Obiswasho – অবিশ্বাস্য – Bangla Uponnash – Bengali Novel

বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান রিমলি নিজে দেখেই অসিতকে বিয়ে করেছিল।অসিত ছেলে হিসাবে ভালই ছিল, পরিবার ও ভালো।সরকারি চাকুরি করা অসিতকে দেখে রিমলির বাবা আর অমত করতে পারে নি।তাই রিমলির বাবা,মা অসিতদের পরিবারের খোঁজ খবর নিয়ে যেটুকু দেখবার দেখে বিয়ে দিয়ে দিলেন।বিয়েতে তিনি ব্যাবস্থাপনার কোনো ত্রুটি রাখেন নি।রিমলি শ্বশুর বাড়িতে ভালই ছিল প্রথম প্রথম।দুবছরের মধ্যে রিমলির একটি কন্যাসন্তান জন্ম নিল।মেয়ে, স্বামী,শ্বশুর ও শাশুড়ী নিয়ে  রিমলির খুব আনন্দেই দিন কাটছিল।রিমলির বাপেরবাড়ি আর শ্বশুর বাড়ি একই জায়গায় এপাড়া আর ওপাড়া।সুতরাং রিমলি মাঝে মাঝেই মা, বাবাকে দেখতে যেতে পারত।তবুও রিমলি কমই যেত।অসিত বুঝিয়ে দিয়েছে মেয়েদের বিয়ের পর বেশি বাপেরবাড়ি গেলে সম্মান থাকে না।

রিমলির শাশুড়ী খুব ভালো মনের মানুষ,কোনো কাজের খুঁত ধরে না।সব কিছু শিখিয়ে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু শ্বশুর কে রিমলির একদম ভালো লাগত না। ওনার হাবভাব আর তাকানোর মধ্যে বাবাসুলভ আচরণ রিমলি দেখতে পায় নি। বিয়ের পরপর রাতে ওরা শুলে পরেই শ্বশুর ওদের ঘরের সামনে দিয়ে পায়চারি করত।কখনো কখনো আবার দরজায় নক করত।রিমলি দরজা খুলে বলত কি হয়েছে বাবা!বাবা কোনো উত্তর না দিয়ে জলের বোতল টা ওদের টেবিলের উপর রাখতে রাখতে শুধু রিমলির দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত।এটা রিমলির একেবারেই পছন্দ হত না।কিন্তু কিছু বলতেও পারে না কাউকে।কিন্তু ক্রমশ শাশুড়ী তার স্বামীকে বলা কথাবার্তায় রিমলি শিওর হল শ্বশুরের চরিত্রে গন্ডগোল আছে।ভয় হতে লাগল এই বাড়িতে রিমলি নিজে সেফ থেকে মেয়েকে কি করে সেফ রাখবে?সারাদিন অসিত বাড়ি থাকে না।কিছু একটা ঘটে গেলে অসিত রিমলিকেই দোষারোপ করবে।পুরুষ মানুষ যা হয়,নিজের বাবার দোষ দেখবে না।অসিত তার বাবা ও মা সম্পর্কে একটা কথাও শুনবে না।বললেই অশান্তি করবে বলে ভয়ে রিমলি কিছু বলে না।

কোনো উপায় না দেখে রিমলি নিজের বাবা মা কে জানায়।বাবা, মা চিন্তা করতে থাকে।তাদের বাড়ির পিছন দিকে বেশ খানিকটা জমি পরে আছে সেইটা বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার কথা ভাবল।রিমলি যদি বিপদে পরে তখন না হয় এই ফ্ল্যাটে এসে থাকবে।অনেক দেখাশোনা করে রিমলির বাবা ও মা তাদের বাড়ির উল্টো দিকে একটা ফ্ল্যাট মেয়ের নামে কিনে সেবার বিবাহবার্ষিকী তে গিফট করল।রিমলি ত খুব খুশী।এই ফ্ল্যাটটা তার নিজের এটা ভাবতেই সে খুব আনন্দ অনুভব করছে।এটাকে সে মনের মত করে সাজাবে।কিন্তু অসিত খুব একটা খুশি নয়।সে তার বাবা ও মা কে ছেড়ে কখনই ওখানে যাবে না এটা রিমলিকে জানিয়ে দিয়েছে।মাঝে মাঝে রিমলি গিয়ে দেখে আসে সেই ফ্ল্যাট।সেদিন ছিল রবিবার আর দিনটাও ভালো দেখে রিমলি সেদিন পুজো দিয়ে গৃহপ্রবেশ করল।সবাইকে নিয়েই গেছিল রিমলি সেদিন ফ্ল্যাটে।রাতে শ্বশুর আর শাশুড়ী নিজের বাড়িতে চলে এসেছিল।রিমলিরা তিনজন তিনটে রাত কাটিয়ে চলে এসেছিল শ্বশুরবাড়িতে।রিমলির মেয়ে ঝিলিক এবারে স্কুলে ভর্তি হবে।অসিত আর রিমলি প্রথমে একটা সাধারণ স্কুলে ভর্তি করল।সেই সাথে মেয়েকে তৈরি করতে লাগল ক্লাশ ওয়ানে যাতে ভালো স্কুলে চান্স পায়।রিমলি খুব ব্যাস্ত হয়ে পরে মেয়ের পড়াশুনা আর সংসার নিয়ে।অসিত রোজ রাত করে বাড়ি ফিরছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেই বলে ওভার টাইম চলছে।তাই বিশ্বাস করে আর কথা বাড়ায় না রিমলি।

রিমলির বাবা,মা নিজেদের পছন্দ মত ফ্ল্যাটটাকে সাজিয়ে তুলছে।যাতে ওরা মাঝে মাঝেএসে থাকতে পারে।কিন্তু অসিতের জন্য রিমলি যেতে পারে না।ঝিলিক এখন বড় হয়েছে সব কথা পরিষ্কার বলতে ও লিখতে শিখেছে।ক্লাশে মোটামুটি  ভালই রেজাল্ট করে।রোজ সকালে রিমলি মেয়েকে স্কুলে দিতে যায় আর শ্বশুর আনতে যায়।বেশ কিছুদিন ধরে এইরকম নিয়মই চলছিল।একদিন দুপুরে রিমলি ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে মেয়েকে নিয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ছিল।হটাৎ দেখে দরজার ফুকোতে কার যেন চোখ।উঠে সাথে সাথে দরজা খুলে দেখতে গিয়ে দেখে শ্বশুর তাড়াতাড়ি চলে গেল নিজের ঘরে।রিমলির মনটা খুব ভারাক্রান্ত হল।বাবার বয়সী মানুষটার প্রতি খুব ঘৃণা জন্মাল।ঝিলিককে নিয়ে বেশি চিন্তা রিমলির।কাল থেকে দুপুরেও দরজার ছিটকিনি আটকেই শোবে রিমলি।এর দু চারদিন বাদে একদিন দুপুরে রিমলি মেয়েকে নিয়ে শুয়েছে তখনও ঝিলিক খাটে বসে খেলছে হটাৎ বলে ওঠে মা জানত দাদু আদর করতে গিয়ে খুব ব্যাথা দেয়।রিমলির কথাটা গিয়ে কানে গিয়ে ঢোকামাত্র ভাবল ব্যাথা দেয়?এর মানেটা কি?ঝিলিককে ত কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না তাই গালে চুমু খেয়ে রিমলি জিজ্ঞেস করল দাদু কিরকম করে আদর করে তোমাকে?আমি যেরকম চুমু খেলাম সেইরকম করে?না গো মা বলে……. মেয়ে যা বলল তা শুনে রিমলির মাথাটা অসম্ভব উত্তেজিত হয়ে উঠল।এই বাড়িতে বসে অসিতের সাথে এই ব্যাপারে আলোচনা করার প্রবৃত্তি রিমলির নেই।তাতে অশান্তু বাড়বে।তাই ফোন করে অসিতকে জানাল সে মেয়ে নিয়ে বাপেরবাড়ি যাচ্ছে।অসিত যেন অফিস ফেরত ওইখানেই যায়।

প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পত্র গুছিয়ে নিয়ে রিমলি মেয়েকে নিয়ে চলে যাবার আগে শাশুড়ী মাকে বলল মা আমি কদিনের জন্য বাপের বাড়ি যাচ্ছি।ও মা সে কি সকাল থেকে কিছু ত বল নি।না হটাৎ ই ঠিক করলাম।শাশুড়ী এসে তাড়াতাড়ি ঝিলিককে কোলে তুলে নিয়ে বলল মা রে তোকে ছাড়া থাকতে আমার খুব কষ্ট হবে।রিমলি বলে উঠল মা ঝিলিককে দেখতে ইচ্ছা করলে তুমিচলে যাবে আমার বাপেরবাড়ি। রিক্সা ডেকে রিমলি চলে গেল।মা, বাবা রিমলি আর ঝিলিককে দেখে অবাক।বাবা তাড়াতাড়ি এসে জিনিসপত্র গুলি হাতে নিল আর মা ঝিলিককে কোলে নিল।রিমলি ঘরে এসে যা যা ঘটেছে মা,বাবাকে জানিয়ে বলল আমি এখন থেকে ফ্ল্যাটেই থাকব।
কিন্তু অসিত ত রাজি হবে না মা
উহু মেয়ের জন্য ঠিক রাজি হবে দেখ না তুমি।প্রথম প্রথম অরাজি হবে তারপর ঠিকই রাজি হবে।আগে অসিত আসুক তারপর দেখি ……..

রাতে অসিত এলে মেয়ে ত ঝাপিয়ে কোলে উঠে নাচানাচি শুরু করে দিল।তারই ফাঁকে রিমলি চা করে নিয়ে অসিতকে দিতে এসে দেখে বাবা আর মেয়েতে হুটোপুটি করছে বিছানায়।তাই দেখে হেসে রিমলি বলে কি গো আজ এত তাড়াতাড়ি অফিস থেকে এলে যে
তাই শুনে অসিত বলল তুমি আমাকে জানাও নি কেন তুমি যে আজ এখানে আসবে!
কি করে জানাব,দুপুরেই ত ঠিক করলাম।
ঝিলিকের দিদা এসে ঝিলিককে নিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল।তখন রিমলি আস্তে করে অসিতকে পুরো ঘটনাটা বলল।অসিত জানতই কোনো না কোনোদিন রিমলি এটা জানবেই।তাই শুধু বলল তুমি থাকো তোমার ফ্ল্যাটে আমার পক্ষে বাবা মাকে ছেড়ে এখানে থাকা সম্ভব নয়।তবে আমি আসব মাঝে মাঝে।
তুমি না থাকলে বাইরের কাজগুলি কে করবে?আমি এতটুকু মেয়ে নিয়ে কি করে পারব বলো?
সে নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।ছুটির দিনে আমি অনেকটা সামলে দিয়ে যাব।
তবে ঝিলিককে নিয়ে তুমিও মাঝে মাঝে বাবা,মায়ের সাথে দেখা করে যেও।
আচ্ছা,আমি সময় পেলেই ও বাড়ি যাব রিমলি জানায়।

অসিত সেদিন বাড়িতে এসে নিজের ঘরে ঢুকে গুম হয়ে বসে থাকে।কিছুক্ষন বাদে মা এসে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে বাবু?অসিত বলে মা তুমি নিজের ঘরে যাও আমি যা বলব তা তোমাদের দুজনেরই শোনা উচিত।মাথাটা খুব গরম হয়ে গেছে অসিতের।কিছুক্ষণ বাদে মায়ের ঘরে গিয়ে অসিত  জানায় রিমলি এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে কেন জানো?আন্দাজ করতে পারছ কেউ?অপর প্রান্তে কোনো আওয়াজ নেই।রিমলি বাবার চরিত্র ধরে ফেলেছে।ছিঃ বাবা তুমি শেষ পর্যন্ত নাতনির সাথে……!!!
এটা কি করে পারলে বাবা?তুমি না দাদু,আর  তাছাড়া রিমলির প্রতিও তোমার ছেলের বউ হিসাবে আচরণ ঠিক হয় নি।লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে রিমলির কাছে।রিমলি নিশ্চয়ই ওর বাবা মায়ের কাছে জানিয়েছে এসব।আমি যদি সত্যিই মানুষের বাচ্চা হতাম তাহলে আজই তোমাদের ছেড়ে চলে যেতাম।কিন্তু আমি ত মানুষের বাচ্চাই নই কারণ তুমি মানুষ নও।এত কান্ডের পর ও যেহেতু তোমরা আমার বাবা মা তাই রিমলির সামনে প্রেস্টিজ রক্ষার্থে তোমাদের ছেড়ে গেলাম না।মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়ে গেলাম এই বাড়িতে।

বউমার কাছেও সম্মানটা রাখল না তোর বাবা।
আমার ত সারাটা জীবন নষ্ট করে দিল।কোনো  আত্মীয় স্বজনের কাছে মুখ দেখাতে পারি না এই লজ্জায়।ভেবেছিলাম তুই বড় হচ্ছিস দেখে হয়ত তোর বাবা নিজেকে শুধরাবে। কোনো পরিবর্তন নেই লোকটার।কি নিয়ে বেঁচে আছি বলত আমি?এরপর পাড়ার লোকে আমাদের কি বলবে?,যে একমাত্র ছেলের বউ আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।অসিত মাথা নাড়তে নাড়তে বলে আমার বিয়ে করাটাই ভুল হয়েছে মা।এখন না পারব তোমাদের ছাড়তে,না পারব রিমলি ও ঝিলিককে ছাড়তে।এত যে কথা বলছি বাবাকে দেখো যেন শুনতেই পাচ্ছে না।একটা ফোন এসে যাওয়াতে কথাটা তখনকার মত চাপা পরে গেল কথাটা।

রিমলিকে এখন ঘরে বাইরে কাজ করতে হয়।বিশ্রামের মোটে সময় পায় না।রান্নাঘর থেকে একফাঁকে এসে রিমলি মেয়েকে দ্রুত তৈরি করছে স্কুল যাওয়ার জন্য।এদিকে রান্নাঘরে রান্নাও চলছে।অসিত রবিবার করে এসে সারা সপ্তাহের বাজার করে দিয়ে যায়।ওইজন্য বাজার করার হাত থেকে রেহাই পেয়েছে রিমলি। ঝিলিক এখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। পড়াশুনার অত্যাধিক চাপ এখন।তবুও বাবাকে ছেড়ে থাকতে তার খুবই মনখারাপ হয়।কিন্তু বাবাকে ত সবসময় পায় না।রিমলির ও ভালো লাগে না অসিতকে ছেড়ে থাকতে।এখন অবশ্য বউ বাচ্চার জোরাজোরিতে অসিত মাঝে মাঝে থেকে যায় ওদের কাছে।মেয়ের পড়াশোনা দেখিয়ে দেয়।ছুটি থাকলে মা মেয়েকে নিয়ে এখানে ওখানে বেড়াতেও নিয়ে যায়।কদিন ধরে অসিতের মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না বলে রিমলি একদিন গেছিল মেয়েকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে।খুব খারাপ চেহাড়া হয়েছে শাশুড়ীর।লো প্রেসারে ভুগছে,কিচ্ছু খায় না।রিমলি যখন এ বাড়িতে ছিল তখনই দেখেছে শাশুড়ী খুব কম খায়।রিমলি আর ঝিলিককে দেখে শাশুড়ী খুব খুশি। ঝিলিকের জন্য কি করবে, কি খেতে দেবে সেই চিন্তাই করে যাচ্ছে।মনে মনে ভাবে রিমলি এনার স্বামী চরিত্রহীন হয়েও লজ্জা ঘেন্নার মাথা খেয়ে পেট পুরে খেয়ে নধর দেহ নিয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে।আর যে মানুষটার কোনো দোষ নেই সেই মানুষটা স্বামী চরিত্রহীন এই দুঃখে না খেয়ে তিলে তিলে নিজেকে শেষ  করে ফেলছে।তাতে স্বামীর কোনো তাপ উত্তাপ ও নেই।রিমলি এইসব দেখে সোজা গিয়ে শাশুড়ীর আলমারি থেকে বেশ কিছু শাড়ি আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বলল চটপট রেডি হয়ে নাও।তোমাকে আর এখানে থাকতে হবে না।তুমি আমার কাছে চলো।ভালো থাকবে ওখানে।শাশুড়ী বলে না রে মা আমি আর কদিনই বা বাঁচব।আমাকে নিয়ে তুই এত ভাবিস না।রিমলি শাশুড়ীর কোনো কথা না শুনে জোর করে ওনাকে নিয়ে চলে এল নিজের কাছে।

অসিত অফিস থেকে সোজা রিমলির ওখানে চলে যায়।ওখানে গিয়ে মা কে দেখে খুশি হয়েছে কিন্তু বাবাকে কে দেখবে সেই চিন্তা করছে।ঝিলিক বলতে লাগল ঠাম্মা এখন থেকে আমাদের কাছে থাকবে জানো বাবা।
হুম জানি ত তবে পড়াশোনা কিন্তু মন দিয়ে করতে হবে।নইলে মা কিন্তু বকবে তোমাকে।
মা আমাকে বকেই না শুধু আদর করে।কারণ আমি নিজের পড়া নিজেই করে নেই।মা শুধু মুখস্তটা ধরে নেয়।বাবা তুমি কিন্তু এখন থেকে রোজ আসবে আমাদের এখানে।
আসব রে মা আসব রোজ আসব।
রিমলি ঘরে এসে দেখে বাবার সাথে মেয়ে খুব গল্প জুড়ে দিয়েছে।রিমলিকে দেখে অসিত বলে খুব ত মাকে এখানে নিয়ে এলে।এবারে আমাকে আর বাবাকে কে রান্না করে দেবে প্রতিদিন।
তোমরা একটা রান্নার লোক রেখে দাও।মায়ের শরীরটা দেখেছ কি অবস্থা হয়েছে?একে এখন সুস্থ করা দরকার।তুমি আর বাবা ত করবে না সেটা।তাই আমি নিয়ে এলাম।সুস্থ করে আবার ও বাড়িতে পাঠিয়ে দেব।তোমরা বরং একটা রান্নার লোক ঠিক করে নাও।ঠিক আছে আমিই জোগার করে দেব রান্নার লোকটা।পরের দিন অসিত অফিস বেরোবার আগে একটা রান্নার লোক পাঠিয়ে দিল রিমলি।অসিত তাকে বুঝিয়ে দিল কি কি করতে হবে?,কখন আসতে হবে?আর টাকার ব্যাপারটাও ঠিক করে নিল।

এখন প্রায় প্রতিদিনই অসিত রিমলির এখানে আসে।মাঝে মাঝে রাতে থেকেও যায়।তাতে রিমলির খুব সুবিদা হয়েছে।কারণ শাশুড়ীর অবস্থা মোটেই ভালো নয়।সারাজীবনের অযত্ন করা শরীরটাকে কি এই কদিনে সুস্থ করা যায়?তাও রিমলি ভালো ডাক্তার দেখিয়ে,ভালো পথ্য দিয়ে খুব চেষ্টা করল কিন্তু পারল না ধরে রাখতে শাশুড়ীকে।তবে যাওয়ার আগে রিমলিকে বলে গেছে তুই পরের বাড়ির মেয়ে হয়ে আমার জন্য যা করলি এ আমি উপরে গিয়েও মনে রাখব।তুই আমার কাছে নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি এখন।তাই শুধু তোর কাছেই স্বীকার করছি এই স্বামী নিয়ে বিয়ের পর থেকে খুব কষ্ট পেয়েছি আমি।প্রথম প্রথম খুব চিৎকার করতাম।শরীর খারাপ লাগত চিৎকার করলে।তারপর আস্তে আস্তে চুপ করে গেলাম লজ্জায়।কারোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগত না।কারোর সাথে মিশতে পারতাম না।প্রচন্ড একা হয়ে গেলাম বহু বছর।তারই মধ্যে ছেলে হয়ে একটু বড় হল যেই চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে সেও চুপ করে গেল।তারপর তুই এলি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম যেন মরুভুমিতে জল পাওয়ার আনন্দ হয়েছিল। কিন্তু তুই ও চলে গেলি।আবার আমার ভাঙন শুরু হল।শেষের দিকটা তোর কাছে এসে খুব সুখে কাটালাম।তুই সত্যিই আমার মা,তুই সত্যিই আমার মেয়ে।

শাশুড়ী চলে যাওয়ার পর রিমলির খুব মনখারাপ হয়েছিল।কিন্তু এইভাবে মনখারাপ করে বেশিদিন থাকতে পারে নি রিমলি।কারণ মেয়ের উঁচু ক্লাশের চাপ অত্যাধিক।ঝিলিককে অনেকটা সময় দিতে হয় এখন।রিমলির মা এসেছিল একদিন বিকেলে সন্ধ্যেবেলার জলখাবার বানিয়ে।কারণ মেয়ে একবার নাতনিকে পড়াতে নিয়ে বসলে তার আর জলখাবার বানাবার খেয়াল থাকে না।অসিত কখন ফিরবে মেয়েকে জিজ্ঞেস করাতে জানল ওর রোজই নটা বাজে ফিরতে।মা তখন মেয়েকে সাবধান করল একটু খেয়াল রাখিস অসিতকে।এত দেরি কেন করে?ছোটবেলার থেকে বড় হয়েছে কিন্তু বাবার ওই চরিত্র দেখে।হয়ত আমার কথাটা ভুল ও হতে পারে তবুও তুই খেয়ালে রাখবি।রিমলি শুনে বলল না মা ও কিন্তু ওরকম নয়।তাহলে আমি দেখে বুঝতাম।ভালো হলেই ভালো বলে মা চলে গেলেন।

অবিশ্বাস্য
ইরা হালদার(৩)

মা চলে যাবার পর রিমলি আর মেয়েকে ততটা মনোযোগ সহকারে পড়াতে পারছে না।সামনে মেয়ের পরীক্ষা। এখন সময় নষ্ট হলে মেয়ের রেজাল্ট খারাপ হয়ে যাবে।মনটা বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে।সত্যিই ত এতদিন এত ঝামেলায় অসিতের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার কথা ত কখনো মনে হয় নি কখনো।তবে এটা বুঝেছে অসিত খুব পরোপকারী। অফিসে কার পেনশান চালু হচ্ছে না,অফিসে কার ছুটির প্রয়োজন অথচ স্যাংশান হচ্ছে না,কোনো এমপ্লয়ি মারা গেলে তার স্ত্রী কে সময়মত টাকা পয়সা পাইয়ে দেওয়া,স্ত্রীর যদি চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা থাকে তার চাকরির জন্য লড়াই করা,অফিসে কেউ অসুস্থ হয়ে পরলে তাকে ঠিকমত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এইরকম সব ব্যাপারে অসিতের অবদান প্রচুর।সেই মানুষটাকে কি করে অবিশ্বাস করবে রিমলি।বাড়িতেও যথেষ্ট সময় দেয়।সেখানেও অবিশ্বাস করা যাবে না।এতটা না হলেও কিছুটা পরোপকারী  রিমলি নিজেও আছে।ফ্ল্যাটের কোন মানুষটাকে সারাদিনে কেউ দেখবার নেই তাকে একটু দেখাশোনা করা।ঝিমলির সাথে একই স্কুলে একই ক্লাশে পড়ে এরকম বাচ্চাও ওদের ফ্ল্যাটে আছে।তার মা চাকরি করে বলে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য লোক রেখে দিয়েছে।সেই লোক কামাই করলে রিমলি নিজের মেয়ের সাথে ওকেও স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে।

অসিতের দিক থেকে কোনো ত্রুটি খুঁজে না পেয়ে রিমলি আস্তে আস্তে ভুলে গেল তার স্বামীর দিকে বিশেষ করে খেয়াল রাখতে।মা বাবারও এখন বয়স হয়েছে তাই একদিকে মা বাবাকে দেখাশুনা করা অন্যদিকে সংসারের কাজ মেয়ের লেখাপড়া। অসিত ত রোজই রাতে ফেরে।এটা দেখতেই রিমলি অভ্যস্ত প্রথম থেকেই।কিছুদিন রাতে অসিত বাবার কাছে থাকে,কিছুদিন রিমলির কাছে।যখন বাবার কাছে থাকে তখন কত রাতে ফেরে সেটা ত রিমলি কখনই দেখতে পাবে না।অসিতের বাবা এখন শয্যাশায়ী তার জন্য একটা হোলটাইমার আছে।সেই হোলটাইমার ঠিকমত দেখাশুনা করছে কিনা সেটা দেখতে মাঝে মাঝেই যায় রিমলি শ্বশুর বাড়িতে।রিমলিকে দেখে শ্বশুর এখন অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে।বোধহয় লজ্জায় ওরকম করে।তবে রিমলিও ওনার সাথে বেশি কথা বলে না।প্রয়োজনীয় কথাবার্তা হোলটাইমারের সাথে বলে বাড়ি চলে আসে।

রিমলি তখন ক্লাশ টেনে পড়ে।সামনের বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা। স্বাভাবিক ভাবেই রিমলি ভীষণ ব্যাস্ত।সারাদিন মেয়েকে নিয়ে কোচিং ক্লাশে দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে।আবার বাড়িতে ফিরেও সংসারের কাজ করে মেয়ের পড়াশুনা দেখতে হচ্ছে।একদিন রাতে তখন ১১টা হবে শ্বশুরবাড়ির হোলটাইমার রিমলিকে ফোন করে বলে দাদা এখনো ফেরে নাই দিদি ঘরে।রিমলি তখন মেয়েকে পড়াচ্ছিল।হটাৎ করে খবরটা পেয়ে রিমলি বলে সে কি!!! আমাকে ত কিছু জানায় নি দাদা।দাঁড়াও আমি একবার ফোন করে দেখি।রিমলি অসিতকে ফোন করে জানতে পারে বাস খারাপ হয়ে গেছিল তাই দেরি হয়েছে।আর কিছুক্ষনের মধ্যেই সে বাড়ি ফিরবে।রিমলি ও বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিল খবরটা।কিন্তু মনটা খচখচ করতে লাগল রিমলির।অসিত কি সত্যি কথা বলল এটা?ঠিক আছে কাল ত আসবে এখানে রাতে তখন ফয়সালা করব এই ভেবে ঠান্ডা করল মস্তিষ্ক।

পরের দিন রাতে অসিত ঠিক নটার সময় অফিস থেকে এল।রিমলি মেয়েকে পড়া বুঝিয়ে
 দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে চা জলখাবারের ব্যাবস্থা  করে অসিতের কাছে এসে বসল। ঝিমলি দৌড়ে এসে বাবাকে নিয়ে চলে গেল পড়ার ঘরে।রিমলির আর কোনো কথাই বলা হল না।মেয়েটা সবসময় পায় না বাবাকে তাই আর কিছু বলল না।কিন্তু এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে হটাৎ অসিতের মোবাইল টার দিকে চোখ গেল।তাড়াতাড়ি মোবাইল টা নিয়ে অসিতের কিছু বন্ধুর ফোন নম্বর টুকে নিল।আর কল লিস্টে চেক করে দেখল রিনা বলে একজন মহিলা রোজ ফোন করে।হোয়াটসঅ্যাপে ও রিনা আছে।গ্যালারিতে অনেক ফটো ও দেখছে অসিতের সাথে।সারা শরীর কাঁপছে রিমলির।ওই অবস্থাতেই রিনার ফোন নম্বর ও টুকে নিল।কখন আবার এসে অসিত দেখতে পেয়ে যায় তাই ফোনটা রেখে দিয়ে প্রচন্ড ঘামতে শুরু করল রিমলি উত্তেজনায়।এটা কি করছে অসিত!!!ভাবতে পারছে না আর, চোখে জল এসে যাচ্ছে রিমলির।নিজের স্বামীকে অন্য মহিলার সাথে ভাবলেই কিরকম একটা শরীর  খারাপ লাগছে।মনে হচ্ছে এক্ষুনি পরে যাবে রিমলি।চিৎকার করে কাঁদতে পারলে মনেহয় বুকের কষ্টটা একটু কমত।মনকে শক্ত করে রিমলি চিন্তা করে নিল কোনরকমে আজ রাতটা কাটুক কাল সকালে যা করার করব।

বাবা আর মেয়েকে খেতে দিয়ে নিজের খাবারটা নিয়ে রিমলি বসে গেল খেতে।মেয়ে আর বাবা বকবক করেই যাচ্ছে। দুজনের কারোর খেয়ালই নেই যে রিমলি একটা কথাও বলছে না।অসিত নিশ্চিন্তে মেয়ের সাথে মজা করছে।এখন রিমলির অনুশোচনা হচ্ছে খুব।এতটা সময় মেয়ের লেখাপড়া, মেয়ের স্কুল,কোচিং নিয়ে ব্যাস্ত থাকার জন্যই কি অসিতের অন্য দিকে মন গেছে?এছাড়া অন্য কোনো উপায় ত জানা নেই রিমলির।সব মায়েরাই ছেলেমেয়ের লেখাপড়া দেখে তাই বলে স্বামীদের মন অন্য দিকে ঘুরে যায়?জিজ্ঞেস করতেও ভয় পাচ্ছে কারণ ধরা পড়ে গেলে ভীষণ চিৎকার করবে অসিত।মেয়ের সামনে এটা করা উচিত হবে না।তাই খেয়ে নিয়ে উঠে পরল রিমলি।রাতে শুয়ে ভাবছে অতীতের দিনগুলির কথা।ভালই ত ছিল সম্পর্কটা আমাদের। তালে? নাকি অসিতকে তার বাবার রোগে ধরেছে?চোখ দিয়ে অঝোরে জল পরে ভেসে যাচ্ছে বালিশটা।ঘুমিয়ে পরল রিমলি।বারবার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে রিমলির আর পাশে হাত দিয়ে দেখছে অসিত আছে কিনা বিছানায়।কিরকম একটা ভয় ধরে গেছে রিমলির।অসিত বোধহয় অন্য কারোর হয়ে যাচ্ছে,আমাকে আর ভালোবাসে না। শ্বশুর চরিত্রহীন ছিল ও বাড়ি থেকে সরে এসে বেঁচেছিল।এখন স্বামী চরিত্রহীন একে ছেড়ে দিয়ে মেয়ে নিয়ে একা থাকবে কি করে রিমলি?

অবিশ্বাস্য (শেষ পর্ব)
ইরা হালদার

পরদিন সকালে রিমলির ঘুম ভাঙতেই ধড়াস ধড়াস  করতে লাগল বুকের ভিতরটা।বালিশটা ভেজা,চোখে জল।কোনোরকমে চোখের জল মুছে উঠে বারান্দায় গিয়ে দেখে মেয়ে আর বাবা টবে জল দিচ্ছে।যাক বাবা ঘরেই আছে অসিত।এতক্ষণ কি সব হাবিজাবি দুঃস্বপ্ন দেখছিল ঘুমের মধ্যে।ঘুমের মধ্যে দেখছিল অসিত আর রিনা ঝিলিককে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছে।সেখানে রিমলিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।বেড়াতে গিয়ে ওরা তিনজনে মিলে ফটো তুলছে,খুব আনন্দ করছে।রিমলি সেই ফটো দেখে হাপুস নয়নে কাঁদছে।রিমলি শরীর ও মনে একেবারে জোর পাচ্ছে না।কি বিচ্ছিরি স্বপ্ন!!!।রাতে ঘুম হয় নি ভালো। কোনোমতে অসিতকে অফিসের ভাত খাইয়ে রওনা করিয়ে দিয়েই রিমলি ঝিলিককে ওর বাবা মায়ের কাছে দিয়ে এল।কারণ ফোনের কথাবার্তা মেয়ের না শোনাই ভালো।মেয়েকে ওখানে পড়তে বসিয়ে দিয়ে রিমলি বাড়ি এসে ফোন নিয়ে বসল।

রিনা বাদে একে একে যে কজনের ফোন নম্বর টুকে নিয়েছিল তাদের সবাইকে ফোন করে অসিতের সম্পর্কে যা জানল তাতে বুঝল বহুদিন ধরে চলছে এই রিলেশান।রিমলি যা জানল তা এইরকম গত দুবছর ধরে অসিতের অফিসে কোনো ওভার টাইম হচ্ছে না।রোজ ৬টায় অফিস ছুটি হয়।অসিত কেন রাত করে ফেরে কোথায় যায় অফিসের পর তা কেউ জানে না।তবে একটা ঘটনা ওরা রিমলিকে জানাতে চায় যেহেতু অসিতের বউ বাচ্চা নিয়ে একটা সংসার আছে।তাই তারা সবাই একই কথা  বলল রিমলিকে। সেটা হল অসিতের অফিসের একজন কলিগ তিন চার বছর আগে মারা গেছিল।তার স্ত্রীকে তার স্বামীর সব টাকা পয়সা অসিত চেষ্টা করে তাড়াতাড়ি   পাইয়ে দিয়েছিল।এছাড়া অসিতই খুব চেষ্টা করে এই মহিলাকে তার স্বামীর চাকরি টা পাইয়ে দিয়েছিল।চাকরি পাওয়ার কৃতজ্ঞতায় (মহিলাটির নাম রিনা)রিনা অসিতকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে রান্না করে খাইয়েছে।অফিসের লোকেরা দেখেছে তাদের মধ্যে প্রথম প্রথম একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই ছিল।ক্রমশ সেই সম্পর্ক এমন জায়গায় গেছে এখন রিনার বাড়ির যে কোনো কাজ করতেই অসিতকে লাগে।রিনা অসুস্থ হলেও অসিতকে প্রয়োজন। অফিস ফেরত রোজ দুজনে একসাথে বেরিয়ে কোথায় যায় কি করে সেসব অফিসের লোকেরা বলতে পারে নি।তবে অফিসের বন্ধুরা সবাই অসিতকে অনেক বুঝিয়েছে যে বাড়িতে বউ মেয়ে আছে তোর, তুই এই মহিলার থেকে সরে আয়।কিন্তু অসিত কারো কথা শোনে নি।

বিধ্বস্ত রিমলি ফোনটা রেখে দিয়ে উপুর হয়ে বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে রইল।চোখ দিয়ে অঝোরে জল পরছে।এই বয়সে অসিত প্রেম করছে?তাও আবার বয়সে বড় উইডো মহিলার সাথে?গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।বেশ খানিকটা জল খেয়ে ভাবতে বসল কি করা উচিৎ রিমলির?প্রথমে নিজের বাবা,মাকে জানাবে সব ঘটনা রিমলি।তারপর কি ডাইরেক্ট চার্জ করবে অসিতকে?নাকি অসিত আর রিনাকে ফলো করে হাতেনাতে ধরবে?আজ রাতেও ঝিলিককে দাদু দিদার কাছেই রাখবে। নইলে মেয়ে এসব কথা শুনলে খুব কষ্ট পাবে।মেয়ে এখন অনেক কিছুই বোঝে।এতসব চিন্তায় ঝিলিকের পরীক্ষা, পড়াশুনা সব মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে রিমলির।রিমলি আর কতদিকে সামলাবে।আর মন বসছে না রিমলির সংসারে।বিক্ষিপ্ত লাগছে মনটা।অসিত প্রথমে স্বীকার করবে না এই সম্পর্কটা এটা রিমলি জানে।মাকে ফোন করে জানিয়ে দিল আজ রিমলি মার কাছেই খাওয়া দাওয়া করবে।আর ইচ্ছা নেই রান্না করার।কিছুক্ষণ আগে অসিত ফোন করে জানাল আজ সে বাবার ওখানেই যাবে রাতে।রিমলি তাড়াতাড়ি বলে উঠল না অফিস ফেরত তুমি বাবার সাথে দেখা করে রাতে আজ এখানেই চলে আসবে।তোমার সাথে আমার দরকার আছে।

দুপুরে মায়ের কাছে খেয়ে নিয়ে রিমলি বাবা আর মাকে সব ঘটনা জানাল।সব শুনে দিশেহারা হয়ে মা বলে উঠল অসিতের এই রাত করে ফেরাটা আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল।স্বামীর উপর এত অগাধ বিশ্বাস তোর যে তুই একদম তখন পাত্তা দিলি না এই ব্যাপারটা।তক্ষুনি যদি সিরিয়াসলি ব্যাপারটা নিতি তালে ওদের সম্পর্ক টা এত মজবুত হত না।দেখো মা স্বামীর প্রতি বিশ্বাস না রাখলেও তোমরা যা ইচ্ছা তাই বলতে।কোন পথে যাব আমি?আমি ত কারো কোনদিন ক্ষতি করি নি।তালে আমার জন্য কেন এই অশান্তি দিল ভগবান?রিমলির কান্না দেখে ঝিলিক এসে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।সবসময় যদি অসিতের উপর অবিশ্বাস রাখতাম তাহলে সংসার কি করে করতাম বলো তো মা।সব সময় সবার কাছে ভালো থাকার চেষ্টা করে গেছি।কিন্তু ভালো ত আমার থাকা চলবে না।এবারে মারাত্মক খারাপ হব আমি।দেখি পারি কিনা এই ঝামেলা বিদায় করতে।কিন্তু অফিসের বন্ধুরা বলল রিনার বাড়ির যাবতীয় কাজ অসিত করে।কখন করে অসিত?এটা ভেবে পায় না রিমলি।কারণ ছুটির দিনে সকাল থেকে রাত অবধি অসিত এখানেই থেকে সারা সপ্তাহের কাজ গুছিয়ে দেয় তালে রিনার ওখানে কখন করে কাজকর্ম? সবচেয়ে বড় কথা রিনা কিন্তু অসিতের থেকে বয়সে বড়।কি করে সম্পর্ক টা এই জায়গায় এল তালে?আজকাল বোধহয় বয়সে ছোটো বড় কেউ মানে না।রিমলি কিভাবে অসিতের সাথে ঝগড়া না করে ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেলিং করবে সেটাই ভাবতে লাগল।রাত তখন ১০টা। রিমলি ওবাড়ি থেকে রাতের খাবার আগেই এনে রেখেছিল।অসিত আসলে একসাথে খাবে বলে বসেছিল।

ডোর বেল বেজে উঠল।বুকের ভিতরটা কাঁপছে রিমলির অসিত এসে ঘরে বসল। রিমলি অসিতের খাবারটা দিয়ে নিজের খাবারটা নিয়ে বসল।অসিত জিজ্ঞেস করল ঝিলিক কোথায়?
ও আজ দাদু দিদার কাছে থাকবে রিমলি জানাল
অসিত   তুমি কি বলবে বলছিলে আমাকে?
রিমলি   অসিতের মোবাইলটা নিয়ে এসে অসিত আর রিনার ফটো দেখিয়ে বলে এই মহিলাটি কে?
অসিত   ক্ষিপ্ত হয়ে বলে তুমি আমার মোবাইলে হাত কেন দিয়েছ?
রিমলি   তোমার মোবাইলে আমার হাত দেওয়ার অধিকার আছে।উত্তরটা দাও।
অসিত   চমকে উঠে জবাব দেয় এ ত আমার অফিস কলিগ।
রিমলি   উহু শুধু অফিস কলিগ নয়।আরো কিছু…
অসিত   আমার খুব ভালো বন্ধু।
রিমলি   আর কদিন বাদে ঝিলিকের প্রেম করার বয়স হবে অসিত।তোমার এই বয়সে এইসব নোংরামি কি না করলে চলছিল না?
অসিত   তুমি কোত্থেকে জানলে আমি নোংরামি করি।ওর নাম রিনা,খুব ভালো মানুষ।ও আমাদের কলিগের বউ।
রিমলি  কলিগের বউ ত আর কলিগের বউ নেই।সে এখন তোমার বউ হয়ে গেছে। কি ভেবেছিলে তুমি, আমি কিছু জানতে পারব না।
অসিত   কি জেনেছ তুমি?
রিমলি   সত্যি যেটা সেটাই আমি জেনেছি।এতদিন ওভার টাইমের নাম করে তুমি কোথায় যেতে ওই মহিলার সাথে।দিনের পর দিন,মাসের পর মাস,দুবছর ধরে  মিথ্যে কথা বলে রাত ৯টায় বাড়ি এসেছ।কেন?
আমি সংসার আর মেয়ের পড়াশুনা নিয়ে নাজেহাল হয়ে যাচ্ছি আর তুমি অফিস ফেরত ওই মহিলার সাথে অত রাত পর্যন্ত ফুর্তি করে বেড়াচ্ছ?মেজাজ চড়ে গেছে রিমলির।আমিও করব ফুর্তি তোমার মত সংসার ফেলে দিয়ে,মেয়েকে ফেলে দিয়ে দেখবে কেমন লাগে?আমি একা কেন এই সংসার নিয়ে পরে থাকব?অসিত এবারে কিছুক্ষণ চুপ থেকে হটাৎ চিৎকার করে বলে করো ফুর্তি কে বারন করেছে তোমাকে।আমি যা করেছি বেশ করেছি  তাতে তোমার কি?আরো করব ফুর্তি।কি করতে পারবে তুমি?যা করার করে নিতে পারো তুমি।বেশি অশান্তি করলে আর বাড়িই ফিরব না ওখানেই থাকব।
রিমলি   আমিও সবাইকে জানাব তোমার ও তোমার বাবার চরিত্র।শালা চরিত্রহীন বাপের চরিত্রহীন সন্তান।রক্তের ধারা যাবে কোথায়!!!

এরপর রিমলি চুপ করে গেল।শুয়ে পরে ভাবতে লাগল কি করে সরাবে রিনাকে অসিতের কাছ থেকে।এইভাবে চিৎকার করে ত হচ্ছে না।রাতের অন্ধকারে কোনো উপায় না পেয়ে অসিতকে অনিচ্ছা থাকলেও জড়িয়ে ধরে ভালোবাসা দিয়ে, আদর করে কান্নাকাটি করে অনেক বুঝিয়েছিল রিমলি কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিমলি পারে নি অসিতকে রিনার কবল থেকে সরিয়ে আনতে।প্রায় প্রতিদিনই ঝগড়া হত ওদের দুজনের।এই দেখে অসিত বাড়িতে ফেরাই বন্ধ করে দিল।
ঝিলিক বাবার এই ঘটনা শুনে বাবার প্রতি রুষ্ট হয়ে বলেছিল ছিঃ বাবা আমি ভাবতে পারি নি তুমি এত নোংরা।বাবা বলল যা বুঝিস না তা নিয়ে কথা বলবি না।আর কি বুঝব বাবা?খুব পরিষ্কারভাবে সব বুঝিয়ে দিয়েছ তুমি।মুখে বললেও রিমলি কি আর অসিতের মত চরিত্রহীন হতে পারবে?কোনোদিনও পারবে না।এটা অসিত ভালো করেই জানে।রিমলি নিরুপায় হয়ে রিনার কাছেও গেছিল।রিমলি হাতে পায়ে ধরেছিল রিনার কিন্তু না রিনাও ছাড়বে না অসিতকে,অসিতও ছাড়বে না রিনাকে।অসিত আর ফেরে নি।রিমলি ঝিলিককে নিয়ে একা পরে রইল। 

       

(এই গল্পটা কোনো সত্যি ঘটনা নয়।এর সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *