রোল নং ৫৪ – Bengali Suspense Thriller Story- Bengali Suspene Detective story

রোল নং ৫৪ - Bengali Suspense Thriller Story- Bengali Suspene Detective story

                 প্রথম পর্ব

ছোট থেকেই ভীষণ উচ্চাকাঙ্খী প্রিয়াঙ্কা! একদম ছোটবেলায় সেরকম কিছু না বুঝলেও জ্ঞান হওয়ার সাথে সাথেই ওর মনে একটা বড় হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা জন্ম নেয় আর সময়ের সাথে সাথে সেই ইচ্ছা আরও বেশি ডানা মেলার জন্য ছটফট করতে থাকে! মা-বাবার একটাই মেয়ে! তাতে বাবা, শেখর চ্যাটার্জী কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ভালো পদে কাজ করেন! মা উচ্চশিক্ষিতা! প্রিয়াঙ্কার বাবাও উচ্চাভিলাষী! মূলত উনিই প্রিয়াঙ্কাকে উঁচু স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি চাইতেন মেয়ে যেন একজন নাম করা ডাক্তার হয়, কারণ পরিবারে আজ অব্দি কেউ ডাক্তার হতে পারেনি! প্রিয়াঙ্কাও মনে প্রাণে ডাক্তার হতে চেয়েছিল। ক্লাস ৬ এ পড়াকালীনই সে মনস্থির করে নেয় যে তাকে ডাক্তারই হতে হবে। আর ক্লাস ৮ এ পড়াকালীন সময় থেকে জীবন বিজ্ঞানকে জীবনের মূলমন্ত্র করে নিয়েছিল! জীবনবিজ্ঞান সম্পর্কিত সবকিছুকে তখন থেকেই রপ্ত করতে শুরু করে সে! এরপর সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার দোরগোড়ায় এসে পড়ে প্রিয়াঙ্কা! মাধ্যমিক পরীক্ষা! বাকি সব বিষয়ে যথেষ্ট ভাল হলেও অঙ্ককে চিরকাল ভয় পায় প্রিয়াঙ্কা! একবার তো ক্লাস ৭ এর বার্ষিক পরীক্ষায় অঙ্কে এত খারাপ ফল হয়েছিল যে সব শিক্ষকরা অবাক হয়ে গেছিলেন যে বাকি সব বিষয়ে এত ভাল ফল করেও অঙ্কে এত খারাপ হয় কি করে! এবার সবাইকে বোঝাবে কি করে সে যে অঙ্ক করতে তার একদমই ভাল লাগেনা! ভূগোল পড়তে পড়তে কত নতুন জায়গাকে চেনা যায়! বেড়াতে বরাবর ভালবাসে সে, তাই ভূগোলও ভাল লাগে! ইতিহাসের পাতায় পাতায় কত রহস্য, কত অতীত! রোমাঞ্চ লাগে! পদার্থ বিজ্ঞানও বেশ ভালই লাগে! আর বাংলা, ইংরাজি মোটের উপর খারাপ লাগেনা! কিন্তু অঙ্ক! না! অঙ্কটাকে কিছুতেই ভালবাসতে পারেনা সে! রসকষহীন বিষয় একটা! আর জীবন বিজ্ঞানের তো নামেই জীবন আছে! শুধু নাম্বারের জন্য নয়, এই বিষয়টা সে ভালবেসে পড়ে! যাই হোক বোর্ড তো আর তার ভাললাগা খারাপলাগা মেনে সিলেবাস করবে না! তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও অঙ্কটা করতে হচ্ছে ভালভাবে প্রিয়াঙ্কাকে! ওর মা বাকি বিষয়গুলো দেখিয়ে দিলেও, অঙ্কে ভীতির জন্য একজন টিচার রাখতেই হয়েছে। প্রিয়াঙ্কার মা নন্দিনী দেবী এমনিতেও প্রিয়াঙ্কাকে কখনই পড়াশুনার ব্যাপারে  কোন জোর করেননি যে স্ট্যান্ড করতেই হবে! উনি নিজে ভীষণ মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। ওনার বাবা ছিলেন না! দাদার কাছেই মানুষ হয়েছিলেন! তাই মন প্রাণ দিয়ে পড়াশুনা করে জীবনে ছোটখাটো হলেও কিছু একটা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন! কিন্তু হায় রে ভাগ্য! সব যোগ্যরা যদি যোগ্যতার দাম পেয়ে যেত তাহলে হয়তো এই পৃথিবী স্বর্গ হয়ে যেত! যে নন্দিনী ব্যানার্জী জীবনে কোনদিন ২য় হয়নি, সে যখন একজন হাউসওয়াইফ হয়েই থেকে গেল তখনই সে বুঝতে পেরেছিল যে জীবনে কিছু করতে গেলে প্রথম দ্বিতীয় হওয়ার দরকার পড়েনা! এই কথাটা উনি মেয়েকেও বোঝাতে চাইতেন! লক্ষ্য স্থির রাখো কিন্তু সব কিছু ছেড়ে শুধু তারই পিছনে ছুটলে ভালভাবে কখনই বাঁচা যায়না! প্রিয়াঙ্কা এসব বুঝত না! সে স্কুলে ভাল ছাত্রী ছিল কিন্তু কখনো প্রথম হতে পারতোনা! আর সেই নিয়ে একটা  ক্ষোভ রয়েই গেছিল ওর মনে। ও চাইতো সবাই ওকে এক নামেই চিনবে! যখন স্কুলে প্রাইজ দেওয়া হত প্রিয়াঙ্কার নজর থাকতো সেই প্রথম প্রাইজের দিকেই! অথচ অঙ্কে ভাল নাম্বার না থাকায় ওই একটা বিষয়ের জন্য অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছিল সে! “ অসহ্য! একেবারে অসহ্য একটা সাবজেক্ট! কবে যে এর থেকে রেহাই পাবো কি জানি!” গজ গজ করতে করতে অঙ্ক করছিল প্রিয়াঙ্কা। “কি হল বাবু?” রান্না ঘর থেকেই জিজ্ঞেস করলেন নন্দিনী দেবী। প্রিয়াঙ্কা কোন জবাব দিল না। নন্দিনী দেবী বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে, প্রিয়াঙ্কার কাছে এসে বললেন “পিউ, অঙ্কটা ভালভাবে প্র্যাকটিস কর তাহলেই পেরে যাবি! অঙ্ক ছাড়া ভাল নাম্বার পাওয়া যাবে না দেখছিস তো!” মায়ের কথায় মুখ ফিরিয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা “ সে কি আর জানিনা মা! এই ফালতু বিষয়টার জন্যই আমার ওভারওল  রেসাল্ট খারাপ হয় প্রতিবার! এমনিও এই বছরটাই আমাকে জান প্রাণ দিয়ে খাটতে হবে! তারপর ক্লাস ১১ এ আমি কিছুতেই পিওর সাইন্স নেবনা! তুমি বাবাকে বলে দিও আগে থাকতেই! এমনিও আমি মেডিক্যাল পড়ব, তাই এই অঙ্ক আমার রাখার দরকারও নেই!” “ঠিক আছে  সে দেখা যাবে! আগে মাধ্যমিকটা ভালভাবে দে! চিন্তা করার কিছু নেই” হাল্কা হেসে বললেন নন্দিনী দেবী।

“ অঙ্কে ৯০%! অসাধারণ প্রিয়াঙ্কা! শেখরদা, আমি আপনাকে বলেছিলাম না প্রিয়াঙ্কা ভীষণই পরিশ্রমী! এর ফল পেতই” উৎফুল্লিত হয়ে বললেন মিস্টার প্রবীর সেন, প্রিয়াঙ্কার অঙ্কের প্রাইভেট টিচার। “রেসাল্ট খুব ভাল হয়েছে! স্টার মার্কস! অঙ্কটা তুমি করালে বলেই কিন্তু ওর এতটা উন্নতি হল! তোমার অবদান কম নয় প্রবীর!” হেসে বললেন প্রিয়াঙ্কার বাবা মিস্টার শেখর। প্রবীর সেন প্রিয়াঙ্কার বাবার সাথেই কাজ করেন। অঙ্কে মাস্টার্স! এমনি সেইভাবে টিউসনি করেননা প্রবীর, কিন্তু প্রিয়াঙ্কার বাবার সাথে ভাল সম্পর্ক থাকায় ওনাকে না করতে পারেননি! প্রিয়াঙ্কা মেয়েটা ভীষণ সিনসিয়ার! শুধু অঙ্কে ভীতির একটাই কারণ ছিল প্র্যাকটিসের অভাব! যাই হোক শেষের দিকে ভালই প্রাকটিস করেছে! প্রবীরবাবু অনেকগুলো পরীক্ষা নিয়ে ওকে পরীক্ষার জন্য তৈরি করে দিয়েছিলেন! কিন্তু মেয়েটার অঙ্কের প্রতি একটা উদাসীনতা আছে! যাই হোক ফল এত ভাল করতে পেরেছে প্রিয়াঙ্কা এতেই খুশি লাগছে প্রবীরবাবুর!

প্রিয়াঙ্কার মনে শান্তি নেই! প্রায় সব বিষয়ে ৯০% করে নাম্বার পেয়েও প্রথম হতে পারলো না! ও তো এটাও শুনেছে যে ওর অনেক ক্লাসমেট অঙ্কে ১০০ তে  ১০০ পেয়েছে! শুনে আরও রাগ হচ্ছিল প্রিয়াঙ্কার! তাও সে মেনে নিত যদি না শুনত যে ওদের ব্যাচের ছেলেদের স্কুলের টপার শুভেন্দু জীবন বিজ্ঞানে ১০০ তে ১০০ পেয়েছে! আর প্রিয়াঙ্কা ৯৫। মানা যায়! রাগের চেয়েও বেশি দুঃখ হচ্ছিল প্রিয়াঙ্কার! আর বার বার মনে করার চেষ্টা করছিল সে যে কি এমন ভুল করে এল যে পাঁচ নাম্বার কম এল! যদিও ওদের স্কুলের জীবনবিজ্ঞানের স্যার শুনে বলেছেন যে প্রিয়াঙ্কাও ১০০ ই পাওয়ার মত কিন্তু তাতে কি হয়! পায়তো নি! এদিকে প্রিয়াঙ্কার মা বেশ খুশি মেয়ের রেসাল্টে! উনি খুশি হয়ে সবাইকে জানাচ্ছেন! প্রিয়াঙ্কার মন এদিকে কিছুতেই ঠিক হচ্ছে না! একটা না পাওয়ার জ্বালা যেন! যেন একটা সুযোগ চলে যাওয়া!

“তুমি পিওর সাইন্সেই ভর্তি হবে পিউ! পিওর সাইন্স ছাড়া সাইন্স পড়ার কোন মানেই নেই!” বললেন প্রিয়াঙ্কার বাবা। “ কিন্তু বাবা আমি ওই অঙ্কটাকে আর রাখতেই চাইনা! আমার দ্বারা অঙ্কটা হবেই না আর….” প্রিয়াঙ্কাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বললেন শেখরবাবু “ দেখ মা! সাইন্সের কোন বিষয়ই অঙ্ক ছাড়া বোঝা সম্ভব হবে না!” “ঠিক আছে তাহলে সাইডে রাখি!” আমতা আমতা করে বলল প্রিয়াঙ্কা। “একই ব্যাপার তো! সাইডে বায়োলজিটা রাখ আর পড়ার সময় মেন সাবজেক্টের মত করেই পড়বি! সাইন্সটাও পিওর থাকবে আর সব সাবজেক্টে সমানভাবে ফোকাসও করা হবে! তাই না!” স্মিত হেসে বললেন শেখরবাবু। প্রিয়াঙ্কা আর কিছু বলল না। পিওর সাইন্স নিয়ে ১১ এ ভর্তি হয়ে গেল।

“খুব আজকাল সেধে সেধে কথা বলে তোর সাথে! ব্যাপার কি?” মুচকি হেসে বলল শ্রীতমা। “কে কথা বলে?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল প্রিয়াঙ্কা। “কে আবার! দীপাঞ্জন” বলল শ্রীতমা। “ও আচ্ছা ওই বাচালটা? ওই কেমিস্ট্রি ব্যাচে হায়েসট নাম্বার পাওয়ার পর থেকেই পিছন পিছন ঘুর ঘুর করছে! ইগনর!” পাশ কাটানোর চেষ্টা করল প্রিয়াঙ্কা।শ্রীতমা আর কিছু বলল না। জানে এখন বেশি কিছু বলতে গেলেই প্রিয়াঙ্কা বলবে যে “ এসব বন্ধ কর শ্রী…আমার এখন এসব শোনার সময় নেই…আমাকে মেডিক্যালে ফোকাস করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি…”। তাই কথা না বাড়িয়ে অন্য কথা শুরু করল।

“ হাই! প্রিয়াঙ্কা রাইট?” ম্যাথের ব্যাচ থেকে পড়ে বেরনোর সময় পিছন থেকে নিজের নামটা শুনে ঘুরে তাকাল প্রিয়াঙ্কা। “হাই! আঙ্কেল নিতে আসবেন নাকি?” হেসে জিজ্ঞেস করল দীপাঞ্জন। “ হ্যাঁ” সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়াঙ্কা। “ বলিস তো ছেড়ে দিয়ে আসতে পারি তোকে, যাবি?” তাকিয়ে রইল দীপাঞ্জন। “ না রে! ঠিক আছে। লাগবে না। বাবা এখনি আসবে” হালকা হেসে বলল প্রিয়াঙ্কা। এরপর প্রায় দিনই কোননা কোন অজুহাতে দীপাঞ্জন প্রিয়াঙ্কার সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজতে লাগলো। প্রিয়াঙ্কা টুকটাক করে জবাব দিত।কিন্তু একদিন একজন বান্ধবীর মারফত জানতে পারে যে দীপাঞ্জন ওকে প্রপোস করবে! ব্যাস! ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই প্রিয়াঙ্কা দীপাঞ্জনকে ইগনর করতে শুরু করে! ওর মোটেও এসব ভাল লাগতো না! এই পিক পিরিয়ডে এসব উটকো জিনিস একেবারেই মেনে নেওয়া যাবে না! যাই হোক এরপর বেশ কিছুদিন পরে ও জানতে পারে যে দীপাঞ্জনের গার্লফ্রেন্ড হয়েছে! একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল প্রিয়াঙ্কা।

এইভাবেই দেখতে দেখতে ক্লাস ১১ এর পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়। এরপর পড়াশুনার চাপ বাড়তে থাকে! সামনেই ১২র ফাইনাল পরীক্ষা! আর তারপর জয়েন্ট। প্রিয়াঙ্কা নিজেকে তৈরি করতে থাকে মেডিক্যাল জয়েন্টের জন্য। ওর ইঞ্জিনিয়ারিং জয়েন্ট দেওয়ার ইচ্ছা একদমই নেই! তা সত্ত্বেও বাবা বলেছে একবার বসতে পরীক্ষাটাতে। যাই হোক এখন আপাতত ১২র ফাইনাল নিয়ে চিন্তা প্রিয়াঙ্কার! যদিও অঙ্কটাতে এখন আর অতটাও দুর্বল নেই সে! বেশ ভালোই পারে এখন আসলে! কিন্তু তাও, অঙ্কতে একদম ইন্টারেস্ট নেই প্রিয়াঙ্কার। কারণ শেষ অব্দি সে মেডিক্যালে যাবেই! অতএব অঙ্কর পাট এই ১২এই শেষ! তাই চিন্তা নেই আর!

দ্বিতীয় পর্ব –

“আমার কিছু ভালো লাগছে না মা! প্লিস একটু একা থাকতে দাও আমাকে” কান্নাভেজা গলায় বলল প্রিয়াঙ্কা। নন্দিনী দেবী আর কিছু বললেন না। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা সম্পর্কে উনি ভালমতোই অবগত! তাই আর বিরক্ত করলেন না প্রিয়াঙ্কাকে।
জানলার দিকে অপলক তাকিয়ে বসে আছে প্রিয়াঙ্কা। আজকে জয়েন্টের ফলাফল বেরিয়েছে! আর প্রিয়াঙ্কা মেডিক্যাল ক্লিয়ার করতে পারেনি! এই কষ্ট প্রথম হতে না পারার কষ্টের থেকেও বহুগুণ বেশি করে বিঁধছে বুকের মধ্যে! একটা শূন্যতা! সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার মত মনে হচ্ছে! উচ্চমাধ্যমিকের আগে আগেই প্রিয়াঙ্কার বাবার একটা সিভিয়ার হার্ট অ্যাটাক হয়! তাই এমনিতেও বেশ ডিস্টার্বড ছিল সে! তাতে জান প্রাণ দিয়ে জয়েন্টটা দিয়েও এতগুলো বছর ধরে দেখা স্বপ্নটা যখন এক লহমায় ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেল তখন সেই দুঃখ সামাল দেওয়ার মত কিছু উপায় মাথায় আসছিল না প্রিয়াঙ্কার! এবার কি করবে সে? বাবার শরীর ভাল নেই! তার উপর সে শুধু নিজের নয় তার বাবারও এত দিনের স্বপ্নকে ভেঙ্গে দিয়েছে! নিজের উপর একটা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল প্রিয়াঙ্কার! এতদিনের এত ভালভাবে পড়ার কি কোনই মূল্য নেই? মা বলছে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে! বাবাও এখন তাই বলছে! কিন্তু…। সে তো ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায়না! আর তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং জয়েন্টটাও দেওয়ার ইচ্ছা ছিলনা তার! বাবা-মা জোর করেই দুটোরই ফর্ম ভরানো করিয়েছিল। পরীক্ষার আগেও বলছিল যে অঙ্কর পেপারটা দেবে না! বাবা বুঝিয়ে দেওয়ানো করিয়েছিল। কিন্তু পেপারটা ভাল হয়ওনি! ফলস্বরূপ ইঞ্জিনিয়ারিংএ র‍্যাঙ্ক এসেছে অনেক পিছনের দিকে! অদেও কোন কলেজে চান্স পাবে কিনা ঠিক নেই! আর পেলেও বা! অঙ্ক ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং হবেই না! আর এই অঙ্কতে কোন ভাবেই ইন্টারেস্ট আসেনা প্রিয়াঙ্কার! কি করবে এই ভেবে ভেবেই সারাদিনই প্রায় কান্নাকাটি করে সে! নন্দিনী দেবী বুঝিয়েও পারছেন না!
“মা! বলছি কি যে আমি যদি প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্সে অনার্স পেয়ে যাই তাহলে ওটা নিয়েই ভর্তি হয়ে যাব বুঝলে!” আস্তে আস্তে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ঠিক আছে তবে তাই কর” বললেন নন্দিনী দেবী। “পাসে অঙ্ক রাখবনা কিন্তু! বায়োলজি রাখবো!” প্রিয়াঙ্কার কথা শেষ হতে হতে শেখরবাবু ঘরে এসে ঢুকলেন। তারপর বললেন “ অঙ্ক ছাড়া তো ফিজিক্স পড়ে লাভ নেই।“ প্রিয়াঙ্কা চুপ করে গেল। ওর শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বাবা বললেন “ ঠিক আছে রে মা! তোর যেটা পড়ার ইচ্ছা সেটাই পড়! কোন জোরজবরদস্তি নেই, কেমন?” প্রিয়াঙ্কা কান্না আটকে আলতো করে মাথা নাড়াল।
“ আর মন খারাপ করিস না রে বাবু! যা হওয়ার হয়ে গেছে! এবার আগে কি করবি সেটা ভাবনা চিন্তা করতে হবে” প্রিয়াঙ্কার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন নন্দিনী দেবী। দুদিন আগেই প্রিয়াঙ্কাদের উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল বেরিয়েছে! অঙ্ক ছাড়া বাকি সব বিষয়তেই খুব ভাল ফল করেছে সে! আর অঙ্কে নাম্বার কম আসাতে প্রেসিডেন্সিতে ফিজিক্সে অনার্স পেলনা সে! প্রিয়াঙ্কা একটা জিনিস বুঝতে পারছিল না যে যখন অঙ্কে খুব খারাপ ছিল তখন ৯০% পেল। আর যখন একটু ভাল হতে শুরু করলো তখন ৬৫% পেল! অদ্ভুত! এখন রাগটা অসহায়তাতে পরিণত হয়েছে! সে বুঝে উঠতে পারছে না যে কি করবে! প্রিয়াঙ্কার খুব ইচ্ছা করছিল যে রাজস্থানের কোটা থেকে আগামী এক বছর মেডিক্যালের কোচিং করতে! বাবা-মাকে বললেন রাজিও হয়ে যাবেন ওনারা! কিন্তু একটা জড়তা লাগছিল তার! বাবাকে ভি আর এস নিতে হয়েছে শারীরিক অসুবিধার জন্য! তার উপর এতগুলো ধাক্কা খেলেন প্রিয়াঙ্কারই জন্য! আবারও খুব কান্না পেল প্রিয়াঙ্কার! না! সবসময় নিজের কথা ভাবলেই চলবে না! সে না হয় ইঞ্জিনিয়ারিংএই ভর্তি হয়ে যাবে! তারপর নেক্সট ইয়ার আর একবার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই না হয় মেডিক্যাল জয়েন্টটা দেবে! এতে মা –বাবার মনে এইটুকু শান্তি থাকবে যে মেয়ে একটা লাইন নিয়ে পড়া শুরু করেছে! চোখের জল মুছে বাবার ঘরে গিয়ে ঢুকল প্রিয়াঙ্কা। একটু ইতস্তত করে বলল “ বাবা! আমি ইঞ্জিনিয়ারিংএর কাউন্সিলিংএ যাব!” শেখরবাবু একটু পেপারটা দেখছিলেন। সেটাকে পাশে রেখে বললেন “ তুই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বিনা বলছিলিস যে মা? কোথাও যদি কোচিং…” “না বাবা! কোচিং করবোনা! বরং পরের বছর একবার মেডিক্যালটা দেব!” বলে উঠল প্রিয়াঙ্কা। “ঠিক আছে! আমার সাথে আজকে সাইবারে চল তবে! কাউন্সিলিং তো আজ থেকেই শুরু হচ্ছে নাকি?” বললেন শেখরবাবু। “আজ না পরশু থেকে শুরু হচ্ছে বাবা!” হাল্কাভাবে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ঠিক আছে” হেসে বললেন শেখর বাবু।
সেইসময়ে সবে সবে ইন্টারনেটের রমরমা শুরু হয়েছে! প্রিয়াঙ্কাদের ব্যাচটাই ছিল সম্ভবত জয়েন্টের প্রথম অনলাইন কাউন্সিলিংএর ব্যাচ। সেইসময় ইন্টারনেট বাড়িতে বাড়িতে আসা শুরু হয়নি। তাই ইন্টারনেট সংক্রান্ত যাবতীয় কাজকর্মের জন্য তখন সাইবারগুলোই ভরসা ছিল। প্রিয়াঙ্কা বাবার সাথে এসেছে সাইবারে অনলাইন কাউন্সিলিংএর জন্য। সাইবারের দাদাটা বুঝিয়ে দিচ্ছে কিভাবে কি করতে হবে! চয়েজ ফিলিং শেষ করে ফিরে এল দুজন বাড়িতে। এবার অপেক্ষা প্রথম কাউন্সিলিংএর ফল প্রকাশের!
“ বাড়ির কাছের কলেজগুলো দিয়েছিলিস? দুর্গাপুরের কলেজগুলো?” জিজ্ঞেস করলেন নন্দিনী দেবী। “হ্যাঁ দিয়েছিলাম! কিন্তু হয়নি! এই দুর্গাপুরের কলেজগুলোতেও যা র‍্যাংক দরকার সেটা আমার নেই!” অন্যদিকে তাকিয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা। “কলকাতা সাইডের কলেজগুলো দিয়ে দিস তো মা এবার সেকেন্ড কাউন্সিলিংএ! ওই দিকে অনেক কলেজ আছে তো সম্ভাবনাও বেশি আছে!” বললেন শেখর বাবু। “হ্যাঁ ওইটাই ভাল! আরে এর থেকেও নিচে র‍্যাংক কি আর কারুর নেই? আর শুভেন্দু আর তোর বাকি বন্ধুদের কি খবর? ওরা সব ইঞ্জিনিয়ারিংএ ভর্তি হচ্ছে নাকি এমনি অনার্সে?” জিজ্ঞেস করলেন নন্দিনী দেবী। “আমি কারুর কোন খবর জানিনা আর জানতেও চাইনা!” বেশ বিরক্ত হয়ে পাশের রুমে চলে গেল প্রিয়াঙ্কা।
“ কলেজটা গ্রেটার কলকাতাতে ঠিক নয়! একটু ভিতরের দিকে! কিন্তু আমি দেখে এলাম, খারাপ লাগলো না! বেসরকারি প্রায় সব কলেজই কম বেশি একই রকম হয়” ঢুকতে ঢুকতে বললেন শেখরবাবু নন্দিনীদেবীকে। প্রিয়াঙ্কা অবশেষে শেষ কাউন্সিলিংএ একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চান্স পেয়েছে! কিন্তু কলেজটা একদমই অনামি কলেজ! শুনে থেকেই প্রিয়াঙ্কার মেজাজটা খিঁচরে আছে! সে জানতো যে ভাল কলেজ পাওয়ার মত র‍্যাঙ্ক তার নেই! তথাপি কেন জানিনা মন মানছিল না এরকম একটা অনামি কলেজে ভর্তি হতে! বিরক্তিতে কলেজটা দেখতেও যায়নি সে! ওর বাবা গিয়ে দেখে এলেন আজকে। হস্টেলেই থাকতে হবে প্রিয়াঙ্কাকে। বাড়ি থেকে মানে দুর্গাপুর থেকে যাতায়াতের প্রশ্নই ওঠেনা! যাই হোক মনে এক রাশ বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল একদিন সে মা বাবার সাথে।
“মা! এটা হোস্টেল?” নাক কুঁচকে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ কিছু করার নেই বাবু! এই জায়গাটাই এমন যে আশে পাশে সেরকম মেয়েদের মেসও নেই ! হোস্টেলেই থাকতে হবে কষ্ট করে!” আস্তে আস্তে বললেন নন্দিনী দেবী। যেহেতু মেয়েদের হোস্টেল তাই শেখরবাবুকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি! নন্দিনী দেবী ভিতরে এসেছেন প্রিয়াঙ্কার সাথে। প্রিয়াঙ্কার কান্না পাচ্ছিল। সব কিছু ভীষণ নন স্ট্যান্ডার্ড মনে হচ্ছিল! এইরকম জায়গায় এসে পড়তে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি সে! রাগের চোটে সেদিন রুমমেটদের সাথেও ঠিক করে কথা বলল না! ক্যান্টিনে রাতের খাওয়ার খেতে গিয়ে দেখল পোড়া রুটি,বিচ্ছিরি আলু ভাজা, জলের মত ডাল। এসব দেখে আরও কান্না পাচ্ছিল তার! সাথে নিজের অসফলতার জন্য নিজের উপর প্রচণ্ড রাগও হচ্ছিল! এখানে ৪ বছর কিভাবে থাকবে সে?
সেদিন রাতে ঘুম এলনা প্রিয়াঙ্কার! খুব খুব কান্না পাচ্ছিল! এইভাবে নিজেকে হেরে যেতে দিতে পারেনা সে! না! ভালভাবে পড়াশুনা করতে হবে যাতে এরপর ভাল জায়গায় যেতে পারে সে! নিজের খামতি গুলোকে ঠিক করতে হবে! উঠে বসে প্রিয়াঙ্কা! মুখে চোখে জল দিয়ে আসে! তারপর সেইদিনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে যে এরপর সে ভাল জায়গায় নিজেকে নিয়ে যাবেই, যে কোরেই হোক! ভাল কলেজ পেলনা ঠিকই কিন্তু এরপরের ধাপগুলোতে সে নিজেকে উপরে উঠিয়ে নিয়ে যাবে! আর এই লড়াইটা তার আজ থেকেই শুরু হল! পূবের আকাশ তখন ফরসা হতে শুরু করেছে! প্রিয়াঙ্কা রুম থেকে বেরিয়ে এল ব্যাল্কনিতে! ভোরের আকাশের দিকে সজল চোখে তাকিয়ে নিজের মনেই বলে উঠলো “ আমি আমার যোগ্য জায়গায় নিশ্চয় পউছাব! সেটা আজ না হলেও এক না একদিন হবেই।“

                      তৃতীয় পর্ব

কলেজ জীবন শুরু হয় প্রিয়াঙ্কার। আস্তে আস্তে এই পরিবেশেই নিজেকে মানিয়ে নিয়ে পড়াশুনায় মনোযোগ দেয় সে! যদিও হোস্টেল আর কলেজের প্রায় সবার সাথেই বেশ ভালই বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও কিছু একটা ছিল যেটা মাঝেমধ্যেই প্রিয়াঙ্কাকে কষ্ট দিত! সেটা মা-বাবাকে ছেড়ে প্রথমবারের জন্য দূরে থাকার কষ্ট নাকি সেই মন ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষত সেটা সে বুঝতে পারতো না! বন্ধুদের সাথে থাকলে বলতে নেই সে বেশ খুশিই থাকত। রুমমেটরা বেশ ভাল এবং বন্ধুসুলভ। তাই কিছুদিনের মধ্যেই ওরা চারজন রুমমেট বেশ ঘুলেমিলে গেছিল। একসাথে ছুটির দিনে ঘুরতে যাওয়া, খাওয়া দাওয়া করা আরও কতকি! যদিও ডিপার্টমেন্ট সবার আলাদা আলাদা ছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও চারজনের বেশ মিল ছিল! কিন্তু যখন প্রিয়াঙ্কা একা থাকতো, তখন সেই না পাওয়াগুলো ঘিরে ধরত ওকে! কত রাত কেঁদে কাটিয়েছে তার ঠিক নেই! বলতেই বলে সময় সব কিছুকে ভুলিয়ে দেয়! আসলে ভুলিয়ে ঠিক দেয়না, আবছা করে দেয়! তাই দ্রুতবেগে বয়ে চলা সময়ের সাথে সাথে মনের ক্ষতটাও খানিক আবছা হতে শুরু করে প্রিয়াঙ্কার! দেখতে দেখতে প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষা চলে আসে! আর সেটা ছিল প্রিয়াঙ্কার কাছে তার নতুন লড়াইয়ের প্রথম পর্ব!
“ হ্যালো অনিতা? আমি প্রিয়াঙ্কার মা বলছি রে! প্রিয়াঙ্কা ফোন তুলছে না কেন রে বাবু?” উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন নন্দিনী দেবী প্রিয়াঙ্কার রুমমেট অনিতাকে। অনিতা একটু থেমে নিয়ে বলল “ আসলে আন্টি আজকে আমাদের সেমিস্টারের রেসাল্ট বেরিয়েছে! তাই প্রিয়াঙ্কা একটু আপসেট আছে! দাঁড়ান আমি ওকে ফোনটা দিচ্ছি” বলে অনিতা প্রিয়াঙ্কাকে ফোনটা দিয়ে বলল “ নে কথা বল! আন্টি কথা বলবেন! ফোনটাকে অফ করে রেখেছিস কেন? নে নে কথা বল।“ “হ্যালো!?” প্রিয়াঙ্কার গলার আওয়াজ পেয়ে নন্দিনী দেবী বললেন “ কিরে বাবু! ফোনটাকে কেউ অফ করে রাখে? কত চিন্তা হয় বলতো!” “ মনে হয় ব্যাটারিটা শেষ হয়ে গেছে তাই অফ হয়ে গেছে ফোনটা!” ভারী গলায় বলল প্রিয়াঙ্কা। নন্দিনী দেবী বুঝতে পারছিলেন যে এতক্ষণ কাঁদছিল প্রিয়াঙ্কা! একটু চুপ থেকে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন “রেসাল্ট কেমন হল রে বাবু?” এরপর ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পেলেন ফোনের ওপার থেকে! তাড়াতাড়ি করে ফের বললেন “ আরে কাঁদছিস কেন রে বোকা মেয়ে! এইটুকুতে বার বার করে এত ভেঙ্গে পড়লে অনেক উপরে কিভাবে যাবি বাবু? কান্না থামা!” মায়ের কথাটা শুনে কান্নাটা একটু থামল প্রিয়াঙ্কার! তারপর কান্না জড়ানো গলায় বলল “ আমি সেকেন্ড হয়েছি মা! ২ পয়েন্টের জন্য ফার্স্ট হতে পারলাম না! কি যে কমতি হচ্ছে সেটাই বুঝতে পারিনা আমি!” বলে আবারও কেঁদে উঠলো। সব শুনে নন্দিনী দেবী বললেন “ আরে তো কি হয়েছে! অল ওভার ফার্স্ট হতে গেলে তো দুটো সেমিস্টারের রেসাল্ট মিলে হতে হবে! পরের সেমিস্টারটা খুব ভাল হবে দেখিস! এখন একদম মন খারাপ করবি না কেমন?” একটু থেমে আবার বললেন “ ফার্স্ট হতে হবে ভেবে পরীক্ষা দিলে ফার্স্ট হওয়া যায়না! ভালভাবে পরীক্ষা দাও! নিশ্চই ভাল করতে পারবে! আর এই সেমিস্টারেও যথেষ্ট ভাল ফল হয়েছে! এবার লক্ষ্য রাখ আরও ভাল করার, নাকি ফার্স্ট হওয়ার! কেমন?” প্রিয়াঙ্কা ফোনটা বেশ কিছুক্ষণ হল রেখে দিয়েছে! মনটাকে স্থির করে! “ প্রিয়া! চল খেতে যাচ্ছি” অনিতার ডাকে চমক ভাঙ্গে প্রিয়াঙ্কার। “ হম! চল” সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়ে খেতে যাওয়ার জন্য রেডি হয় প্রিয়াঙ্কা।
এরপরের সেমিস্টারগুলোতে প্রিয়াঙ্কা অপ্রতিরধ্য হয়ে ওঠে! না! এরপর আর কখনো সে সেকেন্ড হয়নি! নিজের ডিপার্টমেন্ট এমনকি অল ওভারও অনেক বেশি পয়েন্টে সবার থেকে অনেকখানি এগিয়ে মেরিট লিস্টের টপ পজিসানটাতে প্রত্যেক সেমিস্টারেই প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জীর নামটাই জ্বলজ্বল করতো! এটাই, ঠিক এটাই তো চেয়েছিল প্রিয়াঙ্কা! তাকে এক নামে কলেজের জুনিয়াররা, সিনিয়াররা, টিচাররা, ব্যাচমেটরা সবাই চিনত। প্রিয়াঙ্কার মনে আরও উদ্যম আসতে শুরু করলো! এরই মাঝে মেডিক্যালের জয়েন্টটা আরও একবার দিয়েছিল সে! পরীক্ষাটাতে উত্তীর্ণ হতে পারলেও কাউন্সিলিংএ সরকারি কলেজ পায়নি! ওই দিকে ভি আর এস নিয়ে নেওয়ার জন্য শেখরবাবুরও বেসরকারিতে মেডিক্যাল পড়ানোর মত সামর্থ্য ছিল না! আর এই ব্যাপারটা উপলব্ধি করেই প্রিয়াঙ্কা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়!এমনিতেও আস্তে আস্তে সে যা যা জিনিসগুলো স্কুলে পড়াকালীন পায়নি, সেগুলো ইঞ্জিনিয়ারিংএ এসে পেতে শুরু করেছে! তাই অনেক কিছু পাওয়ার মাঝে মেডিক্যালের স্বপ্নটাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রিয়াঙ্কা! অস্ফুটে নিজের মনেই বলে ওঠে “ আমার জন্য মেডিক্যালটা হয়তো ছিলই না!”
এই সময় আবার কলেজে ক্রমবর্ধমান পপুলারিটির জন্য বহু প্রপোসালও আসতে শুরু করে প্রিয়াঙ্কার! কিন্তু এই জিনিসটাই প্রিয়াঙ্কার পছন্দের নয়! ওর মনে হত এইসব মনকে অন্যদিকে পরিচালিত করে! তাই যতটা সম্ভব এসব জিনিসকে এড়িয়ে চলত সে! যদিও ইতিমধ্যেই ওর রুমমেটদের অনেকেই বেশ জোর কদমে প্রেম করতে শুরু করে দিয়েছে! কিন্তু প্রিয়াঙ্কা এসব থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করত! কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক! ভাবনার সাথে ভবিতব্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিল খায়না! প্রিয়াঙ্কা যখন ফাইনাল ইয়ারে, তখনই তার জীবনে আসে সন্দীপ! সন্দীপ প্রিয়াঙ্কারই ডিপার্টমেন্টের অর্থাৎ কম্পিউটার সাইন্সের! আর প্রিয়াঙ্কা সেই হাতছানিকে চেয়েও অগ্রাহ্য করতে পারেনি!
এরপর এই শেষ বছরে প্রিয়াঙ্কার অনেকটাই পরিবর্তন হয়! যে মেয়ে প্রেম করাকে সময়ের অপচয় মনে করত সেই মেয়ে জোর কদমে প্রেম করতে শুরু করাতে ওর বন্ধুরা বেশ অবাকই হয়েছিল। যাই হোক এসবের মাঝে প্রিয়াঙ্কা পড়াশুনাতে ঢিলে দেয়নি একদমই! কারণ আর যাই হোক জীবনে উপরে ওঠাটাই প্রথম প্রায়োরিটি ছিল প্রিয়াঙ্কার!
দেখতে দেখতে শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা এসে যায়! ক্লাসের সেকেন্ড বয় সুমিত, যে কিনা প্রথম সেমিস্টারে ফার্স্ট হয়েছিল, এবারে বেশ খোশ মেজাজে আছে! ওর এমনকি কলেজের আরও সবার মনে হয়েছিল যে এবার হয়তো প্রিয়াঙ্কা আর টপ করতে পারবে না এইসব প্রেমের চক্করে পড়ে ! যাই হোক পরীক্ষা শেষের দিন যখন সবাই সবার সাথে শেষ বারের জন্য দেখা করতে, গলায় মিলে নিতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই প্রিয়াঙ্কার কাছে একটা মেল আসে! আর সেই মেলটা ছিল ইন্ডিয়ার অন্যতম একটা টপ কলেজের এম বি এর প্রবেশিকা পরীক্ষাতে সফল্ভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার বার্তাবাহক! প্রিয়াঙ্কা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না! অবশেষে টপ কলেজে পড়ার স্বপ্ন তার সত্যি হতে চলেছে!? আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে মাকে ফোন করে। “ মা, আমি এম বি এর এন্ট্রান্সটা ক্লিয়ার করে ফেলেছি! কাউন্সিলিংর জন্য কল এসেছে!” অত্যন্ত উৎফুল্লিত হয়ে বলে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। নন্দিনী দেবী খুশি হওয়ার থেকেও বেশি স্বস্তি পেলেন এই ভেবে যে অবশেষে মেয়েটা যেরকম চাইছিল সেরকম কলেজ পেতে চলেছে! উনি শেখরবাবুকে খবরটা দেন। উনিও খুশি! অবশেষে বহু বছর পরে মেয়ের গলার আওয়াজে এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করেন ওনারা! মেয়ের খুশিতেই বাবা-মার খুশি। তাই বহু বছর পরে আজ মিস্টার আর মিসেস চ্যাটার্জীও বেশ স্বস্তি আর খুশি অনুভব করলেন!
“ অত দূরে গিয়ে পড়ার কি দরকার? কলকাতাতে কি ভাল কলেজ নেই?” বিরক্ত হয়ে বলল সন্দীপ। এটা শুনে হটাত করেই প্রিয়াঙ্কা বেশ রেগে গেল আর প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো “তুই কে বলার? আমি কি কি ফেস করেছি তুই তার কতটুকু জানিস? আমি আজ এই দিনটার জন্য কত রাত যে চোখের জল ফেলেছি আর সকালে উঠে মনকে শক্ত করে পড়াশুনা চালিয়ে গেছি তার কোন হিসাব নেই! নিজের মতামত নিজের কাছে রাখ” বলে ক্যান্টিন থেকে উঠে বেরিয়ে যেতে গেলে সন্দীপ এসে প্রিয়াঙ্কাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলে “ আরে আমি সেটা মিন করতে চাইনি! দেখ আমি গেটের কোচিং করব কলকাতাতে থেকেই! তুইও গেটের কোচিং করতে পারিস আমার সাথে! কিম্বা যদি এম বি এই করতে চাস তো কলকাতাতেও অনেক স্কোপ আছে! সেই কোন কর্ণাটকে গিয়ে করাটা কি জরুরী? অনেকটা দূর! তাই বললাম! তুই বেকারই আমার উপর রেগে যাচ্ছিস!” প্রিয়াঙ্কা কিছুক্ষণ সন্দীপের দিকে তাকিয়ে রইল তারপর বলল “ আর কিছু বলবি? তোর আর কিছু মতামত থাকলে এখনই বলে দে! কারণ আজকের পর আর কখনো আমি এসব শুনতে চাইনা! আমি কর্ণাটক যাচ্ছি আর এটাই ফাইনাল। চলি আমি! কালকে হোস্টেল ছাড়ছি, তাই অনেক গোছগাছ করতে হবে! ভাবলাম তোর সাথে কথা বলব যাওয়ার ব্যাপারে! কিন্তু মনে হচ্ছে তুই একটুও খুশি নোস আমি চান্স পেয়েছি বলে!” “তুই ভুল বুঝছিস প্রিয়া আমাকে…” কথাটা শেষ করতে না দিয়েই প্রিয়াঙ্কা ফের বলল “ যাই হোক আর কবে দেখা হবে জানিনা! পরশু আমার যাওয়ার ট্রেন আছে! ভাল থাকিস! পরে ফোন করিস” বলে সন্দীপের উত্তরের অপেক্ষা না করেই ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল প্রিয়াঙ্কা।
আজ হোস্টেলে শেষ রাত প্রিয়াঙ্কাদের! সারারাত জেগে অনেক গল্প করল ওরা সবাই। ভোরে চলে যাবে প্রিয়াঙ্কা! বাকিরাও সেই দিনই যাবে কিন্তু বেলার দিকে! পুবের আকাশ ফরসা হতে শুরু করলেই প্রিয়াঙ্কা রেডি হতে শুরু করলো! তারপর বেরনোর আগে শেষবারের মত সবাইকে জড়িয়ে ধরে যোগাযোগ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় জানালো! সব রুমমেটদের ছলছল চোখের দিকে তাকিয়েও কেন জানিনা সেইভাবে কান্না আসছিল না প্রিয়াঙ্কার! আসলে ও তো এইখান থেকে কবে বেরবে সেই ভাবনাতেই ৪টে বছর কাটিয়ে দিল! সবাই প্রায় কান্নাকাটি করছে, এমনকি হোস্টেল ওয়ার্ডেন ম্যামও ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে আছেন! তাও প্রিয়াঙ্কার দুঃখ হচ্ছিল না কেন জানিনা! বরং একটা চাপা আনন্দ মিশ্রিত উত্তেজনা হচ্ছিল! সেটা যে নতুন হাই স্ট্যান্ডার্ড কলেজে ভর্তি হওয়ার খুশিতে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা! তাও সবার সামনে কিছুটা দুঃখ তো দেখাতেই হয়! তাই মুখটা শুকনো করেই বেরিয়ে এল প্রিয়াঙ্কা! মেন গেটে বয়েস হোস্টেলের বন্ধুদের সাথে দেখা হল! ওরাও শেষবারের মত বিদায় জানিয়ে যোগাযোগ রাখার আবদার জানাল! প্রিয়াঙ্কা হাসিমুখে সম্মতি জানিয়ে মেন গেট থেকে বেরিয়ে এল রাস্তায়! পিছনে পড়ে রইল তার ৪ বছরের অগুন্তি স্মৃতি! ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে যেতে গিয়ে দেখল সামনে থেকে সন্দীপ আসছে! “ চল ট্রেনে তুলে দিয়ে আসি তোকে!” বলে প্রিয়াঙ্কার ব্যাগটা নিতে গেল সন্দীপ। “ না থাক! দরকার নেই! তুইও বাড়ি যাবি তো আজকে! এখন হাওড়া অব্দি গেলে আর কখন ফিরবি হোস্টেলে আর কখনই বা বাড়ি যাবি! ছেড়ে দে! আমি চলে যাব!” বলে প্রিয়াঙ্কা এগোতে শুরু করল। সন্দীপ পিছন পিছন ছুটে এসে প্রিয়াঙ্কাকে থামাল আর বলল “ তোকে সেসব ভাবতে হবে না! চল আমি সাথে যাচ্ছি! আর কালকে সাবধানে যাস! আঙ্কেল আন্টি সাথে যাচ্ছেন তো?” প্রিয়াঙ্কা এবার হাল্কা হেসে বলল “ হম মা-বাবা দুজনেই যাচ্ছে।“ সন্দীপ হেসে প্রিয়াঙ্কার ব্যাগগুলো তুলে নিয়ে বাস স্টপের দিকে এগোতে শুরু করল আর প্রিয়াঙ্কা পিছন পিছন হাঁটা শুরু করলো।

   Suspense Thriller
         চতুর্থ পর্ব

মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে প্রিয়াঙ্কা! কলেজ ক্যাম্পাস তো নয় যেন একটা স্বপনপুরি, যেখানে আসার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল সে! সব কিছুই একটা অবাস্তব স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল প্রিয়াঙ্কার! আর সাথে একটা উত্তেজনা মিশ্রিত ভয়ও কাজ করছিল! ভয়টা লাগছিল এখানে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে কিনা সেই চিন্তাতে! কলেজের কাউন্সিলিং শেষে পুরো ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখছিল প্রিয়াঙ্কারা! চারপাশে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল বিল্ডিংস! এখানে শুধু এম বি এই নয় বরং আরও অনেক রকম ডিপার্টমেন্টস আছে! যেমন বিটেক, এমটেক, বিসিএ, এমসিএ, বিএসসি, এমএসসি ইত্যাদি! চারপাশটা দেখতে দেখতে আবিষ্ট হয়ে পড়ছিল প্রিয়াঙ্কা! কলেজ ক্যাম্পাসটা একটা ছোটখাটো টাউন বললেও ভুল করা হবে না! কিছুদূর পর পরই ফুড কোর্ট, আইসক্রিম হাব আরও কত কি! একটু বাঁক নিতেই চোখে পড়ল একটা বিশাল বাস্কেট বল গ্রাউনড! এখন ক্যাম্পাসের মধ্যে দিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছে প্রিয়াঙ্কারা! ক্যাম্পাসের মধ্যেও কিছু ক্যাব যাওয়া আসা করছে! অনেকে সাইকেল নিয়েও যাচ্ছে আসছে! প্রিয়াঙ্কার বাবা জিজ্ঞেস করে জানলেন যে অনেক বড় ক্যাম্পাস হওয়ায় এখানে কিছু ক্যাবও চলে ক্যাম্পাসের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার জন্য! আর এই ক্যাবগুলো কলেজের জন্যই রাখা, বাইরের কোন গাড়ি পারমিশন ছাড়া ভিতরে ঢুকতে পারে না! আর যারা লোকাল, তারা নিজের গাড়ি বা সাইকেল নিয়ে আসতে পারে! সবের জন্যই আলাদা আলাদা পারকিং জোন আছে! আরও খানিকটা এগিয়ে একটা বিশাল স্টেজ আর সংলগ্ন ফুলের বাগান চোখে পড়ল ওদের! এমনিতেও পুরো ক্যাম্পাসটাই অসম্ভব পরিস্কার পরিছন্ন! আর সাথে প্রতিটা জায়গায় বিভিন্ন জানা-অজানা ফুলের ছোট বড় বাগিচা রয়েছে! কিন্তু এই বাগানটা একটু বেশিই বড় মনে হল! “এখানে মনে হয় ফেসট হয় বুঝলে মা! দেখ জায়গাটা বেশ বড় অন্য বাগানগুলোর তুলনায়! আর একটা বিশাল ওপেন স্টেজও আছে তাই না?” মায়ের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো প্রিয়াঙ্কা! নন্দিনী দেবী একটু থেমে বললেন “ এখানে এত কিছু রয়েছে, কোনটা যে কিসের জন্য বলা মুশকিল! তুই থাকবি তো তখনই সব বুঝতে পারবি!” “এবার আমরা হোস্টেলটা দেখি গিয়ে কেমন! ক্যাম্পাসটা দেখার আরও অনেক সময় পাওয়া যাবে! এমনিও একদিনে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়!” হেসে বললেন শেখরবাবু। বাবার কথায় সম্বিত ফেরে প্রিয়াঙ্কার! ঠিকই তো! হোস্টেল দেখতে হবে, শিফটও তো করতে হবে! লাগেজগুলো সব অফিসের রুমে রাখা আছে! সত্যি! চারপাশটা দেখতে দেখতে সব ভুলতে বসেছিল সে! নিজের মনেই হেসে উঠলো প্রিয়াঙ্কা!
মেয়েকে এতটা খুশি দেখে প্রিয়াঙ্কার বাবা-মাও ভীষণ খুশি! আর তাদেরও কলেজ ক্যাম্পাসটা খুবই পছন্দ হয়েছে! আরও বেশি পছন্দ হয়েছে মেয়ের খুশি দেখে! পায়ে পায়ে লাগেজগুলোকে নিয়ে কলেজের ফিমেল হোস্টেলের পথে এগিয়ে চলল ওরা। এখানে যারা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে আসে তাদের হোস্টেল আর আন্ডার গ্র্যাজুয়েশনদের হোস্টেল এক নয়! পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনদের ফিমেল হোস্টেলটা কলেজ ক্যাম্পাসের একটু অন্য দিকে! অফিস থেকে ডায়রেকশন নিয়ে ওরা যখন হোস্টেলে এসে পউছাল তখন দুপুর হয়ে গেছে! হোস্টেলের সামনে সব মেয়েরা লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে কুপন হাতে! কাউন্সিলিংর শেষে হোস্টেলারদের সবাইকে একটা করে কুপন দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাদের হোস্টেলের রুম আর বেড নাম্বার মেনশেন করা আছে! প্রিয়াঙ্কাও লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়! মনে মনে ভাবতে থাকে যে আগের কলেজে তো এসবের বালাই ছিল না! যে যেমন যাচ্ছে সেরকম হোস্টেলে ঢুকে যাচ্ছে! এখানে সব কিছুই নিয়ম মেনে হয়! নিয়মের বাইরে কিচ্ছু হয়না! প্রিয়াঙ্কার চারপাশের বেশিরভাগ মেয়েই দক্ষিণ ভারতীয়! তাই বিশেষ কিছু কথা বলতেও সাহস হচ্ছেনা প্রিয়াঙ্কার! এমনিতেও প্রিয়াঙ্কা অন্তর্মুখী! কিন্তু তা সত্ত্বেও মিশতে ভালই পারে সবার সাথে! কিন্তু রাজ্যের বাইরে প্রথম এল পড়তে! তাই ভিনরাজ্যের মানুষদের সাথে কিভাবে মানিয়ে নেবে সেটা নিয়ে বেশ একটু ভয় ভয়ই করছে তার! তার উপর শুনেছে এখানে সব কিছুই অনলাইন! মানে পড়াশুনা থেকে শুরু করে সব কিছু! আর এতটা অনলাইনে অভ্যস্তও নয় সে! সব কিছু সামলে সবার আগে এগিয়ে থাকতে পারবে তো সে? লাইনে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিল প্রিয়াঙ্কা ঠিক তখনই নন্দিনী দেবী একটা বেশ গোলগাল মেয়েকে সাথে করে এগিয়ে এলেন প্রিয়াঙ্কার কাছে। “ পিউ! দেখ এ হল নিবেদিতা! নিবেদিতা সেন! সেম ডিপার্টমেন্ট তোর সাথে! কলকাতাতে বাড়ি ওর!” হেসে বললেন নন্দিনী দেবী। “ হাই প্রিয়াঙ্কা! তোর কি ব্লক বি?” মিষ্টি হেসে বলল নিবেদিতা।“ হ্যাঁ রে! আর তোর?” জিজ্ঞেস করল প্রিয়াঙ্কা। “আমার ব্লক এ! আমার তো রুমে শিফটিংও হয়ে গেল! তোদের ব্লকের লাইনটা একটু বেশিই বড় মনে হচ্ছে!” হেসে হেসে বলল নিবেদিতা। “ হম রে! তাই মনে হচ্ছে! এই দুটোই তো ব্লক! তার উপর সব মেয়েদের মনে হয় আমাদের ব্লকেই দিয়েছে!” হাসতে হাসতে বলল প্রিয়াঙ্কা। এরপর কথায় কথায় জানলো যে নিবেদিতাও বিটেক করেছে তবে প্রিয়াঙ্কার এক বছর আগে পাশ-আউট। এক বছর বিভিন্ন কম্পিটিটিভ পরীক্ষা দিয়েছে, কিন্তু কোথাও কিছু না হওয়ার অবশেষে এম বি এ করতে এসেছে! নিবেদিতাও কম্পিউটার সাইন্স নিয়েই পড়েছে! কাজেই এক লহমায় দুজনের বন্ধুত্ব হয়ে গেল! ফর্সা, গোলগাল চেহারার সিধাসাধা মেয়ে নিবেদিতাকে প্রিয়াঙ্কার খুব ভাল লেগে যায়। দুজনের মধ্যে সেইদিন থেকেই একটা সুন্দর বন্ধুত্ব হয়ে গেল! নন্দিনী দেবী আর নিবেদিতার মা, গৌরিদেবীও বেশ নিশ্চিন্ত হলেন এই দূর রাজ্যে এসে দুই বাঙালি মেয়ের প্রথমদিনেই বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যাওয়াতে!
“ হাই নিবেদিতা!” সকালে ক্যান্টিনে ঢুকতে ঢুকতে হাত দেখাল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতাও হাত নেড়ে ওকে নিজের কাছে ডাকল। প্রিয়াঙ্কা তিনটে ব্রেড, একটা অমলেট, আর কফির কাপটা কাউনটার থেকে নিয়ে নিবেদিতার পাশে এসে বসলো। “তোর রুম নাম্বার কত?” খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলো নিবেদিতা। “ ১১১ রে! গ্রাউন্ড ফ্লোর। তোর তো সেকেন্ড ফ্লোর না?” ব্রেডে কামড় দিতে দিতে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ হম রে! রুম নাম্বার ৩০১। তোদের ব্লকটাই বেশি ভাল জানিস তো! আমাদের ব্লকটা পুরনো! আর ক্যান্টিনটাও এই ব্লকেই! আমি ভাবছি শিফট করে নেব ব্লক বি তে! দেখি আজ কলেজ থেকে ফিরে ওয়ার্ডেনের সাথে কথা বলব” বলে কফিতে চুমুক দিল নিবেদিতা। “ আরে তো খুবই ভাল হয় তাহলে! চলে আয় এই ব্লকে! একসাথে পড়াশুনা করা যাবে!” আনন্দিত হয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতা স্মিত হেসে বলল “চল এবারে! দেরি হয়ে যাবে নয়তো! আজকে তো মনে হয় ক্লাস হবে না! ইনগরেশন প্রোগ্রামের পর ক্লাসের শিফট বুক করতে হবে!” “শিফট বুক মানে?” বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো প্রিয়াঙ্কা। “ যেতে যেতে বলছি চল! নইলে দেরি হয়ে যাবে!” বলে হাত ধুতে উঠে পড়ল নিবেদিতা।
“ম্যানেজমেন্টের সেমিনার হলটা কোনদিকে হবে কি জানি! এখানে এত বিলডিংস যে খুঁজে পাওয়াও মুশকিল! আমার তো মনে হচ্ছে হারিয়ে যাব!” হেসে হেসে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ আমি আসলে কাউন্সিলিংর দিন সেমিনার হলটা বাইরে থেকে দেখেছিলাম! মনে হয় ওই সেমিনার হলটাই হবে! চল না খুঁজে পেলে গার্ডগুলোকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে!” হাঁটতে হাঁটতে বলল নিবেদিতা। এরপর আর কিছু না বলে দুজনেই পা চালাল। ভাগ্য ভাল ছিল তাই একজন গার্ডকে জিজ্ঞেস করেই সেমিনারে সময়ের মধ্যেই পৌঁছে গেল দুজন।
“ক্লাসের শিফট বুকিংটা কি বলছিলিস যেন! আমি তো এরকম কিছু শুনিনি!” সেমিনারের মধ্যে ফিসফিস করে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ আরে আমার একজন পরিচিত এম বি এ করেছিল এখান থেকেই! সেই বলেছিল যে প্রথম দিন ইনগরেশনের প্রোগ্রামের পর একটা অনলাইনে ক্লাসের শিফট বুকিং হয়! মানে তুই কোন সময়ে ক্লাস করতে চাস সেটা অপসানে থাকা শিডিউল অনুযায়ী বেছে নিতে পারিস। প্রায় সব বিষয়ের ক্ষেত্রেই এটা করা যাবে!” বলল নিবেদিতা। প্রিয়াঙ্কা বেশ রোমাঞ্চ ফিল করল। নিজের সুবিধামত ক্লাসের সময় বাছা যায় এটা সে জানত না! এখান থেকে যদি বি টেকটাও করা যেত কতই না ভাল হত! আরও কতকি সে শিখতে আর জানতে পারত! এখানের সব কিছুই ভীষণ স্ট্যান্ডার্ড! ঠিক যেমনটা প্রিয়াঙ্কার পছন্দ। মানুষের চাওয়াটা কি এতটা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেতে পারে? বিস্ময় লাগে প্রিয়াঙ্কার! এক মনোমুগ্ধকর বিস্ময়তা!
এরপর সেদিনের মত সেমিনার শেষে ক্লাস শিডিউল বুক করল ওরা সবাই। নিজেদের ডিপার্টমেন্টের বাকি ক্লাসমেটদের সাথে পরিচয় হল। এদের অনেকেই যে প্রিয়াঙ্কারই ব্লকেই থাকে সেটাও জানতে পারলো সে! আর একজন বাঙালি মেয়ের সাথে পরিচয় হল। মেয়েটা প্রিয়াঙ্কাদেরই ডিপার্টমেন্টের, নাম মধুমন্তি দাস। মধুমন্তিও ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে কিন্তু ইলেক্ট্রিক্যালে! কথায় কথায় জানা গেল মধুমন্তিও ব্লক বি তেই রয়েছে, ফার্স্ট ফ্লোর ওর! বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল তিনজনের ওইদিনই!
সকালে তাড়াহুড়ো থাকায় সেইভাবে নিজের রুমমেটদের সাথে কথা হয়ে ওঠেনি প্রিয়াঙ্কার। কলেজ শেষে সবাই গল্প করতে শুরু করল। প্রিয়াঙ্কার রুমে প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে চারজন। এর মধ্যে একজন গোয়া থেকে এসেছে, নাম মাধুরি, একজন কেরালার, নাম স্মৃতি, আর একজন তামিলনাডুর, নাম অর্চনা। এদের মধ্যে মাধুরি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ এম টেক করছে, স্মৃতি ইলেক্ট্রনিক্সে এম টেক করছে, আর অর্চনা এম সি এ করছে। সবার সাথে আলাপ হল বেশ ভালভাবে। হোস্টেলটা খুবই পরিস্কার পরিছন্ন! সবসময়ই ক্লিনিং হয়! আর প্রিয়াঙ্কাদের রুমটা বেশ সুন্দর। প্রত্যেকের নিজস্ব আলমারি দেওয়া আছে, তার সাথে স্টাডি টেবিল, চেয়ার সব কিছু! আর রুমটা পুরো এসি! প্রিয়াঙ্কার মনে পড়ে আগের কলেজের হোস্টেলের কথা! ক্লিনিংএর কোন শিডিউলই ছিলনা! দুটো টেবিল চারজনকে শেয়ার করতে হত! আর টপ ফ্লোরে রুমটা হওয়ায় গরমকালে প্রাণ বেরিয়ে যেত! তখন আরও বেশি কান্না পেত প্রিয়াঙ্কার! গরমের জন্য ঠিক না! বরং এইরকম কলেজে আর হোস্টেলে পড়তে হচ্ছে সেটা ভেবেই বেশি কান্না আসতো! এখানের ক্যান্টিনের খাওয়ারও বেশ ভাল! শুনেছে খাওয়ার রিপিট হয়না! আর আগের কলেজের হোস্টেলের খাওয়ারের কথা ভাবলেই মন খারাপ হয়ে যায় তার! আধা দিনতো ঠিক করে খেতেই পারতোনা প্রিয়াঙ্কা! মাঝে মাঝে রেস্তোরা থেকে আনাত, কিন্তু কদিন? চারটে বছর কম ছিল না! যা দিন পেরিয়ে এসেছে সে, আর সেদিন দেখতে হবে না! এসব ভাবতে ভাবতে বিছানা করল প্রিয়াঙ্কা! বাকিরা শুয়ে পড়েছে! কাল থেকে ক্লাস শুরু! নিবেদিতা বলছিল এখানের লাইব্রেরিটা একদম বিদেশী ধাঁচের! উত্তেজনায় এখনি একবার দেখতে যেতে ইচ্ছা করছিল প্রিয়াঙ্কার। নিজের উত্তেজনাকে সামলে লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো প্রিয়াঙ্কা। “ কালকে নতুন দিন! নতুন সকাল! আর আগের কথা ভাববো না…” ভাবতে ভাবতেই দেখল ফোনটা ভাইব্রেট করছে! তুলে নিয়ে দেখল সন্দীপ। রিসিভ করে বলল “ আমি এখন শুতে যাচ্ছি রে! খুব ক্লান্ত! কালকে কলেজ থেকে ফিরে কথা হবে কেমন? বাই!” বলে ফোনটা রেখে শুয়ে পড়ল প্রিয়াঙ্কা। মনে এক একরাশ উত্তেজনা আর ভাললাগার আবেশ নিয়ে চোখ বুজল সে।

         Suspense Thriller
                পঞ্চম পর্ব –

এরপর কলেজের দিনগুলো স্বপ্নের মত কাটতে শুরু করলো। আস্তে আস্তে সবকিছুর সাথে বেশ ভালমতোই পরিচিত হতে থাকে প্রিয়াঙ্কা! নিবেদিতা অনেক কিছু বেশি জানতো প্রিয়াঙ্কার থেকে, তাই ওর সাহায্যে আর নিজের অদম্য চেষ্টাতে কিছুদিনের মধ্যেই কলেজের প্রায় সবরকম নিয়ম আর পড়াশুনার ধরন আয়ত্ত করে ফেলে সে। দেখতে দেখতে প্রায় এক মাস পূর্ণ হয়। এই এক মাসে ক্লাসের সাথে সাথে প্রিয়াঙ্কা, নিবেদিতা প্রায় সব ফুডকোর্ট, আইসক্রিম হাব আর সাথে ক্যাম্পাসের ঠিক বাইরের বিশাল শপিং মলটাকে অগুন্তি বার চষে ফেলেছে। মধুমন্তিও মাঝে মাঝে ওদের সঙ্গ নিত! কিন্তু মধুমন্তি মেয়েটা বড্ড অলস! তাই বেশির ভাগ দিন ক্লাসের শেষে অথবা ছুটির দিনে ওরা দুজনই বেড়িয়ে পড়তো ক্যাম্পাসটাকে চষে বেড়াতে! আর তার সাথে কলেজের অ্যাডভান্সড পড়াশুনার সিস্টেম! এত চমৎকার লাগতো ক্লাস করতে প্রিয়াঙ্কার যে ক্লাসেই অর্ধেক পড়া হয়ে যেত! অডিও ভিসুয়াল ক্লাসগুলো করতে করতে মন ভরে যেত প্রিয়াঙ্কার! চমৎকারভাবেই সব কিছু চলছিল। কিন্তু বলতেই আছে কোনকিছুই এই পৃথিবীতে স্থায়ী নয়! এরপর এমন কিছু একটা হতে চলেছিল প্রিয়াঙ্কার জীবনে যার কল্পনা করা কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়!
ক্লাসে ঢুকতে গিয়ে একটা নতুন মুখ চোখে পড়ল প্রিয়াঙ্কার। মেয়েটা হিজাব পড়ে ক্লাসের প্রথম বেঞ্চে বসে আছে। দেখেই বোঝা গেল যে মেয়েটা মুসলিম। কিন্তু মেয়েটা অদ্ভুতভাবে হেসে হাত নাড়াল প্রিয়াঙ্কাকে দেখে! প্রথমে প্রিয়াঙ্কা বুঝতে পারেনি কাকে হাত দেখাল মেয়েটা, কারণ মেয়েটাকে চেনে বলে তো মনে হচ্ছে না! তারপর যখন মেয়েটা সামনে উঠে এসে পরিস্কার ইংলিশে বলল “ হাই! কেমন আছো?” তখন বেশ অবাক হয়ে গেল সে! কোন কিছু জবাব দেওয়ার আগেই ক্লাসে টিচার ঢুকলেন। তাই তখনকার মত মেয়েটি ওইরকম ভাবেই হাসি মুখে নিজের জায়গায় ফিরে গেল।
“ এই শোন না, বলছি আমাকে একটু লাইব্রেরী যেতে হবে বুঝলি? তুই বরং রুমে চলে যা, আমি বইগুলো সাবমিট করে ডায়রেকট তোর রুমে চলে আসব। তারপর বিকেলের টিফিনটা করে প্রেজেন্টেশনটা নিয়ে বসব একসাথে কেমন?” ক্লাস শেষে কলেজ বিল্ডিং থেকে বেরতে বেরতে বলল নিবেদিতা। প্রিয়াঙ্কা দেখল ঘড়িতে সাড়ে চারটে বাজে। বিকেলের টিফিন আওয়ারস হতে এখনো আধ ঘণ্টা মত বাকি! তাই ভাবল একটু হোস্টেলে গিয়ে বিশ্রাম করে নিলে মন্দ হয়না! এমনিতেও প্রেজেন্টেশনের কাজ করতে করতে অনেক রাত হবে। তাই নিবেদিতার কথায় সম্মতি জানিয়ে হোস্টেলের দিকে পা বাড়াল প্রিয়াঙ্কা।
হোস্টেল বিল্ডিংএ ঢুকে নিজের রুমের সামনে আজকে সকালে ক্লাসে দেখা মেয়েটাকে দেখে একটু অবাকই হল প্রিয়াঙ্কা। মেয়েটা সেই একই রকম হাসি মুখে রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সামনাসামনি এসে পড়াতে প্রিয়াঙ্কাও হাল্কা হাসল। এবার মেয়েটা এগিয়ে এসে ইংলিশে বলল “প্রিয়াঙ্কা রাইট? হ্যালো, আমি আসিফা, গুজরাট থেকে এসেছি। একটু দেরী হয়ে গেল ক্লাস জয়েন করতে! আর তোমার বাড়ি কোথায়?” প্রিয়াঙ্কা একটু চুপ করে থেকে বলল “ আমি ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে এসেছি। বাই দা ওয়ে, তুমি আমার নাম জানলে কি করে? না মানে কলেজে রোল কল তো হয়না এখানে! বায়মেট্রিক অ্যাটেনডেন্স হয়! তাই ভাবছিলাম আর কি…… আর এখানে হটাত?” আসিফা আবারও সেরকমই  হাসি মুখে বলল “ আরে ভর্তির সময় অফিসে দেখেছিলাম তোমার নামটা, আমার জাস্ট পরের রোল নাম্বারটাই তোমার, তাই নামটা মনে থেকে গেছে! আর এখানে এসেছি কারণ রুম নাম্বার ১১০ হল আমার রুম, শিফট করলাম আজই।“ প্রিয়াঙ্কা আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। একটা খটকা লাগছিল মনে! নামটা না হয় ভর্তির সময় দেখেছে তাই মনে থেকে গেছে, কিন্তু সেই নামের মেয়েটা যে সেই সেটা বুঝল কিভাবে? প্রিয়াঙ্কা নামের আরও মেয়ে থাকতে পারে সেম ক্লাসে! আর প্রথমেই সেই উঠে এসে কথা বলাটা কেমন যেন অদ্ভুত লেগেছিল প্রিয়াঙ্কার। এমনভাবে কথা বলেছিল যেন বহুদিনের পরিচিত! এসব ভাবতে ভাবতেই দেখে নিবেদিতা ওর রুমে ঢুকছে! “কি রে যাবিনা খেতে?” ব্যাগটা প্রিয়াঙ্কার বেডে নামিয়ে রেখে বলল নিবেদিতা। প্রিয়াঙ্কা মাথা নেড়ে বলল “চল।“
প্রিয়াঙ্কা অন্যমনস্ক হয়ে আছে দেখে থাকতে না পেরে এবার জিজ্ঞেস করেই ফেলল নিবেদিতা “ কিরে? কিছু হয়েছে নাকি? এনিথিং পার্সোনাল?” প্রিয়াঙ্কা চমক ভাঙ্গার মত চমকে তাকায় নিবেদিতার দিকে। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলে “ আজকে ক্লাসের নতুন মেয়েটাকে দেখলি? আমার বেশ অদ্ভুত লাগলো ওকে!” “কোন মেয়েটা?” নিবেদিতা ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞেস করলো। “ আরে হিজাব পড়া মুসলিম মেয়েটা রে! যেচে এসে কথা বলল!” বলল প্রিয়াঙ্কা। “ও আচ্ছা ঐ মেয়েটা! ওকে আজকে তোদের ব্লকেই দেখলাম তো!” বলল নিবেদিতা। “ আমার পাশের রুমটাতেই তো আছে! আমার সাথে দেখা হয়েছিল যখন তুই লাইব্রেরী গেছিলিস তখন! যেচে যেচে কথা বলছিল। আমার কিন্তু কেমন যেন একটা লাগলো ওকে!” আস্তে আস্তে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ কিরকম?” ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে জিজ্ঞেস করল নিবেদিতা। “হম…ছাড় এসব! চল প্রেজেন্টেশনটা রেডি করি। একটু বেশিই ভাবছি মনে হয়!” বলে কাজে মন দিল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতাও আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল আসিফা মেয়েটা যথেষ্ট মেধাবী। ক্লাসে প্রায় সবরকম কোয়েশ্চন-আনসারিং সেশনে প্রিয়াঙ্কা আর আসিফা পার্টিসিপেট করে! দেখতে দেখতে কলেজের প্রথম ইন্টারনাল পরীক্ষা এসে গেল। এই সময় যথেষ্ট পড়াশুনা করছে প্রিয়াঙ্কা! ওকে সব পেপারে সর্বোচ্চ নাম্বার আনতেই হবে! এটা কলেজের প্রথম পরীক্ষা, তাই প্রথম ইম্প্রেশনটা খুব ভাল রাখতেই হবে! প্রিয়াঙ্কা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছে যে আসিফা মাঝে মাঝেই তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিটা ছেড়ে কেমন যেন ঘোলা নজরে তাকিয়ে থাকে তার দিকে! বিশেষ করে যখন ক্লাসে কোন প্রশ্নের উত্তর প্রিয়াঙ্কা আসিফার আগে দিয়ে দেয় কিম্বা প্রিয়াঙ্কার প্রেজেন্টেশন কোনভাবে একটু বেশি বাহবা পেয়ে যায় ঠিক তখন! সেই সময় আসিফাকে দেখে একটু কেমন যেন লাগে প্রিয়াঙ্কার! এসব তার মনের ভুল কিনা সে জানেনা কিন্তু আসিফা এখন সেই প্রথম দিনের মত ঠিক করে কথা বলেনা আর প্রিয়াঙ্কার সাথে। কারণটা হয়ত প্রিয়াঙ্কার জানা! ক্লাসে প্রিয়াঙ্কা এগিয়ে যাচ্ছে সেটা ভেবে হয়তো হিংসায় কথা বলেনা! হিংসা প্রিয়াঙ্কারও হয়! যে ওকে বিট করার চেষ্টা করে তার উপরই একটা হিংসাতো হয়ই! কিন্তু আসিফার ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হয়না প্রিয়াঙ্কার! সবসময় সেই এক যুদ্ধজয়ের মত প্রচেষ্টা আসিফার! এতটা কংক্রিট মনোভাব তো  প্রিয়াঙ্কারও নয়!  নিবেদিতাকে বলেছিল একবার। ও বলল “ তোরা দুজন কম্পিটিটারস! সেটা প্রথমদিন বোঝেনি মনে হয়! এখন বুঝে আর কথা বলছে না! হিংসুটে মেয়ে!” ব্যাপারটা কেন জানিনা এতটাও সহজ মনে হয়না প্রিয়াঙ্কার!
আজকে শেষ পরীক্ষা ছিল প্রথম ইন্টারনালের। গল্প করতে করতে মধুমন্তি, প্রিয়াঙ্কা আর নিবেদিতা হোস্টেলে ফিরছিল। হোস্টেলে ঢোকার মুখে আসিফার সাথে দেখা! তাকে সেই তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখে দেখা গেল। ওদের দেখে নিজেই এগিয়ে এল। “ কেমন হল পরীক্ষা?” মুখে হাসি বজায় রেখেই জিজ্ঞেস করল আসিফা। “ সেরকম ভাল না। ওই হল একরকম। তোমার কেমন হল?” জিজ্ঞেস করল মধুমন্তি। মধুমন্তির কথার জবাব না দিয়েই হাসি মুখেই প্রিয়াঙ্কার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল আসিফা “ প্রিয়াঙ্কা তোমার কেমন হল? নিশ্চয়ই খুব ভাল?” প্রিয়াঙ্কা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল “ হয়েছে ভালই।“ আসিফা হাল্কা হেসে বলল “ আমারও হয়েছে একরকম। আচ্ছা চলি, নমাজের টাইম হচ্ছে!” বলে তাড়াতাড়ি করে হোস্টেলের ভিতরে ঢুকে গেল আসিফা। “এই মেয়েটার মাথার ডিফেক্ট আছে মনে হয় বুঝলি? আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে সেদিন নিখিলের বার্থ ডে সেলিব্রেট করা হল, আসিফাকে আমি আর রিদিমা ডাকতে এসেছিলাম। কত করে বললাম তাও এলনা! বলে নাকি ওর এসব ভাল লাগেনা!” মুখ বেঁকিয়ে বলল মধুমন্তি। প্রিয়াঙ্কা আর কিছু বলল না।
এরপর আবার আগের মতই আসিফা এক মুখ হেসে কথা বলতে শুরু করল প্রিয়াঙ্কার সাথে। প্রিয়াঙ্কা যদিও হম, হ্যাঁ ছাড়া বিশেষ জবাব দিতনা। ইয়ার্কি নাকি! যখন মন হবে কথা বলবে, যখন মন হবেনা তখন কথা বলবেনা! যাই হোক সবকিছুই আবার আগের মত চলতে শুরু করল। এর মাঝে একদিন প্রিয়াঙ্কার বাবা-মা দেখা করতে এলেন। ভিসিটিং রুমে বসে কথা বলছিল প্রিয়াঙ্কা বাবা-মার সাথে, হটাত করে দেখে আসিফা রুমে ঢুকছে। প্রিয়াঙ্কা ভাবল হয়তো ওরও গার্জেন দেখা করতে এসেছেন! কিন্তু প্রিয়াঙ্কাকে একপ্রকার চমকে দিয়ে আসিফা সেই হাসিমুখে প্রিয়াঙ্কার বাবা-মার সামনে এসে বলল “ হ্যালো আঙ্কেল, হ্যালো আন্টি! কেমন আছেন আপনারা? কবে এলেন?” প্রিয়াঙ্কা অসম্ভব অবাক হয়ে গেল। আসিফার কথা বলার ধরণ দেখে মনে হচ্ছে যেন প্রিয়াঙ্কার বাবা-মাকে কতদিন ধরে চেনে! ঠিক যেমন প্রিয়ঙ্কাকে প্রথম দিন দেখে কথা বলেছিল!  প্রিয়াঙ্কা এই আসিফার অযাচিত আগমনে বেশ বিরক্ত হল। এমনিতেই প্রায় ২.৫ মাস পরে বাবা-মার সাথে দেখা হয়েছে তার উপর না ডাকতেই এসে হাজির হয়েছে এ! অদ্ভুত মেয়ে তো! যাই হোক না চাইতেও বাবা-মার সাথে আসিফার পরিচয় করিয়ে দিতে হল। কথায় কথায় বলল আসিফা যে ও ইঞ্জিনিয়ারিংই করেছে। গেটের জন্য এক বছর খেটেও সেরকম ভাল ফল হয়নি। তাই শেষে এম বি এ করতে এসেছে। নন্দিনী দেবী টুকটাক কথা জিজ্ঞেস করলেন আসিফাকে। আসিফা যে বিটেক করেছে সেটাই আজ জানলো প্রিয়াঙ্কা। আসলে জানার চেষ্টা করেনি! আসিফা ক্লাসের কারুর সাথেই সেইভাবে মেশেনা। একা একাই থাকে। মাঝে মাঝে একজন রুমমেটের সাথে ক্যান্টিনে খেতে আসে, নয়ত একাই আসে বেশিরভাগ দিন। যাইহোক বেশ কিছুক্ষন কথা বলে আসিফা বিদায় নিল। প্রিয়াঙ্কার ভেবে অবাক লাগছিল যে মেয়ে কোন ইভেন্টে যায়না সে আজ না ডাকাতেই ওর বাবা-মার সাথে দেখা করতে চলে এসেছে! আচ্ছা জানলো কি করে যে ওর বাবা-মা এসেছে? মনে মনে ভাবছিল প্রিয়াঙ্কা। এদিকে ভিসিটিং আওয়ারস শেষ হয়ে গেছিল তাই প্রিয়াঙ্কার বাবা-মাও তখনকার মত বিদায় নিয়ে পার্শ্ববর্তী হোটেলের পথে পা বাড়ালেন। প্রিয়াঙ্কাও তখনকার মত নিজের রুমে চলে এল।
সেই রাতে একটু বেশিরাত অব্দি পড়াশুনা করছিল প্রিয়াঙ্কা। রাত প্রায় ১.৩০ বাজে তখন। এবার শুয়ে পড়বে ভেবে বাথরুমে যাওয়ার জন্য রুম থেকে বেরোল প্রিয়াঙ্কা। বাথরুমটা প্রিয়াঙ্কার রুম থেকে একটু দূরে। প্রিয়াঙ্কার রুমে স্মৃতি ছাড়া বাকি সবাই শুয়ে পড়েছে ততক্ষণে! প্রিয়াঙ্কা বাথরুমের কাছাকাছি আসতে পাশের ব্লকের জানলার দিকে চোখটা গেল ওর। প্রিয়াঙ্কাদের ব্লকটা মানে ব্লক বি আর পাশের ব্লকটা মানে ব্লক এ, দুটো ব্লকই পরস্পরের সাথে লাগানো। বি ব্লকের গ্রাউন্ড ফ্লোরের বাথরুমে ঢোকার মুখে বাঁ হাতি যে জানলাটা পড়ে সেটা ব্লক এর সিঁড়িঘরের জানলা। সেই জানলার দিকে তাকাতেই দেখে যে দুটো মেয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয়াঙ্কার দিকে চেয়ে! হটাত করেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে প্রিয়াঙ্কার! মেয়েদুটো স্থির দৃষ্টিতে প্রিয়াঙ্কার দিকে তাকিয়ে আছে আর দুজনেই হাত নেড়ে ওকে ডাকছে! প্রিয়াঙ্কা চকিতে সচেতন হয়ে যায় আর চিৎকার করে বলে “ যা বলবে ওখান থেকেই বল!” ঠিক সেইসময়েই পিছন থেকে কিছু মেয়ের কথার আওয়াজ আসাতে পিছন ফিরে তাকায় প্রিয়াঙ্কা। দেখে তিনজন মেয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বাথরুমের দিকেই আসছে! তারপর আবার জানলার দিকে ঘুরে দেখে কেউ নেই! প্রিয়াঙ্কার গলা একদম শুকিয়ে যায়। তাড়াতাড়ি বাথরুম থেকে ঘুরে প্রায় দৌড়ে রুমের দরজার কাছে এসে থামে। ঠিক তখনই পাশের রুমের দরজায় দেখে আসিফা দাঁড়িয়ে আছে! মুখে সেই স্বভাবসিদ্ধ হাসিটা নেই। এই অবস্থায় আসিফাকে সেই আলো আধারিতে দেখে চমকে যায় প্রিয়াঙ্কা! আসিফা বেশ গম্ভীরভাবে প্রিয়াঙ্কার সামনে দিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল। প্রিয়াঙ্কা বেশ অবাক হয়েছে আর সাথে ভয়ও পেয়েছে! আর কোনদিকে না তাকিয়ে রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল প্রিয়াঙ্কা। রুমের সবাই ঘুমিয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। প্রিয়াঙ্কা কোনরকমে নিজের বেডে এসে চোখ বন্ধ করে ঘুমনোর চেষ্টা করতে লাগলো।

                            ষষ্ঠ পর্ব 
“ বাপরে! তুই তো তাও চালাক আছিস রে, ওইভাবে ডাকার পরও যাসনি! আমি হলে তো চলেই যেতাম!” চোখদুটোকে গোল গোল করে বলল মধুমন্তি। প্রিয়াঙ্কা চুপ করে ছিল। আগের দিনের রাতের কথাটা মধুমন্তি আর নিবেদিতাকে বলবে না বলবেনা করেও বলেই ফেলল শেষ অব্দি। আসলে অহেতুক ভয় পাওয়ার মেয়ে প্রিয়াঙ্কা নয়, বরং সাহসী হিসেবে যথেষ্ট সুনাম ছিল তার আগের কলেজে! কিন্তু কালকে হটাত এতটা যে কেন ভয় পেয়ে গেল সে সেটাই বুঝতে পারছে না! নিবেদিতা আর মধুমন্তি নিজেদের মধ্যে কথা বলছে এসব নিয়েই। প্রিয়াঙ্কা আর কথা বাড়াল না, এমনিতেও সে মোটেই ভীতু প্রতিপন্ন হতে চায়না! কিন্তু আসিফার সেই দৃষ্টিটা মনে পড়লেই কেমন যেন একটা লাগছে!  আগের রাতের সব ঘটনা খুলে বললেও আসিফার হটাত রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা চেপে গেল প্রিয়াঙ্কা!
 “ওখানে গিয়ে তো আমাদের ভুলেই গেছিস রে প্রিয়া!” কপট রাগ দেখিয়ে ফোনের ওপার থেকে বলে উঠলো অনিতা। প্রিয়াঙ্কা সবেমাত্র কলেজ থেকে ফিরেছে তখন। ব্যাগটা রুমের টেবিলের উপর রেখে হেসে বলল “ নারে! তোদের ভুলতে পারি বল? ব্যাস এখানের ক্লাস শিডিউল আর টোটাল সিস্টেমটাই এরকম! একদম সময় পাইনা! মা দিনে একবার ফোন করে, একমিনিটের মত কথা বলে রেখে দিতে হয়! সন্দীপের সাথে তো দুদিন ফোনে কথাই হয়নি! ওই মেসেজে যা কথা হয় ব্যাস ওইটাই!” “ যাই হোক মিস বিজি! আজকে রেসাল্ট বেরিয়েছে ফাইনাল সেমিস্টারের! আপনি চেক করে দেখুন কি কাণ্ড করে বসে আছেন! মিডিয়া এবার আপনার ইন্টারভিউ নিতে আসবে সিওর!” উত্তেজিত হয়ে বলল অনিতা। “দাঁড়া দাঁড়া চেক করি! তারপর তোকে মেসেজ করছি!” তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রেখে রেসাল্টএর সাইটটা ওপেন করতে ল্যাপটপটা খুলে বসলো প্রিয়াঙ্কা।
“ আমাদের পার্টি চাই ব্যাস!” নিবেদিতা আর মধুমন্তি উৎফুল্লের সাথে বলতে শুরু করলো। প্রিয়াঙ্কা স্মিত হেসে সম্মতি জানালো। আসলে পার্টি চাওয়ার মতই ব্যাপার! প্রিয়াঙ্কা ফাইনাল সেমিস্টারে  ১০/১০ গ্রেড পেয়েছে আর সাথে ওভার অল সি জি পি এ অনুযায়ী পুরো ওয়েস্ট বেঙ্গলের মধ্যে প্রথম হয়েছে কম্পিউটার সাইন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে! প্রথমে তো সবটা জানতে পেরে বিশ্বাসই হচ্ছিল না প্রিয়াঙ্কার! একসাথে সব চাওয়াগুলো তার কাছে এসে ধরা দিচ্ছে! জীবনের সব থেকে সোনালি মুহূর্ত মনে হচ্ছিল এই সময়টাকে। বাবা-মাকে প্রথম জানায় প্রিয়াঙ্কা। তারপর সন্দীপকে জানায়! সন্দীপও ভাল ফল করেছে কিন্তু প্রিয়াঙ্কা সবচেয়ে ভাল করেছে! এটাই প্রিয়াঙ্কা চায় সবসময়! সবসময় এগিয়ে থাকতে! ক্লাসের ভাল বন্ধুদের একটা ছোটখাটো পার্টি দিতে হয় ফুড কোর্টে! রুমমেটদেরও আলাদা ভাবে পার্টি দিতে হয়! সবাই প্রিয়াঙ্কার সুনাম করছিল, যে প্রিয়াঙ্কা এটা ডিসার্ব করে! একটা প্রছন্ন অহংকারও যে হচ্ছিলনা প্রিয়াঙ্কার সেটা নয়! এই মুহূর্তটাকে প্রাণ ভরে উপভোগ করছিল সে!
সময়ের তরী এগিয়ে যেতে থাকে। প্রথম ইন্টারনালের রেসাল্ট সাবজেক্ট ওয়াইস বের হওয়া শুরু হয়। দেখা যায় যে দুটো সাবজেক্ট ছাড়া বাকি সবগুলোতেই প্রিয়াঙ্কার হায়েস্ট নাম্বার আছে! একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয় প্রিয়াঙ্কা! এখানে রেসাল্ট অনলাইনে প্রত্যেক স্টুডেন্টের লগইন আইডিতে পাবলিশ করা হয়। শুধুমাত্র ফাইনাল সেমিস্টারের রেসাল্ট ছাড়া আর কোন রেসাল্টই কলেজ নোটিশ বোর্ডে দেওয়া হয়না, এটা এখানকার নিয়ম। তাই সেক্ষেত্রে ইন্টারনালে কে হায়েসট পেল সেটা জানতে পারাটা বেশ কঠিন কাজ! যাই হোক শেষ অব্দি এর ওর কাছ থেকে প্রিয়াঙ্কা জানতে পারে যে সে দুটো পেপার ছাড়া বাকি গুলোতে হায়েস্ট পেয়েছে আর সেই দুটো পেপারে আসিফা হায়েস্ট পেয়েছে! একটু রাগ হল প্রিয়াঙ্কার যে এত চেষ্টা করেও শেষ অব্দি সব গুলোতে হায়েস্ট পেল না সে! যদিও সব সাবজেক্ট মিলে সেই এগিয়ে আছে আসিফার থেকে! তবুও! যাই হোক আর একটা ইন্টারনাল আছে! তখন সবগুলোতেই হায়েস্ট পাবে সে! মনে সান্ত্বনা নিয়ে বই খুলে বসলো প্রিয়াঙ্কা।   
এরপর সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল শুধু একটা জিনিস ছাড়া! না! সেই রাতের ঘটনা আর রিপিট হয়নি প্রিয়াঙ্কার সাথে! তবে আসিফার ব্যবহারে বেশ পরিবর্তন এসেছে! এখন একদমই কথা বলেনা প্রিয়াঙ্কার সাথে। পাশের রুমেই থাকে অথচ সামনাসামনি দেখা হলেও মুখ নামিয়ে চলে যায়! এখান অব্দি সব ঠিক ছিল, কারন প্রিয়াঙ্কাকে বিট করতে পারেনি বলে হয়তো রাগে কথা বলছে না! কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপারটা হল আসিফা পুরো ক্যাম্পাসে প্রিয়াঙ্কাকে ফলো করে! মানে ঠিক ফলো করে কিনা সেটা বোঝা না গেলেও প্রিয়াঙ্কা লক্ষ্য করেছে যে সে যেখানে যায় সেখানে আগের থেকে নয়তো তার যাওয়ার ঠিক পরে পরে আসিফা গিয়ে উপস্থিত হয়! ব্যাপারটা প্রথমে অতটা আমল দেয়নি প্রিয়াঙ্কা! কিন্তু আজকাল লক্ষ্য করছে আসিফা ঠিক তখনই বাথরুম পর্যন্ত যায় যখন প্রিয়াঙ্কা যায়! মানে সেটা মাঝ রাত হোক, কিম্বা মাঝ দুপুর, কিম্বা ভোর রাত! প্রথমে ব্যাপারটা কাকতালীয় মনে হত প্রিয়াঙ্কার! কিন্তু ধীরে ধীরে জিনিসটা বাড়তে থাকে! প্রতিটা জায়গায়! প্রতিটা সময়ে! প্রিয়াঙ্কা জানেনা যে আগেও আসিফা ফলো করতো কিনা, কারণ তখন তার নজরে আসেনি বিষয়টা! কিন্তু এখন দিন দিন ব্যাপারটা অসহনীয় হয়ে উঠছে!  কথা একটাও বলেনা অথচ যেখানে প্রিয়াঙ্কা সেখানেই ঠিক সেই সময়ে কিভাবে পৌছায় সে? 
“নিবেদিতা! তোকে একটা কথা বলার ছিল!” আস্তে আস্তে বলল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতা আইসক্রিমটা প্রথমবারের জন্য মুখে চালান করে দিয়ে বলল “কি কথা রে?”  “দেখ দূরে দাঁড়িয়ে আছে! ওটা আসিফা না?” আস্তে করে বলল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতা প্রিয়াঙ্কার দেখানো দিকে তাকিয়ে দেখল আসিফা ওরা যে আইসক্রিম হাবে বসে আছে তার থেকে একটু দূরে একটা বসার জায়গায় একা একাই ব্যাগটাকে সাইডে রেখে বসে আছে। চোখটা ওইদিক থেকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল নিবেদিতা “ হম! আসিফাই তো মনে হচ্ছে! কেন বলতো?” প্রিয়াঙ্কা গলাটা নামিয়ে বলল “ আসিফা আমাকে ফলো করে জানিস! যেখানে যাই না কেন দেখি ও হাজির! কথাটা অদ্ভুত শুনতে লাগলেও এটা আমি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে লক্ষ্য করে তবে বলছি!” নিবেদিতা বেশ অবাক হয়ে বলল “ কিন্তু আসিফার তোকে ফলো করে লাভ কি? না মানে, তুইও মেয়ে আর ও মেয়ে! লাভ কিছুই নেই।“ “তুই ইয়ার্কি করিসনা নিবেদিতা! আমি সিরিয়াস! মেয়েটাকে আমার শুরুর দিন থেকেই কেমন একটা লাগে যেন! নিজেই কথা বলে, আবার নিজেই কথা বলা বন্ধ করে দেয়! পর পর রোল নাম্বার, আবার পর পর রুম নাম্বারও! এতটা কোইন্সিডেন্স হয়? আমার তো সন্দেহ আছে! তাছাড়া আরও অনেক অদ্ভুত ব্যাপার আছে মেয়েটার!” বিরক্ত হয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা। “ আর কি ব্যাপার?” নিবেদিতা বলে উঠলো। “ ছাড় কিছুনা! বাদ দে! চল এবার ক্লাসে যেতে হবে” বলে আইসক্রিমের দামটা মিটিয়ে দুজনে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল।
এরপর আরও কিছু অদ্ভুতুড়ে জিনিস শুরু হল প্রিয়াঙ্কার সাথে। প্রথমেই যেটা হল সেটা হচ্ছে অ্যাসাইনমেন্টের নাম্বার নিয়ে! এখানে যেহেতু সব কিছুই অনলাইন আর লগইন আইডি বেসড, তাই প্রিয়াঙ্কাদের অ্যাসাইনমেন্টও লগইন আইডিতে পারটিকুলার কলামে আপলোড করতে হয়! সব কিছু ঠিকঠাকভাবে রেডি করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সব অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করে প্রিয়াঙ্কা। কিন্তু প্রতিটা সাবজেক্টের ক্ষেত্রেই নাম্বার চেক করতে গিয়ে দেখে যে নাম্বার কম দেওয়া হয়েছে আর সাথে রিমার্কসে লেখা আছে ইনকমপ্লিট! প্রথমে তো এরকম হতনা! এখন হটাত করে এরকম কেন হচ্ছে সেটা বুঝে উঠতেই পারছিলনা প্রিয়াঙ্কা। প্রথমে ভেবেছিল হয়ত ওরই কিছু ভুল হয়েছে, তাই সাবজেক্ট টিচারের কাছে গেছিল কি ভুল সেটা জানতে! কিন্তু টিচার ওর সামনে আবার ওর অ্যাসাইনমেন্টটা চেক করে বলেন “ সরি প্রিয়াঙ্কা! এটা আমারই ভুল! আমি দেখতে ভুল করেছি! তোমার ফুল মার্কসই আসবে!” এটা একটা কি দুটো সাবজেক্টের ক্ষেত্রে হলে মেনে নেওয়া যেত! কিন্তু এটা প্রতিটা সাবজেক্টের ক্ষেত্রেই হওয়া শুরু হল! এক একটা সেমিস্টারে মোট ৪ টে করে অ্যাসাইনমেন্ট পার সাবজেক্ট করতে হয়। প্রথম দুটো প্রথম ইন্টারনালের আগে, আর পরের দুটো সেকেন্ড ইন্টারনালের আগে! প্রথম ইন্টারনালের আগে যখন প্রথম দুটো অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করেছিল তখন তো এরকম কোন কিছু হয়নি! আর তাছাড়া এখানকার টিচারদের ভীষণরকম দায়বদ্ধতা! কি যে হচ্ছে প্রিয়াঙ্কার সাথে হটাত করে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলনা! কষ্ট করে অ্যাসাইনমেন্ট রেডি করে, সাবমিট করে আবার প্রতিটা টিচারের কাছে দৌড়াও নাম্বার ঠিক আসেনি বলার জন্য! সব টিচার এক ডিপার্টমেন্টেরও নয়! তাই তাদের বিল্ডিংও আলাদা! আর সাথে ক্লাসের চাপ! প্রিয়াঙ্কা হাঁফিয়ে উঠছিল! অন্য কেউ হলে হয়তো আর নাম্বার কারেকশন করাতে যেতই না! কিন্তু প্রিয়াঙ্কা যাবেই! অ্যাসাইনমেন্টের নাম্বারের উপর ফাইনালের ইন্টারনাল মার্কস অনেকটাই নির্ভর করবে! তাই ছেড়ে দেওয়া যায়না! আর ছেড়ে দেবেইবা কেন? কষ্ট করে, ঠিক সল্যুশন করে সাবমিট করার পরও প্রতিটা সাবজেক্টে এরকম হবে কেন? আর তো কারুর সাথে হচ্ছে না! 
“ একটা কথা বলবো কিছু মনে করিস না!” হাল্কা করে বলল স্মৃতি, প্রিয়াঙ্কার রুমমেট। প্রিয়াঙ্কা ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে বলল “ মনে করার কি আছে! বল না!” স্মৃতি প্রিয়াঙ্কার বেডে এসে বসলো। তারপর বলল “ তোর কি কিছু টেনশন চলছে? সেরকম কিছু থাকলে আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারিস!” স্মৃতির কথায় বেশ অবাক হয়ে গেল প্রিয়াঙ্কা। তারপর বলল “সেরকম কিছুই নয়! কিন্তু তুই হটাত এরকম কথা বলছিস কেন?” স্মৃতি পাশের বেডে বসে থাকা মাধুরির দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল “ আসলে তোর চেহারাটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে! কিছুদিন আগেও তোকে অন্যরকম লাগতো দেখতে! কিন্তু এখন কিরকম যেন লাগে! খাওয়া দাওয়া তো মনে হয় ঠিকঠাকই করিস! ঘুমাসও ঠিকঠাক, দেখেছি আমরা! তাই ভাবলাম মেনটাল কিছু প্রবলেম থাকলে শেয়ার করতে পারিস!” প্রিয়াঙ্কা ভাল মতই বিস্মিত হল, কিন্তু সেটা প্রকাশ না করেই বলল “ না রে সেরকম কিছু না! ওই একটু পড়ার চাপ! থ্যাক্স এতটা ভাবার জন্য!” “তুই কিছু মনে করিসনি তো?” উদ্বিগ্ন হয়ে বলল মাধুরী। প্রিয়াঙ্কা হেসে না সূচকভাবে মাথা নাড়াল।
রাতে শুতে যাওয়ার সময় ভালভাবে নিজেকে রুমের আয়নায় দেখতে শুরু করলো প্রিয়াঙ্কা! রুমের বাকিরা ঘুমিয়ে গেছে! প্রিয়াঙ্কা দেখল চোখের তলায় প্রায় কালশিটের মত পড়ে গেছে তার! চোয়াল ভেঙ্গে গেছে! শরীর প্রায় কঙ্কালসার! এমনিতেও প্রিয়াঙ্কা বেশ রোগাই ছিল, কিন্তু এরকম ছিলনা কখনই! নিজের রুপ নিয়ে কখনই সেইভাবে ভাবেনা প্রিয়াঙ্কা! তাই হয়তো খেয়াল করেনি এতদিন! কিন্তু একি রুপ হয়েছে তার! সামনে প্রতিবিম্বের স্থানে যে দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রিয়াঙ্কাকে চেনেনা সে! খাওয়া দাওয়া তো ভালমতই করে সে! ঘুমায়ও ঠিক মত! তবে এরকম হওয়ার কারণ কি! নিজের বেডে ফিরে আস্তে আস্তে ভাবতে থাকে প্রিয়াঙ্কা যে কি শুরু হল তার সাথে! কিছুদিন আগেও সব ঠিক ছিল! ভাবতে ভাবতে রুমের আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ে প্রিয়াঙ্কা! কিন্তু আজকে ঘুম আসছে না তার! খালি ভাবছে যে কি হচ্ছে তার সাথে! কেনই বা হচ্ছে! এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ে প্রিয়াঙ্কা ।
                    সপ্তম পর্ব 
সকালে দেরী করে ঘুম ভাঙল প্রিয়াঙ্কার! মনে হয় প্রথম ক্লাসটা মিস হয়ে যাবে আজকে! ভাবতে ভাবতে তাড়াতাড়ি করে বাথরুমে যাওয়ার জন্য রুম থেকে বেরোল প্রিয়াঙ্কা। এখন প্রায় ৭টা বাজে, বাথরুমে ভিড় কম হবে কারন বেশিরভাগ মেয়ে আরও সকালে স্নান করে নেয়। এখানে প্রায় সবারই সকাল ৮টা থেকে ক্লাস থাকে, তাই সকালে বাথরুম খালি পাওয়াটা বেশ চাপের বিষয়! যাই হোক বাথরুমে ঢুকতে গিয়েই দেখে আসিফা বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে! প্রিয়াঙ্কার সাথে চোখাচোখি হতেই বেসিনের দিকে ফিরে কলটা খুলে হাত ধুতে শুরু করলো। প্রিয়াঙ্কা বিরক্ত হয়ে একটা খালি বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। এখানে পোস্ট গ্রাজুয়েশনদের হোস্টেলে পিএইচডির স্টুডেন্টরাও থাকে! তাই দুটো হোস্টেল ব্লকই বেশ বড়, পাঁচতলা করে! স্বাভাবিকভাবেই স্টুডেন্টও অনেক বেশি, তাই প্রতিটা ফ্লোরেই একটা করে বাথরুম আছে, আর প্রতিটা বাথরুমেই প্রায় ২০ টা করে টয়লেট আর বাথ প্লেস আছে! প্রিয়াঙ্কা তাড়াতাড়ি করে কোনরকমে স্নানটা করেই বেরিয়ে এল। রুমে আসার সময় দেখে আসিফা করিডরে, হোস্টেলের ঠিক মাঝখানে থাকা বাস্কেটবল কোর্টটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে! প্রিয়াঙ্কা দেখেও না দেখার ভাঙ করে রুমে এসে ঢুকল। “ আজকে মনে হয় ব্রেকফাস্টটা স্কিপ করতে হবে! অলরেডি ৭ টা ২০!” নিজের মনেই বলতে বলতে রেডি হতে শুরু করলো। মাধুরী আর স্মৃতির আজকের দিনে সকাল ১০ টা থেকে ক্লাস থাকে! তাই দুজনে ঘুমাচ্ছে এখনও। আর অর্চনার ৮ টা থেকেই ক্লাস প্রিয়াঙ্কার মত! নিজে উঠে রেডি হয়ে ক্যান্টিনে খেতেও চলে গেছে সে সম্ভবত! একটু অন্যরকম মেয়ে অর্চনা! ব্যাস নিজেরটাই বোঝে! তাই ও কেন প্রিয়াঙ্কাকে একটু ডেকে দেয়নি এটা ভাবা কিম্বা জিজ্ঞেস করার কোন মানেই হয়না! রেডি হয়ে ব্যাগটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ফোনটা খুলে দেখল নিবেদিতার ২ টো মিসড কল। কল ব্যাক করতে গিয়ে দেখল নিবেদিতা ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে ওর কাছেই আসছে! হাতে দুটো ব্রেডের স্লাইস! প্রায় দৌড়ে এসে বলল “ নে, নিয়ে এলাম তোর জন্য! ফোন করছিলাম, তুলছিলিস না, তখনই মনে হয়েছে উঠতে দেরী করেছিস নিশ্চয়ই! চল খেতে খেতে এগোই!” প্রিয়াঙ্কার মনটা বেশ খুশি হয়ে গেল। নিবেদিতা মেয়েটা সত্যিই খুব ভাল। দুজনে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে পড়ল ক্লাসের উদ্দেশ্যে।
ক্লাসে আসিফা একদম অন্যরকম! বেশ মন দিয়ে পড়া শোনে, ভীষণ স্বাভাবিক মনে হয় তখন তাকে! মাঝে মাঝে প্রিয়াঙ্কার মনে হয় আসিফার মধ্যে দুটো আসিফা লোকানো আছে! মানসিকভাবে ঠিক নেই মেয়েটা! আবার এক এক সময় বেশ ভয় লাগে, ভয়টা যে কেন লাগে সেটা বুঝে উঠতে পারেনা প্রিয়াঙ্কা!
দেখতে দেখতে সেকেন্ড ইন্টারনাল পরীক্ষাও এসে যায়। পড়াশুনা নিয়ে বেশ ব্যস্ত এখন প্রিয়াঙ্কা। ইন্টারনাল পরীক্ষা তিনদিন ধরে হয়। শেষদিন পরীক্ষা দিয়ে বেরনোর সময় প্রিয়াঙ্কাকে অবাক করে দিয়ে আসিফা হেসে কথা বলতে এল। প্রিয়াঙ্কা ভেবেছিল জবাব দেবেনা। কিন্তু মুখোমুখি কেউ কথা বলতে এলে প্রিয়াঙ্কা এইভাবে খারাপ ব্যবহার করতে পারেনা। আসিফা প্রথমেই বলল “এখন কি প্ল্যান? পরীক্ষা তো শেষ!” প্রিয়াঙ্কা উদাসীনভাবে বলল “কিছু প্ল্যান নেই। আচ্ছা আমরা আসি, চল নিবেদিতা।“ পাশ কাটিয়ে চলে এল প্রিয়াঙ্কা।
আর কদিন মত ক্লাস হবে, তার পরেই ফাইনাল সেমিস্টার শুরু হবে। এরই মধ্যে সেই একই জিনিস আবার শুরু হয়েছে প্রিয়াঙ্কার সাথে! এতদিন অ্যাসাইনমেন্টের নাম্বার নিয়ে অদ্ভুত জিনিস হচ্ছিল, আর এখন তার সাথে সেকেন্ড ইন্টারনালের নাম্বার পাবলিশের সঙ্গে সঙ্গে সেই একই জিনিস হচ্ছে! এই যেমন একটা পেপারে প্রিয়াঙ্কা খুব ভাল পরীক্ষা দিয়ে এসেছিল, কিন্তু আজকে নাম্বার পাবলিশ হয়েছে শুনে নিজের লগইন খুলে দেখল যে সাবজেক্টটাতে পাশই করেনি সে! বার বার রিফ্রেশ করে দেখল, কিন্তু সেই একই জিনিস দেখাচ্ছে! বাধ্য হয়ে পরের দিন সেই সাবজেক্টের টিচারের কাছে গেল সে! তিনি খাতাটা চেক করলেন আবার, আর সেই একই জিনিস আবারও হল। উনি বললেন “ সরি প্রিয়াঙ্কা, তোমার খাতা চেক করার সময় মাঝের কিছু পাতা ওভার লুকড হয়ে গেছে! তোমারই হায়েস্ট হবে! আমি এখনই ঠিক করে আপলোড করে দিচ্ছি!” প্রিয়াঙ্কার মনে হচ্ছিল যা মুখে আসে বলে দিতে! বার বার এক জিনিস! কিন্তু পারলো না, প্রথমত উনি একজন টিচার, তার উপর উনি যথেষ্টভাবে লজ্জিত! আর সব থেকে বড় কথা কতজনকে বলবে? সব পেপারে, সেটা অ্যাসাইনমেন্ট হোক কিম্বা ইন্টারনালের নাম্বার হোক, একরকম জিনিস কিভাবে হতে পারে! তাও শুধুমাত্র তারই সাথে! ফ্যাকাল্টি রুম থেকে বেরোতে বেরোতে ভাবতে লাগলো প্রিয়াঙ্কা যে আবারও এই বিল্ডিং নয়তো অন্য বিল্ডিংএ আসতে হবেই তাকে, এক এক করে নাম্বার পাবলিশ হবে, আর তাকে ছুটতে হবে এই টিচার থেকে ওই টিচারের কাছে! হটাত করেই বেশ ক্লান্ত লাগছিল প্রিয়াঙ্কার!
এখন ফাইনালের পড়াশুনার সাথে সাথে প্রেজেন্টেশনেরও বেশ চাপ চলছে। এরই মাঝে যা ভেবেছিল প্রিয়াঙ্কা ঠিক তাই হল তার সাথে! প্রায় সব পেপারগুলোর নাম্বার পাবলিশ হওয়ার সাথে সাথেই কিছুনা কিছু প্রব্লেম হয়েইছে, আর সেটা শুধুমাত্র তার ক্ষেত্রেই! প্রিয়াঙ্কার এখন বেশ কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছে যে কেউ একটা আছে যে চায়না যে সে এখানে থাকুক। এটা যে ঘুরে ফিরে কেন তার মনে হয় বারবার সেটা সে জানেনা। প্রথম এখানে আসার উত্তেজনাটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে যেন! আজকাল এই জায়গাটাকে ভীষণ বদ্ধ মনে হয় তার! মনে হয় পাঁচিলগুলো একটু নিচু হলে টপকে পালিয়ে যেত সে অন্য কোথাও!
লাইব্রেরীতে মুখোমুখি বসে আছে নিবেদিতা আর প্রিয়াঙ্কা। “ মেয়েটা না ভীষণ অলস! কখন বলল যে আসবে আর এখনও তার আসার সময় হলনা!” ছটফট করতে করতে বলল নিবেদিতা। নিবেদিতা এই কদিন হল প্রিয়াঙ্কাদের ব্লক, মানে ব্লক বি তে শিফট করেছে! নিবেদিতার রুমটা প্রিয়াঙ্কার ৫টা রুম পরেই, গ্রাউন্ড ফ্লোরেই! তাই এখন অনেকটাই সুবিধা হয়েছে ওদের দুজনেরই গ্রুপ্স্টাডি করতে।  মধুমন্তি একটা সাবজেক্ট বুঝতে পারছে না বলে ওদের সাথে গ্রুপ স্টাডি করবে বলেছিল। তাই তিনজনে ঠিক করেছে আজ হোস্টেলের স্টাডি রুমে না পড়ে লাইব্রেরীতে গিয়েই পড়বে। ওখানে বই দরকার হলেই নিয়ে পড়া যাবে! ক্লাস অলরেডি সাসপেন্ড হয়ে গেছে! এখন সারাদিন পড়াশুনা আর সময় পেলেই যার যার সিঙ্গেল প্রেজেন্টেশনের প্রিপারেশন করা! প্রায় আধ ঘণ্টা লেটে এসে ঢুকল মধুমন্তি। নিবেদিতা তো বিশাল রেগে গেছে! যাই হোক রাগারাগির পর্ব শেষ করে তিনজনে পড়াশুনা শুরু করল। বেশ কিছুক্ষন পরে দেখল আসিফা ওদের দিকেই আসছে! মুখে আবারও সেই স্বভাবসিদ্ধ হাসি! কাছে এসে বলল“ তোমরাও পড়তে এসেছ এখানে? আমি দুটো বই ইস্যু করতে এলাম।“ নিবেদিতা হাসল।মধুমন্তি আর প্রিয়াঙ্কা কিছু বলল না। আসিফা চলে যাওয়ার পর নিবেদিতা বলল “ প্রিয়াঙ্কা, তুই মনে হয় ঠিকই বুঝেছিলিস! এই আসিফাটা তোকে ফলো করে! আমিও শিওর এবারে!” মধুমন্তি বই থেকে চোখ তুলে বলল “ তাই নাকি?” প্রিয়াঙ্কা বলল “ কি জানি! তবে আমার মনে হয়! ছাড় বাদ দে! এসব ডিসকাস করে সময় নষ্ট করে লাভ নেই! যে যা করে আনন্দ পাচ্ছে, সেটাই করুক!” এরপর আর কেউ কিছু বলল না।
বেশ কিছুদিন ধরে প্রিয়াঙ্কার শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা। কখনো খুব জ্বর আসছে, কখনো পেটে ব্যাথা করছে! সেদিন তো খুব অদ্ভুতভাবে হটাত করেই কানে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছিল। এত ব্যাথা আগে কখনই হয়নি প্রিয়াঙ্কার! আর সেদিন ছিল গাইডের কাছে প্রেজেন্টেশনের ডেমো দেওয়ার দিন! সকাল থেকে হটাত কোরেই এত ব্যাথা শুরু হল যে পেন কিলারেও কমলো না! তাই উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাসেরই হেলথ সেন্টারে যেতে হল। নিবেদিতার গাইড আলাদা হওয়ায় ও ফ্রি ছিল সেদিন , তাই সাথে গেছিল প্রিয়াঙ্কার। হেলথ সেন্টারে গিয়ে শুনল যে ইএনটি সেদিন নেই। কোনরকম কিছু ট্রিটমেন্ট হলই না বারবার বলা সত্ত্বেও! শেষে কিছু পেন কিলার দিয়ে ওদের পাঠিয়ে দিল। সারাদিন কাতরানোর পর যখন বিকেল হয়ে এল, তখন নিজের থেকেই ব্যাথাটা কমে গেল! ওষুধেরও দরকার পড়ল না! ব্যাস শুধু প্রেজেন্টেশনের ডেমোটা খুব সুন্দরভাবে মিস হয়ে গেল প্রিয়াঙ্কার!
এইভাবেই চলছিল। প্রিয়াঙ্কার সর্বতোভাবে মনে হত যে কেউ তাকে এখান থেকে সরাতে চাইছে নানাভাবে। সবকিছু একটা মিলিত প্ল্যানিং মনে হত প্রিয়াঙ্কার! নানাভাবে তাকে আটকানো হচ্ছে, ভালভাবে পড়াশুনা করা থেকে, নয়তো ভাল নাম্বার পাওয়া থেকে! নিবেদিতা কিছু কিছু বুঝতে পারছিল প্রিয়াঙ্কার অবস্থাটা, কারণ একমাত্র ওই ছিল যে সব থেকে বেশি সময় প্রিয়াঙ্কার সাথে থাকতো।
বাড়িতে এতকিছু বলেনি প্রিয়াঙ্কা। ওই উপর উপর মাকে বলেছিল যে নাম্বার কম দিয়েছিল ভুল করে ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজের অদম্য ইচ্ছাতে সে এখানে এসেছে! এমনিতেও আগের কলেজে পড়াকালীন যে সে ভাল নেই সেটা মাকে সবসময় বলতো। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারে যে সবসময় নিজের সব অসুবিধা বাড়িতে বলে বাবা-মাকে ব্যতিব্যস্ত করাটা ঠিক নয়। আর তাছাড়া বলবেটাই বা কি! এখানে আপাতদর্শনে কিছু অসুবিধাই নেই! প্রথম প্রথম প্রিয়াঙ্কারও কিছু অসুবিধা হতনা! মনে হত সব কিছু পেয়ে গেছে সে তার লাইফে! কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে সেটা সে বোঝেনি! পরিস্থিতি এমন যে কাউকে বুঝিয়েও বলা যাবেনা!
নিবেদিতা সেদিন সন্ধ্যেবেলা নিজের রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে ফোনে কথা বলছিল। হোস্টেলের রুমের সামনে একটা লম্বা করিডর আছে, আর করিডরের সামনেই বাস্কেটবল কোর্টটা! পাশের ব্লকেও এরকমই সিস্টেম শুধু ওখানে বাস্কেটবলের জায়গায় ব্যাটমিন্টন কোর্ট করা আছে! যাই হোক, নিবেদিতা দেখল প্রিয়াঙ্কা বাস্কেটবল কোর্টের এক সাইডে, যেখানে সিঁড়ির মত একটা বসার জায়গা করা আছে, সেখানে বসে আছে একা একা! ফোনে কথা বলা শেষ করে এগিয়ে যায় সেদিকে নিবেদিতা। প্রিয়াঙ্কাকে এইভাবে একা চুপ করে বসে থাকতে আগে কখনো দেখেনি নিবেদিতা। একটু সন্দেহের বশেই প্রিয়াঙ্কার কাছে গিয়ে বসলো, তারপর জিজ্ঞেস করলো “ কিরে! একা একা বসে আছিস?” প্রিয়াঙ্কা কিছু উত্তর না দিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে রইল। নিবেদিতা একটু থেমে আবার বলল “ কিরে! কি দেখছিস উপরে?” প্রিয়াঙ্কা সেদিক থেকে চোখ না সরিয়েই বলল “ ভাবছি রুমটা টপ ফ্লোরে শিফট করবো!” নিবেদিতা বেশ অবাক হয়ে গেল। সবাই গ্রাউনড ফ্লোরে রুম চায়, আর প্রিয়াঙ্কা টপ ফ্লোরে যেতে চাইছে! প্রিয়াঙ্কার কাঁধে হাত দিয়ে বলল নিবেদিতা “কেন রে? রুমমেটদের সাথে কিছু অসুবিধা হয়েছে নাকি?” কাঁধে হাত দেওয়াতে চমক ভাঙ্গার মত চমকে উঠলো প্রিয়াঙ্কা! নিবেদিতা ব্যস্ত হয়ে বলল “ কি হল রে?” প্রিয়াঙ্কা একটু চুপ থেকে বলল “ না কিছুনা!” নিবেদিতা বেশ অবাক হল, কিন্তু মুখে কিছু আর বললনা।
আজকাল নিজের মনের উপর কন্ট্রোল থাকেনা প্রিয়াঙ্কার। কিসব কিসব মাথায় আসে! এক একবার মনে হয় হোস্টেলের টপ ফ্লোরে চলে যাবে রুম শিফট করে, ওখান থেকে ঝাঁপানো সোজা! ওখান থেকে ঝাঁপালে মরে নিশ্চয়ই যাবে! পরক্ষনেই মনে হয় কিসব ভাবছে সে! কেন ঝাঁপাবে সে! এক একবার মনে হয় কিছু একটা হতে চলেছে তার সাথে, সিক্সথ সেন্স বার বার এটা মনে করিয়ে দেয় যে এখানে বেশিদিন আর নয়! কেন যে এরকম হয় প্রিয়াঙ্কা উত্তর খুঁজে পায়না! আর উত্তর খোঁজার খুব বেশি চেষ্টাও করেনা আজকাল! কোন এক অলৌকিক শক্তির বশে আজকাল বেশি ভাবনাচিন্তা করতেও ইচ্ছা হয়না প্রিয়াঙ্কার! সেদিন আবার মা ফোন করেছিল। একথা সেকথার পর হটাত করেই বলে বসে সে “ মা, আমি ফাইনাল সেমিস্টার এক্সামটা দেবনা! আমার ভাল লাগছেনা!” নন্দিনীদেবী ভালমতোই বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ যে মেয়ে সবসময় প্রথম হওয়ার দৌড়ে সামিল থেকে এসেছে, সে কিনা বলছে পরীক্ষা দেবেনা! তাও আবার নিজের ড্রিম কলেজে চান্স পেয়েও! নিজেকে সামলে নিয়ে বলেছিলেন “ কেন রে বাবু? কি হয়েছে? কলেজে কিছু অসুবিধা হচ্ছে নাকি? ওই নাম্বারের ঝামেলাটা বলছিলিস, ওটা মেটেনি এখনও?” প্রিয়াঙ্কা পরমুহূর্তেই কথা পাল্টে জোর করে একটু হেসে বলে “ না ওটা মিটে গেছে! এমনি বলছিলাম পরীক্ষা দেবনা!” নন্দিনী দেবী আর কিছু না বললেও বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা তো অস্বাভাবিক আছে! কিন্তু এত দূরে থেকে সেই মুহূর্তে মেয়ের চিন্তা করা ছাড়া আর কোন রাস্তা খোলা ছিলনা তার কাছে!
বলতেই আছে, ঝড় আসার আগে অনেক পূর্বাভাস দেয়! যদি সেই পূর্বাভাস বুঝতে পেরে সাবধান হওয়া যায় তো ভাল, নয়তো সেই ঝড়ের দাপটে সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে বেশি সময় লাগেনা! কিন্তু কি করা যায় যদি সব বুঝেও করার কিছু না থাকে তো?
                অষ্টম তথা অন্তিম পর্ব 
এই অদ্ভুত পরিস্থিতির মাঝেই সবকিছুই এগিয়ে চলে সময়ের নিয়মে! আর ফাইনাল সেমিস্টারের পরীক্ষা চলে আসে দোরগোড়ায়! এক শারীরিক আর মানসিক দোটানার মধ্যেই নিজেকে আসন্ন পরীক্ষার জন্য যথা সম্ভব তৈরি করতে থাকে প্রিয়াঙ্কা! কিন্তু মনে শান্তি নেই! কেন নেই, ঠিক কি জন্য নেই, সেটা বুঝে উঠতে পারেনা প্রিয়াঙ্কা! সবসময় মনে হয় কিছু একটা হবে! কি হবে তার সাথে? 
আজকে প্রথম পেপারের পরীক্ষা শুরু হল প্রিয়াঙ্কাদের! যদিও এমটেক আর এম এসসিদের পরীক্ষা দুদিন পর থেকে শুরু হবে। বাকি প্রায় সব পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনদের পরীক্ষা আজ থেকেই শুরু। এম বি এদের পরীক্ষা আজকে ফাস্ট হাফ থেকে শুরু হচ্ছে! পর পর পেপার আছে, কোন অফ নেই দুটো পরীক্ষার মাঝে! শুধু শেষের পেপারটার আগে একদিন ছুটি পড়েছে। যেহেতু এরা নিজেরাই সেলফ ইউনিভার্সিটি, তাই এদের নিজেদের নিয়ম অনুযায়ী ফাইনাল সেমিস্টার পরীক্ষা চলাকালীন রবিবারেও পরীক্ষা চলে। শেষের পেপারটার আগে কিসের যেন একটা ছুটি পড়ে গেছে! প্রিয়াঙ্কা অত আর দেখেনি কিসের ছুটি বা কিছু! এমনিতেও খুব দুর্বল আর ক্লান্ত সে, এখন পরীক্ষাটা দিয়ে বাড়ি যেতে পারলেই বাঁচে!
পরীক্ষার ইনডিভিজুয়াল শিডিউল সবার লগইন আইডিতে দেওয়া হয়েছে! প্রথম দুটো পরীক্ষা নিবেদিতার সাথে একই জায়গায় পড়লেও, বাকিগুলো দুজনের দু জায়গায় পড়েছে। যদিও প্রত্যেক পরীক্ষারই রুম নাম্বার দুজনেরই আলাদা আলাদা! ফাইনাল পরীক্ষার শিডিউল অনুযায়ী এক একটা পরীক্ষা এক একজনের এক এক বিল্ডিংএ পড়বে, যেমন কারুর পড়ল হয়তো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংর বিল্ডিংএ, কারুর হয়তো ম্যাথের বিল্ডিংএ ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার সব পরীক্ষাও একজনের এক বিল্ডিংএ পড়তেও পারে আবার নাও পড়তে পারে! রুম নাম্বার আলাদা আলাদা হলেও নিবেদিতা আর প্রিয়াঙ্কার প্রথম দুটো পরীক্ষাই টেকনিক্যাল টাওয়ার বিল্ডিংএ পড়েছে। এখানে ফাইনাল পরীক্ষা মানে ভীষণরকমের কড়াকড়ি! পাঁচ মিনিটের বেশি দেরী হলেই কোনভাবেই হলে ঢুকতে দেওয়া হয়না! তাড়াতাড়ি করে প্রিয়াঙ্কা আর নিবেদিতা পা চালাল।  টেকনিক্যাল টাওয়ার বিল্ডিংএ ঢুকে প্রিয়াঙ্কা দাঁড়িয়ে পড়ল হটাত করে! নিবেদিতা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে এল প্রিয়াঙ্কার কাছে, “ কি রে! কি হল চল! দেরী হয়ে যাচ্ছে তো!” বলে প্রিয়াঙ্কার হাত ধরে টান মারল নিবেদিতা। প্রিয়াঙ্কা এদিক ওদিক অসহায়ের মত তাকিয়ে বলল “ আমার রুম নাম্বারটা কত আছে সেটা মনে করতে পারছিনা রে!” নিবেদিতা একটু থমকে বলল “ আচ্ছা দাঁড়া! ফ্লোর তো দুজনের একই, সেকেন্ড ফ্লোর! চল যেতে যেতে তোর লগইনটা ফোনে খোল, দেখে নেওয়া যাবে তোর রুম নাম্বারটা।“ প্রিয়াঙ্কার চুপ করে আছে দেখে আবারও বলল নিবেদিতা “ কিরে! ফোনটা বের কর!” প্রিয়াঙ্কা আমতা আমতা করে বলল “ না মনে হয় ফোনটাও আনতে ভুলে গেছি!” নিবেদিতা আর প্রিয়াঙ্কা লিফটে উঠলো। তারপর নিবেদিতা বলল “ঠিক আছে কোন ব্যাপার না! আমার ফোন থেকে দেখে নিচ্ছি! তোর পাসওয়ার্ডটা দে এখানে!” নিজের ফোনে লগইনটা খুলে প্রিয়াঙ্কার সামনে ধরল নিবেদিতা। পাসওয়ার্ড দিয়ে নিবেদিতা প্রিয়াঙ্কার রুম নাম্বারটা দেখে প্রিয়াঙ্কাকে বলল। “রুম খুঁজে পাবি তো? “ প্রিয়াঙ্কা শুকনো মুখে হেসে সম্মতি জানাল। নিবেদিতা বলল “ এত টেনশন করিস না! পরীক্ষা ভাল হবে! অল দ্য বেস্ট।“ “তোকেও বেস্ট অফ লাক” বলে পরীক্ষার হলের দিকে এগোল প্রিয়াঙ্কা।
 প্রথম পেপারটা বেশ ভালই গেছে প্রিয়াঙ্কার। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে হোস্টেলে যাওয়ার পথে মধুমন্তির সাথে দেখা হল। ওর আলাদা বিল্ডিংএ পরীক্ষা পড়েছিল! নিবেদিতা আর মধুমন্তির মোটামুটি পরীক্ষা হয়েছে! একটু হলেও ফুরফুরে লাগছিল আজকে প্রিয়াঙ্কার! তবে আজকে অদ্ভুতভাবেই সকাল থেকে আসিফার সাথে কোত্থাও দেখা হয়নি! প্রিয়াঙ্কা তো ভেবেছিল আসিফারও নিশ্চয়ই তার সাথে একই রুমে পরীক্ষা পড়বে! কিন্তু অদ্ভুতভাবেই এক রুম কেন এক বিল্ডিংও মনে হয় পড়েনি ওদের দুজনের! পড়ে থাকলে একবার না একবার দেখা হতই। এমনিতেই যেখানে দেখা হওয়ার নয় সেখানেই দেখা হয়ে যায়! কিন্তু সেরকম কিছু হল না আজকে! প্রিয়াঙ্কার একটু স্বস্তি লাগছিল। সব মিলিয়েই মনটা বেশ ভালই লাগছিল অনেক দিন পর। “ চল আইসক্রিম খাবি?” হটাত করে বলে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। “ আইসক্রিমে না বলতে পারিনা একদম! চল চল” বলে ছুটে ছুটে এগিয়ে চলল মধুমন্তি। নিবেদিতা আর প্রিয়াঙ্কা হেসে ফেলল সেটা দেখে।
পরের দিনের পরীক্ষার জন্য বেশ মন দিয়ে পড়ছিল প্রিয়াঙ্কা। পরের পরীক্ষাটাও টেকনিক্যাল টাওয়ার বিল্ডিংএই পড়েছে। এবার মধুমন্তিরও নিবেদিতা আর প্রিয়াঙ্কার সাথেই টেকনিক্যাল টাওয়ার বিল্ডিংএই সেকেন্ড পেপারের পরীক্ষাটা পড়েছে! তাই তিনজনে ঠিক করে রেখেছে একসাথেই যাবে হোস্টেল থেকে! কাল সকাল ৮টা থেকে পরীক্ষা, আজ সকাল ১১টা থেকে ছিল। কাজেই আজ রাতের মধ্যেই সব রিভিশন শেষ করতে হবে, সকালে উঠে সেইভাবে সময় পাওয়া যাবেনা! একমনে পড়ছিল প্রিয়াঙ্কা হটাত করে দেখে আসিফা ওর রুমে ঢুকছে! ভালমতই অবাক হয়ে গেলেও মুখে কিছু প্রকাশ করলনা প্রিয়াঙ্কা। আসিফা নিজের স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখে রুমে ঢুকল আর প্রিয়াঙ্কার বাকি রুমমেটদের সাথে কথা বলতে শুরু করলো। ওরাও একটু অবাকই হচ্ছিল কারণ মুখোমুখি হাই হ্যালো হলেও আগে কখনোই আসিফা নিজের থেকে ওদের রুমে এসে ফালতু গল্প করেনি! তাও আবার পরীক্ষার সময়! প্রিয়াঙ্কা সেইদিকে মন না দিয়ে পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল। তথাপি টুকরো টুকরো কথা কানে এসেই গেল প্রিয়াঙ্কার! সে শুনল আসিফা মাধুরীকে বলছে “এখানে ভাল ফল কর আর খারাপ ফল কর, কি যায় আসে! এমনিতেও ক্যাম্পাসিং যার পাওয়ার সেই পাবে! আমি তো বলব অত পড়ে কাজ নেই! আমি তাই ঘুরে বেড়াচ্ছি!” প্রিয়াঙ্কা ভাবল মেয়েটা সত্যিই পাগল নয়তো…! বেশ কিছুক্ষন পর যখন আর কথার আওয়াজ পাচ্ছিল না তখন টেবিল থেকে মুখটা তুলে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখল প্রিয়াঙ্কা। দেখল রুমে কেউ নেই শুধু আসিফা বসে আছে ওর পাশের বেডে ওর দিকে তাকিয়ে! হটাত করেই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল প্রিয়াঙ্কা। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল “ বাকিরা কোথায়?” কোন জবাব পেলনা। সেই ঘোলা চাহনি! অন্য আসিফা! চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো প্রিয়াঙ্কা। তখনই আসিফা হটাত করেই বলে উঠলো “ আমি চলি! পড়া আছে! খাওয়ারও সময় হয়ে গেছে!” বলে হন্তদন্ত করে বেরিয়ে গেল প্রিয়াঙ্কার রুম থেকে। প্রিয়াঙ্কা স্থানুর মত আসিফার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“ আজকে রুম নাম্বার মনে করে এসেছি!” হাসতে হাসতে বলল প্রিয়াঙ্কা। “যাক! বেশি টেনশনেই হচ্ছে তোর এসব বুঝলি? চল ভাল করে পরীক্ষা দিস” বলে নিবেদিতা আর প্রিয়াঙ্কা দুজন দুজনকে বিদায় জানিয়ে যার যার পরীক্ষার হলের দিকে এগোতে লাগলো।
“ মধুমন্তিটা কোথায় গেল বলতো? এক জায়গায় পরীক্ষা পড়েছে বলে বলল একসাথে যাব! সকালে তো জানিনা কোথায় ছিল! এখনও কোথায় আছে কে জানে! পরীক্ষা দিতে এসেছিল তো?” মধুমন্তির নাম্বার ডায়াল করে ফোনটা কানে নিয়ে বলল নিবেদিতা। “ সত্যিই মেয়েটার কথার একদম দাম নেই! দেখ কল করে” বলে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। “তখন থেকে তো করেই যাচ্ছি! নট রিচেবেল বলছে! চল তো আমরা এগোই! বেশি দেরী হলে আর গিয়ে লাঞ্চটা পাব না!” বলে দুজনে হোস্টেলের পথ ধরল।
লাঞ্চ করে বেরিয়ে দেখল মধুমন্তি বাস্কেট বল কোর্টের একটা বসার জায়গায় চুপ করে বসে আছে! প্রিয়াঙ্কা আর নিবেদিতা ওর কাছে গেল। নিবেদিতা গিয়েই বলতে শুরু করল “ তোর ব্যাপার কি রে! কোথায় ছিলিসটা কোথায়?” মধুমন্তি কোন জবাব দিলনা। প্রিয়াঙ্কা মধুমন্তির মুখটা তুলল, দেখল চোখদুটো ছলছল করছে! “ কি হয়েছে মধু?” উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। মধুমন্তি ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। নিবেদিতাও বেশ ঘাবড়ে গেছে! প্রিয়াঙ্কা মধুমন্তিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল “কি হয়েছে বল আমাকে! পরীক্ষা ভাল হয়নি?” কান্নাটা একটু কন্ট্রোল করে মধুমন্তি ভাঙ্গা গলায় বলল “ পরীক্ষা ভাল মন্দ হওয়ার প্রশ্নই আসেনা! আমি আজ কিচ্ছু লিখে আসতে পারিনি! একটা ওয়ার্ডও না! সাদা খাতা জমা দিয়ে এসেছি!” প্রিয়াঙ্কা চমকে উঠে বলল “ কেন রে? পেপার তো বেশ সোজা ছিল! কিচ্ছু লিখতে পারিস নি?” মধুমন্তি কাঁদতে কাঁদতে বলল “ আমি কাল রাত থেকে এক লাইনও পড়তে পারিনি! ঘুমে চোখ খুলতে পারছিলাম না! আজ সকালে পরীক্ষার আধ ঘণ্টা আগে ঘুম ভেঙ্গেছে! আমার সিঙ্গেল রুম! তাই আরওই ঠাহর করতে পারছিলাম না যে কি করবো! জানিস, বাথরুমেও যাইনি! ওই অবস্থাতেই কোনরকমে রেডি হয়ে ছুটতে ছুটতে পরীক্ষার হলে গিয়ে পৌঁছেছি! কিন্তু……এক লাইনও লিখতে পারিনি!” “তাহলে তিন ঘণ্টা কি করলি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো নিবেদিতা। মধুমন্তি চোখের জল মুছতে মুছতে বলল “ ঘুমিয়েছি!” “ কি?” প্রায় চিৎকার করে উঠলো নিবেদিতা। মধুমন্তি নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তখনও। কিছুক্ষন পরে প্রিয়াঙ্কাকে বলল মধুমন্তি “ জানিস তো এক এক সময় মনে হয় ওই পাঁচ তলা থেকে ঝাঁপিয়ে যাই!” চমকে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। ওর ও তো এরকমই মনে হয়! কিছু না বলেই যেখান থেকে উঠে পড়ল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতা কিছু বলার আগেই সেখান থেকে চলে গেল। “ এ্রর আবার কি হল?” বলে উঠলো নিবেদিতা। মধুমন্তি তখনও কেঁদে চলেছে! প্রিয়াঙ্কা রুমে ঢোকার মুখে দেখল আসিফা করিডরে দাঁড়িয়ে আছে! ওকে দেখে হাসল! প্রিয়াঙ্কার কেন জানিনা মনে হল এটা তাকে দেখানোর জন্য ছিল, ডেমো! এবার তার পালা! চোখ ফিরিয়ে রুমে ঢুকে পড়ল প্রিয়াঙ্কা। 
“মধুমন্তি ঠিক আছে অনেকটাই এখন! আজকে পরীক্ষা সকাল ১১টা থেকে! আমি সকালে গেছিলাম ওর রুমে, দেখলাম পড়ছে! আমার আর তোর তো আজ আলাদা আলাদা বিল্ডিং! ঠিক মত রুম নাম্বার দেখে নিস, নইলে আজ আমি থাকবো না কিন্তু খুঁজে দেওয়ার জন্য!” হেসে হেসে বলল নিবেদিতা। এখন সকাল ৮ টা বাজে, দুজনে স্টাডি রুমে বসে শেষ মুহূর্তের রিভিশন করছিল। নিবেদিতা দেখল প্রিয়াঙ্কা অন্যমনস্কভাবে বসে আছে। উঠে গিয়ে প্রিয়াঙ্কাকে একটা টোকা মারল নিবেদিতা। চমক ভাঙ্গার মত চমকে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। “ কি যে হয় তোদের সত্যিই!” বলে উঠলো নিবেদিতা। “ নিবেদিতা, আমি আজকে পরীক্ষা দিতে যাবনা!” অসহায়ের মত বলল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতা অবাক হয়ে বলল “কি সব বলছিস? মাথা ঠিক আছে তো? নাকি মধুমন্তির ছোঁয়া লেগেছে তোর?” “ না রে! আমার মন বলছে কিছু একটা হবে আজকে! আমি ভাবছি কালই বাড়ি চলে যাবো” উত্তেজিত হয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা। নিবেদিতা নরম করে বলল “ বাড়ির জন্য মন খারাপ তো সবারই হয় রে! তুই তো তাও হোস্টেলে থেকেছিস আগে, আমার ভাব! এই প্রথম হোস্টেলে রয়েছি! পরীক্ষা শেষে এমনিতেও সবাই বাড়ি যাবে! এত ভাল প্রিপারেশন তোর! এসব কেন ভাবছিস?” প্রিয়াঙ্কা কিছু উত্তর না দিলেও মনে এক অজানা আশঙ্কা ওকে অস্থির করে তুলছিল। একেই বোধহয় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে!
“এটা কি তোমার?” ফ্লাইং গার্ডের কথায় চমকে ওঠে প্রিয়াঙ্কা! ওনার হাতে একটা ছোট মত কাগজ। প্রিয়াঙ্কা চুপ করে আছে দেখে এবার বেশ চিৎকার করে বললেন উনি “ স্ট্যান্ড আপ! উত্তর দিচ্ছনা কেন? চিটটা কি তোমার?” প্রিয়াঙ্কা আবারও চমকে উঠলো, তারপর বলল “ না স্যার! এটা আমার নয়!” “আচ্ছা? তাহলে তোমার বেঞ্চে এল কিভাবে? উড়ে?” কেটে কেটে বললেন ফ্লাইং গার্ড। প্রিয়াঙ্কা অবাক হয়ে গেল যে এই কাগজটা এল কোথা থেকে তার বেঞ্চে! সে কিছু বুঝে ওঠার আগে উনি বলে উঠলেন “ চল, খাতা ওঠাও আর আমার সাথে চল! ভেরিফিকেশন হবে!” প্রিয়াঙ্কা প্রচণ্ড ভয়ে প্রায় কেঁদে ফেলল। তারপর কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল “ স্যার, আমি কিছু করিনি! বিশ্বাস করুন, আমি জানিনা কাগজটা কিভাবে এল আমার বেঞ্চে! আমি…আমি ভাল স্টুডেন্ট স্যার! আপনি খোঁজ নিতে পারেন! আমি এসব করার কথা স্বপ্নেও…” ফ্লাইং গার্ডটি ঠাণ্ডাভাবে তাকাল প্রিয়াঙ্কার দিকে তারপর কঠিন গলায় বলল “ কাম উইথ মি!”
“  প্রিয়াঙ্কা রুমে এসেছিল?” স্মৃতিকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞেস করল নিবেদিতা। “ কই না তো! আমি ভাবলাম তোমার সাথে আছে!” স্মৃতি অবাক হয়ে বলল। নিবেদিতা কিছু না বলেই বেরিয়ে এল প্রিয়াঙ্কার রুম থেকে। আজকে দুজনের আলাদা আলাদা বিল্ডিংএ পরীক্ষা থাকায় পরীক্ষা শেষেও দেখা হয়নি আর! নিবেদিতা ভেবেছিল প্রিয়াঙ্কা রুমে চলে গেছে হয়তো! কিন্তু প্রায় বিকেল ৬ টা বাজে!  কোথাও নেই প্রিয়াঙ্কা! বিকেলের টিফিনে ডাকতে এসেছিল মধুমন্তি আর নিবেদিতা মিলে, কিন্তু তখনও ছিল না রুমে প্রিয়াঙ্কা! ফোনও বন্ধ! একে ওকে জিজ্ঞেস করছে নিবেদিতা। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না! দেখতে দেখতে সন্ধ্যে হয়ে গেল, কিন্তু প্রিয়াঙ্কাকে কোথাও খুঁজে পেলনা নিবেদিতা। এবার একটু ভয় হচ্ছে নিবেদিতার! কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছেনা যে প্রিয়াঙ্কা গেল তো গেল কোথায়? এরকম তো আগে কখনো করেনি!
“ পেপারটা ক্যান্সেল হয়ে গেলো তাই না? তার উপর আবার ম্যাল্প্র্যাক্টিসের বদনাম! এখানে এসব ব্যাপারে খুব স্ট্রিক্ট! আবার রি-রেজিস্ট্রেশন করতে হবে, আর ফেল করা স্টুডেন্টদের সাথে ক্লাসও করতে হবে!” ছাদে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল প্রিয়াঙ্কা, নিচের দিকে তাকিয়ে! হটাত কারুর গলার আওয়াজ পেয়ে ফিরে দেখে আসিফা! হাসিটা মুখে লেগে আছে, যেন প্রিয়াঙ্কাকে ব্যাঙ্গ করছে! “ তোমাকে এসব কে বলেছে? আর আমি এখানে সেটা তুমি কিভাবে জানলে?” প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বলল প্রিয়াঙ্কা। আসিফা মাথার হিজাবটা ঠিক করতে করতে এগিয়ে এল প্রিয়াঙ্কার কাছে, সেই ঘোলা চোখ! তারপর একটু হেসে বলল “  আজ আমি জেনেছি, কাল গোটা কলেজ জেনে যাবে যে তুমি টুকলি করতে গিয়ে ধরা পরেছ…” “আমি কিছু করিনি বুঝেছ? আমার সাথে কি হচ্ছে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা…” আসিফার কথার মাঝেই চিৎকার করে বলে উঠলো প্রিয়াঙ্কা। “চিৎকার করলেই তোমার নামের সাথে জুড়ে যাওয়া টুকলি বদনামটা তো আর যাবেনা! ভেবে দেখ তোমার আগের কলেজের বন্ধুরা যখন জানবে যে তোমার পেপার ক্যান্সেল হয়ে গেছে টুকলি করতে গিয়ে তখন ওরা কি ভাববে তোমাকে নিয়ে? ভাববে যে কলেজেও এইভাবেই টপ করতো প্রিয়াঙ্কা! হাসির পাত্রী হয়ে যাবে তুমি! আর নিজের রুম মেটদের কি বলবে? ফাইনাল রেসাল্ট তো নোটিশ বোর্ডে টাঙ্গানো হবে! না চাইতেও সবাই জেনেই যাবে!” আস্তে আস্তে বলল আসিফা। প্রিয়াঙ্কা হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ছাদের মেঝেতে বসে পড়ল। তারপর মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলল “ না! আমার ভেরিফিকেশন হলেই জানা যাবে যে আমি দোষী নই! আমাকে আবার চান্স নিশ্চয়ই দেওয়া হবে পেপারটা দেওয়ার!” “সেটাই যদি হত তাহলে আজকেই দিত! ভেরিফিকেশন কমিটি যাকে দোষী মনে করে তার পেপারটা সেইদিনই আটকে দেয়! এবার তোমাকে ফেল স্টুডেন্টদের সাথে ক্লাস করেই পেপারটা আবার দিতে হবে! সবাই জেনে যাবে! নিজের বাবা-মাকে কি বলবে ভেবেছ?” হিস হিসিয়ে বলে আসিফা। প্রিয়াঙ্কার কান্নাটা দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আস্তে চাইছে! আসিফা বলে চলে “একবার ম্যালপ্র্যাকটিশের লিস্টে নাম এসে যাওয়া মানে ব্যাস! সব শেষ প্রিয়াঙ্কা! কিভাবে তুমি প্রমাণ করবে যে তুমি কিছু করনি? সবাই তোমাকে সেই নজরেই দেখবে!” প্রিয়াঙ্কার বুকের ভিতরটাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। উঠে দাঁড়ালো সে! ঝুঁকে পড়ে নিচের দিকে তাকাল। আসিফা এসে প্রিয়াঙ্কার পাশে দাঁড়ালো। তারপর আরও একবার হিস হিসিয়ে বলল “কি করবে প্রিয়াঙ্কা? ভাবলে কিছু? একটা সত্যি কথা বলব? তুমি কিন্তু অনেক আভাস পেয়েছিলে, তাও সেই এক জিদ! আর আমিও অপারক ছিলাম! কিছুই করার ছিল না বিশ্বাস কর! একদিন আমিও এইভাবেই দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমার জায়গায়, ঠিক তাই ভাবছিলাম যেটা এখন তুমি ভাবছ!” প্রিয়াঙ্কা কিছু শুনতে পাচ্ছিল না। বার বার বাবা-মায়ের মুখটা মনে পড়ছিল আর কি জবাব দেবে সেটা ভেবেই বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছিল। টুকলি! এই জিনিসটাকেই প্রচণ্ড ঘেন্না করে এসেছে প্রিয়াঙ্কা! নিজের যোগ্যতায় সব কিছু অর্জনে বিশ্বাসী সে! আর তার কপালেই কিনা এই দোষটা লাগলো! অনেক কাকুতি মিনতি করেছে আজকে সে কমিটির কাছে, কিন্তু ওনারা সেরকমভাবে কিছুই শুনছিলেন না! আসিফা ঠিকই বলছে, ওদের মুখগুলো দেখে মনেই হচ্ছিল যে ওরা একটুও বিশ্বাস করেনি প্রিয়াঙ্কার কথা! এখন তবে কি করনীয় তার? ফিরে যাওয়া সম্ভব কি? 
ধপ করে একটা বীভৎস আওয়াজে সব রুমের মেয়েরা চকিতে রুমের বাইরে বেরিয়ে এল। বাস্কেট বল কোর্টের সামনে বিশাল জটলা! ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকল নিবেদিতা। সামনে যা দেখল তাতে ওর মাথা ঘুরে গেল, জ্ঞান হারানোর আগে দেখল প্রিয়াঙ্কার রক্ত মাখা শরীরটা পড়ে রয়েছে আর রক্তে চারদিক ভেসে যাচ্ছে! 
“ ৭২ ঘণ্টার আগে কিছু বলা যাবেনা! পেসেন্টের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক” ডাক্তারের কথা শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন নন্দিনী দেবী। কলেজ থেকে ফোনটা এসেছিল রাত ১০ টায়! প্রিয়াঙ্কা নাকি ছাদ থেকে পরে গেছে! পাগলের মত ফ্লাইট টিকিট কেটে দুজনে ভোরে এসে পৌঁছেছেন হসপিটালে। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করাতে উনি এটা বললেন।
 প্রিয়াঙ্কা এখন সম্পূর্ণ বেহুঁশ! হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে সে! একটা ক্ষীণ আওয়াজ অবচেতনে যেন শুনতে পেল প্রিয়াঙ্কা। আস্তে আস্তে সেটা স্পষ্ট হতে শুরু করল। “ তোমার দোষ নেই প্রিয়াঙ্কা! দোষ তোমার ভাগ্যের! আজ তুমি আসিফার জায়গায় থাকতে পারতে ! অনেক আভাস পেয়েছিলে! কেন? কেন এত প্রথম হওয়ার ইচ্ছা হ্যাঁ? এখানে শুধু একটাই রোল নাম্বার টপ লিস্টে  থাকতে পারে, আর সেটা হল আমার রোল নাম্বারটা! আমি টপ করতে পারিনি সেবার! তাই নিজেকে………কিন্তু সেই থেকে আমার অশরীরী আমার রোল নাম্বারের মেয়েকে এগিয়ে নিয়ে যায়, আর যদি কখনও তোমার মত প্রতিদ্বন্দ্বী আসে তখন তাকে ধরে নামাতেও দেরী করিনা…… “ আস্তে আস্তে কথাগুলো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসছিল। হটাত প্রিয়াঙ্কার মনে হল সব কিছু তোলপাড় হতে শুরু করেছে! চিরকালের মত সব থেমে যাওয়ার আগে ডাক্তারদের হুড়োহুড়ি আর তার মাঝে এক অদ্ভুত কণ্ঠের অট্টহাসি প্রিয়াঙ্কার কানে এল। তারপরেই সব শেষ!
একমাস পরঃ
প্রিয়াঙ্কার মৃত্যুটাকে সুইসাইডের কেস হিসেবে দেখিয়েছে পুলিশ। সব কিছু তদন্ত করে জানা গেছে যে টুকলির দোষে দোষী হওয়ার জন্য মানসিক অবসাদে প্রিয়াঙ্কা নিজেকে শেষ করে দিয়েছে। প্রিয়াঙ্কার মা পাগলের মত হয়ে গেছেন! আর বাবা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি! সন্দীপ বাক্যহারা হয়ে গেছে, প্রিয়াঙ্কার আগের কলেজের বন্ধুরা বিশ্বাস করতেই পারছেনা যে প্রিয়াঙ্কা আর ওদের মাঝে নেই! নিবেদিতাও খুব ধাক্কা পেয়েছে প্রিয়াঙ্কার আকস্মিক মৃত্যুতে! তার মন মেনে নিতেই পারছে না যে প্রিয়াঙ্কা সুইসাইড করতে পারে! মধুমন্তিও একেবারে চুপ করে গেছে! আর আসিফা হটাত করেই যেন খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে! নিবেদিতা লক্ষ্যও করেছে যে প্রিয়াঙ্কার কন্ডলেন্সেও বেশ দুঃখী মনে হচ্ছিল আসিফাকে! এতটা চেঞ্জ! আর বেশি কিছু ভাবেনি নিবেদিতা। আজ ওদের ফাইনাল সেমিস্টারের ফল প্রকাশিত হবে! কলেজের নোটিশ বোর্ডে আগে দেওয়া হবে রেসাল্ট! সেইমত কলেজে গেল সবাই। নিবেদিতা নিজের রেসাল্টটা চেক করে টপারের নামটা চেক করতে লিস্টের উপর দিকে তাকাতেই দেখল “প্রথম- রোল নাম্বার-৫৪—–আসিফা রহেমানি” কি মনে হতে প্রিয়াঙ্কার নামটা খুঁজতে গিয়ে দেখল সবার শেষে “ইনকমপ্লিট- রোল নাম্বার- ৫৫—–প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জী”। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এল নিবেদিতা।
উচ্চাকাঙ্খার এই দৌড়ে এক মানবী এক অপমানবীর কাছে হেরে গেল! কেউ কিছু জানতেও পারলনা! এমনটা হয়তো আগেও হয়েছে, আর সেই  মৃত্যুগুলোও হয়তো আত্মহত্যার কেসের মোড়কে ঢাকা পরেই রয়ে গেছে! শুধু একটা জিনিসই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে এসেছে আর হয়তো প্রকাশিত হতেও থাকবে, আর সেটা হল এম বি এর প্রথম বর্ষের ফাইনাল রেসাল্টএর লিস্টের টপে থাকা রোল নাম্বারটা, রোল নং-৫৪——-নাম?, নামে কি আসে যায়!
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *