KormoFol – Bengali Story

রাত্রে খাবার টেবিলে বেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে বসে থাকল অনুপম, এমনটা তো সেভাবে নি, সেই ভেবেছিল দেবী তার কথাগুলো শুনে খুব রিয়াক্ট করবে, কাঁদবে, তার পা জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করবে, একবার ফিরে আসার জন্য অনুনয় বিনয় করবে, মনে মনে অনেক রিহার্সাল দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছিল সে এই রাতের খাবার টেবিলে কথাটা বলবে বলে,
বলার সময় দেবীর দিকে বারবার আড় চোখে দেখছিল..আঁচ করতে চাইছিলো দেবীর প্রতিক্রিয়া,
অদ্ভুত নির্লিপ্তভাবে তার কথা শুনতে শুনতে দেবী খাবার শেষের টেবিলটা গুছিয়ে যাচ্ছিল,
অনুপমের কথাগুলো যেন তাকে ছোঁয়নি , কোন দুঃখ সুখ কান্নার প্রকাশ নেই দেবীর মুখে,
ধৈর্য্য হারা হয়ে শেষে অনুপম দেবীকে বলল.. “কি তুমি কিছু বলছো না যে? “
দেবী.. “কি বলবো? তোমার যেটা মন চায় করো..”
অনুপম..” তোমার তাহলে আপত্তি নেই কোনও ? “
দেবী মাথা নাড়লো দুই দিকে.. ” না আমার কিছু বলার নেই…”

এত সহজে দেবীর কাছ থেকে সে মুক্তি পাবে ভাবেনি, যদিও দেবী রিয়াক্ট করলেও সে পাত্তা দিত না, বিয়ের পর থেকেই দেয়নি, আজও দিত না, কিন্তু সে একটু চিন্তায় ছিল, মেয়েদের কাছ থেকে বিনা কারণে ডিভোর্স চাওয়া ওতো সহজ নয়, অনেক ঝামেলা তাছাড়া খোরপোষ দাবিও করতে পারতো দেবী..
কিন্তু তবুও দেবীর এতো সহজভাবে মেনে নেয়াটা মনের কোথায় যেন বিঁধছে তার, কেন বুঝতে পারছেনা সে..

ঘরের টুকটাক কাজ সেরে দেবী যখন শোবার ঘরে এলো দেখল… অনুপম পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে, নয়তো চুপ করে শুয়ে আছে পরবর্তী ঝড়ের আগমনী বার্তার অপেক্ষায়, কিন্তু দেবী কিছু বলল না.. কিছু বলতে তার রুচিতে বাঁধছিল, নিঃশব্দে ব্যালকনিতে এলো সে, অনুপম আজ জানিয়েছে, জানিয়েছে বললে ভুল হবে… ঘোষণা করেছে মাত্র… মেঘা কে বিয়ে করবে সে.. তাই মিউচুয়াল ডিভোর্সের পেপার রেডি করবে, দেবী যেন তাতে সই করে দেয় ,

দেবী অনেকদিন আগে থেকেই জানতো এমন একদিন আসবে আজ নয়তো কাল, তাই আজ নিজের মন কে শক্ত করতে অসুবিধা হয়নি তার, বিগত প্রায় দু’বছর ধরে মেঘা নামে ওর অফিসের কলিগ এর সাথে অনুপমের রিলেশন, প্রথম প্রথম বুঝতে না পারলেও পরে বুঝেছিল খুব, মাঝে মাঝে অনেক রাত্রে ঘুম ভেঙে সে দেখেছে পাশের রুমে ফোনে কথা বলতে, কিছু জিজ্ঞেস করলেই অফিসের কথা বলে এড়িয়ে যেত, বেশি প্রশ্ন করলে সন্দেহ বাতিকগ্রস্থ বলে অশান্তি শুরু করত, বলত “পোষায় থাকো.. না পোষায় চলে যেতে পারো,” তবুও দেবী নিজের অধিকার সহজে হাত ছাড়া করতে চায়নি, কিন্তু যেদিন প্রতিবাদ করায় দেবীর গায়ে হাত তুলেছিল অনুপম সেদিন খুব আত্মসম্মানে লেগেছিল দেবীর,

ধীরে ধীরে সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল,ভিতর টা জ্বলে গেলেও কিছু জিজ্ঞেস করতো না আর, কারণ সে জানে অনুপম তাকে পছন্দ করেনি কোনদিনই, তার মত একদম একটা সাধারন মেয়েকে সে নিজের যোগ্য বলে মনে করেনা, অনুপমের মা ছোটো বেলাতেই মারা গিয়েছিলেন, অনুপম বিয়েটা করেছিলো বাবার চাপে পড়ে,

বিয়ের আগে দেবী একটা বাচ্ছাদের প্রাইভেট স্কুলের টিচার ছিল, সেই স্কুলের সেক্রেটারি ছিলেন অনুপমের বাবা, দেবীর শান্ত স্বভাব, মুখের মিষ্টতা তাকে মুগ্ধ করে, ভেবেছিলেন হয়তো ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরে লক্ষ্মী আনবেন, এনেও ছিলেন, বাবার মুখের উপর কথা বলতে পারেনি অনুপম,

কিন্তু প্রতি পদে পদে দেবীকে বুঝিয়ে দিয়েছিল…. দেবী তার যোগ্য নয়, তাকে আনকালচার্ড, আনস্মার্ট এসব বলে এসেছে সব সময়, ওর অন্যান্য অফিস কলিগদের বৌদের স্মার্টনেস এর কাছে সে যে কিচ্ছু নয়, তাকে যে অফিস পার্টিতে নিয়ে যাওয়া যায় না… সেসব সে অনেকবার শুনেছে,

দেবী জানে সে এ যুগের মেয়েদের মত স্মার্ট নয়, একটা ভালো তাঁতের শাড়ি, এলো খোঁপা আর একটা ছোট্ট টিপ.. এতেই সে অভ্যস্ত বরাবরই, অনুপমের রুচির সাথে তার রুচি কোনভাবেই মেলে না…তবুও চেষ্টা করেছিল অনুপম কে ভালোবাসতে, মন দিয়ে সংসার করতে..

বাবা মারা যাওয়ার পর দাদা বৌদির সংসারে মায়ের সাথে থাকত সে, অনুপমের বাবা যখন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তাদের বাড়ি গিয়েছিল সত্যিই হাতে চাঁদ পেয়েছিল দেবীর মা, ভেবেছিল মেয়েটার এতদিনের কষ্টটা লাঘব হল বুঝি,
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল দেবীর, বিয়ের পর অনুপমের বাবা আর চান নি তার বৌমা স্কুলে গিয়ে চাকরি করুক, আর এখানেই দেবী আরও একটা ভুল করে বসে, মন দিয়ে সংসার করার আশায় সে চাকরিটাও ছেড়ে দেয়, শ্বশুরমশাই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তার সামনে অনুপম কিছুটা হলেও সংযত হয়ে চলত, এমনি অসুবিধা তো কিছু ছিল না, সময় মতো যা বলত সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে জোগাড় হয়ে যেত, যখন যা দরকার অর্ডার করলেই দেবী তঠস্থ থাকতো সেটা মেটাবার,
তাছাড়া যখন ইচ্ছা সে দেবীকে গ্রহণ করত, যখন ইচ্ছা হতো দূরে ঠেলে দেওয়ার.. দিতো, কিন্তু দেবী বুঝতো এই গ্রহণের মধ্যে কোনদিন কোন ভালবাসার চিহ্ন ছিল না, ছিল শুধু পুরুষের অধিকার খাটানোর তাগিদ, এমনকি তাকে গ্রহণ করার সময়ও অনুপম কতদিন মেঘার কথা উল্লেখ করেছে, অপমানে দেবী নীল হয়ে যেত…
ভীষণ কষ্টে, অপমানে সে কান্নাকাটি করলে… অনুপমের “ন্যাকামো” শব্দটা ব্যবহারে .. সেটাও বন্ধ করে দিয়েছিল, ধীরে ধীরে মনের কোনো এক কোনে অনুপমের প্রতি ভালোবাসার বদলে বিতৃস্না জমতে শুরু করেছিল .. তাই শেষের দিকে অনুপমের অপমান গুলো আর গায়ে লাগতোনা, সয়ে গিয়েছিলো, ঝগড়া ঝাটি, ঝামেলা তার ভালো লাগেনা কখনো, কিন্তু মনের জোর পাচ্ছিলোনা ফিরে যাবার, ফিরতে পারছিলো না দাদা বৌদির বোঝা বাড়াতে চায়না বলে..মনের ভিতর টা মরে গেলেও বাইরে তার প্রকাশ ছিলোনা..সে বুঝতে পারতো সহ্য করতে করতে সেল্ফ রেস্পেক্ট টাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো তার..

প্রতিটা ব্যবহারে অনুপম তাকে শোনাতো.. দেবীকে বিয়ে করে তার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে, তার স্বপ্ন তো লুকিয়ে আছে মেঘার মধ্যে, মেঘার মধ্যে যা মাদকতা…তা দেবীর মধ্যে কোথায়? মেঘার মতো স্মার্ট মেয়ের ই স্বপ্ন দেখত সে… অমন গম রাঙা গায়ের রং, অমন সুন্দর ফিগার.. তার কাছে দেবী নাকি একটা কালো, মুটকি ছাড়া আর কিছু নয়.. |

ঘরের ভিতর থেকে অনুপমের নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেল দেবী, দেবীর কাছ থেকে মুক্তি পাবার আশ্বাস পেয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে..

বুক ভরে ঠান্ডা হাওয়ার স্পর্শ নিল দেবী , বিগত চার বছরের তিক্ত স্মৃতি, অপমান তাকে কাঁদাতে ভুলিয়ে দিয়েছে যেন, সারারাত ব্যালকনিতে বসে ভাবল এরপর তার কি করা উচিত…|

পরের দিন সকালবেলা অনুপম ঘুম থেকে উঠলো, অভ্যাসবশত দেবীকে ডেকে তার স্নানের জল রেডি করতে বলল, কিন্তু দেবীর কোন সাড়া পেল না, দুই একবার চেঁচিয়ে ডাকার পর কাজের মেয়েটি এসে বলল… “সকালবেলাতেই ব্যাগগুছিয়ে বৌদি মনি বেরিয়ে গেলেন, যাওয়ার সময় বলে গেলেন আপনার যা দরকার একটু গুছিয়ে দিতে আমাকে “
শুনেই রাগে মাথাটা দপ দপ করে উঠলো অনুপমের, এত বড় সাহস!!
মাথা একটু ঠাণ্ডা হতেই ভাবল.. ফিরতে তো হবেই সেই দুদিন পর, দাদা বৌদির সংসারে কতদিন আর থাকবে!! ফিরে যখন আসতেই হবে, যাওয়ার জায়গা যখন কোথাও নেই তখন নাটক করে যাওয়ার কি আছে? দেবী কি ভেবেছে সে রাগ করে চলে যাবার সাথে সাথে অনুপম তাকে ফেরত নিয়ে আসতে যাবে??
একটা শ্লেষের হাসি অনুপমের ঠোঁটে ফুটে উঠল.. ইচ্ছা করেই আর কোনও খবর নিল না সে, তাছাড়া যে সম্পর্কটা সে আর রাখতে চায় না সে সম্পর্কটার জন্য শুধু শুধু সময় নষ্ট করে আদিখ্যেতা তার পোষাবে না..

মাস তিনেক যাওয়ার পরও যখন দেবী ফিরল না.. তখনও অনুপমের মনে হলো না একবার খোঁজ নেয়া দরকার, আসলে একদিক থেকে অনুপমেরও ভালোই হয়েছিল… তার আর মেঘার অবাধ মেলামেশার এখন আর কোন বাধা ছিল না, মাঝে মাঝেই এ বাড়িতে মেঘা কাটিয়েও গেছে,মেঘাকে নিয়ে অনুপম অনেক স্বপ্ন দেখে, মেঘার অ্যাপ্রোচ , কথা বলার স্টাইল, তাকানো… সব সব কিছুই অনুপমকে ভীষণভাবে টানে প্রথম থেকেই, মেঘাকে নিয়ে যখন ও এদিক ওদিক ঘুরতে যায়, তখন সবাই ঘুরে ঘুরে মেঘাকে দেখে, অনুপমের বেশ অহংকার হয় তাতে, খুব শিগগিরই ঘর বাঁধবে তারা. উকিলের সাথে কথা বলেছে.. খুব শিগ্রী ডিভোর্স ফাইল রেডি করতে দেবে অনুপম,
তবে মাঝে মাঝে দেবীর এই নির্লিপ্ততা অনুপমের গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয়, তবু ইচ্ছা করে কোন খোঁজ নেয় না সে.. কি দরকার খোঁজ নেবার ? দিনগুলো কেটে যাচ্ছে হাওয়ায় ভেসে.. যাকনা… এই ভাবে প্রায় মাস আটেক কেটে গেল…

সেদিন অফিস ফেরত অনুপমের মাথাটা বেশ গরম ছিল. কারণ মেঘার সাথে ঝগড়া হয়েছে তার, ইদানিং লক্ষ্য করছে মেঘা তাকে একটু এভোয়েড করে চলছে, খোঁজ নিয়ে দেখেছে আজ কাল অফিসে নতুন বসের দিকে ঝুঁকেছে সে, কানাঘেঁষা শোনা যাচ্ছে.. কাজ থাকুক না থাকুক বসের রুম এ নানা অছিলায় বার বার যাচ্ছে সে , অফিসে তার আর মেঘার ব্যাপার টা সবাই জানে মোটামুটি , ইদানিং তার মনে হচ্ছে তাকে দেখে সবাই ব্যাঙ্গের হাসি হাসছে, মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল অনুপমের, নতুন বস এর বড্ড নাক উঁচু, সে যে এই কোম্পানির ম্যানেজার এর পদ এ রয়েছে… তার মতো একজন টেলেন্টেড পারসন কেও বিশেষ পাত্তা দেয়না… আর তার সাথেই কিনা মেঘা …!!

মেঘা অবশ্য অনুপমের রাগকে পাত্তা না দিয়ে বলেছিল.. ” শোনো তুমি আমাকে নিজের বউ পাও নি যে তুমি আমাকে মেজাজ দেবে আর আমি সব শুনে নেব.. তাছাড়া তোমার সাথে বিয়ে করে কি হবে আমার!! দেখো আমি বসকে বলে ঠিক আমার প্রমোশন করিয়ে নেবো দিল্লিতে , তুমি আমাকে তখন আর ছুঁতেও পারবে না.. আর হ্যাঁ, আমাকে বেশি ডিসটার্ব করলে তোমার নামে আমি বসের কাছে নালিশ করে দেবো..কেন জানিনা বস তোমাকে শুরু থেকেই পছন্দ করেন না, তবে এই বস একটু ঢ্যাটা টাইপ, একটু বেশি ই টাইম লাগবে মনে হয় পটাতে”… বলতে বলতে হিস্ হিসিয়ে হেসেছিল মেঘা…
তারপর অনুপম কে পাত্তা না দিয়ে গটগট করে তার সামনে দিয়ে বসের রুমে ঢুকে গিয়েছিল..

মাথায় আগুন ধরে গেছিল অনুপমের, কিন্তু কিচ্ছু করার ছিল না তার, এই মেয়ের জন্য তার সংসার সে নিজে হাতে ভেঙেছে, চাকরিটা আর খোয়াতে চায় না, বারবার তার একটা প্রশ্নই মনে হতে থাকলো কি করে পারল মেঘা এমন করতে? এত সহজে কিভাবে একটা সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে!!

হায়রে… অলক্ষ্যে ভগবানও মুচকি হাসে.. যে নিজের সংসার ভেঙে দিতে একবিন্দু দ্বিধাবোধ করে নি, সে অন্যের বিচার করতে বসে..

বাড়ি ফিরে এসে আজ এই প্রথম বাড়িটাকে খুব ফাঁকা মনে হয় তার, আজ দেবীর কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছে , মেয়েটা সত্যি খুব সরল সোজা, মেঘার মতো সুন্দরী ও নয় সে, কিন্তু এটাও সত্যি মেঘার মতো পুরুষ ভোলানো ছলা-কলা ও সে জানে না,
তাই দিনের পর দিন.. ডানা ওঠা পিপীলিকার মত দেবীর মতো শান্ত প্রদীপকে ছেড়ে মেঘার মতো বিজলি বাতির দিকে দৌড়েছিল সে…ভুল করেছে ,
কাল সকালেই দেবীর কাছে গিয়ে তার সাথে যে দিনের পর দিন অন্যায় করে গেছে.. তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেবে.. মনে করল সে… নিশ্চয়ই দেবী তাকে ক্ষমা করে দেবে|

এই ভেবে নিজের অশান্ত মনকে কিছুটা শান্ত করে অন্যান্য দিনের মতো লেটারবক্স থেকে চিঠি গুলো বের করল,
অবাক হলো দেখে যে.. কয়েকটা চিঠির মধ্যে দেবীর একটা চিঠি, একেই মনে হয় কো- ইন্সিডেন্স বলে, কেন জানিনা মনটা একটু ভালো লাগায় ভরে উঠলো তার, তাড়াতাড়ি খামটা খুললো সে|
স্তম্ভিত হয়ে দেখল.. ডিভোর্সের চিঠি তাতে, কিছুক্ষণ বুঝতে সময় লাগলো , দেবী তাকে ডিভোর্সের চিঠি পাঠিয়েছে!!! এই চিঠির সঙ্গে আরও একটা চিঠি..

” আশা করি ভালো আছো, তুমি তো আর খোঁজ ই নিলেনা, নিশ্চই ভেবেছো আপদ বিদায় হয়েছে ভালো হয়েছে, যাইহোক, আমি এখন মা কে নিয়ে দেশের বাড়ি থাকি, দেশের বাড়ির কাছেই যে ছোটদের স্কুল… তাতে চাকরি পেয়েছি এই মাস তিনেক হলো, দাদার বাড়িতে গলগ্রহ হয়ে নেই আর, তোমার পাঠানো ডিভোর্সের চিঠি যখন পেলাম না, তখন আমিই পাঠালাম, চার বছর ধরে তোমার মনের কাছে যাবার, সংসার করার অনেক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকাও নি কখনো, ভবিষ্যতের ডিভোর্স দেবে… এ বিষয়ে তুমি এতো সিওর ছিলে যে.. বারবার বলা সত্ত্বেও তুমি কখনো কোন ইস্যু নিতে চাও নি, সেটা এত দিনে এসে বুঝেছি ..
এখানে আমি চলে আসার পর একবারও যোগাযোগ না করে আরোও বুঝিয়ে দিয়েছ … আমাকে তোমার জীবনে আর কোনো প্রয়োজন নেই.. যদিও সেটা তুমি আমাকে মুখেই জানিয়েছিলে,
যাইহোক, তোমার দিনের-পর-দিন অপমানে নিজের স্বত্ত্বাটুকু যখন হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি, আত্মসম্মানবোধ টুকু আমার নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল দিনের পর দিন, হীনমন্যতায় ডুবে যাচ্ছিলাম আমি, ডুবেই যেতাম যদি আমার জীবনে হঠাৎ সৌম্যজিৎ না আসতো, সৌম্যজিৎ আমার স্কুল জীবনের বন্ধু, ওই প্রথম আমাকে বুঝিয়েছে যে আমিও একটা মানুষ, আমার মধ্যেও সৌন্দর্য আছে, আমিও কারোর ভালোবাসা পাবার যোগ্য….যেটা আমি এ ক’বছরে একদম ভুলতে বসেছিলাম,
ও এখানে ছিলোনা এতদিন, এসেছে মাস পাঁচেক হলো, এর আগে দিল্লি তে পোস্টিং ছিল ওর, আমার দেশের বাড়ির পাশেই ওর বাড়ি, ওখানেই আবার অনেক দিন পরে ওর সাথে দেখা হয়, তুমিও সৌম্যজিৎ কে খুব ভালো করেই চেনো, তোমাদের অফিসের নতুন বস,”

এই টুকু পড়ে অনুপমের হাত কাঁপতে লাগলো.. এই জন্যই বসের সাথে আলাপ হবার দিন বস তাকে বলেছিলেন “আপনার অনেক গল্প শুনেছি আমি “..
অনুপম ভেবেছিলো তার কাজের প্রশংসা করছেন বস..
এই জন্যই বস তাকে পছন্দ করেননা, উফফ ঘামতে শুরু করলো সে.. চিঠি টা আবার পড়তে শুরু করলো..

“সৌম্যজিৎ আমার কাছে সব শুনেছে,
ও কিন্তু মেঘার ব্যাপারে ভালো সার্টিফিকেট দেয়নি, পসিশন এর লোভ এ এখন ও সৌম্যজিৎ কে সিঁড়ি করতে চাইছে, যেমন একদিন তোমাকে করেছিল, তুমি ভেবে চিনতে এগিও.. এতো দিন একসাথে ছিলাম তাই জানিয়ে দেওয়া দরকার মনে হলো .. কিছু মনে করোনা,আসলে বিয়ে জিনিসটা কোনো ছেলেখেলা নয় তো তাই, যাইহোক.. সৌম্যজিৎ বিয়ের জন্য খুব তাড়া দিচ্ছে, বাড়িতেও সবাই রাজি, ডিভোর্সের পেপারটা সই করে পাঠিয়ে দিও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব.. ভালো থেকো….
……………….. ইতি
……………………………………….দেবী

চিঠিটা পড়ে অনুপমের মাথা ঘুরে গেল, চোখ জ্বালা করে উঠলো তার, বুকের মধ্যে তীব্র জ্বালা অনুভব করল সে, চিঠিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজের হাত কামড়ে ধরল অনুপম, কি চেয়েছিল সে আর কি হয়ে গেল! একেই বুঝি কর্মফল বলে..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *