অলৌকিক গল্প – নাড়ির টান – Bengali Science Fiction Story – Sci-Fi Story

             
(প্রাপ্তমনস্কদের জন্য)
                             ১
“উফফ,অস্মি আজ যা তোকে লাগছে না …প্রেমে পড়ে যাবো মনে হচ্ছে “বলে অগ্নি হাসতে গিয়ে দেখল অস্মিতা হাঁটা থামিয়ে ওর দিকে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে,যদিও তারও মনে মনে লাড্ডু ফুটছে।কিন্তু সঙ্গে সিমিতা, অয়ন, সিদ্ধার্থ সবাই রয়েছে তাই এই টুকু ন্যাকামি করতেই হলো তাকে।অস্মিতা কলেজের ফার্স্ট ইয়ার থেকেই অগ্নির প্রেমে হাবুডুবু খেলেও বলে উঠতে পারেনি।আর অগ্নি ,মানে কলেজের একজন হার্টথ্রব বলা যায়,যে কিনা মাসে মাসে গার্ল ফ্রেন্ড বদলায়।অস্মিতা,অগ্নির একই ব্যাচ ,তাই ওদের প্রেমটা না হলেও বন্ধুত্ব টা হয়ে গিয়েছিল খানিকটা অগ্নির স্বার্থের কারণে।কলেজের শেষ বছরে তাই সরস্বতী পুজোতে বেরিয়ে ছিল একসাথে।
ওদের যথারীতি আড্ডা চলছে,মাঝে অয়ন বলে উঠলো”শোন, সকাল টা তো কলেজেই কেটে গেলো, রাতে কিন্তু ভাই একটু ঢুকুঢুকু চাই ..”
“সে তো হবেই বস,পাউব এ যাবি নাকি সিদ্ধার্থর বর্ধমানের গ্রামের বাড়ী”বলেই অগ্নি একটু চোখ টিপে রহস্যসূচক হাসলো।তাতেই অয়ন আর  সিদ্ধার্থ বুঝে গেল।
  সিদ্ধার্থর গার্লফ্রেন্ড সিমিতা,তাই ও যেতে রাজি হলেও অস্মিতা আপত্তি করলো বটে কিন্তু অগ্নির কথা না রাখার মত মনের জোর ওর নেই ও জানে,তাও অগ্নি একটু অনুনয়ের সুরে বললো”আরে আমরা এই ক’জন ই তো,আর আজ বিকালে যাবো আবার কাল দুপুরের মধ্যেই লাঞ্চ করে বেরিয়ে আসবো, প্লিজ আর না করিস,উই উইল এনজয় …দারুন মজা হবে ,চল তো একবার”
    বিকাল 4 টে নাগাদ সবাই বেরিয়ে পড়ল,একটা বাইকে অগ্নি আর অস্মিতা,অন্য বাইকে সিদ্ধার্থ আর অয়ন।শেষ মুহূর্তে সিমিতা যাবে না বলে নাকি জানিয়ে দিয়েছে।অস্মিতা ভাবলো একবার ও তাকে ফন করে কেন জানালো না সিমিতা যে সে আসবেনা..তাহলে ও ও যাওয়া টা ক্যানসেল করতো,কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই।এক তো অজানা জায়গা তার উপর সবই ছেলে,উফঃ কি যে করে,কিন্তু অগ্নির কথায় শেষ পর্যন্ত উঠেই বসলো অগ্নির পিছনের সিটে।
                                        ২
-আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে?
-কেন?
-না ,মানে, একটু সন্ধ্যার দিকে বেরোতাম, কয়েকটা জিনিস কেনার ছিল।
-এ আবার নতুন কি শুরু করলে রিনি?তোমার জিনিস তুমি কিনে আনো, তার জন্য আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে কেন?
-আসলে নতুন জায়গা তো…একা যাবো…তুমি একটু সঙ্গে গেলে ভালো…বলে আর পুরো কথা শেষ করলো না রিনি,চোখের জলটা বেরিয়ে আসার আগেই রান্নাঘরে চলে গেল।মনে মনে ভাবে রিনি,সোম কতটা বদলে গিয়েছে,যে আগে রিনিকে চোখে হারাতো সেই সোম এখন কারণে অকারণে বিরক্ত হয়ে যায় রিনির উপর।আর এটা আরো বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে যবে থেকে এই নতুন থানায় বদলী হয়ে এসেছে তবে থেকে ,যেন ক্রমাগত রিনি  তার চক্ষুশূল হয়ে উঠছে।সোম আর রিনির দিকে না ফিরেই খেয়ে বেরিয়ে গেল,রিনি তার যাওয়া টুকু দেখে চোখের জল মুছে আবার বাসন ধুতে শুরু করলো।
   সোম মানে সৌমব্রত সেন এই দেওয়ানদীঘী থানার চার্জ নিয়ে এসেছেন গত দু’মাস হোলো।জায়গাটা নিতান্তই গ্রাম,তবে বাজারের দিকটায় খানিকটা মফস্বলের ছোঁয়া লেগেছে।কিন্তু সোম কাজের সুবিধার জন্য থানার কাছেই একটা বাড়ী  ভাড়া নিয়েছে ।রিনিও এসেছে কিছুটা দায়ে পড়ে, জন্ম,বড় হওয়া ,স্কুল,কলেজ ,চাকরী সব কলকাতায় কিন্তু সোমের বদলী হওয়াতে তাকেও ওই ছোট্ট পুচকে গুলোকে ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে।কলকাতার একটা নামি কিন্ডারগার্টেনর শিক্ষিকা ছিল ও।আট বছর বিয়ে হলেও তাদের কোনো সন্তান নেই,তাই ওই বাচ্ছাগুলোর সাথে সময় কাটিয়ে তার মন ভালো হয়ে যেত,কিন্তু যেভাবে দিনদিন সোম আর তার সম্পর্ক খারাপের দিকে গড়াচ্ছিলো তাতে সম্পর্কটা শেষ হয়ে যাবার আশঙ্কা হয়েছিল রিনির।রিনিকে সোম যতই দূরে ঠেলে দিক,রিনি কিছুতেই সোমকে ছাড়তে পারবে না,তাই সম্পর্কটাকে নতুন করে অক্সিজেন দেওয়ার জন্য চাকরী ছেড়ে  চলে এসেছিল ও সোমের সঙ্গে ,যদিও সোম আপত্তি করেছিল।
                                  ৩
“ভাই আর কতদূর রে”অগ্নি চিৎকার ক’রে জিজ্ঞাসা করলো সিদ্ধার্থকে,সিদ্ধার্থ বেশ কিছুটা এগিয়ে গেছিলো,মনে হয় শুনতে পায়নি,অস্পষ্ঠভাবে দেখতে পেলো সিদ্ধার্থ ডানদিকে টার্ন নিলো,বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে, আর গ্রামের দিকে রাস্তায় তেমন আলোও থাকে না,তাই অগ্নি কিছুটা আন্দাজে এগিয়ে গিয়ে ডান দিকে বেঁকে আর সিদ্ধার্থকে দেখতে পেলো না,আগে যদিও একবার এসেছিল কিন্তু ভালভাবে মনে নেই রাস্তাটা।”মহা মুশকিলে পড়া গেল তো,***টা গেল কোথায়!”বলে বাইকের গতি কমিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করতে গিয়েই সামনে একজনকে দেখেই চমকে গেল।একি ! কমলি না এটা!মাঝ রাস্তায় কমলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছে! পিছনে বাইকের শব্দে সে যখন চিন্তার জাল ছিঁড়ে বেরোলো, দেখলো তার পিছনে সিদ্ধার্থ এসে দাঁড়িয়েছে কিন্তু সামনে কমলি কোথাও নেই।”হচ্ছে টা কি! তুই তো আমার সামনে ছিলি, **** পিছিয়ে গেলি কখন ?****এত স্পীড মারিস কেন?”কথাটা সিদ্ধার্থর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে অগ্নি আবার স্টার্ট দিলো …”আমি আর অয়ন একটু   হালকা হবো বলে দাঁড়িয়ে গেলাম,তুই তো ভাই দেখেও দেখলিনা আমাদের,আর অস্মিতা ছিল তাই ডাকলাম না ,এখন চল তাড়াতাড়ি,আর মিনিট পাঁচেক মতো লাগবে,চল চল”বলে সিদ্ধার্থ ও আবার এগিয়ে গেলো।অস্মিতা তখন থেকে একটাও কথা বলেনি যদিও অগ্নি অনেক বার চেষ্টা করেছে কথা বলার ।তবে কমলি বলে মেয়েটিকে ,না না মেয়ে নয় বউ টিকে দেখে কেমন যেন খটকা লেগেছে অস্মিতার,হাতে শাঁখা পলা পরা, কপালে সিঁদুরের টিপটা ঘাঁটা, চুল উস্ক কুস্ক,কেমন অপ্রকৃতস্থ।
                                     ৪
বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেলেও সোম ফিরলো না দেখে রিনি কুট্টি কে নিয়ে বেরোলো বাজারের দিকে।কুট্টি মেয়েটা খুব মিষ্টি যদিও এইটুকু একটা বছর ছ’য়েকের মেয়ে যার মুখে কথার খই ফোটার কথা সেখানে এই মেয়ে দু একটা কথা ছাড়া বলেই না,ভীষণ রকম চুপচাপ।রিনির প্রথম প্রথম খুব অদ্ভুত লেগেছিল কিন্তু এখন কুট্টিই যেন রিনির প্রাণ,পারলে সারাদিন তার কাছেই রেখে দেয় ।কুট্টি কিন্তু বিকাল হলে তবেই পায়ে পায়ে এসে বসে রিনির এই ভাড়া বাড়ীর বারান্দায়,সারাদিন তার কোনো পাত্তা থাকে না।দেওয়ানদীঘী আসা অবধি রিনি এই একই জিনিস দেখে আসছে কিন্তু কুট্টিকে জিজ্ঞাসা করেও কোন উত্তর পায়নি।যত টুকু সময় কুট্টি রিনির কাছে থাকে তার যত্নআত্তির শেষ থাকে না,রিনি যেন তার সমস্ত মাতৃ হৃদয়কে উজাড় করে দিতে চায় কুট্টির উপর,কুট্টি রিনিকে আপত্য স্নেহের সব সুখ মিটিয়ে দিয়েছে,তাই তো সোমের অবজ্ঞা,কটূক্তি আর কিছুই গায়ে মাখে না রিনি।তার খুব ইচ্ছে কুট্টিকে আইনত দত্তক নেবে কিন্তু সাহসে ভর করে কথাটা এখনও সোমকে বলে উঠতে পারেনি ।এইসব ভাবতে ভাবতেই কুট্টির হাত টা ধরে হাঁটছিল রিনি।তার যেন বার বার মনে হচ্ছে কেউ বা কারা তাকে দেখছে,দুটো চোখ যেন নজরবন্দি করে রেখেছে।যতক্ষন কুট্টি তার সাথে থাকে ততক্ষনই এই অনুভূতিটা থাকে,অন্যসময় না।রাতে যখন কুট্টিকে নিয়ে ঘুমায় রিনি তখনও ঘুমের মধ্যে মনে হয় কেউ তার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আবার কখনও মাথার কাছে দাঁড়িয়ে এক ভাবে দেখে যাচ্ছে তাদের।রাতের শারীরিক চাহিদা টুকু মিটিয়ে সোম চলে যায় অন্য ঘরে,তাই রাতে কুট্টি রিনির কাছেই ঘুমায়।
  কুট্টির জন্য কয়েকটা ফ্রক আর কয়েকটা বই কিনবে বলেই বেরিয়েছিল আজ রিনি, কিন্তু বাজার পর্যন্ত সমস্ত রাস্তাটাতেই মনে হলো কেউ যেন তাদের পিছনে অনুসরণ করছে কিন্তু পিছনে কাউকেই দেখা যায়না।বাজারে পৌঁছে রিনি দুটো ফ্রক,কয়েকটা বই,কিছু সাংসারিক টুকিটাকি আর  একটা রজনীগন্ধার স্টিক কিনে ফিরলো তাড়াতাড়ি ।সোম বাড়ী ফিরে যদি চা জলখাবার হাতের কাছে না পায় তবে আবার অশান্তি শুরু করবে যেটা রিনি কিছুতেই হতে দিতে চায়না।একটু হলেও মানুষটা কে বোঝার চেষ্ঠা করে।যাকে বাবা হওয়ার সুখ টুকু দিতে পারেনি সে তার থেকে বঞ্চনা পাবে সেটা স্বাভাবিক।তবে সোম হয়তো একটু বেশী রকম বিরক্ত রিনির উপর।
                                     ৫
সিদ্ধার্থদের বাড়িটা  পুরানো দিনের হলেও বেশ বড় ।সমস্ত বাড়িটা বিভিন্ন গেছে ঘেরা,পিছনে একটা বাগান ও আছে।আর আছে একটা বিশাল বড় চাতাল বাঁধানো পাতকুয়া।বাড়ীর সব সদস্য বাইরে থাকায় বাড়িতে একজন কেয়ার টেকার সব দেখাশোনা করে,নাম বলাই, পরিবার নিয়েই থাকে।বলাইএর কথা মনে পড়তেই সবারই ওর বউ কমলির কথাও চকিতে মনে পড়ে গেল,সেকেন্ডের মধ্যে মুখগুলো সবার যেন পাংশু হয়ে গেল।অস্মিতা লক্ষ্য করলো সেটা।কিন্তু ওরা এ বাড়িতে আসার পর থেকে শুধু বলাই কেই দেখেছে,কমলির টিকিটিও দেখেনি।সিদ্ধার্থ ভাবলো ,হয়তো আগেরবারের ঘটনার জন্য কমলি তাদের সামনে আসছে না বা সেই যে পালিয়েছে,আর আসেনি এ তল্লাটে।।আগেরবার সত্যি একটু বেশি বেশি করেছিল অগ্নি।
“আরে ইয়ার রোজ রোজ কি আর বাটার চিকেন ভালো লাগে..তোদের বাড়িতে বুনো রসালো মুরগী দেখলাম একটা,উফঃ কি মাল ভাই..আজ রাতে ওটাই চাই আমার” অগ্নির কথা শুনে অবাক চোখে তাকিয়েছিল সিদ্ধার্থ,যদিও কিছুটা আন্দাজ করেছিল কারণ সে ভালো করে চেনে অগ্নি কে,প্রতিটা উইক এন্ড এ একটা করে নতুন মেয়ের স্বাদ নেয় সে,তবে সে যে বলাই র বউ কমলি কে ইঙ্গিত করবে সেটা ভাবতেই পারেনি ।কিন্তু টাকার কাছে সব নস্যি, কয়েক তাড়া নোট আর এক বোতল মদ বলাইয়ের হাতে ধরাতেই সেও সে রাতের মতো বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে গেছিলো।বাড়িতে ছিল অগ্নি,সিদ্ধার্থ,অয়ন আর অন্য দিকে কমলি আর তার  ছোট্ট মেয়েটা। মেয়ে টাকে ওই ঠান্ডা তেও বাইরে রেখে জোর করে কমলিকে ঢুকিয়ে নিয়েছিল ঘরে তারপর একে একে অগ্নিরা চালিয়েছিল নারকীয় অপকর্ম গুলো।কমলি সিদ্ধার্থর পা জড়িয়ে ধরেছিল,”আমার মেয়েটার মুখ চেয়ে আমায় ছেড়ে দাও গো বাবুরা,মেরণীগো, আমার মেয়েটার যে কেউ দেখবার নেই,ছেড়ে দাও বাবু আমারে”কিন্তু মদের চরম নেশায় যে কখন কি হয়ে গেছিল বুঝতে পারেনি কেউ,যখন দেখল কাটা ছাগলের মতো তড়পাতে তড়পাতে চুপ গেল শরীরটা তখন অগ্নিও ভয় পেয়ে গিয়েছিল।কমলি মারা গেছে ভেবে বডি টা সরাবার জন্য টানতে টানতে দুজনে নিয়ে গিয়ে ছিল পিছনের বাগানে,ছোট্ট মেয়েটা মায়ের ঝুলে পড়া হাত দুটো ধরে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছিল তাদের সাথে।অগ্নি এক ধাক্কায় ছিটকে সরিয়ে দিয়েছিল তাকে। মাটি খোঁড়ার জন্য কোদাল আনতে  হবে বলে বডিটা ওখানে ফেলেই ফিরে এসেছিল বাড়িতে।ফিরে গিয়ে আর খুঁজে পায়নি কমলির বডিটা।তার মেয়েটাকেও দেখতে পায়নি আর।ওরা ধরেই নিয়েছিল যে কমলি হয়ত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল,কিন্তু পরে জ্ঞান ফিরে আসতে ভয়ে মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেছে।পরদিন সামনের দীঘির পাড় থেকে বিষিয়ে নীল হয়ে যাওয়া অজ্ঞান বলাইকে দেখতে পায় গ্রামের লোকরা,তারপর হাসপাতালে বেশ কিছুদিন থাকার পর সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরলেও সে রাতের কথা তার কিছুতেই মনে পড়ে না।কমলি আর তার মেয়েকেও দেখা যায়নি আর গ্রামে।এমনিতেও রোজ বলাই কমলির অশান্তি লেগে থাকতো,তাই হয়তো কমলি মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে ভেবে নিয়েছিল গ্রামের সব লোক।
পুরানো কথা গুলো ভেবে মনে মনে অগ্নির বুদ্ধির তারিফ ও করছিল সিদ্ধার্থ।এমন একটা ড্রাগ মিশিয়েছিল বলাইয়ের মদে যেটা ভুলিয়ে দেবে সেই রাতের সব কথা মানে “short time memory loss”আর কি।আজও সঙ্গে এনেছে অগ্নি।সঙ্গে মুরগী টাকেও ।অস্মিতা এমনিতেও খুব শান্ত আর মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।খুব একটা সমস্যা হবে ব’লে মনে হয়না।ড্রাগ কাজ না করলে  ব্ল্যাকমেইল তো করা যাবেই।আর তাতেই মুখ বন্ধ করবে নয়তো বাকি গুলোর মতো বডি লোপাট।অগ্নি এসব কাজে সিদ্ধ হস্ত।সিদ্ধার্থ ও কম যায়না।সব প্ল্যান করেই এসেছে ওরা।তাইতো সিমিতাকেও সঙ্গে আনেনি ।যাই হোক,ওরা বলাইকে দিয়েই চা আর কিছু স্ন্যাকস বানিয়ে টিফিন সেরে নিলো।তারপর রাতের খাবার বানাতে বলে দোতলার ঘরে চলে গেল।নীচে উপর মিলিয়ে সাত টা ঘর।নীচে চারটে ,উপরে তিনটে।উপরের পাশাপাশি দুটো ঘরের একটাতে অস্মিতা আর অন্য টাতে অগ্নিরা থাকবে ঠিক হ’ল।
               
                               ৭
বাজার থেকে ফিরে রিনি  দেখে তখনও ফেরেনি সোম।খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ঢোকে কুট্টিকে নিয়ে।”এ বাবা,দেখ ,এখনও জানালাটা বন্ধ করা হয়নি, দীঘির দিকের জানালা দিয়ে হু হু ঠান্ডা হাওয়া আসছে,একটু বন্ধ করে দে মা”বলে কুট্টির দিকে তাকাতে গিয়ে দেখে কুট্টি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে যেন কিছু ইশারা করছে।তাড়াতাড়ি জানালার কাছে গিয়ে দেখে নিস্পলক চোখে কুট্টি দীঘির ও’পারের বাড়িটার দিকে চেয়ে আছে।কেউ এসেছে মনে হয় ও বাড়ীতে।এখানে আসা অবধি একটা ক্ষ্যাপটে লোক ছাড়া কাউকে দেখেনি।রাতে কখনও আলো জ্বলতে দেখেনি কিন্তু আজ জানালাটা খোলা,দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই জানালার সামনে।কুট্টি তখনও একভাবে কাউকে কিছু যেন ইশারা করছে দেখে রিনি জিজ্ঞাসা করেই ফেলল”কে রে মা?কাকে ডাকছিস?ওদের
 চিনিস নাকি?”প্রশ্নের উত্তরে  কুট্টির চোখ আজ প্রথম জল দেখলো রিনি।আহা রে,রিনির মাতৃ হৃদয় যেন মুচড়ে উঠলো ,জড়িয়ে ধরে কুট্টিকে কোলে তুলে নিলো ও।”কেন কাঁদছিস মা?দেখ ,আমি তো আছি,তোর নতুন জামাটা পর তো ,দেখি একবার আমার কুট্টিরাণীকে কেমন লাগছে।”বলে কুট্টিকে বিছানাতে বসিয়ে নতুন একটা জামা তুলে দিল কুট্টির হাতে।ভেজা চোখ মুছে জামাটা হাতে নিয়ে জড়িয়ে ধরলো রিনিকে।রিনির বুকে মুখটা গুঁজে কিসের যেন গন্ধ পেল কুট্টি।সেই মায়ের গায়ের মত গন্ধ ,একদম সেই রকম।রিনি কুট্টির কপালে একটা চুম্বনরেখা  এঁকে বলল”কি খাবি বল মা,আজ দুই মা বেটি মিলে রান্না করবো।পায়েস ও করবো চল,এখন জামাটা পরে নে,”।রিনিকে ঘরে রেখে ফুল গুলো ফুলদানিতে সাজিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
     দেওয়ানদীঘি থানার আশে পাশে খুব বেশি বাড়িঘর নেই,হাতে গোনা কয়েকটা পরিবারের বাস।সেখান থেকেই শাঁখের শব্দ ভেসে আসছে সোমের কানে।তার মা ও সন্ধ্যে বেলায় প্রদীপ জ্বালিয়ে শাঁখ বাজিয়ে সন্ধ্যা আরতি করতো ঠাকুরঘরে, সেই সময় বাবা ফিরত অফিস থেকে।রোজ কিছু না কিছু আনতোই তার জন্য বাবা।সোম অপেক্ষা করে থাকতো এই সন্ধ্যেটার জন্য,তারপর রিনি এলো তার বউ হয়ে ও বাড়িতে,কিন্তু এই সন্ধ্যের আনন্দটা তখনও বজায় ছিল।ক্রমে ক্রমে কয়েক বছর গড়িয়েও যখন বাড়ী আলো করার মতো একটা ছোট্ট অতিথি এলো না তখন থেকেই একটু একটু করে সম্পর্ক গুলো তিক্ত হতে শুরু করলো।ও নিজে পছন্দ করে রিনিকে বিয়ে করে এনেছিল ,বাবা মা সাদরে মেনেও নিয়েছিল রিনিকে কিন্তু বংশধর না দেওয়ার অপরাধে রিনিকে তারা আর বাড়িতেও রাখতে চাইলেন না,সব ভালোবাসা কর্পূরের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল।আগে যে সন্ধ্যেটার অধীর অপেক্ষা করতো সোম এখন সেই সন্ধ্যেবেলা গুলোকে ঘৃণা করে ও।বাড়ী ফিরলেই সেই একই অশান্তি,রিনির কান্না,বাবা মায়ের অভিযোগ,অনুনয় রিনিকে ডিভোর্স দেওয়ার।সোম নিজেও সন্তান না আসার সব অপরাধ রিনির উপর চাপিয়ে দিয়েছিল,ঘৃণা করতে শুরু করেছিল রিনিকেও।তারপর এক ডাক্তার বন্ধুর নির্দেশ মতো পরীক্ষা করিয়েছিল নিজের,রিপোর্ট দেখে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল,অক্ষমতা রিনির নয়,তার ছিল।বাবা হবার মতো শারীরিক ক্ষমতাই নেই তার এটা জানার পর আরও চরম আক্রোশে রিনিকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল।ওর অজান্তেই তৈরি হচ্ছিল এক সাইক্রিয়াটিক সমস্যা।এফেনফোসমফোবিয়া,যার কারণে রিনির সঙ্গে ঘনিষ্ট হতেও ভয় পায়,ভয় পায় ভালোবাসা কেও,ভালোবাসার মানুষগুলোকে দূরে ঠেলে দেয়।কিন্তু রিনির তো কোনো দোষ নেই,ও সব ছেড়ে শুধুমাত্র সোমের সঙ্গে থাকতে পারবে বলে এতটা দূরে চলে এসেছে। সম্পর্ক টাকে টিকিয়ে রাখার করুন আর্তি চোখে মুখে ফুটে ওঠে রিনির,সোম বুঝতে পেরেও মেয়েটাকে একটু সান্ত্বনা পর্যন্ত দিতে পারেনা।সেকি তবে রিনির উপর মানসিক অত্যাচার করছে!”স্যার,স্যার..সাহা বাবুর একসিডেন্ট হয়েছে রাস্তায়”বলতে বলতে হাবিলদার শৈলেন গুপ্ত হাঁফাতে হাঁফাতে অফিসরুমে ঢোকে ।তার চিৎকারে এক লহমায় সোম ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে এসে পড়ে।সাহাবাবু মানে এই থানার বড়বাবু বলেই সবাই যাকে চেনে।”কোথায় হয়েছে একসিডেন্ট টা?বেরোতে হবে আমাদের, চলুন”বলে বেরিয়ে গেল সোম।জিপে উঠে রিনিকে ফোন করে জানিয়ে দেয় আজ রাতে ফিরতে দেরি হবে ।
                                 ৮
ঘরগুলো মনে হয় অনেক দিন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।গুমোট একটা গন্ধ সারা ঘরে।অস্মিতার যেন দমবন্ধ লাগছিল।বিছানা থেকে উঠে গিয়ে দীঘির দিকের জানালাটা তাই খুলে দিয়েছিল।একঝাঁক বরফ শীতল বাতাস যেন আষ্ঠে পিষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে।চাঁদের আলো দীঘিতে যেন জলছবি আঁকছে,অস্পষ্ঠ কিছু ছবি ভেসে উঠছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।কেউ যেন দীঘির এপার ওপার সাঁতরে বেড়াচ্ছে।অস্মিতার যেন মনে হচ্ছে এক দৌড়ে চলে যায় দীঘির কাছে, কিছু যেন টানছে তাকে। বেশ কিছুক্ষণ  দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা অস্মিতা।জানালার পাশ থেকে সরে এসে আবার বিছানাতে এসে বসলো।বার বার কেন যেন মনে হচ্ছে ও এই বাড়িতে এসে একদম ঠিক করেনি,আর এখানে আসার পর থেকে অগ্নিদের আচরণও কেমন যেন বদলে গিয়েছে, যে চোখে সকালে প্রেম দেখেছিল অস্মিতা এখন যেন সেই চোখে কেমন কামনার হিংস্রতা দেখতে পেয়েছিল।তাই ওপরের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে চুপ করে বসেছিল।
“এ কাকা..একটু আসছি অস্মিতা ডার্লিং আর কাছ থেকে,তোরা ততক্ষন গ্লাসগুলো রেডি কর”ব’লে অগ্নি বিছানা থেকে উঠতেই সিদ্ধার্থ একটু বাঁকা সুরে বলে উঠল”কি ভাই,এরকম তো কথা ছিল না!তুই একা খাবি আর আমরা গন্ধ শুঁকে গরম হতে পারবনা বলে দিলাম…”অগ্নি আবার ফিরে সিদ্ধার্থর কাঁধে হাত রেখে বলল”আরে না বাবা..এখন জাস্ট মাল টাকে চারিয়ে জলের উপরে তুলব ভাই…বাস..আর শোন..খিদে যত বাড়বে খেতে তো মজা তত বাড়বে বা****।বুঝলি বো*****।চল,এখন যা করছিস কর ,আই উইল কাম ব্যাক উইথ ইন থার্টি মিনিটস,ওকে গাইস”ব’লে অগ্নি ঘর থেকে বেরিয়ে পাশে অস্মিতার ঘরের দরজায় নক করলো।অগ্নি কথা বলতে চায় শুনে অস্মিতা দরজাটা খুলে দিয়ে আবার বসলো বিছানাতে।অগ্নি ওর পিছু পিছু ঘরে ঢুকে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল।সেটা দেখে অস্মিতা কিছুটা গুটিয়ে গেল।অগ্নি ই কথা শুরু করলো..
-কি হয়েছে সোনা?মুখটা খুব শুকনো লাগছে তোর..
-নাথিং…জাস্ট ফিলিং টাইয়ার্ড..
-ওকে বেবি..আমি আছি তো..তোর সব টাইয়ার্ডনেস একদম ভ্যানিশ করে দেব দেখ..
-নো, নো, নাথিং টু ওয়ারী অবউট মি..এম ফাইন।তুই কিছু খেয়েছিস ?তুইও তো ক্লান্ত,অনেকটা ড্রাইভ করেছিস।
-খেয়েছি ,বাট সেটাতে পেট ভরেছে ,মন ফুললি এমটি..বলে অগ্নি অস্মিতার হাতটা ধরে হ্যাঁচকা টানে বক্ষসংলগ্ন করে নিতে চাইলো অস্মিতাকে।ভালো লাগছিলো না অস্মিতার,কিন্তু সে তো বহুদিন থেকেই এই মুহূর্তটা চেয়ে এসেছে,আর আজ যখন তার এত কাছে অগ্নি তবুও সম্মতি জানাতে পারছেনা তার মন।ভীষণ অস্থির লাগছে।কোনটা ঠিক,কোনটা ভুল কিছুই বুঝতে পারছেনা অস্মিতা।তবে তার মন বলছে যা হচ্ছে ভালো হচ্ছে না,আরও ভয়ানক কিছু অপেক্ষা করছে তার জন্য।অগ্নি তখন অস্মিতার চিবুকটা তুলে ঠোঁটের দিকে এগিয়েছে,অস্মিতা এক ঝটকায় নিজেকে অগ্নির বাহুডোর থেকে বন্ধনমুক্ত করে দৌড়ে চলে গেল জানালার কাছে।অগ্নির তো এটাই ভালো লাগে।জোর করে আদায় করতে।যত দূরে যাবে মজা তো ততটাই বেশি তাকে কাছে আনার।অগ্নি আবার গিয়ে জড়িয়ে ধরলো অস্মিতার কোমরটা।মুখটা অস্মিতার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে কামড়ে ধরলো কানের লতিটা …অবশ হয়ে আসছে অস্মিতার শরীর,ভালখারাপ বোঝার ক্ষমতা টুকুও নেই আর,সম্মোহিতের মতো অগ্নির কাছে নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে মনে হচ্ছে….কিন্তু সেই অসাড় শরীরেও মনে হল কেউ তাকে চিৎকার করে ডাকছে,না ঠিক ডাকছে না…কিছু বলছে..”ফিরে যা,ফিরে যা”এটাই বার বার ঘুরে ফিরে কানে আসছে অস্মিতার।অস্মিতা এবার স্পষ্ট শুনছে কেউ বলছে “ফিরে যা”….হুঁশ ফিরেছে অস্মিতার,উফঃ খুব জ্বালা করছে ঠোঁটটা, অগ্নি কামড়ে রক্ত বের করে দিয়েছে ..নিজেকে অগ্নির কাছ থেকে সরিয়ে আবার বিছানায় গিয়ে বসলো অস্মিতা,”তুই এখন যা প্লিজ,আমি ভীষণ টাইয়ার্ড।”বলে অগ্নিকে দরজা দেখিয়ে দিল।”ব্লাডি বিচ…দাঁড়া..এত দেমাক..রাতে দেখবো এই দেমাক কোথায় থাকে.”মনে মনে কথাগুলো বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অগ্নি।অস্মিতার কিন্তু মনে হল ঘরে ও এখনও একা নেই, আরো একজন কেউ আছে,বার বার সেই” ফিরে যা”শব্দটার অনুরণন হতে থাকলো তার কানে।
                                  ৯
সোম ফোন করেছিল ওর ফিরতে রাত হবে।একটু মন খারাপ হলো তবে আজ খুশির কারণটা সেই মন খারাপকে ঢাকা দিয়ে দিয়েছে।গোটা সন্ধ্যে টা আজ কুট্টিকে সাজিয়ে,খাইয়ে,খুনসুটি করে কখন কেটে গেছে রিনি বুঝতেই পারেনি।আজ যেন কুট্টি অনেকটা সাবলীল হয়েছিল রিনির সাথে।আগাগোড়া শুন্যতায় ভরা মুখে আজ একটু হলেও খুশির ঝিলিক দেখেছে।রিনি তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়লো কুট্টিকে নিয়ে।মন টা ভীষণ শান্ত,শান্তিতে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে কুট্টিকে কোলের কাছে নিয়ে।
রাত তখন দশ’টাও হয়নি,দেওয়ান দীঘি একেবারে যেন নিশুতি রাত।রিনি ঘুমিয়ে গেছে দেখে কুট্টি পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে এসে দৌড় লাগলো দীঘির ওপরের বাড়ীর দিকে।বাড়ীর সদর দরজা খোলাই ছিল।কুট্টি চুপি চুপি ঢুকে পড়লো বাড়িতে।অনেক জনের গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।ও ভিতরে ঢুকে খুঁজে চলেছে কিছু, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছেনা।আগের মতো লুকোচুরি খেলতে ভালো লাগে না ওর।খুঁজতে খুঁজতে ওপরের বারান্দায় পৌঁছে গেল কুট্টি।সিদ্ধার্থদের দরজাটা খোলাই ছিল।রাতের খাবার পর একের পর এক বোতল শেষ করছিল ।অয়ন কুট্টিকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলো”কে রে তুই?এখানে কি করছিস?”ওর চিৎকারে সিদ্ধার্থ অগ্নিও বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখল একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ওদের দিকে চেয়ে কুট্টি জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে থমকে গেল,তারপর ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে এল নিচের ঘরে।”এখন ওসব বাচ্ছা ফাচ্ছা ছাড়ত…চল যা,ও ঘর থেকে রসালো******টাকে নিয়ে আয় “বলে উঠলো অগ্নি।
  অস্মিতা রাতের খাবারও খায়নি।দরজা বন্ধ করে বসেছিল চুপ করে।কেমন একটা অজানা ভয় যেন ওকে ঘিরে ধরেছে।ঘরের মধ্যেও কেউ যেন আছে,কিছু বলতে চাইছে তাকে।এমন সময় ওর দরজায় নক করলো সিদ্ধার্থ,”অস্মি  বেরিয়ে আয় একটু,সবাই মিলে এনজয় করি,প্লিজ,এ ঘরে আয়, সবাই ওয়েট করছি তোর জন্য,একটু আড্ডা মেরেই ঘুমিয়ে যাব,আয়”
অস্মিরও ভয় ভয় করছিল একা ঘরে থাকতে,আর ও ঘরে তো সিদ্ধার্থ,অয়নও অগ্নির সাথে আছে।ওদের সামনে এট লিস্ট অগ্নি কিছু করবে না ভেবে অস্মি বেরিয়ে এলো ঘর থেকে,তারপর সিদ্ধার্থর পিছু পিছু ও ঘরে গিয়ে ঢুকলো।সবাই তখন ভীষণভাবে ড্রাঙ্ক,অস্মিতাকে দেখে অগ্নি বলল “আরে চিল ইয়ার,বস,..একটু খাবি নাকি?বলে বিশ্রীভাবে হাসতে লাগলো।”ওকে ওকে ,হার্ড কিছু নয়,তুই একটু সফট ড্রিংকস ই নে” ব’লে অস্মিতার হাতে একটা স্প্ৰাইটের ক্যান ধরিয়ে দিল।এবার শুধু প্রহর গোনার অপেক্ষা।অগ্নির যেন হাত নিশপিশ করছে,আর ধৈর্য ধরছে না।অস্মিতার শুধু ড্রিংক্সটা শেষ করার অপেক্ষা।সুনিপুন কৌশলে তাতে অগ্নি মিশিয়ে দিয়েছে সেই ড্রাগ।তাদের দুষ্কর্মের কোনো প্রমাণ রাখতে চায়না ও। অস্মিতার কয়েক চুমুক গোলধকরণ করার পর থেকেই মাথাটা ঝিমঝিম করছে মনে হচ্ছে,কোনো অতলে ডুবে যাচ্ছে কি ও।অগ্নিরা বুঝলো উপযুক্ত সময় উপস্থিত।যে মুহূর্তে অগ্নি ঝাঁপিয়ে পড়লো অস্মিতার উপর তখনই ঘটল একটা অনভিপ্রেত ঘটনা।
                             
                                ১০

রিনি ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে দেখে পাশে কুট্টি নেই।এত রাতে মেয়েটা কোথায় যাবে ভেবে টয়লেটটা দেখে বাইরে বেরিয়ে কুট্টির নাম ধরে ডাকতে লাগলো।”কুট্টি ই ই ই ই ই ই”নাম টাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো শুধু কিন্তু কুট্টিকে দেখতে পেল না রিনি।অসহায়ের মত এদিক ওদিক খুঁজতে শুরু করলো কুট্টিকে।অন্ধকারে দীঘির পাড় টাও খুঁজে এলো রিনি,কিন্তু কুট্টি কোথাও নেই।কোথায় গেল মেয়েটা একাএকা এত রাতে।কি করবে ভেবে না পেয়ে সোমকে ফোন করলো।
–  হ্যালো..শুনছো..কুট্টিকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা,ও আমার পাশেই শুয়ে ছিল,কিন্তু এখন ঘুম ভেঙে দেখি কোথাও নেই,
-খোঁজো ভালো করে,আছে কোথাও আশেপাশে,
-সব খুঁজেছি,কোথাও নেই,বলছি…
-কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো,আমি হসপিটালে আছি
-কি হয়েছে তোমার?ঠিক আছো তুমি?কোন হসপিটাল ?আমি যাচ্ছি..
-উফঃ,অহেতুক টেনশন করা বন্ধ করো।আমি ঠিক আছি।আমাদের বড়বাবুর একসিডেন্ট হয়েছে,তাই নিয়ে এসেছি হসপিটাল।এবার তুমি কি বলছিলে বলো।
-ও আচ্ছা,বলছিলাম যদি ওখানে কাজ হয়ে যায় একটু বাড়ী এসো তাড়াতাড়ি ,আমি একা কোথায় খুঁজবো বুঝতে পারছিনা।আসবে ?
-আসছি
ব’লে ফোন টা কেটে দিল সোম।অন্যসময় হলে ‘না’ বলে দিত,কিন্তু আজ একটা মায়ের অনুরোধকে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারলো না সোম।
রিনি কিন্তু কিছুতেই আর অপেক্ষা করতে পারলো না।বাচ্ছাটার কোনো ক্ষতি হলে যে সে নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবে না।কিন্তু কোথায় যেতে পারে কুট্টি!”কোথায়.. কোথায়..হে ভগবান..এমন করে কুট্টিকে আমার থেকে কেড়ে নিও না,আমার নাড়ী ছেঁড়া ধন না হলেও ওকে যে আমি আমার সন্তানের মতোই ভালোবাসি।ওকে আঁকড়ে ধরেই তো বেঁচে থাকার আলো টুকু দেখতে পাই “বলে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো রিনি।চকিতে মনে পড়ে গেলো সন্ধ্যা বেলার ঘটনাটা।কুট্টি জানালা দিয়ে দীঘির ও’পারের বাড়িটার দিকে কিছু ইশারা করছিল,তবে কি ওখানেই গেল!
চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো রিনি।সোম আসার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না ও,একাই যাবে ও বাড়িতে ।মন বলছে কুট্টি ওখানেই আছে।কিন্তু বিপদে পড়ার আগেই যেতে হবে তাকে।মা হয়ে সন্তানকে কিছুতেই বিপদে পড়তে দেবে না ও।অন্ধকারে দীঘির পাড় ধরে চললো ও বাড়ীর দিকে।
                                      ১১
এমন কিছু যে হতে পারে তা ভাবতেই পারেনি অগ্নিরা।হটাৎ করেই ঘরের  দরজা জানালাগুলো খুলে গেল ,পাল্লা গুলো সবেগে আছাড় মারছে যেন নিজেদের।বাইরে থেকে ঠান্ডা হাওয়া তীরের মত বিঁধেছে অগ্নিদের গায়ে।দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে একটা বাচ্চা মেয়ে ।সিদ্ধার্থরা কিছু ভাবার আগেই হাতের লাঠিটা সজোরে চালিয়ে দিলো অগ্নির মাথায় ।”ছেড়ে দাও আমার মা’কে”বলে চিৎকার করে উঠলো কুট্টি।এই লোক গুলোই তো তার মাকে মারছিল,মা কত কাঁদছিল কিন্তু তাও ছাড়েনি ওরা।আজ আবার,বাঁচাতেই হবে ওর মাকে।লাঠির আঘাতে অগ্নির নেশা উড়ে গেছে।কিন্তু ঘরের পরিবেশ এতটা বদলে গেল কিভাবে।কেউ হুঙ্কার দিয়ে যেন বারে বারে বলছে “ছেড়ে দেন বাবু”,অগ্নিদের মনে পড়ছে এক বছর আগের রাত টার কথা।তবে কি কমলি এখানে কোথাও লুকিয়ে আছে,এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন যে অস্মিতা উঠে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি ওরা।
   কোনোমতে টলতে টলতে অবশ শরীরটাকে দাঁড় করায় অস্মিতা।অগ্নিরা যে ক্ষতি করতে যাচ্ছিল সব বুঝতে পেরেও কিছু করার ক্ষমতা ছিল না তার,এখন যেন কেউ তাকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।কানে কানে বলে যাচ্ছে”পালিয়ে যা,এখনি চলে যা”….দেহের সবটুকু শক্তি দিয়ে অস্মিতা বেরিয়ে এলো ঘর থেকে ,সোজা দরজার বাইরে,তারপর সদর দরজা ছেড়ে রাস্তা ধরে দৌড়াতে লাগলো।কোনো অজানা শক্তি যেন তাকে নিয়ে চলেছে,অস্মিতা শুধু এটুকু বুঝেছে,পালিয়ে যেতে হবে তাকে,ওই বাড়ী থেকে দূরে,অগ্নিদের থেকে অনেক দূরে।ছুটে চলেছে সে।সামনে একটা গাড়ীর হেড লাইটের আলো দেখতে পাচ্ছে,আর পারছে না অস্মি,খুব কাছে এসে পড়েছে গাড়িটা,অস্মিতা পড়ে গেল রাস্তাতেই,আর কিছু মনে নেই
      এক তো অস্মিতার মতো মাল টা পালিয়ে গেল..ও যদি সবাইকে সব জানিয়ে দেয় তবে কি হবে অগ্নিদের,আবার মাথায় লাঠিটা আঘাত টা ভালোই লেগেছে, এটা  ভেবেই সব রাগ গিয়ে পড়লো ছোট্ট কুট্টির উপর।মাথাটা তখনও যন্ত্রনায় ছিঁড়ে যাচ্ছে অগ্নির।রাগে মাথায় আগুন জ্বলছে ..”আজ তোকে ছাড়বো না..********এর বাচ্ছা,আমার মাল ভাগিয়ে দিবি তার ক্ষতিপূরণ তো তোকেই করতে হবে”বলে অগ্নি পাকিয়ে ধরলো কুট্টির হাত টা।ছিঁড়ে ফেলতে গেল জামাটা, কিন্তু একি…ঘরের মধ্যে এত ধোঁয়া এলো কোথায় থেকে।.সিদ্ধার্থ ,অয়নও ভীষণ রকম ভয় পেয়ে গেছে..চোখের সামনে ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে তৈরী হচ্ছে একটা অবয়ব…ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে একটা চেনা মুখ,সেই চোখ কিন্তু চোখগুলো জ্বলন্ত..”কমলি”বলে চিৎকার করে কুট্টিকে ছেড়ে অগ্নি ছিটকে পড়লো ঘরের মেঝেতে।
“চিনতে পেরেছিস?হ্যাঁ, আমি সেই কমলি..যাকে তোরা তিনজন মিলে খুবলে খেয়েছিলি কুকুরের মত..দেখ..কেমন চোখ গুলো উপড়ে দিয়েছিলিস…দেখ..পেট চিরে কেমন নাড়ী ভুঁড়ি গুলো বের করে দিয়েছিলি..দেখ ..দেখ..”বলে রক্তাত্ব শরীরটা এগিয়ে ধরল অগ্নির চোখের উপর..কি বীভৎস সে দৃশ্য..সহ্য করতে পারছে না অগ্নিরা..সারা ঘর ধোঁয়া তে ভরে গেছে।শ্বাস নিতে পারছে না কেউ ..দমবন্ধ হয়ে আসছে..”ছেড়ে দে কমলি আমাদের,আর কখনও আসবোনা  এ বাড়িতে, এবারের মত ছেড়ে দে, ক্ষমা করে দে”কাকুতি মিনতি করতে লাগলো সিদ্ধার্থ…”সেদিন আমিও তোর পা ধরে বলেছিলাম ছেড়ে দিতে..দিয়ে ছিলি?আমার ছোট বাছাটাকেও ছাড়লি না তোরা..তোদের ক্ষমা হয়না..আজ তোদের মরতেই হবে..আমাকে মেরেছিলিস, আজ ওই সরল মেয়েটার সর্বনাশ করছিলিস তাও তোদের শাস্তি দিতে পারিনি..কিন্তু তোরা আমার মেয়েকে ছুঁয়েছিস।নরকের কীট তোরা,পিশাচ..তোদের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নেই,একটা মায়ের কি ক্ষমতা থাকতে পারে আজ তোদের বুঝিয়ে দেব আমি…আমার নাড়ী ছেঁড়া সন্তানকে কষ্ট দেয়ার শাস্তি আজ পেতেই হবে..তোদের মতো রাক্ষসদের মৃত্যু ই একমাত্র শাস্তি…”
সারা ঘরের দরজা জানালা গুলো কিভাবে যেন বন্ধ হয়ে গেছে,সিদ্ধার্থরা চেষ্ঠা করেও খুলতে পারলো না..শাস বন্ধ হয়ে আসছে…চোখ এবার বেরিয়ে আসবে মনে হচ্ছে ..গলা টিপে ধরেছে যেন কেউ…
  ধোঁয়ার অবয়বটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে কুট্টির দিকে।টেনে ঘর থেকে বের করে দিলো কুট্টিকে,কুট্টি চিনতে পেরেছে  তার জন্মদাত্রী মা কে,কিন্তু জড়িয়ে ধরতে পারছেনা মাকে..”মা “বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে কুট্টি…
রিনি যখন ওবাড়িতে এসে পৌঁছালো তখন সদর দরজা খোলাই ছিল,ও সদর দরজা পেরিয়ে যখন সিঁড়ির কাছে এসে পৌঁছালো তখন দেখতে পেল কুট্টিকে..মা বলে চিৎকার করে কাঁদছে…দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরলো কুট্টিকে,”কী হয়েছে মা?এখানে আসলি কিভাবে? কাঁদছিস কেন?এইতো আমি দেখ..”বলে কুট্টিকে জড়িয়ে ধরে চোখ মুছিয়ে দিতে লাগলো…কুট্টি রিনিকে হাতের ইশারা করে দেখালো সেই ক্রমাগত মিলিয়ে যাওয়া অবয়ব টাকে…”মা”শুধু এটুকুই বলে আবার কেঁদে উঠলো কুট্টি..রিনি দেখলো আবছা অবয়ব টাও যেন কাঁদছে…এই অবয়ব টাকেই তো রাতে ঘুমের মধ্যে দেখে রিনি।তবে কি সত্যি এটা কুট্টির মা,সন্তান স্নেহ যে কি ভীষণ মোহ যা মৃত্যুর পরও ফিরে আসতে বাধ্য করে একটা মা’কে….কুট্টিকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে ফেলে রিনি..”তুমি চিন্তা কোরোনা বোন,কুট্টি এখন থেকে আমার সন্তান,আমি ঠিক তোমার মতই ভালোবাসা স্নেহ দিয়ে ওকে বড় করে তুলবো”
অবয়ব টা যেন হাত দুটো জড়ো করে কপালে ঠেকলো…তারপর একদম মিলিয়ে গেল…
                                  ১২
     সামনের ঘরটা থেকে ভীষণ ধোঁয়া বেরিয়ে আসছিল,রিনি ভাবলো হয়তো আগুন লেগে গেছে..ভয়ে কুট্টিকে কোলে তুলে দৌড়ে নীচে নেমে এসে বেরিয়ে যাবার  মুখে দরজাতে দেখে সোম একটি মেয়েকে নিয়ে ঢুকছে .. দুজন চেনা মানুষকে দেখে চমকে গেল… অস্মিতা তার দিদিকে এখানে দেখতে পাবে ভাবতেও পারেনি।দৌড়ে গিয়ে রিনিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো..রিনিও ভাবেনি বোনকে এখানে দেখবে,আর সোম ই বা এখানে কি করছে! ভীষণ হতবাক হয়ে গেছে পরস্পরকে দেখে। রিনি বাড়ির অমতে সোমকে বিয়ে করেছিল তাই বিয়ের পর আর ও বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেনি,কিন্তু আজ দিদিকে দেখে সব অভিমান ভুলে গেছে অস্মিতা।এবার মুখ খুললো সোম “আমরা জীপ নিয়ে এদিকেই আসছিলাম,দূর থেকে দেখলাম একটা মেয়ে টলোমলো পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে প’ড়ে গেল রাস্তার মাঝখানে,জীপ থামিয়ে নেমে এসে দেখি অস্মিতা অজ্ঞান হয়ে গেছে।তারপর জল দিয়ে ওকে একটু সুস্থ করে এখানের সব ঘটনা জানতে পারলাম,তিনটে স্কাউন্দ্রেল মিলে আজ ওর চরম সর্বনাশ করতে গেছিলো,একটা বাচ্চা মেয়ে নাকি এসে ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছে,আর তুমি বল্লে কুট্টিকে খুঁজে পাচ্ছ না .তাই দু’য়ে দু’য়ে চার করে চলে এলাম এ বাড়িতে।এখনও শয়তান গুলো এখানেই আছে,বাইকগুলো রয়েছে দেখলাম..”বলে তাকালো অস্মিতার দিকে।অস্মিতা ইশারায় দেখিয়ে দিল উপরে অগ্নিদের ঘরটা।
সোম আরও দুজন অফিসারকে নিয়ে উপরে উঠে গেল,কিন্তু বহু চেষ্ঠাতেও দরজা খুলতে না পারায় দরজা ভাঙ্গতে হলো।ভেঙ্গে ওরকম দৃশ্য দেখতে পাবে তা কেউ আশা করেনি, ঘরের এক কোনে একজন ,মাঝামাঝি দুজন পড়ে আছে মৃত অবস্থায়।চোখ গুলো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে,জিভ ও বেরিয়ে আছে ,যেন কেউ গলা টিপে হত্যা করেছে,কিন্তু সারা ঘরে ধোঁয়া ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়না সোমরা।গলাতে হাতের আঙুলের ও কোনো ছাপ নেই।বদ্ধ ঘরে আগুন জ্বালানোর জন্য ধোঁয়া এবং তার জন্য সাফোকেশন এর সমস্যার কারণে মৃত্যুর কেস লিখে নেয় অফিসার।তিনটে বিকৃত মৃতদেহ গুলো যখন নীচে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তোলা হচ্ছে তখন বলাই এসে সোমের পায়ের কাছে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল”আমার বউ টারে খুঁজে দেন গো বাবু! কি মতি হোয়েছল সেদিন,ছেড়ে দিলুম ওই রাক্ষসগুলানের হাতে..পাপ করসি গো..খুঁজে দেন বাবু আমার কমলি রে,আপনার পায়ে পড়ি..”
বলাই কে দেখতে পেয়ে কুট্টি দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে ওর গলাটা।”বাবা তুমি কিচ্ছু জানো না,মা আছে তো,রোজ খেলে আমার সাথে লুকোচুরি,আমি তো মা’কে সেদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম,এখন আমি ডাকলেই মা চলে আসে”..কুট্টির কথায় বলাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে রিনি সোম ও ভীষণ অবাক হয়ে যায়।কুট্টি যে বলাইয়ের মেয়ে সেটা বুঝতে পারে রিনি,আর যে অবয়ব টা তখন দেখেছিল তাকে কুট্টি মা বলে ডাকছিল,কিন্তু কুট্টি যা বলছে তাতে কিভাবে সব সম্ভব..এই রহস্যটা একমাত্র কুট্টিই সমাধান করতে পারবে।
 রিনি কুট্টির কাছে গিয়ে স্নেহমাখা হাতটা রাখলো কুট্টির  মাথায়।আদর করে জিজ্ঞাসা করলো”তোর মা এখন কোথায় কুট্টি?”কুট্টি,চোখ মুছে বলতে শুরু করলো”মা’কে তো ওই দুষ্ঠু লোকগুলো খুব মারছিল,তারপর মাকে ওই পিছনের জঙ্গলে নিয়ে গেল।আমি মাকে কত ডাকলাম সেদিন,মা কথা বলছিল না,কত রক্ত সারা গায়ে মায়ের,তারপর ওই লোকগুলো মাকে জঙ্গলে ফেলে আসতেই আমি চুপি চুপি মাকে নিয়ে দীঘির সিঁড়ির ওখানে লুকিয়ে রেখে,বাবা কে খুঁজতে গেছিলাম,কিন্তু ফিরে এসে দেখি আর মা নেই ওখানে।সেই থেকে মা আর আমার কাছেই আসে না,শুধু দূর থেকে দেখে,আমি ধরতে গেলেই পালিয়ে যায়,বাবা,তুমি একটু বলো না মা’কে যেন আর না লুকায়…”বলে বলাইএর গলাটা আবার জড়িয়ে ধরলো কুট্টি।রিনি কুট্টিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলে”একেই বলে নাড়ীর টান ,বুঝলে, যার কিছু বোঝার বয়সটুকু হয়নি তাও সে মাকে বাঁচাতে চেয়েছিল আর সেই টানেই তো মৃত্যুর পরও বারে বারে ফিরে ফিরে আসে ওর মা।”বলাইয়ের হাত দুটো ধরে রিনি অনুরোধ করে “দাদা, কুট্টিকে আমাকে দাও ,আমি ওর মাকেও কথা দিয়েছি ,কুট্টিকে কখনও ওর মায়ের অভাব বুঝতে দেব না”বলাইএর কাছে ‘হ্যাঁ’ বলা ছাড়া উপায় ছিল না।
আজ নতুন করে কুট্টি মা পেল।সোম রিনিকে এত খুশি আগে দেখেনি।কুট্টিকে কোলে নিয়ে যেন সোমের নিজেকে পূর্ন মনে হচ্ছে,রিনিকে কাছে টেনে নিল সোম।নতুন করে শুরু করবে ও জীবনটাকে।পারতেই হবে তাকে।
অনেক রাত হওয়ায় দীঘিতে সেদিন তল্লাশি চালানো যায়নি,পরের দিন তল্লাশি করে একটা কঙ্কাল উদ্ধার হয়,তখনও হাতে শাঁখা পলা ছিল।বলাই সেগুলো দেখে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল।
জীবন শেষ হয়ে গেলেও থেকে যায় কিছু,মায়া বড় বিষম বস্তু।তাকে অগ্রাহ্য করে কার সাধ্য।আর সেই মায়া যখন নাড়ী ধরে টান মারে, ফিরতে হয় শত বাঁধা পেরিয়ে।সন্তানের রক্ষার্থে একটা মা ই শুধু সব বাঁধা পেরোতে পারে,সে বাঁধার নাম মৃত্যু হলেও।

*******শেষ হলো ‘নাড়ীর টান’……সবার কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন।অনেক ধন্যবাদ।******

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *