চরিত্রহীন – charitraheen – Read & Download Bengali Uponnash – Bengali Novel online – Golpo Bangla

মেয়ে মানুষ দেখলেই রতনের জিহ্বায় জল আসে।একলা মেয়ে মানুষ দেখলেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে মন চায়!কিন্তু তা সম্ভব নয় বলে নিজের মতো তাকে নিয়ে কত রকম বিশ্রী চিন্তা ভাবনা রতনের মাথায় শুরু হয়ে যায়। একবারে যৌবন শুরু হবার পর থেকেই এমনটা তার হয়ে এসেছে।

তার মাথা জুড়ে এমন চিন্তা সবসময় ঘুরপাক খায়। মাঝে মাঝে শহরে গিয়ে নিষিদ্ধ পল্লী থেকে বেড়িয়ে আসে কিন্তু তাতে কি তার সাধ মেটে। সে যে সবসময় ক্ষুধার্ত বাঘের মতোই খিদে নিয়ে ঘুরে!

মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে এর তার উড়না ধরে টান মারে। চড় থাপ্পড়ও কম খায়না। তাতে কি তার স্বভাব পাল্টে? পাল্টে নাহ!

আরও নতুন উদ্যমে সে খুঁজে ফেরে তার শিকার। একদিন এমনই একটা সুযোগ সে পেয়ে যায়। বড়োই সহজ শিকার!

সকিনাদের বাড়ি গাঁয়ের শেষ মাথায়। গরীব মানুষ এঁরা। বাবা দিনমজুর। মা পরের বাড়ি কাজ করে। রতন দের বাড়িতেও সকিনার মা কাজ করে। তাই আজ সুযোগ বোঝেই রতন শিকার করতে এসেছে। সকিনা ১৫, ১৬ বছরের উঠতি মেয়ে। সেদিন মায়ের সাথে রতনদের বাড়িতে গিয়েছিল। মায়ের অসুখ ছিলো তাই মায়ের বদল সে কাজ করতে গিয়েছিল। রতন তাকে দেখে সেদিন বাড়ি থেকে কোথাও যায়নি। ওর পাশে ঘুরঘুর করছে। কিন্তু কোন সুযোগ পায়নি। তাই তার মনে ইচ্ছে মনেই রয়ে গেছে।

এটা সেটা দিয়ে সকিনার গায়ে সে হাত দেবার চেষ্টা যে করেনি তা নয়। কিন্তু মেয়েটি বড়োই চালাক তাকে কৌশলে এড়িয়ে গেছে। রতন জোর করেনি যদি চিৎকার করে তবে তার মা জেনে যাবে। আর মা জানলে বাবা তো জানবেই। তার বাবা গ্রামের গন্যমান্য ব্যাক্তি। এসব শুনলে রতনের আর রক্ষা নেই! আর কাউকে না হোক বাবাকে সে ভীষণ ভয় পায়।

আজ সকিনার মা তাদের বাড়িতে রাত অবধি কাজ করবে। তার বাবা দিনমজুরি করতে পশ্চিম অঞ্চলে গেছে। তাই বাড়ি এখন ফাঁকা। এই তো সুযোগ রতনের শিকার করার জন্য । রতন চোরের মতো চারিদিকে নজর বুলিয়ে দেখে কেউ কোথাও আছে নাকি?  এদিকে বিকালের পর বেশি মানুষ থাকে না। দু’একজন যারা আছে তারা তারাহুরো করে কাজ শেষ করছে বাড়ি যাবার জন্য। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফসলের ক্ষেত। বাড়ি ঘর একটা থেকে আরেকটা দুরত্ব অনেক।  শিতের সন্ধ্যা তারাতাড়িই চারিদিক অন্ধকারে পরিপূর্ণ করে তোলে। আর একটু পরে খোলা জায়গায় এক হাত দূরেও দেখতে কষ্ট হবে।

এমন সময় রতন সকিনাদের উঠানে দাঁড়িয়ে ডাক দেয় সকিনা! সকিনাদের একটা ভাঙাচোরা ঘর। তার ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসে সকিনা। সকিনা আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করে রতন ভাই!  হুম এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই দেখতে এলাম চাঁচি কি করে। সকিনা বলে, মায়ে তো আপনা গো বাড়ি। কইলো আইজ দেরি হইবো আইতে। রাহেলা বু নাকি আইছে তাই পিঠা বানাইতে হইবো। রতনের বড় বোন রাহেলা বাপের বাড়ি এসেছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। তাই পিঠা পুলির আয়োজন চলছে। রতন তো জানেই।

রতন খেয়াল করে সকিনার একটা জামা তাতেও কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। শরীরের বিভিন্ন জায়গা দেখা যায়। অতি দরিদ্র এরা। রতন জিজ্ঞেস করে তোমার আর জামা নাই?  সকিনা লজ্জা পায় এই কথায়! ওর শরীরটা যে রতন চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে তা সে বুঝতে পারে। এর নামে সে অনেক কিছু অনেকের কাছে শুনেছে। তাই তার হাত পা কাঁপছে। রতন বলে তোমারে একটা জামা কিনা দিমু। সকিনা বলে, লাগবো না। আমার আরেকটা আছে।

রতন বলে, তোমার ছেঁড়া জামায় যে শরীর বেড়িয়ে আছে। সকিনা জবাব দেয়, বাজান আইলে সামনে হাঁটে নতুন জামা কিনা দিবো। এখন আপনে যান। বাড়িতে কেউ নাই মানুষ দেখলে কি কইবো? হুম জানি এদিকে সন্ধ্যার পরে তেমন মানুষ জন আসে না। তাতে কি হয়েছে আমি আছি না!  চাঁচি আসুক পরে না হয় আমি যামু? একথা,শুনে সকিনার গলা শুকিয়ে যায়। কি কন রতন ভাই?  আমি একলা থাকতে পারুম। আপনে চইলা যান।

এই তুমি এতো ভয় পাও ক্যান সকিনা? সকিনা বলে, আমরা গরীব মানুষ একবার কেউ দেখলে মুখের উপর কথা কইতে ছাড়বোনা। আপনে যান রতন ভাই! আমি  চাইনা আমার নামে গ্রামের মানুষ হাসুক।  না আমি এখন যামুনা সকিনা! জিদ ধরে বলে রতন!

তোমার যদি বদনাম হয় তো আমি আছিনা।কি করবেন আপনে? ক্যান বিয়া করমু তোমারে। নাহ্ রতন ভাই!  আমরা গরীব মানুষ। আপনেরা কত ধনী মানুষ। এই সব কথা কেউ শুনলে আমারে থুথু দিবো। আমার এতো লোভ নাই!

রতন বিরক্ত হয়ে বলে, আচ্ছা! আচ্ছা!  যাইতাছি। শিতের দিন খালি তেষ্টা পায়। এক গ্লাস পানি দেও তো। গলাটা শুকিয়ে একেবারে  কাঠ হইয়া গেছে। সকিনা তারাতাড়ি এক গ্লাস পানি এনে দেয়। এতো কাছে থেকে সকিনার যৌবন দেখে রতনের মাথাটা ঘুরে যায়। পানিটা কোন মতো শেষ করে বলে, তুমি খুব সুন্দর সকিনা! সকিনা তার ওড়না দিয়ে সারা শরীর ঢাকার বৃথা চেষ্টা করে।

রতন বলে তুমি এতো সুন্দর আগে বুঝতে পারি নাই। সেদিন আমাদের বাড়ি তোমাকে দেখে আমার মাথা ঘুরে গেছে!
সকিনা প্রায় কেঁদে বলে, রতন ভাই আপনের দুইটা পায়ে পড়ি চইলা যান। রতন আরও এগিয়ে গিয়ে সকিনার মাথায় হাত দিয়ে বলে, কাঁদো কেন? সকিনা রতনের হাত ছুড়ে মারে। রতন ভাই আমি কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করলে চিৎকার দিমু।
রতন হেঁসে বলে দেও চিৎকার। কার তাতে সর্বনাশ হবে,আমার না তোমার?

রতন আরও এগিয়ে যায় সকিনার কাছে। সকিনা রতনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু পেরে উঠে না। রতন সেই সুযোগটা কাজে লাগায়। সকিনাকে ধরে বিছানায় ছুড়ে মারে। সকিনা কাঁদে ও রতন ভাই!  আপনের দুই পায়ে ধরি। আমরা গরীব মানুষ। এমন কইরেন না।আমার গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবোনা।

 সকিনার ছেঁড়া কাপড় আরও ছিঁড়ে যায়। সকিনা চিৎকার করে না সমাজের ভয়ে! সেই সুযোগ নিয়ে রতন তার কামনা বাসনা পূর্ণ করে।

সকিনা কেঁদে বলে, রতন ভাই এইডা কি করলেন?  আমারে এখন কেডায় বিয়া করবো। আমি যে নষ্ট হয়ে গেলাম। রতন ধমক দিয়ে বলে, এতো চিন্তা কিসের আমি আছিনা। প্রয়োজন পড়লে আমি বিয়া করুম তোমারে। সকিনা বলে তাই লে এখনি আমারে নিয়া চলেন।
তোমার মাথা খারাপ হয়েছে সকিনা? তোমারে এখন নিয়ে গেলে বাজান আমারে কাইটা দুই টুকরো করবো। সময় মতো তোমারে ঘরে তুলবো। কবে সময় হইবো রতন ভাই?

তাইলে এতোদিন কি হইবো আমার, রতন ভাই!  আমি তোমার খুঁজ খবর নিয়া যামু। পকেট থেকে কতগুলো টাকা বের করে বলে, জামা কিনবা। বিছানার উপর টাকাগুলো পড়ে রইলো। সকিনা দুই হাঁটুর মাঝে মাথা লুকিয়ে কাঁদছে। রতন জিজ্ঞেস করে আয়না আছে?  মাথার চুল গুলো  কেমন অগোছালো হয়ে গেছে। সকিনা উঠে না। রতন বলে থাক লাগবোনা।

নিজের হাত দিয়ে মাথার চুল ঠিক করে বলে, চিন্তা কইরোনা সকিনা। আমি তোমার খুঁজ খবর নিতে মাঝে মাঝে আসমু। রতন মনের সুখে গান গাইতে গাইতে চলে গেল।

অনেক রাতে সকিনার মা বাড়ি এলো। সকিনা কে ডাকে কিন্তু কোন উত্তর নাই। বাড়িটা ভুতের বাড়ির মতো হয়ে আছে!  না আছে পাকঘরে বাতি। না আছে ঘরে। তেল তো শেষ হয় নাই। তবে মেয়েটা কোথায় গেল? বাড়ি ঘরে আলো জ্বালেনি কেন?  ও সকিনা! কোথায় গিয়ে মড়লি অভাগীর বেটি! সকিনা ককিয়ে উঠে। সেই শব্দ শুনতে পেয়ে সকিনার মা!  হুশ হারিয়ে ফেলেন। পিঠের হাঁড়িটা বারান্দায় রেখে অন্ধকারে পরিপূর্ণ ঘরে দৌড়ে প্রবেশ করেন।

পিঠের হাঁড়িটা মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পিঠেপুলি মাটিতে পড়ে রইলো।যেমন পড়ে আছে সকিনা বিছানার উপর  তার সম্ভ্রম ভাঙার পরে। অন্ধকারে হাতরিয়ে মেয়েকে খুঁজে বের করেন তার মা। মেয়েটা কেমন নিথর হয়ে পড়ে আছে। মা আর্তনাদ করে উঠে নিজের অজান্তেই।
ও সকিনা বলে চিৎকার করে বুকে জড়িয়ে ধরে মেয়েকে তিনি।

 সকিনা অন্ধকারে বিছানার উপর শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মা মেয়ের পিঠে হাত দিয়ে বুঝতে  পারে মেয়ে তার কাঁদছে। কিন্তু কেন এমন ভাবে কাঁদছে বুঝতে পারলেন না?

মা সকিনা! কি হইছে মা!অমন করে কান্দস কেন মা? তবুও সকিনা কেঁদে চলে কোন জবাব দেয় না। সকিনার মা তারাহুরো করে কেরোসিনের কুপি বাতিটা জ্বালায়। দেখতে পায় মেয়ের মাথায় চুল এলোমেলো। কাপড়টা ছেঁড়া!  মায়ের মন অজানা আতংকে আতংকিত হয়ে উঠে।

মেয়েকে তুলে ঝাঁকি দিয়ে বলে, কি হইছে আমারে খুইলা কও মা! আমি যা ভাবতাছি তা তো না মা? সকিনা কেঁদেই চলেছে। সকিনার মা এবার মেয়ের গালে ঠাস করে চড় মেরে বলে, কথা কস না কে সকিনা? আরে পুড়া কপালী অভাগীর বেটি! তোর জবান কি বন্ধ হয়ে গেছে?

সকিনা এবার মায়ের শরীর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে, মা! মাগো! কি হইছে সকিনা আমারে ক মা? মাগো রতন ভাই আইছিল।  মা ভ্যাবাচেকা খেয়ে জিজ্ঞেস করে তো কি হইছে? সকিনা কেঁদে চলে। মা চিন্তিত হয়ে বসে পড়ে। রতন কি করছে সকিনা? মাগো রতন ভাই জোর করে আমার। মা এবার না বলা কথা বুঝতে পারে। এবার মা সকিনাকে জড়িয়ে ধরে বলে, কস কি সকিনা? রতন তোর সাথে জোর জবরদস্তির করছে?

এবার সকিনা উচ্চ স্বরে কেঁদে উঠে কেঁপে কেঁপে বলে, আমার সব শেষ মা! সকিনার মা এবার বাঘিনীর মতো হিংস্রতার সাথে বলে, আমি ছাড়ুম না সকিনা! এর উচিত বিচার আমি কইরা ছাড়ুম।

আমি এর বিচার মাতবরের কাছে চামু! সকিনার মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, তুই তারে ঘরে আইতে দিলি কে? কি করমু মা! সে জোর কইরা ঢুইকা পড়লো। তারে ধাক্কা দিলাম কিন্তু পারলামনা!
সকিনা কেঁদে কেটে বুক ভাসিয়ে দেয়। সকিনার মা চেঁচিয়ে বলে চুপ অভাগীর বেটি!  সব হারায়ে এখন কাইন্দা কি হইবো।
শক্ত কর মনরে।

জামাটা পাল্টাইয়া চল যামু রতনের বাপের কাছে। দেখি রতনের বাপ কি কয় আর কি করে?  সকিনা কেঁদে বলে মা! রতন ভাই কইলো আমারে চিন্তা না করতে সে আমারে বিয়া করবো।  সকিনার মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, এই কথায় লোভে পড়ে তুই?  না মা! যাওনের সময় কইয়া গেল। রতন পোলাডা ভালা না! ওর কথার দাম নাই। সকিনা বলে, মাগো বাজান আগে আসুক পরে না হয় আমরা যামু? নাহ্ এখুনি যামু!

সকিনার মা আবার বলে মেয়েকে না থাক, কাপড় পাল্টানোর দরকার নাই। এই কাপড়েই তোরে রতনের বাপের কাছে নিয়া যামু। নিজের চক্ষে তার পোলার অপকর্মের চিহ্ন সে দেখুক। সকিনা আঁতকে উঠে  কেঁদে বলে, মাগো এমন কাপড়ে মাইনষের সামনে আমি যাইতে পারুম না! তুমি জোর করলে আমি গলায় দড়ি দিমু। সকিনার মা ট্রাংকের ভেতরে স্বযত্নে রাখা চাদরটা বের করে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, এইডা গায়ে জড়াইয়া নে সকিনা!
সকিনা চাদরে সমস্ত শরীর ঢেকে মায়ের সাথে ঘুটঘুটে অন্ধকারে পরিপূর্ণ পথে পা ফেলে। নিজের খোয়া যাওয়া সম্মান ফিরে পাবার জন্য। এর সঠিক বিচার পাবার জন্য। কিন্তু গরীব মানুষ কি সঠিক বিচার পায়? দেখা যাক ওরা মা মেয়ে সমাজের উঁচু তলার মানুষের কাছে থেকে নিজের জন্য সঠিক বিচার পায় কি না?

সকিনার মা মনে করেছিলো এই অন্ধকার পথে তাদের কেউ দেখবেনা। কিন্তু তবুও তারা মানুষের সামনে পড়ে নানান প্রশ্নের সম্মূক্ষীন হয়। এটা সেটা বলে নিজেদের সম্মান বাঁচিয়ে তারা রতনের বাপ মন্ডলের বাড়ি হাজির হয়। তখন রাত গভীর হয়ে গেছে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু ঘুম নাই সকিনা ও তার মায়ের চারটি চোখে। পেটে তাদের আজ ক্ষুধাও নাই। থাকলেও তারা তা উপলব্ধি করতে পারছেনা। দানাপানি না পড়লেও অনেক দুঃখ বেদনার নির্জাস সেখানে জমা হয়ে আছে।

সকিনার মা মন্ডলের ঘরের দরজায় করাঘাত করে। শীতের রাত সকাল সকাল সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর একটুতেই উঠতে মন চায়না! কিন্তু যার কাঁধে বিপদ তার আর  কি শীত কি গরম?
মন্ডলের কানে কষাঘাতের শব্দ পৌঁছে কিন্তু তিনি গায়ের লেপটা আরও শক্ত পোক্ত করে শরীরের সাথে জড়িয়ে নেয়।  কিন্তু তার তো জানা নাই এই করাঘাত থামবার নয়! সকিনার মা! করাঘাত করেই চলেছে। একসময় বিরক্ত হয়ে মন্ডল জিজ্ঞেস করে, এতো রাতে কে কড়া নাড়ে।

আমি সকিনার মা! দরজাটা খুলেন মন্ডল সাহেব!  কাল সকালে এসো সকিনার মা! এখন শুয়ে পড়ছি উঠতে পারুম না। কিন্তু মন্ডল সাহেব আমার খুব দরকার। আহা! বিরক্ত করোনা। যা দরকার কাল শুনে মিটিয়ে দেব। এখন ঘুম পেয়েছে বিরক্ত করোনা যাও। মন্ডলের বউ বলে দেখেন না কি দরকার?  সকিনার মা আমাদের পুরোনো ঝি! তার কথা আমাদের শুনা উচিত। এমন তো হতে পারে বেচারি অনেক বিপদে পড়েই এসেছে।

মন্ডল রেগে আহ্ তুমি মাঝখানে কথা বলোনা তো। ওদের বিপদ বলতে তো টাকার অভাব!  সকিনার মা আবার করাঘাত করে বলে, মন্ডল সাহেব দরজা না খুললেন। আমি মাতবরের কাছে যাইতাছি রতনের বিচার করার জন্য!  এই কথা শুনে মন্ডল দরজা খুলে জিজ্ঞেস করে রতন কি করলো? তার নিজের অজান্তেই মনের ভিতর একটা শংকা জেগে উঠে। তার যে ছেলে না জানি কি অঘটন ঘটিয়েছে? মন্ডলের বউ লাইট অন করে।  ঘর আলোকিত হয়ে যায়। সকিনাকে মায়ের সাথে দেখে জিজ্ঞেস করে মন্ডল, একে এতো রাতে এখানে নিয়া আইছো কেন?

দরকার আছে তাই আনছি। আপনার কু পুত্র কি করেছে দেহেন। এই বলে সকিনার মা সকিনার চাদরটা শরীর থেকে টান মেরে খুলে ফেলে। সকিনার মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ওর বাঁইচা থাকার মতো কিছু আর রাখে নাই রতন! মন্ডল সাহেব সকিনার মায়ের দিকে করুন ভাবে তাকিয়ে বলে, ওর শরীর ঢেকে দাও সকিনার মা!  আর শোন যা বলার আস্তে আস্তে বলো বাড়িতে আমার মেয়র জামাই আইছে। সকিনার মা কেঁদে বলে, সেইটাই তো আমার কাল হইছে। আপনের বাড়ির আনন্দ বাড়াইতে রাত ভর পিঠে বানাইলাম। আর এই সুযোগে আপনের পোলা আমার সারা জীবনের শান্তি নষ্ট করে দিলো!

সকিনার মা সবই আস্তে আস্তে বলে গেল। মন্ডল সব শুনে বলে, শোন এর উচিত বিচার আমি করুম! রতনের পিঠের চামড়া দিয়া সকিনার পায়ের জুতা বানাইয়া দিমু। তুমি কোন চিন্তা কইরোনা সকিনার মা। আজকে রতন বাড়িতে আসুক পড়ে দেখবো ওর বজ্জাতি কেমন করে ছুটাই। সকিনার বিয়ার সব খরচ আমার। সকিনার মা মন্ডলের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, রতন কইছে ওরে বিয়া করবো। আপনি কি কন? মন্ডল কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে, তাই বলেছে হারামজাদা! ঠিক আছে আমার কি?  যার বিয়ে তার যদি মত থাকে আমার অমত নাই।

মন্ডল একতোড়া টাকা এনে সকিনার মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলে, এগুলো রাখ। সকিনার মা হাত সরিয়ে নেয়। বলে, না মন্ডল সাহেব এই টাকা আমি নিতে পারুম না!  আমার মেয়ের ইজ্জতের দাম দিতে চান? দূর সকিনার মা তুমি সত্যিই বোকা! আমার ছেলে যখন কথা দিছে তখন আমি ওর কথা ফালামুনা। এইডা মনে করো আমার ছেলের বউয়ের হাতে আমি দিলাম আশীর্বাদ স্বরুপ! সকিনার হাতে জোর করে টাকাগুলো দিয়ে তিনি বললেন, শোন মা তুই এখন আমার ঘরের ইজ্জত!  ভুলেও কখনো একথা প্রকাশ করিসনা।

আর সকিনার মা মেয়েরে বাড়িতে নিয়া গিয়া গরম পানি দিয়া ভালোমতো গোছল দাও গে। বুঝতেই তো পারছো নাপাকী বেশিক্ষণ শরীরে রাখতে নেই!  তবে গুনাহের কাজ হবে।

সকিনার মা বলে, মন্ডল সাহেব বিয়াটা আজই দেওন লাগবো?  মন্ডল সাহেব হেঁসে বলে, তুমি দেখি পাগল হলে সকিনার মা! এতো রাতে আমি কোথায় গিয়ে কাজী ডেকে আনবো আর কোথায় পাব মাওলানা। আর রতন তো বাড়ি ফিরে নাই। তবে কার সাথে বিয়া দিবা? না জানি কুলাঙ্গারটা কোথায় পালাইছে? আমার তো মনে হয় আজ আর বাড়ি সে ফিরবে না। সকিনার মা বুঝতে পারে সত্যি কথাই” তাই বলে, আমি কিন্তু আপনার কথা বিশ্বাস করে মাতবরের কাছে গেলাম না। আচ্ছা! আচ্ছা!  তোমার কোন চিন্তা নাই। যা বললাম তা ঠিক ঠিক মতো করবা।

সকিনার মা মন্ডলের কথা খুব যে বিশ্বাস করলো তা নয় কিন্তু আর কোন উপায় তো তার জানা নাই। মানুষ জন যদি জানতে পারে তবে যে মেয়ের বিয়ে হবেনা কোনদিন! তাই বাড়ি নিয়ে গিয়ে গরম জলে মেয়েকে ভালো করে গোছল করালেন।  রাতে মেয়েকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ঘুমালেন, এই আশায় কাল একটা কিছু সমাধান হবে। মন্ডল সাহেব মানী মানুষ তিনি কি তার কথার বরখেলাপ করতে পারবেন?

প্রতিদিনের মতো অনেক ভোরে সকিনা আজ জেগে উঠে না! তার ঘুম ভাঙে একটু দেরিতে ও এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নের রেশ নিয়ে। আজ যেন পৃথিবীটা তার কাছে অন্যরকম।

গতকাল সকালেও তার এমন মনে হয় নি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে পৃথিবীর চারপাশে দুঃখ আর ভয়ের আনাগোনা!  সবকিছুই তার কাছে মনে হচ্ছে মূল্যহীন! সবকিছুই যেন তার নিজস্ব রঙ হারিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে । সবকিছুই যেন আজ রঙহীন মনে হচ্ছে তার চোখে। সত্যি বলতে তার হৃদয়ের মধ্যে বাস করা রঙ যে ভূলুণ্ঠিত হয়ে গেছে। সকল আশা আকাঙ্ক্ষার যেন ইতি হয়ে গেছে একটি দিনের মধ্যে।  আর তার ভিতর থেকে যেন প্রাণ চঞ্চলতাটা কেউ কেড়ে নিয়েছে।  ভাবে এই রঙহীন আনন্দহীন পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কি লাভ? চোখের পানি ফেলা ছাড়া কিইবা করার আছে তাদের মতো গরীবের!

এমন সময় ঘরে তার মা প্রবেশ করলো। মেয়েকে জেগে উঠতে দেখে জিজ্ঞেস করে কিছু খাবি? না মা! খিদে নেই।  ঠিক আছে অনেক বেলা হইছে বিছানা তুইলা দে সকিনা। না মা আরও একটুখানি ঘুমাই?  নাহ্!  আর ঘুমান লাগবোনা। অনেক ঘুমাইছো। উঠে হাত মুখ ধুয়ে আয়। একটু দর্জির দোকানে যাইতে হইবো। সকিনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে কেন মা?

তোর জন্য কয়ডা নতুন জামার অর্ডার দিমু। আমার জামা লাগবো না মা! বাজান আইলে পরে নতুন জামা বানাইয়া দিবো। মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলে, টাকা তো আছেই! কোন টাকা মা? কেন মন্ডল সাহেব যে দিলেন। তার টাকার জামা আমি পড়ুম না মা! তুমি কেমন গো মা?

কেন পড়বি না শুনি? কেন পড়মু মা! ঐ টাকা দিয়া তিনি তোমারে আমারে কিনা নিছে মা! সকিনার মা আশ্চর্য হয়ে বলে, দেখ কয় কি মেয়ে আমার। টাকা দিছে তোর ছেঁড়া কাপড় দেইখা। হাজার হলেও তুই তার একটা ছেলের বউ হবি। তার একটা মান সম্মান আছে না? মাগো তুমি এতো বোকা কেন? যারা অন্যের সম্মান নিয়া খেলায় যারা। তাদের কেমন মান সম্মান মা? কয়দিন পরই টের পাবা মা! সকিনার মা রেগে উঠে বলে, তোর কথা শুনলে মাঝে মাঝে মনে হয় তুই কয়েক অক্ষর লেখা পড়া শিখে নিজেরে খুব বুদ্ধিমান মনে করস? মনে রাখিস তোর আগে দুনিয়াতে আইছি আমি!  একটু হইলেও আমি তোর চাইতে বেশি বুঝি!

মাগো তুমি একটু ভালা কইরা ভাবো তারা কই আর আমরা কই?
সকিনার মা রেগে উঠে বলেন আচ্ছা দেখুম তোর কথা হাঁচা নাকি মন্ডলের।  সকিনার মা ঘর দুয়ার গুছিয়ে মেয়েকে খাবার সামনে দিয়ে মন্ডলের বাড়ি যায়। মন্ডল সাহেব বাড়িতেই ছিলেন। সকিনার মা’কে দেখেই হেঁসে বলেন। আরে আস আস সকিনার মা! তা কেমন আছে এখন সকিনা। জ্বি আলহামদুলিল্লাহ!  ভালোই আছে সকিনা। বলছিলাম কি মন্ডল সাব! মন্ডল সাহেব হাত দিয়ে সকিনার মায়ের কথা মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে বলে, আমি জানি তুমি কি বলবা।

আমিও সেই কথাই  চিন্তা করতাছি। রতনটা যে কোথায় গিয়ে লুকিয়েছে বুঝতে পারছি না! বিয়া যত তারাতাড়ি করা যায় ততই মঙ্গল। বলা তো যায় না, কখন কে জানতে পারে জিনিসটা নিয়ে একটা হইচই বাধায়। চারপাশের মানুষ আবার আমার উন্নতি দেখতে পারেনা নাকি? একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন মন্ডল, বড়ো চিন্তার মধ্যে আছি সকিনার মা! এই সান্ত্বনা তুমি নিজের লোক। অন্য কেউ হলে এতোক্ষণ থানা পুলিশ কত কি করতো।

 কিন্তু লাভ কি? কেইস সেই জিতে সকিনার মা যার টাকার জোর বেশি। জিত আমারই হইতো কিন্তু মাঝে থেকে কিছু টাকা পয়সা নষ্ট হতো। তার সাথে ইজ্জতও একটু আধটু যাইতো। তবে সামাল দিতে অবশ্য পারতাম।

কিন্তু এখন আর সেই চিন্তা আমার নেই। তুমি তো কক্ষনো আমার অনিষ্ঠ চাইবেনা। সে আমি ভালো করেই জানি!  সকিনার মা মন্ডলের নরম কথায় আবেগে আপ্লুত হয়ে বলে, কি যে কন মন্ডল সাহেব?  আমার জীবন থাকতে কথা দুই কান হইবোনা। আমার বড় সৌভাগ্য আপনি যে আমার মেয়েরে ঘরে তুইলা নিতাছেন।

কি যে কওনা সকিনার মা!  তোমার সকিনা কম কিসে?  শুধু বাপের টাকা পয়সা একটু কম কিন্তু রুপে গুণে তোমার সকিনার মতো মেয়ে কয়টা পাওয়া যায়!  বলো শুনি? তবুও মন্ডল সাব কই আপনে আর কই আমরা? সকিনার মা সন্তুষ্ট চিত্তে বলে। মন্ডল গলা খাঁকারি দিয়ে পরিস্কার করে বলে, এখন কথা হচ্ছে  সকিনার মা!  সকিনার বাপতো বাড়িতে নাই আর রতনের দেখাও পাইতাছি নাহ্! তুমি যদি অমত না কর তবে সকিনার বাপ ফিরুক তারপর নাহয় বিয়ে সাদী দেওয়া যাবে? সকিনার মা একটু চিন্তা করে বলে, আপনের কথার উপর আমি কথা কইতে চাই না! যেমন ভালা মনে করেন।

আপনে জ্ঞানী মানী লোক যা ভালা মনে করেন। তাহলে এই কথাই রইলো। আমার আবার একটু কাজ আছে তুমি যদি কিছু মনে না কর তবে আমি এখন উঠি? ঠিক আছে মন্ডল সাব!  আমিও এখন যাই! আচ্ছা! আচ্ছা!  ও ভালো কথা!  সকিনার একটু খেয়াল রাইখো। সকিনার মা হেঁসে বলে, অহন তো মেয়ে আমার আপনের আমানত। চিন্তা কইরেন না। সকিনা ভালাই আছে তয় একটু কষ্ট পাইছে! ও কিছু না সকিনার মা!  যখন এই বাড়ির বউ হইয়া আইবো তখন দেখা যাইবো মুখে শুধু হাসি আর হাসি!
সকিনার মা চলে আসে।

সকিনার মা বাড়ি এসে দেখে সকিনা তেমনি মন মরা হয়ে বারান্দায় বসে আছে!  আরে সকিনা তুই এহনো এমনি ভাবে মনমরা হইয়া বইসা রইছস? তোর বিয়ার খুশিতে আমার পাগল হইবার যোগাড়। আর তোর কিনা মন খারাপ !  মা আমার বড়ো ভাগ্যবতী। কি একখানা ভাগ্য নিয়া আইছস তুই মা! একেবারে রাজরাণী!

সকিনার মা খুশিতে গদগদ হয়ে বলে, এমন ভাঙা ঘরে জন্ম নিয়া কখনো কি ভাবতে পারছস মা!  এতো বড় ঘরের বউ তুই হবি? আমি তো স্বপ্নেও ভাবি নাই। মানুষ যখন দেখবো আমার সকিনা মায়ে মন্ডল বাড়ির বউ হইয়া যাইতেছে তখন তাদের কি অবস্থা হইবো?  একবার ভাব দেখিনি মা! সকিনার মায়ের কথায় সকিনার শরীরে যেন আগুন জ্বলে যায়! মা তুমি বোকার স্বর্গে বাস কর মা! এখনো সময় আছে মা চলো পুলিশের কাছে যাই। এর বিচার চাই!

সকিনার মা মেয়ের কথায় রাগান্বিত হয়ে বলে, কি কইলি পোড়াকপালি আরেক বার ক দেখি? তোর মুখটা আমি ভোতা কইরা দিমু!  নিজের বদনাম কামানের তোর বড় শখ হইছে না? মানুষ হুনলে খুব বাহবা দিবো মনে করছস। আর আদালত পুলিশ এগুলান আমগোর মতো মানুষের জন্য না। অনেক টেহার দরকার!  বুঝলি অনেক টেহা! আছে তোর বাপের এতো টেহা?
তোর বাপে তো দিনমজুর কামলা। ঠিক মতো বউ বাচ্চার ভাত দিতে পারে না। তার মাইয়া হইয়া তোর আবার এতো দেমাক।

সকিনা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,মাগো উচিত বিচার চাওয়া দেমাক না! তুমিও বুঝতে পারবা, কিন্তু সব হারাইয়া মা! মা আর মেয়ের মত এক হয়না।

এরপর প্রায় প্রতিদিন সকিনার মা মন্ডলের বাড়িতে আসা যাওয়া করে কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়না। মন্ডল শুধু কথা দিয়ে  চিরে ভিজায়। আস্তে আস্তে সকিনার মা এটা বুঝতে পারে। সেদিন স্পষ্টই বুঝতে পারে যেদিন রতন ফিরে আসে। মন্ডল সাব সেদিন বললেন সকিনার মা! সকিনার বিয়ার ব্যাবস্থা কর তুমি, টাকা যা লাগে আমি দিমু।

কথাটা শুনা মাত্র সকিনার মা যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে!  এইডা আপনে কি কন মন্ডল সাব?  আপনে তো কথা দিছিলেন, সকিনা আপনের বাড়ির বউ হইয়া আইবো। আহ্!  তুমি একটু বুঝতে চেষ্টা কর সকিনার মা!  আমার একটা মান সম্মান আছে গ্রামের মধ্যে। এখন যদি আমার বাড়ির কাজের বেটির মেয়ের সাথে আমার ছেলের বিয়া দেই, তাহলে মানুষ কি বলবে?

সকিনার মায়ের চোখের জল পড়তে লাগলো!  তা দেখে মন্ডল সাহেব বললেন আহা! কাঁদো কেন? তোমার মেয়ের বিয়ার সব খরচ আমার। সকিনার কথা বলে না। সে এই কাঁদছে যে তার মেয়ে সঠিক কথা বলেছিলো কিন্তু সে বুঝতে পারেনি মন্ডলের চালাকি! মন্ডল হয়তো ভাবছে বিয়ে হয়নি দেখে সকিনার মা কাঁদছে।  মন্ডল বলে, আমারে তুমি ক্ষমা কইরো সকিনার মা! সন্তান নষ্ট হলেও ফেলে দেওয়া যায়না।

সকিনার মা মন্ডলের চোখের দিকে তাকিয়ে  বলে, আমি তো কাজের বেটি! তাই হয়তো আপনের সন্তান আমার সন্তানের সাথে এমন কাজ করার সাহস পাইলো। আপনে যখন আপনের কথা রাখলেন না, তখন আমিও চেষ্টা কইরা দেখি রতনের বিচার করা যায় না-কি?  মন্ডল এবার চোখ গরম করে বলে, তুমি আমারে মনে হয় ভয় দেখাইতাছো? নাহ্! সেই সাহস এই কাজের বেটির নাই! আমার পাওনাটা আমি চাই। মন্ডল গলা চড়িয়ে বলে,যাও গিয়ে চেষ্টা করে দেখ। সকিনার মা বলে, জানি আপনার অনেক টেহা আমি বিচার না পাইলেও একদিন এর শাস্তি ঠিক আপনের সন্তানের উপর আইবো। আমার চোখের সামনে থেকে বিদায় হও বলছি। এই বলে মন্ডল আরেক দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

সকিনার মা আর কিছু না বলে, বাড়ি এসে বারান্দায় চুপ করে একাকিনী মন মরা হয়ে  বসে রইলো। সকিনা কাছে এসে বলে, কি হইলো মা? সকিনার মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। সকিনা সব বুঝতে পারে তার মা কেন কাঁদে?  মা বসে রইলো সেই ভাবে। সকিনা উঠে গিয়ে  ঘরের মধ্যে খিল দিয়ে আত্মহত্যার আয়োজন করে।
হঠাৎ মায়ের খেয়াল হয় সকিনা দরজা বন্ধ করে চুপ করে আছে কেন?

 মা সকিনা! দরজা খুইলা দে মা!  দরজা বন্ধ করে কি করস অভাগীর বেটি? সকিনা মায়ের কথায় কোন উত্তর করে না। সকিনার মা মেয়ের চুপ করে থাকা দেখে ভয় পেয়ে গেল। দরজায় দুমদাম আঘাত করতে লাগলো কিন্তু তাতেও সকিনা না বলে কথা না দেয় দরজা খুলে।

সকিনার মায়ের আর বুঝতে বাকি থাকে না তার মেয়ে ঘরের ভিতর কি করছে।
তিনি তারাতাড়ি পাশের বাড়ির মকবুল কে ডেকে আনে দরজা ভাঙার জন্য। মকবুল এসে সকিনাকে ডাকে কিন্তু সকিনা উত্তর দেয় না! সকিনার মা মকবুলের পানে তাকিয়ে বলে, বাজান! দরজা ভাঙার ব্যাবস্থা কর তারাতাড়ি নয়তো মেলা দেরি হইয়া যাইবো।

মকবুল তাই করে। মকবুল দশাসই দেহধারী যুবক তার কয়েক ধাক্কায় গরীবের দূর্বল দরজা বেশিক্ষণ টিকতে পারে না! সকিনার মা হন্তদন্ত হয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করে দেখে মেয়ে বিছানার উপর চিৎ হয়ে শুয়ে নিরবে কেঁপে কেঁপে কাদছে! মকবুল জিজ্ঞেস  কি গো চাচি ঘটনা কি? তুমি যেই ভাবে আমারে ডাক দিয়া আনলা তাতে আমি ভীষণ ঘাবড়ে গেছিলাম!  না জানি কি অঘটন ঘটলো?

কিন্তু সকিনা দেখি ঠিকই আছে। সকিনার পাশে পড়ে থাকা দড়িটা মকবুল দেখতে পায় না। সকিনার মা মকবুলের পানে তাকিয়ে বলে, বাজান তোরে কষ্ট দিলাম! অনেক ডাকাডাকি করেও সকিনা যখন দরজা খুলে নাই তখন আমি ডরাই গেছি। তুই অহন যা বাজান! আইচ্ছা চাঁচি আমি গেলাম। ঠিক আছে বাজান!

সকিনার মা সকিনারে দড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, সকিনা তুই এইডা কি করতেছিলি? সকিনা মায়ের দিকে না তাকিয়েই জবাব দেয়, ঠিকই তো করতাছিলাম মা! আমি জানতাম তুমি একটা ভুলের পিছনে দৌড়াইয়া যাইতেছ। তারা আমারে কোন দিন ঘরের বউ কইরা নিবো না মা!

আইজ না হোক কাইলকা মানুষ জানতে পারবো সত্যিটা!  তখন আমি কি কইরা মুখ দেখামু মা কইতে পারো? সকিনার চুপ করে থাকে। সকিনা মায়ের নিরবতা ভঙ্গ করে বলে,এরচেয়ে মা মইরা যাওয়া অনেক সহজ! অনেক সম্মানের। আমারে মরতে দেও মা! আমি আর বাঁইচা থাকতে চাই না। নিজেরে আমার পাপি মনে হয় মা! মনে হয় আমি যেন একটা নষ্টা মেয়ে!

এইবার সকিনার মা সকিনার গালে একটা প্রচন্ড জোরে চড় মেরে বলে, আর এমন কথা মুখে আনবি না অভাগীর বেটি! কে কইছে তোরে তুই পাপিষ্ঠা। কে কইছে তোরে নষ্টা মেয়ে?  আমি তার দাঁত গুলা ভাইঙ্গা দিমু না। সকিনা কাঁদে আর বলে,আমি তুমি কয়জনের মুখ বন্ধ করবা?
পারবা না মা! জ্বালা যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে তুমিই তখন আমারে মরতে কইবা মা! মানুষের কটু কথা বড়োই অন্তরে লাগে মা।তুমি এতো কাল ধরে এই কথাটা বোঝ নাই মা?

সকিনার মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, বুঝতে পারি আমি সব বুঝি তাই তোরে কইতাছি। তুই আর এমন কাজ কক্ষনো করতে যাবি না মা!
আমি এর বিচার না কইরা থামবোনা সকিনা। কিন্তু মা তোমার বিচার কে করবো? বড়লোকের টাকার কাছে সবাই বিক্রি হয় মা!
তুমি বিচার চাইতে গিয়া নিজেই আরও বিপদে পরবা।

না সকিনা এখনো মানুষ আছে এই গ্রামে যে মন্ডলের উচিত বিচার করতে পারবো। শুধু তার পায়ে গিয়ে ঠিক মতো ধর্না দিতে পারলেই হইলো। কিন্তু মা তবুও যদি না পাও বিচার?  মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জবাব দেয় মা। যদি তবুও বিচার না পাই তয় এই মুখ আমি গ্রামের কাউরে আর দেখামু না।

তোর বাজান আইজ আহনের কথা। দেখি মানুষটা বাড়ি ফিরুক তিনি কি কয়? সকিনার মা দড়িটা গুছিয়ে রেখে রান্নাঘরে যায়। যত দুঃখই অন্তরে থাক কিন্তু পেট খাবার কথা ভুলে নাহ্!

সন্ধ্যার আগে আগেই বাড়ি ফিরে সকিনার বাবা কাশেম! তিনি বাড়ি ফিরেই মা!  ও মা কোথায় গেলি? এই বলে বাড়ি মাথায় তুলে। কিন্তু সকিনা আগের মতো বাপের আগমনে পাগলের মতো দৌড়ে আসেনা! শতবার ডাকার পরও যখন সকিনা বাপের কাছে আসেনা তখন কাশেম আলী দাওয়ায় বসে তার বউকে ডাকে, কইরে বউ তোরা কোথায় গেলি? এতোদিন পর বাড়ি ফিরলাম তোরা আমারে দেইখা খুশি হুস নাই?  সকিনার মা রান্নাঘরে কাজ ফেলে এসে বলে, খুশি হমুনা কেন। মেলা খুশি হয়ছি!

আপনে হাত মুখ ধুয়ে একটু ঝিরান দেন। আমি রান্ধন শেষ কইরা আইতাছি। কাশেম বউয়ের পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, সকিনা কই? আমার মায়ে কি আমার সাথে রাগ করছে?  সকিনার মা জবাব দেয়, না সে আপনার প্রতি কোনদিন রাগ করে? যা বাপ আদুরী মেয়ে আপনার!  তয় কি হইছে মায়ের আমার?  কোথাও গেছে নাকি?  নাহ্! আপনি এতো অস্থির আর এমন উতলা হয়েন না। তার শরীরটা একটু খারাপ!  কাশেম আলী কি মনে কইরা আর ডাকাডাকি করলো না।

হাতমুখ ধুয়ে আসার জন্য বাড়ির সামনে পুকুরের দিকে গেল। সকিনার মা তালে তালে ছিলো, স্বামীকে চলে যেতে দেখেই তারাতাড়ি ঘরের ভিতর গিয়ে সকিনাকে জিজ্ঞেস করলো, কি রে তোর বাজান এতো কইরা ডাকলো কিন্তু তুই একবারও সাড়া দিলি না যে? সকিনা কেঁদে ওঠে বলে, মা! আমি এই মুখ লইয়া কেমনে বাজানের সামনে যামু! সকিনার মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, এতোদিন পর এতদূর থন মানুষটা পরিশ্রম কইরা আইছে। তারে অহনি সব কথা কওনের দরকার নাই। আর তুই যদি তার সামনে না যাস তয় মানুষটা বড়োই উতলা হয়ে উঠবেন।

যা মা চোখের জল মুছে তার সামনে যা! মুখে একটু হাসি রাখিস মা! এতোদিন পর মানুষটা বাড়ি ফিরে আইছে। তোরে যদি এমন ভাবে দেখে তয় মানুষটার মনটা খারাপ হইয়া যাইবো। সকিনা জবাব দেয় না।

কাশেম আলী দাওয়ায় বসে ডাকে কই গো মা সকিনা বাজানের কাছে আইবা না? সকিনা চোখের জল মুছে বাপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। কাশেম আলী মেয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি গো মা। বাজানের সাথে কথা কইবা না?
আমার চান্দের লাহান মায়ের মুখে আজ হাসি নাই কেন? কি হয়েছে গো মা?

বাবার মুখে এমন কথা শুনে সকিনা আর চোখের পানি ও উচ্ছ্বসিত ক্রন্দন রুখতে পারেনা। পিতা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। তারাতাড়ি উঠে গিয়ে মেয়েকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বলে, কি রে মা! কান্দস কেন? আমারে সব খুইলা কও। আমি বাঁইচা থাকতে আমার সামনে মা আমার এমন ভাবে চোখের পানি ফালাইবো! সকিনার মা রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে বলে, কিছু না!  অনেক দিন পর বাপরে দেখছে তো,  তাই মনে হয় চোখের পানি ধইরা রাখতে পারে নাই। আয় মা! তোর শরীর ভালা না। আয় শুইয়া থাকবি।

কাশেম আলীর মনটা সত্যি খারাপ হয়ে যায়। সকিনার মা রান্নাঘর থেকে খাবার এনে স্বামীর সামনে দেয়। কাশেম আলী ক্ষুধার্ত ছিল। খাবার খেয়ে জিজ্ঞেস করে, সকিনার মা!  সত্যি কইরা কও তো কি হইছে সকিনার? সকিনার মা লুকাতে চায়, নাহ্ কিছু হয়নাই।  কাশেম আলী বলে কিন্তু আমার মনে কেন জানি শান্তি পাইতেছি না!

সকিনার মা ভাবে আজ হোক কাল হোক সকিনার বাপের কাছে সব বলতেই হবে। তাই সে ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে বলে, একটা কথা কমু কিন্তু আপনের কথা দেওন লাগবো মাথা ঠান্ডা রাখবেন?  কাশেম আলীর হৃদয়ে কিছু একটা অজানা বিপদের ঈঙ্গিত বেজে ওঠে। সে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, তুই আমার কাছে কিছু লুকাইস না বউ!

আপনি কিন্তু কথা দিছেন মাথা ঠান্ডা রাখবেন। হুম!  তুই আমারে সব খুইলা ক।
সকিনার মা সব বলে দেয়।
কাশেম আলী কথাটা শুনে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, আমি মন্ডলের বাড়ি এখনি যামু। সকিনার মা বাঁধা দিয়ে বলে, আপনি আমারে কথা দিছেন কিন্তু মাথা ঠান্ডা রাখবেন। কাশেম আলী কেঁদে ওঠে বলে, কিন্তু আমার মাইডা তার কি ক্ষতি করছিলো? তার পোলায় অপরাধ করছে তার কোন বিচার হইবোনা?

কোন দিন কারও ক্ষতি করি নাই। আইজ আমার এমন ক্ষতি কেন হইলো বউ? সকিনা দুয়ারে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো। সে বাবার কথার জবাব দেয়, আমরা যে খুব গরীব!  বাজান এইডাই আমাগোর অপরাধ!  তুমি যদি আইজ মন্ডলের মতো ধনী হইতা তয় মন্ডলের আর কোন আপত্তি থাকতোনা। ঠিক কইছো মা।

সকিনার মা বলে, চলেন মাতবরের কাছে যাই তিনি ভালো মানুষ। একটা ব্যাবস্থা তিনি কইরা দিবেন।  কাশেম রাজি হয়। রাতে সকিনার মা আর বাবা দুজনেই মাতবরের বাড়ি গিয়ে ধর্ণা দেয়। মাতবর সব শুনে বলে, এতোদিন পর আমার কাছে আইলি তোরা। এখন তো কোন প্রমানও নেই!  যাক দেখি আমি কি করতে পারি।

তোরা এখন বাড়ি যা! রাত তো অনেক হলো। সকিনার মা হাত জোর করে বলে, আপনি এখন শেষ ভরসা মাতবর সাব! আচ্ছা! আচ্ছা আমি দেখবো তো বললাম। তোরা নিঃশ্চিন্ত মনে বাড়ি যা।

পরদিন রাতে মাতবর আর মন্ডল বসে খুশ গল্পে মত্ত। এমন সময় মাতবর বলে, মিয়া তোমার নামে তো একটা বিচার আমার কাছে আছে। মন্ডল হেঁসে বলে তাই নাকি, তা কে দিলো বিচার?
সকিনার মা!  মন্ডল মদের বোতলটা থেকে আর একটু গ্লাসে ঢেলে বলে, এই কাজের বেটির জ্বালায় দেখছি গ্রাম ছেড়ে দিতে হবে। মাতবর হেঁসে বলে, তুমি ছাড়বে গ্রাম!  নাকি ওদের গ্রাম ছাড়া করবার চিন্তা করছো?

মন্ডল চিন্তিত হয়ে বলে, কি করা যায় বল তো মাতবর?  কি আর হবে। গরীব মানুষ ওদের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিতে হবে। মন্ডল বলে, চেষ্টা করে দেখেছি কিন্তু মাগী রাজি হয়নি। বলেছি অন্য জায়গায় সকিনার বিয়ের ব্যাবস্থা করতে সব খরচ আমি দেব কিন্তু সে নাগিনীর মতো ফুঁসে ওঠে চলে আসে।

আরে মিয়া নগদ টাকা দেখতে পেলে ঠিকই মত পাল্টাবে। মন্ডল মাতবরের দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক বলেছো।

 মন্ডলের সিন্দুক থেকে বের করা টাকা গুলো হাতে নিয়ে মাতবর গুনে দেখে পুরো দুই লাখ।  মাতবর তবুও যাচ্ছে না দেখে মাতবরকে মন্ডল জিজ্ঞেস করে কি ব্যাপার বসে রইলে যে? মাতবর হেঁসে বলে তুমি না কেমন কিপটেই রয়ে গেলে মন্ডল!  মানে কি মাতবর?  যা বলেলে তার সব টাকাই তো পই পই করে গুনে দিলাম।

তবে কেমন করে তোমার কথার সুযোগ রইলো? তুমি সত্যি মন্ডল অভিনয়টাও ভালো পারো! তুমি যদি অভিনয় করতে নিশ্চিত জাতীয় পুরুষ্কার পেতে। কিন্তু আমি তোমাকে তা দিতে পারছিনা।

মন্ডল রেগে মদের বোতল টেবিলে ঠাস করে রেখে গ্লাসের মদ টুকু গলায় ঢেলে বলে, তোমার প্যাচানো স্বভাবটা আর গেলনা দেখছি। তা কি বলতে চাইছো খোলাসা করে বল দেখি?

মাতবর হাত কচলিয়ে বলে, এই টাকাগুলো তো সকিনার হাতেই তুলে দিতে হবে। আমি এতো কষ্ট করে সব কিছু সমাধান করে দিচ্ছি।  তোমার কৃতজ্ঞতা বোধ বলতেও তো একটা কথা আছে।  সেইটার কথাই মনে করিয়ে দিতে চাইছিলাম।
মন্ডল হেঁসে বলে, ও এই কথা!  বোতল থেকে গ্লাসে মদ ঢেলে বন্ধুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, এই নাও তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতায় এবার পান করছি।  মাতবর গলায় মদটা ঢেলে দিয়ে হেঁসে বলে, গলায় না হয় মদ ঢাললাম কিন্তু পকেট তো একেবারে খালি রয়ে গেল মন্ডল!

মন্ডল আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে কি তুমি আমার কাছে থেকেও টাকা চাইছো? মাতবর জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলে, ছি! ওভাবে কেন বলছো?  তবে যে আমি একেবারে ছোট হয়ে যাই। এই আমার পেশা মনে কর। আর তো কিছু করিনা। সমাজের লোক ভালো বেসে তাদের মাতবর বানিয়েছে। এখন শুধু তাদের উপকার করলেই তো চলবে না। আমারও তো পেট আছে!  তুমি বন্ধু মানুষ না হয় কিছু কম দিলে।

থানা পুলিশ করতে গেলে দশ লাখেও ছাড় পাবেনা। লাখ টাকা তো আর চাইছি না। তুমি বন্ধু মানুষ পঞ্চাশ হাজার দিলেই আমি খুশি! নিজের ছেলের উপর ভীষণ রাগ হলো মন্ডলের। এত কষ্ট করে যত্নে রাখা টাকা গুলো অন্যের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। সিন্দুক থেকে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা বের করে টেবিলের উপর আছড়ে ফেলে বলে, এই নাও পকেটে ভরে ফেল। রক্তচোষা বাদুড় একটা!  মাতবর টাকাটা পকেটে ভরে জিজ্ঞেস করে, আমায় কিছু বললে?

মন্ডল হেঁসে বলে, নাহ্ তোমাকে কিছু বলা আর কলা গাছকে বলা এখন একই কথা!  টাকা ছাড়া অন্য শব্দ কি আর তোমার কানে এখন যাবে?  মাতবর হেঁসে বলে তোমার রসিকতা করার অভ্যেশটা আর গেল না মন্ডল। আচ্ছা অনেক রাত হলো এখন আমি আসি। ঠিক আছে যাও আর ওতেই কাজটা যেভাবে হোক সমাধা করবে। আচ্ছা! আচ্ছা!  তা নিয়ে এখন তোমার না ভাবলেও চলবে। মন্ডল দরজা বন্ধ করে বাড়ি যাবার আয়োজন করলো।

পরদিন রাতে কাশেম আলী ও তার স্ত্রী মাতবরের কাছে আসলো। মাতবরের চাকর তাদের বাইরে বসতে বলে, ভিতরে গেল খবর দিতে। মাতবর শুনে বলে, বেটাদের মনে হয় ঘুম আসছে না, তাই এতো রাতে এসেছে আমাকে জ্বালাতন করতে!  বল গিয়ে মাতবর সাব বাড়িতে নাই!  চাকর তবুও দাঁড়িয়ে রইলো। চাকর কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি ধমকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে ঠায় দাঁড়িয়ে আছিস যে? চাকর জবাব দিলো কিন্তু আমি তো বলেছি আপনি বাড়িতেই আছেন।

তোদের জ্বালায় আমি একেবারে জ্বলে গেলাম রে! আমার কথা না শুনেই বলে এলি আমি বাড়িতে আছি। আচ্ছা দাঁড়া আমি দেখছি কি করা যায়। মাতবর খালি গায়ে বেড়িয়ে এলেন বাইরে। তাকে দেখে কাশেম আলী ও তার স্ত্রী উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, চাচা কিছু করলেন?  হ্যা! হ্যা!

আচ্ছা এখন বলতো সকিনার মা!  তোমরা কেমন বিচার চাও? মানে কি পেলে তোমরা খুশি হও? সকিনার মা এগিয়ে এসে বলে , চাচা! মন্ডল সাব যদি তার ছেলে দিয়ে আমার মেয়েকে ঘরের বউ করে নেয় তবেই আমি খুশি হই! এ কথা শুনে মাতবর হেঁসে বলে, দেখ কি বলে সকিনার মা? আরে কোথায় মন্ডল আর কোথায় তোমরা! মন্ডলের বদমাশ পোলাডা একটা অঘটন ঘটাইছে একথা ঠিক তাই বলে, তোমার মেয়েকে কেমন করে ঘরের বউ করে নেয়!

বুঝতে পারলাম তোমার অনেক বড় ক্ষতি হইছে। তার জন্য অন্য শাস্তি ভোগ করতে সে রাজি হইছে। সকিনার মা আক্ষেপ করে বলে, চাচা মন্ডলের পয়সা আছে তাই সকিনাকে ঘরে নিলে তার ইজ্জত যাইবো!  আমগোরে পয়সা নাই !  তাই বইলা কি ইজ্জত নাই!  ইজ্জতের কোন দাম নাই চাচা?

মাতবর হেঁসে বলে, দেখো দেখি কি বলে সকিনার মা! থাকবো না কেন? আলবৎ আছে! তুমি চাইলেই আছে।
বল দেখি সকিনার মা কত হইলে মন্ডলের সঠিক বিচার হয়? সকিনার মা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে মানে কি চাচা? মানে মন্ডলের জরিমানা!  আমি তোমাদের লাখ খানেক টাকা নিয়ে দিতে পারুম আশা রাখি!  এক লাখ টাকা কম নয় সকিনার মা! তা দিয়ে অনেক কিছু করতে পারবা।

জীবনেও একসাথে দেখতে পারবা বলে মনে হয় না। নিয়ে নাও আখেরে ঐ টাকাটাই কাজে দিবে। সকিনার মা মাতবরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে চাচা! আপনি কি তাই চান। টাকা নিয়া আমার মেয়ের ইজ্জত বিক্রি কইরা দেই? নাহ্ তা আমি বলি না সকিনার মা!
তবে তুমি কি চাও মন্ডলের বিচার করি?
হুম!  চাচা আমি চাই মন্ডল ও তার পোলার কঠিন বিচার। গ্রামের মানুষ যেন সত্যি তাদের  মুখোশের আড়ালে কুৎসিত বিকৃত চেহেরাটা দেখতে পায়! তখন দেখি মন্ডলের ইজ্জত কই যায়। কোথায় তার মুখ ঢাকে?

মাতবর হেঁসে বলে, একটা কথা বলি সকিনার মা!  মন্ডলের মতো পয়সা ওয়ালা লোকের ইজ্জত আর মুখোশ এতো সহজে ধুলায় মিশানো যায় না। তোমার কি মনে হয় মন্ডল আমার ডাকা বিচারে আসবো? আসবেনা সকিনার মা! যদি পারো থানা পুলিশ করতে পারো। তাতে যদি কাজ হয় কিন্তু এতোদিন পর তুমি কি কিছু প্রমাণ করতে পারবা? অনেক দেরি হয়ে গেছে। তারা উল্টো তোমার এবং তোমার মেয়ের উপর পতিতাবৃত্তির অপবাদ দেবে। পৃথিবীতে টাকার পিছনে অনেক মানুষ!

সকিনার এই কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে বলে, কি কইলেন চাচা? মাতবর হেঁসে বলে সত্যিটাই বললাম সকিনার মা। তুমি এখন ভেবে দেখো কি করবা? টাকা নিবা না-কি পুলিশের কাছে যাবা। সকিনার মা মাতবরের দিকে তাকিয়ে বলে, মন্ডলের টাকার উপর আমি থুথু ফেলি!  তারে কইয়েন চাচা! গরীব হইলেও আমরা মানুষ। ইজ্জত বিক্রি করার চাইতে মইরা যামু।  আমি পুলিশের কাছেই যাইতাছি। আমিও দেখি দেশে গরীবের জন্য বিচার আছে কি না। গরীব কি দেশে বিনা বিচারেই মরে নাকি?

মাতবর টাকাটা হাতে নিয়ে বলে, মন্ডলের অনেক টাকা তুমি মিছেই তার সাথে লাগতে যাচ্ছো! আমি বাঁধা দিবার কে?  শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি তোমরা সহজ সরল মানুষ!  তার সাথে পেরে উঠবে না। শুধু শুধু হয়রানি হয়ে মেয়ের বদনাম কামিয়ে আসবে। আমার কথাটা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো। কাশেম আলী বউকে নিয়ে বেড়িয়ে আসে মাতবরের বাড়ি থেকে।

কাশেম আলী বউকে বলে, একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাইবা দেখ বউ। আমরা গরীব মানুষ!  নাই মানুষের জোর নাই টাকা পয়সার জোর!  কেমনে মন্ডলের মতো মানুষের সাথে আমরা জিততে পারুম? এরচেয়ে ভালো বউ আমি একটা কথা কই কি, আমরা অন্য চিন্তা করি। সকিনার মা স্বামীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি করতে চান? আয় আগে বাড়িতে যাই। পরে তোরে সব বুঝাইয়া কইতাছি।

রতন তালে তালে ছিলো সকিনার বাবা-মা কখন বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। যখন সকিনার বাবা-মা বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেল তখন রতন পা টিপে টিপে সকিনাদের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন চুপ করে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে কয়েক বার কড়া নাড়ে। সকিনা ভিতর থেকে জিজ্ঞেস করে কেডায়?  রতন কোন জবাব দেয় না। আবার চুপ!  কতক্ষণ পরে আবার রতন একটু জোরে কড়া নাড়ে। এবার সকিনা জিজ্ঞেস করে এই কেডা?  এবারও সকিনার প্রশ্নের জবাব নেই। তাই সকিনা রাগে ও কিছুটা ভয় বলে, কোন হারামির বাচ্চা এমন করে রে?

অনেক ক্ষন পর আবার রতন কড়া নাড়ে। সকিনা বুঝতে পারে কেউ তাকে ভয় দেখানোর জন্য এমনটা করেছে কিন্তু কে হতে পারে তাই সে বুঝতে পারছেনা।  তাই শেষ বারের মতো জিজ্ঞেস করে, এই কেডায় এমন করে? আমি কিন্তু বাইরে আইসা একবারে দা দিয়ে কুপিয়ে মারবো!
অনেক ক্ষন শব্দ নেই কিন্তু যেই রতন শব্দ করে ঠিক সেই সময় সকিনা দরজা খুলে দেখে রতন দাঁড়িয়ে আছে।

সকিনার হাতে দা দেখতে পেয়ে রতন জিজ্ঞেস করে তোমার হাতে দা কেন সকিনা? সকিনা জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করে তুই এখানে কেন? রতন যথেষ্ট মিষ্টি সুরে বলে, সকিনা তুমি আমারে ভুল বুইঝোনা। আমি সত্যি তোমারে অনেক ভালোবাসি! আমি যেমন করে হোক বাজানরে বোঝানোর চেষ্টা করুম আমাদের বিয়াটা যেন দিয়া দেয়। সকিনা দরজা লাগাতে লাগাতে বলে, ঠিক আছে। রতন বলে, দরজা লাগিয়ে দিওনা। আমি তোমার সাথে একটু কথা কইতে চাই।

এখন আর আমার কাছে তোমার কি লজ্জা। আসনা দুইজন। কি কইলি এই কথা বলে সকিনা দা উঁচিয়ে বলে, যাবি!
রতন তবুও জোর করে। সকিনা এক কোপ বসিয়ে দেয় কিন্তু রতনের গায়ে লাগেনা। রতন শাসিয়ে বলে, ভালো করলি না সকিনা!  এই কথা শুনে সকিনা উত্তেজিত হয়ে দা হাতে নিয়ে দৌড়ে যায় রতনের দিকে। রতন অন্ধকারে দৌড় দেয়। সকিনা অন্ধকারে দা ছুঁড়ে মারে। একবারে গিয়ে রতনের পায়ে গিয়ে লাগে আর রতন চিৎকার করে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
যারা পড়বেন কষ্ট করে একটা কমেন্ট করে যাবেন। যাতে আরেক জনের খুঁজে পেতে সুবিধা হয়।

রতন চিৎকার করে ছুটে যাবার পর সকিনা ভয় পেয়ে যায়! বুঝতে পারেনা দা, কোথায় গিয়ে লেগেছে। অন্ধকারে সে তো কিছু দেখতে পায়নি তাই চিন্তা হচ্ছে।

যদি লোকটা মরে যায়!  তবে তার কি হবে?  পুলিশ এসে তাকে বেঁধে নিয়ে যাবে। তখন গ্রামের সবাই জানতে পারবে কি ঘটনা ঘটেছে। সকিনা ভয়ে ঘামতে লাগে।

ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দুই হাঁটু ধরে বসে থাকে। নাহ্!  কাজটা মনে হয় বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। মনে মনে অনুশোচনায় পুড়ছে সে। এমন সময় সকিনার মা! দরজায় টোকা দিলো। সকিনা আঁতকে উঠে ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে, কেডায়? সকিনার মা মেয়ের কন্ঠ শুনে উতলা হয়ে বলে, দরজা খুলে দে সকিনা। তোর কি হইছে?  অমন ডরাইছস কেন?

সকিনার মায়ের কন্ঠ শুনে সকিনা দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলেই মায়ের বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে সে। মা মেয়ের এমন কান্ডে বুঝতে পারে একটা কিছু হয়েছে। তাই এক গ্লাস পানি এনে মেয়ের সামনে দিয়ে বলে, নে খা!  তারপর আমার কাছে সব খুইলা ক দেহি?
সকিনা পানি পান করে, একে একে সব কথা মায়ের কাছে খুলে বলে। তারপর সকিনার মা  একটা হারিকেন নিয়ে সেই জায়গায় গিয়ে দেখে অনেক রক্ত!  দা খুঁজে পেতে একটু দেরি হলো। ওটা ছিটকে গিয়ে ঝোপের মধ্য পড়েছিল।

কাশেম আলী সকিনার মায়ের কাছে এসে বলে, বউ আমরা মনে হয় এই গেরামে আর থাকতে পারুম না। সকিবার মা স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, এইডা আপনে কি কন? সত্যি কথা কই বউ! তোরে আমি আরও আগেই কইতে চাইছিলাম কিন্তু বাড়ি আইসা যা দেখলাম। তাতে কইরা এখনই উপযুক্ত সময় এখান থেকে চলে যাবার।

আয় একটু আড়ালে তোরে সব বোঝাইয়া কই। সকিনা তুই ঘরে যা মা!

রতন যখন দেখলো আর সামলানো যাবে না! রক্ত কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না, তখন বাপের কাছে গিয়ে হাজির হলো। মন্ডল ছেলের এমন অবস্থা থেকে মাথা ঠিক রাখতে পারেনা। দিশেহারা হয়ে চিৎকার চেঁচামিচি করতে শুরু করে। চিৎকার শুনে লোকজন ছুটে আসে। জিজ্ঞেস করে কোথায় কেমন করে এমন হলো কিন্তু রতনের মুখে কোন কথা নেই!

রতনের এমন অবস্থা দেখে সবাই মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরদিন মন্ডল ছেলের কাছে জিজ্ঞেস করে, রতন তোর এই অবস্থা কে করলো। রতন বলতে না চাইলেও পিতার কথার কাছে টিকতে না পেরে সত্যি কথাই বলে দিলো। তখন মন্ডলের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়।

বিকাল বেলা মন্ডল নিজে সকিনার মায়ের খুঁজে ওদের বাড়ি আসে। খিড়কীর পাশে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়ে কই সকিনার মা!  এদিকে একবার আস দেখি।
বারবার ডাকাডাকি করার পরেও যখন কোন সারা শব্দ তিনি পেলেন না, তখন পাশ দিয়ে চলে চলে যাওয়া একটা ছেলেকে ডেকে বললেন, এই দেখতো এদের বাড়িতে কেউ আছে কি-না?

ছেলেটি মন্ডলের কথা মতো বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে চারদিকে খুঁজে দেখে কিন্তু কেউ বাড়িতে নেই। ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে দেখে তালা ঝুলছে। তাই দৌড়ে এসে মন্ডলের কাছে বলে, বাড়িতে তো কেউ নাই!  দুয়ারে তালা!
মন্ডল ছেলেটিকে সাথে নিয়ে বাড়ির ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখে, ছেলেটা সত্যি কথাই বলেছে। মনের রাগ মনে নিয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে এলেন। এবং তার বিশ্বস্ত চাকর কে ঐ বাড়িতে নজর রাখতে বলে তিনি হাসপাতালে চলে গেলেন।

সপ্তাহ খানেক হলো কিন্তু সকিনার মা বাবা ও সকিনার কোন খোঁজ পাওয়া গেল না।
হঠাৎ করে মন্ডলের মনে হলো, মাতবর এর জবাব দিতে পারবে। তাই মাতবরের বাড়ি গিয়ে হাঁক ছাড়ে মাতবর বাড়ি আছো! মন্ডলের হাঁক শুনে মাতবর তড়িঘড়ি করে ছুটে আসে। জিজ্ঞেস করে কি ব্যাপার মাতবর! রতনের কি খবর?

আমি খুব লজ্জিত মন্ডল!  রতনের খোঁজ নিতে পারি নাই। জানি তুমি আমার উপর অসন্তুষ্ট!  মন্ডল ধমকে উঠে বলে, রাখ মিয়া! তোমার বাজে কথা। তুমি স্বার্থ ছাড়া কোথায় যাও? যা, জিজ্ঞেস করি তার জবাব দাও। সকিনারা কোথায়?

এই প্রশ্নে মাতবর হেঁসে জিজ্ঞেস করে এটা আবার কেমন কথা?  ওরা কি আমার বাড়ির লোক যে বলবো ওরা কোথায়। বাড়ি গিয়ে দেখো। মন্ডল যখন সব খুলে বলে তখন মাতবর বেয়াকুব হয়ে যায় কিন্তু তা প্রকাশ করে না মন্ডলের সামনে। ভাবে এরা কি তবে গ্রাম ছেড়ে পালালো না-কি?
মন্ডল জিজ্ঞেস করে তোমার সাথে কবে দেখা করেছে সকিনার মা?

তুমি যেদিন টাকা দিলে তার পরেরদিন!  টাকাটা ওদের হাতে তুলে দিলাম। মন্ডল জিজ্ঞেস করে টাকা নিয়ে গেল? মন্ডল চুপ করে মাথা কাত করে! মন্ডল মনে মনে ভাবতে লাগলো যদি টাকা নেয় তবে এমন কান্ড কেন করলো? পরক্ষণেই ভাবলেন কাজটা তো সকিনার। তার বাবা-মা এই কান্ডে ভয় পেয়ে পালিয়েছে মনে হয়।

মন্ডলের চোখের সাথে চোখ মেলাতে পারছেনা মাতবর। সত্যি বলতে মিথ্যা কথা মানুষ চোখের উপর চোখ রেখে বলতে পারেনা। মন্ডল জিজ্ঞেস করে পুরো টাকাটাই কি নিয়ে গেল? মাতবর মাথা নিচু করে জবাব দেয়, টাকা হাতে পেলে কি ছাড়ে মন্ডল। তুমি দেখছি ছেলে মানুষের মতো কথা বলতে শুরু করেছো।

আচ্ছা এখন আমি চলি! মন্ডল চলে গেলে মাতবর তারাতাড়ি ছাতাটা বগলদাবা করে সকিনাদের বাড়ি চললো। যাচ্ছে আর ভাবছে এরা গেল কোথায়? সত্যি এসে দেখে জনমানবহীন পরা পতিত বাড়ি ঘর।এই কয়দিনেই উঠানে আগাছা জন্মানো শুরু করেছে। আর একটু ভিতরে গিয়ে ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে সবই আছে ঘরে। যা ছিলো আগে আর কি।
গরীব মানুষ জিনিস পত্র তো বেশি নেই। ভাঙাচোরা বাক্স পেঁটরা ও ছেঁড়া কাপড় চোপড় এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে।

মাতবর ভাবে এরা যদি আর কখনো ফিরে না আসে তবে, এই ভিটে মাটি সব তার সাথে মন্ডলের দেওয়া টাকা! একেই বুঝি বলে, কারও পৌষ মাস কার বা সর্বনাশ!

রতন হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি এলো। এখন তাকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে হয়। অল্প কিছু দিনের মধ্যে তার নামে একটা  বিশেষনে বিশেষিত হয়ে গেল। রতন খুঁড়া!  এখন এই গ্রামে এই নামে সে প্রসিদ্ধ। কিন্তু কেউ জানতে পারলোনা তার পুরুষ্কারের হেতু।
যাক সেই কথা। মন্ডল প্রতিশোধ স্পৃহায় অনেক দিন অপেক্ষা করে ছিলো সকিনার বাবা-মা পথ চেয়ে কিন্তু তাকে নিরাশ করে অবশেষে তারা আর ফিরে এলোনা।

কয়েক দিন মানুষ তাদের নিয়ে একটু আধটু আলাপ আলোচনা করে এক সময় তাও সময়ের স্রোতের সাথে মিলিয়ে যায়।রতন কিছু দিন আর কোন অনাসৃষ্টি করেনি।

নতুন একটা কাজের মেয়ে রাখলেন মন্ডল বাড়িতে। তার বৌয়ের বাতের সমস্যা তাই সব কাজ দ্বারা করা হয়ে উঠে না।
সকিনার মা চলে যাবার পর বহু কষ্ট করে এই কম বয়সী মহিলাকে সে যোগাড় করেছে। কিন্তু তার মনের মধ্যে সব সময় ভয় কাজ করে কোন সময় না জানি তার আদরের রতন তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। কিন্তু তাই বলে তো তিনি বউকে কষ্ট দিতে পারেন না। আর তিনিও সারাদিন বসে পাহারা দিতে পারবেন না।

তাই বউকে বারবার করে সাবধান করে দিয়েছেন রতন যেন এর কাছে পিঠে ঘেঁষতে না পারে। আর অভাগীর বেটি যেন গ্রামের সকলের রুপ একাই কেড়ে নিয়ে এসেছে। ছেলের কথা কি বলবেন তিনিই তো অতি কষ্টে চোখ সরিয়ে আনেন। আর নাউজুবিল্লাহ পড়তে পড়তে বেড়িয়ে যান।

আর কোন কাজের বেটি পাওয়া যাচ্ছে না।তাই বাধ্য হয়েই একে তিনি রাখতে বাধ্য হয়েছেন। রতন এখন খুব একটা বাড়িতে আসেনা। তাই এখনো এই ফুলের মতো সুন্দরী কাজের মেয়েটি তার চোখে পড়েনি। এই যা রক্ষা!

এই অভাগীর ছোট একটা ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই। তাই মন্ডল তাঁকে থাকার জন্য একটা ঘর দিয়েছে। মেয়েটি তাতেই অনেক সন্তুষ্ট চিত্তে সেখানে থাকতে লাগলো। রতনের মা কাজের মেয়েটিকে এমন ভাবে চোখে চোখে রাখে যেন রতন তার দেখা না পায়। রতন আগে রান্নাঘরে এসে খেয়ে যেত কিন্তু এখন তার আসার আগেই খাবার তার ঘরে দিয়ে আসা হয়।

কিন্তু একদিন রতন আগেই ঘরে এসে বসে থাকে। তা রতনের মা জানতে পারেনি। তিনি ছেলের জন্য খাবার বেড়ে দিয়ে বললেন,  যা তো মা মিনু খাবারটা আমার ছেলের ঘরে রেখে আয়! মিনু খাবার নিয়ে রতনের ঘরে গিয়ে রাখতে যাবে দেখে খাটে শুয়ে আছে রতন। সে চোখ দুটি বোজে ঝিমুনি দিচ্ছে। মিনু খাবারটা টেবিলে ঢাকা দিয়ে চলে আসছিলো। খাবার রাখার শব্দে রতন চোখ খুলে দেখে তার খাবার রেখে যাচ্ছে যে সে-তো সুন্দরী নয় মহা সুন্দরী!  কে এটা তার অন্ডরে তোলপাড় শুরু হলো।

জিজ্ঞেস করে কে তুমি?  মিনু কাপড় দিয়ে ঘোমটা টেনে বললো, আমি ভাইজান!  আপনাগো বাড়িতে কাজ করি। রতন আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে তুমি আমাদের বাড়িতে কাজ করো। অথচ আমি জানিনা!

 অনেক দিন গত হলো সকিনাদের আর কাউকে গ্রামের মধ্যে দেখা গেল না। মানুষ কিছু দিন মনে রেখে পরে আস্তে আস্তে তাদের কথা ভুলে যায়। এখন আর রতনের নামে কোন বিচার নেই। এখন রতন খুব একটা এদিক সেদিকও যায় না। মন্ডল বসে বসে ভাবে তার পুত্রের এতো সুমতি কিভাবে হলো? সত্যি রতন আর আগের মতো মেয়েদের পিছু নেয়না। কারও উপর নজর দেয় না! গ্রামের মেয়ে গুলোও একটু শান্তিতে পথ চলতে পারে।

মন্ডল সাহেব ভেবে ভেবে কুল-কিনারাহীণ হয়ে নিজের মনকে শান্তনা দেন, যেভাবেই হোক ছেলেতো তার ভালো হয়ে গেছে। সমাজে তো তাকে নিয়ে এখন আর কোন রটনা নেই। এতেই তিনি মহাখুশি!
এই একমাত্র সন্তানের জন্য তার যে আড়ালে আবডালে কত মানুষের কাছে নিচু হতে হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

কারও কারও চোখে তিনি তার কুলাঙ্গার পুত্রের মতোই সমান দোষী!  ভাবে সেই দিন বুঝি তার ফুরালো। কিসের কমতি তার না টাকার, না দাপটের? কোনটাই নয়! শুধু ছেলের কারণে মান সম্মানের একটু হানি হয়েছে। এই যা, তাও হয়তো পূরণ হয়ে যাবে। নিজের মনেই ভাবেন ছেলের আর দোষ কি?  নতুন যৌবনের দাপট সামলাতে পারছেনা।

তাই ঝড়ের বেগে এদিক সেদিক ছিটকে পড়ে মাঝে মাঝে। ওটাও ঠিক হয়ে যাবে বিয়ে করিয়ে দিলে। যাক এতোদিনে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবেন। এভাবে যদি ছেলেটা কিছু দিন থাকতে পারে তবে আর পায় কে?  বিয়ে দিয়ে ঘরে নতুন বৌ এনে দিবেন তখন রতন পাক্কা সংসারী হয়ে উঠবে।

কিন্তু মন্ডল এটা ভাবলেন ঝড়ের আগে প্রকৃতি নিরব থমথমে ভাব ধারণ করে। তার পুত্রের বেলায় তাই হলো নাতে?

তিনি এতদূর ভাবার অবকাশ পে
;  আ
লেন না। এর আগেই এক ঘটনা ঘটে গেল যা তাকে ও পরিবারের সবাইকে তাজ
জ্জব করে দিয়ে গেল।

একদিন সন্ধ্যা হতেই মন্ডল বাড়িতে রাতের খাবার রান্না করা হচ্ছিলো। রতনেঝৈপ্ফর মা বাতের রুগি বেশি নড়াচড়া করতের গেলে ই ককিয়ে উঠেন। তাই তো মিনুর মতো কাজের মানুষ পেয়ে মনে মনে অনেক তুষ্ট। ভাবেন,এমন লক্ষ্মী পয়মন্ত মেয়েটি কোথায় ছিলো?

যাই হোক রান্নার এক পর্যায়ে মিনু হঠাৎ করে উঠে গিয়ে দুয়ারে দাঁড়িয়ে ওয়াক ওয়াক করে বমি করে দেয়। মন্ডল গৃহিণী চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, কি হলোরে মিনু? অমন করে বমি করছিস যে! কিছু না বড় মা! মনে হয় বদহজম হইছে। রতনের মা বাতের শরীর নিয়ে উঠে বলে, তুই যা মা তোর শরীরটা মনে হয় ভালো না। মিনু তবুও না উঠে বলে না বড় মা তেমন কিছু না। আমি ঠিক ঠাক কাজ করতে পারবো।

তা কি এমন খেয়েছিলি যে, বদহজম হলো? মিনু হেঁসে বলে, কালকের একটু তরকারি ছিলো তাই খাইছিলাম। ওতেই মনে হয় এমন হইছে বড় মা!  মন্ডল গৃহিণী রাগের সাথে বলে, কে তোকে বাসি পান্তা খেতে বলেছে। মন্ডলের বাড়িতে কি খাবারের আকাল হইছে যে তোর বাসি খাবার খেতে হবে।  আমি বললাম এখন থেকে বাসি খাবার কুকুর বেড়ালে খাবে তুই না! মিনু মাথা নাড়িয়ে বলে, ঠিক আছে বড় মা!

রান্না প্রায় শেষ এমন সময় মিনু আবার কাজ ফেলে দুয়ারের সামনেই বমি করতে থাকে। এইবার সে অনেকটা কাহিল হয়ে যায়।  রতনের মা বাতের শরীর নিয়ে কাছে গিয়ে বলে, তোরে আগেই বললাম যা ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকগে। কে শুনে আমার কথা?  এখন হলো তো। আচ্ছা বড় মা আমি ঘরে যাই। আপনে আইজ একটু কষ্ট করেন। আচ্ছা! আচ্ছা!  আমি সব সামলে নিতে পারবো।

রান্না শেষ হলে সবাই খেয়ে দেয়ে শুতে গেল যে যার ঘরে কিন্তু মিনু আর খেতে এলোনা। রতনের মা ডাকতে গেলেন। কি রে মিনু খাবার যে ঠান্ডা বরফ হয়ে গেল। খাবি না? মিনু দরজা না খুলেই জবাব দেয়। না বড় মা আজ আর উঠতে পারুম না। একেবারে শক্তি নাই শরীরে!  রাতে না খেয়ে থাকলে তো আরও দূর্বল হয়ে পড়বি। তবুও বড় মা উঠতে পারুম না।
মন্টু কে তাই বলে উপোস করিয়ে রাখবি? মন্টু আর রাতে উঠবে না। কাল সকালে উঠে না হয় খাবে।
আচ্ছা!  খেতে মন চাইলে চাবি নিয়ে যাস। ঠিক আছে বড় মা!

মন্ডলের বউ শুয়ে ভাবেন মেয়েটাকে দিয়ে তিনি বেশিই খাটিয়ে নিচ্ছেন। মনে মনে স্থীর করলেন এখন থেকে তিনি ওর সাথে সাহায্য সহযোগিতা করবেন। স্বামী হারা অসহায়া দুখিনী মেয়ে পেটের জ্বালায় পরের বাড়ি কাজ করতে এসেছে। হয়তো বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবন জলাঞ্জলি দিতে স্থীর করেছে। নয়তো কি এমন বয়স হয়েছে মেয়েটার। গরীবের মেয়ে কম বয়সে বিয়ে হয়ে বাচ্চার মা হয়ে গেছে। তার নূপুরের চাইতেও মেয়েটার বয়স কম হবে। কিন্তু এই বয়সে এমন রুপ যৌবন নিয়ে স্থির করেছে আর বিয়ে নয়।

স্বামী থাকলে এমন বউকে পরের বাড়ি কাজে পাঠাতোনা। কপালটা বড়োই মন্দ অভাগীর!  হঠাৎ করে রতনের মায়ের মনে পড়লো গতকাল তো হঠাৎ করে মেহমান আসাতে ভাত তরকারি দুটোই কম পড়ে। তিনি নিজে কম খেয়ে মিনু খেতে দিয়েছেন। তাও সামান্য। তাহলে তরকারি বাসি কেমন করে হলো? মিনু আর তার ছেলে মন্টু তো তার সামনেই খেয়ে গেল।

তবে কি মিনু মিথ্যা কথা বললো তার কাছে! কিন্তু কেনই বা মিথ্যা বললো? তবে কি অন্য কিছু লুকিয়ে রাখতে চাইছে মিনু তার কাছে থেকে। কিন্তু কি সেটা। এই চিন্তায় মন্ডল গৃহিণীর ঘুম হারাম হয়ে গেল। আবার ভাবলেন এমনিতেও হতে পারে। যাক,সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লেন।

মাতবর সকিনাদের বাড়ি কব্জা করেছে এই বলে যে, সকিনার বাপ কাশেম আলী তার কাছে থেকে লাখ খানেক টাকা ধার নিয়েছে। তার কাগজ যে কেউ চাইলে সে দেখিয়ে দিতে পারে। মোটামুটি একটা সালিসির মতো করে মাতবর ঘটা করে সকিনাদের বাড়ির দখল নিলো। তার কথার উপর কেউ কথা বললো না! মন্ডল সেই সালিশ থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি এলেন।

মন্ডল সাহেবের ঘরে খাবার দিয়ে আসতে হয়। মিনু খাবার নিয়ে যেই মন্ডলের ঘরে যাবে তখনই তার বমি আসতে চাইলো। কোন মতে খাবারটা তার সামনে দিয়ে দৌড়ে বাইরে এসে ওয়াক!  ওয়াক করতে লাগলো। এই দেখে মন্ডলের খাওয়ার ইচ্ছে মরে গেল। তিনি জোরে জোরে রতনের মাকে ডাকলেন।  স্বামীর এমন হাঁক ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে রতনের মা হাজির হলো। দৌড়ে এসে কোনমতে জিজ্ঞেস করলেন, হি হইছে?  এমন চিল্লাচিল্লি করছেন কেন?

মন্ডল মিনুকে দেখিয়ে বলে একে দিয়ে আমার খাবার পাঠিয়েছো কেন? আরেক টু হ’লে তো আমার খাবার উপর বমি করে দিয়েছিলো। রতনের মা এতোক্ষণ মিনুকে খেয়াল করেনি। সত্যি মেয়েটা বমি করে উঠোন ভাসিয়ে দিয়েছে। তুমি জানো এই মেয়ে অসুস্থ?  হুম!  একটু একটু জানতাম কিন্তু এতটা জানতাম না।

আচ্ছা আমি ওরে নিয়ে যাচ্ছি। আপনি খাইয়া লন। নাহ্! এখন আর খামু না। এইসব নিয়ে যাও। মন্ডল বিরক্ত হয়ে বাজারে চলে গেলেন।   তার আজকের খাওয়ার রুচু নষ্ট করে দিলো মেয়েটা।

রতনের মা মিনুকে আড়ালে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, সত্যি করে বলতো মা তোর কি হইছে?  দুদিন ধরে বমি করে যাচ্ছিস।
অসুখ হলে ডাক্তার দেখা। মিনু চুপ করে থাকে। রতনের মা জিজ্ঞেস করে জবাব দে? মিনু বলে বড় মা কিছু হয় নাই। আপনে শুধু শুধু চিন্তা করতাছেন। রতনের মা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলেন, ঠিক আছে ভালো হলেই ভালো!

কিন্তু তিনি খেয়াল রাখতে লাগলেন মিনুর উপর। কেন জানি তার মনে কু ডাক ডাকছে। তাই মিনুর উপর তার নজর রাখতে হচ্ছে।  তার মনে হচ্ছে মিনু তার কাছে থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছে।

তিনি খেয়াল করলেন মিনু খেতে বসে এটা ওটা পাত থেকে তুলে দেয়। অনেক জিনিস নাকের কাছে নিতে পারে না। গরীবের পেট ভয়ানক ক্ষুধার্ত থাকে আর সেই মিনু এখন খেতে পারছেনা। এসব দেখে তো রতনের মায়ের হুঁশ উড়ে যাবার দশা! তিনি আর ভাবতে পারছেন না।

যে করেই হোক তাকে জানতে হবে আসল কারণ কি? তাই তিনি আজ রাতে জেগে থেকে অপেক্ষায় রইলেন তার দৃষ্টির আড়ালে কি ঘটছে দেখার জন্য।  কিন্তু কিছুই তিনি দেখতে পেলেন না। ভাবলেন তিনি হয়তো একটু বেশিই ভাবছেন।  তাই এসব চিন্তা মন থেকে আপাতত ঝেড়ে ফেললেন।

দুরাত পর কড়া নাড়ার শব্দে হঠাৎই তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জানালা খুলে উঁকি দিয়ে দেখলেন একটা ছায়া মূর্তি মিনুর ঘরে প্রবেশ করলো। আর দরজটা বন্ধ হয়ে গেল। তিনি অবাক হয়ে ভাবলেন তবে এই কান্ড ঘটছে তার বাড়িতে। কিন্তু মিনুর ঘরে প্রবেশ করলো কে?

  রতনের মা দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেন। তারপর মিনুর দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে একবার টোকা দিতে চেয়ে কি মনে করে ফিরে এলেন।

ভাবলেন যেই হোক না কেন এখন যদি ওদের হাতে নাতে ধরে ফেলি তবে তারও কম লজ্জা নয়। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন কে হতে পারে। তাই চুপচাপ যেমন এসেছিলেন তেমন চলে যাওয়াই ভালো মনে করলেন ।

এখন একটা কিছু করতে গেলে হট্টগোলের সৃষ্টি হতে পারে। মন্ডলের রাগ একবারে কম নয়। তিনি যদি এসে দেখতে পান এমন ঘটনা তার বাড়িতে ঘটছে তবে কি থেকে কি করে বসেন। কে জানে?

এমনিতেই রতনের সাথে তার সম্পর্ক ভালো নয়। শুধু একটি মাত্র পুত্র সন্তান বলে এখনো তিনি রতনকে এই বাড়িতে রেখেছেন। নয়তো বংশ রক্ষা কে করে।

অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন। মন্ডল নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে কিন্তু রতনের মায়ের ঘুম আর এলোনা। তিনি ঘুমের ভান ধরে বিছানায় পড়ে রইলেন।

ভাবছেন কি হবে এখন সামনে যে বিপদ তিনি দেখতে পাচ্ছেন তা কি করে সমাধান হবে?
একদিন আগে হোক পরে হোক সত্যি ঘটনা প্রকাশ হবে। মন্ডল বাড়ির মান সম্মান বলে আর কিছু থাকবেনা। সব ধূলোয় লুটিয়ে যাবে। তিনি যে কি করে এই সামাল দিবেন তাই তার মাথায় আসছেনা।

বড় দুঃখের সাথে ভাবেন কি কুক্ষনেই না এমন ছেলে তিনি জন্ম দিয়েছেন। সত্যি কি তবে তার পেটের দোষ?
তা কি করে হয় তিনি তো একটা মেয়েরও মা। সেই মেয়ে তার কত পয়মন্ত!  কিন্তু ছেলেটা কেন এমন হলো।

নাকি অতি আদরে তার ছেলেটা এমন বাঁদর হয়ে গেল। এক মাত্র ছেলে বলে কোন আবদার তার অপূর্ণ রাখা হয়নি। তাতে করেই এমন বিগড়ে গেল রতন? কেমন করে এমন হলো এখন তা ভেবে আর কি লাভ।  ক্ষতি যা হবার তো হয়েই গেছে। এখন যেমন করেই হোক তাকেই এই বদনামের হাত থেকে মন্ডল বাড়ির মান সম্মান বাঁচাতে হবে।

সকালের নাশতা করার পর সবাই যখন বাড়ি থেকে চলে গেল, তখন রতনের মা মিনুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যা রে মিনু তোর অসুখ ভালো হইছে?  আজ মন্ডলের স্ত্রীর কথায় হালকা একটা খোঁচা অনুভব করে মিনু!
সে আস্তে করে বলে, হ্যা বড় মা!
আচ্ছা ভালো হলেই বাঁচি।  তা তোর তো হাতের যশ ভালোই সব জায়গায় কাজ পাবি। আমি বলি কি তোকে অন্য জায়গায় একটা কাজ নিয়ে নে। আমার শরীর বড় আলসে হয়ে যাচ্ছে তোকে পেয়ে তাই এখন থেকে ভাবছি নিজের কাজ নিজেই করবো।

কথা শুনে মিনুর আত্মা ছ্যাৎ করে উঠে। একি বলে বড় মা! এখন কোথায় যাবে সে?
রতনের মা জিজ্ঞেস করলেন কি রে কোন জবাব দিলি না যে?
মিনু রতনের মায়ের হাত ধরে বলে, কোথায় যামু বড় মা?
তা আমি কি জানি রে পোড়ামুখী!  বলে রতনের মা থুথু নিক্ষেপ করে বাইরে।

মিনু কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, বড় মা আমি অসহায়া দূর্বল নারী!  কোথায় যামু?  আপনাদের এখানেই পড়ে থাকতে চাই।  রতনের মা মুখ বেঁকিয়ে বলে, তাতো হবে না বাছাধন। তুমি অসহায় বলে আমার বাড়ির বদনাম করবে তা আমি মেনে নেবো না।
মিনু কিছু কিছু বুঝতে পারছে কি বলতে চাইছে বড় মা।
তাই চুপ করে থাকে।
মন্ডলের স্ত্রী এই সুযোগে তারে আরও বাঁকা বাঁকা কথা শুনাতে থাকে।

মিনু তবুও চুপ করে থাকে। রতনের মা জিজ্ঞেস করে, বল তোর পেটে পাপ বাস করছেনা? তোর ঘরে পরপুরুষ আসে না?
তবুও মিনু চুপ করে থাকে। কি বলার আছে তার?

রতনের মা বলে, আজই তুই চুপচাপ এই বাড়ি থেকে চলে যাবি। বাইরে থেকে পর পুরুষ এসে মন্ডল বাড়িতে ফুর্তি করার সাহস করে! আমি যখন একবার দেখে ফেলেছি তখন আমার বাড়িতে থেকে তোকে এমন পাপ করতে আমি দিমু না!
কি, ভালোই তোকে আমি মনে করেছিলাম আর তুই তলে তলে এই?

আজ সন্ধ্যার সময় আমার বাড়ি থেকে তুই চিরদিনের জন্য চলে যাবি!  এই আমার শেষ কথা মিনু। বড় মা, দয়া করেন আমি এই সময় ছোট একটা বাচ্চা নিয়া কই যামু? তার আমি কি জানি পোড়াকপালি!  যখন পাপ করছোস তখন এই কথা তোর মনে ছিলো না? মিনু চোখের জল মুছে বলে, হ্যা! বড় মা  পাপ আমি করছি আলবাত কিন্তু আমারে যে এই পাপে জোর কইরা টাইনা আনছে তার কি কোন শাস্তি নাই?

আছে থাকবো না কেন?  তাহলে তারে কি শাস্তি দিবেন?  তার সাথে যখন পাপ করতে পারছস তখন শাস্তি তারে তুই দিতে পারবিনা। দরকার পড়ে হাতে দা, নিয়া তার কল্লা কাইটা আনগে যা!

মিনু হেঁসে বলে, পারবেন বড় মা সহ্য করতে তখন? মিনু কথাটা বলে তাকিয়ে থাকে মন্ডলের স্ত্রীর মুখের পানে। এই তুই তোর নাগর কে কুপিয়ে মেরে ফেললে আমি সহ্য করতে পারুম না কেন? সে তো আপনার অতি আপনজন বড় মা!
মিনুর কথাটা শুনে তিনি রেগে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, কি বলতে চাস তুই? বাইরের কে না কে, আমার আপন জন হইতে যাবে কেন?

বাইরের নয় বড় মা ! আপনার পেটের সন্তান!  মন্ডলের স্ত্রীর মুখে কোন কথা যোগালো না। তিনি মনে মনে এই আশংকা একবার করেছিলেন কিন্তু পরে ভেবেছেন, রতন এমন কাজ করতে সাহস পাবে না।
কিন্তু তার আশংকা সত্যি হতে দেখে মুখের ভেতর যেন কেউ কুলুপ এঁটে দিয়েছেন। এমন মনে হলো তার।

একটু পরে নিজেকে তিনি সামলিয়ে বললেন,  কার না কার পাপ! তুই আমার ছেলের উপর চাপিয়ে দিতে চাস? তোর এতোবড় সাহস! মিনু অনেক চুপ করে ছিলো কিন্তু তার দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল তাই মরিয়া হয়ে বলে, পরিক্ষা করলে ঠিক বের হয়ে যাবে আমার পেটে কার পাপ!  মন্ডলের স্ত্রী এখনো জানেন না সন্তানের পিতাকে পরিক্ষা করলেই বের করা যায়। তিনি দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তাই কি হয়?

হয় বড় মা! এখন অনেক কিছুই হয়। আচ্ছা মন্ডল সাব বাসায় এসে নিক পরে আমি তোর ব্যাবস্থা করবো। তিনি বললেন, মিনু তোরে তো রতন এখনো দেখে নাই। তো কেমনে তোর খুঁজ রতন পাইলো? আমি তো তোরে আগলাইয়া রাখছি তার কাছ থেকে। রতনের সামনেও তোরে যাইতে দেই নাই।  তবে কেমন করে হলো এসব।

মিনু বলে, সেদিন যখন তার ঘরে খাবার রেখে আসবো তখন তিনি যে ঘরে ছিলেন জানতাম না বড় মা! আমি ঢুকতেই তিনি চোখ মেলে চাইলেন আমার দিকে। আমি তারাতাড়ি ঘুমটা টেনে খাবার রেখে চলে আসি কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। রাতের বেলায় যখন বাইরে গেলাম ফিরে এসে দেখি তিনি আমার ঘরে বসে আছে। আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এখানে কেন? সে বললো, কথা আছে।

আমি বললাম সকালে কইয়েন। তিনি বললেন জরুরি এখনই বলতে হবে। আমি দরজা আগেই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। তাই আর বের হতে পারি নাই। চিৎকার দিতে যামু সে আমার চেপে ধরে বললো, চুপচাপ কথা শুনে যেতে নয়তো আমার মন্টুর গলা সে কেটে দিবে। এই বড় একটা চাকু সে আমার গলায় ধরে বললো, তোর উপর নির্ভর করছে মন্টু আর তোর নিজের জীবন।

আমি ভয় পেয়ে চুপ করে থাকি। আমার সর্বনাশ সে করে দিলো। কোন আকুতি মিনতি তার কানে পৌঁছে নাই বড় মা! মন্ডলের স্ত্রীর মুখে কোন কথা নাই। তিনি উঠে যেতে চাইলেন কিন্তু মিনু তার ধরে বললো, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আমারে একদিনের জন্যও রেহাই দেয় নাই। শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে চুল করে ছিলাম আমি।

আমার যা সর্বনাশ হবার তো হইছেই আমি এবার মন্ডল বাড়ির ইজ্জত ধূলায় মিশাইয়া দিমু। গ্রামের প্রতিটি মানুষের কাছে যামু এর বিচার চাইতে। দেখি তখন আপনারা কোথায় মুখ লুকান। মিনুকে অনেক করে বুঝিয়ে শান্ত করে ঘরে এসে বসলেন রতনের মা!  অপেক্ষা করতে লাগলেন স্বামীর জন্য। এই সমস্যা যে তার দ্বারা সমাধান হবার নয়, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন।

মিনু কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। তাই ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখলেন মন্ডল গিন্নি তার মাথায় হঠাৎ করে সন্দেহ জাগে। আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে না তো মেয়েটা? আর বসে রইলেন না তিনি। এক ছুটে মিনুর দরজার সামনে গিয়ে হাজির হলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে দরজার কড়া নাড়তে নাড়তে ডাকলেন, মিনু! ওমা মিনু!

মিনুর কোন সাড়াশব্দ নেই। তিনি ঘাবড়ে গিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করলেন কি করিস অভাগীর বেটি। তারাতাড়ি দরজাটা খুলে দে।
মিনুর দরজা খুলার কোন লক্ষ্মণ নেই দেখে তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন, এখন কি হবে?

গেইটের সামনে এসে ডাকলেন হাতেম!  এই হাতেম! হাতেম এই বাড়ির বছর বাঁধা কামলা। সে কাজে মগ্ন ছিল হঠাৎ করে বড় মায়ের কন্ঠ শুনে দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করলো। কি গো মা! কিছু বলবেন?  হ্যা রে, আমার খুব অসুখ!  বাজারে গিয়ে তোর চাচাকে বলবি বড় মায়ের খুব অসুখ এখনি যেতে হবে। হাতেম মনে মনে বলে, তাই তো বলি মা কেন আমায় ডাকে এতোদিন হয়ে গেল আমারে কোনদিন বড় মা ডাকেনি।

আচ্ছা মা, আমি এখনি দৌড়ে যাচ্ছি আর কিছু বলতে হবে চাচাজান কে? নাহ্! নাহ এটুকুই বললে হবে। হাতেম কাজ ফেলে দৌড়ে বাজারে চলে গেল।

মন্ডলের আরতে তখন অনেক লোকের ভীড়। হামেম আলীকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন কি রে, বাড়িতে কাজ ফেলে বাজারে কি করিস? হাতেম একটু কাছে গিয়ে বলে, চাচা বড় মায়ের খুব অসুখ তিনি এখনই আপনাকে যেতে বললেন।
মন্ডল চিন্তায়,পড়ে গেল অনেক পাইকার এসেছে। তাদের কাছে অনেক পাওনা তিনি এখন চলে গেলে টাকাগুলোও হাত ফসকে হাত থেকে চলে যাবে।

তিনি বললেন, হাতেম তুই একটা কাজ কর নিপেন ডাক্তারের কাছে গিয়ে বল আমার বাড়িতে যেতে। আর বাজারে খুঁজে দেখ রতনকে পাওয়া যায় কি না? যদি ওকে পেয়ে যাস বলবি তার মায়ের খুব অসুখ এখনি বাড়িতে যেতে বলেছি আমি। হাতেম মন খারাপ করে, জিজ্ঞেস করে বড় মায়ের এমন অসুখ আপনি যাবেন না চাচা জান?

মন্ডল ধমকে উঠে বললেন, তোকে যা বললাম তাই কর। আমার এখানে এখন অনেক কাজ। আমি গেলে কি চলবে? হাতেম মাথা নিচু করে বললো, আচ্ছা আমি যাই চাচা! হুম ঠিক আছে।

মন্ডল পিছনে ডেকে বললেন, হাতেম শোন, জ্বি চাচা জান!  যদি বেশি বাড়াবাড়ি রকমের কিছু হয় তখন আমারে খবর দিস।
আচ্ছা!  বলে হাতেম বেড়িয়ে এলো আরত থেকে। নিপেন ডাক্তারের কাছে গিয়ে তাঁকে পেক সে রুগি দেখতে পাশের গ্রামে গেছে। তাই উনার আসার অপেক্ষায় বসে রইলো।

রতনের মা ডাকাডাকি অব্যাহত রেখেছেন। একটু করে জিরিয়ে নিয়ে আবার ডাকেন। কিন্তু তবুও মিনুর কোন সাড়াশব্দ নেই। ভাবলেন হাতেম কৈ গেলো। সব কামচোরা! ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেল কিন্তু এখনো তাদের আসার সময় নেই।  তার স্বামীর উপর রাগ হলো এখনো তিনি কেন আসছেন না। তার উপর কি উনার একটুও মায়া নেই?

মেয়েটা বন্ধ ঘরের ভিতর কি অনিষ্ট করছে কে জানে? এদিকে ভয়ে তার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। একটা কিছু যদি করে বসে তবে তাদের তো মান সম্মান যাবেই। উল্টো পুলিশের পাঁয়তারা তো আছেই।
আর রতনের স্বভাব তো ভালো নয় কাজটা তার তো হতে পারে। তখন তো ঘর ঘুষ্ঠি সবাইকে জেল খাটতে হবে। নাহ্ তার কিছু ভালো লাগছে না। একটু মনের মধ্যে ভরসা পাচ্ছেন তিনি এই ভেবে যে, মন্টুর কথা ভেবে হয়তো মিনু মরতে যাবেনা। আবার ভাবেন মানুষের মাথায় যখন শয়তান চাপে তখন কি আর কিছু মানে?

একেবারে ভাবতে ভাবতে দিশেহারা অবস্থা তার! সে সময় যদি হাতেম কে দিয়ে দরজাটা ভেঙে দেখতেন তবে তাকে এমন চিন্তায় পড়তে হতোনা।
নিজেকে বড়োই বোকা ও অসহায়া মনে হচ্ছে তার। আবার গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকেন মিনু! মিনুরে আমার কথা একবার শোন! তোর কোন ক্ষতি আমি হতে দেবোনা। রতন যদি এমন কাজ করে থাকে তাহলে তার উচিত শাস্তি তারে আমি নিজের হাতে দিবো। তবুও তুই দরজা খুলে একবার বেড়িয়ে আয়। আমাকে আর চিন্তার মধ্যে ফেলিস না!

হাতেম নিপেন ডাক্তারের আসতে দেরি দেখে রতনকে খুঁজে সমস্ত বাজার ঘুরে কিন্তু কোথাও তার ছায়াটির দেখাও সে পায় না। তাই আবার নিপেন ডাক্তারের কাছে গেল। তিনি এই মাত্র রুগি দেখে ফিরলেন। হাতেম গিয়ে বললো,  ডাক্তার বাবু তারাতাড়ি চলুন! নিপেন ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে কোথায়?

মন্ডল সাগরের স্ত্রী অনেক অসুস্থ তাকে দেখতে হবে। আমি সবে মাত্র রুগি দেখে এসেছি এখন দুপুরের খাবার খেতে হবে। ক্ষিদেয় পেট জ্বালা করছে! তুমি বাপু অন্য ডাক্তার নিয়ে যাও। আমি এখন অত দূর যেতে পারবোনা।  হাতেম বলে ভ্যান নিয়া আইছি বেশি সময় তো লাগবো না। নিপেন ডাক্তার গো ধরে নাহ্ বাপু তবুও আমি যেতে পারবোনা। খিদে পেয়েছে আর খিদে আমি সহ্য করতে পারি না। হাতেম জিজ্ঞেস করে, তাহলে এই শেষ কথা?  হ্যা শেষ কথা!  তাহলে ব্যাগটা আমার কাছে রইলো।  হাতেম নিপেন ডাক্তারের ব্যাগ নিয়ে হাঁটা দিলো।

নিপেন ডাক্তার বাধ্য হয়ে তার পিছু পিছু ছুটলো। বাড়িতে এসে ডাক দিলো হাতেম বড় মা!
হাতেম এর কন্ঠ শুনতে পেয়ে মন্ডলের গিন্নির কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলো। কাছে গিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, উনি এলেন না হাতেম? নাহ্ বড় মা, দোকানে অনেক লোকের ভীড়।  তাই ডাক্তার পাঠিয়ে দিলেন। মহামুশকিল হলো ডাক্তার দিয়ে তিনি কি করেন? তার তো কোন অসুখ হয়নি।

তিনি হাতেম কে বললেন, ডাক্তার এখন দরকার নেই আমার অসুখ ভালো হয়ে গেছে। কিন্তু বড় মা, বললেন যে অনেক অসুখ?  তখন ছিলো এখন নেই!  ডাক্তার বাবুও শুনতে পেলেন। তাই তিনি বললেন, এসে যখন পড়েছি তবে না হয় আপনাকে একবার দেখে যাই? নাহ্ আপনি আরত থেকে ভিজেটের ফি নিয়ে নিবেন। এবার আসুন নমস্কার!

নিপেন ডাক্তার চলে গেলেন। রতনের মা জিজ্ঞেস করলেন, হাতেম একটা দরজা ভাঙতে পারবি? হাতেম কথা ঠিক শুনেছে কি না তা জানতে প্রশ্ন করে কি বড় মা? বলি একটা দরজা ভাঙতে পারবি?  হ্যা পারুম বড় মা! কিন্তু কেন দরজা ভাঙতে হবে বড় মা?
দরকার আছে বলে, রতনের মা চুপ করে থাকে। এমন সময় মন্টু কোথা থেকে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরে। তার আঙুল কেটে রক্ত বেরুচ্ছে। দরজার সামনে এসে মা! মা! বলে কাঁদতে থাকে।

মন্ডলের স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, কি রে মন্টু আঙুল কাটলো কিভাবে?  মন্টু কাঁদে কিন্তু প্রশ্নের জবাব দেয় না। ইস্ কতটা কেটে গেছে তাই তো এতো রক্ত বেরুচ্ছে!  আয়! আয়! তোর হাতটা আমি কিছু দিয়ে বেঁধে দেই। এমন সময় মিনু দরজা খুলে ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসে। তার চোখ ফুলে উঠেছে অনেক কাঁদার ফলে। বড় মা কে দেখেও না দেখার ভান করে ছেলের আঙুলটা বেঁধে দেয় সে। তারপর সে ছেলেকে নিয়ে ঘরের ভিতর চলে যেতে চাইলে মন্ডলের স্ত্রী পথ আঁটকে জিজ্ঞেস করে, এতোক্ষণ ধরে ডাকলাম সাড়া দিলি না কেন?

মিনু চোখের জল মুছে জবাব দেয়, আমার মন ভালো নাই বড় মা!  তাই বলে একবার জবাব দিবি না? জানিস তোর জন্য আমার কত চিন্তা হচ্ছিল। মিনু চোখের পুনরায় মুছে বলে আমি জানি আপনার চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু সেই চিন্তাটা আমার ক্ষতি হবে বলে না বড় মা! চিন্তা হচ্ছিল আমি যদি একটা কিছু করে বসি তবে আপনারা কত ঝামেলায় পড়বেন তা নিয়ে।  মন্ডলের স্ত্রীর মুখে আর কথা যোগালো না।
মিনু বলে, চিন্তা কইরেন না বড় মা! এই অভাগী এতো সহজে মরবো না!

এই বলে মিনু ছেলেকে নিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেল। মন্ডলের স্ত্রী হাতেম গিয়ে বলে, যা, তোর কাজে যা। হাতেম কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে কেন বড় মা? তুই যা হাতেম প্রশ্ন করিস না। হাতেম মনে মনে ভাবে সত্যি বড় মায়ের কঠিন কোন অসুখ হয়েছে।  নয়তো এমন করবেন কেন?

রাতের খাবার শেষে মন্ডলের স্ত্রী স্বামীর পানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, সত্যি আপনি বড় পাষাণ মনের মানুষ!  আমার এতো অসুখ শুনেও তো একবার এলেন না। মন্ডল বউকে বুঝিয়ে বলে, আমি খুব ব্যাস্ত ছিলাম। আর নিপেন ডাক্তার বললো তোমার কিছু হয়নি। যদি আমি ছুটে আসতাম তবে অনেক গুলো টাকা হাত থেকে বেড়িয়ে যেতো। আর এলেও তো বেকার হতো! জানো না বাকি টাকা একবার না পেলে তা তুলতে আমার কতদিন লাগতো? তবুও আমার মন খারাপ হয়েছে এই ভেবে যে আপনি এতো অসুখ শুনেও এলেন না!

মন্ডল হেঁসে বলে, তবে কি এই বুড়ো বয়সে তোমার মান অভিমান ভাঙাতে হবে?  আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? কি কথা রতনের মা? কথাটা কিভাবে আপনারে বলি। কেন কি হয়েছে?

রতনের মা বলে ধরেন কেউ যদি গর্ভবতী হয় কিন্তু বাপের নাম নিয়া উল্টো পাল্টা কথা বলে, তাহলে কি বাপের নাম বের করার যন্ত্র আছে? এমন কথা শুনে তো মন্ডল প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন মানে কি?  মানে ধরেন কেউ জানে না গর্ভের সন্তানের বাবা কে? মা তার বাপের আসল নাম বলতে চাইছে না, তখন কি কোন পরিক্ষা আছে আসল কথা জানার?  মন্ডলের মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো।

তিনি স্ত্রীর মুখটা তার দিকে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে আমারে খুলে বল? রতনের মা সব খুলে বলে। এবং তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন মিনু মিথ্যা কথা বলছেন। মন্ডল বললেন মিনু মিথ্যা বললে তার ব্যাবস্থা আছে কিন্তু আমার মনে হয় কাজটা আর কারও না। আমার একমাত্র অমানুষ ছেলের!

মন্ডলের মাথায় যেন কে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছে তার এমন মনে হচ্ছে। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি বলতে পার কি এমন পাপ আমি করেছি যে এমন একটা ছেলে আমার ঘরে জন্মালো?
তিনি নিরবে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিলেন। তা দেখে রতনের মায়ের খুব কষ্ট হলো! মন্ডল একেবারে নরম লোক নয়। কতটা কষ্টে সে আজ কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিলেন।

রতনের মা তার হাত ধরে বললো, আপনি এমন করছেন কেন? আমাদের রতন ভালো না জানি। কিন্তু এই কাজ তো তার নাও হতে পারে?  নাহ্ সালেহা! এটা রতনের কাজ আমাকে কেউ না বললেও আমি বুঝতে পারছি। সালেহা বেগম চুপ করে থাকেন।

হঠাৎ মন্ডল দৃঢ় কন্ঠে বললেন, এমন ছেলে আমি চাই নাহ্! এই বলে, তিনি দরজার পাশে রাখা একটা লোহার রড হাতে নিয়ে দরজা খুলে বেড়িয়ে পড়লেন। সালেহা বেগম বুঝতে পেরে আঁতকে উঠে বলে, মাথা খারাপ করবেন না। মন্ডল রক্তচক্ষু মেলে বললেন, ওখানেই থাক। আমি না বললে বের হবে না।

মন্ডল রতনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দরজার কড়া নাড়ে। রতন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে কে?  আমি তোর বাপ দরজা খুলে বাইরে আয়!

   বাপের ডাক শুনতে পেয়ে রতন চমকে উঠে এতো রাতে তিনি আবার আমায় ডাকেন কেন?  তবুও বাবার আদেশ বলে কথা তাঁকে দরজা খুলতেই হয়। রতন দরজা খুলতেই মন্ডল সাহেব তাকে টান মেরে বাইরে ফেলে দেন!

রতন বাপের এমন রুদ্র মূর্তি আর দেখেনি। তার হাতে হোলার রড দেখে রতনের হুঁশ উড়ে যাবার কথা। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, আব্বা আপনার হাতে রড কেন? মন্ডল ধমকে উঠে বললেন, আজ তুই আমার সব কথার জবাব দিবি নয়তো এই রড দিয়ে তোর মাথা আমি থেঁতলে দেবো।

মন্ডল রড উঁচিয়ে ধরে, রতন জিজ্ঞেস করে কি করছি আমি? কি করছস তুই জানস না? নাহ্ আব্বা! আচ্ছা মিনুর এই অবস্থা কে করছে বল সত্যি করে নয়তো আজ তোর একদিন কি আমার।

আব্বা আমি কিছু করি নাই। আমার নামে কেউ আপনার কাছে লাগাইছে! আচ্ছা এখনই বোঝা যাবে তুই কিছু করছ না করস নাই।  এই কথা বলে, মন্ডল রড দিয়ে কয়েক ঘা রতনের পায়ে বসিয়ে দিলো। রতন চিৎকার করে বলে, ও আব্বা গো আমি কিছু করি নাই। আমারে ছাইড়া দেন। আমি আর এই বাড়িতে থাকবোনা। রতন কয়েক ঘা খেতেই এমন চিৎকার শুরু করলো যে গাঁয়ের মানুষ জন জেগে উঠবে তাতে। মন্ডল ধমকে উঠে বললেন, চুপ একেবারে চুপ।

আরও কয়েক ঘা খেতেই রতন বেহুঁশের মতো আবোল তাবোল বকতে লাগলো। মন্ডল ধমকে উঠে পুনরায় বলে, সত্যি কথা বল আমি তোরে কিছু বলবো না। নয়তো পুলিশ তোরে ধরে নিয়ে গিয়ে এরচেয়ে বেশি মারবো আর পরিক্ষা করলে তুই এমনিতেই ধরা পড়বি! তবুও রতন বলে, বিশ্বাস করেন আব্বা আমি কিছু করি নাই।
ঐ মেয়েটা ভালো না!

মন্ডল রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তুই খুব ভালো!  তাই-না?  হারমজাদা!
এবার তিনি রডটা মাথার উপর তুলে বলেন, পুলিশের হাতে মার খেয়ে মরার চেয়ে আমার হাতেই মর! রতন বাপের এমন রক্তচক্ষু আগে দেখে নাই। তাই ভয় পেয়ে বলে। বলতেছি! বলতেছি। হুম আমিই সব করছি। মন্ডল রড হাতে নিয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, তোর চেয়ে আমার অপরাধ বেশি তাই মাথাটা রড দিয়ে আগে থেঁতলানো দরকার!

মন্ডল ঘরের ভিতর প্রবেশ করতেই সালেহা বেগম ঘর থেকে চিৎকার করে বেড়িয়ে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন। আহা!রে আমার ছেলেটারে একবারে মাইরা ফেলছে!  পাষাণ মনের মানুষ!  এমন করে কেউ নিজের সন্তানের উপর হাত উঠায়?
একটু দয়ামায়া অন্তরে নাই মানুষটার। আমার ছেলের যদি কিছু হয় তবে মন্ডল বাড়ি আমি আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেব। এই আমার শেষ কথা।

আয় বাজান তুই আমার সাথে আয়! ছেলেকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে উঠতে সাহায্য করলেন সালেহা বেগম।  আর বলতে লাগলেন আমার ছেলে কি একা অপরাধ করছে! মিনুর কি কোন দোষ নাই?  সেই মাগী তো আরামে ঘুমাচ্ছে!  আমি কাল সকালেই ওরে  গাড় ধরে এই বাড়ি থেকে যদি না বের করি তবে আমি নাজায়েজ সন্তান!

সারারাত সালেহা বেগম ছেলের সেবা করে পার করে দিলেন। মন্ডল সাহেব তাকে একটি বারের জন্যও ডাকে নি। খুব ভোরে মন্ডল মিনুর দরজার সামনে এসে ডাকলেন, মা! মিনু।  দরজাটা একটু খোল কিছু কথা আছে। মিনু মন্ডলের ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠে এসে দরজা খুলে দেয়। জিজ্ঞেস করে চাচা জান এতো ভোরে আপনে আমার কাছে। মন্ডল ভিতরে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে বলে, মা আমি অসহায়!  এমন বিপদ আমার সামনে যে কি বলবো।

ভেঙেচুরে আর কি বলবো। যা ঘটেছে আমাদের সবারই জানা। কিন্তু এখনো গাঁয়ের লোক জানতে পারেনি এই যা সান্তনা!  একমাত্র তুমিই পার মা! আমাকে এই কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। গ্রামের মানুষ জানলে আমার এই বয়সে আত্মহত্যা করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না! ইচ্ছে মতো রতনকে আমি রড দিয়ে পিটিয়েছি কিন্তু তবুও জানি তোমার যে ক্ষতি হয়েছে তা লাগবের নয়। কি করবো মেরে তো ফেলতে পারিনা। তুমি চাইলে নিজের হাতে ওকে শাস্তি দিতে পার মা!

নিজের ছেলে বলতে এখন আমার ওর ঘেন্না হয়! এখন যদি গ্রামের মানুষ জানতে পারে তোমারও মান যাবে। এখন বলো মা কি করতে চাও?
মিনু কেঁদে বলে কি করমু চাচা আপনিই বলে দেন? আমি জানি রতনের সাথে কেউ সুখী হতে পারবেনা। তাই বিয়ের কথা আমি বলি না মা! তুমি বরং শহরে আমার বড় ভাইয়ের ওখানে চলে যাও। তোমার যা খরচ হয় আমি সব দেবো এমন কি মন্টুর লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ এখন থেকে আমার। শহরে গিয়ে ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিদ্বান বানাও।

মিনু চোখের জল মুছে বলে কিন্তু আমার পেটে যে আছে তার কি হবে। সব আমি দেখবো মা! ডাক্তারের সব খরচ আমার। নাহ্ চাচা! আমি একে নষ্ট করতে পারুম না। কি করবে মা পাপের সন্তান রেখে?  চাচা পাপ করলে আপনার করেছে কিন্তু আমার পেটের সন্তান তো নয়!
মন্ডল বুঝতে পারলেন এখন তর্ক করার সময় নয়। তাই বললেন, আচ্ছা তোমার যেমন ইচ্ছে হয় মা! তবে আজই রওনা হয়ে যাও শহরে। আমি তোমার সাথে হাতেম আলিকে দিচ্ছি।

খুব সকালেই মিনুকে নিয়ে হাতেম শহরে চলে গেল। মন্ডল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঘরে এসে বসলেন।

রতনের মায়ের ছেলের সেবা করতেই করতেই এখন সময় চলে যায়। মায়ের আদর পেয়ে রতন যেন কচি খোকা হয়ে গেছে। মা বলেন, বাবা! এমন কাজ আর করিস না। তোর বাবা হয়তো আরেক বার আমাদের বাড়ি থেকেই বের করে দিবে? রতন বলে মা! আমার কি দোষ মেয়েটা আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার ফাঁদে ফেলেছে। হ্যা! আমিও বুঝতে পারছি মেয়ে মানুষ প্রশ্রয় না দিলে কি এমন হয়! কিন্তু যাই বলিস বাবা, মানুষ তোকে মন্দ কথা কইতে ছাড়বে না। তোর দোষ যে একেবারে নেই তা কিন্তু না।

আর লজ্জা দিওনা মা! আমি আর এমন কাজ করতে যাবো না। মনে থাকে যেন বাবা। তুই মন্ডল বাড়ির ছেলে। এই গ্রামে যুগের পর যুগ ধরে তোদেরকে মানুষ সম্মান দিয়ে চলছে। আজ যদি তোর কারণে তা ধূলোয় মিশে যায় তবে আমরা তা সইতে পারবোনা!  এই বলে সালেহা বেগম চোখের জল মুছে বাইরে চলে গেলেন।

রতনের পা আগে থেকেই লেংড়া হয়ে ছিলো, এখন বাপের পিটুনি খাওয়ার পর তা যেন আরও পাকাপোক্ত হলো। এখন লাঠি ছাড়া সে চলতে পারে না। অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখিয়ে অবশেষে লাঠি ছাড়ানো গেল কিন্তু তার পা একেবারে ভালো হলোনা। খুড়িয়ে খুড়িয়ে তাকে চলতে হয়। তাই তার নাম একেবারে পাকাপোক্ত হয়ে গেল রতন খোঁড়া।  এই নামে সে এখন প্রসিদ্ধ! রতনের বোন নূপুর তার ননদিনীকে নিয়ে অনেক দিন পর বেড়াতে এলো।

সালেহা বেগম তাদের দেখে অনেক খুশি হলেন! জিজ্ঞেস করলেন জামাই আসেনি? না মা! তার অনেক কাজ তাই আমাকে নিতে আসবে। তা কতদিন থাকবি মা? এবার দিন পনের বেড়িয়ে যাবো মা। ঠিক আছে শুনে খুশি হলাম। তোর সাথে কাকে নিয়ে এসেছিস নূপুর?  ও এটা আমার ননদ ঝুমুর!  সালেহা বেগম ঝুমুকে দেখে চিনতে পারেনি। তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, এটা ঝুমুর?  কি আশ্চর্য সেই যে বিয়ের সময় একেবারে ছোট ছিলো। কিভাবে এতো বড় হলি মা! একেবারে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে গেছে আমার মামনী।  ঝুমুরের মুখটা স্পর্শ করে তিনি বললেন, অনেক সুন্দর হয়েছো মা!  বেঁচে থাকো মা। বেঁচে থাকো!

নুপুর বলে মা মেয়ে মানুষ বড় হতে সময় লাগে না। একেবারে কলা গাছের মতো তারাতাড়ি বড় হয়ে যায়। সালেহা বেগম হেঁসে বললেন, ঠিক বলেছিস নূপুর।  কয়েক দিন বেশ হাসি খুশিতেই ঝুমুরের দিন কাটলো। রতন যখন দেখতে পেল তার বেয়াইন এসেছে তখন বাড়ি থেকে নড়ে না বললেই চলে। রতন এটা সেটা মশকরা করে ঝুমুরের সাথে যা তার ভালো লাগে না। একদিন রতনকে সে বলেই বসলো রতন ভাই এ-সব হাসি তামাশা আমার ভালো লাগে না! রতন এগিয়ে গিয়ে বলে, কি বলো তুমি তো আমার বেয়াইন। তোমার সাথে হাসি তামাশা করবোনা তো কার সাথে করবো বল?

ঝুমুর বলে না আমার সাথে তবুও আপনি মশকরা করবেন না। এ-সব আমার পছন্দ নয়! এই বলে ঝুমুর চলে যাচ্ছিলো। রতন পেছন থেকে তার ওড়না ধরে টান মারে। এই ঘটনায় ঝুমুর কেঁদে ফেলে ওড়না মাটি থেকে তুলে বুকের উপর জড়িয়ে নেয়। তারপর ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে যায়। রতন নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাথার চুল ধরে টানতে থাকে।  তার কি যে হয়ে যায় মেয়ে মানুষ দেখলে বুঝতে পারে না!

ভাবি! ভাবি! আমি আজই চলে যাবো। ঝুমুর কেঁদে নূপুরের কাছে ছুটে যেতে লাগলো ।

নূপুর দেখলো তার ননদিনী কাঁদতে কাঁদতে তার দিকেই আসছে। কি হলো ঝুমুরের তাই সে বুঝতে পারলো না। কছে আসতেই ননদিনীকে জিজ্ঞেস করে সে কি হয়েছে ঝুমুর চোখে পানি কেন?

ভাবি আমি আর এক মূহুর্ত এই বাড়িতে থাকবো না। তুমি দাদাভাই কে খবর দাও। আমাকে যেন এখনি এসে নিয়ে যায়। নূপুর তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে আমাকে আগে বলবি তো? কিছু হয়নি ভাবী আমি আর থাকতে চাই না এখানে।

এই তো এলাম পাগলী!  এখনি চলে যেতে চাইছিস। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমি তোমাকে তো যেতে বলিনি, শুধু দাদাভাই কে খবর দাও সে যেন আমাকে এসে নিয়ে যায়। তুমি তোমার বাপের বাড়ি যতদিন ইচ্ছে থাকো। নূপুর বুঝতে পারে এমন কিছু হয়েছে যা,বলতে ঝুমুর লজ্জা পাচ্ছে। তাই সে বলে, এই পাগলী হাসি খুশিতেই তোর দিন কাটছিলো। হঠাৎ এমন কি হলো বল দেখি? আমাদের বাড়ি কি তোর কাছে পরের বাড়ি!

সালেহা বেগম হেঁসে বলে,  মা আমার কি বলে। আজ কত রকমের পিঠে পায়েসের আয়োজন করছি এগুলো খাবে কে শুনি। নূপুর তুই ওকে নিয়ে বাগান থেকে বেড়িয়ে আয়। ওর মনটা এতে ভালো হবে। নূপূরও মনে মনে তাই ভাবছিলো। ওকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে। তাই আদর করতে করতে ঝুমুরকে সে বাগানে নিয়ে গেল।

একটু নিরিবিলি দেখে একটা জায়গায় বসে বলে, এখন বল দেখি তোর এখানে কি সমস্যা?  ঝুমুর এবার কেঁদে ফেলে বলে, তোমার ভাই ভালো না। সে আমার সাথে অভদ্রতা করেছে। নূপুর কথাটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল!  কোন মতো জিজ্ঞেস করে কি করেছে রতন? তোমার ভাই আমার ওড়না ধরে টান মেরেছে!  কথাটা শুনামাত্র নূপুরের মনে হলো কাছে পিঠে কোথাও বিনা মেঘে বজ্রপাত হল। রতন তোর সাথে খারাপ আচরণ করলো?

হ্যা ভাবী! বলে কিনা আমি তার বেয়াইন তার সাথে আমার নাকি এমনই সম্পর্ক। নূপুর ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো কথা গুলি শুনে। তার ভাই এমন কাজ করেছে শুনতে পারলে তার স্বামী তাকে আর ঘরে তুলবেনা! নয়তো বা চির জীবনের জন্য তার বাপের বাড়ির মুখ দেখার আশা ত্যাগ করতে হবে।  তাই ঝুমুরকে সে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে বললো, এই জন্য বুুঝি আমার ননদিনীর মন এতো খারাপ! তাই না? হ্যা ভাবী। নূপুর ননদিনীর চোখের জল মুছে দিয়ে বললো, আমার ভাইটা একটু পাগলা কিসিমে’র। তুই ভাবিস না। তার পাগলামি আজ টাইট করে দেব। এমন টাইট দিবো যে তোর সাথে এমন মশকরা সে তো আর করবেই না। তুই সামনে পড়লে তাকিয়ে দেখা তো দূরের কথা,  দেখবি তোকে দেখলে হাজার সেলাম দিবে। এমনটা যদি আমি না করতে পারি তবে আমার নূপুর নয়!

তবে বোন আমাকে তোমার কথা দিতে হবে যে,তুমি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে কিছু বলবে না। জানিস তোর ভাইয়ের যে রাগ তাতে করে আমার উপর খামোকা অত্যাচার করবে।  এমনকি বাপের বাড়ি আসাও বন্ধ করে দিতে পারে। এখন তুই ভেবে দেখ বিয়ের পর কোন কারণে যদি তোর স্বামী তোর বাপের বাড়ি আসা বন্ধ করে দেয় তবে তোর কেমন লাগবে?  ঝুমুর একটু ভেবে বলে, হ্যা ভাবী খুব খারাপ লাগবে। এখন বল তুই কি আমার অমঙ্গল চাস। যদি তাই হয় তবে বলতে পারিস তার কাছে।
কি বলবি?

না ভাবী!  তোতোমার তো কোন দোষ নাই। মিছে মিছে তুমি কেন শাস্তি পাবে। আমি কাউকে বলবোনা একথা। আচ্ছা!  তবে এখন চল। রতনের শাস্তির ব্যবস্থা করা যাক। ঝুমুর হেঁসে বলে তাই চল।

নূপুর বাড়িতে ঢুকেয় তারস্বরে ডাকলো মা! মা! সালেহা বেগম বাইরে এসে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে?  এমন করে ডাকছিস কেন? কি হয়নি তাই বলো মা! মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, জান মা! ঝুমুর কেন কেঁদে কেটে চলে যেতে চাইছে? রতনের মা জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে রইলো নূপুরের দিকে।

নূপুর মায়ের কানের কাছে গিয়ে বললো রতনের কৃত কর্মের কথা!  এখন তুমিই ভেবে দেখো মা! তোমার জামাইয়ের কানে যদি একবার এই কথা যায় তবে আমার কি হবে? রতনের মা চুপ করে থাকে। ভাবে ছেলেটার জন্য কি তিনি আর শান্তিতে বাঁচতে পারবেন না! নূপুর অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে, মা আমার কথা কি তোমার কানে গেছে?  সালেহা বেগম বলে, কোথায় এখন সে? কে মা, কার কথা বলছো?
রতন!

আচ্ছা দাঁড়াও দেখি কোথায় আছে তোমার গুনধর পুত্র!  নূপুর রতনের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে রতন পায়ের উপর পা তুলে মহা সুখে পা নাচাচ্ছে।  তাই দেখে এসে নূপুর বলে, মা তোমার ছেলে মনের আনন্দে পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে।
সালেহা বেগম পাক ঘরের কোনায় নারিকেল পাতার সলায় তৈরি ঝাঁটা হাতে নিয়ে বললো,  তুই একটু এদিকটা দেখিস। আমি আজ ওর মন থেকে সব আনন্দ নিংড়ে ছাড়বো।

কিছুক্ষন পর বাইরে থেকে শোনা গেল। ও মাগো! তোমার আজ কি হলো। এমন করে কেন আমায় মারছো। ও মা থামো নয়লে তোমার ছেলে মরে যাবে গো মা! সালেহা বেগম কোন দৃকপাত না করে। ঝাঁটার আগা মুঠো করে ধরে গোড়া দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকলেন!  রতন প্রথম ভেবেছিলো দু এক বার মেরেই মা চলে যাবে। কিন্তু মায়ের প্রচন্ড আঘাত করার ফলে তার সত্যিই মনে হলো মা আজ তাকে ছাড়বে।

শরীরের এমন কোন জায়গা বাদ নেই যেখানে তিনি মারেননি রতন কে। রতন মায়ের পা জড়িয়ে ধরে বললো মা, ছেড়ে দাও আমি মরে যাচ্ছি ” সালেহা বেগম জবাব দিলেন তুই মরেই যা! তোর মতো ছেলে থাকার চেয়ে না থাকাই অনেক ভালে। তিনি হাঁপিয়ে ওঠে ঝাঁটাটা ফেলে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন। রতনের গায়ে জায়গায় ফুলে উঠেছে। কোথাও কোথাও রক্তের ছাপ।

নূপূরও তাকে দেখে চমকে উঠে বলে, মা একি করলো! একে তো প্রায় মেরেই ফেলেছে। তখন মনে মনে ননদিনীর উপর তার অনেক রাগ হলো। যাই হোক না কেন রতন তার মায়ের পেটের ভাই!  তাই ঝুমুরকে এসে বললো, দেখে আয় হয়েছে নাকি আরও মার দিতে হবে?
ঝুমুর বলে ভাবী আমি তো মারতে বলিনি। নূপুর বুঝতে পারে ওকে বলে কি লাভ। ওতো সত্যিই মারতে বলেনি। নাহ বললাম রতন আর তোকে জ্বালাবেনা। ওর আজ যা শিক্ষা হল! শুধু তোকে কেন আর কাউকে ও আর জ্বালাবে না। যদি লাজ লজ্জা বলে ওর কিছু থেকে থাকে।

আমি তোর ভাইকে ফোন করছি কাল এসে যেন আমাদের এখান থেকে নিয়ে যায়। ঝুমুর বলে ভাবী আমার খারাপ লাগছে এতোটা না মারলেও হতো। আমি বাইরে থেকে তার চিৎকার শুনেছি। তুমি মন খারাপ করোনা!  হয়তো দেখবে এই শাস্তি পেয়ে সে ভালো হয়ে গেছে।

রাতে রতনের গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো! রতন মা! মা! বলে ডেকে অস্থির হলো। কিন্তু সালেহা বেগম শুনতে পেয়েও মনকে পাষাণ করে ঠায় বসে রইলেন। মন্ডল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, রতনের কি হয়েছে?  তিনি জবাব দিলেন সামান্য জ্বর। তাহলে তুমি গিয়ে একবার দেখে এসো জ্বরটা বাড়লো কি না? না ওরকম জ্বর জারি এখন সবার ঘরেই হচ্ছে। ও কিছু না। তবুও তোমার একবার ছেলেটা কাছে যাওয়া দরকার সালেহা! মন্তব্য করলেন মন্ডল সাহেব। সালেহা বেগম বললো, আপনি ঘুমান। ওর কিছু হবেনা! বিড়ালের জান নিয়ে এসেছে ও! কি বলছো তুমি মা হয়ে?  বিরক্ত হয়ে বললেন মন্ডল।

যা বলছি ঠিক বলছি। ওর বোঝা দরকার এই দুনিয়ায় অনাদরে থাকলে কতটা কষ্ট হয়!  আর আদর পেতে হলে কিভাবে চলতে হয় পৃথিবীতে। আজ নিজের বউয়ের কথা কিছুই বুঝতে পারলেন মন্ডল। শুধু আচ করতে পারলেন তার মনটা ভালো নেই কোন কারণে। তাই তিনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। হঠাৎ কারও দরজা খোলার আওয়াজ পেলেন সালেহা বেগম। উঁকি দিয়ে দেখেন নূপুর ঘর থেকে বের হয়ে রতনের ঘরের দিকে যাচ্ছে। তিনি বেরিয়ে এসে পিছন থেকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছিস নূপুর?  নূপুর চমকে উঠে বলে, রতনের খুব জ্বর হয়েছে, মা!

ওঁকে একটু দেখে আসি মা? না, ওকে এভাবেই থাকতে দে। তুই ঘরে যা। একটু দেখেই চলে আসবো মা। না!  আমি বলছি তুই তোর ঘরে যা। নূপূর জানে আজ তার মায়ের মন অধিক খারাপ তাই আর তাকে সে রাগালো না। রাতের খাবার আজ সালেহা বেগম খাননি। নূপুর অনেক জোরাজোরি করেছে কিন্তু তিনি শুনেন নি। পরে নূপুর মায়ের এক ধমক খেয়ে শোবার জন্য চলে যায়।
এখনো যে মায়ের রাগ কমেনি তা বুঝতে পেরে কথা না বাড়িয়ে আবার শুতে চলে গেল নূপুর।

অনেক রাত হয়ে গেলে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে তখন সালেহা বেগম পা টিপে টিপে রতনের ঘরে গেলো। রতনের এখন কোন সাড়াশব্দ নেই। তিনি ওর কপালে হাত দিয়ে বুঝতে পারলেন, অনেক জ্বর!  তাই একটা জল পট্টি বেঁধে নিরবে চলে এলেন রতনের ঘর থেকে।

পরদিন নিপেন ডাক্তার এসে রতনকে দেখে ঔষধ দিয়ে গেল।
মা দূর থেকে দেখলেন। বিকাল বেলা জামাই এসে নূপুর ও তার বোনকে নিয়ে গেল। আজ শ্বাশুড়ী একটি বারের জন্য জামাইয়ের সামনে এলো না। যদিও এটা তার মনে খোঁচা দিলো, তবুও নিজেকে তিনি তার সামনে উপস্থাপন করলেন না। জামাই কয়েক বার জিজ্ঞেস করে, শ্বাশুড়ীর কথা। নূপুর এটা সেটা বলে কাটিয়ে নেয়।  জামাই যখন জেদ ধরে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে আম্মার? তখন নূপুর মিথ্যা অসুখের বাহানা করে। জামাই বলে, অসুস্থ মানুষকে না দেখে কেমন করে চলে যাই। জামাই ঘরে এসে শ্বাশুড়ীকে কদমবুসি করে চলে গেল। সালেহা বেগম কোন কথা তার সাথে বলেনি। চোখ বুঁজে শুয়ে রইলো।

কয়েক দিন পর রতন এসে মায়ের কাছে বলে, মা! আমি আর এমন করবো না। তুুমি একবার আব্বারে বলে দেখ। আমি ঝুমুর কে বিয়ে করতে চাই!  ওকে পেলে আমি একেবারে ভালো হয়ে যাবো। সালেহা বেগম রতনের কোন কথার জবাব দিলেন না!

সালেহা বেগম রতন চলে গেলে ভাবলেন রতনের বিয়েটা দিলেই হয়তো রতন ভালো হয়ে উঠবে। তিনি মনে মনে স্থীর করলেন রতনের বিয়ের কথা মন্ডল সাহেবের কাছে বলবেন। কিন্তু রতন যে ঝুমুরের কথা বলে গেল। ওরা কি রাজি হবে বিয়ে দিতে? একে তো রতনের লেখাপড়ার দৌড় ক্লাস নাইন পর্যন্ত আর দ্বিতীয় মেয়েটি যেভাবে রতনের উপর খেপে আছে তাতে করে যদি সে রাজি না হয়।

ভাবলেন মেয়ের গার্ডিয়ান যদি রাজি থাকে তবে মেয়ের আপত্তি আর কতটুকু টিকবে সবার সামনে। যাক এবার একটা সুন্দর সমাধান পাওয়া গেল তার ছেলের জন্য।  তাই মনের,ভিতর কথাটা গেঁথে রাখলেন। আজই তিনি স্বামীকে বলবেন এই কথা আর দেরি নয়।

রাতের খাবার শেষে মন্ডলের জন্য পান সাজিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলেন সালেহা বেগম। ব্যাবসা বানিজ্য কেমন চলছে আজ কাল? মন্ডল চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে আজ তোমার?  সালেহা বেগম হেঁসে বলে, কই কিছু না তো। তবে যে হঠাৎ করে ব্যাবসার কথা জিজ্ঞেস করছো। ও ওটা জিজ্ঞেস করলাম এই কারণে যে, পুরুষমানুষ মানুষের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ভালো চললে মনটাও ভালো থাকে তাই। মন্ডল সাহেব স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, বাহ্ তোমার দেখি ইদানীং রাজনীতিও মাথায় ঢুকছে!

তা জিজ্ঞেস করার কারণ জানলাম। কিন্তু কি উদ্দেশ্য সেটা বল? মানে একটা কথা বলতাম।  মন্ডল একটা হাই তুলে বলে, বলে ফেল মন ভালো আছে আর ঘুম পাচ্ছে। সালেহা বেগম স্বামীর পা টিপে দিতে দিতে বললো, রতনের লেখাপড়া তো হলোই না। বাজে ছেলেদের সাথে সারাদিন ঘুরাঘুরি করে সময় কাটায়। কোনদিন কোন অঘটন ঘটিয়ে বসে বলা তো যায়না!  মন্ডল পা সরিয়ে নিয়ে বলে, বাকি আর রেখেছে কোথায় অঘটন ঘটাতে!  শুধু ধামাচাপা দিতে পেরেছি বলে রক্ষা!

তাই বলছিলাম ওকে যদি, মন্ডল হাত দিয়ে সালেহা বেগম কে থামিয়ে দিয়ে বলে, দোকানে বসতে বলছো? না, না তা নয়। তবে কি বলতে চাও? সোজাসাপটা বল দেখি?  মানে ব্যাবসা বানিজ্য করতে হলে মনটা তো সুস্থির হওয়া চাই।  হ্যা তো অবশ্যই!  বললেন মন্ডল।  না হলে তো ব্যাবসা বানিজ্য ভরাডুবি হবে।  তাই ওকে একটা বিয়ে দিলে কেমন হয়? কথাটা বলে সালেহা বেগম স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো জবাবের আশায়।

মন্ডল কতক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, কথাটা যে আমার মাথায় আসেনি তা কিন্তু নয়! কথা হচ্ছে ওর কাছে মেয়ে দিবে কে?
চারিদিকে তোমার ছেলের যা সুনাম! তাতে করে কেউ জেনেশুনে মেয়েকে জলন্ত আগুনে ফেলতে চাইবে না নিশ্চয়ই। সালেহা বেগম স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাই বলে কি রতনকে বিয়ে দিয়ে সংসারী করতে হবে না? তা তো হবেই। কিন্তু আমি ভাবছি মেয়েটা দেবে কে? আর আমি তো আমার বরাবর না হলে যার তার মেয়েকে মন্ডল বাড়ির বউ করে আনতে পারি না!

ঠিক আছে আপনার কথা আমারও কথা!  বললেন সালেহা বেগম। তাই বলে আমরা বাবা-মা হয়ে তো চুপ করে বসে থাকতে পারি না। ছেলে ভালো হয়ে সংসার ধর্ম পালন করুক সেই চেষ্টা আমাদেরই করতে হবে। নাকি বলেন? হুম!  মনে হচ্ছে তোমার কোন মেয়ে পছন্দ আছে। যেভাবে কথা বলছো। আছে নাকি তেমন মেয়ে ? আমার না, রতনের এক জনকে পছন্দ হয়েছে আপনি রাজি হলেই প্রস্তাব দেওয়া যায়। মন্ডল স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রতনের পছন্দ!  সে আবার কে?

আমাদের নূপুরের ননদ ঝুমুর!  বল কি! সেখানে আমি প্রস্তাব নিয়ে যেতে পারবোনা!  মুখের উপর না করে দিলে। কেমন করে এই মুখ দেখাবো বলতে পার?
সালেহা,বেগম বললেন সে দায়িত্ব আমার কেমন করে প্রস্তাব দিতে হবে। মন্ডল সাহেব বললেন দেখো চেষ্টা করে। কুপুত্র যখন পেটে ধরেছো তখন তো একটু আধটু অপমান তোমারও প্রাপ্য!  আমি আর কি বলবো। শুয়ে পড়লাম।

সালেহা বেগম আর কথা,বাড়ালেন না। মন্ডলের চোখ সবেমাত্র ঘুমে ঘিরে ধরেছে এমন সময় তার মোবাইল ফোনের রিং টোনের আওয়াজে ঘুম টুটে গেল। বিরক্ত হয়ে বিরবির করে বললেন, এমন সময় আবার কে?
দেখলেন তার বড় ভাই শহর থেকে ফোন করেছে। তিনি রিসিভ করে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এতো রাতে হঠাৎ ফোন দিলেন ভাইজান?

ওপ্রান্তে তার বড় ভাই বললেন, তোর ছেলে যে কর্ম করেছে তাতে করে আমাদের চৌদ্দ গুষ্টির ভুগতে হবে দেখছি! কেন কি হয়েছে ভাইজান? মন্ডল নরম সুরে জিজ্ঞেস করে, কি আর হবে। এখন আর বাচ্চাটা নষ্ট করা যাবে না। এতে মিনুর অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আর মিনুর যদি কিছু হয়ে যায় তবে চৌদ্দ গুষ্টিকে পুলিশের হাত কড়া পড়তে হবে। এখন বল কি করা যায়? আমি কি আর বলবো ভাইজান। আপনি যা ভালো মনে করুন তাতে আমার অমত নেই। ঠিক আছে তাহলে বাচ্চা হলে একটা এতিম খানায় দিয়ে দিলেই হবে। আচ্ছা ঠিক আছে বলে মন্ডল ফোন রেখে দিলো।

সাহেলা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, কার ফোন। ভাইজানের ফোন। তা কি বললেন তিনি?  মন্ডল ধমকে উঠে বললেন, কি আর বলবেন!  বললেন মিনুর বাচ্চা নষ্ট করা যাবে না। বাচ্চা হলে এতিম খানায় দিয়ে আসবেন। তোমার আর ছেলের জ্বালায় দেখি আমি একদিনের জন্যও শান্তিতে ঘুমাতে পারি না!  আমি আবার কি করলাম?  অভিমানের সুরে বলে সালেহা বেগম!  কি করোনি তাই বলো। ছেলেটাকে আহ্লাদ দিয়ে মাথায় তুলেছো। তাই তো আজ আমাকে এতো ভোগান্তীর সামনে পড়তে হচ্ছে!

কয়েক দিন পর সালেহা বেগম রতনের মোবাইল দিয়ে নূপুরের কাছে ফোন করে, নূপূর মায়ের কন্ঠ শুনে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে। কেমন আছো মা! এমনিতে তো কখনো খুঁজ খবর দাও না। আজ হঠাৎ কি মনে করে?  আমি তো ফোন করতে পারি না, তাই রতনকে বলে তোর সাথে কথা বলছি। তা কেমন আছিস মা? ভালো আছি মা! তুমি কেমন আছো?  ভালো!
তা বলছিলাম কি নূপুর। কি মা!  রতনের একটা বিয়ে দেওয়া দরকার। নূপুর জবাব দেয় তাই ভালো মা! এতে যদি তোমার ছেলে পথে আসে।

তা নূপুর তোর একটা কাজ করতে হবে। কি মা! কি করত হবে বল?  রতন সেদিন এসে বললো তোর ননদ ঝুমুর কে ওর ভীষণ পছন্দ! তোর বাবা প্রস্তাব দিতে চাইছে না। এখন তুই যদি কথাটা জামাইয়ের কাছে বলিস? নূপুর কথাটা শুনে চমকে উঠে বলে, এসব কি বলছো মা! আমি বলতে পারবোনা মা! ভাইয়ের যা স্বভাব তাতে করে ঝুমুরের জীবনটা আমি ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে পারি মা! তুমি আমাকে একথাটা আর বলোনা। সালেহা বেগম বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এটাই তোর শেষ কথা নূপুর? হ্যা মা!

সালেহা বেগম ফোনটা রতনের হাতে দিয়ে দিলেন। রতন সবই শুনতে পেল কাছে থেকে।  বললো, মা বোন আমাকে দেখতে পারে না তো তাই এমন কথা বলছে। আমি দুলামিঞার কাছে ফোন দিচ্ছি তুমি তার সাথে কথা কও। সালেহা বেগম বলেন, নারে বাপ! জামাইয়ের সাথে আমি একথা কেমন করে বলি? ঠিক আছে কারও কিছু বলতে হবে না। আমি আমার মতোই ঠিক আছি। এই বলে রতন বাড়ি থেকে চলে গেল। রতনের মা অনেক ডাকলেন পিছনে কিন্তু রতন ফিরে তাকিয়ে দেখলো না।

সালেহা বেগম গালে হাত দিয়ে বসে বিরবির করে বললেন, আমার হয়েছে যতো জ্বালা।  অবশেষে রতনের মা ফোন করেন তার বেয়াইনের কাছে। রতন খাওয়া গোছল ছেড়ে দিয়েছে কি করবেন তিনি। ছেলে মরে গেলেও তো মন্ডল আর এসবে জড়াবেন না পণ করেছেন। তার বেয়াইন প্রস্তাব শুনে খুশিই হলেন! বাড়ির সবাই একে একে কথা শুনতে পেল। নূপুর ও ঝুমুর দুজনেই কথাটা শুনে খুশি হতে পারলোনা। জামাই তো আর তার শ্যালকের দুষ্কর্ম্মের কথা জানে না তাই সে-ও ভীষণ খুশি!  আত্মীয়তা আরও মজবুত হবে। সে বিয়েটা যাতে হয়ে যায় সেই চেষ্টাই করতে লাগলো।

ঝুমুর নূপুরের কাছে ছুটে এসে বললো, ভাবী আমি তো রাজি নই এটা ভাইজানকে তুমি বল। নূপুর আস্তে করে জবাব দেয় ঠিক আছে। নূপুরের ইচ্ছে বিয়েটা যাতে না হয়। কারণ ভাইয়ের কারণে তার সংসার জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাক সে এটা চায়না। স্বামীর কাছে ঝুমুর যখন কথাটা বললো, তখন শুনে স্বামী রাগে গর্জে উঠে বলে। বললেই হলো রাজি নয়!
কি দোষ খুঁজে পেল ও।
সে ঝুমুরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি রে তোর ভাবি কি বলছে? ঝুমুর মাথা নিচু করে জবাব দেয়, ভাইজান আমি এ বিয়ে করবোনা!  কেন করবি না শুনতে পারি?  ঝুমুর চুপ করে থাকে।

বোনের নিরবতা নূপুরের স্বামীর গায়ে যেন আগুন জ্বেলে দেয়। বাবা-মা, র কাছে গিয়ে নালিশ করে দেখোছো ঝুমুরের কত সাহস বলে কিনা এই বিয়ে সে করবে না! সবাই যখন অনেক করে বুঝিয়ে ঝুমুর কে রাজি করাতে পারলোনা তখন ঝুমুরকে সবাই ইচ্ছে মতো বকাঝকা করলো। তাই শুনে ঝুমুরের মনে প্রচন্ড অভিমান জমে! সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। যখন সবাই ডাকাডাকি শুরু করে। ঝুমুর কেঁদে ফেলে বলে, আমি এই বিয়ে করবোনা। তখন নূপূরের স্বামী কাকুতি মিনতি করে বলে,আচ্ছা দরজাটা খুলে দে বোন! আমারা তোকে জোর করে তোর অমতে বিয়ে দিবো না।

কথাটা শুনে রতন ও রতনের মায়ের মুখের উপর কেউ যেন চুনকালি লেপে দিয়েছে এমন অবস্থা হলো।

ঝুমুরের না বলে দেওয়াটা রতন যেন মানতেই পারলোনা। এতবড় অপমান তার সহ্য করতে বড় কষ্ট হলো। মাকে তাই বললো, মা দেখে নিও আমি যদি এই অপমানের প্রতিশোধ না নিতে পারি তবে আমার নাম রতন নয়! সালেহা বেগম ছেলের দিকে অগ্নি চক্ষে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি করবি তুই শুনি?

রতন বলে মা! আমি ওর সব অহংকার একেবারে ধূলায় মিশিয়ে দিবো। মা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে মানে? রতন বলে সময় মতো ঠিকই জানতে পারবে। সালেহা বেগম বুঝতে পারলেন ছেলের মনের অভিসন্ধি!  তাই ছেলের সামনে গিয়ে হুংকার ছেলে বললেন,  মনে রাখিস ঝুমুর কে? ঝুমুর কোন খেলনা নয়! তাকে নিয়ে যা খুশি তাই করবি আর তোকে সবাই ছেড়ে দেবে।

আমার মেয়ের চারটে ভাত সেখানে খেতে হবে মনে রাখিস। ঝুমুরের কিছু হলে তুই কি ভাবিস, নূপুর কে তারা ছেড়ে দিবে? আর যদি মনে করিস তোর সাথে আমরা পারবোনা তাহলে মনে রাখিস। আমি যেমন তোকে পেটে ধরেছি লালন পালন করে বড় করেছি। তেমন করে  তোর জীবনের বারোটা বাজিয়ে দেবার ক্ষমতাও রাখি! মায়ের এমন হুমকিতে রতন সত্যি মনে মনে ভয় পেয়ে গেল। কারণ সংসারে একমাত্র মা কাছেই সে একটু ছাড় পায়।

তাই যাবার সময় বলে মা!  তোমার মেয়ের কারণেই আজ আমার মনের আশা পূরণ হলোনা। তবুও আমি তোমার মেয়ের কথা ভেবে মনের কষ্ট মনে গেঁথে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি!  আর আসবোনা এই মন্ডল বাড়ির ত্রি সীমানায়! তোমরা সুখে থাকো।

রাতে ভাত নিয়ে ছেলের অপেক্ষায় বসে আছেন সালেহা বেগম। কিন্তু রতন বাড়ি ফেরেনি। সন্তান যতই খারাপ হোক না কেন তবুও মায়ের অন্তর তার জন্যেই কেঁদে মরে।  মন্ডল সাহেব বিছানা ছেড়ে উঠে এসে জিজ্ঞেস করেন, ব্যাপার কি আজ সারারাত কি রান্না ঘরেই বসে থাকবে? চোখের কোন মুছে সালেহা বেগম জবাব দেয় আসছি, আপনি যান।
তোমার এখানে এতো রাতে কাজটা কি শুনি?
রতন এখনো বাড়ি ফেরেনি।
ফেরেনি তো কি হয়েছে?  পেটে যখন টান পড়বে তখন ঠিকই বাড়ি ফিরবে!

নাহ্! সে আর ফিরবে না! মন্ডল বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, এই কথার মানে কি? সালেহা বেগম চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে,
যাবার সময় বলে গেছে আর এই মন্ডল বাড়ির ত্রি সীমানায় সে আর আসবেনা।

মন্ডল হেঁসে বললেন, ওহ্ এই কথা!  তাতেই তুমি ভয়ে অস্থির হয়ে গেছো! ছেলে তোমার যদি আর না ফেরে এই ভেবে। তুমি পারও সালেহা! তোমরা মা আর ছেলে মিলে আমার জীবন একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিলে।

তিনি ধমকে উঠে বললেন,  এসো ঘরে এসো!  এমন অকর্মার ঢেঁকি ছেলের মুখে এরচেয়ে ভালো কথা কি আর শুনতে পাবে। খাবার ওর ঘরে ঢাকা দিয়ে রেখে এসো! রাতে ফিরে যাতে খেতে পারে। পৃথিবীটা অনেক কঠিন জায়গা যাবে কোথায়!  খাবে কি শুনি! মুখের উপর বলে গেল বলেই ভেবো না তার মতো অমন নরাধম ছেলে বাপের এমন সুখের সংসার ত্যাগ করে দুঃখের সাগরে পড়তে যাবে।

স্বামীর এমন কথায় সালেহা বেগম আর বসে থাকতে পারলেন না! খাবার রতনের ঘরে ঢেকে রেখে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু ঘুম তার এলোনা সারারাত। তেমনি রতনও আর এলোনা সারারাত।

সকালে মন্ডল সাহেবও একটু চিন্তার মধ্যে পড়লেন, সত্যি কি রাগ করে সংসার ত্যাগ করলো নাকি রতন! কিন্তু বাইরে তিনি তা প্রকাশ করলেন না। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কাকুতি মিনতি করে বললেন, আপনি একটু খুঁজে দেখুন ছেলেটা কোথায় গেল?
মন্ডল বিরক্ত হয়ে বললেন, এখনো তুমি সেই চিন্তা নিয়ে আছো? আরে তোমার ছেলের বাজে বন্ধুর কি অভাব আছে!  দেখো গিয়ে কার সাথে গিয়ে কোন কুকাজ করে বেড়াচ্ছে।  আমার এতো সময় নেই যে কাজ ফেলে এমন নরাধম ছেলেকে খুঁজতে বের হবো।

মন্ডল আরতে এসে এক কর্মচারীকে বললেন, হেরে হাসু!  দেখতো আমার কুলাঙ্গার ছেলেটা কোথায় আছে?  জ্বি আচ্ছা! বলে হাসু খুঁজতে বের হলো রতনকে। কিন্তু কোথাও তাকে খুজে পাওয়া গেলনা।
ফিরে এসে হাসু বললো চাচা! কোথাও পেলাম না ভাইজান কে। আচ্ছা ঠিক আছে কাজ কর গে।

এদিকে সালেহা বেগম স্বামীর কথায় নিরাশ হয়ে বাড়ির কাজের লোককে দিয়ে খুঁজতে পাঠালেন। কিন্তু সেও ফিরে এসে নিরাশার বাণী শোনালো! সালেহা বেগম রান্নাঘরে বসে চোখের জলে রান্না করতে বসলেন।

হঠাৎই তার মনে হলো রতন তো বলেছিলো ঝুমুরের অহংকার সে ধূলায় মিশিয়ে দিবে! সেখানে যায়নি তো? তারাতাড়ি কাজের লোকের  মোবাইল দিয়ে ফোন করলেন নূপুরের কাছে। নূপুর শুনে বললো, বললে না তো মা! ভাই তো এখানে আসেনি!
কি হইছে মা? আমার কাছে খুলে কও। সালেহা বেগম জিজ্ঞেস করলেন, তোর ননদ এখন কোথায়?

নূপুর বললো, কেন মা?  সে তো তার খালার বাসায় গেছে!  মন ভালো নেই বলে সবাই তাকে সেখানে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছে।  আচ্ছা ঠিক আছে বলে তিনি ফোন রেখে দিলেন। মেয়েকে আর কিছু খুলে বললেন নাহ্!

আজ তিনদিন হলো রতন বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। সালেহা বেগম আস্তে আস্তে খাবার ছেড়ে দিলেন। মন্ডল সাহেব ভিতরে ভিতরে ছেলের জন্য উৎকন্ঠিত হয়ে পড়লেন।

চারিদিকে লোক পাঠালেন তার খুঁজে। রতনের বন্ধু বান্ধব সবার কাছে খুঁজ নেওয়া হলো কিন্তু কেউ তার কোন হদিস দিতে পারলোনা। মন্ডল সাহেব ভাবলেন, হঠাৎ করে ছেলেটা তার কোথায় হাওয়া হয়ে গেল! কেউ তাকে কিছু করে ফেললো না তো?

মাতবর তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, চিন্তা করোনা মন্ডল! যুবক পোলা হারিয়ে তো যাবেনা!  দেখো কোথাও রাগ করে গিয়ে বসে আছে। মন্ডল মনে মনে বললেন, তাই যেন হয়।

বাড়িতে এসে তিনি দেখলেন, তার স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ।  নিপেন ডাক্তারকে খবর পাঠালেন। নিপেন ডাক্তার এসে দেখে বললেন, শরীর বড় দূর্বল! প্রেসার একেবারে লো! মনে হয় খাওয়া দাওয়া ঠিক মতো করেন না। ভালো মন্দ খেতে হবে। আর আমি কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি তা এনে খাওয়ান ঠিক হয়ে যাবে।
স্ত্রী যে ঠিক মতো খায়না তা মন্ডলের আগেই সন্দেহ হয়েছিল। আজ প্রমাণ পেলেন।

অসুস্থ মানুষ তাই আর কিছু বললেন নাহ্। মেয়ের কাছে ফোন করে সব কথা খুলে বললেন, নূপুর সব শুনে বললো, বাবা আমি কাল সকালেই এসে হাজির হবো।

নিপেন ডাক্তার চলে গেলে মন্ডলের হঠাৎ মনে পড়লো ছেলে যে তার বাড়ি ছেড়ে গেল তার কাছে টাকা পয়সা তো থাকার কথা নয়। আর টাকা পয়সা না থাকলে এতোদিনে চলে আসার কথা!  তবে কি তার বাক্সের ভেতর থেকে টাকা নিয়ে গেছে?  তারাতাড়ি আলমারি খুলে দেখলেন, যা সন্দেহ করেছিলেন তাই। বাক্সের ভেতর লাখ তিনেক টাকা রেখেছিলেন। কখন কোথায় দরকার পড়ে ভেবে।  সেখানে দুই লাখ পরে আছে আর বাকি এক লাখ উধাও!

তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলে তার টাকা উড়ানোর জন্য ব্যাস্ত! বাড়ির কথা তাই তার মনে নেই। রাগে তার শরীর কাঁপছে কিন্তু বলবে কাকে? ছেলের চিন্তায় মা যে তার বিছানা নিয়েছে!  তবুও কানের কাছে গিয়ে বললেন, আর না খেয়ে শরীর নষ্ট করতে হবে না! তোমার ছেলে লাখ টাকা নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন!  টাকা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসছেনা। সালেহা বেগম ওপাশ ফিরে সবই শুনলেন।

সকালে নূপুর উঠানে এসে হাজির হলো। মায়ের শরীরের এমন অবস্থা দেখে কিছু মিষ্টি কথা আর কিছু তিক্ত কথায় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো।

আরতে যেতেই হাসু এসে বললো, চাচা! রতন ভাইয়ের খুঁজে আমি একজনকে লাগিয়ে ছিলাম। মন্ডল সাগ্রহে হাসুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। সে খুঁজে পেয়েছে!  তিনি হাসুকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায় সে?

হাসু দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে! কি করে কথাটা বলি চাচা! মন্ডল ধমকে উঠে বলে, বল! অমানুষ ছেলের বাপ আমি!  শুনতে আমাকে হবেই কোন নরকে আছে সে?

হাসু একদমে কথাগুলো বললো,  চাচা সে দিনের বেলায় মুচার পাড়ার মদের আড্ডায় পড়ে থাকে আর রাতের বেলায় পূব পাড়ার যাত্রার দলের সঙ্গে সময় কাটায়!

ঠিক আছে তুই যা! মন্ডল লোক লাগিয়ে খবর নিলেন। হাসুর কথা সত্যি! রতন দিনের বেলায় মুচার পাড়ার মদের আড্ডায় থাকে আর রাতের বেলায় যাত্রা দলের সঙ্গে রাত কাটায়!

সেখানে যাত্রা দলের নতুন সুন্দরী নায়িকা মিস জেরিন এর পিছনে আঠার মতো লেগে থাকে।  তার পিছনে বিস্তর টাকা পয়সা খরচ করছে। তার রুপের ঝলকে নাকি রতন দিওয়ানা হয়েছে!

লোক মুখে শোনা গেছে মিস জেরিন রাজি হলেই নাকি রতন তাকে বিয়ে করে বাড়িতে তুলবে।

#চরিত্রহীন_১৪_তম_পর্ব

এই নীলমনি আজকের মদটা আমার জন্য একটু কড়া করে দিস। কেনরে বাবু আজ কি তোর মরার সাধ হয়েছে?  নাহ্ রে মারার সাধ হয়েছে। বিরক্তিকর হেঁসে বলে রতন! নীলমনি রতনের চোখে চোখ রেখে বলে, তা কারে মারতে চাস বাবু? রতন ধমকে উঠে বলে, তা দিয়ে তোর কাজ কি রে। যা বলছি তাই কর।

নীলমণি চলে যাচ্ছিল রতন পিছনে ডেকে বলে, হ্যা আরেকটা কথা। কি কথা বল বাবু? তোর ব্লাউজ নেই? আছে বাবু! তা পরিস না কেন? সে আমার ভালো লাগেনা!  তোর ভালো লাগুক আর না লাগুক আমার সামনে এখন থেকে ব্লাউজ ছাড়া কাপড় পড়ে আসবি না। কেন বাবু!  আমার কোন সমস্যা নেই তোর কি সমস্যা?

রতন খেঁকিয়ে উঠে বলে, যা বলছি তাই কর। আমার সামনে এভাবে আর আসবি না। কাস্টমার ধরার ফন্দি তাই না? হ্যা তাই নীলমনি হেঁসে বলে। রতনের মেজাজ বিগড়ে যায়। বলে, এই আয়নায় গিয়ে দেখ কেমন দেখা যায়।

নীলমণি ঘরের ভিতর যেতে যেতে বলে, বল তোর আমার উপর থেকে সরতে চায় না। এই এদিকে আয়! রতন নীলমণিকে কাছে ডাকে। দূর থেকেই নীলমনি বলে, বল শুনতে পাচ্ছি। আমি বয়রা কালা নই!
রতন বলে, তোর মতো নিচু জাতের মেয়ে মানুষের কাছে আমি আমার জাত মারতে চাই না বুঝতে পারলি।

নীলমণি কম যায়না কড়া জবাব দেয়, আহা! বড় জাতের মানুষ!  তা এখানে নীলমনির ঘরের সামনে এসে ধর্ণা দিস কেন? আর কোন ঘর নাই। রতন বুঝতে পারে এর সাথে পেরে উঠা তার সাধ্য নয়। তাই চুপ করে থাকে।

নীলমণি এমন কড়া মদ আজ রতনকে দেয় যা খেয়ে। সেই সকাল বেলা নীলমনির বারান্দায় পড়েছিল আর হুঁশ ফিরে রাত হয়ে গেলে। উঠেই চারপাশে তাকিয়ে দেখে মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল।

এই নীলমনি!  নীলমণি!  রতনের ডাকে নীলমনি ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে জিজ্ঞেস করে। এই বাবু এমন করে চেঁচামিচি করছিস কেন? আমি তোর ঘরের বউ না!  বুঝতে পারলি। কথা আস্তে আস্তে বল।

রতন জিজ্ঞেস করে কি খাওয়ালি আমায়? মাথা এখনো ঘুরছে! সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না কেন? নীলমণি হেঁসে বলে, সহ্য করতে পারবি না তো চাইলি কেন? যা এখান থেকে। রতন খেকিয়ে উঠে বলে, থাম! তোর এখানে থাকতে আসিনি। শালি ছোট লোক!  পাওয়ার কত রতন মন্ডলের সাথে পাওয়ার দেখায়। নীলমণি সেই সকাল থেকেই রতনের উপর চটে ছিলো। তাই ছোট জাত বলাতে পরে থাকা ঝাটাটা হাতে তুলে নেয়। তাই দেখে রতন কথা না বাড়িয়ে সোজা হাঁটা ধরে।

রতন মাতাল হয়ে আজ যাত্রার প্যান্ডেলে গিয়ে মিস জেরিন কে খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথাও দেখতে পায় না। তার ভীষণ রাগ হয় মিস জেরিন এর উপর। কোথায় গেল সে। তাকে পাগল করে দিয়ে। তাকে শাস্তি দেবার জন্য মাতাল হয়ে এসেছে সে।

রতন গালিগালাজ করতে থাকে। তা শুনে যাত্রার নায়ক নগেন্দ্রনাথ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে কি সমস্যা আপনার?  মদ খেয়ে মাতাল হয়ে এমন বাজে গালিগালাজ করছেন কেন? রতন নগেন্দ্রনাথ এগিয়ে গিয়ে এক ঘুসি মেরে বলে, তোর তাতে কি? তোর বাপের টাকায় মদ খেয়ে এসেছি। শালা দুই টাকার শিল্পী!  আমার সাথে লাগতে আসে।

রতন চেচিয়ে বলে,মিস জেরিন কোথায়? তার সাথে আজ আমার একটা রফাদফা করার আছে। নগেন্দ্রনাথ রতনের এক ঘুসি খেয়ে নিজের পতন রক্ষা করতে না পেরে মাটিতে পড়ে যায়।  সে শিল্পী মানুষ মারামারি করে অভ্যস্ত নয়। তাই তাল সামলাতে পারেনি। এই কান্ডে তাবুর ভেতর থাকা সব শিল্পী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। তারা এগিয়ে এলো। নগেন্দ্রনাথ উঠে বসে, হাত দিয়ে দেখে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে সে তা মুছে রতনের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি তো মানুষ নও হে! অসভ্য জানোয়ার একটা! এমন করে কেউ কাউকে মারে!

রতন আবার তেড়ে আসে তার দিকে। রাগে অগ্নি মূর্তি ধারণ করে বলে, কি আমি অসভ্য!  আমি জানোয়ার!  আর তোমরা বেশ মানুষ তাই না! রুপ দেখিয়ে পুরুষ পাগল করে খাও।

 দেখাচ্ছি আজ অমানুষ কাকে বলে। নগেন্দ্রনাথ রতনের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পিছিয়ে যায়। দলের শক্তি শালী দুই শিল্পী পিছন থেকে রতনকে ঝাপটে ধরে। রতন বন্দী হিংস্র বাঘের মতো হুংকার ছাড়তে থাকে।  পালোয়ান দু’জন তাকে এমন ভাবে ধরে যে ছুটার কোন ফাঁক নেই।

দুই পালোয়ান তাকে ধরে তাঁবুর বাইরে নিয়ে ফেলে আসে। তবুও রতন আবার প্রবেশ করতে চাইছে। তখন এক পালোয়ান বললো, চলে যাও! আর বাড়াবাড়ি করলে ভুলে যাবো আমি ভীনদেশী!  ঝামেলা চাই না বলে ছেড়ে দিচ্ছি!  তবুও রতন তাদের কথা মালুম করে না। জোর করে ঢুকতে চায় তাঁবুর ভেতরে কিন্তু পালোয়ান দু’জন ওকে বারবার ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।

এক পালোয়ান আরেক পালোয়ান কে বলছে শোন, আমাদের কিছু করার দরকার নাই। কমিটির লোক খবর দে। এরা এই গ্রামের লোক লাগতে যাওয়া ঠিক হবে না।

তৎক্ষনাৎ কমিটির লোকের কাছে ফোন করা হল। একটু পরেই কমিটির প্রধান এসে হাজির। সে মারমুখী হয়ে এগিয়ে যায় রতনের দিকে। মনে মনে বলছে কার এতবড় সাহস!  আমার কথা তার মনে নাই নাকি? রতন তখন পিছনে ফিরে অন্যমনষ্ক হয়ে ছিলো। কমিটির প্রধান গাঁয়ের উঠতি নেতা সাইফুল তাকে পিছন থেকে ধমকে উঠে। এই তুই কে রে? তোর এতবড় সাহস আমার শিল্পীর গায়ে হাত তুলিস।

রতন তার দিকে ফিরতেই মুখ দেখে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে, বড় ভাই আপনি এখানে?  সাইফুল মনে মনে বলে, শালা পরিস্থিতি দেখি আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। এই রতন খুঁড়া এখানে কি করে? মনে মনে বললো সে।

রতনের অনেক নুনু সাইফুলের পেটে এখনো ঠিক মতো সেদ্ধ হয়নি। তাই সাইফুল বিচার করতে এসে নিজেই অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখে কোন কথা নেই।

রতন সাইফুলকে রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি রে সাইফুল  তুই আমার বিচার করতে আইছস? না ভাই ঠিক তা না। ফোন করে বললো, এখানে নাকি গন্ডগোল করছে কে যেন, তাই দেখতে আইলাম। রতন এগিয়ে গিয়ে বলে, আমি!  এখন বল কি বলবি?

সাইফুল নিম্ন স্বরে জিজ্ঞেস করে ভাই আপনি যাত্রার নায়কের নাক ফাটিয়ে দিছেন। আর কতক্ষণ পরেই যাত্রা শুরু হবে। বলেন তো কেমন করে বেচারা অভিনয় করে?  রতন রাগে ফুঁসে ওঠে বলে, শালার ব্যাটা আমারে ব্যাবহার শিখাতে আসে। ভদ্রতা দেখাতে বলে। তাই রাগ উঠে গেল। ঠিক আছে ভাই!

সাইফুল বলে, ভাই এদের সাথে কি আপনার ঝগড়া করা সাজে? সাজে না! আপনাকে ওরা চিনে নাই। তাই হয়তো জিজ্ঞেস করেছে।  এখন ভাই কথা হচ্ছে নায়ক নগেন্দ্রনাথ যদি রাগ করে চলে যায়। তবে এবারের মতো যাত্রা পালা বন্ধ হয়ে যাবে। আমি তাই শুনে এলাম কয়েক জনের মুখে। আসেন ভাই ব্যাপারটা এখানেই মিটমাট করিয়ে দেই। রতন জিজ্ঞেস করে আমাকে এখন কি করতে হবে ?

তেমন কিছু না ভাই, শুধু নায়কের হাত ধরে একটু বলবেন, আমার মাথা ঠিক ছিলো না। তাই এমন একটা ভুল হয়ে গেছে। রতন হেঁসে বলে, যদি না যাই তবে?
সাইফুল হতাশ হয়ে বলে, ভাই তবে আমার আপনার এই গ্রামের ইজ্জত যাইবো। আর কোন দিন কোন শিল্পীগুষ্ঠি এই গ্রামের মধ্যে  আসতে চাইবো না।

রতন বলে, ঠিক আছে তোমার কথায় রাজী আছি কিন্তু এক শর্তে।  কি শর্ত ভাই?
যাত্রার নায়িকা মিস জেরিন আমার সাথে দেখা করছে না। তার সাথে আমার দেখা করার ব্যাবস্থা তুমি করবা? নেতা আগে পিছনে না ভেবেই সায় জানিয়ে দেয়।  তারপর রতন ও নায়ক নগেন্দ্রনাথ এর মাঝে মিটমাট করিয়ে দিয়ে সাইফুল চলে যাবার জন্য উঠে। কিন্তু রতন তার হাত ধরে বসিয়ে দিয়ে বলে, আমার কাজ না করে দিয়ে কোথায় যাও?

কাল দেখা করিয়ে দেই। না আজকেই দেখা করতে হবে। কিন্তু রতন ভাই আর আধ ঘন্টা পরে নায়িকা পুরো ব্যাস্ত হয়ে যাবে। কেমন করে সম্ভব এখন? তা আমি কি জানি। নির্বিকার চিত্তে বলে রতন! ঠিক আছে আমি দেখছি বলে, সাইফুল একজনকে বলে, কেটে পড়ে।

একটু পরেই যাত্রার বাদ্যবাজনা বেজে উঠলো। কমলা সুন্দরী পালা। লোকে লোকারণ্য। জমে উঠেছে ক্রমেই পালা। আর এদিকে রতনের মনে ক্রমেই রাগ জমাট হচ্ছে।  দর্শক অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে করতালি দিচ্ছে। বিশেষ করে নায়িকা মিস জেরিন এর অভিনয় দর্শকদের মন কেড়ে নিয়েছে।  রতন এখন সামনে বসে অভিনয় দেখছে। সত্যি বলতে মিস জেরিন কে সে দেখছে। তার উপর নজর রাখছে।

এমন সময় নায়ক নগেন্দ্রনাথ ও নায়িকা জেরিনের একটি অন্তরঙ্গ মূহুর্ত এলো। সেই দৃশ্য দেখে  দর্শক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। আর রতনের শরীরে জ্বলে উঠে আগুন।  আর তখনি সে স্টেজে লাফিয়ে উঠে জেরিনের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চায়। নগেন্দ্রনাথ বাঁধা দিয়ে বলে, আরে পাগল নাকি! অভিনয় চলছে কি করছো তুমি?  রতন নগেন্দ্রনাথ কে ধাক্কা দিয়ে স্টেজে ফেলে দেয়। বলে তোর জায়গায় তুই থাক। একেবারে চুপ!

চারপাশে দর্শক দাঁড়িয়ে উঠে হইচই বাঁধিয়ে দেয়। হঠাৎ করে কারেন্ট চলে যায় আর তখনি হুলুস্থুল কান্ড শুরু হয়ে যায়। দর্শক চিৎকার চেচামেচি শুরু করে।  তারাতাড়ি জেনারেটর চালু করা হল। কিন্তু স্টেজ নায়িকা শুন্য!

দর্শক স্টেজে তাকিয়ে দেখলো নায়ক নগেন্দ্রনাথ তেমনি ভাবে পড়ে আছে। আর রতন আর নায়িকার কোন হদিস নাই।  কোথায় গেল নায়িকা? শুরু হয়ে গেল খোঁজা খুঁজি কিন্তু কোথাও পাওয়া গেলনা তাদের। কমিটির লোক ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো এই ঘটনায়। একটু পরেই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো রটনা যে রতন খুঁড়া নায়িকা মিস জেরিন কে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। নায়িকার একটা সর্বনাশ না করে সে ছাড়বেনা!
নায়িকার প্রেমে পাগল হয়ে গেছে সে।

তাঁবুর ভেতরে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখা হলো কোথাও তাকে পাওয়া গেলনা। রতনের ছায়াও কোথাও দেখা গেল না। তখন কমিটির লোক ও যাত্রা শিল্পীদের বুঝতে বাকি রইলো না কাজটা কার? রতন মিস জেরিন কে জোর কোথাও ধরে নিয়ে গেছে কিন্তু কোথায়?  ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লো শিল্পী থেকে শুরু করে নেতা পর্যন্ত।

এই গল্পের পরবর্তী আপডেট আসছে খুব শীঘ্রই …
সঙ্গে থাকুন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *