Chuti – Bengali Story – Bengali Novel

 (পর্ব ১)

শুভ ও জয়া সপ্তাহন্তের ছুটি কাটাতে এসেছে শংকরপুরে । প্রায় সমবয়সী দুজনেরই বয়স এখন প্রায় তিরিশ ছুঁই ছুঁই। একই পাড়াতে বসবাস করলেও ওদের প্রথম আলাপ কিন্তু কলেজস্ট্রিটের কফি হাউসে পরিচিত এক বন্ধুর মাধ্যমে। এর পর থেকে গাড়িয়াহাটে প্রায়ই দেখা হত দুজনের, কারণ শুভ সিটি কলেজে পড়তো কমার্স নিয়ে আর জয়া আর্টস নিয়ে মুরলীধরে। ওদের বন্ধুত্ব সময়ের সাথে গাঢ় হতে থাকে। দুজনের প্রেম কাহিনী অবশ্য খুব সহজ ছিল না। জয়ারা গোঁড়া ব্রাহ্মণ, কায়স্ত জামাইয়ে প্রচন্ড আপত্তি ছিল ওদের বাড়িতে। আপত্তি না থাকলেও শুভর মায়ের স্পষ্ট কথা, “তোমরা একে অপরকে পছন্দ কর ভালো কথা, তোমাদের বিয়েতেও আমার কোনও অসুবিদে নেই, কিন্তু  জয়ার মা বাবার অমতে দুজনের পালিয়ে বিয়ে, চলবে না।”

স্নাতকোত্তর মানাজেমেন্টের পাঠ শেষ করে শুভ একটা বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চপদে কর্মরত। স্কুল কলেজে একদা ঢেঙ্গা একহারা তামাটে চেহারায় এখন স্থানে স্থানে মেদ জমতে শুরু করলেও পাজামা পাঞ্জাবিতে তাকে আজও আকর্ষণীয়  লাগে। ফর্সা মিষ্টি জয়া বয়সের সাথে আরো সুন্দরী হয়েছে, সকলে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে ওর দিকে, সে পাড়ার রাস্তায়, শপিং মল, এমনকি স্কুলে ওর ক্লাসের ছাত্ররাও।

হোটেলের বাগানে সবুজ ঘাসের ওপরে টেবিল  চেয়ার পেতে ডিনারের ব্যবস্থা। জায়গায় জায়গায় আলো থাকলেও ডিনারের জায়গাটায় একটা আলো আঁধারির পরিবেশ।

“আপনার পাঞ্জাবীটা তো ভারী সুন্দর, পাঞ্জাবী হাউসের নাকি?” ডিনারের সময় পাশের খানিক ছায়াঢাকা টেবিল থেকে মধ্য বয়স্ক অচেনা ব্যক্তির প্রশ্নে প্রথমে শুভ-জয়া দুজনে চমকে উঠলেও মুহূর্তে সামলে নিয়ে শুভ বলে, “জন্মদিনে স্ত্রী ভাগ্যে প্রাপ্তি, কোথা থেকে বা দাম জিজ্ঞেস করা বারণ।”

এই ভাবেই শুভ ও জয়ার সঙ্গে আলাপের সূত্রপাত গাঙ্গুলী দম্পতি মলয় ও অরুণার। মলয়ের  সঙ্গে মানুষের ভাব জমতে সময় লাগে না বিশেষ করে, তার মজাদার গল্প  মানুষকে চটপট  আকর্ষিত করে তার দিকে। শুভ-জয়ারও আপনি থেকে তুমি সম্মোধন বা মলয়দা ও বৌদি ডাকতে বেশিক্ষণ  সময় লাগে নি।

আগেকার লোকে বলতো যার তার সঙ্গে পথে ঘাটে আলাপ করবে না, বিশেষ করে গায়ে পড়া লোককে এক্কেবারে এড়িয়ে চলবে।  অচেনা কেই কিছু দিলে খাবে না, কোথায় নিয়ে যেতে চাইলে যাবে না। সমাজে থাকতে গেলে এই সব  কি পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে চলা যায়? শিক্ষার আলো আলোকিত, আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত, কুসংস্কার মুক্ত শুভ আর জয়া কি তখন একবারও ভেবেছিল এই পরিচয়ই ওদের কাল হবে?

বছর পঞ্চান্নর ছফুটের মজবুত চেহারার, টাক মাথা, মোটা কালো ফ্রামের চশমায়, মলয়দাকে প্রথম দেখলে মনে হয় বুঝি পুলিশে চাকরী করেন। পরিচয়ে জানা যায় আসলে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিছু বছর হল সরকারি চাকরি ছেড়ে নির্মাণ শিল্পে কন্সালটেন্সির অপিস খুলেছেন। অরুণা বৌদির মুখে সবসময় একটা মিষ্টি হাসি লেগে আছে, উচ্চতা ফুট পাঁচেক, একসময়ের লম্বা চুল আজ কাঁধ পর্যন্ত, হাসলে দুগালে টোল পড়ে ।

“তা তোমাদের বিয়ে কত বছর হলো?” অরুণা বৌদির প্রশ্নে জয়ার উত্তর “সবে এক বছর হল।”

“সবে এক বছর? তাই শুভর মাথায় এতো চুল। আমার অর্ধেক মাথার চুল শশুরকে বিয়েতে রাজি করাতে আর বাকি তিরিশ বছর দাম্পত্তের ভারে ফাঁকা হয়ে গেছে।”

“চুপ কর, বেশি বোকো না। তোমাদেরতো টাকের গুষ্টী, তোমার ঠাকুরদা,বাবা, কাকা, কার মাথায় দুর্ব্ব ঘাসের মতোও চুল আছে?” মলয়দার কথা শেষ না হতেই বৌদির আপত্তিসূচক উত্তর।

শুভ ও জয়া হা হা করে হেসে ওঠে, মলয়দা দমার পাত্র নন নিম্ন সুরে বলেন, “দাম্পত্য ভাগ্য আমাদের পরিবারিক টাকের কারণ।”

“তোমাদের কি বাড়ির থেকে ঠিক করে বিয়ে নাকি নিজেরাই একে অপরকে পছন্দ করেছ?”

অরুণা বৌদির প্রশ্নের উত্তরে জয়া আর  শুভ বলে কি ভাবে তাদের আলাপ, কলেজের দিনগুলোর কথা, দু পরিবারের আপত্তির কথা ও অবশেষে তাদের বিয়ের গল্প ।

“তোমাদের মত একই পাড়ায় থাকলে আমি কলেজে জীবনেই বিয়েটা সেরে ফেলতাম।” মলয়দা হেঁসে বলেন।

“তুমি স্কুলেই বিয়ে পাস করে ফেলতে। কলেজ অব্দী যেতেই হত না,” বৌদির হেসে উত্তর।

“বৌদি বল না তোমাদের কি ভাবে বিয়ে হল।” জয়া আবদারের সুরে বলে।

অরুনাবৌদি বলেন, “সে এক ইতিহাস! আমার বাবার  ছিল রেলে চাকরি, পোস্টিং কাটনিতে।  উচ্চ মাধ্যমিকের পরে ওখানে তেমন পড়ার সুবিধা না থাকায় কলকাতায় রামমোহন কলেজে ভর্তি করে দিলেন। থাকতাম হাতিবাগানের কাছে বড় মাসির বাড়িতে।  মাসির বাড়ির উল্টোদিকে মলয়ের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় থাকতেন।  আমি জানিও না কবে ওখানে এসে আমাকে দেখে ওর ভালো লেগেছিল ।  এর পরে নাকি প্রায়ই  ওই আত্মীয়ের  বাড়িতে  হাতিবাগান হাটের ছুতোয় হানা দিত। আমার বড় মেসোর আবার ফুল গাছের খুব শখ ছিল, হাতিবাগান হাটেও যেতেন প্রায়ই । হঠাৎ এক রবিবার সকালে মলয়কে সঙ্গে করে হাট থেকে ফিরলেন। চা বিস্কুট পৌঁছনোর ভার পড়লো আমার ওপরে। ব্যাস ওই এক মিনিটের ভিতরে আমার নাম, কোন কলেজে পড়ি, কখন ছুটি হয় সব জেনে নিলো।  আমিও বোকার মতো গড় গড় করে সব বলে দিলাম। তারপর আর কি? পরেরদিন কলেজ থেকে  বাড়ির দিকে পা বাড়িয়েছি হঠাৎ দেখি সামনে মূর্তিমান দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেমাত্র  আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে।  একগাল হেসে আমার দিকে একটা ঠোঙা বাড়িয়ে দিয়ে বললো, সোনপাপড়ি দিয়ে মুড়ি, খেয়ে দেখ, দারুন লাগবে ।  আগে কোনোদিনও জানতাম  না কলেজের পাশেই একটা সোনপাপড়ির কারখানা আছে ।”

শুনে জয়া বলে, “হাউ সুইট, একেবারে মিষ্টিমুখ দিয়ে শুরু, তারপর কি হল বল, মনে হচ্ছে খুবই ইন্টেরেস্টিং,”

“মলয় যেখানে সেখানে মজার কিছু যে হবেই এতো বলাই বাহুল্য,” একগাল হেঁসে অরুণা বৌদি বলেন।

(পর্ব ২)

জয়ার আবদারে অরুণা বৌদি তার ও মলয়দার গল্প বলতে থাকে, “আমি সত্যি খুব ভালো মেয়ে ছিলাম, আজকালকার মেয়েদের যা দেখি কলেজের নাম করে বিশ্ব ব্রম্মান্ড চোষে বেড়ায়। কলেজ কাট মারা কি জানতামই না। সব শিখেছি মলয়ের দৌলতে। আমার সকালে ক্লাস, কলেজে ঢোকার মুখে একদিন আমাকে প্রায় কিডন্যাপ করে সোজা ভিক্টোরিয়ায় নিয়ে উপস্থিত, সেদিন সক্কালবেলায় ওনার খুব প্রেমালাপ করতে ইচ্ছে হয়েছে । ভিক্টোরিয়াতে চারিদিকে শুধু বয়স্ক লোকেরা প্রাতঃভ্রমনে ব্যস্ত । কেউ কেউ আড় চোখে আমাদের দেখছে, ভাবখানা আর কয়েক ঘন্টা সবুর হচ্ছে না? আমার কি ভয়! এই বুঝি মেসোর কোনো পরিচিত আমাকে দেখে ফেল্লো। এখন ভাবলে হাসি পায় তখন কি ভীতু আর বোকা ছিলাম।”
“তোমার সাহস বাড়িয়ে তোমাকে কত এডভান্স করেছি সেটা বল?” মলয়দার মুখে বড়াইয়ের হাঁসি ।
“বেশি সাহস ভালো নয় তা তো সেদিনই বুঝেছিলে?” অরুণা বৌদি বলেন।
মলয়দাকে চুপ করে যেতে জয়া জিজ্ঞেস করে, “ভিক্টোরিয়াতে আবার কি বিপদ হয়েছিল?”
“তেমন কিছু নয়, পরে শুনো,” মলয়দা বলে।
যে টেবিলগুলোতে লোকে বসে খাচ্ছে সেগুলোতে একটা করে মৃদু বাতি জ্বলছে, শুধু মলয়দাদের টেবিলে কোনো আলো নেই।
“মলয়দা আপনাদের এখনো খাবার দিয়ে যাই নি? টেবিলের আলোটাও নেভানো, বেয়ারাটাকে একটা আওয়াজ দিই ।” শুভ হঠাৎ খেয়াল করে ।
“তার দরকার নেই। তোমরা আসার আগেই আমাদের ডিনার হয়ে গেছে। অন্ধকারে আমাদের বেশ রোমান্টিকই লাগছে ।”
জয়া হেসে বলে, “বৌদি মলয়দা আজও কি রোমান্টিক। “
“আমাদের কি অনেক বয়স হয়ে গেছে?” মলয়দা হেঁসে বলে।
বৌদি বলেন, “জান জয়া যাদের সদ্য বিয়ে হয়েছে তাদের গল্প শুনতে খুব ভালো লাগে। মনে পড়ে যায় আমাদের ফেলে আসা সেই মধুর দিনগুলোর কথা। ছোট বেলা থেকে বাবাকে দেখেছি খুব গম্ভীর, তাই খুব ভয় পেতাম বাবাকে। যা কিছু আবদার মার কাছে, উনি বাবাকে সবেতে রাজি করাতেন। একমাসের গরমের ছুটি, মনে ইচ্ছে না থাকলেও বাবা-মার কাছে কাটেনিতে যেতেই হবে। বাবা টেলিগ্রামে জানিয়েছেন দুদিনের মধ্যে আসছেন আমাকে নিয়ে যেতে । আমার আরেক ভয় মলয়ের চিঠি বাবার হাতে পড়লেই নির্ঘাত কলকাতায় পড়াশোনার পাঠ বন্ধ হয়ে যাবে। মলয়ের শতধিক অনুরোধ সত্ত্বেও কাটনির ঠিকানা ওকে কিছুতেই দিই নি। অবশ্য পৌঁছেই মলয়কে চিঠি দিলাম, তোমার জন্য ভীষণ মন খারাপ, ইত্যাদি, শুধু ইচ্ছে করেই দিলাম না কাটনির ঠিকানাটা ।
একদিন সন্ধ্যেবেলা কাটনিতে মায়ের সাথে কলকাতার গল্প করছি, ভাবছিলাম সাহস করে মলয়ের কথাটা বলবো নাকি মাকে? ইতিমধ্যে বাবা অপিস থেকে ফিরে সোজা এসে আমাকে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “অরুণা মলয় বলে কাউকে চেন নাকি?”
আমার মাথায় বজ্রপাত, হাত পা ঠান্ডা হয়ে কাঁপতে শুরু করেছে, হ্যাঁ বা না কিছুই মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না। ভাবছি বাবা মলয়ের কথা জানলো কি করে?
মা তো আরও অবাক, “মলয়টা আবার কে?”
অবস্থা দেখে বাবা মুচকি হেসে বললেন, “অত আমতা আমতা করার কি আছে? চেনতো ভালোই, ছেলেটির সাহস আছে, ইঞ্জিনীর সৎ সাহস আছে, সোজা এসেছে আমার কাছে, আমারতো বেশ লেগেছে। তোমার জন্য এতো দূরে দৌড়ে এসেছে, যাও দেখা করে এসো বাইরের ঘরে বসিয়েছি।”
আমার নিজের কানে শোনা কথাগুলো কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না, আবার মলয়কে দেখার আনন্দে বুকের ধুকধুক বেড়ে গেছে দৌড়ে গেলাম, বসার ঘরে দেখি হাসি মুখে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করলাম কি করে ঠিকানা পেলে? উত্তর পেলাম, ‘জোগাড় করতে জানতে হয়’। পরে জেনেছিলাম মাসতুতো দাদার সাথে আলাপ জমিয়ে ঠিকানা হাতিয়েছিলো। ওর বাবার এক বন্ধু ডালমিয়া রিফ্র্যাক্টরীতে চাকরি করতেন তার ওখানেই উঠেছিল । যে ৩/৪ দিন মলয় কাটনিতে ছিল রোজ রাতেই আমাদের বাড়িতে ভুরিভোজের ব্যবস্থা। বিদায় নেবার সময় বাবা শুধু বললেন, “মলয় আমার একটা অনুরোধ, অরুণার এবছরই ফাইনাল ইয়ার ওর পড়ায় যেন কোনরকম বিঘ্ন না ঘটে, ওকে ভালো করে পাস করতে দিও। পরীক্ষার হয়ে গেলে, আমি ওর মাকে নিয়ে অবশ্যই যাবো তোমাদের বাড়িতে বাকি সব কিছু পাকা করতে ।”
ব্যাস, দেখতে দেখতে পরীক্ষা দিলাম, স্নাতক হলাম বিয়েও হল। বিয়ের কমাস আগেই মলয়ের বদলি হয় জলপাইগুড়িতে, তাই মাত্র ১০ দিনের ছুটি নিয়ে এলো কলকাতায় বিয়ে করতে। চটজলদি মধুচন্দ্রিমা শঙ্করপুরে, প্রথমবার এসেই ভীষণ ভালো লেগে গেল। সেই থেকে যখনি সুযোগ পাই দুজনে চলে আসি এখানে।”
“আমাদের এই প্রথমবার হলেও বেশ লাগছে শঙ্করপুরের শান্ত সুন্দর সমুদ্র সৈকত।” শুভ বলে।
“আমারও। পাশে দীঘাতে যা গ্যাঞ্জাম, বেড়াতে এসেও লোকের ভিড়, মোটেই ভালো লাগে না, ” জয়া সায় দেয়।
“ঠিক বলেছ! আগে দার্জিলিং ভাল লাগলেও এখন ম্যালে গেলেই মনে হয় যেন সোমবার সকালের শিয়ালদহ স্টেশন।” মলয়দা বলেন।
শুভ বলে, “যা বলেছেন,” সকলে হেসে উঠে।
গল্প করতে করতে শুভ জয়ার ডিনার সবে শেষ হয়েছে।
“এই চলোনা হেঁটে সমুদ্রের দিকটা একটু ঘুরে আসি?” অরুণা বৌদি বলেন।
“ওদের যদি অন্ধকারে হাঁটতে ইচ্ছে না করে? এখানকার রাস্তায় তো কলকাতার মত আলো নেই, ” মলয়দা বলেন।
“আমার অন্ধকারে হাঁটায় অসুবিধে নেই,” শুভ বলে।
জয়া বৌদির দিকে তাকিয়ে বলে, “যেতে পারি যদি আপনার গল্প চালু থাকে।”
“আমাদের ষ্টকে অনেক গল্প জয়া, আমি তো এখনো শুরুই করি নি,” মলয়দা বলে।
শুভ পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে, “মলয়দা আপনার সঙ্গে টর্চ আছে তো?”
“এখানকার রাস্তা আমাদের মুখস্থ, চোখ বন্ধ করেও হাঁটতে পারবো, তাছাড়া চাঁদের আলোতো রয়েছে, তোমরা বরং টর্চ জেলে সামনে চলো আমরা তোমাদের পিছনে আছি,” মলয়দা বলে।
“দেখ এতো তারা কলকাতার আকাশে কখনো দেখা যাই না,” হোটেলের বাইরের রাস্তায় নেমে জয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে।
“তাইতো প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে যখনই ইচ্ছে হয় এখানে চলে আসি,” অরুণা বলেন।
বাঁকা চাঁদের আলোতে রাস্তাটা ঠাওর হলেও দূরে চাপ চাপ অন্ধকার।
“গাড়ির রাস্তাটা আর একটু চওড়া করলে ভালো হয়” শুভ বলে।
“সরু রাস্তার কথায় আমার মনে পরে গেল, ” অরুণা বৌদি বলেন, “কাশি বেড়াতে গেছি, জানোই তো কাশির রাস্তা কেমন সরু। সকালে বিশ্বনাথের মন্দিরে পুজো দিয়ে হেঁটে হোটেলে ফিরছি। পাশাপাশি হাঁটার তো জো নেই, আগে আমি, পিছনে মলয়। হঠাৎ আমার আত্মারাম খাঁচা হবার জোগাড়। দেখি গলির উল্টো দিক থেকে প্রকান্ড এক ষাঁড়, মস্ত তার সিং নিয়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। আমি আঁতকে চেঁচিয়ে উঠলাম ‘মলয় বাঁচাও’ পিছন থেকে উনি গম্ভীর স্বরে কি উত্তর দিলেন জানো? ‘ফার্স্ট লেডিস দেন জেন্টস’ “
সকলে হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে।
.

 (৩য় পর্ব)

তখন রাত নটা, চারজনে রাস্তায়, মেঘমুক্ত আকাশে একফালি চাঁদ একটা আলো আঁধারির পরিবেশ। সামনে ছোট্ট টর্চ হাতে শুভ আর জয়া পিছনে মলয়দা ও বৌদি। সমুদ্র রাস্তা থেকে দেখা না গেলেও সমুদ্রের স্নিগ্ধ ফুরফুরে হাওয়ার পরশ সকলে বেশ অনুভব করছে ।
“এতক্ষন তোমরা অরুণার গল্প শুনলে এবারে আমি একটা গল্প বলি?”
“তোমার তো যত আজগুবে গল্প,” বৌদি মলয়দাকে বলেন।
“যে গল্প বলতে যাচ্ছি সেটা আমাদের স্মরণীয় গল্প, শুভ-জয়া, শুনবে নাকি? “
“আচ্ছা ওই গল্পটা বলতে যাচ্ছ বুঝি?” অরুণা বলে।
“আপনাদের স্মরণীয় গল্প যখন নিশ্চই খুব ইন্টারেষ্টিং হবে, অবশ্যই শুনবো মলয়দা, বলুন,” বলে শুভ।
শুকনো খটখটে পিচের রাস্তায় চটি পরে হাঁটলে একটা খস খস আওয়াজ হয়, যা শুভ ও জয়ার হাঁটাতে হচ্ছে। হঠাৎ শুভর খেয়াল হল ওদের পেছনেই হাঁটা মলয়দা বৌদির হাঁটা একেবারে নিঃস্বব্ধে। তাহলে কি ওদের পায়ে নরম রবারের সোলের জুতো? পিছনে ফিরে দেখতে গিয়েই চকলা ওঠা পীচের রাস্তায় পা পড়ে শুভ একেবারে বেতাল হয়ে পড়েই যাচ্ছিল, পাশে জয়া কোনোরকমে ওকে ধরে সামলে নেয়।
পেছন থেকে মলয়দা বকুনির সুরে বলেন “সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাঁটো, এখানকার রাস্তা মোটেও তোমার চেনা নয়। গল্প শোনার জন্য পিছনে তাকাবার কি আছে?”
শুভ কৌতুহল দমন করে চুপ করে যায় ।
মলয়দা বলতে থাকেন “পুরনো মারুতি বেচে ঝাঁ চকচকে সান্ত্রো গাড়ি কিনেছি। একটা বিহারি ড্রাইভার রেখেছিলাম তার পেট্রল চুরির বহর দেখে তাড়িয়েছি, নিজেই ড্রাইভ করি। এই সময় কলকাতা বাইরে এক আত্মীয়ের বাড়ি বিয়ের নেমন্তন্ন। দিব্বি ট্রেনে যাওয়া যেত কিন্তু আমাদের মানে বাঙালিদের, নিজেদের পদোন্নতি অন্যদের দেখতে না পারলে শান্তিই নেই। অরুণার বারণ সত্ত্বেও আমি গাড়ি চালিয়েই গেলাম।”
“আমার কোন কথাটা শোন তুমি?” মলয়দাকে মাঝপথে থামিয়ে অরুণা বৌদির অভিযোগ। মলয়দা বলেন, “ওই একবারই শুনিনি গিন্নি, তবে হ্যাঁ গাড়ি নিয়ে যাওয়াতে অতিরিক্ত খাতির পেয়েছিলাম । আরো কদিন থাকবার অনুরোধ উপেক্ষা করে শেষ দুপুরে বাড়ির পথ ধরলাম। একটানা ঘন্টা তিনেক গাড়ি চালিয়ে কোমড় ধরে গেছে, রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে গাড়ি থামালাম। উদ্দেশ্য একটু হাত পা ছড়িয়ে নেওয়া। দোকান বলতে একটা ছোট্ট খড়ের ছাউনির মাটির কুঁড়ে ঘর, বাইরে পাশেই বাঁশের দুটো বেঞ্চি। দোকানের ভেতরটা অন্ধকার বিকেলেই লম্প জ্বালাতে হয়েছে। দোকানি পাকা দাড়িওলা এক বুড়ো অলোয়ান জড়িয়ে বসে। দুটো চা বানাতে বলে আমি আর জয়া খানিক পায়চারি করে নিলাম। দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, কর্তা খদ্দের নেই কেন? সে জানাল গ্রামের লোকেরা ঠান্ডায় বিকেলে আর ঘর থেকে বেরোয় না আজকাল গাড়িও বিশেষ এখানে থামে না, তাই  সূর্য ডোবার সাথে সেও দোকান বন্ধ করে দেয়।
চায়ের গ্লাস নিয়ে আমি আর অরুণা বেঞ্চে বসেছি। শীতকালের বিকেল সূর্য অস্ত যাচ্ছে তার শেষ গোলাপী রশ্মি টুকু ছড়িয়ে। পাখিদের বাসায় ফেরার কলতান। হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার উল্টোদিকের এক ফালি জঙ্গলের পিছনে বেশ বড়ো জীর্ণ একটা বাংলো বাড়ি। জঙ্গলের জন্য দোতলার যতটা দেখা যায় তার অতি করুণ অবস্থা । জায়গায় জায়জায় ছাদ ভেঙে পড়ছে, কার্নিসে গজানো লতা গুল্মো প্রায় ছাদ ছুঁইছুঁই, জানালার অর্ধেক শার্শিই ভাঙ্গা। দেখে মনে হয় ব্রিটিশ জমানার স্থাপত্য বাহন করছে। অরুণাকে বললাম, এরাস্তায় একটাও হোটেল নেই এই বাড়িটাকে পেলে মেরামত করে দারুন একটা হোটেল বানাতে পারতাম। তারপর দুটো কাগজে বিজ্ঞাপন আর কজন ভ্রমণ লেখকের দু কলম লেখা রসিক বাজারে, আর দেখতে হবে না সুপারহিট একদম হাউসফুল।”
“বাঃ দারুন প্ল্যান, বাড়িটাকে কি হোটেল বানিয়ে ছাড়লেন?” শুভ জিজ্ঞেস করে।
“আগে পুরোটা শোনো। ওটা রায়চৌধুরীদের বাগান বাড়ি, আচমকা এক অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে আমি অরুণা দুজনেই চমকে দেখি আমাদের পাশে কখন রোগা পেটকা ২০-২২ বছরের একটা ছেলে এসে বসেছে, আমরা খেয়ালই করি নি। পরিচয় জিজ্ঞেস করতে, বলে তার নাম কালু এই গ্রামেই থাকে।
এতো ফেকাসে ফর্সা যার গায়ের রঙ তার বাবা-মা কালু নাম কেন রাখলো জানি না। একমাথা ঝাঁকড়া চুল মুখভর্তি দাড়ি, কালুর চোখগুলো গোধুলির আলোতে কেমন ঘোলাটে লাগলো। পরনে শুধু শার্ট প্যান্ট, ভাবলাম ওর কি ঠান্ডা লাগছে না? আমি জ্যাকেট আর অরুণা কার্ডিগানের ওপর শাল চাপিয়েছে ।
কালু বলে, রায়চৌধুরীরা ছিল এখানকার জমিদার, ওই যে জঙ্গল দেখছেন এককালে সাজানো ফুলের বাগান ছিল, রাস্তা পর্যন্ত ছিল বাড়ির পাঁচিল, লেঠেলরা সবসময় বাড়ি পাহারায় থাকতো।
আজ এই দশা কেন? আমার প্রশ্নের উত্তরে কালু বলে, হারান পদ্মার ভূত।
আমার ভাই ভূত ফুতে বিশ্বাস নেই তাই মুচকী হেসে কালুকে বল্লাম, হারান পদ্মা আবার কে?
কালু যে গল্প শোনালো তা এরকম, জমিদার ছিলেন অহংকারী, মদ্যপ ও চরিত্রহীন। কলকাতায় তার তিন স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বাগানবাড়িতে প্রায়ই বাঈজী নিয়ে আসতেন কলকাতা বা লখনৌ থেকে। জমিদার তার বন্ধুদের নিয়ে সারারাত মজলিসে চুর হয়ে থাকতো । গ্রামের মেয়ে বৌদের ওপরেও ছিল তার কুদৃষ্টি, অনেকের সাথেই করেছেন অত্যাচার। শুধু জমিদারের লেঠেল আর খাজনার ভয়ে গরিব গ্রামবাসীরা সব সহ্য করত। হারান জমিদার বাড়ির ভৃত্য, বিয়ে করে বৌ পদ্মাকে নিয়ে আসে মনিবের আশীর্ব্বাদ নিতে। এই অবধি সকলে জানে, তারপরে কি হয়েছিল কারোর জানা নেই। দু দিন পরে পদ্মার উলঙ্গ মৃতদেহ পাওয়া যায় বাড়ির পিছনের কুয়োতে, হারানকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় ওই কাঁঠাল গাছে পাওয়া যায়। গ্রামবাসীরা জানতো এসবের পিছনে জমিদারের হাত আছে কিন্তু কেউ ভয়ে টু শব্দও করে নি। জমিদারের পোষ্য গ্রামের পুলিশও আসে, সব দেখে ও সাক্ষীর অভাবে তারা আত্মহত্যা বলে তাদের হাত ধুয়ে ফেলে।
এই ঘটনার পর থেকেই এক মহিলার অট্টহাসির আওয়াজ বাড়ির আনাচে কানাচে শোনা যেত, কিন্তু কেউ তাকে দেখতে পেত না । সপ্তাহ খানেক পর একদিন হঠাৎ জমিদার ও তার তিন লেঠেলকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। জমিদার দোতলায় তার নিজের ঘরের মেঝেতে। লেঠেলদের একজন সিঁড়িতে, দুজন ওই কাঁঠাল গাছের গোড়ায়। কারুর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, সকলের চোখ খোলা, মুখ বিভীষিকাময়। ওই দেখে বাড়ির বাকি লেঠেল, চাকরবাকর ভয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দিনের বেলাতেও গ্রামের লোকেরা ওই বাড়ির ত্রিসীমানায় যায় না। লোকে বলে রাতে নাকি লাল শাড়িতে পদ্মাকে প্রায়ই ওই বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরতে দেখা যায়।”
“চারটে মৃত্যুর পর পুলিশ আসে নি?”
কালু বলে, “এসেছিল, অদ্ভুত ব্যাপার পুলিশে বড় বাবু ওই বাড়িতে ঢুকেই শরীর খারাপ করে, উনিও স্বশরীরে আর ফেরেন নি। “

 (পর্ব ৪)

মলয়দা বলেন, “আমার অবস্থাটা তখন কেমন বুঝতে পারছো? গ্রামের চায়ের ঠেকে বসে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামের যুবকের কাছে মধ্যযুগিও যত গাঁজাখোরি ভূতপ্রেতের গল্প শুনছি। হাঁসি পেলেও অনেক কষ্টে হাঁসি চেপে আছি, মুখের ওপর কালুকে তাচ্ছিল্য করতে চাই না। অন্যদিকে গল্পের গরুও গাছের কতটা ওপরে উঠতে পারে তা জানারও প্রবল আগ্রহ। কালুকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি নিজে কি পদ্মাকে কখনও দেখেছো? নাকি লোক মুখে শোনা গল্প আমাদের শোনাচ্ছ?”
কালু বলে, “হামেশাই দেখি, “
“বাঃ তার মানে তুমিও আমার মত ভূত টুতে বিশ্বাস কর না?”
“একদম যা বলেছেন! আগে ভীষণ ভয় পেতাম। ভয়টা কাটলো কি করে জানেন?”
“কি করে?” জানতে চাইলাম। অরুণা তখন আকার ইঙ্গিতে তাগাতা দিচ্ছে বাড়ির পথ ধরার। ইন্টারেষ্টিং গল্প না শুনে উঠি কি করে বল?
গল্প বলার সুযোগ পেয়ে কালু উত্তেজিত, “সে আর এক লম্বা গপ্পো, অবশ্য আপনাদের ছোট করেই বলছি। আমার এক কাকা, তাকে আমরা লালকাকা বলতাম কারণ তার ডাক নাম ছিল লালু। ছোটবেলায় শুনেছিলাম সে নিরুদ্দেশ, পরে বড় হয়ে বাবার কাছে শুনেছি তার অসৎ সঙ্গত আর বদ নেশার জন্য তাকে দাদু বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলন । দাদু তো কবে গত হয়েছেন বাবাও স্বর্গে গেছেন। কিছু বছর আগেকার কথা, হঠাৎ এক শীতের দুপুরে কোথা থেকে হাজির হলেন লালকাকা । পরনে ছাই রঙের স্যুট, চোখে কালো চশমা, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি মাথায় টুপী, হাতে এটাচী। সতেরো বছর পরে তাকে তো কেউ চিনতেই পারে না। সেদিনের সেই নেশাখোর হাভাগাড়ে লালু আজকে একেবারে কালো সাহেব। মা অনেক কষ্টে তাকে চিনলেন, যত্ন করে তাকে আপ্যায়ন করলেন, জিজ্ঞেস করলেন, ঠাকুরপো এতদিন কোথায় ছিলে? তোমার একটাও খবর পাই নি? চিঠিপত্রও কখনও দাও নি।”
উত্তরে লালকাকা বলে, “বৌদি আমি কি এদেশে ছিলাম যে খবর পাবে? আমিতো এতদিন ছিলাম বিদেশে,”
“বাবাঃ একেবারে বিদেশে চলে গেলে? কেমন করে?”
“বাবা বাড়ি থেকে আর পঞ্চায়েত গ্রাম ছাড়া করে দিলে আমাকে । কিছুদিন অন্য গ্রামের বন্ধুদের বাড়িতে শরণার্থী হলাম, একদিন দুদিনের পরেই সবাই ভাগিয়ে দেয়। এইসময় বোম্বেতে কাজ করে একবন্ধুর সাথে হঠাৎ দেখা। কপালে যা থাকে ভেবে ওর সাথে বোম্বে চলে যাই, একটা গুজরাটির বাড়িতে আমার বন্ধু কাজ করতো। মালিককে বলে বন্ধুই আমাকেও কাজে লাগিয়ে দিল। বাবা বাড়ি থেকে তাড়াবার পর আত্মীয় স্বজন প্রতিবেশী অনেক দরজা বন্ধ পেয়ে ঠিক করেছিলাম নিজেকে পাল্টাতেই হবে। খুব মন দিয়ে কাজ করতাম। আমার কাজে খুশি হয়ে মালিক একদিন জিজ্ঞেস করে তাদের ফ্যাক্টরিতে কাজ করতে আফ্রিকায় যাবো নাকি? বেশি মাইনের সঙ্গে থাকা খাওয়া ফ্রি। আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। ওদের ফ্যাক্টরী কেনিয়াতে। বেশ ছিলাম, কবছরের মধ্যেই ওখানকার স্থানীয় স্বহিলি ভাষা শিখে স্থানীয়দের সাথে স্বচ্ছন্দে কথাও বলতে পারতাম। এরই মধ্যে মিষ্টি স্বভাবের স্বহিলি মেয়ে মৌরিনের সাথে আলাপ হল, যত দিন যাচ্ছিলো ততই আমরা একে ওপরের কাছে আসতে লাগলাম। একদিন ওর বাড়িতে নিয়ে গেল, ও আর ওর বুড়ো বাবা থাকতো। ওর বাবা কঙ্গোতে হীরের খনিতে নাকি কাজ করত কোনও সময়ে। তারপর কঙ্গোতে গৃহযুদ্ধর সময় ওদের পরিবারে সকলে মারা যায়, বাবার সাথে মৌরিন কোনোরকমে কেনিয়ায় পালিয়ে এসে প্রাণ বাঁচায়। মাঝেমধ্যেই ওদের বাড়িতে যেতাম, একটা ব্যাপার লক্ষ্য করতাম মৌরিনের বাবা একদম বাড়ির বাইরে বের হত না। বাড়ির মধ্যেই একরকম প্রায় লুকিয়েই থাকত। অচেনা কাউকে বাড়ির বাইরে দেখলেই ভয়ে সিঁটিয়ে যেত। ভাবতাম কঙ্গোতে গৃহযুদ্ধর ভয়াবহতার থেকে মানুষিক আঘাত পেয়েই এমনটা হয়েছে।
কঙ্গোতে যে ঠিক কি হয়েছিল জানার আমার ভীষণ আগ্রহ এবং তা ক্রমে বাড়তে থাকে যখনই মৌরিনের বাবাকে দেখি । একদিন মৌরিনকে জিজ্ঞেস করেই ফেল্লাম। খানিক ইতস্ততার পর মৌরিন বলে, বাবার সঙ্গে ও গিয়েছিল এক আন্তীয়র বাড়ি। রাত হয়ে যাওয়াতে ওই আন্তীয়র অনুরোধে ওদের বাড়িতেই ওরা থেকে যায়। হয়তো সেদিন বাড়ি ফিরলে আজ আর জীবিতই থাকতো না। পরদিন সন্ধ্যেতে বাড়ি ফিরে দেখে নিঝুম অন্ধকার যেন বাড়ির সকলে হঠাৎ উধাও । লম্প জ্বালাতেই তার আলোতে দেখে সারা বাড়ি লন্ড ভন্ড। চাপ চাপ কালচে জমাট রক্ত চারিদিকে তারই মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মা, ভাই, বোন, ঠাম্মার মৃতদেহ। এ দৃশ্য দেখার পরে বাবা শত শোকের মধ্যেও আর একবিন্দু অপেক্ষা করে নি। তাক থেকে শুধু মোটা বাইবেলটা নিয়ে আমার হাত ধরে ওই রাতের অন্ধকারেই গাঢাকা দিতে নিরুদ্দেশের পথে নামলেন । অনেক কষ্টে এখানে এসে পৌঁছলাম। আগে মাঝে মধ্যে বাবা কোথায় যেন যেত দুদিন পরে ফিরত অনেক টাকা নিয়ে। শেষবার, বাড়ি ফিরেই জানলা দরজা সব বন্ধ করে দিলো, এখন তো বাড়ি থেকে বেরোতেই ভয় পায়, জানলাও খোলার জো নেই।“
অধৈর্য হয়ে কালুকে বলি, “তোমার ভূত আর পদ্মার গল্প আফ্রিকাতে চলে গেল কেন?”
কালু উল্টে এক ধমক দিয়ে বলে, “জানতে গেলে চুপকরে সবটা শুনতে হবে।”
একটু থেমে সে আবার বলে, “একদিন হঠাৎ মৌরিনের বাবা লালকাকাকে বলল, লালু চলো আমরা এখন থেকে অনেক দূরে কোথাও চলে যাই, তোমাদের দেশে? ওখানে মাউরিনকে বিয়ে করে সুখে থাকতে পারবে না? বললাম হ্যাঁ কিন্তু এখানকার ভালো চাকরি ছেড়ে দেশে গিয়ে রোজকার কিই বা করব? তারপর খাবো কি? বুড়ো বললো যীশুর দয়ায় কোনো অসুবিধে হবে না।
মাউরিনকে এ কথা বলতে ও কিছুক্ষন চুপ করে বললো তুমি যেখানে আমাকে নিয়ে যাবে আমি যেতে রাজি তবে বাবাকে ফেলে কোথাও যাবো না।
একদিন বুড়ো আমায় একা পেয়ে বলল, কি ঠিক করলে? হাতে বেশি সময় নেই তাড়াতাড়ি কর। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তৎক্ষনাৎ তোমরা এখন থেকে পালিয়ে যেয়ো আর হ্যাঁ ওই বাইবেলটা সঙ্গে নিতে ভুল না, ওটা পড়লে সর্বশক্তিমান যীশুই তোমাদের পথ দেখিয়ে দেবে।
মৌরিনকে একথা বলতে সে জানায় বাবা তাকেও এই কথা অনেকবার বলেছে, অথচ ওই বাইবেলে হাত দেওয়া এক্কেবারে নিষিদ্ধ।
সব শুনে খুবই অবাক লাগলো, বাইবেল তো পড়ার জন্য আর সকলকে পড়াবার কথা ।

( ৫)
কদিন ধরে মন ভীষণ উসখুস করছে, মৌরিনের সঙ্গে দেখা করতেই পাচ্ছি না। ফ্যাক্টরিতে এমনই কাজে চাপ যে প্রতিদিনই ওভারটাইম কাজ করতে হচ্ছে।  বাসায় ফিরি একেবারে ক্লান্ত কাদা হয়ে কোনোরকমে খেয়ে বিছানায় চিৎ হচ্ছি।  মৌরিনকে আমার ভীষণ পছন্দ, মনে মনে ভাবি বাকি জীবনটা ওর সঙ্গেই বেশ কাটিয়ে দিতে পারবো। আমাদের নিজেদের একটা দ্বিতল বাড়ী হবে সঙ্গে একটু বাগান, আমাদের দুটো সন্তান ওখানে খেলবে, আরো কত কি এলোমেলো…. স্বপ্নের কি শেষ আছে? পরমুহুর্ত্তে  ওর বাবার কথা ভাবলেই একেবারে গুটিয়ে যাই।  মনে শত চিন্তা আসে, ভাবি অচেনা দেশে অজানা বিপদে জড়িয়ে পড়ছি না তো? এক পা এগিয়ে দু পা পিছয়ে আসি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কি করা উচিত।  
সেদিন কাজ থেকে ক্লান্ত শরীরে ফিরে কোন রকমে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি। গভীর রাতে দরজায় মৃদু ঠক ঠক করাঘাত। প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি, ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকি। একটু পরে আবার ঠক ঠক আওয়াজ ।  এতো রাতে কার দরকার পড়লো আমাকে? ফ্যাক্টরি থেকে নাকি? অবাক হলেও বিরক্ত হই তার থেকে বেশী। আবার দরজায় ঠক ঠক বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে চমকে গেলাম। বাইরে অন্ধকারে কালো চাদর আবৃত মুখ ঢাকা দুটো ছায়া মূর্ত্তি। দুজনে মিলে আমাকে ঠেলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আকস্মিৎ ঘটনায় আমার মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না, হাত পা কাঁপছে, না জানি কোন বিপদ এলো গভীর রাতে? চাপাস্বরে চেনা নারী কণ্ঠে  একজন বললো “আলোটা নিভিয়ে দাও” বলতে যাচ্ছিলাম, কেন? তার আগেই সে মুখের ওপর থেকে কালো চাদর সরাতেই চমকে উঠলাম এযে মৌরিন সাথে তার বাবা, সলমন। দুজনের তর্জনী ঠোঁটের ওপর, ইঙ্গিত যাতে আওয়াজ না করি।  আলো নিভিয়ে ফিসফিস করে বললাম, এতো রাতে হঠাৎ এভাবে? কি ব্যাপার? 
“বাইবেল চুরি হয়ে গেছে, ঘোর বিপদ আমাদের এখন থেকে পালতে হবে এই রাতেই,” মৌরিন বললো। 
উত্তেজনায় খানিকটা তোতলিয়ে বলি, বাইবেল চুরির সাথে আমার কিসের সম্পর্ক? আমি পালতে যাব কেন?
সে বিরাট গল্প, যেতে যেতে বলব, সলমন বলে। 
আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে শুধু বললাম, “যাবোটা কোথায়? সেখানে করবো কি? অনেক কষ্টার্জিত এই চাকরি এমনি ছেড়ে চলে যেতে পারি না।“
 প্রায় ফিসফিসিয়ে সলমন বলে, “খুব সংক্ষেপে বলছি কঙ্গো থেকে পালিয়ে আথি নদীর তীরে এই ছোট্ট কারখানা শহরকে বেছে নি যাতে বাইরের লোকের নজর এড়িয়ে থাকতে পারি। এখানে বসবাস কালিন বৃদ্ধ জর্জের সঙ্গে আলাপ হয়, বেশ বন্ধুত্ত্ব হয়ে যায়  প্রায়ই যেতাম ওর বাড়িতে । জর্জ এমনিতে স্থুলকায় ডায়াবেটিস রুগী তার ওপর গাঁটে গাঁটে প্রচন্ড বাতের ব্যাথায় বিশেষ নড়াচড়া করতে পারে না, একা থাকে, ওর বাড়ি আর বাগান পরিষ্কার করে দিতাম, কিছু দরকার থাকলে শহর থেকে এনে দিতাম। মৌরিনও মাঝে মধ্যে গিয়ে ওর খবর নিত, রান্না করে দিয়ে আসত। ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ওপরপর বন্ধুত্ব হলেও আসলে ছিল আমার নিজের গুপ্ত স্বার্থ, যার ব্যাপারে জর্জ কিছুই জানতো না।“ 
“দুদিন আগে মৌরিনকে নিয়ে গেছিলাম শহরে আমার কিছু দামী সামগ্রী বেচে টাকা আনতে, আজ  ফিরে দেখি আমার বাড়ির তালা ভাঙা,  ভিতরে সব তছনছ, বাইবেলও হাপিস। মনে একটা সন্দেহ হওয়াতে ছুট্টে গেলাম জর্জের বাড়ি, যা দেখলাম কান্নায় বুক ফেটে যাবার জোগাড়। বেচারাকে অনেক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়েছে মৃত্যু পর্যন্ত, শুধু সে আমার বন্ধু বলে। অর্থাৎ আমার শত্রূর চর  অনেকদিন ধরেই আমাকে অনুসরণ করছিল। জর্জ আমার অতীত জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতো না মনে হয় ওকে জেরা করে যখন ওরা কিছুই জানতে পারে নি, মেরে ফেলেছে। সেই থেকে সারাদিন আমরা গ্রামের বাইরে পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলাম, রাত্রি নিশুতি হবার পরে তোমার কাছে এসেছি।  তুমি আমাদের বাড়িতে হরদম যেতে একথা ওরা জানে, নিশ্চই জানে, সেক্ষেত্রে তোমারও  বিপদ আসন্ন, যদিও তুমি আমার কথা কিছুই জান না, তাই বলছি একদম সময় নেই আমাদের হাতে, যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, এখনই বেরোতে হবে।“ 
  
অজান্তে মদ্ধরাতে ঘুম ভেঙেই এমন ভয়কর খবর শুনে মাথায় জোট পাকিয়ে গেছে। অজানা আতঙ্কে হাত-পা কেমন অবশ লাগছে, টলতে টলতে গিয়ে কোনরকমে ঘরের চেয়ারটাতে বসে পড়ি। 
সলোমন নিচু গলায় ভৎসনার সুরে বলে, “বসে পড়লে যে? আমাদের হাতে বেশী সময় নেই।”
মাথায় তখন হাজারও চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। লগ্নের ওপর সেদিন নিশ্চই রাহু, কেতুর একসঙ্গে  দৃষ্টি ছিল নাহলে মৌরিনের সঙ্গে বাজারে সেদিন আলাপ হবে কেন? হা ভগবান! আবার কোন সঙ্কটে ফেললে? বিদেশে বেশ করে খাচ্ছিলাম কোথাকার উটকো ঝামেলায় এখন জড়িয়ে দিলে। এমনিতেই ভীতু, ঝুট ঝামেলা এড়িয়ে চলি, বিপদ শুনলে ঘাবড়ে যাই, তার একেবারে প্রাণের ভয়। ঠিক করতে পারছি না সলমনের কথায় বিশ্বাস করা কি উচিত হবে?  
ততক্ষনে মৌরিন এসে আমার হাত ধরেছে, তাকিয়ে দেখি করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমার দিকে, ওই দৃষ্টিকে অবিশ্বাস করতে পারি না, যেন বলছে ‘তোমাকে ছেড়ে যেতে পারছি না গো’
এমনিতে প্রাণের ভয় বড় ভয়, বললাম, “এই রাতে আমার জিনিস পত্র নেব কি করে?” 
“যেটুকু না হলেই নয় সেটুকু মাত্র, হাঁটতে হবে সারা রাত পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বাস রাস্তা পর্যন্ত, ভোরের প্রথম বাস ধরতে হবে। “ 
“বাস তো সকালে এখন থেকেই পেতে পারি?” উত্তরে সলমনকে বলি। 
সলোমন চাপা ধমকে বলে, “তুমি কি শত্রূকে জানিয়ে পালাতে চাও বুঝি? আমরা মাঠের ওপারে বড় গাছটার পেছনে অপেক্ষা করছি, তাড়াতাড়ি এস। একসাথে এতজনের হাঁটা আবার কার চোখে পড়বে। অস্ত্র থাকলে সঙ্গে নিও।”
সলোমন যে  হাঁটা রাস্তার কথা বললো তা গেছে সাভো অরণ্যের মধ্যে দিয়ে। হাতি, চিতা, সিংহ, গন্ডার বুনো মোষ সবাই আছেন, একজন দয়া করে দেখা দিলে ওখানেই সব শেষ। আমার হাত পা তখন কাঁপছে, হৃৎপিণ্ড গতিও অনেকগুন বেড়ে মনে হয় গলায় উঠে এসেছে, মুখ দিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে পড়লো বলে।  এখানে থাকলে শত্রূর হাতে মরব, পালতে গিয়ে জংলী জানোয়ারের হাতে, বা অন্য না জানা কোন বিপদে । জানি না আছে কি কপালে? 
যতগুলো দেবদেবীর নাম জানতাম সকলকে মনে মনে শত বার স্মরণ করে এখন মনে একটা একরোখা ভাব, যা থাকে কপালে, এডভেঞ্চার করেই মরব। একটা ঝোলা, টাকাপয়সা আর একফুটের দুফলার ছুরিটা সঙ্গে করে গভীর অন্ধকারে অজানার উদ্দেশ্যে পথে নামলাম।
 (পর্ব ৬)
আমি অতি সাধারণ মাছের ঝোল ভাত খাওয়া মায়ের স্নেহের আঁচলে পালিত বঙ্গ সন্তান। এত দুঃসাহসিক কম্মের জন্য আমার শরীর বা মন একেবারে অযোগ্য। আলোকিত শহরের মসৃন পথে হাঁটা আর অন্ধকারে অচেনা বন্ধুর পাহাড়ী চড়াই উৎরাই চাঁদের আলোর ভরসায়, পিঠে বোঝা নিয়ে, পথ হাতড়ে যে কেমন বিভীষিকাময় বোঝাতে পারবো না। মহামূল্য প্রাণটা বাঁচাতে শরীরে যে দুঃসাহসিক শক্তি এসেছিল ওই সময় তার কথা ভাবলে আজও অবাক হয়ে যাই। একঘেঁয়ে হাওয়ায় গাছের পাতার ঘষার খসখস আর ঝিঁঝির ডাক। প্রতি বাঁকে মনে হয় কোন অজানা বিপদ বুঝি ওৎ পেতে দাঁড়িয়ে। নিজের স্নায়ু আর অনুভূতি যে এত সতেজ শহরে থেকে আগে কোনোদিন পরখ করার সুযোগই হয় নি ।  ক্ষুদ্রতম আওয়াজ, অতি ক্ষিন গন্ধ, পাতার  নড়ন কিছুই ইন্দ্রিয়কে ফাঁকি দিতে পারে না। 
একেই গরম তার মধ্যে অনেক্ষন মুখ বুজে পাহাড়ি পথে হাঁটার পরিশ্রমে জামা ঘামে ভিজে সপসপ করছে । সারাদিন ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছি ঘুমও হয়নি তেমন শরীর যেন আর চলতে চাইছে না। সলমনকে বললাম, “সলমন এবার একটু জিরোতে দাও আর পা যে চলছে না। তোমার গল্পেও তো বললে না।”
চাপা ধমকে সলমন বলে, “সময় হলেই বলব, কথার আওয়াজ শুধু বন্য জন্তু নয়, আদিবাসী ডাকাতদেরও আকৃষ্ট করবে । এখানকার ডাকাতরা বন্য জন্তুর থেকেও হিংস্র।” 
ইশারায় মৌরিনও  আমাকে মুখ বন্ধ রাখতে বলল। 
আরো ঘন্টা খানেক হাঁটার পর পৌঁছলাম এক বিশাল তৃণভূমির সামনে। কোমড় সমান উঁচু ঘাস বৃষ্টির জলের অভাবে শুকিয়ে হলদে হয়ে গেছে গেছে । চাঁদের আলোতে দেখে মনে হচ্ছে  যেন এক নীলচে রূপালী স্বপ্নের ভূমি। হাল্কা হওয়া ওই ঘাঁসে থেকে থেকে একটা শিরশির শব্দ তোলে। সলমন অনেক্ষন এদিক ওদিক পর্যবেক্ষণ করার পরে বললো, “দেখছিলাম কাছাকাছি মোষের পাল আছে কিনা, মোষ থাকলেই সিংহ শিকারের লোভে হাজির হতে পারে।”
আমার পা আর চলছে না গলাও শুখিয়ে কাঠ, মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পড়েই যাব । পিঠের বোঝা নামিয়ে একটা বিশাল গাছের তলায় বসে হাঁপাতে লাগলাম। আমার দেখাদেখি মৌরিনকেও বসতে দেখে চিরিদিকে তাকিয়ে সলমনও বসে পড়ল l মৌরিন তার সঙ্গে আনা ভুট্টার আটায় তৈরী উগালি আর জল দিল। জল পানের পর শরীরে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। 
খানিক জল আর উগালি খাওয়ার পর সলমন বলে, “লালু তুমি আমার গল্প শুনতে চাইছিলে তাহলে শোনো, অভাবের সংসারের হাল ধরতে অল্প লেখাপড়ার পরেই হীরের খনিতে শ্রমিকের কাজে ঢুকি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খনির অন্ধকার গর্ভে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরেও সেই নুন আনতে পান্তা ফুরতো । একদিন কোন কারণে কাজে না গেলে পরের দিন খাবার জুটতো না।  খনি শ্রমিকদের নিত্য নানারকম অসুখ লেগেই থাকতো, বিশেষ করে ফুসফুসের ব্যারাম। তাছাড়া নেশার সামগ্রী খনি বস্তিগুলোর আনাচে কানাচে অতি সহজলভ্য, যা অল্পদিনে শরীর অকেঁজো করে দেয় l অনেক শ্রমিক বন্ধুকে দেখেছি যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে, অর্থাভাব আর  বিনা চিকিৎসায় মরতে, তাদের পরিবারের দুর্দশা বলে বোঝানো যাবে না। দুমুঠো অন্নের  জন্য দেহ ব্যবসায় পর্যন্ত নামতে দেখেছি তাদের  স্ত্রী, কন্যাদের। যতটুকু পারতাম সাহায্য করতাম কিন্তু তা অতি  সামান্য, নিজেরও পরিবার আছে, তাদের তো আগে দেখতে হবে । আমরা শ্রমিকরা একরকম ক্রীতদাসের জীবন কাটাতাম অথচ মালিক পক্ষের লোকেদের দেখতাম আমাদের চোখের সামনে রাতারাতি বড়োলোক হতে। মনে প্রতিদিন বিদ্রোহ করলেও আমাদের শক্তি একেবারে সীমিত। অর্থের জোরে প্রশাসন, পুলিশ, আদালত সবই ওদের দখলে তাছাড়া ওদের পোষা গুন্ডারা অতদূর পৌঁছনোর আগেই শ্রমিককে মেরে এমন গুম করে দিত যে তার টিকিও আর পাওয়া যেত না। একদিন সাহস করে আমাদের সর্দারকে বললাম, ভাবছি অন্য কিছু করব, এত খেটেও না আছে স্বচ্ছলতা না ভবিষ্যত ।  আমি মরলে আমার পরিবারেরও অনাহারে মৃত্যু। শুনে সর্দার বললে আমার মনের কথা বলেছো যদি রাজি থাক মাথায় একটা মতলব আছে, তবে হুঁশিয়ার মুখ খুললে বা জানাজানি হলেই নির্ঘাত  মৃত্যু। কোন রকমে দুপয়সা বেশী রোজকার করে যদি গরিবমুক্ত হতে পারি অবশ্যই আমি  রাজি মুখ বন্ধ রাখতে । খনি থেকে বেরোবার সময় সকলকে অগ্রপশ্চাৎ সম্পূর্ণ চেকিং করা হত, একটা ধুলোর দানাও নিয়ে বেরোবার জো ছিল না । সর্দার বল্লে কলার সঙ্গে গিলে পেটের মধ্যে হীরে নিয়ে বেরোলেও কিন্তু কারোর ধরার  ক্ষমতা নেই । খনি থেকে এভাবে হীরে চুরিতে সর্দার সমেত দলে মোট আমরা পাঁচ জন ছিলাম, এইটুকুই শুধু জানতাম। গোপনীয়তা রাখতে শুধুই সর্দারই জানতো দলের বাকি তিন জনকে ।” 
সলোমন খানিকটা জল পান করে আবার বলতে থাকে, “গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ মালিক পক্ষের চর চিরিদিকে ছড়ানো, তারা জানতে পারলেই ধন ও প্রাণ দুই যাবে। সর্দার ছাড়া বাকি ৩ জন যে কে জানতাম না। সর্দারই বললে ঠিক হয়েছে একটা মোটা বাইবেলের পাতা ভিতর থেকে চতুস্কোন আকারে কেটে ওটাকে একটা বাক্সের রূপ দেওয়া হবে । সর্দারের কাছে থাকবে বাইবেল, ওটা ভর্তি হলেই আমরা যে যার ভাগ বুঝে চুপিচুপি অনেক দূরে যে যার পথে চলে যাব।” 
একটু থেমে সলমন বলে, “প্রতি বংশে যেমন একটা কুলাঙ্গার জন্মায় তেমনই প্রতি দলেও একটা নির্বোধ অবশ্যই থাকে। একদিন শেষ রাতে দরজায় করাঘাত, খুলে দেখি চাদরে মুড়ি দেওয়া ভীতসন্ত্রস্থ সর্দার সঙ্গে তার নিদ্রামগ্ন একমাত্র পাঁচ বছরের ছেলে। ব্যাপার কি? বললে ভীষণ বিপদ সব ফাঁস হয়ে গেছে, আমাদেরই একজন নেশার ঘোরে পানশালায় হীরে আর বাইবেল সম্পর্কে অজান্তে বলে ফেলেছে। গুপ্তচর সর্বত্র, আর যাবে কোথায়? তার বাড়িতে চড়াও হয়েছে খনি মালিকের গুন্ডা বাহিনী। এটুকু জেনেই সর্দারের ধারণা, ওকে অত্যাচার করে নিশ্চই সর্দারের বাড়ি পৌঁছবে ওরা । বাইবেলটা এনেছে যাতে আমি সেটা কোথাও লুকিয়ে রাখি আর ওর ছেলেকে আপাততঃ দূরে ওর এক আন্তীয়র কাছে রেখে আসি । বললাম আপনি স্বপরিবারে পালালেন না কেন? সর্দারের বললে, আমি পালালে তোমরা ভাববে তোমাদের ঠকালাম, তাছাড়া অনেক দেরি হয়ে গেছে, পেছনে এতক্ষনে ফেউ লেগে গেছে, হয়তো বাস রাস্তায় তারা অপেক্ষমান পালতে গেলেই সব যাবে তার থেকে আমার বংশের প্রদীপ এই ছেলে ও হীরে আপাততঃ বাঁচুক, প্রাণ থাকলে দেখা যাবে । বাইবেল আর ছেলেকে রেখে সর্দার অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। দেরী না করে সামান্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম মৌরিনকেও সঙ্গে নিলাম যাতে মনে হয় আমারা ব্যক্তিগত পারিবারিক কাজে যাচ্ছি। মা-স্ত্রীকে বলে গেলাম জরুরি দরকারে যেতে হচ্ছে ফিরে সব বলব, কোথায় যাচ্ছি ওদের কিছুই জানালাম না। 
সর্দারের ছেলেকে তার আত্মীয়ের বাড়িতে রাখলাম কিন্তু বাইবেল লুকোবার তেমন বিশ্বস্ত যুৎসই জায়গা না পেয়ে সঙ্গেই নিয়ে ফিরলাম দুদিন পরে। সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে অবাক হলাম, দরজা খোলা বাড়ি অন্ধকার। আলো জ্বেলে বাইবেলটা যীশুর মূর্তির পাদদেশের  তাকে রাখলাম।  ভিতরে ঢুকে সেই নরকীয় দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলাম, সকলকে হত্যা করেছে, মৌরিন চিৎকার করে কেঁদে উঠল। চকিতে বুজলাম সর্দারের পিছু পিছু বিপদ আমার ঘরে ঢুকেছে। নিশ্চই কেউ সর্দারকে অনুসরণ করছিল সেই দেখেছে অতো রাতে তাকে আমার বাড়ি আসতে l যে কোনো মুহুর্ত্তে  মৃত্যু আবার আসতে পারে। দুঃখে যন্ত্রনায় আমার মাথা ঘুরে গেলেও অনেক কষ্টে নিজেকে শক্ত করলাম l এখন হৃদয়ের শোক ভুলে দিমাগ দিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে l আমার কান্নায় যারা গেছে তাদের কেউ ফিরবে না l মৌরিনের মুখ চেপে ধরলাম যাতে ওর কান্নার আওয়াজে ওরা না ফিরে আসে, বাইবেলটাকে  নিয়ে আলো নিভিয়ে বাইরের অন্ধকারে গা ঢাকা দিলাম। অন্ধকারে খানিকটা দূরে গেছি, চিৎকার চেঁচামিচির আওয়াজ শুনে পিছনে ফিরে দেখি আমার খোঁজে বাড়িতে মালিকের গুন্ডারা চড়াও হয়েছে ।” 
মলয়দা বলেন, “কালুর গল্প শুনতে ভালো লাগলেও বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ভাই এই বাড়ির গল্প বলো তোমার লালুকাকার আফ্রিকার গল্প কে বলতে বলেছে?”
কালু বলে, “কে আবার? পদ্মা!” 
কালুর রসিকতায় বিরক্ত হয়েই বলি,”তার মানে?”
হাঃ হাঃ করে খানিকটা হেঁসে কালু বলে, “কেমন গল্পে নেশা ধরে গেছে না? এখন সবটা  না শুনে যেতে পারবেন না।”
অনুভব করি ওখান থেকে ওঠার মনের ও শরীরে জোরটা কখন হারিয়ে ফেলেছি ।
 (পর্ব ৭)
সলমন বলে, “আমার পরিস্থিতিতে যে না পড়েছে তাকে বোঝানো খুবই কঠিন নিজেকে শোকে আবেগে ভাসতে না দিয়ে বাস্তবের সাথে সমঝোতা করে সংযত থাকা । আক্রোশে সারা শরীর জ্বলে গেলেও জানতাম আমি একা বিশ পঁচিশ জনের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবো না। ইচ্ছে করছিলে সকলকে কেটে ফেলি কিন্তু মৌরিনকে তো বাঁচাতে হবে! সারা সন্ধ্যে ঘাপ্টি মেরে লুকিয়ে থেকে গভীর রাতে সর্দারের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম সেখানেও স্মশানপুরী। সর্দারের কাছে জানার ছিল দলের বাকি দুজন কে? সন্দেহ হচ্ছিল দুজনের এক জন নিশ্চই গুপ্তচর? জানাবার লোকই জীবিত যখন নেই তখনই ঠিক করলাম মৌরিনকে নিয়ে যত দূরে পারা যায় পালতে হবে যাতে এদের ছায়াও আমার খোঁজ না পায়। অনেক স্থান বদলের পরে আতি নদীর তীরে এই ছোট্ট কারখানা শহরে আস্তানা নিলাম । এতদূরে এলেও মনে কোনও স্বস্তি ছিল না। অতি সাবধানে থাকতাম কারণ জানতাম কঙ্গোর আদিবাসী রক্ত ওদের শরীরে, শেষ বিন্দু রক্ত থাকা অবধি প্রতিহিংসা নিতে ওরা ছাড়বে না, সঙ্গে আছে হীরের লোভও, খুঁজে ঠিকই একদিন আমার দরজায় পৌঁছবে। হলোও তাই।
কেনিয়াতে পৌঁছে প্রথমে ভাবছিলাম বাইবেল কোথায় লুকোই। একদিন বাইবেল খুলে দেখলাম ছোট হীরে অনেক রয়েছে কিন্তু বড় গুলো উধাও, বুঝলাম সর্দার দামী হীরে গুলো অন্যত্র লুকিয়ে রেখেছে কোথায় তা আর কেউ জানতেই পারবে না। জর্জের সঙ্গে আলাপ হতেই মাথায় অন্য বুদ্ধি খেলে গেল। বাতের ব্যাথায় ও নড়াচড়া বিশেষ করতে পারতো না বাড়িটাও লোকালয়ের শেষ প্রান্তে একদম নিরিবিলিতে । বাগানে ওর আগাছা আবর্জনা ভর্তি। যেচেই ওর সঙ্গে ভাব জমালাম। বাগান পরিষ্কারের নামে একটা ঝোপের আড়ালে গর্ত খুঁড়ে বানালাম গোপন একটা চোরা কুঠরী। হীরেগুলো ওখানে লুকিয়ে মাটি চাপা দিয়ে আসেপাশে কিছু ফুলের গাছ লাগিয়ে দিলাম, কারোর বোঝার সাধ্যি নেই মাটির তলায় কি আছে। এদিকে জর্জ খুব খুশি, আমি ওর বাড়ি-বাগান পরিষ্কার করে দিই, মাঝে মাঝেই গিয়ে গল্পও করি । যেতাম আসলে আমার ধন সুরক্ষিত আছে কিনা দেখতে। মৌরিন গুপ্তধনের কথা কিচ্ছু জানতো না। ওকেও লোক দেখানো কাজ করতে পাঠাতাম, টাকার দরকার পড়লেই মোম্বাসা, নাইরোবি, গারিসার মত বড় শহরে যেতাম হীরে বেচতে। যেহেতু কংগোতে বাইবেলের কথা জানাজানি হয়ে গেছিল সেটাকে জিইয়ে রাখতে আসল বাইবেল আতি নদীতে ভাসিয়ে ওরকমই আরেকটা বাইবেল কিনে জনসমুক্ষে রেখে দিলাম, বিভ্রান্ত করতে কাউকে ছুঁতেও দিতাম না। শুধু বাইবেলের শেষ পাতায় জর্জের বাগানের নকশা এঁকে রাখলাম। আমার কিছু হলে যাতে মৌরিন যাতে ওটা দেখে অনায়াসে গুপ্তধন খুঁজে পায়।”
চাঁদের রুপোলি আলোয় শুকনো হলদেটে তৃণভূমিকে মনে হচ্ছে বিশাল এক শ্বেতশুভ্র সমুদ্র। হঠাৎ আমার নজরে পড়লো খানিক দূরে কি যেন কালো মতো নড়ে উঠলো। গন্ডার, মোষ নাকি সিংহ? সলমনের দৃষ্টি আকর্ষণই করতে যাচ্ছিলাম, সহসা পিছন থেকে বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বর, ‘কেউ একদম নড়বি না,পালাবার চেষ্টা করলে এখানেই মেরে ফেলব।”
এতোটা পথ হাঁটার পরে মনে একটা স্বস্তি ছিল যাইহোক সলমনের লেঠেল শত্রূর থেকে অন্তত রেহাই পেয়েছি। কিন্তু আবার যে কোন নতুন বিপদ উদয় হল? লেঠেলদলই আমাদের পিছু নিয়ে এসেছে নাকি এরা ডাকাত? ভয়ে তো আমার ভিমরী খাবার জোগাড়, হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে ।
“মাথার ওপর হাত তুলে সকলে উঠে দাঁড়া,” আবার সেই কর্কশ কঠিন গলা। নিরীহ পুতুলের মত আজ্ঞা পালন করলাম। আমাদের সামনে দুজন আর পেছনা তিনজন সশস্ত্র ব্যাক্তি আমাদের ঘিরে রয়েছে। ওদের খালি গা পরনে শুধু প্যান্ট, সকলের মুখ ঢাকা কালো কাপড়ে । ওদের হাতে তরোয়াল আর বন্দুক দেখে মনে হচ্ছে না আমাদের জঙ্গল যাত্রায় সাহায্য করতে ওরা এসেছে l বুক দুর দুর করছে এই বুঝি তরোয়ালের এক কোপে ভবলীলা সাঙ্গ হল। তরোয়ালের কোপ পড়লো না, কিন্তু আমাদের সর্বস্য কেড়ে নিয়ে হাত আর চোখ বেঁধে ওদের সঙ্গে হাঁটিয়ে নিয়ে চললো। অন্ধের মত হোঁচট খেতে খেতে চলেছি। কোথায় চলেছি কিচ্ছু জানি না। শুনেছি আফ্রিকায় আজও নরখাদক আছে, আমাদের কপালে কি আগুনে পুড়ে ওদের পেটে যাওয়া লেখা আছে?
অনেকক্ষন হাঁটু পর্যন্ত শুকনো ঘাঁসের ওপর হাঁটার পর মনে হল এখন আমরা নরম সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটছি কারণ প্যান্টে শুকনো ঘাঁস ঘষার খসখসে শব্দটা বন্ধ হয়েছে। বামদিক থেকে একটা মিষ্টি স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে লাগছে, মনে হয় কোন নদীর পার দিয়ে হাঁটছি। একসময় হাঁটার অবসান হল। একটা পুরনো দরজা খোলার ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ তারপর আমাদের সকলের চোখের পট্টি খুলে, একরকম ঠেলে এক অন্ধকার ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল। এতক্ষন চুপ করে ছিলাম আশপাশে কেউ নেই, ফিসফিস করে সলমনকে জিজ্ঞেস করলাম,” এরা কারা? আমাদের কি মেরে ফেলবে?” চাপা স্বরে উত্তর পেলাম, “জানি না!” এমনিতে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর, আসন্ন বিভীষিকাময় ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে হাত বাঁধা অবস্থাতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।
পরদিন দরজা খোলার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। দুজন আমাদের টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করালো এরপর বাইরে একটা মাঠ মত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল। ভাগ্যে কি লেখা আছে, অজানা আতঙ্কে গলা শুকিয়ে কাঠ, হৃৎপিণ্ড যেন লাফাচ্ছে। মাঠের চিরিদিকে ঘন জঙ্গলে ঢাকা। রাতে আমাদের রাখা হয়েছিল পুরোনো একটা আস্তাবলে । পাশে একটা একতলা পোড়ো বাড়ি। মাঠের মাঝে একটা কাটা গাছের গুঁড়ির ওপরে একজন বসা ওই মনে হয় এই দলের সর্দার। বাকি আরো জানা দশেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে, সকলের হাতে অস্ত্র।
“এতরাতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছিল?” দলের সর্দার, জিজ্ঞেস করলো । সলমন সব ঘটনা বললো শুধু লক্ষ্য করলাম হীরের কোনো উল্লেখ করলো না। আমাদের লোটা-কম্বলও ওরা নিশ্চয়ই খুঁজে দেখেছে, সেখানেও হীরের কোনো সন্ধান পায় নি । সলমন কি তাহলে আমাকে কি হীরের লোভ দেখিয়ে বোকা বানাল? সলমনের গল্প শুনতে শুনতে বসা লোকটা সলমনের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে হাতে ওর চকচক করছে তরোয়াল। আমার বুক ধুকপুক করছে এই বুঝি চোখের সামনে সলমনের শিরোচ্ছেদ দেখব। ভয়ার্ত সলমনেরও চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ ।
তরোয়ালের ডগা সলমনের গলায় রেখে সে বলল, “এই উল্কিটা আমার বাবার গলাতেও দেখেছি, এটার অর্থ কি? কে তুই সত্যি করে বল?”
সলোমন বলে, “খনিতে গাঁইতি নিয়ে কাজ করতাম গ্রামের মেলাতে এই গাইতির উল্কি আমি আর খনি সর্দার একসঙ্গে করি আমাদের বন্ধুত্বের প্রতীক চিহ্ন হিসেবে। “
তারপরে যা হলো আশ্চর্য হবার মত। ডাকাত সর্দার দলের একজনকে আদেশ করলো আমাদের বাঁধন মুক্ত করতে এলো আমাদের জন্য পানিও ও খাবার। এযাত্রায় এভাবে রক্ষা পেলাম, ডাকাতদের সর্দার আসলে সলমনের মৃত খনি সর্দারেরই ছেলে নাম মোসে ।
মোসে বলে, “আমার আত্মীয়র ধারণা ছিল খনি শ্রমিক বাবার অনেক টাকাপয়সা, আমাকে রাখার জন্য বাবা নিশ্চয় ওকে মোটা টাকা পাঠাবে। এদিকে বছর ঘুরে গেল অথচ বাবা-মায়ের কোনো খবর নেই, টাকারও কোনো যোগান নেই। আমার ওপর অত্যাচার শুরু এখান থেকে। প্রথমে শুরু বাড়ির কাজ দিয়ে ক্রমে কাজ বাড়তে থাকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত, খাওয়া আধপেটা, সঙ্গে অসহ্য নির্যাতন। তখন আমার বয়স ১৭ লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে না পেরে ওই আত্মীয়কেই প্রচন্ড প্রহার করে পালিয়ে যাই বাবা-মায়ের খোঁজে। নিজেদের গ্রামে পৌঁছে দেখি তা অনেক বদলে গেছে। কোথায় আমাদের বাড়ি? তা খুঁজেই পায়না। সর্দারের নাম করলেই কেউ কোন কথাই আর আমার সঙ্গে বলতে চাই না। অনেক কষ্টে এক প্রতিবেশীর কাছে জানতে পারি পরিবারের দুঃখজনক ঘটনা। সে আবার আমার পরিচয় পেয়েই অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্থ, বলে, সর্দারের ছেলেকে কোনো রকম সাহায্য করেছে জানাজানি হলে আমার পরিবারের ঘোর বিপদ, তাড়াতাড়ি চলে যাও এখন থেকে ।
ওখান থেকে পালিয়ে ভবঘুরে ভিকিরির মত উদ্দেশ্যহীন ভাবে যখন এখান সেখান ঘুরছি সেসময় পরিচয় হয় এক কামারের সঙ্গে। কামারের ছেলে পুলে নেই, আমাকে অসহায় দেখে নিয়ে যায় নিজের বাড়িতে, দেয় পুত্রের মর্যাদা। দিনে সে কামার রাতে তিনি দস্যু সর্দার। ধীরে ধীরে দুবিদ্যাতেই আমার হাতেখড়ি হয়, কামারের মৃত্যুর পরে আমিই হই দলের সর্দার। ডাকাতি শুধু ধনীদের ওপর, সেই অর্থ দিয়ে হয় গ্রামের অত্যন্ত গরিব ও বুড়োদের সাহায্য। তোমাদের ধরে আনলেও, জানি তোমরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তোমাদের ছেড়েই দিতাম। “
মোসের অনুরোধে ওদের গ্রামে গেলাম। পথে সলমন আমাদের দুজনকে সাবধান করে দিলো হীরে নিয়ে যেন এক্কেবারে মুখ না খুলি। কদিন মোসের গ্রামের আতিথেয়তার পর সেই আমাদের ভৈ স্টেশনে পর্যন্ত পৌঁছে দিল তার লোকজন দিয়ে। যেখান থেকে আমরা ট্রেন ধরলাম মোম্বাসার। উদ্দেশ্য ওখান থেকে জাহাজে চড়ে ভারত পৌঁছনো।
মোম্বাসার বন্দর ঘুরে জানলাম বোম্বে যাবার জাহাজ সবে কদিন আগেই রওনা হয়েছে। আমাদের এখন মাসদেড়েক অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী জাহাজের জন্য ।
 (পর্ব ৮)
মোম্বাসাতে অলস কয়েকটা দিন কাটানোর পর, বন্দরে গেলাম বোম্বে গামি জাহাজের খোঁজ খবর নিতে। ওখানে জিজ্ঞেসাবাদ করতে গিয়ে টনক নড়লো যোগ্য কাগজপত্র না থাকলে আন্তর্জাতিক জাহাজে সফর করার ছাড়পত্র পাওয়া যাবে না। আমারতো মাথায় হাত, জানি সলমন বা মৌরিন কারোর কোন কাগজপত্রই নেই। বাড়লো অন্য এক উটকো ঝামেলা, হন্যে হয়ে মোম্বাসায় খুঁজে বেড়াচ্ছি কিভাবে ওদের চোরাপথে কাগজপত্র তাড়াতাড়ি তৈরি করা যায়, জানিও না কে করে দিতে পারবে, আর তার দক্ষিনাই বা হবে কত । একদিন বিকেলে ফিরে দেখি ঘর অন্ধকার, মৌরিন গেছে বাজারে। আলো জ্বালতে দেখি সলমন বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে, যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে ।
“অসুস্থ নাকি?” জিজ্ঞেস করতে বললো, পা ফুলেছে, কোমড়ে বিষ ব্যাথা, সামান্য জ্বরও, কদিন ধরে প্রসাব করতে অসুবিধে হচ্ছিল আজ নাকি রক্তও বেরিয়েছে।
দেরি না করে, সলমনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও, প্রায় জোর করে ওকে কাছাকাছি এক ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। অল্পবয়স্ক ডাক্তারটি সব শুনে অনেকক্ষন সলমনকে পরীক্ষা করে বললে, “খুব ভালো বুঝছি না দেরি না করে বড় হাসপাতালে নিয়ে যান,”
পরদিন ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, কদিন নানা পরীক্ষা হল সলমনের । সপ্তাহ খানেক পরে ডাক্তার সব পরীক্ষার ফল দেখে জানালেন প্রোস্ট্রেটে ক্যান্সার, অত্যন্ত অ্যাডভান্সড স্টেজে, চিকিৎসার কোনই অবকাশ নেই, আয়ু বড় জোর আর দুমাস ।
ডাক্তারের কথা শুনে, আমি কি বলবো বুঝে ওঠার আগেই, সলোমন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল, বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, “জানতাম ঈশ্বর একদিন আমার পাপের শাস্তি দেবে, এমন ভাবে এতো তাড়াতাড়ি দেবেন, বুঝতে পারিনি।”
ভাবলাম যে লোকটা সারা জীবন এতো অন্যায় অত্যাচার সহ্য করেছে তাকেই ভগবান এমনই শাস্তি দিচ্ছে কেন? ওকে স্বান্তনা দিলাম, “নিজেকে বা পরিবারকে রক্ষা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়া, কোনোটাই পাপ নয়।”
স্লান হেঁসে সলোমন বলল, “তুমি তাই জানো যা আমি তোমায় বলেছি, আসল সত্যিটা এখনো তুমি বা মৌরিন কেউই জান না, হয়তো জানলে আমাকে ঘেন্না করবে ।”
সেদিন বুঝেছিলাম মানুষ মৃত্যুকে সবথেকে বেশি ভয় পায়, আসন্ন মৃত্যুর কথা আগাম জানতে পেরে সলোমন বিস্মিত ও আতঙ্কিত । ভাবলাম সেই ঘোরেই প্রলাপ বকছে। তবুও নিজের কৌতূহল দমন করতে না পেরে হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, “আসল সত্যিটা কি সলোমন? যদি আমাকে বলতে চাও?”
সলমন আমার কথা না শোনার ভান করে কোনো উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকে । ওর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি। আমার প্রশ্নে ওকে নির্বাক দেখে মনে মনে ভাবলাম এবারে ঝুলি থেকে আসল খরগোশটা বেরিয়ে পড়বে। হীরে আর গুপ্তধনের গল্প মিথ্যে এই বলবে তো? তাতো আমি আগেই মনে মনে ভেবে রেখেছি ।
শুকনো গলায় সলমনের বলে, “আজ যা তোমাকে বলব সবই আমার জীবনের সত্য ঘটনা। তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে আমার মৃত্যু পর্যন্ত একথা কাউকে বলবে না, মৌরিনকেও নয়।পাদ্রীর সামনে গিয়ে স্বীকারোক্তি করার সাহস আর আমার নেই। মনে করো তোমার কাছেই জীবনের সায়াহ্নে আজ স্বীকারোক্তি করছি।”
অভয় দিলাম, “যা শুনবো সবই আমার মধ্যেই থাকবে, কেউ কোনদিন কিচ্ছু জানবে না ।”
খানিক্ষন হাঁটার পর একটা গাছের তলায় সলমন বসে হাঁপাতে থাকে ইশারায় আমাকেও বসতে বলে। আমিও বসলাম,কিছুক্ষন পর ওর স্বাসপ্রসাস খানিক স্বাভিক হতে ও বলে, “দীর্ঘদিনর দরিদ্রের যাতনা আমাকে অত্যন্ত লোভি করে দিয়েছিলো ঠিক যেমন ক্ষুধার্তের খাদ্যের প্রতি স্বাভাবিক লোভ হয় । মাথায় ঘোরপাক খেত নানা চিন্তা, কিভাবে চটজলদি বড়লোক হওয়া যায়, নিষ্কৃতি পাওয়া যায় দরিদ্রের যন্ত্রনা থেকে। খনি থেকে হীরে বের করার প্রক্রিয়া আমার মস্তিষ্কে আসতেই কুট বুদ্ধি খেলে গেলো, কেন না আরো কজনকে দলে নি, কাজটা তাড়াতাড়ি হবে। চার জনক শ্রমিককে দলে নিলাম। প্রথম থেকেই ছক কষে রেখেছিলাম খানিক হীরে জমলেই পরিবার আর হীরে নিয়ে চম্পট দেব কোন বিদেশ বিভূঁইয়ে যেখানে কেউ আমার কোনদিন খোঁজ পাবে না।”
চমকে উঠি সলমনের গল্প এমন অপ্রত্যাশিত মোড় ঘোড়ায়, মাথা কেমন গোল গোল ঘুরতে থাকে । লোকটা কি তাহলে আদপে আমার চিন্তার আয়ত্তের অনেক বাইরে? অনেক বেশী জটিল আর কুটিল? ফ্যাক্টরির মালিককে একবার বলতে শুনেছিলাম, “অনেক মানুষের সাথে মিশে শিখেছি মানুষ চেনা আর মানুষের ভিতরটা চেনার মধ্যে অনেক পার্থক্য।”
আমি মুখে কিছু না বলে শুনতে থাকি, সলোমন বলে, “আমার পরিকল্পনা মত আরও চারজনকে খুব সাবধানে হীরের লোভ দেখিয়ে দলে নিলাম। আমার বরাতটাই খারাপ, আহাম্মক চারজনই জল ঢেলে দিল আমার মতলবে । খানিক হিরে জমতেই কারোর আর তর সহে না, সকলে তার নিজের ভাগ চাইতে লাগলো। বোকার দল, আমি সকলকে ভাগ দেবার জন্য এতো কষ্ট করে, এত আঁটঘাট বেঁধে পরিকল্পনা করিনি মূর্খ গুলো তা ঘুনাক্ষরেও টের পায় নি । সেই সময় হীরে নিয়ে পালতে গেলে ধরা পড়ে যেতাম কারণ ওরা সবাই আমার ওপর নজর রাখছিল । অন্য ফন্দী আঁটলাম, একরাতে অনেক সুস্বাদু খাবার, পানীয় নিয়ে পৌঁছলাম একজনের বাড়ি যে রোজই হীরের বখরা চাইছিল। ওর প্রতিদিন মদেই অনেক খরচ । সুস্বাদু খাবারের আর মদের লোভ সামলানো ওর পক্ষে মুশকিল সেটা জানতাম । খাবারে মেশানো তীব্র ঘুমের ওষুধে মুহূর্তের মধ্যে ওদের সবাইকে অচেতন করে দিল। ব্যাস এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, ওদের সকলকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে চুপচাপ বাড়ি ফিরলাম। পরদিন ওই পরিবারের মৃত্যুর খবর বস্তিতে ছড়াতেই দলের বাকি তিনজনের কাছে রটিয়ে দিলাম শুঁড়িখানায় নিশ্চয় নির্বোধ মাতালটা মদের নেশায় কিছু বেফাঁস বলে ফেলেছে আর সর্বত্র ছড়ানো গুপ্তচর মারফৎ মালিকের কানে তা চলে যাওয়ায় মালিকের গুন্ডাদের হাতে ওর পুরো পরিবারের মৃত্যু হয়েছে । ভয়ে বাকি তিনজন সিঁটিয়ে গেল তবে মাত্র কিছুদিনের জন্য। আতঙ্কিত মুসোর বাবা একদিন রাতে এলো জানাতে ও নিজের ভাগের হীরে নিয়ে যত শীগ্র সম্ভব অন্য জায়গায় চলে যেতে চায়। ওকে বললাম রাত বাড়ুক চিরিদিক নিশুতি হলেই ওর ভাগের হীরে আজই ওর বাড়ীতে পৌঁছে দেব ।”
জিজ্ঞেস করলাম, “মুসোর বাবা মানেই তো খনি শ্রমিকদের সর্দার?”
আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে সলমন বলতে থাকে, “রাত গভীর হতেই বেছে বড় কতকগুলো হীরে আর এক বোতল মদ নিয়ে পৌঁছলাম ওর বাড়ী। বড় বড় হীরেগুলো পেয়ে ব্যাটা বেজায় খুশী। বললাম আর হয়তো কোনোদিন আমাদের দেখা হবে না হীরেকে সাক্ষী রেখে একসঙ্গে শেষবারের মত এক পেয়ালা হয়ে যাক, ওর বৌকেও আমন্ত্রণ জানালাম। আমার অভিসন্ধির বিন্দুমাত্র আঁচ না করে দুজনেই তীব্র্র ওষুধ মেশানো সুরা পান করে অচৈতন্য। কোমরে গোঁজা ছোরা দিয়ে ওদেরকে শেষ করে, হীরাগুলো আর ঘুমন্ত মোসেকে কোলে করে অন্ধকারে মিলিয়ে যাই । সেদিন ভোর রাতেই বাইবেল আর মৌরিনকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দি ওর আত্মীয়ের বাড়ির উদ্দেশ্যে।”
এতক্ষন সলমনের গল্প শুনে আমার মাটির তালার জমিই যেন নড়ে উঠল, বুড়ো বোকা বোকা দেখতে লোকটার মাথা যে এমন বিষাক্ত আজ প্রথম জেনে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। ভাবছিলাম কাকে বিশ্বাস করে এই দুর্গম দুঃসাহসিক পথে পাড়ি দিয়েছিলাম, নিজের স্বার্থে মিথ্যাচার বা মানুষ খুন কোনটাই করতে পেছপা হবে না। যতই ও মৃত্যুপথযাত্রী হোক, যতই আমার কাছে স্বীকারোক্তি করুক, ঠিক করলাম ওর দেওয়া আর কিছু খাওয়া চলবে না আরও সাবধানে থাকতে হবে । কে জানে ওর পাপ জেনেছি বলে কোন দিন হয়ত আমারই পাত্তা সাফ করে দেবে। ওকে আর কোনো বিশ্বাস নেই।  মনে একটা প্রশ্ন খোঁচা দিচ্ছিল, “তাহলে মুসোকে বাঁচিয়ে রাখলে কেন? ওকেও তো শেষ করে দিতে পারতে?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“কি করে ওকে মারতাম, ওতো আমারই রক্ত,” সলমনের গলা ভারী হয়ে ওঠে।
ওর উত্তরে চমকে উঠি আমি, “মানে?” তাজ্জব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“মুসোর মায়ের সঙ্গে গোপনে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ট শারীরিক সম্পর্ক ছিল যা কেউই জানতো না। মুসো যখন তিন, টাইফয়েডের মহামারী ছড়িয়ে পরে আমাদের খনি বস্তিতে, মুসোর মা তাতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ওর কথিত বাবা বছর ঘুরতে আবার বিয়ে করে। ইচ্ছে ছিল মুসোকে আমার সঙ্গেই রাখি কারণ মুসোর সৎ মা ওর তেমন যত্ন নিত না। কিন্তু নিজের পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে তা আর পারি নি।“
“তুমিই যদি সকলকে খুন করে থাকো তাহলে তোমার বাড়িতে কারা হামলা করল?” আমার কৌতুহলী প্রশ্ন।
“মুসোকে ওখান থেকে সরানোর তাড়াহুড়োতে ব্যাপারটাতে তেমন গুরুত্ত্ব দিই নি। ওকে রেখে বাড়ী ফেরবার সময় মনে একটা খটকা লাগলো । মনে পড়ল অচৈতন্য হওয়ার আগে মুসোর বাবা যেন জড়ানো গলায় বলছিলো কাকে যেন বলেছে আজ হীরের ভাগ পাবে। ফেরার বাকি রাস্তাটা খুবই উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলাম, কে জানে বাড়ী ফিরে কি দেখব? ইচ্ছে করে রাতের অন্ধকারে বাড়ীতে গেলাম। ঢুকেই বাড়ীর হাল দেখেই বুঝলাম কি হতে পারে। আমার আর মৌরিন দুজনের জীবন বিপন্ন। আর কি প্রাণ বাঁচাতে পালালাম ।”
(পর্ব ৯)
খানিক্ষন চুপ করে থেকে সলোমন নিজে থেকেই বলে, “তুমি কিছুক্ষন আগে জিজ্ঞেস করছিলে আমাকে মুসোর বাবা অর্থাৎ খনির সর্দারের কথা? সত্যিটা আজ বলছি তোমাকে আমিই মুসোর বাবা তোমাকে আগেই বলেছি আর খনি শ্রমিকদের সর্দারও আমিই । ‘সলমন’ মুসোর পরিচয় মাত্র বাবার নাম, আমার আসল নাম এটা নয়। ভাবছ এতদিন কেন নাম ভাঁড়িয়ে ছিলাম? নিজেকে ও মৌরিনকে বাঁচাতে, কেউ যাতে না জানতে পারে হীরে নিয়ে পলাতক খনি সর্দার আসলে এখনও জীবিত। দলে আরও চারজন গাধাকে নিয়েছিলাম, আমি ছাড়া কেউ জানতো না দলে আর কে কে আছে, সবই আমার পরিকল্পনা মত অত্যন্ত গোপন ছিল। দেখ এতো কিছু করেও পালিয়ে বেড়াচ্ছি ।”
“হীরে নিয়ে পালানো তো তোমার পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল,” আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে ও দূরে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে।
সলমনের জীবনের ঘটনা যত শুনছি ততই আশ্চর্য হচ্ছি। অবশ্য ওকে যেটুকু চিনেছি পাঁকে পড়ে ও নতুন গল্প শোনাচ্ছে না সত্যি বলছে হলফ করে বলতে পারবো না। দেখতে ওকে খুবই সাধারণ, নিরীহ, সৎ, ধার্মিক বলে মনে হয়। এমন ধীরে গুছিয়ে কথা বলে যে ওর কথা অবিশ্বাসও কেউ করবে না। আজ জানলাম ও কতটা বিশ্বাস যোগ্য, কি ধূর্ত আর কুট বুদ্ধিতে ওর মগজ ঠাসা। স্বার্থসিদ্ধির জন্য যে কোন পর্যায়ের নরকীয় নৃশংশ হতে ওর বিন্দুমাত্র সময় লাগবে না । ওর কথা যত জানছি ততই হতভম্ব হচ্ছি আরো কত আশ্চর্য হওয়া বাকি আছে, কে জানে? যতই অসুস্থ হোক ওর সঙ্গে এক ছাদের নিচে বাস করতে হবে ভেবেই ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠছি।
একটু থেমে সলোমন বলে, “সেদিন গভীর রাতে মুসোর সৎ মা আর বাবাকে মেরে ওকে ঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ে যখন ফিরছিলাম মনে হয়েছিল অন্ধকারে আমার দলের একজনকে যেন মাতাল অবস্থায় দেখলাম। যদি ওই সময়ই ওর মোকাবিলা করে নিতাম! তাহলে আমাকে মৃত্যুভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হত না আমার পরিবারেরও সকলে হয়তো আজ জীবিত থাকত । পরদিন মোসের পরিবারের মৃত্যুর খবর চাউর এবং আমার কাউকে কিছু না বলে উধাও হওয়া নিশ্চয় ওদের উস্কেছে আমার বিরুদ্ধে । আমি সঠিক জানি না আমার দলের বাকি দুজন না খনি মালিকের গুন্ডারা আমার পিছনে। শুধু জানি সর্বদা মৃত্যু আমার পিছনে ধাওয়া করছে, আজ তো ডাক্তারের জানলাম আমার পাপ আমাকে গ্রাস করেছে । একটাই অনুরোধ লালু আমার জীবনের পাপ যেন তোমার আর মৌরিনের সম্পর্কে কোন বাধা সৃষ্টি না করে। তোমাকে যা বললাম মৌরিন তার কিছুই জানে না তুমিও ওকে কিছু বোলো না।”কেন জানি না, প্রতিদিন সচক্ষে দেখা ওর কষ্টভোগ না মৃত্যুপথযাত্রীর অনুরোধ। ইচ্ছে না হলেও আমার মন কেমন ওর প্রতি নরম হতে থাকে ওর প্রতি। মৌরিনকে কোনোদিন তাই বলিনি ওর মুখে যা শুনেছিলাম।
ওর শেষের দিনগুলোতে ও প্রচন্ড যন্ত্রনা ভোগ করেছে । আমাদের সামনে কিছু হয় নি দেখানোর প্রানপন চেষ্টা করলেও আড়াল থেকে শুনেছি ব্যাথায় কুঁকিয়ে ওকে বলতে, “হে ঈশ্বর আর সহ্য হচ্ছে না, দোয়া করে আমাকে মৃত্যু দাও।’
হাসপাতালে ওকে অনেকবার নিয়ে গেছি। ডাক্তার প্রতিবারেই বলেন এই অবস্থায় ব্যাথা সামান্য উপশম ছাড়া আর কোনও ওষুধ নেই আমার কাছে।
আমাকে ডেকে একদিন বললো, “বুঝতে পারছি যে কোনদিন আমার ডাক আসবে, তোমাদের বিয়ে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যেতে চাই, কালই তোমরা বিয়ে করে নাও।”
আমি আইনি বিয়ের পক্ষপাতি, তাহলে আমার স্ত্রী হিসেবে মৌরিন সহজেই জাহাজে ওঠার ছাড়পত্র পাবে। সলোমন খুব কষ্ট করেই আমাদের বিয়েতে অংশ নিল। কচি বাচ্চার মত আনন্দ ওর চোখে মুখে বাড়ী ফেরার পথে বললো, “একটা নতুন জুতো কিনবো,”
নতুন জুতো পায়ে পরে দেখি আধ ছেঁড়া পুরনো বুট সঙ্গে নিয়ে চলেছে, “তোমার ওই করুন বুট বাড়ী বয়ে নিয়ে যাচ্ছ কেন? এখানেই ফেলে দাও,” আমার কথার উত্তরে ও বলে, “বাড়ী যাই তারপর।”
কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে লাগলাম।
বাড়ী ফিরে আমাকে আবার আশ্চর্য করে বুড়ো। নিজের বুটের ভিতরকার সুকতলা উপড়ে ছোট বড় মিলিয়ে একমুঠো হীরে আমাদের দুজনকে উপহার দিয়ে বলে, “ঈশ্বরের কাছে তোমাদের সুখী জীবনের প্রার্থনা করি, এবার এই বুট ফেলে দিও,” । অজান্তে কেন জানি না সেদিন ওই নিষ্ঠূর বুড়োর জন্য চোখ ভিজে গেছিল।
এর অল্প দিন পর সলোমন একদিন ঘুম থেকে আর উঠলো না ।
কেন জানি না পিতৃ বিয়োগের পরই মৌরিন মত পালটে ফেলে, ভারতে আসার তার আর কোনো ইচ্ছে নেই, অগত্য মোম্বাসাতেই থেকে গেলাম। বেশ আনন্দেই ছিলাম একটা কাজও জোগাড় করে নিলাম। বছর ঘুরতে মৌরিন অন্তসত্তা। সব ঠিকই ছিল, হঠাৎ এক প্রচন্ড ঝড় জলের রাতে কাজ থেকে ফিরে দেখি মৌরিনের পেটে প্রচন্ড যন্ত্রনা সঙ্গে ভীষণ জ্বর।
অনেক কষ্টে ওকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, কপাল খারাপ রাতে কোন ডাক্তার নেই। ওই দুর্যোগের পুর রাততা যন্ত্রনায় মৌরিন ছটফট করেছে। পরদিন ডাক্তার এসে ওকে পরীক্ষা করেই আমাকে জানায় অনেক দেরি হয়ে গেছে, মৌরিন পা পিছলে নাকি দু দিন আগে পড়ে গেছিল। এব্যাপারে আমাকে ও কিছুই জানাই নি। ডাক্তার অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মৃত ভ্রূণ থেকে সারা শরীরে সেপটিক ততক্ষনে ছড়িয়ে গেছিল । মৌরিন ও সন্তানকে একই দিনে হারিয়ে এক্কেবারে ভেঙে পড়েছিলাম সেদিন । বছর লেগে গেল নিজেকে খানিকটা সামলাতে তারপরে ঠিক করলাম দেশে, নিজের লোকেদের কাছে ফিরে যাব।
মোম্বাসা থেকে বোম্বে ফিরে হীরে বিক্রির টাকায় রাজার হালে দিন কাটছিলো। একদিন আলাপ হল চৌধুরী পরিবারের একজনের সাথে। ওদের পরিবারের কেউ গ্রামে থাকে না। জলের দরে এই বাগানবাড়ি বিক্রী করতে চাইছে, ভাবলাম বড় বাড়ি, সকলে একসঙ্গে থাকব, তাই কিনেই ফেল্লাম।
লালকাকার কথা শুনেই মা বললে, “করেছো কি ঠাকুরপো ওই অলুক্ষণে ভুতুড়ে বাড়ির ত্রিসীমানায় কেউ যায় না এক্ষুনি বিক্রি করে দাও। ঐ বাড়িতে কে থাকবে?”
লালকাকা হেঁসে বলে, “ভূতফুত আমি বিশ্বাস করি না, মিছে তোমাদের যত ভয়, আজ রাতে ওই বাড়িতে থেকে তা তোমাদের কাছে প্রমান করে দেব।”
লালকাকার কোথায় বুকের ভিতরটা কেমন হিম হয়ে গেল। আমি ও মা একে ওপারের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। আমার ও মায়ের অনেক বারণ অগ্রাহ্য করে সেদিন বিকেলে লালকাকা গেলো চৌধুরী বাড়িতে রাত কাটিয়ে প্রমান করতে ভুত ফুথ সব বাজে কথা।
লালকাকার সঙ্গে আমাকেও যেতে হল ওই বাড়ি পর্যন্ত ওকে পৌঁছতে। শীতের সন্ধ্যের আলো আঁধারিতে বিশাল বাগানবাড়িটাকে কাছ থেকে যেন একটা দৈত্য পুরি মনে হচ্ছে। বাড়ির চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ওখানে গিয়েই আমার কেমন গা ছমছম করছে। বাগানবাড়ি অবধি গেলাম, গেটের ভিতরে কিছুতেই ঢুকলাম না। আমাকে ব্যঙ্গ করে লালকাকা বলে “গেঁয়ো ভীতুর দল যত,”
একফ্ল্যাস্ক চা, মার রাঁধা রাতের খাবার, টর্চ, দেশলাই আর মোমবাতি সঙ্গে নিয়ে লালকাকা ওই ভূতপুরীর গেটে।
বিদায় নেবার আগে বললাম, “কোন রকম বিপদ বা ভয়ের কিছু দেখলে তক্ষুনি বাড়ি ফিরে আসবেন,”
“মাওঃ, ” শুনেই চমকে উঠি। একটা বিদঘুটে দেখতে মিশ কালো বেড়াল, আবছা শীতের অন্ধকারে ওর হলদে চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে আমাদের দিকে তাকিয়ে ল্যাজ নাড়ছে।
বেড়ালটার দিকে তাকিয়ে লালকাকা বলে, “এই মেনি বেড়ালই আজ রাতে আমার সঙ্গী,” আমাকে বাই করে মুচকি হেঁসে লালকাকা ওই বাড়ির ভেতরে গেল, ওই বেড়ালটাকে ওনার পেছনে যেতে দেখলাম।
পরের দিন সকালে চা- জলখাবার নিয়ে আসব প্রতিজ্ঞা করে আমিও বাড়ী ফিরে এলাম।
 (পর্ব ১০)
পরদিন শীতের সকালে মা কাকভোরে উঠে দেখি লুচি আলুভাজা করছে। শত হোক হীরেওলা দেওর বলে কথা, যত্নআর্থিও সেইমত । ভোর ছটায় লালকাকার জন্য চা জলখাবার নিয়ে পৌঁছলাম চৌধুরীদের বাগানবাড়িতে। এমনিতে শীতের সকাল বাতাসে ভালোই হিমের পরশ, পাতলা কুয়াশার চাদরে চারিদিক কিছুটা অস্পষ্ট । এর আগে ভয়ে কোনদিন ওই বাড়ির ত্রিসীমানায় যাইনি, সেদিনই প্রথম এতো কাছ থেকে দেখছি। বাড়ী ঘিরে ১০ ফুটের উঁচু পাঁচিল, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এক্কেবারে জরাজীর্ণ। কোথাও ইঁট খসে পড়েছে তো কোথাও আগাছা গজিয়েছে। সামনে মস্ত লোহার রেলিংওলা গেট, অনুমান করতে পারছি দুজন লেঠেল সবসময় এই গেট পাহারায় থাকত। গেট পেরিয়ে মোরাম বিছানো পথ অর্ধচন্দ্রাকারে বাগান পেরিয়ে পৌঁছেছে একেবারে সাহাবী বাংলো কায়দায় তৈরী বিশাল অট্টালিকার গাড়ী বারান্দায়। মোরাম আজ খুঁজতে হয় বুনো আগাছা আর ঘাসের মাঝে। কোনো এক সময় এই বাগানে শীতে মখমলের মতো সবুজ ঘাসের মাঝে গোলাপ, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা শোভিত ছিল আজ আগাছা,বুনো কাঁটাঝোপ, শুকনো পাতা, ভাঙা গাছের ডাল ছাড়া কিচ্ছু নেই।
অট্টালিকার সামনে পৌঁছে উত্তেজনায় বুকের ধুক ধুক বেড়েছে। মনে দ্বিমত, গেটের ভেতরে ঢুকবো নাকি বাইরে থেকেই লালকাকাকে হাঁক দেব । গেটের সামনে কয়েক মূহুর্ত্ত দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেট ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করলাম, মনে হলো কে যেন চুম্বকের মতো আমাকে টেনে নিল । ওই দূরে বাগানবাড়ির ডানদিকে একতলা ছাদ ভাঙা ঘরগুলো বোধহয় ঘোড়ার আস্তাবল ছিল। কয়েক পা হেঁটেছি হঠাৎ কোথা থেকে “মিঁয়াও” ডাকে চমকে দেখি আমার সামনে কোথা থেকে উদয় হয়েছে কাল রাতে দেখা মিশ কালো বেড়ালটা । ওকে দেখেই শরীর কেমন কেঁপে ওঠে, চোখদুটো কেমন জ্বলজ্বলে হলুদ সোজা আমার দিকে চেয়ে আছে। আমার আগে আগে কয়েক পা হেঁটে থামে, পিছন ফিরে আমার দিকে তাকায়, আমি কাছে পৌঁছলে আবার এগিয়ে চলে। এমনি করে গাড়িবারান্দার কাছে পৌঁছে গেছি, শ্বেতপাথরের পাঁচ-ছ ধাপ সিঁড়ি উঠে গেছে বাড়ীর বন্ধ দরজা পর্যন্ত। ভাবছি সিঁড়ি দিয়ে উঠবো নাকি ফিরে যাবো?
“কালু ! কখন এলি?” ঘুরে দেখি আমার ঠিক পেছনে লালকাকা। বেড়ালটাকে নিয়ে এত বেশী ভাবছিলাম যে লালকাকার হেঁটে আসার পদশব্দ শুনতে পাই নি । ওনাকে দেখে যাই হোক শরীরে স্বস্তি এল, অজানা ভয়ের গা ছম্ছমে ভাবটা এক্কেবারে কেটে গেল। গতকালের ছাই রঙের সুটই পরে আছেন ।
মলয়দা বলেন, “তাহলে লালুবাবু সকলের ভয়কে মিথ্যে প্রমান করে দিলন?”
“সেই মুহুর্ত্তে আমাকে অবশ্যই!” কালু বলে চলে, “লালকাকাকে জিজ্ঞেস করলুম তুমি কি কোট পরেই ঘুমোও নাকি?”
লালকাকা বলেন ” পাথরের মেঝে রাতে খুব ঠান্ডা ছিল আর সারাদিনে এমন ক্লান্ত যে জামাকাপড় পালটানোর সময়ও পাই নি ।”
“সারারাতে জামাকাপড় পাল্টাতে পারো নি? যাক তোমার জন্য চা জলখাবার নিয়ে এসেছি,”
“দারুন, চল ওপরের ঘরে গিয়ে একসাথে বসে খাওয়া যাবে, দেখবি কি বিশাল আমার শোবার ঘর,”
” বললাম এখানে বসেই খেলে হত না?”
কালুর কথা একরকম উড়িয়ে দিয়ে লালকাকা বলে “দূর বোকা! ঠান্ডায় এখানে কিরে? আমরা এখন থেকে এখানেই থাকবো ভিতরটা দেখতে হবে না? চল চল।”
বলেই লালকাকা সোজা হনহনিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো । উনি যখন সঙ্গে আছেন ভেতরে যেতে আর ভয় কি? আমিও পিছু নিলাম। ভারী সেগুন কাঠের দশফুটের দরজা ঠেলে ঢুকলাম। ভেতরটা ঠান্ডা ও স্যাৎস্যেতে, অনেকদিন জানলা দরজা বন্ধ থাকায় কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ। আধো আলোয় চোখ একটু অভ্যস্ত হতে দেখলাম আমি দাঁড়িয়ে দোতলা সমান ছাদের তলায়, ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল বিলিতি ঝাড়লণ্ঠন। এক ইঞ্চি ধুলোজমা শ্বেতপাথরের মেঝের ওপরে সাজানো বাহারি আরাম চেয়ার, শ্বেতপাথরের টেবিল, ফুলদানি রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে করুন থেকে করুণতর তাদের অবস্থা, দেয়ালে বাঘ,হরিনের মাথার সঙ্গে রয়েছে বড় বড় তৈলচিত্র যার অর্ধেকই রং উঠে গেছে, র্নিশ্চয় চৌধুরী বংশধরদের। ডান দিক থেকে ছফুট চওড়া শ্বেতপাথরের রেলিং দেয়া সিঁড়ি বাঁক নিয়ে উঠে গেছে দোতলায়। নীচথেকে দোতলার রেলিং দেয়া দালানটা দেখতে পাচ্ছি।
লালকাকা “আয়” বলে দোতলায় উঠতে শুরু করেছে ওর সঙ্গে কালো বেড়ালটাও উঠছে।
“বেড়ালটাকে কোথা থেকে জোগার করলে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“যখন থেকে এ বাড়ীতে এসেছি ও আমার সঙ্গ নিয়েছে, এখন আমরা বন্ধু হয়ে গেছি ।” লালকাকা হেঁসে বললো।
নোংরা ধুলো বালি পড়ে থাকা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় আমার প্রতি পদক্ষেপে চটির খস খস আওয়াজ হচ্ছে অথচ লালকাকা ও বেড়ালটা উঠলো বিনা আওয়াজে ভাবলাম নিশ্চই বিলিতি জুতোর কামাল। দোতলার অন্ধকারাচ্ছন্ন দালানটার দুদিকে সারি দিয়ে বন্ধ ঘরের দরজা। শুধু একটা ঘরের খোলা দরজা দিয়ে আলো এসে দালানটা খানিকটা আলোকিত করেছে । আমাকে লালকাকা অনুসরণ করার ইশারা করে ওই ঘরেই প্রবেশ করল সঙ্গে ওই বিটকেল বেড়ালটাও।
পিছু পিছু দরজার মুখে পৌঁছে দেখলাম সত্যি বিশাল ঘরখানা। বিশাল জানলা গুলোতে রঙিন কাঁচের শার্শি যার অনেকগুলো ভাঙা, সেখান দিয়ে বাইরের ভোরের আলো এসে ঘরটাকে খানিকটা আলোকিত করেছে। ঘরের এক কোনে বিশাল পালঙ্ক, বড় আয়না, কাঠের টেবিল চেয়ার যত্নের অভাবে আজ তাদের দৈন্যদশা । কিন্তু লালকাকা কৈ?
‘লালকাকা’ বলে ডাকতে যাচ্ছিলাম তখনই কিসে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পরে গেলাম যেন কার ওপরে। সামলে উঠতে যাচ্ছি মেঝের দিকে নজর গেল। আমি সোজা হুমড়ি খেয়ে পড়েছি লালকাকার ওপরে। মার্জনা চেয়ে লালকাকাকে ওঠাতে গিয়ে দেখলাম লালকাকার ঠান্ডা নিথর মৃত দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। আমার রক্ত হিম হয়ে যাবার জোগাড়, হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে, চিৎকার করতে গেলাম কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু গোঁ গোঁ শব্দ বের হল । টর্চ, খাবার, ফ্লাস্ক ছড়ানো, লালকাকার ভয়ার্ত খোলা চোখ উল্টে গেছে, চেয়ে আছে যেন ছাতের দিকে।
আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় টলতে টলতে ছুটলাম সিঁড়ির দিকে। পিছন থেকে হঠাৎ হাড়কাঁপানো হিঃহিঃহিঃ মহিলা কণ্ঠে খিলখিলিয়ে অট্টহাসি, তা যেন সারা বাড়িময় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে । পড়ি কি মরি করে সিঁড়ির মুখে পৌঁছেছি এমন সময় কথা থেকে ওই কালো বেড়ালটা আমার মুখ লক্ষ্য করে ঝাঁপালো। নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে শ্বেতপাথরের সিঁড়িদিয়ে প্রথমে ডিগবাজি ও শেষটায় গড়িয়ে মুখথুবড়ে পড়লাম এক্কেবারে নীচের সিঁড়িতে । আমার মাথার কাছে লাল শাড়ি পরে কে যেন দাঁড়িয়ে মুখ তুলে দেখলাম মহিলা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে, জ্ঞান হারাবার আগে ওর চোখের দিকে তাকাতেই সারা শরীর হিম হয়ে গেল। ওর দুটো চোখই সম্পূর্ণ সাদা তাতে কোন মনি নেই। সদ্য মনে হয় পান খেয়েছে তার লাল দাঁত বের করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে, “কবে থেকে তোকে ডাকছি এতদিনে এলি হিঃহিঃহিঃ,”
“আমার মুখ দিয়ে শুধু পদ্মা শব্দটা বের হল, তারপর কি হল জানি না,” বলে কালু থামে।
(পর্ব ১১)
মলয়দা বলেন, “কালুর লম্বা গল্প শুনতে শুনতে অনেক্ষন সন্ধ্যে নেমেছে, চায়ের দোকানের বাইরে জমাট অন্ধকার, আশপাশে ঝোপ ঝাড়ে শুরু হয়েছে ঝিঝির ডাক । দোকানের ভিতরের লম্পের কাঁপা আলোর একফালি বাইরে পড়েছে। এদিকে বাড়ি ফেরার তাড়া, বললাম তারপর? কোনো সাড়া না পেয়ে একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে আবার কালুকে তাড়া লাগাতে জিজ্ঞেস করলাম, তারপর কি হল কালু? চারিদিক নিস্তব্ধ, একটা থমথমে নীরবতা, কালুর কোনো উত্তর না পেয়ে একটা সিগরেট ধরিয়ে নিবন্ত দেশলাই শেষ রশ্মিটুকুর আলোতে কালু যেখানে বসে ছিল সেখানটা দেখতেই চমকে উঠলাম কালু নেই ওখানে বসে একটা মিশ কালো বেড়াল তার দুচোখ হলদে ভাটার মত যেন জ্বলছে । গায়ে দেশলাইয়ের আলো পড়তেই মাওঃ করে একলাফে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
তাই দেখে অরুণা শিউরে ওঠে, “মলয় এক্ষুনি চল এখন থেকে।”
আমি অকুতভয় ভাবলাম কি অদভূত ছোকরা না বলে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। গাড়ির দিকে যেতে গিয়ে দেখলাম বুড়ো দোকানী দোকান বন্ধে ব্যস্ত। আমাদের দেখে বললে এখনও আছেন আপনারা, তাড়াতাড়ি চলে যান এখন থেকে?
“এই যাচ্ছি, আপনাদের গ্রামের ছেলে কালুর গল্প শুনছিলাম, হঠাৎ মাঝপথে সে যে কোথায় চলে গেল?”
দোকানি আমার দিকে আশ্চর্য হয়ে কয়েক মূহুর্ত্ত তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনি কালুকে দেখেছেন? অনেকদিন পর ও তাহলে দেখা দিল। কাকা -ভাইপো, লালু আর কালু অনেক বছর আগে ওই চৌধুরী বাড়িতে মারা যায় । আমাদের গ্রামে আর কোন কালু বা লালু নেই। কেউ তাদের বাচ্চাদের ভুলেও ওই নাম আর রাখে না। সাবধানে যাবেন। রাম রাম রাম রাম।”
দোকানির কথায় একটা শৈত প্রবাহ শিরদাড়া দিয়ে বহে গেল। খেয়াল করলাম অরুণা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে ভয়ে ওর মুখ ফেকাসে।
আর দেরি না করে গাড়িতে স্টার্ট দিলাম, যানহীন রাস্তায় বাড়ির পথ ধরেছি, দোকানির শেষের কথা গুলোতে খুব আতঙ্কগ্রস্ত অরুণার, ওর মুখে কোন কথা নেই। খানিকটা এগিয়ে ওর দিকে তাকাতেই চমকে উঠি, অরুণা কোথায়? ওর জায়গায় বসে আছে অন্য একজন মহিলা। পরনে লাল বেনারসী, নাকে নথ, একেবারে বিয়ের সাজে সেজে । হাঁসিমুখে সে আমার দিকে ঘুরে তাকায়, চোখাচুখি হতেই আমার শরীরের সমস্ত রক্ত জল হয়ে গেল, ওর চোখে মনি নেই পুরোটাই সাদা। হিঃহিঃহিঃ করে অট্টহাঁসি হেঁসে বলে বাবু আমার বাড়িটাতে হোটেল করবে? বলতে যাচ্ছিলাম ‘অরে না না’ কিন্তু লক্ষ্য করলাম আমার শরীর ক্রমশ নিশ্চল হয়ে যাচ্ছে । মুখ দিয়ে কাঁপা গলায় একটাই শব্দ বের হল, “পদ্মা” ততক্ষনে গাড়ি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে উর্দ্ধশ্বাসে এগিয়ে চলেছে কোন দিকে জানি না। সামনে থেকে একটা তীব্র সাদা আলো এসে আমাকে প্রায় অন্ধ করে দেয়, অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই গাড়ির স্টিয়ারিং একটুও ঘোরাতে পারলাম না। সমস্ত শরীর অবশ, কানফাটানো প্রচন্ড একটা ধাক্কার শব্দ…….”
মলয়দা অনেক্ষন গল্প বলে ক্লান্ত, কিন্তু শুভর অপ্রতিরোধ্য আগ্রহ, “ওই আকসিডেন্টের পরে কে আপনাদের হাসপাতালে নিয়ে গেলো?”
কোন উত্তর নেই শুধু নির্জন নিস্তদ্ধতাকে ভঙ্গ করে সমুদ্রের হাওয়া শুভ আর জয়ার কানে শুধু শোঁ শোঁ শব্দ করে এক নাগাড়ে বহে যাচ্ছে ।
শুভ বলে “ও মলয়দা শুনছেন?”
উত্তর না পেয়ে মলয়দা বৌদির একনাগাড়ে সামনে হাঁটা ওরা দুজনেই সরাসারি পিছনে ঘোরে। যা দেখে তাতে ওদের শিরদাঁড়াও কেঁপে ওঠে। ওদের ঠিক পেছনে একটা কালো বেড়াল ওদের সঙ্গে হাঁটছিলো এতক্ষন। শুভর টর্চের আলোতে ওর হলদে চোখ দুটো ধক করে জ্বলে ওঠে যেন। বেড়ালটা একলাফে পথের পাশের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
নিশুথী সমুদ্রের জনহীন রাস্তায় এই মুহুর্ত্তে একা শুধু ওরা দুজন। কোথায় মলয়দা বা বৌদি? চাঁদের আলোয় যেটুকু দেখা যায় তাতে একটাও জনপ্রাণী নজরে আসে না । জয়া ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। বিস্ময়,আতঙ্ক ওদের চোখে মুখে। সমস্ত ঘটনায় বিভ্রান্ত, হতবাক দুজনেই, বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকে, অনিশ্চিত কি করা উচিত। জয়াই শুভর হাত ধরে টান দিল ও দুজনে প্রায় পড়ি কি মরি, ছোটে হোটেলের দিকে।
হোটেলের গেটের ভেতরে ঢুকে দুজনে হাঁপাচ্ছে, সামনের লনের অস্পষ্ট অন্ধকারে মনে হোল একটা কালো কি যেন লাফিয়ে চলে গেল। হঠাৎ কেঁচ কেঁচ লোহার শিকলের শব্দ। আওয়াজে যেদিক থেকে আসছে সেদিকে তাকিয়ে দুজনেই হতবাক। কেউ নেই অথচ দোলনা দুটো আপন মনে কেঁচ কেঁচ শব্দে দুলে চলেছে, মনে হচ্ছে অদৃশ্য দুজন দোল খাচ্ছে। হওয়াতে শুভর কানে ফিসফিস করে কে বলছে “ভয় কি শুভ আমিতো আছি ” শুভ লক্ষ্য করল বিভিসিকাগ্রস্ত ওর সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে।
জয়ার মুখ আতঙ্কে সাদা কাগজের মত ফেকাসে। হোটেলে ঘরে টলতে টলতে ফিরে জয়া কোনোরকমে খাতে বসে বলে, “শুভ কাল ভোরেই কিন্তু আমরা কলকাতায় ফিরছি।”
ঠিক সেই সময় জানলার বাইরে “মাওঃ”
ঠক ঠক করে ভয়ে কাঁপতে থাকা জয়া বলে, “শুভ শুনছো?”
হোটেলে আরো দুদিনের বুকিং থাকলেও হতভম্ব শুভ বলে, “হ্যাঁ শুনেছি, কালি ফিরবো। এসব জানলে আসতামই না এখানে।”
রাতে শুভকে ঘরের আলো নিভোতে বারণ করল। আলো জ্বললে এমনিতে শুভর ঘুম আসে না, তবুও সে আজ কোনোই আপত্তি করল না। সারা রাত ওরা কেউই ঘুমোতে পারলো না। বার বার ভেসে উঠছিল মলয়দা আর বৌদির মুখদুটো, কানে বাজছিলো ওদের কণ্ঠস্বর।
“একবারই পিছনে ঘুরে ওদের দেখে অস্বাভাবিক কি যেন দেখলাম মনে হয়েছিল। তখন মাথায় আসে নি, এখন বুঝলাম চাঁদের আলোতে আমাদের ছায়া পড়লেও ওদের কোনো ছায়া পড়ে নি,” জয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলে।
শীতকালের ভোরে যখন হোটেলের সমস্ত গেস্ট ঘুমোচ্ছে তখন শুভ আর জয়াকে হোটেল ছাড়তে দেখে হোটেলের ডেস্কে মাফলার জড়ানো ঝিমন্ত কেরানীটি বিরক্ত ও অবাক, “দাদা আজ চেক আউট করলে আপনি কিন্তু দু দিনের টাকা হারাবেন? আমাদের হোটেলে কোনো রিফান্ড হয় না।”
“ঠিক আছে। আচ্ছা বলতে পারেন এই হোটেলে কোন সময় মলয় গাঙ্গুলী ও তার স্ত্রী অরুণা এসে থাকতেন?”
কেরানীটি বলে, “আমি এই বছরেই এসেছি, একজনকে ডাকছি যিনি এই হোটেলে অনেক বছর আছেন, হয়তো তিনি বলতে পারেন।”
শুভ দরকার নেই বলতে যাচ্ছিল তার আগেই কেরানীটি হাঁকে, “রতনদা একবার আসবেন?”
মাঙ্কিক্যাপ ও মাফলারে আবৃত, মোটা কাঁচের চশমা পড়া প্রায় ষাট ছুঁই ছুঁই রতনদা সকালের তোড়জোড়ে ব্যাস্ত বিরক্ত মুখে এলেন,”এখন ডোম ফেলার সময় নেই..কি ব্যাপার?” শুভ জয়াকে দেখে রতন বলেন “আপনারা ৩০৫ নম্বর ঘরে ছিলেন না? এখনই চলে যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ। আচ্ছা মলয়-অরুণা গাঙ্গুলী বলে এক দম্পতিকে কি মনে পড়ে আপনার?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদের বহু পুরনো কাস্টমার, ৩০৫ নম্বর ঘরেই বেশি থাকতেন। দু ‘বছর হলো আর আসেন না। শুনেছি এক পথ দুর্ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়। আপনি কি ওনাদের চিনতেন?”
শুভ কোন উত্তর না দিয়ে সুটকেসটা নিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
পাতলা কুয়াশার চাদরে ঢাকা শীতকালের সকাল তবুও শুভ বেশ বেগেই গাড়ি চালাচ্ছে।
জয়া বলে, “শুভ !এই কুয়াশার মধ্যে একটু আসতে চালাও।”
“এতো সকালে এরাস্তায় গাড়ি নেই আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মলয়দাকে স্মৃতি থেকে বাইরে করতে চাইছি ।”
ঠিক সেই সময় গাড়ির পিছনের সিট্ থেকে একটা খচ খচ আওয়াজ, যেন কেউ আঁচড়াচ্ছে। শুভ জয়াকে জিজ্ঞেস করে, “পেছনের সিটে কি রেখেছো?”
“কিছু রাখি নি,” বলে জয়া পিছনে তাকায়।
আচমকা শুভ অনুভব করে জয়া ওর বাঁ হাতটা সাঁড়াশির মত শক্ত করে চেপে ধরে আছে, শুভ জয়ার দিকে তাকিয়ে দেখে ভয়ে নির্বাক জয়া বিস্ফোরিত চোখে পিছনের সিটের দিকে তাকিয়ে আছে । আর একটু ঘাড় ঘোরাতেই শুভ দেখে পিছনের সিটে বসে সটাং ওর দিকে জ্বলন্ত হলদে চোখে তাকিয়ে একটা মিশ কালো বেড়াল।
গাড়ীর গতি ক্রমশঃ যেন বেড়ে চলেছে পাল্লা দিয়ে শুভর সমস্ত শরীর কেমন ঝিমিয়ে আসছে, গভীর ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসে,শুভর চোখ ঝাপসা থেকে অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে শোনে একটা প্রচন্ড ‘ধড়াম’ শব্দ ।
************
একসিডেন্টের তদন্ত করতে আসা স্থানীয় পুলিশের মোটাসোটা বিশাল ভুঁড়িওলা বড়কর্তা দুর্ঘটনা স্থল খানিক ধীর পদক্ষেপে পর্যবেক্ষন করে তার কোমরের বেল্ট ধরে প্যান্টটা ওপরে টানতে টানতে এস আই কে বলেন, “রঞ্জিত একটা জিনিস লক্ষ্য করেছো, এই দু বছরে এটা পঞ্চম এক্সিডেন্ট, প্রতিটা হয়েছে শনিবার ভোরে, এই পাঁচশো গজ রাস্তার মধ্যেই । “
অল্প বয়সী ছিপছিপে রঞ্জিত বলে, “হ্যাঁ স্যার, প্রত্যেকেই অল্প বয়সী দম্পতি আর একটা ব্যাপার সকলেই ওই একই হোটেলের ৩০৫ নম্বর ঘরের গেস্ট ।”
সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *