মায়ের সংঘর্ষ – Mayer Songhorsho – Short Story – New Bengali Story

গতকাল নর্মদা নদীতে অস্থি বিসর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের ৮৬ বছরের সংঘর্ষময় জীবনের শেষ অস্তিত্বটুকু বিলীন হয়ে গেলো। মায়ের জীবনটা কেটে ছিল নিজের সঙ্গে সংধর্ষ করতে করতে। ক্লাস সিক্স পাস্ আমার মাকে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে করে শ্বশুর শাশুড়ি , ননদ , দেওর ভরা সংসারের হাঁড়ি ঠ্যালার দায়িত্ব নিয়ে জীবনের সংঘর্ষ শুরু করতে হয়েছিল। তারপর সংসারের স্বাদ পাওয়ার আগেই মা মাত্র ৩০ বছর বয়সের মধ্যে ছয় সন্তানের জন্মদিয়ে নিজের শেষ বিশ্রামটুকুও সংসারের কর্মকান্ডে বিসর্জন দিয়েছিলেন। তার পরেও মায়ের আরো দুই সন্তান হয়। এই আট সন্তান মানুষ করাটাই ছিল মায়ের জীবন সংঘর্ষ।
পুত্র কন্যার এই বড় সংসার সামলাতে মা যখন ব্যতিব্যস্ত , তখন আমার বাবা সংসারটা ওড়িশা থেকে উপড়ে নিয়ে এলেন কলকাতার উপকণ্ঠে। সেদিন বাবার সেই কলকাতায় ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার সুবিধার জন্য চলে আসার সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়াটাই ছিল মায়ের এক বিরাট পদক্ষেপ। নিজের চেনা গ্রাম গঞ্জ , আত্মীয় স্বজন সব ছেড়েছুড়ে এক নতুন ভাষা , নতুন সংস্কৃতির দেশে চলে আসা ছিল মায়ের সংঘর্ষ। কেবল নিজের জায়গা ছেড়ে চলে আসা নয় , নতুন করে ভাষা শেখা , সামাজিক রীতিনীতি জেনে নেওয়াটা সেই স্বল্প শিক্ষিত মহিলার কাছে সেদিন ছিল এক বৃহৎ সংঘর্ষ।
সময়ের সাথে সাথে ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজের বেড়া পার হচ্ছে , তখন তাদের সাথে পা মিলিয়ে চলার জন্য মাকে জেনে নিতে হচ্ছে কে কি পড়ছে , তার কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে রীতিনীতি কি , পাঠ্য বিষয়টা কি , পরীক্ষা পদ্ধতিটাইবা কি। মায়ের ছিল জিজ্ঞাসু মন। ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজ থেকে ফিরলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিগ্যাসা করে তবে মা তার জিজ্ঞাসু মনের চাহিদা মেটাতো। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আড্ডায় তাল মিলিয়ে চলার জন্য রোজ খবরের কাগজ পড়া , বাংলা সাহিত্যের দিকপালদের রচনা পড়া ছিল মায়ের প্রতিদিনের সংঘর্ষময় দিনগত পাপক্ষয় ।
মা চেঁচিয়ে বা জোর দিয়ে কোনো কিছুই বলতে পারতোনা। নিজের গলার নিচু স্বরে নিজের মতামত জানাতে কোনো কুন্ঠা করতোনা। তবে মা কোনোদিন সন্তানদের মতের বিরোধিতা করতোনা। কারণ মায়ের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শিক্ষিত সন্তানেরা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। হয়তো সেই কারণে মা জীবনে দুশ্চিনা কম করতো। কিন্তু এতো বড় সংসারের দায়িত্ব নিতে হলে মনে ভয় ভীতি সংশয় থাকাটা স্বাভাবিক ছিল। সেই সব মানসিক বাধা কাটিয়ে ওঠাটাই ছিল মায়ের সংঘর্ষ। বহিদিন মা নিজের মনের আশংকা দূর করার জন্য মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়ে যাচ্ছে তা না হলে নিজেকে ঠাকুর ঘরে পুজোয় ব্যস্ত রাখছে। ও ছিল এক নীরব সংঘর্ষ যা মাকে নিজের সঙ্গেও লড়তে হতো।
মা যদিও রোজ ঠাকুর পুজো করতো , কিন্তু মায়ের কোনো কুসংস্কার ছিলোনা। মা কোনোদিন তাগা , তাবিজ, মাদুলি বা পাথর পরাতে বিশ্বাস করেনি। সেই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে থেকে নিজেকে কুসংস্কারমুক্ত করে রাখাটাও ছিল এক জীবন সংঘর্ষ।
মোবাইল ফোন হাতে পাওয়াটা ছিল মায়ের টেকনোলজির সঙ্গে সংঘর্ষ করে জিতে যাওয়া। প্রতিদিন সব ছেলেমেয়েকে ফোন করে একটাই প্রশ্ন করতো “তোরা সবাই ভালো আছিস তো ?” এর উত্তর পেলেই মায়ের সব ইচ্ছাপূরণ হয়ে যেত। ফোনটা ছিল মায়ের বহিরদুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র। মায়ের সাথে সাথেই থাকতো সেই সস্তার মোবাইল। দূরত্বের পাঁচিল পার করে সবার কাছে যাওয়াটাও ছিল মায়ের প্রতিদিনের সংঘর্ষ।
বাবার প্রতি মায়ের ছিল অটল আস্থা। বাবার কোনো সিদ্ধান্তকেই মা বিরোধিতা করতোনা। বাবার সব সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াটাও ছিল এক ধরণের সংঘর্ষে জয়ী হওয়া।
মায়ের যেমন কুসংস্কার ছিলোনা , তেমনি কিছু দৃঢ় বিশ্বাসের সংস্কার ছিল। মায়ের দুটো দৃঢ় বিশ্বাস ছিল , (১) ভোরে উঠে পড়লে পড়াশুনা ভালো হয়। তাই মা সেই ভোর পাঁচটার মধ্যে চা করে নিয়ে এসে সব ছেলেমেয়ের ঘুম ভাঙিয়ে পড়তে বসার ব্যবস্থা করতেন। (২) পড়াশুনা করলে রেজাল্ট ভালো হতে বাধ্য। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মা তার এই দুই বিশ্বাস আমাদের ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলো বলে আজ যেটুকু আমরা ভাই বোনেরা জীবনে , দাঁড়িয়েছি তা সম্ভব হয়েছিল। সন্তানদের মধ্যে এই সহজ বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেওয়াটা ছিল মায়ের এক মস্ত সংঘর্ষ জিতে নেওয়া।
মা নিজে লেখা পড়া করতে পারেনি বলেই হয়তো লেখা পড়া ভালোবাসতো। বাবার সামান্য চাকরিতে এই বড় সংসারের দুবেলার অন্য সংস্থান করাটাই ছিল দুরূহ কাজ। মা তার শরীরে যেটুকু গয়নাগাঁটি ছিল সব একে একে খুলে বিক্রি করে আমাদের স্কুল কলেজের খরচ মিটিয়েছিলো। নিজের স্ত্রীধন একে একে বিক্রি করাটাও ছিল মায়ের নিজের সাথে করা এক সংঘর্ষ।
মা আমার অল্প শিক্ষিত হলেও ছিলেন নিজের উপর ওভার কনফিডেন্ট। নিজে স্কুল কলেজে যায়নি তবে বাবার হাত ধরে ছেলে মেয়েদের কলেজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সমাবর্তনে গিয়েছে। মা যদিও ক্ষীণ স্বাস্থ্যের ছিলেন কিন্তু কোথাও বেড়াতে যেতে হলে সব সময়ে এক পায়ে খাড়া। হেঁটে হেঁটে বেড়াতে ভালোবাসতো। সেটাও ছিল নিজের শক্তির সঙ্গে এক বড় সংঘর্ষ। মা কোথাও যেতে ভয় পেতোনা। তাই সত্তর বছর বয়সে মা একলাই আমেরিকা চলে গিয়েছিলো দিদির কাছে। নিজের আধো আধো ইংরেজিতেই সব কিছু ম্যানেজ করা ছিল মায়ের সংঘর্ষ।
বাবা যখন পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন , তখন শুরু হয় মায়ের শেষ সংঘর্ষ। মা একলা হাতে বাবার সব কাজ করতো। এমন কি ইংরেজি খবরের কাগজ পড়া পর্যন্ত। বাবার হাত কাঁপতো, তাই বাবা খবরের কাগজ হাতে ধরে পড়তে পারতেন না। মা পড়তেন বাবা শুনতেন। প্রথম প্রথম শব্দের উচ্চারণ ঠেকতো , বাবা উচ্চারণ ও অর্থ বুঝিয়ে দিতেন। মাস দুয়েকের মধ্যে মা ইংরেজি খবরের কাগজ গড়গড় করে পড়ে শোনাতে থাকলেন। সে ছিল মায়ের ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে সংঘর্ষ। মাও জীবনের শেষ দু বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। কিন্তু সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকার একাকীত্বর সঙ্গে সংঘর্ষ করার এক মাত্র অস্ত্র ছিল মায়ের বই পড়া। ছেলেমেয়েরা কেউ এলে গেলে তাদেরকে বই , পত্র, পত্রিকা নিয়ে আসতে বলতেন। মা শেষ পড়ছিলেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের রচনা সমগ্র।
আজ মা নেই কিন্তু খালি মনে পড়ে মায়ের সারা জীবন নিজের সঙ্গে লড়ে যাবার সংঘর্ষের কথা। আজ মা নেই , শেষ হয়ে গেছে মায়ের সব সংঘর্ষ। এখন খালি মনে হয়
“আজিকে হয়েছে শান্তি ,
জীবনের ভুলভ্রান্তি
সব গেছে চুকে ।
রাত্রিদিন ধুক্‌ধুক্‌
তরঙ্গিত দুঃখসুখ
থামিয়াছে বুকে ।
যত কিছু ভালোমন্দ
যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব
কিছু আর নাই ।
বলো শান্তি , বলো শান্তি ,
দেহ-সাথে সব ক্লান্তি
হয়ে যাক ছাই ।”
— রবীন্দ্রনাথ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *