানসিক যন্ত্রণায় তিলেতিলে শেষ হয়ে যেতে দেখছি। তারপর এক সময় আমিই উকিল ঠিক করলাম। বাবার সাথে গিয়ে কোর্টে পালটা জবাব দিলাম। ন্যায় অন্যায়ের হিসেবটা গুছিয়ে উঠতে গিয়েই আবার ভিন্ন ঝড়ের আগমন ঘটল। যদিও সে ঝড় আগের ঝামেলারই লেজ ধরে গুটিগুটি পায়ে এগিয়েছিল। তাতেই এলোমেলো হয়ে গেল আমার কলেজের লাস্ট ইয়ারটা। হাজার টেনশনের টানাপোড়নে মায়ের হঠাৎ হার্টের বাইপাস করানোর আচমকা আশংকা জন্মাল। কাকার এক একটা শয়তানি চালে আমাদের জীবন বিরক্ত, বিপর্যস্ত হয়ে উঠল। তখন শুধু মামা পাশে ছিল বলে মায়ের চিকিৎসার খরচ সামলে নিয়েছিলাম। কিন্তু বাবাকে আর সামলানো গেল না। চুপচাপ থাকা ঠাণ্ডা মানুষটা চিরকালের জন্য চুপ হয়ে গেল। একটা ম্যাসিভ সেরিব্রাল অ্যাটাকে সব শেষ হয়ে গেল। আমার মাথার ছাদ আর পায়ের তলার মাটি যেন মুহূর্তে তাদের ভারসাম্য হারাল। চরম শোক আর আপন সম্পর্কীয় পাকদণ্ডির প্যাঁচে পড়ে তখন আমি দিশাহারা বেকার এক সদ্য গ্র‍্যাজুয়েট ছেলে। ছোটোখাটো চাটার ফার্মে কাজ করে নিজের আর মায়ের আত্মসম্মানগত দিকগুলো টালমাটাল হয়ে সামলাচ্ছিলাম। ঠিক সেসময় আমার জীবনে আবার উপস্থিত হল সেই সম্পর্কীয় রাহু … কাকু। সে নাকি অনুতপ্ত হয়েছে তার দাদার মৃত্যুতে। তাই আমাকে বাড়ির অর্ধেক অংশ দিতে চায়। দাদু তখন শয্যাশায়ী। নিজের ছোটো সন্তানটিকে সারাজীবন আদরের নামে গাদাগাদা অন্যায় প্রশ্রয়দান করে নিজের জীবনের অন্তিম দিন গুনছেন। আমার হাতে তখন সল্টলেকের প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে নতুন চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। শয়তানটার আর দ্বারস্থ হবো না বলে মনস্থ করলাম তখন। এতদিন যে ঘেন্নাগুলোকে মনের মধ্যে পোষ মানিয়ে রেখেছিলাম, তাদের উৎসাহে আমিও এক পরিকল্পনা নিয়ে দেখা করলাম তখন তার সঙ্গে। কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম যে কুকুরের লেজ বারো বছরেও সিধা হয়না। কাকুর এই সুখালাপের পশ্চাতে নির্ঘাত কোনও উদ্দেশ্য আছে। আর সেটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, সেদিন দেখা করার পরই।

                        দ্বিতীয় পর্ব

বাবার পুরানো ব্যবসার কিছু শেয়ার আটকে ছিল। সেগুলো বাবার অবর্তমানে আমায় দিয়ে সই করাতে চেয়েছিল শয়তানটা। কতকটা নিজের পরিকল্পনার খাতিরে আর কতকটা পূর্বের ঘটনার আতঙ্কের কারণেই, মাকে সেদিন জানাইনি যে শয়তানটার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। কিন্তু সেদিন যা হল, তাতে আদৌ কি আমার কোনো হাত ছিল? নাকি ধর্মের কল আপনা আপনিই বাতাসে নড়ে উঠেছিল? এসব চিন্তার মাঝেই আবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই বিভৎস দৃশ্যটা। রক্তাক্ত ছটফটানো দুটো পায়ের অংশ আর  বাঁহাতে মুষ্টিবদ্ধ করে রাখা কাগজপত্র। হঠাৎ মনে হল সেই বিভৎসতা যেন আমার ঠিক উপরে শূন্যে সরীসৃপের মতো ভাসমান হয়ে আমার দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। আর অদ্ভুতুড়ে ভঙ্গিতে একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে তার বিশ্রী বিভৎস্য চাউনিতে। তার ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত ঠোঁট দুটো নড়ে অস্ফুটে বলে চলেছে ‘জল, একটু জল’। মুহূর্তে আমার সারা শরীর যেন এক আগ্রাসী স্থবিরতায় জড়িয়ে পরতে লাগল। নাকে পৌঁছাতে লাগল একটা বোটকা গন্ধ। না চাইতেও ওই খুবলে বেরিয়ে আসা দৃষ্টির বিশ্রী আকর্ষণে আমি একনাগাড়ে চেয়ে রয়েছি তখন। যেন কেউ আমার সমস্ত চলনক্ষমতার উপর কঠিন কার্ফিউ জারি করেছে। অতঃপর অনুভব করলাম ওই ভয়ঙ্কর দৃশ্যায়ন থেকে শীতল তরলের ছিটে পড়তে লাগল আমার নিম্নাঙ্গে। ক্রমশ ছিটেগুলো তীরের ফলার মতো বেগে আমার শরীরের নীচের দিক থেকে কোমরের দিকে উঠে আসতেই মুহূর্তের শিহরণে কেঁপে উঠে বসলাম আমি। তারপর দুহাত নিজের পায়ের উপরের সিক্ত অংশে বুলিয়ে চোখের কাছে ধরতেই নাইট বাল্বের আধো আলোতে দেখলাম তা বর্ণহীন। ততক্ষণে খেয়াল হল বাইরে মুশলধারায় বৃষ্টি পড়ছে। আর তার ছিটেই পায়ের দিকে থাকা খোলা জানলা দিয়ে আছড়ে পড়েছে শরীরের নিম্নাঙ্গে। কিন্তু বাকিটুকু কি শুধুই স্বপ্ন ছিল? স্মৃতির জটে মাথার নার্ভগুলো নিস্তেজ হয়ে গিয়ে কি তবে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি? তবে কে বলল এভাবে আমায় ‘জল, একটু জল!’ গলাটা খুব চেনা লাগছিল কেন? শয়তানটা কি তবে মুক্তি পায় নি …?

পরেরদিন সকালে উঠে থেকে মাথাটা খুব ধরে আছে। রাতের ঘুমতো ঠিকঠাক হয়ইনি, তার চেয়ে বড় অস্বস্তি মনের মধ্যে, চিন্তার মধ্যে। কী যে হাবিজাবি দেখলাম আমি, আর মা যে কী বললো। ভাবতে ভাবতে চমকে উঠলাম … দুটো ঘটনার মধ্যে কোনও লিঙ্ক নেই তো? কিন্তু আজ এতদিন পর এসব হবেই বা কেন? ঘটনার পরের সাতদিন যে আমি টানা খুব বাজে দিন কাটিয়েছিলাম, সেটা অস্বীকার করবো না। সেটা যদিও অপার্থিব ভীতির সাথে পার্থিব বিশ্রী স্মৃতির জন্যই। তখন একজনের কাছে গিয়ে একটা তাবিজও তো নিয়েছিলাম। হঠাৎ খেয়াল হল সেটা দুদিন আগে ছিঁড়ে গিয়েছিল। তারপর আর লাল কাড়ে বেঁধে পড়া হয়ে ওঠেনি। মনে পরতেই দ্রুত উঠে ড্রয়ার হাতড়ে সেটা বের করে মানিব্যাগে রাখলাম। সেবার এটা পরেই সব মোটামুটি চুকেমুকে গিয়েছিল। তাহলে আবার নতুন করে কী হচ্ছে এসব। এমনসময় বাড়িয়ালার দেওয়াল ঘড়ির আওয়াজে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল। হাতঘড়িটা টেবিলের উপর থেকে তুলে দেখলাম, আটটা বাজে। তড়িঘড়ি করে গায়ে মাথায় জল ঢেলে দুটো কেকের প্যাকেট ব্যাগে গুঁজে বেরিয়ে পরলাম অফিসের উদ্দেশ্যে। পথে যেতে যেতে ব্রেকফাস্ট সেরে নেব।

কিন্তু এক অস্বস্তিজনক কারনে অফিসের কাজেও যেন মন বসাতে পারছিলাম না। মনে বারবার কড়া নাড়াচ্ছিল, অতীতের কিছু ঘটনা। বাবার মৃত্যুর আগে মায়ের মন মোঁচরানো কান্নার অনুভূতি, কাকুর মৃত্যুর আগে মায়ের টের পাওয়া কিছু লক্ষণ, আর এসবের সঙ্গে আমার মন বারবার কো সিকোয়েন্স গড়তে চাইছিল মায়ের কাছে শোনা কালকের কথাগুলোর। তবে কি এবার দাদুর কিছু হবে? ভাবনাটাকে সমূলে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে আমার পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। বের করে দেখি স্ক্রিনে Maa calling….

কেমন একটা অদ্ভুত আশংকায় হাতটা কেঁপে উঠল আমার। ফোন রিসিভ করতেই মা জানাল, এক্ষুণি একবার আমাদের শ্যামনগরের বাড়িতে যেতে হবে। পরের কথাগুলো শুনে আমার দুটো কান দিয়ে গরম বের হচ্ছিল। আমার মনের ভেতরে তখন লৌকিক অলৌকিক হিসেবগুলো যেন অজান্তেই নিজেদের মধ্যে এক ভারসাম্যপূর্ণ সমীকরণ করে নিচ্ছিল। মায়ের সব কথার শেষে, আমি শুধু ‘আসছি’ বলে ফোনটা রাখলাম। তারপর কোনোরকমে অফিস ম্যানেজ করে লাঞ্চটাইমে শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে বেরিয়ে এলাম অফিস থেকে। যদিও তা আংশিক সত্য। কারণ আমায় দেখে সেসময় বেশ কয়েকজন জিজ্ঞাসা করছিল ‘কিছু হয়েছে নাকি আমার?’

তারপর অফিস থেকে বেরিয়ে বাস ধরে সোজা বিধাননগর স্টেশন গেলাম। আর সেখান থেকে শ্যামনগর লোকালে চেপে বসলাম। দুপুরের দিকের ট্রেনে ভিড় নেই বললেই চলে। একটা বসার সিটও জুটে গেল। কিন্তু বসে দাঁড়িয়ে কোনওকিছুতেই তখন আর স্বস্তি পাচ্ছি না আমি। কর্ণকুহরে একনাগাড়ে নীরবে ঠোকাঠুকি খাচ্ছে মায়ের বলা কথাগুলো।
‘আজ সকালে অভি ফোন করেছিল। বলল ওদের বাড়িতে কিসব আজব আজব ঘটনা ঘটছে তিনদিন ধরে। পরশুদিন সন্ধ্যের দিকে তোর কাকুর ঘরের আলমারির লকারে আওয়াজ পেয়েছিল। তারপর রাতে নিচের ঘর থেকে উপরের রান্নাঘরে গ্লাস গড়ানোর আওয়াজ পেয়েছিল ও আর মনিকাকা একসঙ্গে। ভয়ে ও কাল ওর মামা মৃদুলকে রাতে ডেকে নিয়েছিল। তো কাল রাতে নাকি তোর দাদুর ঘরে আওয়াজ পেয়ে, ওরা গিয়ে দেখে তোর দাদু টানটান হয়ে বসে আছেন মাঝ বিছানায়। দেড় বছরের শয্যাশায়ী মানুষটাকে এমন অবস্থায় দেখে নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করাতে এগিয়ে যেতেই উনি মৃদুলের গালে একটা সপাটে থাপ্পড় মারেন। ওরা নাকি এসব ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে একজন তান্ত্রিককে আসতে বলেছেন আজ। ওই তান্ত্রিক সকালে খবর দিয়ে জানিয়েছেন যে, বাড়ির সব সদস্যদের থাকতে হবে আজ। তবেই উনি আসবেন। তাই আমাদের যেতে হবে বাবু …।’

অন্যসময় হলে মাকে সটান ‘মরুক গে ওরা। আমরা যাব না’ বলে ধমকে চুপ করিয়ে দিতাম। কিন্তু এবার যেন নিজের ভেতরেই কেমন একটা ভয় কাজ করছে। শয়তানটা মনে হচ্ছে যেন কাউকে কোথাও ঠিক থাকতে দেবে না। কিন্তু এতোদিন পর কি এমন ঘটল যে … এসব শুরু হল। নাহ, জানতেই হবে আমাকে। ভাবতে ভাবতে জানলায় উঁকি মেরে দেখলাম ট্রেন সোদপুর ক্রস করছে। এরপর ট্রেন যত গন্তব্য স্টেশনের দিকে এগোতে থাকল, ততই বুকের বাঁদিকে কেমন একটা দপদপ আওয়াজ তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়াতে লাগল ধীরে ধীরে। অতঃপর শ্যামনগর স্টেশনে নেমে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম, মা স্টেশনের এসবেস্টস ছাউনির নিচের সিমেন্টের চেয়ারে আনমনে বসে আছে। মায়ের সারাটা চোখমুখে এক অস্থিরভাব। আমি যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রেখে এগিয়ে গিয়ে বললাম ‘কতক্ষণ এলে?’
আমার গলার শব্দে মা হঠাৎ চমকে উঠল। মনে হল কোনও গভীর চিন্তায় ডুবে ছিল। আমায় জড়িয়ে ধরে বলল ‘বাবু, পরে অনেক ভেবে দেখলাম আমি। আমাদের ওখানে গিয়ে কাজ নেই। তোর কাকার যা কর্ম আর যেভাবে ও মরেছে, তাতে এসব হওয়ারই ছিল। চল আমরা ফিরে যাই।’
আমি কেন জানি তখন আদিবাড়িটার প্রতি একটা অবাধ্য আকর্ষণ বোধ করছিলাম। তাতে প্রভাবিত হয়ে মাকে শান্ত করে বললাম “তুমি এখানেই বসো। আমি একঘন্টার মধ্যেই ফিরে আসছি। শুধু দেখে আসছি, আদৌ কী হচ্ছে ওখানে। ভেতরে ঢুকব না। অনেক জ্বালিয়েছে ওরা আমাদের। ওদের এই হালটা চোখে দেখলে হয়তো একটু শান্তি পাব।”

“ছাড় না। যা হয়েছে, হয়েছে। ওসবে আর জড়িয়ে কাজ নেই।” মায়ের স্নেহসুলভ বারন।

কিন্তু আমার মানসিক টান তখন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে আরও। মাকে কোনওভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে বসিয়ে অতঃপর আমি পা বাড়ালাম আমার  জীবনের প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় কাটানো বাড়িটার দিকে।

স্টেশন থেকে হাঁটা পথে মিনিট ছয়েকের রাস্তাটা কেন জানি পায়ে পায়ে ফুরাতে চাইছিল না। আমার মধ্যের ভয়গুলো তখন কৌতুহলের ভারী আচ্ছাদনে চাপা পড়ে গিয়েছিল। তবে সেদিনের দৃশ্যটা না চাইতেও কেন জানি বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *