প্রেম দিবস – Premer Golpo – Bengali Love Story – Golpo Bangla

প্রেম দিবস - Premer Golpo - Bengali Love Story - Golpo Bangla
Premer Golpo

দুপুরের খাওয়া সেরে ঘরে ড্রেসিং টেবিলটার সামনে বসে হাতে পায়ে মোমতেল ঘষছিলেন লতিকা দেবী , ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি ..তাও বেশ শীত পড়েছে আজ, ওনার স্বামী পেপার টা নিয়ে ছাদে চলে গেলেন রোদে বসে পড়বেন বলে,

গোড়ালির ফাটাতে মোমতেল ঘষতে ঘষতে নিজেকে একটু অন্যমনস্ক ভাবে আয়নায় লক্ষ্য করছিলেন তিনি, মাথার চুলে বেশ পাক ধরেছে, সিথির কাছের চুলগুলোও ভীষণ রকমের পাতলা হয়ে গেছে , চোখের তলায় হালকা কালির প্রলেপ, মুখের চামড়ায় সেই আগের মত লাবণ্য আর নেই, বয়সের সাথে সাথে ভারীও হয়েছেন আগের থেকে ,
কিন্তু একটা সময় কী সুন্দরী যে ছিলেন তিনি.. তা এখন তাঁর মেয়েকে দেখলেই বোঝা যায় , একসময় তার স্বামী তাকে আদর করে সবার আড়ালে লবঙ্গলতিকা বলে ডাকত,
সুন্দরী ছিলেন বলে ম্যাট্রিক দেবার আগে থেকেই বিভিন্ন জায়গা থেকে ভালোভালো বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করে, তাই ম্যাট্রিক আর দেওয়া হলোনা তার, ষোলো কী সতেরো বছর বয়সেই বিয়ে, তারপর সংসারের মধ্যে ডুবে যাওয়া …
তবে সেই বিশাল সংসারের চাপের মধ্যেও উনি …মাঝে মাঝেই সংসারের খরচ বাঁচিয়ে সবাইকে লুকিয়ে লতিকা দেবীর জন্য এটা ওটা কিনে আনতেন…
আর এখন !! অনেক আছে.. কিন্তু সেই আনার মনটা আর নেই..
যদিও এই বয়সে এসে বিশেষ কিছুই তো চাননি .. একটু মনোযোগ ছাড়া !!

একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন লতিকা দেবী , এমনিতে সংসারের যাঁতাকলে পড়ে আয়নায় নিজেকে লক্ষ্য করার সময় পান না বিশেষ , কিন্তু আজ নিজেকে লক্ষ্য করে ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল তার,

ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন বছরখানেক হলো, বৌমা আবার স্কুলের দিদিমণি, কোথায় ভেবেছিলেন একটা ঘরোয়া মেয়ে বৌমা হবে, যে তাঁর নিস্তরঙ্গ জীবনের দোসর হবে, দুজনে মিলে গল্প করবেন, একসাথে সারাদুপুর কাটাবেন, টিভি দেখবেন, একটু পরনিন্দা পরচর্চা করবেন,
তা নয়… ছেলে যে মেয়েটাকে ভালোবাসতো সেই বৌমা বিয়ের আগে এই বাজারেও দুম করে একটা চাকরি পেয়ে গেলো,
..অগত্যা আগের মতোই সক্কাল বেলা উঠে ওদের জন্য রান্না করে, টিফিনের জোগাড় করে দিতে হয়, ছেলের সাথে বৌমাও খেয়ে দেয়ে গট গট করে চোখের সামনে দিয়ে বেড়িয়ে যায়,
তিনি যদিও খারাপ শাশুড়ি হতে চাননা মোটেই ,বৌমা মেয়েটাও বেশ নরম সরম,

তবুও কোথায় যেন একটা নিঃসঙ্গতা কুরে কুরে খায় তাকে, সকাল থেকে সংসারের এটা ওটা সেটা করতে করতে কখন যে বেলা শেষ হয়েযায় বুঝতেই পারেন না.. ঠিক যেমন নিজেও যে কখন বেলাশেষে পৌঁছে গেছেন বুঝতেই পারেননি,

সকাল বেলা ছেলে বৌ বেড়িয়ে যায়, মেয়েটাও কলেজে চলে যায়, উনিও অফিসে যেতেন… ব্যাস সারাদিন তিনি একা একা ..|

@ঝুম্পা

উনি যখন রিটায়ার করলেন তখন লতিকা দেবী প্রথম প্রথম ভাবলেন এবার দুজনে একটু একসাথে সময় কাটাতে পারবেন নিশ্চই…
কিন্তু তা আর হলো কৈ?
উনি রিটায়ার করেছেন আজ বছর খানেক হলো ঠিকই ,
কিন্তু পুরুষ মানুষ দিনরাত ঘরে থাকলে যা হয় আর কী !! সে যে বয়সেই হোক.. দিনরাত খিটির মিটির লেগেই আছে..অসহ্য..
খুব রাগ হয় তাঁর,
একমুহূর্ত তাঁকে বসতে দেয়না মোটেই,
এটা কোরো, ওটা দাও, সেটা আনো…গাঁটে ব্যথা…দোলে দাও, কোমরে ব্যথা.. সেঁক দাও, উফফ….
কোথায় একটু পাশে বসে মনের কথা বলবেন, মাঝে মাঝে দুজনে একটু ঘুরতে যাবেন তা নয়, পাশে বসলেই ওনার ঘরকুনো বরের একেবারে হাত পা, কোমর যন্ত্রনায় ছেড়ে যায় , তারমানে মালিশ করে দাও, যদিও উনিও মাঝে মাঝে মালিশ করে দেন লতিকা দেবীকে..তবে সে খুবই কম,
একেবারে যতক্ষন না লতিকা দেবী কোমরের যন্ত্রনায়… “বাবাগো মাগো” না করেন ..|

মালিশ পর্ব শেষ হলেই উনি টিভির খবর, খেলা, গল্পবই, পেপার নিয়ে বসে যান…লতিকা দেবী এটা ওটা জিজ্ঞেস করলে” হুঁ হ্যাঁ “তে উত্তর সেরে দেন, দুটো মনের কথা কী বলতে নেই?

আজ যেন কী… ভ্যালেসটাইন দিন… না কী যেন নাম ,বাপের জম্মে শোনেননি তিনি, মেয়ে তো বললো প্রেমের দিন..ভালোবাসার দিন,
তাই মেয়ে সুন্দর করে সেজে গুজে বলে গেলো বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাবে,
অন্যদিন তাও সন্ধ্যেবেলায় ফিরে আসে মেয়ে, কিন্তু আজ দেরি হবে বলে গেলো … প্রেম ভালোবাসার দিন বলে ছেলে বৌমাও বলে গেলো সিনেমা দেখতে যাবে আজ,…উনিও প্রতিদিনের মতো একটু পরে বন্ধুদের সাথে চা এর আড্ডায় হাঁটা দেবেন …রাত নটার আগে এমুখো হবেননা,

লতিকা দেবী যেই একা সেই একা.. ওনার জীবনে আর কোনো শখ আল্হাদ নেই, কেউ তাঁর কথা ভাবেনা…তিনি যেন সংসারের এক যন্ত্রের মতো, তিনি যে একটা মানুষ, তাঁর ও যে ইচ্ছে হয় একটু বাইরে ঘুরতে, সিনেমা দেখতে.. কেউ ভাবেনা সেটা, তাঁর কথা ভাববার সময় কোথায় সবার! সবাই যে ভীষণ ব্যস্ত আজকাল, ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেলো তাঁর..|

একটা ভালো শাড়ি পড়ে বেড়িয়েগেলেন তিনি, মনটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না আজ, অনেক চেষ্টা করছেন নিজেকে বোঝাতে.. কিন্তু কোথা থেকে একরাশ অভিমান যেন তাকে গ্রাস করেছে, কাউকেই ভাবতে হবেনা তার কথা, তিনি একা একাই ঘুরবেন,…কাউকেই দরকার নেই তাঁর..|

অনেক দিন পড়ে খুব চকলেট খেতে ইচ্ছে হলো , একটা বড়ো চকলেট কিনে পার্স খুলে টাকা দিতে গিয়ে দেখলেন রাগের চোটে ফোন টাই আনতে ভুলে গেছেন তিনি, তারপর ভাবলেন… যাকগে, সারাদিনে কে আর তাঁর খোঁজ নেয়? তাই ভালোই হয়েছে ফোন ফেলে এসেছেন…|

হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে পৌঁছে যান তিনি, সারা নদীর ধার জুড়ে আজ রংবেরঙের মেলা ,
জুটিতে জুটিতে বসে আছে সব অল্পবয়সের ছেলেমেয়েরা…কেউ মুখোমুখি, কেউবা হাত ধরে..কেউ কেউ একটু বেশিই সাহস দেখিয়েছে কাঁধে মাথা রেখে…
মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন তিনি, বেশ ভালোলাগছিলো তাঁর,
মনে পড়লো..মেয়ে বলেছিলো আজ প্রেম করার দিন, ভালোবাসার দিন,
হাসলেন তিনি, ভালোবাসার আবার আলাদা করে দিন হয় নাকি !!বিয়ের প্রথম প্রথম উনি প্রায় রাত্রে অফিস থেকে আসার সময় রজনী গন্ধার স্টিক আনতেন বাড়ির লোককে লুকিয়ে ,কারণ রাজনীগন্ধা লতিকা দেবীর ভীষণ প্রিয়,
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবলেন মন খুলে আজ প্রেম করে নে তোরা, কারণ জীবন থেকে প্রেমটা বড্ড তাড়াতাড়ি চলে যায় …|

কতক্ষন যে নদীর ধারের জোড়া বট তলায় বসে ছিলেন এই ঠান্ডার মধ্যে হুশ ছিলোনা তাঁর.. হুস ফিরলো বাইকের আওয়াজে.. কত রাত তাও জানেননা, নদীর ধার আগের থেকে ফাঁকা, উঠতে যাবেন..বাইক থেকে নেমে এলো তাঁর ছেলে..

নিঃশব্দে ছেলের বাইকের পিছনে উঠে বসলেন তিনি…
সারা রাস্তায় ছেলে আর কোনো কথা বলেনি, শুধু মনে মনে ভাবছিলেন তিনি… ছেলের এখনো মনে আছে এ জায়গার কথা ! ছেলে যখন বেশ ছোট ছিলো… একবার তিনি ওনার উপরে এমনি ভাবে একা রাগ করে এখানে এসে বসেছিলেন, সেদিনও ছেলে সাইকেল নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে এসেছিলো!! বুকটা প্রশান্তিতে ভরে গেলেও চোখে জল চলে এলো তাঁর..এখনো ছেলে ভোলেনি তাহলে..

বাড়ি ঢুকেই দেখলো মেয়ে, বৌমা সবাই বসে আছে ডাইনিং হলে.. চিন্তিত, বিদ্ধস্ত..

মা কে দেখেই মেয়ে দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো.. “বাবা… মা এসেছে…”
তারপর মাকে জড়িয়ে ধরে বলল “কোথায় গিয়েছিলে মা? ফোন নিয়ে যাওনি কেন..?”

বৌমাও এগিয়ে এসে বললো “আমরা খুব চিন্তা করছিলাম মা, আপনি এমন তো কখনো করেননা, “
মেয়ের ডাকে ঘর থেকে বাইরে এলেন উনি..

স্বামীর দিকে আরচোখে একপলক দেখেই পাত্তা না দিয়ে লতিকা দেবী বাথরুমে হাত পা ধুতে ধুতে বললেন.. “আমি যে রোজ চিন্তা করি, অপেক্ষা করি সবার জন্য?? আমার জন্য একদিন না হয় সবাই করলে চিন্তা “|

উত্তর শুনে সবাই বুঝলো পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো..তাই সবাই চুপ করে রইলো,

পরিস্থিতি সামাল দিতে বৌমা তাড়াতাড়ি করে সবার জন্য রাত্রের খাবার জোগাড় করতে করতে বললো.. “আমরা অনেক তাড়াতাড়ি চলে এসেছি মা, সিনেমা দেখতেও যাইনি.. ইচ্ছে হলো সবাই একসাথে আজকের সন্ধ্যেটা কাটাই..”

…তারপর একপ্লেট মোমো নিয়ে তাঁর হাতে দিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন.. “আপনার ফেভারিট”..
বৌমার মিষ্টি হাসি দেখে মনটা বেশ ভরে গেলো লতিকা দেবীর .. প্লেট টা হাতে নিয়ে চোখ দিয়ে ভুরুর ইশারায় স্বামী কে দেখিয়ে বৌমাকে বললেন .. “আর সবাই খেয়েছে?”
ছেলে বললো.. “সবার আছে মা..তুমি শুরু কোরো “
“না একসাথে খাবো ” বলে প্লেট টা টেবিলে রেখে দিলেন…
মেয়ে এসে মায়ের পাশে বসে বললো “ওমা রাগ করোনা, বৌদি ফোন করতে আমিও চলে এসেছিলাম, দেরি করিনি দেখো”.. বলে একটা ডার্ক চকলেট ভেঙে লতিকা দেবীর গালে দিল…

@ঝুম্পা
মেয়ের আল্হাদিপনায় একটু সাহস পেয়ে লতিকা দেবীর স্বামী মিনমিন স্বরে বললেন.. “ফোন নিয়ে যাওনি কেন? রাত সাড়ে আটটা বাজে, আমরা ঘন্টাখানেক ধরে আশেপাশের আত্মীয়স্বজনএর বাড়িতে ফোন করে করে তোমাকে খুঁজছি,
শেষে বাবু বাইক নিয়ে বের হলো খুঁজতে, এমন ছেলেমানুষি কেউ করে !! পাশের বাড়িতে চাবি দিয়ে গেলে অথচ ওদের কিছু বলে যাওনি, তাছাড়া তুমি হাই প্রেসারের রুগী.. কোথায় কি হয়ে যায় ! একবারও মনে হয়নি চিন্তা করতে পারি আমরা? “

স্বামীর কথা শুনে মুখ বেঁকিয়ে বললেন.. “বেশ করেছি ফোন নিয়ে যাইনি , উউউ… যেন কত্ত চিন্তা করেন আমার !! “

বলেই গলার কাছে ঠেলে আসা কান্নাটাকে আটকানোর জন্য নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়েই দরজার কাছে থমকে গেলেন.. সারা ঘর জুড়ে ম ম করছে তার প্রিয় রজনীগন্ধার গন্ধ… বিছানার উপরে পড়ে আছে এক গোছা রাজনীগন্ধার স্টিক…

পিছনে উনি এসে দাঁড়ালেন…. কিন্তু কিন্তু করে বললেন “বাইরে গিয়ে দেখলাম সবাই প্রেম করছে, ভালোবাসছে.. আজ নাকি প্রেমের দিন.. ভাবলুম ভালোতো সবসময় বাসি… কিন্তু অনেক দিন প্রেম করিনি আমার লবঙ্গলতিকার সাথে.. তাই আবার স্টেশনে গিয়ে রজনীগন্ধা কিনে এনেছিলাম..”

লতিকা দেবীর মনটা বেশ নরম হয়েগিয়েছিল ছেলে মেয়ে বৌমার আন্তরিকতায়, এইটুকুই তো চেয়েছিলেন তিনি,
স্বামীর দিকে মিষ্টি হেসে রজনীগন্ধার গন্ধ মন দিয়ে নিয়ে তিনি অনুভব করলেন কিছু কিছু প্রেম কখনো শেষ হয়ে যায়না, প্রেম পরিবর্তিত হয়ে সুপ্ত থাকে ওই কোমর ব্যথায়, হাঁটু ব্যথার উপরে হাত বুলিয়ে দেওয়ার স্পর্শে ..|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *