Durjoger Rat – Thriller Love Story – Rohossho Uponnash

 (পর্ব ১)
পাহাড়ের একদিকে নিবীড় ঘন জঙ্গল অন্য দিকে প্রায় তিনশো ফুট গভীর খাদ। পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে চঞ্চলা নদীটা ওই খাদের মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে তীব্র গতিতে পাহাড়ের পাথরে প্রচন্ড ধাক্কা খেয়ে লাফাতে লাফাতে নেমে চলেছে। পাহাড়ী রাস্তাটাও  সাপের মত এঁকে বেঁকে নেমেছে প্রায় পাহাড়ের খাদ ঘেঁষে । দিনের বেলা ওপর থেকে দেখলে রাস্তাটাকে মনে হয় পাহাড়ের গা বেয়ে যেন একটা মস্ত সাপ হেলে দুলে নেমেছে । রাতে অবশ্য সারা রাস্তাটা বাতির অভাবে জমাট অন্ধকারে ডুবে থাকে।  তখন শুধু শোনা যায় একঘেয়ে নদীর জলের কুল কুল  শব্দ আর হাওয়ায় জঙ্গলে আলোড়িত পাতার আওয়াজ । ব্যতিক্রম অবশ্য ওই পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা বাংলো যাদের সামনের বাতি চাপা অন্ধকারে মধ্যেও  খাপছাড়া টিমটিম করে জ্বলে সামান্য আলোকিত করে রাস্তাটার জায়গায় জায়গায়  ।
আজকের রাতটা বড়ই দুর্যোগের, পাহাড়ে ঝড় ও বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই নেই। থেকে থেকে সারা আকাশ জুড়ে বিদ্যুতের ঝলকানি আর কড়কড় শব্দে আকাশের হুঙ্কার। বিদ্যুতের আলোয় জঙ্গলের বিশাল গাছগুলোকে দৈত্যের মত আর অন্যপারের উপত্যকাটাকে দেখায় অন্ধকারে ডুবে থাকা কোনো অজানা ভূত পুরীর মত
স্বভাবতঃ এই দুর্যোগের রাতে রাস্তা জনশূন্য। ওই জমাট ঠান্ডার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝড় বৃষ্টির মধ্যে সকলে যখন তাদের বাসার নিরাপদ উষ্ণ আস্তানায় অনেক আগেই ফায়ার গেছে তখন  ওই সুনসান রাস্তায় একটা মোটরগাড়ী পথের পাশে পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে । পাথরের পেছনে এমন করে গাড়িটা লুকিয়ে রাখা যাতে কারুর সহজে নজরে না পড়ে । গাড়ির ভিতরের মাঝবয়সী আরোহী  নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সবেমাত্র রাত সাড়ে সাতটা । মনে মনে ভাবে এখনো বেশ কিছুক্ষন এই অন্ধকারে তাকে ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করে থাকতে হবে।
পাহাড়ের ওপর যে জলবিদ্যুত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে তার জন্য এই রাস্তায় গাড়ি ও লরির গতিবিধি বেড়েছে কিন্তু দিনের আলো নেভার আগেই তারা এই মারাত্মক পাহাড়ীপথটা পার করে চলে যায় । সন্ধে ছটার মধ্যে রাস্তা সাফ আর আজ এই দুর্যোগে কে বা পথে নামবে ? এমন দুর্যোগে নিরাপত্তার জন্য বিদ্যুতের যোগান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলোগুলোও ডুবে আছে জমাট অন্ধকারে।  নিজের চেক লিস্টগুলোকে আর একবার মনে মনে ঝালিয়ে নেয় ওই আগন্তুক। তার গন্তব্য বাংলোটার থেকে ৫০ গজ দূরে একটা বুড়ো চা ওলা রাস্তায় তার অস্থায়ী পসরা সাজিয়ে বসে, সাধারণতঃ সে সাড়ে ছটার মধ্যে তার দোকান গুটিয়ে নেমে যায় সিকি মাইল দূরে তার গ্রামে। এই দুর্যোগের রাতে সে হয়তো অনেক আগেই বাসায় ফিরেছে । বাংলোয় ভৃত্যটি কাজ সেরে বিদায় হয় সাতটার কিছু পরে । বাংলোটাতে রাতে মাত্র দুজন প্রাণী থাকে পঞ্চাশ উর্ধে জগমোহন ও তার মাঝবয়সি স্ত্রী। জগমোহন ধনী নেতা ব্যক্তি, রাজনৈতিক মহলে বেশ ভালোই প্রভাব । সামনের নির্বাচনে তার জেতা অবধারিত  বাড়ি দিল্লীতে যেখানে তার সঙ্গে মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। দিল্লীর বাংলোয় অনেক চাকরবাকর, ড্রাইভার- অনেক লোকজন, আশপাশের প্রতিবেশী, তাছাড়া ওর বসবাসের  এলাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাস, জোরদার পুলিশী টহল । ইদানিং বছরে কয়েকটা মাস এই বাংলোয় থাকে তার কাঠের ব্যবসা ও নতুন শুরু করা খনির ব্যবসার কাজকর্ম  দেখতে ।
সাত দিন ওই বাংলো ও জগমোহনের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে আগন্তুক কিন্তু জগমোহনের স্ত্রীকে একবারের জন্য দেখতে পায় নি। শুনেছে তাদের এক সন্তান আছে যে বোর্ডিং স্কুলে পড়াশুনা করে।
আগন্তুক ৯ মিলিমিটার বোরের পিস্তলটাতে সাইলেন্সার লাগাতে লাগাতে ভাবে এই কাজটা যেমন বিপজ্জনক তেমনই এটাতে অনেক টাকা।  হয়তো তার জীবনের এটাই হবে শেষ কাজ । কারণ এই কাজ করার পরে লম্বা সময় সুদূরে গাঢাকা দিয়ে থাকতে হবে, পাল্টাতে হতে পারে নিজের পরিচয়ও।  কথায় আছে বিপজ্জনক কাজের আগে পালাবার রাস্তা প্রসস্থ রাখা উচিত। আগন্তুক কোথায় গা ঢাকা দেবে কি ছদ্মপরিচয়ে তা আগেই ঠিক করে রেখেছে । পিস্তলে ম্যাগাজিন লোড করে পাশের সিটে রেখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে রাস্তায় নামে । বাংলোটার কাছাকাছি আসতেই গাড়ির স্টার্ট ও হেডলাইট বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারে সাবধানে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পরিকল্পনা মতো বাংলোটা ছাড়িয়ে ২৫ গজ দূরে গাড়িটা দাঁড় করায়।
বাংলোটা ডুবে আছে গভীর অন্ধকারে। কাজে নামার আগে একটা সিগারেট ধরিয়ে মনে মনে একবার রিহার্সাল করে নেয়। প্রথমে বাংলোর ফোনের তারটা ছিঁড়ে বারান্দায় পৌঁছে দরজায় টোকা দেবে। দরজা খুলবে সম্ভবতঃ জগমোহন কারণ চাকরটি এতক্ষনে নিজের বাসায় ফিরে গেছে । চার পাঁচ ফুট থেকে একটাই ফট্ এক্কেবারে কপালের মাঝখানে। যদি সেইসময় তার স্ত্রী এসে পরে তাহলে অগত্য তাকেও, প্রমান লোপাট করতেই হবে । এরপর গড়ান রাস্তায় গাড়িতে স্টার্ট না করে নিস্তব্ধে নেমে যাবে যাতে আশেপাশের বাংলোর কেউ গাড়ির আওয়াজ শুনতে না পায় । উল্টো দিক থেকে এই দুর্যোগে রাতে গাড়ি আসার কোনও সম্ভবনা আজ নেই।
আগন্তুক জ্যাকেটের ভিতরে সাইলেন্সার লাগানো লম্বা অস্ত্রটিকে রাখে। এত কাছ থেকে রক্তের ছিঁটে উড়ে আসবে জামা-প্যান্টে তাই ওভারকোটের মত লম্বা বর্ষাতিটা চাপিয়ে নেয়, হাতে চামড়ার দস্তানা পড়ে  নেয় পোড়া বারুদের গুঁড়োর থেকে হাত বাঁচাতে, মাথায় টুপী । গাড়ি থেকে বেরোতেই ঝড়ের মত কনকনে হওয়ার সঙ্গে  মুষল ধারায় বৃষ্টিতে তার সারা শরীর ঠান্ডায় কেঁপে ওঠে। বৃষ্টির প্রচন্ড শব্দ ঢেকে দেয় তার সমস্ত গতিবিধির শব্দ। প্রায় নিঃশ্বব্দে ফোনের তারটা ছিঁড়ে পৌঁছোয় বারান্দায় দরজার সামনে। একহাতে ইস্পাতের বাঁটটা ধরে অন্য হাতে দরজার কড়া নাড়ে।
ভিতরে পুরুষ কণ্ঠস্বর, “হওয়ার দরজার আওয়াজ ? এতরাতে কে আবার কড়া নাড়ছে?”
মহিলা কণ্ঠস্বর, “এতো রাতে কে আবার আসবে? দাঁড়াও আমি দেখছি।”
আগন্তুকের বুকের  দুরু দুরু বেড়ে যায়, অগত্যা স্ত্রীকে দিয়েই শুরু করতে হবে ? মনে মনে সে প্রস্তুত হয় শক্ত হাতে চেপে ধরে লোহার অস্ত্রটাকে। দরজার ভিতর থেকে খুট করে শব্দ হয়, ক্যাচ শব্দের সঙ্গে দরজার খুলে দাঁড়ায় সালোয়ার কামিজ পরা শালে আবৃত এক মাঝবয়সী মহিলা। ঠিক সেই সময় বিদ্যুতের ঝলকানিতে চারিদিক মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয় ।মহিলাকে দেখে আগন্তুকের হাত কেঁপে যায়, বুকে যেন কে ক্রমাগত হাতুড়ি পিটতে লাগলো। তার মুখ দিয়ে কোনও কথা আর বেরোয় না।
বিস্মৃত মহিলাও, অস্ফুষ্ট স্বরে তার মুখ দিয়ে শুধু বেরোয়, “তুমি !!”
 (পর্ব ২)
ওরা দুজনেই নির্বাক, এমন আকস্মিত সাক্ষাতে মহিলা ও আগন্তুক দুজনেই একেবারে হতচকিত। কেঁপে ওঠে ওদের দুজনের সত্তা। বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত ওই অন্ধকারে দুজনে একে ওপরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে খানিকক্ষণ ।  অচেনা একজনের প্রেমে পড়া যত সহজ, নিজের ভালোবাসাকে নিজের হাতে খুন করা ততধিক কঠিন । বিদ্যুতের বেগে পুরোনো দিনের কত ছবি মনের পর্দায় একই সঙ্গে ভেসে ওঠে। আগন্তুকের প্রথম প্রতিক্রিয়া ওর অস্ত্রহীন কাঁপা হাত জ্যাকেটের থেকে বেরিয়ে আসে । মনে মনে ভাবে আর একটু হলে কি করে ফেলছিলাম। ওই মুহুর্ত্তে ওর ইচ্ছে করে সামনে দাঁড়ানো মহিলাকে দুহাতে নিজের বুকে টেনে নিতে, কিন্তু ফেলে আসা বছরগুলো দেয়ালের মত বাধা দেয় তাকে । আবার বিদ্যুতের ঝলকানিতে চারিদিক আলোকিত হয়, সম্বিত ফেরে ওদের দুজনেরই ।
“জিৎ! তুমি এখানে? এই দুর্যোগের রাতে?” চাপা স্বরে বলে মহিলা।
সমগ্র পরিস্থিতির এক ঝটিকায় পরিবর্তনের জন্য মোটেই জিৎ প্রস্তুত ছিল না, “এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম, ফেরার পথে গাড়িটা বিগড়েছে, ঝড় জলের রাতে ভাবলাম যদি কাছাকাছি …..” তড়িঘড়ি সে বলে। 
ভিতর থেকে ঠক ঠক করে ছড়িতে ভর দিয়ে ততক্ষণে জগমোহন খুঁড়িয়ে হেঁটে পৌঁছেছে দরজার কাছে, “প্রিয়া এতো রাতে কে এসেছে?”
প্রিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “এই দেখোনা আমার কলেজের বন্ধু জিৎ, কি ভাগ্গিস ঠিক আমাদের বাড়ির সামনে এসেই ওর গাড়িটা খারাপ হয়েছে।”
“এমন ঝড় জলের রাতে প্রিয়া ওনাকে দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখো না। জিৎ জি ভিতরে আসুন, প্লিজ ,”
“ওহঃ দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য সরি জিৎ, ভিতরে এসো। ইনি জগমোহন আমার স্বামী,” প্রিয়া বলে।
জিৎ ভিতরে ঢুকে জগমোহনের সঙ্গে করমর্দন করে।
প্রিয়া ওকে নিয়ে বসায় বাংলোর ডাইনিং রুমে, মোমবাতির কাঁপা আলোয় জিৎ লক্ষ্য করে বিশাল কাঠের টেবিলটা ঘিরে ১৮-২০ টা চেয়ার ।
 প্রিয়া ফায়ারপ্লেসের আগুনটাকে সামান্য  খুঁচিয়ে দেয়। ক্রমে ঘরের তাপ বেড়ে ওঠে। জগমোহনও এসে বসে জিৎ এর কাছেই একটা চেয়ারে l
“জিৎ জি আরাম করে বসুন। এই ঝড় জলের রাতে এখানে কোথায় এসেছিলেন?” জগমোহন জিজ্ঞেস করে।
জিৎ বলে, “এসেছি দুপুরে, তখন কি জানতাম বিকেলে আবহাওয়া এমন পাল্টে যাবে?”
“বুঝলাম ! দুপুরে এসেছিলেন। কার বাংলোতে ? মানে এই রাস্তায় সকলকেই তো আমি চিনি।”
অন্যমনস্ক জিৎ এর মাথায় অন্য এক ঝড় বহে চলেছে। তার আত্মা ও মনের মধ্যে এই মুহুর্ত্তে বিরাট সংঘাত। জীবনের শেষ কাজ মনে করে অনেক ধৈর্য ও সাবধানী পরিকল্পিত পদক্ষেপের পর আজ এখানে পৌঁছেছে । এক  মাসের ওপর সময় লেগেছে ধৈর্য নিয়ে ঠান্ডা মাথায় ফন্দী এঁটে এই বাংলোয় পৌঁছতে। আজ নিজের আত্মার কথা শুনে শেষ টুকু না করেই চলে যাবে ? নাকি মস্তিষ্কের কথা শুনে আগ্নেয়াস্ত্রটা বার করে দুজনকেই ? এতো কাছ থেকে লক্ষচ্যুত হবার কোনোও সম্ভবনাই নেই। এই দুর্যোগের রাতে বৃষ্টি আর মেঘের গর্জনের মধ্যে দুটো ফট ফট আওয়াজ কেউ টেরও পাবে না। 
আগামী কাল চাকরটা এসে এই ঘটনা উদ্ধার করতে করতে সকাল, ততক্ষনে জিৎ অনেক দূরে, অন্য ছদ্মপরিচয়ে ।
“আপনাকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে?” উত্তর না পেয়ে জগমোহন বলে।
আচমকা জগমোহনের এই প্রশ্নে জিৎ চমকে ওঠে। মুহুর্ত্তে নিজেকে সামলে নিয়ে পাকা পরিকল্পনাকারীর মত বলে “আসলে, গাড়িটা বিগড়েছে। ভাবছিলাম কাল ফিরবো কেমন করে?”
হেঁসে জগমোহন বলে, “ওহ এই ব্যাপার ! আমার খনিতে অনেকগুলো মেশিন চলে, গাড়ীর মিস্ত্রিও আছে, কাল আপনার গাড়ী ওরাই ঠিক করে দেবে, ওই নিয়ে চিন্তা করবেন না।” একটু থেমে বলে, “দিল্লিতে প্রিয়ার অনেক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হয়েছে, কিন্তু আপনাকে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। “
“না আমাকে আপনি দেখেন নি। আমি যে কিছু বছর বাইরে ছিলাম। “
“ইন্টেরেস্টিং! চাকরী করতে গেছিলেন? তা কোথায় গিয়ে ছিলেন? “
জিৎ মুহূর্তের জন্য বেমালুম ভুলে গেছিলো একটা মিথ্যেকে ঢাকতে আরো একশোটা মিথ্যে বলতে হয়। অবচেতন মনে মুখ ফসকে ‘বাইরে ছিলাম’ বেরিয়ে গেছে। সে মুহুর্ত্তে ভাবে জগমোহনকে দুবাই, ওমান বা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কোনও দেশের কথা বললে এক্ষুনি মিথ্যেটা ধরা পড়ে যাবে। কারণ কোনোটাতেই ও কস্মিনকালে যায় নি। আর জগমোহনের হয়তো বারকয়েক ওই সব দেশ ঘোরা হয়ে গেছে, জিৎ শুধু নাম শুনেছ বা ছবি দেখেছে l সাবধানের মার নেই ভেবে, খুব আস্তে বলে “বর্মা” কারণ ওদেশের কথা কেউ সচরাচর বলে না। ঘুরতে যাবারও তেমন চল নেই ভারতীয়দের মধ্যে ।
জিৎ ভেবেছিল বর্মা বললে বিদেশ নিয়ে আর কথা এগোবে না কিন্তু জিৎকে একেবারে অবাক করে জগমোহনের পাল্টা জবাব, “ওদেশের তো রুবি খুব বিখ্যাত, আপনি কি জেম শিল্পে কাজ করতেন নাকি?”
বর্মা নিয়ে আলোচনায় বেশিদূর এগুতে পারবে না জিৎ তা ভালোমতই জানে। সে পড়েছে মহা বিপদে ‘হ্যাঁ’ বললেই ব্যাটা রত্ন নিয়েই কি জিজ্ঞেস করে বসবে কে জানে? জিতের রত্নর সম্বন্ধে কোনই আইডিয়া নেই। ‘না’ বললেও বিপদ এক্ষুনি উল্টে জিজ্ঞেস করবে তাহলে কি করতেন? জিৎ বুঝেছে এ জ্ঞানপাপীকে যাহোক একটা বলে কাটানো যাবে না। এক্কেবারে ছীনে জোঁক, প্রশ্নর পর প্রশ্ন করে যাবে । শালা এতো জানলো কি করে? এর থেকে ভাল বরং জ্যাকেট থেকে লোহার যন্ত্রটা বের করে একটা ফট, একেবারে চুপ হবে ব্যাটা!
ঠিক সেই মুহুর্ত্তে প্রিয়া ট্রেতে খাবার নিয়ে প্রবেশ করে, “জগ! জিৎ কে একটু খেয়ে নিতে দাও, এই দুর্যোগের মধ্যে অনেক্ষন নিশ্চই কিছু পেটে পড়ে নি?”
প্রিয়ার প্রবেশে জিৎ যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল, “ওঃ সত্যি যা খিদে পেয়েছে কি বলবো? অনেকক্ষন গাড়ির জন্য ….”
“হ্যাঁ জিৎ সরি আপনি খান, আমাদের রাঁধুনের রান্নার হাতটা ভালই, আশা করি এনজয় করবেন ।” জগমোহন হেঁসে বলে l
প্রিয়া খাবারের প্লেট, জল জিৎ এর সামনে টেবিলে রাখে।
চলবে। ……
 (পর্ব ৩)
খাবারের প্লেট রেখে টেবিলে রাখা  কেরোসিনের ল্যাম্পটা জিৎ এর কাছে টেনে রাখতে রাখতে  জগমোহনের দিয়ে চেয়ে প্রিয়া বলে, “জগ! এখন আমি আর জিৎ শুধু কথা বলবো, বুঝতেই পারছো অনেক বছরের অনেক জানার-বলার  আছে আমাদের । ” 
“অবশ্যই!” জগ বলে। 
অনেক্ষন কিছু খাওয়া হয় নি, তার সঙ্গে জগমোহনের ক্রমাগত প্রশ্ন বানে জিৎ একরকম কাহিলই  হয়ে পড়ছিলো।  প্রিয়ার প্রবেশ ও জগমোহনকে চুপ করানোয় ওর  ধড়ে যেন প্রাণ ফিরলো। পেতে প্রচন্ড খিদে থাকলেও সে  প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকায় প্রিয়ার দিকে, ভাবখানা ‘তোমরা খাবে না?’
মুচকি হেঁসে প্রিয়া বলে, “আগে তো আর জানতাম না তুমি আসবে এমন দুর্যোগের রাতে। আমাদের আগেই খাওয়া হয়ে গেছে, তুমি  খাবার গরম থাকতে শুরু কর ।” 
“হ্যাঁ জিৎ, লজ্জা না করে শুরু করুন,” জগ বলে। 
জিৎ খেতে খেতে  প্রিয়ার সাথে ওদের পুরনো দিনের টুকটাক নানা স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকে । কথা বল্লেও জগমোহনের উপস্থিতি কোথায় যেন ওদের দৈত সুরের তালে বাধা হচ্ছিল। সহসা ল্যাম্পের মৃদু আলোতে প্রিয়া লক্ষ্য করে জগ চেয়ারেই  ঘুমে ঢুলছে, ” জগ! তুমি কি শুতে যাবে?”
থতমত জগমোহন বলে, “হ্যাঁ প্রিয়া। জিৎ কিছু মনে করবেন না, ঘুমের ওষুধ খেলেই  কিছুক্ষনের মধ্যে ভীষণ ঘুম পেয়ে যায়। “
জিৎ মনে মনে খুশি হলেও বলে, “নিশ্চই খুব ব্যস্ত দিন গেছে, আপনি বিশ্রাম করুন।”
শুভ রাত্রি বলে জগ তার ছড়ি কাঠের সিঁড়িতে ঠক ঠক করে দোতলায় উঠতে থাকে প্রিয়াও ওর সঙ্গে যায় পথ দেখাতে একটা ল্যাম্প নিয়ে ।
জিৎ এর খাওয়া শেষ, একটা সিগারেট ধরিয়ে সে আরাম করে বসেছে ফায়ারপ্লেসের কাছের একটা চেয়ারে। বাইরে ঝড়-জলের তান্ডব, দমকা হাওয়ায় কেঁপে উঠে কাঁচের জানলার পাল্লাগুলো। থেকে থেকে বিদ্যুতের চমকে মূহুর্ত্তের জন্য সারা ঘর আলোকিত হয়ে ওঠে । 
জগকে ঘরে পৌঁছে কিছুক্ষন পরে  প্রিয়া ফিরে আসে। পরনে তার রাতের পোশাক হালকা লাইলাক রঙের হাউসকোট।  একটা চেয়ার টেনে বসে একেবারে জিৎ এর পাশে, জিৎ এর হাতে ওপর আলতো  নিজের হাতটা রেখে করুন অথচ চাপা অভিযোগের সুরে বলে, “আগে বল হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেলে আমাকে একা ফেলে ?”
প্রিয়ার নরম হাতের ছোঁয়ায় চমকে ওঠে জিৎ, ল্যাম্পের  কাঁপা আলোয় প্রিয়ার মুখের দিকে তাকায়, বোঝার চেষ্টা করে তার কথায় কতটা সত্যি আন্তরিকতা আছে । জিৎ এর বলার আছে অনেক, জীবন তার ভেসে গেছে নদীর স্রোতে অজান্তে অন্যখানে কিন্তু  সেমুহূর্ত্তে সঠিক প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায় না সে, “এমন কিছু দরকারী কাজ  ছিল, হঠাৎই এলো আমাকেও যেতে হল। ফিরে অবশ্যই এসেছিলাম তোমার টানে হয়তো অনেক দেরিতে,  শুনলাম তোমার বিয়ে হয়ে গেছে, বাচ্চাও হয়েছে  । তুমি যখন আমার অপেক্ষাই  করলে না, ইচ্ছে থাকলেও তোমাকে আর বিরক্ত  করতে মন সায় দিল না।  এখন আর ওই নিয়ে ভাবি না।” 
প্রিয়া অনেক্ষন চুপ করে চেয়ে থাকে ফায়ারপ্লেসের অঙ্গারের দিকে, মৃদুস্বরে বলতে থাকে,  “তখন আমার মাথায় অনেক চিন্তা, যা একমাত্র তোমার সঙ্গেই আলোচনা করা যায় অথচ তুমি হঠাৎ গায়েব, তোমার সঙ্গে কিছুতেই দেখা হচ্ছে না, তোমার কোনও খবরও পাচ্ছি না। কাজ থেকে ফেরার পথে রোজ তোমার ওখান দিয়ে ঘুরে আসি, দেখি তালা দেওয়া। হঠাৎ একদিন দেখলাম তোমার দরজায় তালা নেই, ভাবলাম তুমি ফিরে এসেছো। আনন্দে আমার  হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল ছুটে  গিয়ে দরজার কড়া নাড়লাম। আমাকে অবাক করে দরজা খুললো একজন কালো মোটাসোটা দক্ষিণী মহিলা, কোলে তার কয়েক মাসের একটা বাচ্চা । প্রথমে ভাবলাম তোমারই বৌ আর বাচ্চা যাদের  জন্য হয়তো আমাকে তোমার জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছো। তবুও সত্যিটা আমার জানা দরকার কিন্তু সেই মহিলার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আর এক বিপদ।  না সে আমার কথা বোঝে না আমি তার। তোমার নাম তাকে যতবার জিগেস করছি সে কিছুই না বোঝার ভান করে নিজের ভাষায় কি সব বলে চলে। আমার তখন মরিয়া অবস্থা স্পষ্ট সব না জেনে ফিরতেও পারছি না, আমার ধৈর্যের অবসান হল কিছুক্ষন পর একজন মোটা মত দক্ষিণের লোক আসতে, সম্ভবত সে কাজ থেকে ফিরলো। ভাঙা ইংরিজিতে ও হিন্দিতে সে জানালো আগের সপ্তাহে তারা এখানে নতুন ভাড়া এসেছে। মহিলা তারই বৌ, তোমাকে সে একেবারেই চেনে না। সব শুনে সেই মুহুর্ত্তে আনন্দ না হলেও মনে মনে অনেকটা স্বস্তি পেয়েছিলাম। “
একটু থেমে প্রিয়া বলে, “তোমার ওই বড়োলোক বন্ধুটা ।  কি যেন নাম ছিল ?”
“কে প্রমোদ?”
“হ্যাঁ! এমনিতে আমার সঙ্গে সব সময় সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করত। পাত্তা দিতাম না।  তুমি উধাও হলে আর ওর গতিবিধি বেড়ে গেল, সবসময় আমার পেছনে লেগে থাকত।  ওর কাছে তোমার  খোঁজ জানতে চাইলেই বলতো তোমাকে ভুলে যেতে, তুমি নাকি ডাকাতি কেসে ধরা পড়েছো বহু বছর হাজতবাস করতে হবে। তোমার সঙ্গে জেলে দেখা করাতে  নিয়ে যাবার নাম করে আমার সঙ্গে জবরদস্তীর চেষ্টা করতেও হারামজাদাটা  ছাড়ে নি। কোনো রকমে পালিয়ে নিজেকে বাঁচাই।  এরপরেও আমার পিছু নিয়েছে অনেকবার।”
প্রিয়ার কথা শুনতে শুনতে জিৎ এর চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। 
জিৎ এর গম্ভীর মুখ দেখে কথা ঘোরাতে প্রিয়া বলে, “যাক ছাড় ওর কথা। তোমার কথা বলো। বিয়ে নিশ্চই করেছো? কেমন হয়েছে বৌ? ছেলেপুলে কটা?”
জিৎ ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে, খুব নিচু স্বরে বলে, “না ওগুলোর কোনটাই করা হয় নি গো । জীবন আমাকে ওসবের থেকে অনেক দূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।” 
“তোমার কথা মনে হলেই ভাবতাম, পৃথিবীর কোনো এক কোনে হয়তো তুমি ভালোই আছ।  সুখে ঘর সংসার করছো।” 
“জগমোহনের অনেক ধন ও প্রতিপত্তি। নিশ্চিন্ত প্রাচুর্যের মধ্যে রেখেছে তোমাকে। নিশ্চই তুমি খুব সুখে আছ?”
প্রিয়ার স্বাস রুদ্ধ কণ্ঠে বলে “জিৎ, ঠিক যেমন নদীর এপাড়ে দাঁড়িয়ে ওপারটাকে ভীষণ সুন্দর মনে হয়। বাইরে থেকে দেখা অনেক অনুমানই  ভুল হয়।”
জিৎ অনুভব করে প্রিয়া ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরেছে নিজের হাতে । তাকিয়ে দেখে প্রিয়ার চোখে টলটল জল, আবেগের প্রবাহে ওর  মাথা কখন রেখেছে  জিৎ এর কাঁধে । 
অজান্তে জিৎ এর একটা হাত প্রিয়াকে স্বান্তনা দিতে ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে, “তুমি নিজের ইচ্ছাতেই তো জগকে বিয়ে করেছ?”
“ওই মুহুর্ত্তে আর কোনো উপায় আমার সামনে খোলা ছিল না গো, বাধ্য হয়েই জীবনের সঙ্গে আপোষ করেছি। “
অবাক জিৎ, “তার মানে?”
 (পর্ব ৪)
এক তীব্র বিদ্যুতের ঝলকানিতে ডাইনিং রুমটা প্রায় দিনের মত আলোকিত হয়ে ওঠে। তীব্র ওই রশ্মিতে প্রিয়া থতমত খেয়ে জিৎ এর থেকে সরে সোজা হয়ে বসে। মুহুর্ত্তের আবেগে ভেসে যাবার  লজ্জায় মুখ নিচু করে বসে থাকে। ঘরে একটা থমথমে অস্বস্তিকর নীরবতা, যা ভাঙ্গে প্রিয়ার  চাপা আবেগ মিশ্রিত কণ্ঠে, “জান জিৎ, একটা বয়সে ভবিষ্যতের অনেক রঙিন স্বপ্ন সকলেই দেখে আমিও দেখতাম। ভালো নার্স হব, একটা সুন্দর স্বামী হবে যে আমাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসবে, বুঝবে, সর্বদা পাশে থাকবে। একটা ছোট্ট হোক সুন্দর আমাদের নীড় হবে, স্বামী সন্তান কে নিয়ে সুখে থাকব সেখানে, কিন্তু…..”
প্রিয়ার কথা শেষ হবার আগেই জিৎ বলে, “এসবই  তুমি পেয়েছ, তাহলে এখন  অভিযোগ কিসের?” 
“আগেই বলেছি দূর থেকে সবই খুব সুন্দর দেখায়।  আমার বিয়েটা একটা সমঝোতা, একটা চুক্তি, বাইরের জগৎকে দেখানোর জন্য ।”
“তোমার কথা কিছুই বুঝছি না,” জিৎ অবাক হয়ে বলে। 
“তোমার সঙ্গে জগের বিয়ে হল কেমন করে? খুব কৌতহল হচ্ছে জানতে, তোমার পছন্দে? নাকি তোমার মামার করা সম্বন্ধ?”
 আড়চোখে জিৎকে দেখে, কিছুক্ষন চুপ করে থেকে প্রিয়া বলে, “তুমি হঠাৎ উধাও হলে তার ঠিক পরেই নার্সিং হোম থেকে আমাকে পাঠালো একজন বয়স্কা মহিলা, কুসুমদেবীর, দেখভাল করতে। স্ট্রোকের পর ওনার একদিক প্যারালিসিস তার সঙ্গে প্রেসার, সুগার, ইন্সুলিন তো আছেই। দুদিন যাবার পরেই আমার কর্ম্মে নিষ্টা, দক্ষতা ও মনোযোগের জন্য উনি নার্সিংহোমকে বললেন আমাকেই পাকাপাকি রাখতে চান। বাড়ির কিছুটা কাছে, টাকাপয়সাও বেশী তাই রাজী হয়ে গেলাম। ওনার শুশ্রুষাকারীর কাজ করে অল্পদিনেই  বাড়ির একজনই হয়ে গেছিলাম। কুসুমদেবী, দাপুটে মহিলা হলেও আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। প্রায়ই আমার সঙ্গে নানা পারিবারিক বিষয়ে গল্প করতেন।  একদিন হঠাৎ আমার মাথা ঘুরে গিয়ে বার বার বমি। ভাবলাম বদহজম বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম করলে ঠিক হয়ে যাব। কুসুমদেবী  আমাকে শরীর খারাপ নিয়ে কিছুতেই বাড়ি যেতে দিলেন না, ওনার হুকুমে বাড়িতে তক্ষুনি ডাক্তার এল, আমাকে পরীক্ষা করে ডাক্তার বললেন আমি গর্ভবতী।  শুনে মাথায় বাজ ভাঙার মত অবস্থা আমার তখন । ওরা জানতো আমি অবিবাহিত, এখন কি ভাববে? আমি দুশ্চরিত্রা? হয়ত কাজ থেকেই তাড়িয়ে দেবে। মামাকে কি বলবো? নিজেকে ভীষণ এক মনে হচ্ছিল, অজানা ভবিষতের ভয়ে থর থর করে কাঁপছি। ডাক্তার চলে গেলে উনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। ভাবলাম আজই আমার কাজ থেকে ছুটির ঘোষণা শোনাবেন কুসুমদেবী। দুরু দুরু বুকে গিয়ে দাঁড়ালাম ওনার সামনে, কিন্তু আমাকে অবাক করে কাছে ডেকে বসলেন উনি। স্বস্নেহে বললেন প্রেম করেছো বুঝেছি আজকাল এমন হতেই পারে তা বাচ্চার বাবা কোথায়? কেঁদে ফেললাম বললাম জানি না। কিছুক্ষন ভেবে জিজ্ঞেস করলেন  আমার কি ইচ্ছে, বাচ্চাটাকে জন্ম দেবার নাকি গর্ভপাত? সেই মুহূর্তে আমার মাথা কাজ করছে  না, নিজের বলতে মামা-মামী, তাদেরই বা  কি বলব? শুনে তারাই হয়তো আমাকে তাড়িয়ে দেবে। কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলাম।”
” তারপর কি হলো? বাচ্চার বাবাকে খুঁজে পেলে?” 
জিৎ এর প্রশ্নের কোন  উত্তর না দিয়ে প্রিয়া বলে, “কুসুমদেবী আমাকে তাড়ান নি বরং সর্বদা ভালো ব্যবহার করেছেন । বাচ্চার বাবাকে হন্নে হয়ে  খুঁজে যখন হাল ছাড়লাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার মুখ বিষন্ন চোখে জল, কুসুমদেবী আমার থেকে সব শুনে কিছুক্ষন ভেবে বললেন ভাবছো বাচ্চাটার পিতৃ পরিচয় কি দেবে দুনিয়াকে? আমি তার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। চমকে উঠলাম ওনার কথায়।  উনি বললেন আমারও কিছু শর্ত আছে, তুমি হবে আমার একমাত্র পুত্র জগমোহনের বৌ, কিন্তু ওর ব্যক্তিগত ব্যাপারে তুমি নাক গলাতে পারবে না।  দুনিয়াকে বলতে হবে আমার ছেলেই এই বাচ্চার পিতা, এর বদলে তুমি পাবে এই পরিবারের পুত্রবধূর মর্যাদা, তোমার বাচ্চা হবে এই পরিবারের উত্তরাধিকারী। সেই মুহুর্ত্তে এর থেকে আর ভালো কোন উপায় খুঁজে না পেয়ে ওনার  শর্ত মেনে নিলাম, অল্পদিনের মধ্যে হলাম জগমোহনের স্ত্রী। পরে জানতে পারলাম জগের আগে দুবার বিয়ে হয়েছিল কোনোটাই ছ  মাসের বেশি টেঁকে নি। স্ত্রীরাই ওকে ছেড়ে চলে গেছে আর সমাজে  নিজেদের মুখ বাঁচাতে অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে দুজন স্ত্রীকেই। “
“জগমোহনের ব্যক্তিগত ব্যাপার স্ত্রী হিসেবেও জানতে পারবে না? কিন্তু কেন? ওর  কি খারাপ কোনও নেশা আছে? মানে অন্য মহিলা…”
“জঘন্ন! এব্যাপারে কথা বলতে আমার রুচিতে বাধে।” একটু চুপ করে থেকে ম্লান হেঁসে প্রিয়া বলে, “কিন্তু জিৎ তুমি তো একবারও জানতে চাইলে না আমার ছেলের কথা? ভাবছিলে জগমোহনের ছেলের কথা জেনে কি হবে? “
তথমত খেয়ে জিৎ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে “না তা ঠিক নয়, আসলে সামনে দেখছি না তো তাই মাথায়ও আসে নি?”
চেয়ার ছেড়ে উঠে প্রিয়া বলে, “চলো গেস্ট রুমটা তোমাকে দেখিয়ে দি, রাত অনেক হল, আমার কথা তো অনেক শুনলে এখনও জানি না  তুমি কি কর এখন? এদিকেই বা আজ এই ঝড়জলের রাতে কি করছিলে?”
প্রিয়ার হঠাৎ প্রশ্নে একটু বিভ্রান্ত হলেও মুহুর্ত্তে সামলে জিৎ বলে, “আমি ইন্সুরেন্সের সার্ভেয়ার, জলবিদ্যুত প্রকল্পের মেশিনগুলো ইন্সপেক্ট করতে এসেছিলাম। “
প্রিয়া অবাক হয়ে বলে, “শনিবারে? জগের মুখে শুনেছি ওই প্রকল্পে শনি রবি দুদিনই  ছুটি থাকে। “
 (পর্ব ৫)
এতো বছরে জিৎ ভুলেই গেছিল প্রিয়ার বুদ্ধিমত্তা ও স্মৃতিশক্তি, বাড়িতে থাকলেও আশেপাশের সব খবরই ওর নখদর্পনে । প্রসঙ্গ ঘোরাতে জিৎ চট করে জিজ্ঞেস করে, “আচ্ছা জগ কি বরাবরই অমন ছড়ি নিয়ে হাঁটে?”
“না, গত এক বছরে জগের বেশ ক’বার এক্সিডেন্ট হয়েছে, প্রত্যেকটাতেই ওর প্রাণ যেতে পারতো। জানি না এগুলো নিছক এক্সিডেন্ট নাকি ওকে প্রাণে মারার কোনো চক্রান্ত। মাস চারেক আগে লরির ধাক্কায় ওর গাড়ি উল্টে যায় তাতে জগের পা ভাঙে।”
অন্ধকার বাংলোয় কাঁচে ঢাকা কেরোসিনের ল্যাম্প হাতে আগে আগে প্রিয়া চলেছে জিৎকে নিয়ে গেস্টরুমের দিকে। পেছন থেকে ওকে দেখে জিৎ এর মনে হয় প্রিয়া আজও সেই একই রকম সুন্দরী মোহময়ী যেমনটা সে ছিল দশ বছর আগে। আবেকের ঢেউ বার বার আছড়ে পড়ে জিৎ এর মনের পাড়ে । নিস্তব্ধ নির্জন বাংলোতে প্রিয়াকে অনুসরণ করতে করতে বার বার ওর মনে হয় প্রিয়াকে পেছন থেকে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরতে। বার বার মনের কোন উঁকি দেয় ওদের মধুর সেই মুহূর্তগুলোর কথা। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে সে অনুসরণ করে চলে প্রিয়াকে।
পরিচয় গোপন রাখতে ওদের পেশায় কাজ প্রদানকারী বা নির্বাহক কেউই নিজের আসল পরিচয় জানাতে চায় না। জগমোহনকে জিৎ শুধু জানতো একটা টার্গেট হিসেবে। ওর দিল্লীর বাড়ির ঠিকানা, এই বাংলোর সন্ধান ছাড়া পেয়েছিল ওর একটা ছবি। অপরাধ জগতে কাজটার কথা চালাচালি হলেও ঝুলে ছিল তিন চার সপ্তাহ। তাতেই জিৎ এর সন্দেহ হয় নিশ্চয় বেশ বড় সড়ো মাছ। একটু খোঁজ খবর নিয়েই বুঝে যায় এই কাজ করে মোটা টাকা কামিয়ে একেবারে বহু দূরে, হয়তো কোনোদিনও এদিকে আসাই যাবে না । প্লানও ছকে ফেলে জগমোহনকে মারার তখন একবারের জন্য মনে হয় নি জগ এর স্ত্রীর কথা। প্রিয়াকে এখানে এসে দেখবে কোন দুঃস্বপ্নেও ভাবে নি। জগ এই মুহুর্ত্তে ওর কাছে ব্যাতিক্রম টার্গেট, ওর ব্যাপারে জানার আগ্রহ জিৎ এর বেড়ে গেছে কারণ প্রিয়াও যুক্ত ওর জীবনের সঙ্গে, “কে ওকে প্রাণে মারতে চাইবে? কাকে সন্দেহ কর তুমি?”
গেস্টরুমে খাট, কাঠের আলমারি, টেবিল ও দুটো চেয়ার। টেবিলে মোমবাতিটা রেখে প্রিয়া চেয়ারে বসে বলে, “জগের প্রথম স্ত্রী অল্পদিনেই ওকে ছেড়ে চলে যায়। কুসুমদেবী তাকে মোটা টাকা দেয় যাতে ডিভোর্সের ব্যাপারে সে সমাজে নিজের মুখ বন্ধ রাখে। কুসুমদেবী বংশের উত্তরাধিকারীর আশায় জগের আবার বিয়ে দেন। ভাবছো মা বিয়ে দিচ্ছেন আর জগ বাধ্য ছেলের মত করে যাচ্ছে, কেন? কারণ মায়ের হাতেই তখন ছিল সম্পত্তির চাবি। দূরসম্পর্কের এক ভাই সারাদিন থাকতো ওদের বাড়িতে, সে খুব চেষ্টা করতো কুসুমদেবীকে জগের নামে কান ভাঙ্গানোর। জগের দ্বিতীয় স্ত্রীকে সে বশে করে নেয় আর দুজনে মিলে দিব্যি মোটা টাকা সরাচ্ছিল । একদিন ওদের চুরি ধরা পরে যায়, কুসুমদেবী জগের সঙ্গে ডিভোর্স দিয়ে ওর স্ত্রীকে বিদেয় করেন, দারোয়ানদের আদেশ দেন ওই ভাইকে আর বাড়িতে ঢুকতে না দিতে।”
প্রিযার দিকে নিজের চেয়ারটা একটু টেনে নিয়ে মৃদু গলায় জিৎ জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা ওরা দুজন কি পরে বিয়ে করে?”
জিৎ এর প্রশ্নে চমকে ওঠে প্রিয়া, “তুমি জানলে কেমন করে? ওদের চেনো নাকি?”
“না! তোমার কথায় আন্দাজ করলাম, এক্ষুনি বললে না দুজনে একসঙ্গে চুরি করতো l”
“তুমি জান না ওদের। দুজনেই সাংঘাতিক! সব করতে পারে। জগমোহনের কিছু ছবি ছিল ওদের কাছে যেগুলো দেখিয়ে ওকে ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছিল দীর্ঘ দিন ধরে । লজ্জায় জগ কাউকে না জানিয়ে টাকা দিয়ে যাচ্ছিলো। আমি ব্যাপারটা জানার পর শ্বাশুড়ীকে জানাই, তখনকার পুলিশ কমিশনার ছিলেন ওনার খুবই পরিচিত, কারণ স্বশুর ছিলেন বড় ব্যাবসায়ী, তার সঙ্গে রাজনীতিও করতেন। কমিশনারের তৎপরতায় সব ছবি নেগেটিভ দু দিনের মধ্যে আমাদের কাছে চলে আসে। অবশ্য শ্বাশুড়িও পরে আর মোকদ্দমা করেন নি।”
“তারপর?”
জিৎ এর প্রশ্নে একটু থেমে প্রিয়া বলে, “কাঠের ব্যবসা ওদের অনেক পুরোনো, জগকে বিশেষ দেখতে হয় না। তখন জগ সবে এই খাদানের কাজ শুরু করেছে, একজন বিশ্বস্ত লোকের খুব দরকার নাহলে জগকেই ৮-৯ মাস থাকতে হচ্ছে এখানে । শাশুড়ি মারা যাবার পর দিল্লির বাড়িতে একদিন ওর ভাই এলো জগের পা ধরে অনেক ক্ষমা কান্না ‘একটা কাজ দাও দাদা নাহলে না খেয়ে মরবো’ সে এক তামাশার দৃশ্য। সব ভুলে সমবেদনা দেখিয়ে আমার আপত্তি সত্ত্বেও জগ ওকে খাদানের ম্যানেজার পদে নিযুক্ত করল। জানতো জিৎ কুকুরের লেজ আর মানুষের স্বভাব……, বছর ঘুরতেই ও নিজের পরিচয় দিতে শুরু করে দিল, এক্কেবারে পুকুর চুরি। বছর খানেক আগে জগ ওকে হাতে নাতে ধরে ফেলে তাড়িয়ে দেয় খাদান থেকে। আন্দাজ কয়েক কোটি চুরি করেছে ক’বছরে , দিল্লীতে নিজের বিশাল বাড়ি, গাজিয়াবাদে ফার্মহাউস, বেশ কটা দামী গাড়ী সবই করেছে । ওকে তাড়ানোর পর থেকেই জগমোহনের ওপর একটার পর একটা ফাঁড়া চলেছে।”
জিৎ এর জানা থাকলেও প্রিয়াকে জিজ্ঞেস করে “ওর ভাইয়ের নাম কি ?”
“সুকদেব আর ওর স্ত্রীর নাম বিন্দিয়া।”
“তাহলে বিন্দিয়াই জগের দ্বিতীয় স্ত্রী?”
“ঠিক”
“আমাদের কথাবাত্রায় জগের ঘুমের ব্যাঘাত হবে না তো?”
হেঁসে প্রিয়া বলে, “ঘুমের ওষুধ খেলে জগ একেবারে কুম্ভকর্ণ, কাল সকাল ৮টার আগে ভূমিকম্প হলেও ওর ঘুম ভাঙবে না l”
“কি এমন ছবি ওদের কাছে ছিল যা দিয়ে জগকে ব্ল্যাকমেল করত?”
একটা দীর্ঘ-নিঃস্বাস নিয়ে প্রিয়া বলে, “জগের মহিলাতে কোনো আকর্ষণই নেই, ও সমকামী। দিল্লীর বাড়িতে একটা ১৬-১৭ বছরের চাকরের সঙ্গে জগমোহনের সম্পর্ক ছিল। সুকদেব আর বিন্দিয়া সবই জানতো কখন জগের অজান্তে ওর ছবি লুকিয়ে তুলে রেখেছিল । ভাবলেই আমার গা ঘিন ঘিন করে।”
“তাহলে তোমার সঙ্গে?”
“আমাদের মধ্যে কোনও শারীরিক সম্পর্ক নেই। আমাদের বেডরুমও আলাদা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *