ভালোবাসার অনুঘটক – Chemical Reaction – Valobashar Romantic Premer Golpo – Bengali Love Story

ভালোবাসার অনুঘটক - Chemical Reaction - Valobashar Romantic Premer Golpo - Bengali Love Story
premer Golpo

মধুরিমা আজ সকাল থেকেই কিরকম যেন বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল।আজ সন্দীপ অফিসের কাজে ইউ এস এ যাবে বেশ কয়েক মাসের জন্য।অনেকদিন ধরেই সে তার স্ত্রীকে বোঝাচ্ছে যে এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তার উপরওয়ালা একমাত্র তাকেই নির্বাচন করেছে।এইজন্য সে অত্যন্ত গর্ববোধ করছে আর সে এও মনে করছে যে তার স্ত্রীরও সন্দীপের এই উন্নতি ও বিদেশযাত্রা সম্পর্কে গর্বিত হওয়া উচিত।মধুরিমা মৌখিকভাবে যতই আনন্দ প্রকাশ করুক না কেন সন্দীপ তার অভিব্যক্তিটা ঠিকমত ধরতে পারছে না,আর ঠিক ততটাই মধুর উপর তার আক্রোশ বাড়ছিল।অকারণ চঞ্চল হয়ে এটা ওটা খুঁত ধরে ধরে সে মধুকে ক্ষতবিক্ষত করছিল।সে ভাবে তার মত উপযুক্ত একজন সফল পুরুষকে স্বামী হিসেবে পেয়ে মধুরিমার কি উচিত নয় এইটুকু সময় অন্তত স্বামীকে সঙ্গ দেওয়া ও বিগলিত চিত্তে তার সেবা করা!যেমন সন্দীপ মনে এও ভাবে যে মধুর বলা উচিত,’সন্দীপ , সত্যি আমি কি ভাগ্য করে তোমার মত এমন দুর্দান্ত সফল স্বামী পেয়েছি গো।এমন কৃতি মানুষ আর একটাও দেখাও দেখি।’সেই সময় সে অনুকম্পা সহকারে মধুকে সামান্য আদরের ভঙ্গি করে দিত।তাহলে ত ঐ বোকা সরল মেয়েটা আহ্লাদে গলে গলে পড়ত।কিন্তু তা ত হবার নয়।মধু কি ব্যস্ততার সঙ্গে সন্দীপের জিনিসপত্র গুছিয়েই চলেছে।সন্দীপ সোফায় বসে বসে কল্পনায় জাল বুনেই চলেছে।আসলে মধুর জন্য একজন কেরাণী স্বামী ই ঠিক ছিল।মধু কোনদিনই তার সঠিক মূল্য দিতে পারেনি।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্দীপ স্নানের জন্য এগোল।কিন্তু আজ কেন যেন কেবলই মধুর কথা মনে আসছে।মেয়েটা এত সাদামাটা যে যেমন তেমন পুরুষেই সন্তুষ্ট আর কেবল সাংসারিক কাজ শেষে বিছানায় গড়িয়ে পড়াতেই তার শান্তি।এমনকি মেয়েটা একজন আধুনিক যুবকের শয্যাসঙ্গিনী হবার উপযুক্ত ভঙ্গিগুলোও আয়ত্ত করে উঠতে পারেনি এখনও।দৈনন্দিনতার ক্লান্তি সত্বেও সন্দীপ-মধুরিমার একটি সন্তান জন্মেছে।এই সন্তানটিই মধুর জীবনের একমাত্র আনন্দ।সে এই জন্য ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞ।সারাদিন সংসারের কর্তব্য সেরেও শিশুর পরিচর্যায় এতটুকু ফাঁক রাখে না।সন্দীপও বাড়ির ক্লান্তিকর পরিবেশ খানিক সরগরম রাখার চেষ্টায় সকাল থেকে মধুকে নানা ফরমাস করে শেষমেষ স্নান খাওয়া সেরে অফিসের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেয়।মধু তার দাপুটে স্বামীর ফরমাস মত নানা রকমারি জলখাবার বানায়।কখনো কেউ তার মুখে প্রতিবাদ ত দূরের কথা সামান্য অনিচ্ছার প্রকাশও শোনেনি।কারণ সে জানত এই রাশভারী লোকটার দাসত্ব তাকে চিরকাল করে যেতে হবে।এর থেকে তার মুক্তি নেই।আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে মধুরিমা এক শিক্ষিত বর্ধিষ্ণু ঘরের মেয়ে।কিন্তু এম এ পাশ করে সংবাদপত্রের মাধ্যমে বাবা মায়ের পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করে তার এই দুর্বিষহ যন্ত্রণাভোগ করতে হচ্ছে।তাকে তার মা পইপই করে শিখিয়েছেন সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে আর সংসারে যে সয় সে রয় ।যে না সয় সে না রয়।অতএব মধুকে টিঁকে থাকার জন্য সব সহ্য করে চলতে হয়।মধুরিমার সাধ আহ্লাদ বলতে কিছুই নেই।সন্দীপ নিজেকে আধুনিক প্রতিপন্ন করতে স্ত্রীকে নিয়ে এক আধবার বাইরে গেলেও মধু তাতে কোনো আনন্দ পায়নি।সবেতেই সন্দীপের মতের প্রাধান্য পেত বলে সে চিরকাল চুপ করেই থেকেছে।এমনকি ছেলেকে সন্দীপের পছন্দসই খাবার খাওয়াতে হয় বা পোষাকও তার পছন্দেরই পরাতে হয়।ফলে দিবারাত্রি অন্যের চাকায় বাঁধা মধু এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে এখন তার সমস্ত নিজস্বতা লোপ পেয়েছে।যেদিন সন্দীপঅফিস থেকে এসে আশ্চর্যভাবে মধুকে জড়িয়েধরে বলে যে সে আমেরিকা যাচ্ছে।অফিস ই তার ভিসা পাসপোর্ট সব করে দিচ্ছে তা শুনে মধু অবাক হয়ে যায়।সে শুধু ভাবে যে এখন সন্দীপের মা বাবা কেউ বেঁচে নেই আর সে অতদূর দেশে কয়েক মাস থাকবে।এখানে এই দুধের শিশুকে নিয়ে মধু কি করে থাকবে তা সে একবারও ভাবছে না।এত স্বার্থপর মানুষ হয় কি করে!এর পর কদিন বন্ধু আত্মীয়দের নিজের বিদেশ যাত্রার সংবাদ সবিস্তারে প্রচার করে সন্দীপ অপরিসীম আত্মপ্রসাদ লাভ করল।মধুরিমা শুধু সংসার আর সন্তান সামলে স্বামীর আহ্লাদ দেখল।ছোট্ট শিশু পুশকিন বুঝতেই পারছেনা তার বাবা কি জন্য এত আনন্দিত।সন্দীপের মুখে এতদিন শুধু তার সাফল্য অর্জনের ধারাবিবরণী অর্থাত এই প্রজেক্টে কাকে কাকে পিছনে ফেলে সে বিদেশ যেতে পারছে।এযে তার কতদিনের স্বপ্ন তা বলার নয়।মধু শুধু কাজ করে আর ভাবে কবে সেই দিনটা আসবে যবে সে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে।পুশকিনকে নিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে।সেই বিয়ের আগে যেমন মাকে জড়িয়ে শুত তেমনি শোবে।ছেলেটা হয়ত অবাক চোখে মাকে তার মায়ের আদর খেতে দেখবে।মনে মনে মধু লজ্জাই পায় ।তার স্বামী বিদেশ বিভূঁই যাচ্ছে আর সে মুক্তি চাইছে?এত সংকীর্ণ মন তার!নাঃ,বড্ড পুরনো কথা মনে পড়ছে আজ।সন্দীপ যে গাড়িতে রওনা দেবে সেটা এসে হর্ন দিচ্ছে।সন্দীপ শেষ মুহূর্তে সব দেখে নিয়ে খুব অনাগ্রহ নিয়ে মধুকে শুকনো আদর করে পুশকিনের গাল টিপে একটা বাজে রসিকতা করে বলে ফেলল,’কিরে ব্যাটা, বাপকে ভুলে যাবি নাত?’মধু যে খুব সাধারণ মেয়ে তার প্রমাণ আর একবার দিল।সে চোখের জল ফেলতে লাগল।সন্দীপ খুব ভারি ক্কি চালে তাকে সাবধানে থাকতে বলে রওনা হল।মধুর হঠাত মনে হল সন্দীপ দূরে চলে গেলে সে যতটা আরাম পাবে মনে করেছিল কৈ তাতো পেল না।আসলে সে সন্দীপের প্রভুত্ব সয়ে সয়ে এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে সব সময়ই মনে হচ্ছে এই বুঝি সে এসে কোন ফরমাশ করবে।হঠাত মধুর মনে হল যে এই ত ভাল হল সে আর পুশকিন কটাদিন স্বাধীন ভাবে কাটাবে।

মধুরিমা ভাবছে তার স্বামী এখনও আমেরিকার মাটিও ছোঁয় নি , আর সে এরই মধ্যে স্বামীর বিরহে কাতর হয়ে পড়ছে ,তবে এতগুলো দিন সে এখানে কাটাবে কি করে?

অথচ এই সে কিনা ভাবতে শুরু করেছিল যে তার স্বামী যতদিন না দেশে ফেরে ততদিন অন্তত সে খানিকটা স্বাধীন ভাবে থাকবে, পুরনো বান্ধবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে , সবথেকে বড়কথা ইচ্ছেমত ঠিক আগেকার কুমারী জীবনে ফিরে যাবার চেষ্টাটা অন্তত করবে। কিন্তু এক সকালের মধ্যেই সে যেন দমে গেল ,সে ভাবল সে এই জীবনের থেকে কখনই মুক্তি পাবেনা ,সেই ইচ্ছে ডানাটা বোধহয় কেউ নির্মম হাতে ছেঁটে দিয়েছে।হঠাৎ মোবাইলে টুং টাং শব্দ হল। এই রিং টোনটাও সন্দীপেরই পছন্দসই গানের সুর আর তারই ঠিক করে দেওয়া ।

মধু তাড়াতাড়ি গিয়ে ফোনটা রিসিভ করতে গিয়ে দেখল যে তার বাবা করেছেন।সে ভাবল বাবা তাকে নিয়ে খুব চিন্তায় পড়েছেন কারণ সে কখনোই একা থাকে নি।সে হাসি মুখে বলল ,” হ্যাঁ বাবা,বল ,ও ঠিক সময়েই বেরিয়ে গেছে ।”

বাবা বললেন ,” মধু ,তুই ঠিক আছিস ত মা? “

মধু একটু লজ্জা পেয়ে বলে,”হ্যাঁ বাবা,ঠিকই আছি ।তুমি এত চিন্তা করো না তো ?”

বাবার গলায় একটু যেন বিষণ্ণতার সুর …”তুই দাদুভাইকে আজ স্কুলে পাঠাস না।আর কারুর ফোন ধরার ও দরকার নেই ।টিভি খুলিস না এখন।আর কারুর ফোন ধরার ও প্রয়োজন নেই।।আমি আর তোর মা এখনই আসছি ।সব সামলে নেব।তুই একটু সাবধানে থাকিস।”

মধু ধপ্ করে খাটে বসে পড়ল ,মানেটা কি? বাবার কথা ত কিছুই বুঝতে পারল না। ছেলের ইউনিট টেস্ট চলছে ,এখন স্কুল কামাই ?কি যে করবে ও ভেবেই পেল না। কাজের মাসিও মধুর কাছে এসে দাঁড়ায়, ভাবে ফোনে কি এমন খবর এল যে বউদি এমনভাবে বসে রয়েছে? আজ কি রান্নাবান্না হবে না? মধুর মিষ্টি ব্যবহারে সে তাকে বেশ ভালই বাসে ,নির্ধারিত কাজের বাইরেও সে অনেক সময়েই এটা সেটা করে তাকে সাহায্য করে থাকে ।সে মধুর প্রতি সন্দীপের রূঢ় ব্যবহারও অনেক সময়েই মেনে নিতে পারে না, কিন্তু ছোট মুখে বড় কথা শোভা পায় না বলেই চুপ করে থাকে । আজ আবার কি ঘটেছে কে জানে?

এরপর মধুর বাবা মা ,থেকে শুরু করে পাড়ার প্রতিবেশী ,সন্দীপের অফিসের কলিগ সব এসে উপস্থিত হলে ওদের ছোটো ফ্ল্যাটটা লোকে ভরে গেল ।সবাই চাপা গলায় কথা বললেও ঘরদোর বেশ সরগরম হয়ে উঠলো ।

মধুরিমাকে সবাই মিলে সান্ত্বনা দিতে চাইছে , শুধু তার কারণটাই সে বুঝেই উঠতে পারছে না। ফ্যালফ্যাল করে সে সকলের মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে ।তার বাবা মেয়েকে কিছুতেই বোঝাতে পারছেন না, যে আমেরিকাগামী বিমানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে অহংকারী ছেলেটা যাত্রা করেছিল গতকাল ,শ-দেড়েক যাত্রীর সঙ্গে তাকে নিয়ে সেই বিমানটি এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে অতলান্তিকের অতলে তলিয়ে গেছে। সকালেই দূরদর্শনের সংবাদের জেরে এই মানুষগুলো এই বাড়িতে ছুটে এসেছে ।তবে সন্দীপের ঘনিষ্ঠদের মত হল এই সব ক্ষেত্রে অনেক সময়ে ত্রাণকার্যের পর অনেকেই বেঁচে ও যায় ।সুতরাং সন্দীপের ও বেঁচে ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে, অন্তত এমনটা আশাই করা যেতে পারে ।

সেদিন থেকেই মধু যেন নীরব দর্শক হয়ে গেল ,শুধু ছেলেটাকে বুকে আঁকড়ে বসে থাকে। আত্মীয় পরিজন ,সন্দীপের অফিসের কর্মকর্তারা ,তার সহকর্মী ,প্রতিবেশী সকলেই নানাভাবে অনুসন্ধানপর্ব চালিয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে ফিরল ।নিখোঁজের তালিকায় প্রথম দিকেই আছে সন্দীপ সেনের নাম।প্রথম কয়েকমাস মধুর বাবা বিশ্বনাথ বাবু ও মা মানসী দেবী মেয়ের সংসার সামলালেন ,কিন্তু বিশ্বনাথ নাথ বাবুর নিজেরও ব্যবসা আছে ।তিনি আর ব্যবসা পত্র, কাজকর্ম ছেড়ে মেয়ের কাছে থাকতে পারলেন না। ফলে স্বামীকে একলা ছেড়ে দিয়ে মানসীও মেয়ের কাছে পড়ে থাকতে পারলেন না।এঁরা চলে যেতে মধুরিমার এক অদ্ভুত অবস্থা হল।সে বুঝতে পারে তার বর্তমান অবস্থার গুরুত্ব ।শিশুপুত্রকে বড় করার দায়িত্ব এখন শুধুই তার।ধীরে ধীরে মানসিক স্থিতিশীলতা আয়ত্ত করল , শুধু তাই নয় সে সন্দীপের অফিসে গিয়ে তার প্রাপ্য অর্থ সংগ্রহ থেকে শুরু করে এল আই সি র টাকা সব কিছুই গুছিয়ে ব্যাঙ্কে রাখল।। ছেলের স্কুলে যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থাও করল।ছেলেকে সন্ধ্যায় পড়াতে শুরু করল আর তার এই নিজেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে দেখে তার মা বাবাও আস্বস্ত হলেন ।

আশ্চর্যের বিষয় হল এটাই যে মধুরিমা নিজে সন্দীপের কর্তৃত্বের বাইরে এসে নিজেকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করল ,নতুন করে চিনল , তার নবতর আত্মোপলব্ধি হল ।নিজের উপর বহুদিন আগের বিশ্বাসটা ফিরে এল, যা এই ক’বছরে সে প্রায় হারিয়ে বসেছিল ।সে যেন তার এই স্বাধীনতা ,একাকীত্ব সবকিছুকে উপভোগ করতে লাগল ,তবে খুব ধীরে ধীরে তার মধ্যে এই পরিবর্তনটা এল, তার সম্পূর্ণ অগোচরে ।সে এখন তার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজেই নেয় , ঠিক ভুল যাই হোক কাউকে তার জন্য দোষারোপ করেনা। পরবর্তী ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগায় ।

পুশকিনকে সে একটা দাবা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করে নিজেও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।বিশ্বনাথ বাবু দেখছেন তাঁর সহজ সরল নিরীহ মেয়েটা এতদিনে স্বামীশোক কাটিয়ে উঠে স্বাধীন ভাবে বাঁচতে চাইছে ,স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে ,তিনি এই বিষয়টি বেশ ভালভাবেই গ্রহণ করেছেন। তাঁরা আর কদিনই বা আছেন ,ওকে ত ছেলেকে মানুষ করতে হবে ,অনেক গুরু দায়িত্ব মেয়েটার কাঁধে এখন ।

মধু এখন ভালই কম্পুটার বা অত্যাধুনিক মোবাইল ফোন ও ব্যবহার করতে শিখেছে ।এখন ঘরে-বাইরে সে সমান স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে ।পুশকিনের লেখাপড়ার দায়িত্ব যদিও এতদিন সে একাই সামলেছে কিন্তু এখন সে একজন গৃহ শিক্ষকের সাহায্যের আবশ্যকতা অনুভব করছে। পুশকিনের পড়াশুনোর ব্যাপারে সে কোনও ঝুঁকি নিতে চায় না। সন্দীপের রেখে যাওয়া অর্থে তাদের দুটো মানুষের জীবন ভালভাবেই চলে যাবে আশা করা যায় , তারপরে ছেলে দাঁড়িয়ে গেলে আর চিন্তা কি? গৃহশিক্ষকের সহায়তায় পুশকিন আরও ভাল ফল করতে লাগলো। সে এখন স্কুলে লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে গান ,দাবা খেলা ইত্যাদিতেও বেশ সুনাম অর্জন করছে ।আসলে মধু তো এটাই চেয়ে এসেছে এতকাল যে একজন মানুষ তার শিক্ষা দীক্ষা সংস্কৃতি ও মানবিকতা নিয়েই পরিপূর্ণতা পায় ,এই গুণগুলো ছাড়া কি দু হাত দুপেয়ে প্রানীমাত্রকেই মানুষ বলা চলে? ছেলেকে তাই সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে গান শেখায় ,বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীত যা তার ছোটবেলা থেকেই খুব প্রিয় ।ভাল ভাল গল্প পড়ে শোনায় ,আবার ছেলের কাছ থেকেও তার পড়া গল্পকথা শুনতে চায়। এভাবেই মধু আর পুশকিনের দিনগুলো বেশ কাটছিল।

আজ ছেলের স্কুলের পিটি এম অর্থাৎ পেরেন্টস টিচার মিটিং ।কখনও যদিও ছেলের নামে স্কুল থেকে কোনও অভিযোগ আসেনি তবু কিছুটা উদ্বেগ নিয়েই মধু পুশকিনের স্কুলের গেটের ভিতরে পা রাখল ।তাকে দেখেই অন্যান্য ছেলে -মেয়েদের মায়েরা এসে ঘিরে ধরল ,পুশকিন কিভাবে এত ভাল রেজাল্ট করছে ,কার কাছে পড়ে ? এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তাদের জানা যে খুব দরকার ।কারন মধুরিমা কখনই এই মায়েদের আড্ডায় যোগ দেয় না ,সে তাহলে কিকরে একা একা সময় কাটায় ?স্বামীও ত নেই , তবে ছেলেকে একা কিভাবে এত সুন্দর করে গড়ে তুলছে -এটা তাদের গভীর কৌতূহলের বিষয় । কিন্তু শান্ত ভঙ্গিতে মিষ্টি হাসিতে তাদের এড়িয়ে মধু ছেলের ক্লাসরুমের দিকে দ্রুত এগিয়ে গেল। পুশকিনের রিপোর্ট কার্ড এগিয়ে দিয়ে তার শিক্ষিকা মিসেস সেনগুপ্ত মিষ্টি হেসে মধুকে বললেন,” আমি দিব্যকান্তির রেজাল্ট দেখে খুব খুশী হয়েছি। ও ভবিষ্যতে খুব ভাল মানুষ হবে,অবশ্য এর পিছনে আপনার অবদান বিরাট।এবারে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ও খুব সুন্দর গান গেয়েছে। শুধু তাই নয় ওর আর একটা গুন যেটা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হল অন্যকে যেকোনো ব্যাপারে সাহায্য করা। একদিন সৌম্যজিতের টিফিন পড়ে গিয়েছিল বলে ও কাঁদছিল ।অন্য ছেলে মেয়েরা কেউ হাসছিল ,আবার কেউ নিজের টিফিন মন দিয়ে খাচ্ছিল ,কেউই ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি, তখন আপনার ছেলে নিজের টিফিন সৌম্যকে জোর করে খাইয়ে দেয় ,একজন শিক্ষিকা এই খবর পেয়ে ওকে যখন বলেন,”তুমি ত কিছুই খেলে না।তোমার মা বকবেন না? “

ও তখন বলে ,” আমি যদি ওকে না খাইয়ে নিজে খেতাম তাহলেই মাম্মাম আমাকে সেলফিস বলত।”

মিসেস সেন আমি জানি অনেক বাধা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আপনাকে এই চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে কিন্তু আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব যাতে আপনি জয়ী হন। আমি আন্তরিক ভাবে দিব্যকান্তির সাফল্যও কামনা করি।”

মধু ভিতর থেকে উঠে আসা আবেগকে আর আটকে রাখতে পারল না। ওনার পায়ে প্রনাম করতে যেতেই উনি তাড়াতাড়ি ওর হাতদুটো ধরে ফেললেন। বললেন,” আমি যতটা পারি চেষ্টা করব যাতে এবছর দিব্যকান্তি স্কলারশিপটা পেয়ে যায় ।এটা আমাদের কর্তব্য ,এবার আপনি আসুন।”

ছেলের স্কুল থেকে একবুক আনন্দ আর ভরসা নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরল মধু, এসে দেখে তার বাবা নাতির সঙ্গে দাবাখেলায় নিমগ্ন ।মধুকে ফিরে আসতে দেখে দাদু নাতি দুজনেই খুব খুশী হয়ে উঠল ।মধু ছেলের ভালো রেজাল্ট এর কথা বলায় বাড়িতে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল ।মধু হাসিমুখে বলল,”এবার আর কোন কথা নয় ,সবাই খেতে এস।”

মধু যখন রান্নাঘরে খাওয়ার ব্যবস্থা করছে তখন দেখে বিশ্বনাথবাবু রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন ,মধু তাঁকে ওই ভাবে দেখে বলে, “কিছু বলবে বাবা?”

—-“হ্যাঁরে মামনি,দেখ পাঁচবছর তো হল সন্দীপ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ,এবার তুই একটু বাস্তবের দিকে মুখ ফেরা ।তোর মা বলছিল মেয়েদের তিরিশ পেরিয়ে গেলে ভাল পাত্র পাওয়া ভার হয়। তোরও তো ত্রিশ হল ,এবার কিছু একটা ভাব ।কারণ আমাদেরও তো বয়স হচ্ছে ।এর মধ্যে আমরা কেউ একজন চলে গেলে …………।”অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠে তিনি কথাটা শেষ করতে পারলেন না আর।

” কি ব্যপার বলত বাবা?”

__-“দেখ স্পস্ট ভাষায় তবে বলি যে তোকে আমরা আবার বিয়ে দেব। দাদুভাই এখনও খুব ছোট, ওকে তুই একা কিভাবে মানুষ করে তুলবি? এখন কেউ তোর ভার নিলে ওর পক্ষেও তাকে মেনে নেওয়া সহজ হবে।তুই আর না করিস না মা।ছেলে দেখা শুরু করি।”

__-“কি বলছ বাবা?”

মধু বোধহয় ঘরে বাজ পড়লেও এতটা চমকে উঠত না।সে এতটা জোরে চেঁচিয়ে উঠেছে যে পুশকিন ছুটে এসেছে।

_”বাবা,”ছেলেকে জড়িয়ে ধরে দৃঢ় কঠিন স্বরে মধু বলে,” পুশকিন আছে আমার ।আর কাউকে চাইনা আমার ।আবার বিয়ে? “

তার কন্ঠে ঝরে পড়ে তীব্র বিদ্বেষ , দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠে ,” বিয়ের পরের ক’বছর আমি মরে বেঁচেছিলাম বাবা। আর নয়।এখন আমি ছেলেকে নিয়ে স্বাধীনভাবে থাকব। নিজেদের পছন্দ অপছন্দ সব কিছু নিয়ে এই জীবনটা খারাপ কি বাবা? কারুর ভয়ে সিটিয়ে থাকি না আর,কেউ আমাকে চোখ রাঙায় না।এর  থেকেও কি বিয়ে করে ভাল থাকব বাবা ?”

বিশ্বনাথবাবু অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে ,কই ,এই মেয়েটাকে তো তিনি চেনেন না? এই কি তার সেই মুখচরা মধু?নাকি অকালে স্বামীকে হারিয়ে মেয়েটা মানসিক ভারসাম্য একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে? এ সমাজ ওকে এইভাবে মেনে নেবে?এখন যে মেয়েটার জীবনের পথচলা অনেকটাই বাকী?

তিনি মধুকে আবারও একবার বোঝাতে চেষ্টা করেন ,”দেখ মামনি ,তোর বিয়েটা কি খারাপ হয়েছিল? সন্দীপ কি খারাপ ছেলে ছিল? “

—” না ,বাবা, সন্দীপ ইঞ্জিনিয়ার ছিল, বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ,নিজেদের ফ্ল্যাট ,গাড়ি, সু-উপায়ী ,আর কি চাই?’

তার গলা দিয়ে ঝরে পড়ছে তীব্র অভিমান ,যন্ত্রণায় তার কণ্ঠস্বর বুজে আসছে।তবু সে কাঁপাগলায় বলে চলে ,”না , বাবা, আমার তোমাদের পছন্দসই পাত্রকে বিয়ে করার দরকার নেই।একাই থাকব আমি।তোমরা তোমাদের মত থাক না, আমাকে আমার মত থাকতে দাও ।”

— ” নাহ, তোকে একজন মনস্তত্ববিদের কাছে নিয়ে যাওয়া বড্ড দরকার ,আমি যে কি করি ? এই বয়সে এরকম ধাক্কা সহ্য করা কি কঠিন তা কি আমি জানি নারে? আচ্ছা তুই বল সন্দীপ একটু কঠোর স্বভাবের মানুষ ছিল ।কিন্তু তোকে নিয়ে ঘুরতে ও গেছে,শাড়ি -গয়নাওদিয়েছে, কখনও কি তোকে মারধোর করেছে?আসলে কি জানিস তোরা মেয়েরা কিসে যে ঠিক খুশি হস তা নিজেরাই জানিস না।”

–“বাবা ,আমি তোমাকে কিছুতেই বোঝাতে পারব না যে নির্যাতন শুধু শারীরিকই হয় না,মেয়েদের মন বলে একটা পদার্থ থাকে আর সেটা খুব স্পর্শকাতর ।সেই মানসিক নির্যাতন আমাকে নিত্য নিয়ত ক্ষইয়ে ক্ষইয়ে একটা যন্ত্রে পরিণত করেছিল ।এখন আমি বাঁচতে চাই বাবা।আমাকে নিজের মত বাঁচতে দাও। জীবনের রসায়নে অনুঘটকের অবস্থানটাও খুব জরুরি।এখন আমার জীবনে যে স্রোত বইছে তাতে আমিই একাকী দাঁড় বাইব। এখানে আর কোন পুরুষ সঙ্গীর প্রয়োজন নেই ।”

বিশ্বনাথবাবু কি বুঝলেন কে জানে ,ধীরে ধীরে হেরে যাওয়া এক সৈনিকের মত স্খলিত পদক্ষেপে ঘর থেকে বেরিয়ে পথে নামলেন। যাবার সময় নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফুটে বলে গেলেন,” ভাল থাকিস তোরা ।”

তিনি এটুকু বুঝলেন যে মেয়ে আর আগের মেয়ে নেই ,তার মধ্যে এক পরিণত মনস্কা নারী মাথা তুলেছে ,যে নিজের দায়িত্ব শুধু নয় সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালনেও সক্ষম ।

পুশকিন গোটা ব্যাপারটা দেখলেও কিছুই বোঝে নি, তবে এটুকু বুঝছে দাদুর সঙ্গে কথাবার্তায় মাম্মাম দুঃখ পেয়ে কাঁদছে। যেটা তার মোটেও পছন্দের নয়। সে মধুকে জড়িয়ে ধরে বলে ,”মাম্মাম চল আমরা সেই গানটা গাই যেটা আমাকে শিখিয়েছিলে–বলেই সে কচি গলায়ধরল———

“তোমার খোলা হাওয়া ,লাগিয়ে পালে

টুকরো করে কাছি আমি ডুবতে রাজি আছি

তোমার খোলা হাওয়া..

…….এবার মধুরিমা আর থাকতে না পেরে ছেলের সঙ্গে গেয়ে ওঠে —

“সকাল আমার গেল মিছে ,বিকেল যে যায় তারই পিছে গো

রেখো না আর কূলের কাছাকাছি আমি ডুবতে রাজি আছি

তোমার খোলা হাওয়া ….

।। সমাপ্ত ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *