একটি ধূসর প্রেম – Bangla Uponnash Read Online Free – Bangla Uponnash Book

এই গোধূলির সময়টা খুব মনোরম লাগে শ্রেষ্ঠার। স্কুল যাওয়া আসার রাস্তাটা সমুদ্রের পাশ ঘেঁষেই গেছে! যাওয়ার সময়টা বেশ তাড়া থাকে, কিন্তু ফেরার সময়টাতে পরিবেশটাকে বেশ উপভোগ করতে করতে পথ চলা যায়! মাস ছয়েক হল শ্রেষ্ঠারা দক্ষিণ ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী এই ছোট অথচ সুন্দর জায়গা পুদুচেরিতে এসে থাকা শুরু করেছে। শ্রেষ্ঠার বাবার বদলির চাকরি। তাই ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত জায়গায় ওদের ঘুরে বেড়াতে হয়! প্রথম প্রথম  শ্রেষ্ঠা যখন খুব ছোট ছিল তখন ওর খুব মন খারাপ করতো। এইভাবে ওকে কত বন্ধুদের ছেড়ে  আসতে হয়েছে! সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছিল যখন জয়সালমির থেকে আসার সময় অম্বিকাকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল! জয়সালমিরে ওরা প্রায় ৫ বছর মতো ছিল, মানে শ্রেষ্ঠা ক্লাস ২ থেকে ৭ অব্দি ওখানেই পড়াশুনা করেছে আর অম্বিকা ছিল ওর প্রাণের বন্ধু। কি গভীর বন্ধুত্ব ছিল ওদের দুজনের! একসাথে স্কুলে যাওয়া , আসা, মেলাতে ঘোরা, অম্বিকাদের বাড়িতে সেই দাল বাটি চুরমা খাওয়া! আহা! সেই স্বাদ এখনো শ্রেষ্ঠার মুখে লেগে আছে! আর অম্বিকার পছন্দ ছিল বাঙ্গালীদের চিংড়ির মালাইকারি! অম্বিকারা দুই ভাই বোন ছিল, অম্বিকাই বড়। ওর ভাই অর্জুন শ্রেষ্ঠাদের থেকে দুই ক্লাস নিচে পড়ত। শ্রেষ্ঠার কোন ভাই বোন ছিলনা বলে রাখীর দিন ওরা দুইজন মিলে অর্জুনকেই রাখী পরাত। শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলো শ্রেষ্ঠার কাছে সবচেয়ে দামি আর মনোরম ছিল! অম্বিকার বাবা একটা ছোট ষ্টেশনারীর দোকান চালাত, কিন্তু দুই ছেলেমেয়েকেই শিক্ষিত করে তোলার দিকে কড়া নজর ছিল তার। অম্বিকাও পড়াশুনাতে ভালোই ছিল। ইতিহাস ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। ও সেইসময় শ্রেষ্ঠাকে বলেছিল  “ বাবা আমাদের দুই ভাই বোনকে সাইন্স নিয়েই পড়াতে চায় জানিসতো! কিন্তু আমার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করার ইচ্ছা সুমিত্রা দিদির মত। সুমিত্রা দিদি এই কদিন আগে যখন জয়পুর থেকে এসেছিল তখন বলছিল আমাকে  যে এই রাজস্থানেরই অলিতে গলিতে কত অতীত দাফন আছে, কত অজানা ইতিহাস আছে! ওরা ঘুরে ঘুরে সেইসব ইতিহাসের খোঁজ করে।“ “ সেই অজানা ইতিহাস তোকে বলেছে সুমিত্রা দিদি?” চোখ দুটোকে বড় বড় করে জিজ্ঞেস করেছিল শ্রেষ্ঠা। “ না রে, সেসব বলতে গেলে নাকি অনেক সময় লাগবে। তবে হ্যাঁ এবার যখন বড় ছুটিতে আসবে তখন অনেক গল্প বলবে বলেছে দিদি” হাসি হাসি মুখে বলেছিল অম্বিকা। “ আমাকেও ডেকে নিবি কিন্তু” আব্দারের সুরে বলেছিল শ্রেষ্ঠা।
এরপর একদিন হটাত করেই শ্রেষ্ঠার বাবার ভুবনেশ্বরে বদলি হয়ে যায়। শ্রেষ্ঠা কিছুতেই যেতে চাইছিলনা। কিন্তু কারুর কিছু করনীয়ও নেই! অগত্যা তার প্রাণের সখী, সেই খেলার মাঠ, স্কুলের বারান্দা, বাড়ির সামনের বাগান, দাল বাটি চুরমা…সব কিছুকে পিছনে ফেলে চোখের জল ফেলতে ফেলতে চলে আসতে হয়েছিল শ্রেষ্ঠাকে! সেই থেকেই শ্রেষ্ঠা একটু বেশিই চুপচাপ হয়ে গেছিল। সেই সময় ফোনের চল ছিলনা সেরকম। তাই অম্বিকাদের সাথে যোগাযোগ রাখাও সম্ভব হয়নি। নতুন স্কুলে শ্রেষ্ঠা আর সেরকম বন্ধু পায়নি, বলা চলে পাওয়ার চেষ্টা করেনি। সময় হল একটা অদৃশ্য উপশমকারী! এর প্রবাহের সাথে সাথে সব দুঃখ, ব্যাথা, বেদনা ম্লান হয়ে যায়। শ্রেষ্ঠাও একসময় সব কিছু মানিয়ে নিলো। বুঝতে শিখল যে তার বাবার কাজটাই এরকম, এতে কারুর কিছুই করনীয় নেই।   
এখন শ্রেষ্ঠার ক্লাস ১১। পুদুচেরিরই একটা গার্লস স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে। ভুবনেশ্বরে ক্লাস ১০ অব্দি পড়ার পর ওর বাবার পুদুচেরিতে বদলি হয়। স্কুল ওদের বাড়ি থেকে মিনিট ১০র রাস্তা, কাছেই বলা চলে। তাই শ্রেষ্ঠা পায়ে  হেঁটেই যাতায়াত  করে। “ এই শ্রেষ্ঠা দাঁড়া…ওই দাঁড়া না” নিজের নামটা শুনে পিছনে ফিরে তাকাল শ্রেষ্ঠা। দেখল ওর ক্লাসের আরতি প্রায় ছুটতে ছুটতে ওর দিকেই আসছে। “ বাপরে! তুই না সত্যি! বললাম আজ একসাথে ফিরবো তাও দাঁড়ালি না আমার জন্য!” হাঁফাতে হাঁফতে বলল আরতি। “ওহ! আই আম সরি রে! আসলে ছুটির সময় তোকে আর দেখতে পেলামনা, তো ভাবলাম হয়তো চলে গেছিস” নরম সুরে বলল শ্রেষ্ঠা। “ থাক! ঐরকম ভুলো মন তোর, আমার নয় বুঝলি যে দাঁড়াতে বলে পালিয়ে যাব ” কপট রাগ দেখিয়ে বলল আরতি। শ্রেষ্ঠা আর কিছু বলার মত খুঁজে পেলোনা। আরতিদের বাড়িটা ওদের বাড়ির দু গলি আগে। মানে স্কুল থেকে ফেরার সময় আগে আরতিদের বাড়ি আসবে তারপর শ্রেষ্ঠাদের। আরতিও শ্রেষ্ঠার মতই পিওর সাইন্সের স্টুডেন্ট, একই ক্লাসে পড়ে। আরতিরা তামিল। কিন্তু ইংলিশ পরিষ্কার বলে, আর হিন্দিটা ভাঙ্গা ভাঙ্গা!শ্রেষ্ঠা চুপ করে আছে দেখে আরতি আবার বলল “ আরে ঠিক আছে! আমি তো মজা করছিলাম! তুই সবসময় চুপচাপ থাকিস, পড়াশুনাতে এত ভালো তাও সবার সাথে ঠিক করে মিশিসনা!” শ্রেষ্ঠা পায়ে পায়ে চলা শুরু করেছে দেখে আরতি আবার এগিয়ে এসে বলল “ আচ্ছা ঠিক আছে, বলতে হবে না! কিন্তু তোর আর আমার বাড়ির রাস্তা তো একই দিকে, একসাথে যেতে তো পারি?” একরাশ আশা নিয়ে তাকাল আরতি। শ্রেষ্ঠা হালকা হেসে সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়াল।
“ বিকেলের দিকে সমুদ্রটা বেশ জীবন্ত লাগে না রে?” সমুদ্রের দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই জিজ্ঞেস করল শ্রেষ্ঠা। আরতি আর শ্রেষ্ঠা সমুদ্রের ধারের বড় মত একটা পাথরের উপর বসে ছুটির দিনের বিকেলটাকে উপভোগ করছিল। সেই দিনের পর থেকে না চেয়েও আস্তে আস্তে একটা হালকা বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুজনের। এখন দুজন একসাথেই গল্প করতে করতে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে! শ্রেষ্ঠার মাও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন শ্রেষ্ঠার নতুন বন্ধু হয়েছে শুনে। আরতি বার কয়েক এসেওছে ওদের বাড়িতে। মেয়েটা খুবই মিশুকে। এবার রবিবারে প্রায় জোর করেই শ্রেষ্ঠাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। চিপসের প্যাকেটটা থেকে দুটো চিপস মুখে দিয়ে আরতি বলল “ হ্যাঁ, ঘন নীল রঙের মধ্যে সূর্যাস্তের লাল আভা! পুরো মাইন্ড ব্লইং লাগে! নে দুটো চিপস নে” বলে প্যাকেটটা শ্রেষ্ঠার দিকে এগিয়ে দিল। তারপর আবার বলল “ তুই পুদুচেরি ঘুরে দেখেছিস পুরো?” “ হ্যাঁ কয়েকটা জায়গায় বাবা উইকএন্ডে নিয়ে গেছিল শ্রী অরবিন্দ আশ্রম, আরুল্মিগু মানাকুলা ভিনায়াগার মন্দির, মাতৃমন্দির…” “ আচ্ছা আচ্ছা” বলে মাঝ পথেই থামিয়ে দিলো আরতি শ্রেষ্ঠাকে। তোকে এখানের আরও কিছু কিছু অখ্যাত জায়গা আছে সেইগুলো একদিন ঘুরিয়ে দেখাবো। “ না না… এমনিও এক্সাম আসছে! এখন আর হবে না রে!” মৃদু আপত্তি জানালো শ্রেষ্ঠা। “ আরে, এক্সামের পরই যাব চিন্তা করছিস কেন?” পাথরের উপর থেকে উঠতে উঠতে বলল আরতি। “ ঠিক আছে দেখা যাবে, এখন চল। সন্ধ্যে হয়ে গেছে” বলে শ্রেষ্ঠা আর আরতি নিজের নিজের বাড়ির পথে পা বাড়াল।

“আজ কিন্তু কেমিস্ট্রি পেপারটা বেশ টাফ ছিল, কি বল?” হাঁটতে হাঁটতে বলল আরতি। “সেরকম নয় কিন্তু কিছু আনইম্পরট্যান্ট টপিকের উপরও কোশ্চেন দিয়ে দিয়েছে” পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলল শ্রেষ্ঠা। ওদের এখন ক্লাস ১১র ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। দুই বন্ধু এখন বাড়ি ফেরার পথে। “ হ্যাঁ আমিও আবার কাকে জিজ্ঞেস করছি! টপারকে! তোর তো সোজাই লাগে সব সাবজেক্ট!” বলে শ্রেষ্ঠার দিকে একটা হাসি দিল আরতি। তারপর আবার বলল “ ওই শোননা! পরশু পরীক্ষা শেষ হচ্ছে, এরপর একদিন প্ল্যান করনা!“ “কিসের প্ল্যান? ১২র পড়া শুরু হয়ে যাবে তো!” কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল শ্রেষ্ঠা। “ ধুর! একদিন ঘোরাঘুরি করলে তোর কিম্বা আমার পড়াশুনার কি ক্ষতি হবে শুনি?” নিরাশ গলায় বলল আরতি। শ্রেষ্ঠা চুপ করে গেলো। কিছুক্ষণ পরে বলল “ কবে যাবি ?” আরতি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল “ যেদিন পরীক্ষা শেষ হচ্ছে তার পরের দিনই! কি বলিস?” “ ওকে ডান “ বলে দুজনেই হেসে উঠলো।
“কিরে কেমন হল আজকে পরীক্ষা?” শ্রেষ্ঠা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করলেন শ্রেষ্ঠার মা। “ ভালোই হয়েছে” একটু হেসে বলল শ্রেষ্ঠা। “ আর আরতির?” রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে আবার জিজ্ঞেস করলেন। “ওরও ভালোই হয়েছে। আচ্ছা শোনোনা মা, বলছি যে কালকে না একটু বেরবো আরতির সাথে। ও বলছিল ধারেপাশে অনেক কিছু ঘোরার জায়গা আছে। দুপুর করে বেরবো, সন্ধ্যের মধ্যে চলে আসব। যাব?” বলতে বলতে রান্না ঘরে এসে ঢুকল শ্রেষ্ঠা। ওর মা খাওয়ার বাড়তে বাড়তেই বললেন “ ঠিক আছে, ঘুরে আয়। মনটাও ভালো লাগবে। কিন্তু বেশি দেরি করিসনা বাবু কেমন? বাবা অফিস থেকে আসার আগে চলে আসিস, ঠিক আছে?” শ্রেষ্ঠা মনে মনে ক্যাল্কুলেট করে নিল যে ওর বাবা অফিস থেকে মোটামুটি সন্ধ্যে ছয়টা নাগাদ ফেরে। এর মধ্যেই ওদের ঘোরাঘুরি হয়ে যাবে। খাওয়ার টেবিলে বসে খেতে খেতে বলল শ্রেষ্ঠা “ ওর অনেক আগেই ফিরে আসব মা। চিন্তা নেই।“ ওর মা হাসি মুখে ওকে যাওয়ার সম্মতি দিলেন।
“জানিস তো সমুদ্রের এই দিকটা সেরকম ভাবে কেউ জানেনা! আয় এদিকটা আয়” বলে শ্রেষ্ঠার হাত ধরে ওকে জলের মধ্যে নিয়ে গেলো আরতি। “ তোকে আর একটা জায়গায় নিয়ে যাব” জলের মধ্যে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে বলল আরতি। “কোথায়?” শ্রেষ্ঠা জিজ্ঞেস করলো। “ এখানে একটা অনেক পুরনো লাইট হাউস আছে। ফ্রেঞ্চ টাইমে তৈরি হয়েছিল, ওই ধর ১৮৩৬ সাল নাগাদ। যেসব জাহাজগুলো সেইসময় পুদুচেরিতে আসতো বাণিজ্য করতে, সেইগুলোকে আলো দেখানোর জন্য, রাতের বেলায়“ বলে থামল আরতি। “ তাই নাকি? এটা জানতাম না তো!” শ্রেষ্ঠার গলায় বিস্ময়। “ আমার বাবা এগুলো সব বলেছে আমাকে। ফ্রেঞ্চরা এই এলাকাতে প্রায় ১৬৭৪ সাল নাগাদ এসেছিল বাণিজ্যেরই উদ্দেশ্যে। এখানের অনেক কবরস্থান আছে, যেখানে গেলেই দেখতে পাবি কত কত পুরনো ফ্রেঞ্চদের কবর!” বলে থামল আরতি। “ তুই তো অনেক কিছু জানিস রে! আমার না এই ঐতিহাসিক কাহিনীগুলো শুনলে বেশ একটা নষ্টালজিক ফিল হয়!” অন্যমনস্কভাবে বলল শ্রেষ্ঠা।
“এই লাইট হাউসটার পাশেই একটা পুরনো কবরস্থান আছে, যাবি?” আরতি উত্তেজিত হয়ে বলল। “ গ্রেভ ইয়ার্ডে?” কিছুটা থমকে বলল শ্রেষ্ঠা। “ হ্যাঁ কেন? তোর আবার ভূত টুতে ভয় লাগে নাকি?” ঠোঁট টিপে হেসে বলল আরতি। “না না সেটা নয়…” দ্বিধাগ্রস্থভাবে বলল শ্রেষ্ঠা। “ তাহলে আবার কি? তোর না সবেতেই কিন্তু কিন্তু!…চল এবার” বলে শ্রেষ্ঠাকে তাড়া লাগিয়ে এগিয়ে চলল আরতি।
একটা পুরনো জং ধরা গেট পেরিয়ে ওরা দুজন কবরস্থানের ভিতরে ঢুকল। ছোট বড় নানা আকৃতির কবর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। মানুষের আনাগোনা যে খুব একটা নেই সেটা দেখলেই বোঝা যায়। শুকনো ফুল আর অযত্নে বেড়ে ওঠা কিছু আগাছা! কবরস্থানের শেষ প্রান্তে একটা বড় মত অশ্বত্থ গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেন যুগের পর যুগ কবরের তলায় শায়িত  মানুষগুলোর শেষকৃত্যের একমাত্র সাক্ষী সে! “ এই কবরস্থানের বেশিরভাগ কবরগুলোই ফ্রেঞ্চদের বুঝলি!” ঘুরে দেখতে দেখতে বলল আরতি। ওরা কবরগুলো দেখতে লাগলো দুজন মিলে। “ এই দেখ আরথার মারচানড, জন্মঃ ১৭২২ আর মৃত্যুঃ ১৭৮৯, কোন বাণিজ্যিক ছিল মনে হয়। সারনেমটা দেখে তাই মনে হচ্ছে, না?” বলে শ্রেষ্ঠার দিকে তাকাল আরতি। “ হ্যাঁ তাই হবে। এই জায়গাটাতে কত অতীত শায়িত আছে বল! কত অজানা মৃত্যু, কত কষ্ট” অন্যমনস্ক হয়ে বলল শ্রেষ্ঠা। “ বাবা! তুই তো ভাবুক হয়ে গেলিরে!” হেসে হেসে বলল আরতি।হাসি থামিয়ে আবার বলল “ চল ওই পিছন দিকটাও দেখি একবার। আয়” বলে এগিয়ে গেল আরতি।
“ এই কবরটা বেশ অন্যরকম দেখ, ঘেরা ছিল মনে হয় আগে” একটা কবরের দিকে তাকিয়ে বলল আরতি। শ্রেষ্ঠা ঝুকে পড়ে ফলকটা পরিষ্কার করে নামটা দেখার চেষ্টা করছিল। আরতি অন্য কবরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখা শুরু করল। “ কিরে ওখানেই থাকবি?” চিৎকার করে বলল আরতি। শ্রেষ্ঠা কোন উত্তর দিলনা। আরতি এগিয়ে এল এবার “কিরে, শুনতে পারছিস না? এখানে বসে পরলি কেন হটাত?” শ্রেষ্ঠাকে হাল্কা একটা ধাক্কা দিল আরতি। শ্রেষ্ঠা সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার মত চমকে উঠলো। দেখল আরতি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। “ না, কিছুনা চল” বলে উঠে দাঁড়ালো শ্রেষ্ঠা। আরতি আর কিছুনা বলে এগিয়ে চলল।
“ বেশ দেরী হয়ে গেল রে! বাড়ি যেতে যেতে মনে হয় সন্ধ্যে নেমে যাবে” বলে তাড়াতাড়ি পা চালাল আরতি। শ্রেষ্ঠা কোন উত্তর দিলনা, চুপচাপ পা চালাল।
“কিরে, এত দেরী হল তোদের?” শ্রেষ্ঠাকে ঢুকতে দেখে ওর মা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল। শ্রেষ্ঠা কোন উত্তর না দিয়েই নিজের রুমে ঢুকে গেল। ওর মা পিছু পিছু ওর রুমে এসে ঢুকলেন। দেখলেন শ্রেষ্ঠা বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। “কিরে, শরীর খারাপ লাগছে নাকি? কোন উত্তর দিচ্ছিসনা যে?” উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন শ্রেষ্ঠার মা। “কিছুনা গো মা! একটু ক্লান্ত লাগছে! এক কাপ কফি দেবে?” একটু উঠে বসে বলল শ্রেষ্ঠা। “ আচ্ছা আনছি “ বলে ওর মা আর কথা না বাড়িয়ে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।

অনেকদিন ধরেই আরতি লক্ষ্য করেছে ব্যাপারটা। আজকাল শ্রেষ্ঠা বেশ অন্যমনস্ক থাকে। কথা তো আগেও কম বলতো, এখন আরওই যেন নিজের দুনিয়াতেই থাকে। স্কুল থেকেও মাঝে মাঝে একাই ফিরে যায়, বললে কিছু একটা কারণ দেখিয়ে দেয়। না! ব্যাপারটা জানতেই হবে আজকে আরতিকে! ফিজিক্সের ক্লাসটা শেষ হতেই ও শ্রেষ্ঠাকে চেপে ধরল” তোর কি হয়েছে বলতো? এরকম আপন মনেই থাকিস আজকাল! কিছুই বলিসনা! আমাকে বন্ধু মনে করিসনা বল?” শ্রেষ্ঠা একটু ইতস্তত করতে লাগলো। ওকে এরকম করতে দেখে আরতি আবার বলল “ কিছু সেরকম ব্যাপার হলে ছুটির সময় বলিস না হয়। একসাথে যাব, অপেক্ষা করিস যদি আগে বেরিয়ে যাস, ঠিক আছে?” “ আচ্ছা” বলে শ্রেষ্ঠা আর কিছু বলল না।
“ তুই কি প্রেম টেম করছিস নাকি বলতো?” হাসি চেপে বলল আরতি। প্রায় ভূত দেখার মত চমকে উঠলো শ্রেষ্ঠা। আরতি বেশ অবাক হল,  কিন্তু সেটা প্রকাশ না করেই ফিসফিস করে বলল “ সত্যি প্রেম করছিস নাকি?” “ না না…ওইসব আমি কিছু করিনা” অন্য দিকে তাকিয়ে বলল শ্রেষ্ঠা। আরতি মনে মনে একটু দুঃখই পেল কারন বোঝাই যাচ্ছে যে শ্রেষ্ঠা কিছু একটা ওর থেকে লুকানোর চেষ্টা করছে! আরতি শ্রেষ্ঠাকে বেস্ট ফ্রেন্ড মনে করে, কিন্তু শ্রেষ্ঠা হয়তো তাকে ফ্রেন্ডও মনে করেনা! প্রেম যদি করছে, তো সেটা আরতিকে লুকানোর কি আছে! ও থোড়াই শ্রেষ্ঠার মাকে গিয়ে বলে দেবে! এসবই ভাবছিল আরতি ঠিক তখনই শ্রেষ্ঠা হটাত করেই বলল “ জানিস তো আরতি, প্রথম প্রথম এই পুদুচেরিতে এসে আমার খুব একটা ভাল লাগতো না! কিন্তু এখন কি মনে হয় জানিস! এখানে না এলে হয়তো প্রতিটা মুহূর্ত যে এত সুন্দর হতে পারে, সেটা হয়তো জানতেই পারতাম না!” আরতি কথাগুলো সেরকম কিছু না বুঝলেও শ্রেষ্ঠার মুখে লেগে থাকা এক অদ্ভুত খুশি তার নজর এড়ালো না! আরতি কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিল ঠিক তখনি ওকে থামিয়ে দিয়ে চকিতে শ্রেষ্ঠা ওকে জড়িয়ে ধরে বলল  “ থ্যাঙ্ক ইউ”। আরতি হতভম্ব হয়ে গেল।
“ কি হয়েছে তোমার আজকাল? এখানে এসে থেকে তো ভালোই পড়াশুনা করছিলে! টপ করেছ ক্লাস ১১এ। আর ১২র টেস্টে এত খারাপ ফল? মন কোথায় থাকে আজকাল?” বেশ কড়া ভাষায় বলে উঠলেন সমীর রায়, শ্রেষ্ঠার বাবা। শ্রেষ্ঠাদের টেস্টের ফলাফল বেরিয়েছে আজকে। শ্রেষ্ঠা  লিটারেচারের পেপার গুলো ছাড়া বাকি সাইন্সের সব মেন মেন পেপারগুলোতে খুবই খারাপ ফল করেছে। ওদের ক্লাস টিচার মিসেস পিল্লাই আজকে ওর বাবাকে কল করেছিলেন, কালকে একবার দেখা করার জন্য। কালকে উনি কি বলবেন সেটা অজানা নয়! শ্রেষ্ঠা চুপ করে আছে দেখে মিস্টার রায় আবারও বললেন  “কি হল চুপ করে আছো যে! পুদুচেরির সবচেয়ে ভাল স্কুলে পড়ছ, এত ভাল স্টুডেন্ট তুমি! এতদিন এত ভাল পারফরমেন্স করে এসেছ! আজ স্কুল জীবনের সবচেয়ে শেষ ধাপে এসে সব কিছু নষ্ট করে দিলে হবে? পড়াশুনাতে কোন অসুবিধা হলে আমাকে বল সেটা! আমি না হয় কালকে মিসেস পিল্লাইকে সেসব কিছু ডিটেলে এক্সপ্লেন করব…।“ শ্রেষ্ঠাকে বেশ বিধ্বস্ত লাগছিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা ঢোঁক গিলে নিয়ে বলল “ না পড়াশুনাতে কোন অসুবিধা নেই বাবা! আমি ফাইনাল পরীক্ষার আগে সব পড়া তৈরি…।“ শ্রেষ্ঠাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বললেন মিস্টার রায় “ পড়াশুনার অসুবিধা নেই মানে স্কুলের তরফ থেকে কোন দোষ নেই!” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন “ যাই হোক, ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফলের সাথে আমি কিন্তু কোনোরকম আপস করবো না শ্রী। আর আমি জানি তুমি আমাকে নিরাশ করবে না! তাই তো?” বাবা কিছুটা নরম হয়েছে দেখে শ্রেষ্ঠা কিছুটা স্বস্তি পেলো। তারপর বলল “ আমি পুরো মন দিয়ে চেষ্টা করবো বাবা।“ মিস্টার রায় হালকা করে পিঠ চাপড়ে দিলেন শ্রেষ্ঠার।
“ কিরে! কার সাথে কথা বলছিলিস?” আরতির অতর্কিত আগমনে শ্রেষ্ঠা হকচকিয়ে গেল। আরতি জানলার ওপারে কাউকে দেখতে পেলোনা। শ্রেষ্ঠার ঘরে আজ আচমকাই চলে এসেছে আরতি। গতকালই ওদের ক্লাস ১২র ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে, এখন কিছুদিন বেশ নিশ্চিন্ত। তারপর কে কোন কলেজে ভর্তি হবে, কি সাবজেক্ট নেবে সেসব ঠিক করা হবে! তাই বিকেলে ঠিক করলো প্রিয়াঙ্কাকে সাথে করে নিয়ে শ্রেষ্ঠার বাড়ি যাবে, প্রিয়াঙ্কাও ওদেরই ক্লাসমেট কিন্তু ওর আর্টস ছিল। যাই হোক, তিনজন মিলে বেশ ঘোরাঘুরি করা যাবে এই ভেবেই আরতি শ্রেষ্ঠাকে ডাকতে ওর বাড়িতে এসেছে, কিন্তু শ্রেষ্ঠার রুমে ঢোকার মুহূর্তে মনে হল যেন ও কারুর সাথে রুমের ভিতরে কথা বলছে! “ আঙ্কেল তো অফিসে, আর আন্টি তো দেখলাম বাইরের ঘরে…” নিজের মনেই বলে উঠলো আরতি। রুমে ঢুকতেই দেখল শ্রেষ্ঠা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছে আর বেশ হকচকিয়ে গেছে! “ কিরে, কেউ ছিল নাকি রুমে?” আবারও বলল আরতি। “ কই…কেউ না! কে থাকবে?” আমতা আমতা করে বলল শ্রেষ্ঠা। “ যাই হোক তাহলে আমার মনের ভুল হবে! আচ্ছা আমি আর প্রিয়াঙ্কা আজকে সমুদ্রের ধারে ঘুরতে যাচ্ছি, তারপর বাজারের দিকটাও ঢুঁ মেরে আসবো! তুইও চলনা! দারুন মজা হবে!” উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল আরতি। “ ঠিক আছে, তোরা বস, আমি তৈরি হয়ে নিয়ে আসছি” হাল্কা হেসে বলল শ্রেষ্ঠা।
পড়ন্ত বিকেলে তিন বান্ধবী সমুদ্র তটের পাশে বসে নিজেদের শেষ হতে চলা কৈশোরের মুহূর্তগুলোকে  উপভোগ করতে ব্যস্ত! জীবনের এই সময়টা অনেকটাই এই পড়ন্ত বিকেলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ! এক অধ্যায়ের শেষ, আর একটি নতুন সকালসম অধ্যায়ের সূত্রপাত! এই সন্ধিক্ষন একদিনে যেমন নতুন দিনের আশ্বাস দেয়, তেমনি ফেলে আসা দিনের প্রতি এক মায়ার টানও সৃষ্টি করে! সবমিলিয়ে, এ এক অনবদ্য দোলাচালের মুহূর্ত! জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আর সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত এই সময়েই নেওয়া হয়ে থাকে, যা জীবনের ধারাকে এক লহমায় বিপরীতে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম! “ এই তোরা কেউ প্রেম করিস?” ফিসফিস করে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ না তো কেন? তুই করিস নাকি?” চোখ দুটোকে সরু করে বলল আরতি। “ আরে না না, কিন্তু আমার একটা টল ডার্ক বয়ফ্রেনড থাকলে আমার কোন আপত্তি নেই!” হেসে হেসে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ কিরে শ্রেষ্ঠা তুই বল তোর কিরকম ছেলে পছন্দ?” চোখ টিপে বলল প্রিয়াঙ্কা। শ্রেষ্ঠা হালকা হেসে বলল “ কিরকম ছেলে মানে?” “ আরে, প্রেমিক হিসেবে কেমন ছেলে তোর পছন্দ? তোর স্বপ্নের রাজপুত্র!” বলে প্রিয়াঙ্কা আর আরতি হাসাহাসি করতে লাগলো। শ্রেষ্ঠা অন্যমনস্ক হয়ে সমুদ্রের দিকে তাকাল। মুখে হাল্কা হাসি! কিছুক্ষন পরে বলল “ ফর্সা, লম্বা, আর…।“ “আর কি?” আরতি বলল। “আর এই সমুদ্রের মত ঘন নীল চোখ, যার অতলে সহজেই হারিয়ে যাওয়া যায়!” মুখে এক অদ্ভুত আলো খেলে গেলো শ্রেষ্ঠার। “ বাবা! তোর কি বিদেশী চাই নাকি? নীল চোখ, সোনালি চুল” হা হা করে হাসতে লাগলো প্রিয়াঙ্কা। হাসি থামিয়ে বলল “ অবশ্য এখানেও অনেক সেরকম…” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই শ্রেষ্ঠা উঠে পড়লো। “ আরে কি হল! দাঁড়া আর একটু একসাথেই উঠবো। তারপর বাজারের দিকটাও তো যাব!” উঠে এসে বলল আরতি। “ না আমার আর ভালো লাগছেনা রে! আমি আসি। তোরা ঘোর!” বলে শ্রেষ্ঠা বাড়ি যেতে তৎপর হল। “ কি হয়েছে? আমি হাসলাম বলে চলে যাচ্ছিস?” একটু অবাক হয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা। শ্রেষ্ঠা আর কিছু না বলে তখনি বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। “ এই শ্রেষ্ঠা মেয়েটার স্ক্রু ঢিলা আছে না রে?” শ্রেষ্ঠার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল প্রিয়াঙ্কা। আরতি কিছু বলল না। কিন্তু মন থেকে দ্বিধাটাকেও পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারললাম ।

উচ্চমাধ্যমিকে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি শ্রেষ্ঠা। বাবা বেশ মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছেন সেই জন্য। যাই হোক পুদুচেরিরই একটা ভালো কলেজে পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হয় শ্রেষ্ঠা। আরতিও একই কলেজে ভর্তি হয় কিন্তু অঙ্কে অনার্স নিয়ে। দুজনের ডিপার্টমেন্ট আলাদা হয়ে গেলেও দুজন যাতায়াত একসাথেই করে। কলেজটা ওদের দুজনেরই বাড়ি থেকে একটু দূরে! বাসে অথবা অটোতে যেতে হয়, তারপর একটু হাঁটা রাস্তা। শ্রেষ্ঠাদের ডিপার্টমেন্টের সব থেকে ভালো পড়াশুনায় হল অনিকেত। অনিকেত শুধু পড়াশুনাতেই নয় স্পোর্টস, গিটার বাজানো এসব কিছুতেই অদ্বিতীয়! প্রথম দিন থেকেই শ্রেষ্ঠাকে বেশ ভাল লেগে যায় অনিকেতের। অনিকেতরাও শ্রেষ্ঠাদের মতই প্রবাসী, ওদের আসল বাড়ি উত্তরপ্রদেশে। যাই হোক, দেখতে দেখতে কলেজ ফেস্ট চলে এল। আরতির জোরাজুরিতেই সেইদিন ফেসটে যেতে হল শ্রেষ্ঠাকে! “ আরে চল না ইয়ার! প্রথমবার কলেজের একটা প্রোগ্রাম দেখবো! দারুণ মজা হবে!” উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল আরতি। শ্রেষ্ঠা আর কি করতো, নিমরাজি হয়ে যেতে হল!
“ আরে ইয়ার! তোদের ডিপার্টমেন্টের অনিকেত কি দারুণ গিটার বাজায় রে! আমি তো ফ্যান হয়ে গেলাম!” আরতির গলায় মুগ্ধতা ঝরে পড়ছিল! “এই শোনো!” পিছন থেকে একটা ডাক শুনে ঘুরে তাকাল দুজন। “ শ্রেষ্ঠা, শ্রেষ্ঠা রায় তাইতো?” উজ্জ্বল মুখে সামনে এসে দাঁড়ালো অনিকেত। এরকম অতর্কিত আলাপে বেশ হকচকিয়ে গেছে শ্রেষ্ঠা আর আরতি। অপরপ্রান্ত থেকে কোন উত্তর না পেয়ে অনিকেত আবার নিজেই বলল “ হাই! আমি অনিকেত, অনিকেত গুপ্তা। আমরা একই ডিপার্টমেন্টের রাইট?” অপলক শ্রেষ্ঠার দিকে তাকিয়ে বলল। “ হ্যাঁ তাই হবে হয়তো” জোর করে একটু হেসে এবার জবাব দিলো শ্রেষ্ঠা। “তুমি বেশ ভালো গিটার বাজাও কিন্তু! আমার ভীষণ ভালো লেগেছে!” এক মুখ হেসে বলল আরতি। “ অনেক ধন্যবাদ! আর তোমার কেমন লাগলো শ্রেষ্ঠা?” জিজ্ঞেস করলো অনিকেত। শ্রেষ্ঠা স্মিত হাসল। আবারও অনিকেত কিছু বলতে যাচ্ছিলো তখন শ্রেষ্ঠা বলে উঠলো “ আমাদের বেরোতে হবে এবার! বেশি দেরি হয়ে গেলে মা চিন্তা করবে।“ বলে আরতির হাত ধরে টান মারল। “ ওকে! ক্লাসে দেখা হবে আবার! তখন জানিও কেমন লেগেছে!” পিছন থেকে চিৎকার করে বলল অনিকেত।
“ছেলেটা পাক্কা তোর প্রেমে পড়েছে বুঝলি!” গায়ে একটা হালকা ঠেলা মেরে বলল আরতি। “ হতে পারে!” সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে বাসের জানলা দিয়ে বাইরের দিকে মুখ ঘোরাল শ্রেষ্ঠা। “ কেন? তোর ভাল লাগেনা অনিকেতকে?” শ্রেষ্ঠাকে জিজ্ঞেস করলো আরতি। বাইরের থেকে মুখ ঘুরিয়ে আরতির দিকে সরাসরি তাকাল শ্রেষ্ঠা, তারপর বলল “ না!”
“ তোমাকে আমার শুরুর দিন থেকেই খুব ভালো লাগে শ্রেষ্ঠা! তুমি কি আমার প্রেমিকা হবে?” ক্যান্টিনে প্রায় সব ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টদের সামনে একপ্রকার ফিল্মি স্টাইলে প্রপোস করেছে অনিকেত শ্রেষ্ঠাকে। শ্রেষ্ঠা ভীষণ অপ্রস্তুতে পড়ে গেছে সেটা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক কিন্তু আরতি বেশ ভাল মতই বুঝতে পারছে! আশ পাশ থেকে সবাই বলে চলেছে অনিকেতকে একসেপ্ট করার জন্য! শ্রেষ্ঠা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। অনেকক্ষন ধরে যখন কিছু উত্তর পেলনা তখন অনিকেত উঠে এল শ্রেষ্ঠার কাছে, “ তোমার যদি ভাবতে সময় লাগে তাহলে কোন ব্যাপার নয়! ভেবে চিন্তে জানিও! আমি তোমার জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করতে রাজি!” একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল শ্রেষ্ঠা অনিকেতের দিকে! তারপর কিছু না বলে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল। “ শ্রেষ্ঠা দাঁড়া” চিৎকার করতে করতে ওর পিছু নিল আরতি।
“ শ্রেষ্ঠা তুমি আমাকে ইগনোর করছ কেন?” কলেজ থেকে বেরনোর সময় পথ আটকে দাঁড়ায় অনিকেত। শ্রেষ্ঠা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে আবারও পিছু নিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়। “ আরে বলবে তো কিছু! হ্যাঁ অথবা না!” গলায় জোর দিয়ে বলল অনিকেত। এবার শ্রেষ্ঠা অনিকেতের দিকে ফিরে বলল “ জবাব কিছু না দেওয়ার মানে কি বলতো?” “কি? আমি কিভাবে বলবো সেটা? তুমি বল” অবাক হয়ে তাকাল অনিকেত। “চল আরতি” বলে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল শ্রেষ্ঠা।
“তুই এটা ঠিক করলি আজকে?” আরতির কথা শুনে চোখ দুটোকে সরু করে তাকাল শ্রেষ্ঠা। “ না মানে, মানছি ওইভাবে প্রপোস করাটা ঠিক হয়নি! এবার ও তো আর জানেনা যে তুই এসব পছন্দ করিসনা! একবার কথা বলে নিলেই পারিস” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল আরতি “ এমনিও আমার সাথে তুই সব কিছু শেয়ার করিসনা! মনে মনেই রাখিস!” শ্রেষ্ঠা বোকার মত তাকাল আরতির দিকে, তারপর বলল “কি শেয়ার করিনি তোর সাথে?” “ছাড় বাদ দে! আমাদের স্টপ এসে গেছে, চল নামতে হবে” বলে বাসের গেটের দিকে এগিয়ে গেল দুজন।
এই কখনো বৃষ্টি, কখনো গরম এসবের জন্য আরতির শরীরটা বেশ কিছুদিন ধরেই ঠিক যাচ্ছেনা! ভাইরাল ফিভার মনে হচ্ছে! “ মা আজকে আর কলেজ যাবনা! শ্রেষ্ঠা এলে বলে দিও ওকে! মাথাটা খুব ধরে আছে!” বলে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলো আরতি।
“অনিকেতের এক্সিডেন্ট হয়েছে? কবে?” বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে রইল আরতি। “আরে দুদিন আগেই হয়েছে! কলেজ থেকে ফেরার সময় কলেজের সামনেরই রাস্তাটাতে হয়েছে! গাড়িতে ধাক্কা লেগেছে! খুব সিরিয়াস!” বলল অদিতি, আরতির ডিপার্টমেন্টের একটা মেয়ে। “আমাকে শ্রেষ্ঠা কিছুই বলেনি এই ব্যাপারে!” অস্ফুতেই বলে উঠলো আরতি।
“ অনিকেতের এক্সিডেন্ট হয়েছে শুনেছিস তুই?” জিজ্ঞেস করল আরতি শ্রেষ্ঠাকে। “ হ্যাঁ, খুব খারাপ লেগেছে শুনে!” উদাস হয়ে বলল শ্রেষ্ঠা। “ আমাকে জানাসই নি!” আবারও বলল আরতি। “ কি আর বলতাম বল! এমনিও আমার নিজেরই খারাপ লাগছিল খুব! কিছুদিন আগেই ওইরকম ভাবে কথা বলেছিলাম ওর সাথে!” মলিন মুখে বলল শ্রেষ্ঠা। আরতি শ্রেষ্ঠার পিঠে হাত রেখে বলল “ ওইসব ভাবিস না! আমরা সময় করে একদিন না হয় হসপিটালে দেখে আসবো অনিকেতকে!” শ্রেষ্ঠা মৃদু হাসল।
“ অনিকেতকে বাঁচানো যায়নি, সিভিয়র ইনজুরি ছিল!” বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো অনিকেতের সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু উৎসব। আরতির কেমন যেন একটা লাগছিল! আজই ওরা দুজন অনিকেতকে দেখতে হসপিটালে এসেছে! ঢোকার মুখেই উৎসবের সাথে দেখা! লাল ফোলা চোখে কান্না লুকানোর বৃথা চেষ্টা করছিলো ছেলেটা! “ আমি আর ভেতরে যেতে পারবোনা রে!” অস্পষ্ট গলায় বলল শ্রেষ্ঠা। আরতি বুঝতে পারলো শ্রেষ্ঠারও ওর মতই অবস্থা! উৎসব আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো তখনই ভেতর থেকে একজন কেউ ডাকল ওকে! “ তোমরা কি ভেতরে আসবে শেষ দেখা…” আর বলতে পারলো না উৎসব, কথা জড়িয়ে গেল। “ আমরা এখানেই…” আরতির কথা শেষ হওয়ার আগেই উৎসব হসপিটালের ভেতরে চলে গেল।
“ শুনেছি পুলিশ ইনভেস্টিগেশন চলছে অনিকেতের কেসটা নিয়ে!” আস্তে আস্তে বলল অদিতি। “ এক্সিডেন্টাল ডেথ তো! তাতে আবার পুলিশ ইনভেস্টিগেশন একমাস ধরে চলার কি আছে! ওই গাড়ির ড্রাইভারকে ধরেছে পুলিশ?” অবাক হয়ে বলল আরতি। “ হ্যাঁ! ওই ড্রাইভারই তো অনিকেতকে হসপিটালে ভর্তি করেছিল! আসলে, অনিকেতের এক্সিডেন্টটা কলেজের সামনের রাস্তাটার একদম শেষপ্রান্তে হয়েছে! তারপরেই হাই ওয়ে! আর অনিকেতের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটা ওই দিকে পড়েই না! বরং বিপরীতে পড়ে!” বলে থামল অদিতি। “ তো তারমানে…” বলে থামল আরতি। “ হতেও পারে অন্য কিছু, আবার নাও হতে পারে! অনিকেতের বাবাই ইনভেস্টিগেশন করাচ্ছেন!” বলে থামল অদিতি, তারপর আবারও বলল “ আসলে অনিকেতের বাবা একজন বিশাল বড় বিজনেস ম্যান, আর ওনার শত্রুরও অভাব নেই! সেই ক্ষেত্রে অনেক কিছুই হতে পারে! এবার দেখা যাক শেষ অব্দি কি জানা যায়! পুলিশ অনিকেতের ডিপার্টমেন্টের ছেলে মেয়েদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করছিল আজকে শুনলাম!” “ আচ্ছা!” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আরতি।

“আমার এখন ফাইনাল ইয়ার চলছে মা! পড়াশুনা শেষ না করেই বিয়ে! আর তাছাড়া আমি মোটেও বিয়ের জন্য প্রস্তুত নই” শান্ত শিষ্ট মেয়ের এরকম আচমকা রেগে যাওয়াতে শ্রেষ্ঠার মা কিছুটা অবাকই হলেন! তারপর শ্রেষ্ঠাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বললেন “দেখ বাবু, আমি বুঝতে পারছি! তোকে এখনই তো আর বিয়ে করতে বলা হচ্ছে না! তোর পিসি সম্বন্ধটা দিয়েছেন! ছেলে হায়দ্রাবাদে ভাল চাকরি করে, মা-বাবা কলকাতাতে থাকেন। শুধু তোকে দেখতে আসবে বলে অত দূর থেকে ওনারা তিনজন সব কিছু বন্দোবস্ত করে আসছেন! একবার দেখে নে! তোর পড়াশুনা শেষ না হলে তোর মনে হয় যে তোর বাবা তোর বিয়ে দিয়ে দেবেন?” শ্রেষ্ঠার অসহনীয় লাগছিল মায়ের কথাগুলো! ওর এই পিসি হল ওর বাবার দূর সম্পর্কের এক দিদি। যেহেতু শ্রেষ্ঠার বাবার নিজের কোন দিদি বা বোন নেই, তাই উনি এই দিদিকেই নিজের দিদির মত ভালবাসেন। যদিও শ্রেষ্ঠা তেমনভাবে এনাকে চেনেনা, তার কারণ হল ওর বাবার বদলির চাকরি। এই পিসি থাকেন কলকাতার নিকটবর্তী শ্রীরামপুরে! আর শ্রেষ্ঠা অনেক ছোটবেলাতে একবার গেছিল মা-বাবার সাথে এই পিসির বাড়ি, তাই স্বাভাবিক ভাবেই সেরকম কিছু মনে নেই। যদিও বাবার মুখে অনেক শুনেছে এনার কথা! যোগাযোগটা দূরত্বের কারণে অনেকগুলো বছর শিথিল হয়ে গেছিল, কিন্তু বেশ কিছুদিন আগেই পিসি ফোন করেছিলেন মাকে! এখন ফোনের আধিক্য বেড়ে গেছে! তাই পিসিও কদিন আগেই নতুন ফোন কিনেছেন। শ্রেষ্ঠাদের নাম্বারটা শ্রেষ্ঠার জ্যাঠার কাছ থেকে জোগাড় করে নিজের থেকেই ফোন করেছিলেন। পিসির দুই মেয়ের অনেকদিন আগেই বিয়ে হয়ে গেছে! শ্রেষ্ঠার ব্যাপারে প্রায় সব  কিছু জেনে তারপর আবার একদিন ফোন করে এই সম্বন্ধটার কথা বলেন! এই ছেলেটা হায়দ্রাবাদের একটা বেশ ভালো কোম্পানিতে সফটওয়্যার ডেভেলপার পোস্টে আছে। ওই পিসিরই শ্বশুরবাড়ির দিকের কিরকম একটা আত্মীয় হয় এরা! সেই জন্যই শ্রেষ্ঠার একটা ছবিও চেয়ে পাঠিয়েছিলেন এই পিসি। ছবি দেখে নাকি ওদের খুবই পছন্দ হয়েছে! তাই ছেলে ছুটি নিয়ে মা-বাবাকে ব্যবস্থা করে আগামী পরশুদিন পুদুচেরিতে আসছে, শ্রেষ্ঠাকে দেখতে! শ্রেষ্ঠা বুঝল যে মাকে এখন আর কিছু বলে এমনিতেও কোন লাভ নেই! ওরা আসবেই!  সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কলেজে যাওয়ার জন্য বেরোতে গেল শ্রেষ্ঠা। “ আরে খেয়ে যা তো!” পিছন থেকে মায়ের গলা পেলো শ্রেষ্ঠা। “না! দেরী হয়ে গেছে এমনিতেই। আমি কলেজ ক্যান্টিনে খেয়ে নেব কিছু! আসছি আমি, আরতি অপেক্ষা করছে বাস স্ট্যান্ডে!” বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই গেট ঠেলে বেরিয়ে গেল।
“ মেয়ে তো আমাদের বেশ পছন্দ হয়েছে! এবার আপনারা বলুন কিছু বলার থাকলে!” হেসে হেসে বললেন ছেলের বাবা। “ না, আমরা আর কি বলি বলুন ! ছেলে তো আমাদেরও বেশ পছন্দ হয়েছে, কি বল?” বলে শ্রেষ্ঠার মার দিকে তাকালেন শ্রেষ্ঠার বাবা। শ্রেষ্ঠার মাও হেসে মৃদু সম্মতি জানালেন। “ তাহলে ওদের দুজনকে একটু কথা বলার সুযোগ দেওয়া যাক, কি বলেন?” বললেন ছেলের বাবা। “ হ্যাঁ হ্যাঁ! নিশ্চয়! শ্রেষ্ঠা, বাবু, যা অরিত্রকে আমাদের বাড়িটা একটু ঘুরিয়ে দেখা!” বলে শ্রেষ্ঠার মা শ্রেষ্ঠার দিকে তাকালেন। শ্রেষ্ঠার ভীষণ বিরক্ত লাগছিল সবকিছুই! তাও মুখে কিছু না বলে রুম থেকে বেরিয়ে এল, পিছনে পিছনে এল অরিত্র!
“ তো আপনি ফিজিক্সে অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছেন, তাই তো?” নীরবতা ভঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল অরিত্র। “হ্যাঁ” বলে চুপ করে থাকলো শ্রেষ্ঠা। আর কিছু বলছেনা দেখে অরিত্র একটু থমকাল, তারপর আস্তে আস্তে বলল “ আপনার বিয়েতে মত আছে তো?” এবার শ্রেষ্ঠা মুখটা তুলে সরাসরি তাকাল অরিত্রর দিকে! বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর কিছু একটা বলতেই যাচ্ছিলো তখনই মায়ের গলা পেল, “ বাবু, তোদের কথা হয়ে গিয়ে থাকলে নিচে আয়, ওনারা আবার বেরিয়ে যাবেন বলছেন!” “ হ্যাঁ আসছি! চলুন” বলে শ্রেষ্ঠা আর আরিত্র নিচে নেমে এল। অরিত্রর কেন জানিনা মনে হচ্ছিলো যে শ্রেষ্ঠার হয়তো বিয়েতে মত নেই, কিন্তু আর সেভাবে কথা হয়ে উঠলো না! সেদিনের মত অরিত্ররা বিদায় নিল। শ্রেষ্ঠার মা-বাবা বার বার থাকতে বলছিলেন, পরের বার এসে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওনারা বেরিয়ে পরলেন শ্রেষ্ঠাদের বাড়ি থেকে!
“কিরে, কেমন লাগলো ছেলেটাকে?” বাসে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো আরতি। “ সকাল সকাল মুড খারাপ করাস না তো!” বলে শ্রেষ্ঠা অন্য দিকে তাকাল। আরতি আর কিছু বলল না! ছেলেদের প্রতি একটা অনীহা দেখে ও শ্রেষ্ঠার মধ্যে! কারণ জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায়! কিন্তু আজও স্পষ্ট মনে আছে আরতির শ্রেষ্ঠা বলেছিল একসময় যে ওর কিরকম ছেলে পছন্দ! তবে কি ওর জীবনে কেউ আছে! কিন্তু কে? আর সে কথা আরতি আজ অব্দি জানতে পারলনা কেন? না, এসব জবাব নেই আরতির কাছে। বরাবরই চাপা স্বভাবের মেয়ে শ্রেষ্ঠা! খুব কম বন্ধু, কম কথা আর নিজের দুনিয়া! ব্যাস এটাই হল শ্রেষ্ঠা! তাও না জানি কিভাবে আরতি ওর বন্ধু হতে পেরেছে! কিন্তু সত্যিই কি হতে পেরেছে! কি জানি!
“ নেক্সট উইকে আমাদের একটা এক্সকারশন আছে! চেন্নাই তে!” কলেজ থেকে ফেরার সময় বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বলল শ্রেষ্ঠা। “ও তাই! তুই যাচ্ছিস?” বলে তাকাল আরতি। “ হ্যাঁ যাব ভাবছি। অনেক কিছু শেখা যায় এক্সকারশনে গেলে!” হাল্কা হেসে বলল শ্রেষ্ঠা। আরতি জানে, শ্রেষ্ঠা ভীষণ নতুন জায়গা ঘুরতে আর সেখান থেকে নতুন কিছু শিখতে আর জানতে ভালবাসে! শ্রেষ্ঠার মাও বলেছিলেন একবার আরতিকে যে শ্রেষ্ঠা ছোটবেলায়  ভীষণ ইতিহাস পড়তে ভালবাসত, অজানা তথ্য জানতে পারার জন্য! যাই হোক, এসব ব্যাপারে শ্রেষ্ঠা যদিও সেরকম করে খুলে কিছু বলেনি আরতিকে কোনোদিন , কিন্তু একদিন শুধু বলেছিল যে ওকে অতীতের পাতাগুলো ভীষণভাবে টানে! একটা শিহরণ জাগায়! কিন্তু শ্রেষ্ঠার বাবা একটু স্ট্রিক্ট! উনি শ্রেষ্ঠাকে বলেই দিয়েছিলেন যে সাইন্স নিয়েই পড়তে হবে! শ্রেষ্ঠার মৃদু প্রতিবাদ উনি শোনেন নি! ওনার মতে আর্টসে কোন ভবিষ্যৎ নেই! এসবই আরতি আন্টি মানে শ্রেষ্ঠার মায়ের মুখেই শুনেছে। শ্রেষ্ঠাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে ও এড়িয়েই যায়, কেউই যেন ওকে বুঝবে না!
শ্রেষ্ঠা চার দিনের জন্য এক্সকারশনে চলে গেছে। এই কদিন আরতি একাই যাতায়াত করছে কলেজ! সেদিন কলেজে ঢোকার সময় প্রায় দুবছর পর আরতি অনিকেতের বাবাকে দেখল, পুলিশের দুজন লোকও ছিল সাথে।ক্লাসে ঢুকে অদিতিকে দেখতে পেয়ে আরতি জিজ্ঞেস করলো “ কি ব্যাপার রে, আজ এতদিন পর অনিকেতের বাবাকে দেখলাম কলেজে, দুজন পুলিশের লোকও ছিল মনে হল।“ অদিতি একবার চারপাশটা দেখে নিলো তারপর বলল “ আরে আমিও ঠিকঠাক জানিনা, তবে শুনছিলাম পুলিশ কিছু একটা ক্লু পেয়েছে অনিকেতের মৃত্যু সংক্রান্ত ব্যাপারে!” “ এতদিন পরে?” বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো আরতি। “ হ্যাঁ রে! পুলিশ এই দেড় বছর ধরে তদন্ত চালিয়ে গেছে শুনেছি। আর এখন কিছু ক্লু পেয়েছে তাই আবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছে কলেজে! এখন মনে হচ্ছে অনিকেতের মৃত্যুটা হয়তো এক্সিডেন্ট ছিলনা!” ফিসফিস করে বলল অদিতি।
“ একটা অদ্ভুত খবর পেলাম মিনতি বুঝলে!” অফিস থেকে ঢুকতে ঢুকতে বললেন মিস্টার রায়, শ্রেষ্ঠার বাবা। “কি খবর?” বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মিনতি মানে শ্রেষ্ঠার মা। “ অরিত্র নাকি নিখোঁজ গত দুদিন ধরে!” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “ সেকি?” প্রায় আঁতকে উঠলেন শ্রেষ্ঠার মা। “ দিদি আমাকে ফোন করেছিল দুপুরের দিকে, তখনই বলল। পুলিশে মিসিং ডাইরি করেছেন মিস্টার আর মিসেস সেন” বলে থামলেন শ্রেষ্ঠার বাবা। “ কিন্তু এইভাবে হটাত করে নিখোঁজ কিভাবে হয়ে গেল?” শ্রেষ্ঠার মা অবাক হয়ে বললেন। “ কি জানি! তবে শুনলাম ফোনের লাস্ট লোকেশান ছিল উটি” বলে একটু থামলেন শ্রেষ্ঠার বাবা, তারপর আবার বললেন “ পুলিশ তদন্ত করছে, দেখা যাক কি হয়।“
“কি রে তোকে এতবার ফোন করছিলাম, তুলছিলিস না কেন?” শ্রেষ্ঠাদের বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে বলল আরতি। “ও আচ্ছা, মনে হয় ফোনটাতে চার্জ শেষ হয়ে গেছে!” বলে নিজের ফোনটা খুঁজতে লাগলো শ্রেষ্ঠা। আরতি জানে শ্রেষ্ঠা আর শ্রেষ্ঠার ফোন, দুটো কখনই এক জায়গায় থাকে না! ওকে এত খুঁজাখুঁজি করতে দেখে হেসেই ফেলল আরতি, তারপর বলল “ ঠিক  আছে পরে খুঁজে নিস! আমি ফোন করছিলাম এটা জানার জন্য যে এই রবিবার তুই ফ্রি আছিস কিনা।“ “ও! কেন?” খোঁজা থামিয়ে আরতির দিকে তাকাল শ্রেষ্ঠা। “ না, তাহলে দুজন মিলে একটু হাওয়া খেতে যেতাম আর কি!” মিটি মিটি হাসতে লাগল আরতি। “ ওই গ্রেভিয়ারডের দিক টাতে “ অদ্ভুত ভাবে তাকাল শ্রেষ্ঠা। আরতি একটু অবাক হল, তারপর বলল “ হ্যাঁ সেটা বেরিয়ে…” “ওকে! দুপুর থাকতেই বেরিয়ে যাব ঠিক আছে?” আরতিকে শেষ করতে না দিয়েই বেশ উৎসাহিত হয়ে বলল শ্রেষ্ঠা। আরতি নিজের বিস্ময়ভাবকে আড়াল করে হালকা হেসে সম্মতি জানালো।

চরিত্রহীন – charitraheen – Read & Download Bengali Uponnash

শ্রেষ্ঠাকে বেশ খুশি খুশি লাগছে আজকে! অন্য কোন দিন হলে আরতিকেই ডাকতে আসতে হয়! কিন্তু আজকে শ্রেষ্ঠা আরতির আগেই রেডি হয়ে ওকে ডাকতে চলে এসেছিল! “ কিরে! বেশ সেজে গুজে বেরলি তো! কি ব্যাপার?” মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো আরতি। শ্রেষ্ঠা শুধু একটু হাসল। এটাই বাজে লাগে আরতির! কিছু জিজ্ঞেস করলেই সেটাকে এড়িয়ে যাওয়াটা যেন শ্রেষ্ঠার স্বভাব একটা! আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না আরতি তখনকার মতো!
“ শ্রেষ্ঠা! এই তুই ওইদিকে কি করছিস বলতো? এখানেই থাকবি নাকি? চল বাজারের দিকে যাব! এখানে ভাল লাগে নাকি সবসময়!” চিৎকার করে বলল আরতি। ওরা দুজন এখন পুদুচেরির পুরনো কবরস্থানে এসেছে, এর আগের দিনও এসেছিল এখানে। শ্রেষ্ঠা বলল এখানেই আগে যাবে! তাই আবার আসতে হল! শ্রেষ্ঠা কবরস্থানের পিছনের দিকটাতে গেছে! আরতি একটু বসেছিল কবরস্থানের সামনের বেঞ্চিটাতে! অনেকক্ষণ হয়ে গেছে, তাই চিৎকার করে ডাক দিল শ্রেষ্ঠাকে! কোন জবাব না পেয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল আরতি গজ গজ করতে করতে। “ কিরে তুই…” বলে থেমে গেল আরতি। দেখল শ্রেষ্ঠা ওই আগের দিনের কবরটা যেটার চারদিকে একটা ভেঙ্গে পড়া বেড়ার মত দেওয়া ছিল, তার সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কিসব বলছে! আরতি না চাইতেও একটু ভয় পেয়ে গেল! তারপর শ্রেষ্ঠাকে একটা টোকা মারল। শ্রেষ্ঠা চমকে তাকাল আরতির দিকে!” তুই…তুই কিসব কথা বলছিলিস? কার সাথে বলছিলিস?” কাঁপা গলায় বলল আরতি। শ্রেষ্ঠা কবরের দিকে তাকাল, তারপর ইতস্তত করে বলল “ কোথায়!” আরতি যদিও অশরীরী ব্যাপারে বিশ্বাসী নয়, তথাপি পড়ন্ত বিকেলের এই সময়ে, কবরস্থানে শ্রেষ্ঠার এহেন আচরণে ভাল মতই ভয় পেয়ে গেছে! “চল এখান থেকে” বলে উঠলো আরতি।
“এক্সকিউস মি মিস আরতি” নিজের নামটা শুনতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল আরতি। দেখল দুজন ইয়ং লোক ওর দিকে এগিয়ে আসছে! “ ইয়েস বলুন” কৌতুহল নিয়ে বলল আরতি। “ হ্যালো, আই আয়াম চরণ রেডডি! আপনাদের বন্ধু অনিকেত গুপ্তার কেসটা এখন আমিই তদন্ত করছি” বলে থামলেন ইন্সপেক্টর চরণ। “ হ্যাঁ বলুন, কি জানতে চান?”জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল আরতি। “ আমি এর আগে যিনি এই কেসটা তদন্ত করছিলেন, তার কাছ থেকে সব কিছু ডিটেল কালেক্ট করেছি। অনিকেত গুপ্তা কলেজ থেকে বেরনোর পরেই দুর্ঘটনাগ্রস্থ হন!” বলে থামলেন ইন্সপেক্টর চরণ। “এটা নিয়ে আগেও আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, নতুন তো নয়!” সরাসরি তাকিয়ে বলল আরতি। “ নতুন তো আছে ম্যাডাম! সেই জন্যই এই কেসটাতে নতুন করে তদন্ত করা হচ্ছে! যাই হোক, শুনলাম যে অনিকেতের আপনার প্রিয় বান্ধবির সাথে কিছু প্রেম জাতীয় ইস্যু হয়েছিল?” বলে তাকালেন চরণ। “ হ্যাঁ, তবে এই ব্যাপারে আমি আর আমার বান্ধবি শ্রেষ্ঠা, আপনাদের আগের টিমকেও সব কিছুই খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছিলাম! অনিকেত পছন্দ করতো শ্রেষ্ঠাকে! কিন্তু শ্রেষ্ঠা হয়তো করতো না!” বলে থামল আরতি। ইন্সপেক্টর চরণ একটু চুপ করে রইলেন, তারপর বললেন “হয়তো করতো না? আপনি সিওর জানেন না করত কি করত না? আপনার প্রিয় বান্ধবি তো! নাকি আপনাকে সব জানাত না?” আরতি একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে বলল “ আপনি শ্রেষ্ঠার সাথে সরাসরিই কথা বলে নিন অফিসার! আমি যতটুকু জানি আপনাকে বললাম। আর তাছাড়া যেদিন অনিকেতের সাথে এসব হয়েছিল, সেদিন আমি কলেজে আসতেও পারিনি।“ “আর আপনার বান্ধবি? উনি এসেছিলেন?” চোখ দুটোকে সরু করে বললেন ইন্সপেক্টর। “ শ্রেষ্ঠা মনে হয় এসেছিল!…… হ্যাঁ হ্যাঁ এসেছিল” বলে উঠলো আরতি। “ আচ্ছা মিস! অনেক ধন্যবাদ! দরকার পড়লে আবার সাক্ষাত হবে” বলে বিদায় নিলেন ইন্সপেক্টর চরণ।
“ কি গো? অরিত্রর কোন খোঁজ পাওয়া গেল?” চিন্তিত মুখে বললেন শ্রেষ্ঠার মা। “ না! কোন খবর নেই এখনো অব্দি! ওনাদের একবার ফোন করা উচিৎ, তাই করেছিলাম  আজকে একবার। মিস্টার সেন বললেন যে পুলিশ উটিতে তদন্ত শুরু করেছে ইতিমধ্যে! কিন্তু অরিত্রর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি”বলে থামলেন শ্রেষ্ঠার বাবা। তখনই শ্রেষ্ঠাকে ঢুকতে দেখে ওর বাবা বললেন “ কি রে! দেরী হল আজকে তোর ফিরতে?” “ কিছুনা! বাস কম চলছে আজকে!” বলে নিজের রুমে চলে গেল। “ শ্রীকে এত বিধবস্থ লাগছে কেন? পড়ার খুব চাপ নাকি?” জামা চেঞ্জ করতে করতে বললেন শ্রেষ্ঠার বাবা। “ কি জানি! মেয়েটা এত চাপা স্বভাবের যে কিছু জিজ্ঞেস করলেও সরাসরি উত্তর দেয়না” বলে থামলেন শ্রেষ্ঠার মা। “ দেখো একবার কথা বলে! হয়তো অরিত্রর ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তিত! আমি বরং একবার দিদিকে ফোন করি” বলে শ্রেষ্ঠার বাবা নিজের ফোনটা নিয়ে বাইরের ঘরে বেরিয়ে এলেন।
“কিরে? এত বেলা অব্দি শুয়ে আছিস যে! কলেজ যাবি না?” উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন শ্রেষ্ঠার মা। শ্রেষ্ঠা চুপ করে আছে দেখে ওর মা কাছে এসে কপালে হাত ঠেকিয়ে দেখলেন “ তোর তো জ্বর আছে রে বাবু! শুয়ে থাক! আমি ওষুধ নিয়ে আসছি” বলে বেরিয়ে গেলেন শ্রেষ্ঠার মা।
“ আচ্ছা মা! তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?” হটাত করে বলে উঠলো শ্রেষ্ঠা। “হ্যাঁ বাবু বল” ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন ওর মা। “ কাউকে ভালবাসাটা কি দোষের?” বোকার মত তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল শ্রেষ্ঠা। “ না! একদমই না! ভালবাসা কোনদিন দোষের হতে পারে!” হেসে বললেন ওর মা। “ আচ্ছা! খুব স্বস্তি লাগছে এবার” বলে চোখ বুজল শ্রেষ্ঠা।
“ আন্টি, শ্রেষ্ঠা কোথায়? ফোনটাও লাগছে না ওর! সুইচট অফ বলছে খালি! আজ কলেজেও গেলনা!” দরজায় দাঁড়িয়ে জুতো খুলতে খুলতে বলল আরতি। “ আরে ওর খুব জ্বর রে! এখন একটু ভালো আছে! ভিতরে আছে যা” বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন শ্রেষ্ঠার মা।
“ শ্রেষ্ঠা! ইন্সপেক্টর চরণ আজকে তোকে খুঁজছিলেন! “ বলে থামল আরতি। শ্রেষ্ঠা চুপ করে জানলার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন শুনতেই পায়নি! “ শ্রেষ্ঠা! ওই! শুনছিস? অনিকেতের কেস নিয়ে কিসব জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তোকে খুঁজছিলেন আজকে অফিসার!” শ্রেষ্ঠাকে হাল্কা একটা টোকা মেরে বলল আরতি। “ আচ্ছা আরতি! এই পৃথিবীতে, বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন যুগে কত কত প্রেম হয়ে এসেছে বল! কিছু কিছু প্রেমের কাহিনী তো তৎকালীন পরিস্থিতির চাপে কালের অতলে তলিয়ে গেছে, কেউ খবরও রাখেনি! এই সমাজ, এই মানুষ প্রেমকে সুন্দরতম অনুভূতি হিসেবে চিহ্নিত করলেও কোনদিন প্রেমিক যুগলের মন মানসিকতাকে মেনে নিতে পারেনি!” জানলার দিক থেকে চোখ না ফিরিয়েই বলে উঠলো শ্রেষ্ঠা। আরতির তো সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিলো! একবার ভাবল হয়তো জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকছে! পরক্ষনেই সেই কবরস্থানের কথা মনে পড়ে যাওয়াতে না চাইতেও কিছুটা শিউড়ে উঠলো আরতি! নিজেকে সামলে নিয়ে বলল “ তোর প্রেমকেও কেউ বুঝবে না বলে মনে হয় নাকি তোর?” টোপটা ফেলে চুপ করে রইল আরতি। চকিতে শ্রেষ্ঠা জানলার দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে সরাসরি আরতির দিকে তাকাল। শ্রেষ্ঠার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে! আরতি মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল!  শ্রেষ্ঠা বিছানা থেকে ধীরে ধীরে নেমে আরতির সামনে এসে দাঁড়ালো, তারপর হিসহিসিয়ে বলল “ তুই কি জানিস আমার প্রেমের ব্যাপারে! তুই আমার কেন তুই প্রেমের ব্যাপারেই কিছু জানিসনা! কেউই জানেনা! প্রেম মানে ত্যাগ, সঙ্গে না থেকেও সব সময় সঙ্গে থাকার এক অনুভূতি! একটা পিওর অনুভূতি, যেটা শুধু আমার একার, আর কারুর অধিকার নেই এতে…” শ্রেষ্ঠার কথার মাঝেই ওর মা ঘরে এসে ঢুকলেন, সাথে দু কাপ চা আর কয়েকটা বিস্কিট। “ নে দুই বন্ধু মিলে খেয়ে নে! বাবু তুইও খা অল্প করে, আরতির সাথে” হেসে হেসে বললেন শ্রেষ্ঠার মা। আরতি অপলক তাকিয়ে আছে শ্রেষ্ঠার দিকে! শ্রেষ্ঠার মুখ থেকে এসব কথা আগে কক্ষনো শোনেনি ও! “ আন্টি, আমি উঠলাম! পরে একদিন এসে চা খাব, একটা কাজ মনে পড়ে গেল” বলে উঠতে গেল আরতি। “ আরে, খেয়ে নিয়েই যা! কতক্ষন আর সময় লাগবে…” ওর মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই আরতি বলে উঠলো “ সরি আন্টি, পরের বার হবে, আজ আসি” একবার শ্রেষ্ঠার দিকে তাকিয়ে তারপর তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল আরতি।
“ শ্রেষ্ঠা! শ্রেষ্ঠা! “ বাবার ভারী গলার আওয়াজ পেয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল শ্রেষ্ঠা। “তোমার ফোনটা কোথায়?” মুখটাকে কঠিন করে জিজ্ঞেস করলেন মিস্টার রায়। শ্রেষ্ঠা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উস্খুস করতে লাগলো। তারপর এগিয়ে এসে বললেন “ এটা তো?” শ্রেষ্ঠা চমকে উঠলো। তারপর আবার বললেন ওর বাবা “ জিজ্ঞেস করবে না এটা কোথা থেকে পেলাম?” বলে সরে দাঁড়িয়ে ঘরের সদর দরজাটা খুলে দিলেন। দরজার ওপারে তখন শ্রেষ্ঠার জন্য অপেক্ষা করছে অগুন্তি প্রশ্ন!

#একটি ধূসর প্রেম
#Poulami Gangopadhyay
#সপ্তম তথা অন্তিম পর্ব –
“এইভাবে শ্রীকে পুলিশ বসিয়ে রেখেছে কেন ভেতরে একটু বলবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা!” উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন শ্রেষ্ঠার মা। “ আমি কিছু জানিনা! তবে তামিলনাডুর এই পুলিশ টিম অরিত্রর নিখোঁজ কেসটার তদন্ত করছিল। ওরা শ্রেষ্ঠার ফোনটা অরিত্রর গাড়িতে পেয়েছে! আর অরিত্রর গাড়িটা উটির নিকটবর্তী এক শুনশান জঙ্গলের মধ্যে থেকে পাওয়া গেছে!” এত টুকু বলে থামলেন মিস্টার রায়। “ বাকিটা আমি বলছি মিসেস রায়” ভারী একটা গলা শুনে ঘুরে দেখলেন দুজনেই। “মিস্টার অরিত্র সেনের কেসটা আমিই তদন্ত করছি! আমি ইনস্পেক্টর রামানন্দ কে। আপনাদের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করার আছে, ভিতরে আসুন” বলে নিজের কেবিনে ঢুকলেন রামানন্দ। শ্রেষ্ঠার বাবা মা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে ওনার পিছনে গিয়ে কেবিনে ঢুকলেন।
“মিস্টার অরিত্র সেনকে আপনারা কিভাবে চেনেন?” সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন রামানন্দ। “ বেশ কিছুদিন আগে অরিত্র আর ওর বাবা মা আমাদের মেয়ে শ্রেষ্ঠাকে দেখতে এসেছিলেন! সেই সূত্রেই পরিচয়, আর পরস্পরকে আমাদের পছন্দও হয়েছিল, কথা এগিয়েওছিল” বললেন মিস্টার রায়। “আর মিস্টার অরিত্র যেদিন নিখোঁজ হলেন সেদিন আপনার মেয়ে শ্রেষ্ঠা কোথায় ছিল?” ওনাদের দুজনের উপর থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন রামানন্দ। “ সপ্তাহ তিন আগে তো? শ্রেষ্ঠা তো ওইদিন কলেজ এক্সকারশনে চেন্নাই গেছিল! আপনি ওর কলেজে খবর নিতে পারেন চাইলে!” উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন শ্রেষ্ঠার মা। “ আমরা সব খোঁজ নিয়েছি মিসেস রায়। আপনার মেয়ে যেদিন অরিত্র নিখোঁজ হয় তার আগের দিনই কলেজের ফ্যাকাল্টির থেকে কোন এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার পারমিশন নিয়েছিল! তারমানে সেইদিন আপনার মেয়ে কলেজের এক্সকারশনের দলের সাথে ছিলই না!” বলে থামলেন রামানন্দ। “ আত্মীয়? চেন্নাইতে আমাদের…” মিসেস রায়কে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠেন মিস্টার রায় “এই জন্য আমি শ্রেষ্ঠাকে কোথাও যেতে দিতাম না! দেখলে তো কিরকম ঝামেলা পাকিয়ে বসে আছে! ডিসগাস্তিং! এক্সকারশনে গিয়ে…।“ ওনাকে হাত দেখিয়ে থামালেন রামানন্দ। তারপর বললেন “ আপনাদের পারিবারিক কথা শুনতে আমি ইন্টারেস্টেড নই মিস্টার রায়! আপনার মেয়ে নিশ্চিতরূপে অরিত্র নিখোঁজ কেসের সাথে জড়িত! ও যতক্ষণ না আমাদের সব কিছু বলছে, ততক্ষণ অব্দি আপনাদেরও আমাদের সংগ দিতে হবে! আশা করি বোঝাতে পেরেছি!” গম্ভীর গলায় বললেন ইন্সপেক্টর রামানন্দ। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল মিস্টার রায়ের গলা থেকে!
“ শ্রেষ্ঠা! তুমি নিশ্চিতভাবে জানো অরিত্র কোথায় আছে তাই তো?” কোন জবাব এল না। আবারো জিজ্ঞেস করলেন ইন্সপেক্টর রামানন্দ “ শ্রেষ্ঠা, চুপ করে থাকলে যদি ভাবছ তুমি বেঁচে যাবে, তাহলে সেটা কিন্তু তোমার মস্ত বড় ভুল ধারণা! তোমার বিরুদ্ধে অনেক প্রমাণ আছে আমাদের কাছে! বেটার হবে যদি তুমি সব কিছু সত্যি এখনি বলে দাও!” শ্রেষ্ঠা মাথা নিচু করে বসে আছে! আর বিড়বিড় করে কিসব বলে চলেছে! রামানন্দ শোনার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন না! “ শ্রেষ্ঠা! মিস শ্রেষ্ঠা রায়! তোমার সাথে কথা বলছি আমি! জবাব দাও! অরিত্র কোথায়? তুমি কি করছিলে ওইদিন অরিত্রর সাথে? অরিত্র কি অদেও বেঁচে আছে? আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিওনা!” চিৎকার করে বলে উঠলেন রামানন্দ। তাও কোন হেলদোল দেখা গেলো না! “ স্যার! একবার এদিকে আসবেন?” মহিলা কন্সটেবলের ডাকে উঠে সাইডে গেলেন রামানন্দ। “ বলুন ম্যাডাম” বলে তাকালেন। “স্যার! এতক্ষণ ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে! তাও কোন জবাব নেই! কলেজে পড়া মেয়ে! এইভাবে জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও কেমন নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে আর বিড়বিড় করে চলেছে!”  বলে থামলেন মহিলা কন্সটেবলটি। “ আপনি বলতে কি চাইছেন, পরিষ্কার ভাবে বলুন” বলে তাকালেন রামানন্দ। “স্যার! আমার মনে হয় সাইক্রিয়াটিসটের সাহায্য নেওয়া উচিত! হয়তো কিছু সুরাহা হতে পারে!” বলে থামলেন মহিলা কন্সটেবলটি। ইন্সপেক্টর রামানন্দ তাকিয়ে দেখলেন শ্রেষ্ঠাকে! এখন দেওয়ালের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে সে!
“ শ্রেষ্ঠা! আমাকে শুনতে পাচ্ছ ?” হালকা ভাবে জিজ্ঞেস করলেন নামী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মিসেস রাও। সামনের চেয়ারে বসে আছে শ্রেষ্ঠা, একদম চুপ করে। কোন জবাব না পেয়ে আবার বললেন ডাঃ রাও “ আচ্ছা শ্রেষ্ঠা তোমার কি করতে সব থেকে ভাল লাগে?” তাও কোন জবাব নেই। “ শ্রেষ্ঠা! তুমি কি কাউকে ভালোবাসো?” বলার সাথে সাথে শ্রেষ্ঠা মুখ তুলে তাকাল ডাঃ রাওএর দিকে। চোখ দুটো ছলছল করছে! ডাঃ রাও এগিয়ে এসে শ্রেষ্ঠার কাঁধে হাত রাখলেন, তারপর বললেন “ তুমি আমাকে বলতে পারো! আমি তো তোমার বন্ধু হতে চাই।“ চকিতে ডাঃ রাওএর হাতটা নিজের কাঁধ থেকে ফেলে দিল শ্রেষ্ঠা “ না! আমার কোন বন্ধু চাইনা! আমি কাউকে বন্ধু বানাইনা! আমি জানি এক না একদিন এই বন্ধুত্ব আমার জীবন থেকে সরে যাবে! আর তখন…আর তখন আমি একা একা শুধু কাঁদবো! কেউ বুঝবে না আমাকে! কেউ না!” বলে মুখ ঢেকে বাচ্চাদের মত ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলো শ্রেষ্ঠা।
“ আপনার মেয়ের কি ছোটবেলাতে কোন বন্ধু –বিচ্ছেদ হয়েছিল?” সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন  ডাঃ রাও শ্রেষ্ঠার মা বাবাকে। “ হয়েছে তো অনেকবারই! ওর বাবার বদলির চাকরি! বুঝতেই পারছেন” আস্তে আস্তে বললেন মিসেস রায়। “ হম! ঠিক আছে। শ্রেষ্ঠার ছোটবেলার বেশিরভাগটা কোথায় কেটেছে?” জিজ্ঞেস করলেন ডাঃ রাও। একটু ভেবে নিয়ে বললেন মিসেস রায় “ আমরা রাজস্থানে বেশ কয়েক বছর ছিলাম। ওখানে ওর খুব প্রিয় একটি বন্ধু ছিল, অম্বিকা নাম ছিল মেয়েটার। দুজনের ভীষণ ভালো বন্ধুত্ব ছিল!” “তারপর?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন ডাঃ রাও। “ তারপর, ওর বাবার বদলি হয়ে গেল, আর আমরা ভুবনেশ্বরে চলে গেলাম। কিন্তু অম্বিকাকে ছেড়ে আসার পর বহুদিন মনমরা হয়ে ছিল শ্রেষ্ঠা! তারপর থেকেই ও একটু বেশিই চুপচাপ হয়ে যায়!” বলে থামলেন মিসেস রায়। “আর আপনারা কোনদিন এটাকে গুরুত্ব দেননি তাই তো?” তীক্ষ্ণভাবে বললেন ডাঃ রাও। “ আমাদের কি করার ছিল বলুন তো?” এবার মুখ খুললেন মিস্টার রায়। “অনেক কিছু মিস্টার রায়! আপনি যদি ব্যস্ত ছিলেন তাহলে অন্তত আপনার ওয়াইফের করা উচিৎ ছিল! শ্রেষ্ঠা আপনাদের মেয়ে, আর ওর বয়সটা তখন খুবই সেনসিটিভ ছিল! আপনারা অদেও কি জানেন ওর মানসিক স্থিতিটা কি এই মুহূর্তে?” বলে থামলেন ডাঃ রাও। তারপর বেরিয়ে যেতে গিয়েও ফিরে এলেন, আর বললেন “ শ্রেষ্ঠা মানসিকভাবে সুস্থ নয়! ওর এই রোগের মূল হয়তো ওর অতীতে গাঁথা আছে! আপনাদের সহযোগিতা দরকার হবে!” শ্রেষ্ঠার মা বাবা বিস্ফোরিত চোখে ডাঃ  রাওর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“ কি বুঝলেন ডাঃ  রাও? কিছু বলল মেয়েটা?” বলে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলেন ইন্সপেক্টর রামানন্দ। কাপে চুমুক দিয়ে বললেন ডাঃ রাও “ কেসটা ভোগাবে আপনাদের অফিসার! আমাদের বেশ খাটতে হবে বলে মনে হচ্ছে!” কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন রামানন্দ “ আচ্ছা? মেয়েটা কি মিস্টার অরিত্রর নিখোঁজের জন্য দায়ী?” “এখনই এসব কিছুই বলা যাবেনা অফিসার! তবে মেয়েটা মানসিক ভাবে সুস্থ নয়। অতীতের কিছু ব্যাথা, বিচ্ছেদ ওকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে ওর নিজের সত্ত্বা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ওর নিজেরই অজান্তে! আমাকে কয়েকটা জায়গায় যেতে হবে অফিসার, আর সাথে মেয়েটির সাথে আরও সময় কাটাতে হবে, একদম স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে! যাতে ও মন খুলে কথা বলতে পারে, তবেই আপনাদের কেস সল্ভড হবে” বলে থামলেন ডাঃ রাও। “সবরকম সহযোগিতা পাবেন আপনি আমাদের এন্ড থেকে ডাঃ রাও! প্রথমে তবে কোথা থেকে শুরু করতে হবে?” বলে তাকালেন রামানন্দ। হাতের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন ডাঃ রাও “জয়সালমির, রাজস্থান।“
“ শ্রেষ্ঠা, দেখো কে এসেছে তোমার সাথে দেখা করতে!” বলে শ্রেষ্ঠার পিঠে আলতো করে হাত রাখলেন ডাঃ রাও। শ্রেষ্ঠা আস্তে করে ফিরে দেখার চেষ্টা করলো, পরক্ষনেই চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। “ শ্রেষ্ঠা! তুই আমাকে চিনতে পারছিস না? দেখ তোর জন্য কি এনেছি! দাল বাটি চুরমা!” অগন্তুক বলে উঠলো। “ অম্বিকা!” অস্ফুটে বলে উঠলো শ্রেষ্ঠা! “ হ্যাঁ অম্বিকা এসেছে দেখা করতে তোমার সাথে!” হালকা হেসে বললেন ডাঃ রাও। শ্রেষ্ঠা ছুটে গিয়ে অম্বিকার সামনে দাঁড়ালো। অম্বিকা মিটিমিটি হাসছে। “ আমাকে চিংড়ির মালাইকারি খাওয়াবিনা শ্রেষ্ঠা?” ছলছলে চোখে বলল অম্বিকা। শ্রেষ্ঠার চোখের জল তখন আর বাঁধ মানছে না! এ যেন এক হারিয়ে খুঁজে পাওয়া এক অসাধারণ মিলনের মুহূর্ত!
শ্রেষ্ঠার কথাঃ
“ আমি আমার প্রিয় বন্ধুকে আজ চিরতরে হারালাম। হয়তো এই জীবনকালে আর কোনদিনও আমাদের দেখা হবে না! সেই দাল বাটি চুরমা, সেই স্কুল, সেই মেলা…আর কোনদিন দেখতে পাবনা! কেন ঠাকুর, শুধু আমার বাবারই এমন চাকরি? আমি আর কোনোদিন অম্বিকাকে দেখতে পারবো না বাবার এই চাকরির জন্য…”
“ আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি! বন্ধুমহল থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করি। কারণ আমি জানি, এসবই ক্ষণস্থায়ী! আবারও বাবার বদলি হবে! আবারো আমার বন্ধু-বিচ্ছেদ হবে! আর এবারও আমাকে কেউ বুঝবে না! মাও না! বলবে এরকম তো হতেই থাকে! সবার সাথেই হয়! আমার কষ্ট, আমার বন্ধুহীনতা কেউ বোঝে না! কেউ না!………”
“ পুদুচেরি জায়গাটা আমার একদম ভাল লাগেনা! কেমন যেন প্রাণহীন! আসলে আমার জীবনটাই প্রাণহীন যন্ত্র হয়ে গেছে! ইতিহাসের টান কি জিনিস সেটা আমার বাবা কোনদিনও বুঝবে না! সুমিত্রা দিদির কাছে শোনা ঐতিহাসিক গল্প গুলো আজও মনে আছে আমার! সেই রাজাদের বীরত্বের কাহিনী! যুগে যুগে কতো সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হয়েছে এই পৃথিবীতে! মুঘল, ব্রিটিশ…… সুমিত্রা দিদি বলেছিল শাহেজাদা শাহজাহানের কথা! শাহজাহান নিজের প্রেমকে অমর রাখতে তাজমহল বানিয়েছিলেন! আচ্ছা! সত্যিই কি কেউ কাউকে এতটা ভালবাসতে পারে! কি জানি!……আমার তো পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, অঙ্ক এসবকে ভালবাসতে হবে! তবেই বাবা খুশি হবে! আমাকে ফার্স্ট হতে হবে!………আমার রসহীন জীবনে তাজমহল এক হাস্যকর বিষয়…………”
“ আরতি মেয়েটা বেশ ভালো। আজ ওরই জন্য আমি পুদুচেরির গোধূলিকালীন সমুদ্র ছাড়াও আরও কিছু ভালোলাগার জিনিস জানতে পারলাম! সেটা হল পুদুচেরির ইতিহাস। হ্যাঁ! আজও আমি ইতিহাসের পাতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ পৃথক করতে পারিনি! আমি তো অম্বিকার মতই ইতিহাস নিয়ে পড়তে চেয়েছিলাম! খুব কি কষ্ট হত বাবার যদি আমার এই সামান্য কথাটা রাখতেন?……আমি লুকিয়ে ইতিহাসের বই জোগাড় করে রাখি! রাতে শুয়ে শুয়ে পড়ি! নিস্তব্ধ রাতে, অতীতের সেইসব ঘটনাগুলো আমাকে শিহরণ জাগায়! আমাকে সঙ্গ দেয়! আর আমি জানি, এই সঙ্গ আমার কাছ থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না………।“
“ যেদিন আমি আরতির সাথে গেলাম পুদুচেরির আশেপাশে ঘুরতে, সেদিনও আমি বুঝিনি যে আমার জীবনটা এইভাবে ঘুরে যাবে! ওকে আমি সবসময় কাছে পেতে শুরু করলাম! আমরা একান্তে সাক্ষাত করতাম……ও বলত, কেউ জেনে গেলে ওকে চলে যেতে হবে অনেক দূরে ! আমার খুব ইচ্ছা করতো ওর সাথে গোধূলির সময় সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখার! ও আসতো, ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে আগে! আমি অপেক্ষা করতাম……আমার ভাল লাগত এই অপেক্ষা! নাই বা হল সূর্যাস্ত দেখা! ও আমার সাথে থাকবে চিরকাল! আর কি চাই! এরকমই এক বর্ষামুখর সন্ধ্যে বেলায় আমার দুটো হাত ধরে বলেছিল ভালবাসে আমাকে! ওর ঘন নীল চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল আমি অনন্ত গভীরতায় ডুবতে রাজি আছি!………এই নীল চোখ দুটোর অধিকারী শুধু আমার……আমার লুইস……ভেবেই মনে এক অদ্ভুত শিহরণ হয়………একেই কি প্রেম বলে? কি জানি………”
“ শুনেছিলাম সুদূর ফ্রান্স দেশটা হল প্রেমের দেশ……এখানের মানুষের প্রেমে পড়তে আপনি বাধ্য! সত্যিই! লুইসের সাথে দেখা না হলে হয়তো কোনদিন জানতেও পারতাম না যে এই মিথটা কতটা সত্যি! আমাকে সুদূর ফ্রান্সের শহর প্যারিসে নিয়ে যাবে লুইস! ও বলেছে ওখানেই আমরা দুজন নিজেদের ঘর বাঁধব, আর আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভালবাসার কথা চিৎকার করে সারা দুনিয়াকে জানিয়ে দেবে লুইস!………আমি কতটা ভাগ্যবতী! আমাকে কেউ বুঝুক না বুঝুক কিন্তু লুইস বোঝে! ও জানে আমি কি চাই! ও আমার চাওয়া না-চাওয়ার কদর করে! ওকে আমি হারাতে পারবনা! তাই দুনিয়ার কাছে এই প্রেমকে আমাকে আড়াল করতেই হবে………নইলে লুইস আমাকে ছেড়ে চলে যাবে ………না! আমি লুইসকে ছাড়া বাঁচবো না! আমরা দুজন প্যারিসে চলে যাব একদিন!……শুধু আমার গ্রাজুয়েশনটা শেষ হয়ে যাক………”
“ অনিকেত গুপ্তা না কে! কি মনে কি করে নিজেকে! প্রেম দেখাচ্ছে! তাও আমাকে? সব প্রেমের নামে টাইমপাস করে আবার কথা বলে…………আমার পিছনে পিছনে আসছিল! আজ আরতিও আসেনি! তাই লুইস এসেছিল কলেজ শেষে আমার সাথে একান্তে দেখা করতে! ঠিক তখনই ও এসে হাজির! সাহস কি! লুইস ওকে দেখে নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারেনি! যখন আমার হাত ধরতে গেছে ঠিক তখনই………কি রক্ত! আমাকে গাছের আড়ালে টেনে নিয়েছিল লুইস……… ঠিক হয়েছে! আমার আর লুইসের মাঝে যে আসবে তাকে লুইস ছেড়ে দেবে না!……আমাদের আলাদা করার মত শক্তি কারুর নেই………”
“ এই অনিকেত মরার পর আবার আর এক উটকো ঝামেলা এসে পড়েছে! অরিত্র সেন! বাবাকে তো বলে লাভ নেই, আর মা তো বাবার উপরে কিছুই বলবে না!……লুইস এবার বেশ রেগে গেছে! যেদিন শুনল যে আমাকে ছেলের বাড়ির থেকে দেখতে আসছে সেদিন আর দেখাই করতে আসেনি!………”
“ চার দিনের জন্য এক্সকারশনে এসেছি চেন্নাই! লুইসও এসেছে!……আমারও এবার বেশ রাগ হচ্ছে! ওই অরিত্র ফোন করেছিল আমাকে! আমি বুঝিনি, বলে দিয়েছি চেন্নাইতে আছি। ব্যাস! বলল ও নাকি চেন্নাইতেই আছে, একবার দেখা করে আমার বিয়েতে কিছু প্রব্লেম আছে নাকি ক্লিয়ার করবে!………লুইসকে সব বললাম। ও বলল যেতে! ও পিছনেই থাকবে! কালই এই ঝামেলা শেষ করে দেবে ও………”
“ আমি বললাম উটিতে গিয়ে কথা বলব! অরিত্র খুশি খুশি রাজি হয়ে গেল!…এইসব প্ল্যান লুইসের। আমি জানিনা ও কি করতে চলেছে………”
“আমি আর অরিত্র উটির নিকটবর্তী একটা পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছি……অরিত্র অনেক কিছু বলছে! আমার কিছু কানে ঢুকছে না! আমার চোখ শুধুই লুইসকে খুঁজছে!………ওই! ওই তো লুইস! অরিত্রকে আমার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াতে দেখে ওর চোখের সেই জিঘাংসা আমি এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি!……লুইস এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে……নিচে খাদ, আর একটা ধাক্কা……ব্যাস সব শেষ………কাঁটাটা উপড়ে ফেলে দিয়েছে লুইস……আবারও………”

“অবশেষে মেয়েটির মুখ খোলানো গেলো তাহলে ডাঃ রাও!” বলে তাকালেন ইন্সপেক্টর রামানন্দ। তারপর আবার বললেন “এবার শুধু ওই লুইসকে ধরতে পারলেই কেস সল্ভড! আমি পুদুচেরি পুলিশকে ইনফরম করে দিয়েছি যে ওনারা যে অনিকেত গুপ্তার কেসটা হ্যান্ডেল করছিলেন, তার দোষী আর আমাদের কেসের দোষী এই দুজনই, মিস শ্রেষ্ঠা রায় আর ওনার প্রেমিক মিস্টার লুইস, একজন ফ্রেঞ্চ! “ “দুজন নয় অফিসার, একজনই” বলে একটা রহস্যময় হাসি হাসলেন ডাঃ রাও। “ মানে?” অবাক হয়ে বললেন রামানন্দ। “ মানে আপনি  লুইসকে এই দুনিয়ার কোন কোণাতেই  খুঁজে পাবেন না!” “তাহলে কি শ্রেষ্ঠা মিথ্যা কথা বলছে?” বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন রামানন্দ। “না! আমি আপনার কাছে এক মাস মত টাইম চেয়ে নিয়েছিলাম মনে আছে? আমি শ্রেষ্ঠার ছোটবেলা থেকে শুরু করে এখনো অব্দি সব মুভমেন্ট স্টাডি করেছি! অম্বিকাকে নিয়ে আসার কারণই ছিল যাতে শ্রেষ্ঠা নিজের থেকে ভেঙ্গে পড়ে আর আমাদের কাজে সুবিধা হয়! অম্বিকা ওর মনের খাঁজে হারিয়ে যাওয়া এক সেনসিটিভ চরিত্র! আমি অম্বিকাকে খুঁজে পাই জয়সালমিরে এবং সেখান থেকেই শ্রেষ্ঠার ইতিহাস প্রীতির ব্যাপারে এক উল্লেখযোগ্য তথ্য পাই! অম্বিকা সব শুনে আমাদের সাহায্য করতেও রাজি হয় এবং আমার সাথে চেন্নাই আসে!” বলে একটু থামলেন ডাঃ রাও। তারপর আবার বললেন “ শ্রেষ্ঠার জীবনে বিচ্ছেদটা একটা জোরালো ঘা ছিল! বয়ঃসন্ধির সেনসিটিভ সময়ে ওকে নিজের একান্ত কাছের বান্ধবীকে ছেড়ে চলে আসতে হয়! তারপর আবারও একবার মন ভাঙ্গে যখন ওর বাবা জোর করে সাইন্স নিতে বাধ্য করেন ওকে! বন্ধু বানাতে দ্বিধা, বন্ধুহীনতা, একাকীত্ব, নিজের পছন্দের কাজ করতে না পারার যন্ত্রণা, সর্বোপরি বাবার সব কিছুতেই বাড়তি স্ট্রিক্টনেস! সব মিলিয়ে শ্রেষ্ঠার মন সবসময় সব কিছুকে হারিয়ে ফেলার ভয় পেত! সে এমন কাউকে চাইতো যে তার জীবন থেকে কোন ভাবেই দূরে চলে যাবেনা! ওকে বুঝবে!…এবার এরকম মানুষ ও হয়ত পায়নি কিম্বা আর খোঁজার সাহস দেখায়নি! বরং নিজের মনের তুলি দিয়ে সেই মানুষটাকে এঁকে নিয়েছিল! আর সোর্সটা ছিল পুদুচেরির সেই পুরনো কবরস্থান, যেখানে শ্রেষ্ঠা ওর বান্ধবী আরতির সাথে প্রথমবারের জন্য ঘুরতে গেছিল!” রামানন্দ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ডাঃ রাও আবারও বলে চললেন “ আমি আরতিকে শ্রেষ্ঠার ব্যাপারে সব কিছু খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করি!  এক অদ্ভুত জিনিস জানতে পারি তখন! শ্রেষ্ঠা নাকি আর একবার যখন ওই কবরস্থানে গেছিল তখন একটা কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কিসব বিড়বিড় করে বলছিল! আমি তৎক্ষণাৎ আরতির সাথে সেখানে যাই আর সেই কবরটা দেখতে পাই……নামঃ লুইস বিসেট, জন্ম সালঃ ১৭০১, মৃত্যু সালঃ ১৭২৬। আর এই সেই লুইস যাকে প্রেমিক হিসেবে কল্পনা করে এসেছে শ্রেষ্ঠা। ওর ভাবনাতে লুইস এক ২৫ বছরের ফ্রেঞ্চ যুবক, সোনালি চুল, নীল চোখ আর মায়াময় হাসি! ঠিক যেমনটা শ্রেষ্ঠার পছন্দ! এই লুইস যে কিনা আসলে প্রায় ৩০০ বছর আগেই মারা গেছে! তাকে আপনি পৃথিবীর কোন প্রান্ত থেকে ধরে আনতেন অফিসার!” “তারমানে এই মার্ডারগুলো সবই……” থেমে গেলেন রামানন্দ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন ডাঃ রাও “ হ্যাঁ অফিসার, এই সব হত্যাগুলো শ্রেষ্ঠাই করেছে! নিজের অবচেতন মনে! আর ওর অবচেতন মন ওকে বার বার এটাই বলেছে যে লুইস করেছে এগুলো! ওকে নিজের কাছ থেকে দূর না হতে দেওয়ার জন্য! এ এক ভয়ঙ্কর মনব্যাধি!” “অরিত্রর মৃতদেহটা তাড়াতাড়ি উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে!…আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ডাঃ রাও ! আজ আপনার জন্যই এই কেসটা সল্ভ হল বলে থামলেন ইন্সপেক্টর রামানন্দ। “ আর আমাদের কেসটাও সল্ভ হয়ে গেল। যদিও আমাদের কাছে ক্লু ছিল যে একটা মেয়েকে অনিকেতকে হসপিটালের পথে নিয়ে যাওয়ার পর সেই দুর্ঘটনাস্থল থেকে আসতে দেখা গিয়েছিল! সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ায় আর অন্ধকার থাকায় সেই দোকানের লোকটি মেয়েটাকে ঠিকভাবে দেখতে পায়নি! আর কিছু ক্লু পাওয়া যাচ্ছিলোনা! যাই হোক! আজ আপনাদের জন্য আমার কেসটাও সল্ভ হয়ে গেল” বলে হাল্কা হেসে রুমে ঢুকলেন ইন্সপেক্টর চরণ। ডাঃ রাও মৃদু হাসলেন আর বললেন “ মানুষের মনের মত প্যাঁচালো জিনিস আর নেই বুঝলেন অফিসার! কার মনে কোন ঘটনা যে কিভাবে রেখাপাত করবে সেটা আমরা কেউ বলতে পারিনা! মেয়েটাকে  অ্যাসাইলেমে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।“
শ্রেষ্ঠার মা বাবা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে ওনাদের শান্ত শিষ্ট মেয়েটা দু দুটো মার্ডার করেছে! পুলিশ বলছে শ্রেষ্ঠাকে  অ্যাসাইলেমে পাঠানো হবে! শ্রেষ্ঠার মা কাঁদতে কাঁদতে পাগলের মত করছে! ওর বাবা নির্বাক হয়ে গেছে! আরতি বিশ্বাসই করতে পারছে না যে এই ঘটনাগুলো শ্রেষ্ঠা ঘটিয়েছে! অম্বিকা নীরবে চোখের জল মুছছে! আর শ্রেষ্ঠা!? তার আজ ঠিকানা হল অ্যাসাইলেম! কেউ মানুক না মানুক শ্রেষ্ঠা এখনও মানে, আর সারা জীবন মানবে যে ও লুইসকে ভালবেসেছে! আজও রাত গভীর হলে লুইস আসে, তার সমুদ্র- নীল চোখের দিকে তাকিয়ে শ্রেষ্ঠা দুনিয়ার সব কিছুকে ভুলে যায়! হতে পারে এই প্রেম দুনিয়ার সবার কাছে এক অবাস্তব, অলীক কাহিনী! কিন্তু একটা ধূসর প্রেমের অনুভূতি হয়ে লুইস সারাজীবনের জন্য শ্রেষ্ঠার মনের মণিকোঠায় রয়েই যাবে!

সমাপ্ত…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *