বন্ধন – Heart Touching Bangla Uponnash – Bengali Novels

বন্ধন - Heart Touching Bangla Uponnash - Bengali Novels

         

[•• পরিস্থিতির সাথে লড়াই করা একটি মেয়ের জীবনের কাহিনী••]

__মা আমি তো তোমাকে কতবার বলেছি যে, আমি বিয়ে করতে চাই না। প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে এসব আমার জন্য না।

__একটু বোঝার চেষ্টা কর, বাবার তো বয়স হয়েছে চন্দ্রা !! আর তাছাড়া এবারের পাত্র কে তোর ভালোই লাগবে।

__কে শুনি মহাপুরুষ টি?? যেই হোক না কেন আমি বিয়ে করবো না ব্যাস।

__অরিন্দম, আমি জানি তোদের মধ্যে ভালোই ফোনে কথা হয়। আর তাছাড়া তোরা দুজন তো সেই ছোটবেলার বন্ধু।তোর বাবার সেই বন্ধুর ছেলে।জানিস ও এবার কলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে কাজের জন্য। তাই যাওয়ার আগে বিয়েটা সেরে নিয়ে যেতে চায়।

__কি! কি ! কে? অরিন্দম? ও আমার বন্ধু ছোটবেলার। ওর সাথে বিয়ে কি করে হতে পারে?

__চেনাশোনা মানুষের সাথে সম্পর্ক করাটাই তো ভালো চন্দ্রা। তাছাড়া আজকাল যা হচ্ছে!! নিরঞ্জন বাবু তোর বাবার তো খুব ভালো বন্ধু তুই তো জানিসই। তোমার বাবা বিয়ের কথা তুলতেই এক কথায় রাজি হয়ে গেলে।

__মা অরিন্দম আমার শুধু বন্ধু। আমি ওকে থেকে বেশি কিছু ভাবতে পারবো না।

__দেখ মা এরকম করিস না, কালকে ওরা আসবে, তুই একটু তাড়াতাড়ি চলে আসিস। তোর বাবার মুখের দিকে চেয়ে অন্তত এরকম করিস না।

চন্দ্রা অর্থাৎ চন্দ্রিমা, বয়স ২৭। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। সবে মাত্র দুবছর হলো কাছেই সরকারি একটা হাইস্কুলে বাংলার শিক্ষিকা হিসেবে জয়েন করেছে। চন্দ্রিমার বাবাও আগে ওই স্কুলেরই অংকের শিক্ষক ছিলেন। ১৫ বছর হল উনি রিটার করেছেন। আসলে ছোটবেলা থেকেই চন্দ্রিমা ওরকমই, প্রেম ভালোবাসার দিকে ওর কোনদিনই সেরকম নজর নেই। চন্দ্রিমা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়, কোন পরাধীনতার বন্ধনে নিজেকে জড়াতে চায় না। তাই বিয়েটাও কোনদিন করতে চায়নি। কিন্তু যতোই হোক বাঙালি বাড়ির মেয়ে বলে কথা,বাবা মা কি করে এটা মেনে নেবেন? তার সন্তানকে কিভাবে কেন একা ফেলে চলে যাবেন? বিমল বাবুর চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে গেছে, এর মধ্যেই ৫/৬  সম্বন্ধ চন্দ্রিমা নিজেই ভেস্তে দিয়েছে। তাই কোন রাস্তা খুঁজে না পেয়ে, বিমল বাবু তার পরিচিত বন্ধু নিরঞ্জন কে নিজের মেয়ের সম্বন্ধের কথাটা বলেন। নিরঞ্জনের তো চন্দ্রিমা কে ছোটো থেকেই পছন্দ ছিল, তাই সেও আর আপত্তি করে না।

                দ্বিতীয় পর্ব

চন্দ্রিমা ভাবছে এ আবার কোন ঝামেলা!! অদ্ভুত ব্যাপার অরিন্দম কি করে রাজি হল এই বিয়েতে?? আর কিছু ভাবতে না পেরে তাড়াতাড়ি অরিন্দম কে ফোন করল।

__হ্যালো অরিন্দম ,তোর সাথে আমার কথা আছে?

__চন্দ্রা আমি একটু ব্যস্ত আছি, তোকে আমি রাত্রেবেলা ফোন করবো।

__ঠিক আছে, মনে করে করবি কিন্তু। রাখছি তাহলে।

__হ্যাঁ ,রাখলাম।

তারপর তাড়াতাড়ি করে ব্যাগটা নিয়ে স্কুলের জন্য বেরিয়ে পড়ল। রাত্রিবেলা অরিন্দম ফোন করবে বলেছিল,কিন্তু প্রায় ন’টা বেজে গেল  অরিন্দম ফোন করল না। চন্দ্রিমা ভাবছে: তাহলে কি ভুলে গেলো ফোন করতে?? নাকি ইচ্ছে করেই করল না, নিজেকে লুকোতে চাইছে!!

এইসব ভাবতে ভাবতে চন্দ্রিমা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে ওর নিজেরই খেয়াল নেই। সকালে ঘুম ভাঙে মায়ের ডাকে।

__কিরে চন্দ্রা উঠে পড়!! অনেক বেলা হয়ে গেছে , আজকে আর তোর স্কুলে যেতে হবে না।

__কেন মা স্কুলে যাব না কেন? আর কোন মহামূল্যবান কাজ আছে যে স্কুলে যাব না?

__অমন করেনা সোনা, তাড়াতাড়ি উঠে
স্নান করে ঘরটা একটু বুঝিয়ে রাখ। অরিন্দমের মা ফোন করে বলল ওরা সাড়ে চারটের মধ্যে চলে আসবে।

আর কোন কথা বলে না চন্দ্রা। শুধু একটাই কথা ভাবছে, অরিন্দম একবার ফোন করল না!! কেন?

তারপর স্নান করে নিজের ঘরটা একটু গুছিয়ে রাখে। যদিও এসব কাজ একটুও ভালো লাগছিল না। দেখতে দেখতে প্রায় তিনটা বেজে যায়।দুপুরের খাবার খেয়ে চন্দ্রা একটু ঘরে এসে বসে আছে। ভাবছে অরিন্দম কি ইচ্ছা করে ফোনটা করলোনা!! নাকি আমাকে কিছু জানাতে চায় না !! এমন সময় চন্দ্রার মা উপরে এসে চিৎকার করতে লাগলো।

__কিরে তাড়াতাড়ি শাড়ীটা পরে রেডি হয়ে নে। ওরা এখুনি চলে আসবে তো।

চন্দ্রা দেখল টেবিলের ওপর মা একটা হলুদ রঙের শাড়ি রেখেছে ওর জন্য। কিন্তু ওর একদম পছন্দ না শাড়ি পরা।তাও আজকে বাধ্য হয়েই শাড়িটা পড়ে একটু সাজলো।বলতে গেলে চন্দ্রা কে আজকে খুব মিষ্টি লাগছে। তারপরই হঠাৎ করে গাড়ির একটা হর্নের আওয়াজ শুনতে পেল। মনে মনে ভাবতে লাগল তাহলে ওরা এসে গেল। আজকের দিনের মতো অস্বস্তি মনে হয় আর কোনদিন জীবনে লাগেনি। তাও বাধ্য হয়ে মা বাবার মুখের দিকে চেয়ে শুধুমাত্র নিজেকে সংযত করে আছে।

__কি চন্দ্রা ও চন্দ্রা তাড়াতাড়ি আয় মা ওরা এসে গেছে।

চন্দ্রা উপরের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। নামার সময় অবশ্য দেখলো, অরিন্দম একটা সুন্দর লাল রংয়ের কুর্তি আর পায়জামা পড়ে এসেছে। দেখে এমন মনে হচ্ছে যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। চন্দ্রার খুব রাগ হচ্ছে অরিন্দমের ওপর। এমন তো নয় যে অরিন্দম কিছুই জানেনা, সবই তো জানে। যেমন সেজেগুজে বাবুটি সেজে এসেছে, তাতে স্পষ্ট‌ই বোঝা যাচ্ছে সবকিছুই আগে থেকেই জানতো তাহলে কেন আড়াল করলো??

__আয় চন্দ্রা আয়, আমার পাশে বস মা। অরিন্দমের মা বলল।

চন্দ্রা গিয়ে অরিন্দমের মায়ের পাশে বসলো।

__আমাদের আর পাত্রী দেখার কি আছে!! ও তো আমাদের ঘরের মেয়ে। অরিন্দমের বাবা পাশ থেকে বললেন।

__হ্যাঁ তার থেকে বরং অরিন্দম আর চন্দ্রা নিজেদের মধ্যে নিজেরা কথা বলুক। অরিন্দমের মা বললেন।

__হ্যাঁ দিদি ঠিক বলেছেন, সেটাই ভালো।

তারপর চন্দ্রা অরিন্দমকে নিয়ে নিজের ঘরে গেল।কিন্তু চন্দ্রার মুখটা দেখে অরিন্দম বুঝতে পেরেছিল, ওর মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই নিজে থেকেই প্রশ্ন করল অরিন্দম।

__কিরে এতো গম্ভীর কেন ? দেখে মনে হচ্ছে মেঘ করেছে তবু বৃষ্টি হয়নি।

__কই কিছু নাতো।আচ্ছা তোকে আমি রাত্রেবেলা ফোন করতে বললাম তুই তো আমাকে একবারও ফোন করলি না!!

__আসলে কালকে খুব চাপ ছিল। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে ছিলাম। তাই ভাবলাম আজকে তো দেখাই হবে, আর ফোন করে কি হবে। তুইতো জানিসই আর দু-তিন মাসের মধ্যেই ব্যাঙ্গালোর যাবো আমি। তাই বাবার ব্যবসা সব ঠিকঠাক করে বাবাকে বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে।

__তুই সবকিছু জানতিস তাইনা অরিন্দম?? আমাকে বলার একবারও প্রয়োজন মনে করলি না!!

__আরে আমি তো এই পরশু জানলাম। মা এমন ভাবে আমাকে জোর করলো, যে আমি হ্যাঁ বলতে বাধ্য হলাম।

__কিন্তু কেন? সবকিছুই জানিস তো তুই।আমার জীবনের কিছুই তো তোর কাছে লুকোনো নয় বল। ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা একসাথে পড়ি, তারপরেও কেন এরকম করছিস!! আমার এসব বিয়ে – ভালোবাসার- প্রেম কিছুই পছন্দ না। আমি বিয়ে করতেই চাই না।

__আসলে মা বাবার মুখ চেয়ে আমি বিয়েতে রাজী হয়েছি রে। আমার কিছু করার ছিল না। তবে তোকে আমি জোর করব না। কিন্তু একটা বিষয়—-

__কি বিষয়? থেমে গেলি কেন বল?

__আমার তোকে অপছন্দ কিন্তু নয়। হয়তো কোনদিন বলতে পারিনি এই ভেবে যে , তোর হয়তো খারাপ লাগবে। কিন্তু এটা একদম সত্যি আমি তোকে সেই ছোটো থেকেই মনে মনে ভালোবাসি। আর তাই যখন মা বিয়ের কথাটা বলল আমি আর না বলতে পারলাম না।

__বাহ্ খুব সুন্দর। সবাই কেবল নিজের কথাটাই ভাবছে। আমিও তো একটা মানুষ, আমারও তো একটা পছন্দ-অপছন্দ আছে। সত্যি কথা বলতে, আমি তোকে বন্ধু ছাড়া আর কিছু ভাবি নি কোনদিন। কি করে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে বিয়ে করবো বল?? বিয়েটা হলে তুই কি খুশি হতে পারবি, যে মেয়ে তোকে বন্ধু ছাড়া কিছু ভাবে না তার সাথে খুশি হওয়া সম্ভব?

__দেখ আমি একটাই কথা বলব, তোর যদি আমাকে বিয়ে করতে আপত্তি থাকে, তাহলে তুই এক্ষুনি নিচে গিয়ে আমার সঙ্গে না বলে দিতে পারিস। আমি তোকে বাধা দেবো না , সবথেকে আগে আমি তোর বন্ধু।

এরপর অরিন্দম চন্দ্রার হাত ধরে ওকে নিচে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু চন্দ্রা বাধা দেয়,আর বলে

__আমার একটু সময় লাগবে অরিন্দম, আমি হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইনা। কারণ বাবার শরীরটা সত্যিই ভালো নেই। তুই আমাকে একটু বোঝার চেষ্টা কর।

__আমি জানি, তুই হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবি না। তবে যা করার তাড়াতাড়ি করিস, মা খুব তাড়াহুড়ো করছে তোকে আমাদের বাড়ির বউ করবে বলে। এটা বলার পর অরিন্দম নিচে চলে যায়, চন্দ্রা আর কিছু বলে না চুপ করে বসে থাকে।

এর কিছুক্ষণ এরপরে অরিন্দমরা চলে যায়। চন্দ্রার এখন অদ্ভুত লাগছে। কোনটা ঠিক কোনটা ভুল সেটা ও নিজেই বুঝতে পারছেনা।

__এই চন্দ্রা একটা খুশির খবর আছে। বলতো কি? আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে না!!

__আমি কি করে জানব মা কি খবর!! কি হয়েছে বল?

__অরিন্দমের মা-বাবা সবাই বিয়েতে রাজি। পরশু ওনারা এনগেজমেন্ট করতে চান।

__ হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি?? এত তাড়াহুড়োর কি আছে? আমি তো আর কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না, আমার একটা সময় লাগবে।

__আমি ওসব জানি না বাবা, ভালোই ভালোই সব হয়ে গেলে বাঁচি। আর তাছাড়া ওরা বিয়েটাও পরের মাসে করে ফেলতে চায়। কি বলতো অরিন্দম ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে বউকে নিয়েই তো যাবে ।

চন্দ্রা আর কোন কথা বাড়ায় না, অবশ্য কথা বাড়িয়ে লাভ নেই সেটা ও ভালো করেই বুঝে গেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে বুঝতে পারছেনা একদিকে বন্ধুকে স্বামীর জায়গায় কি করে বসাবে, অন্যদিকে ও চাকরি ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর যাবে কেন?পরের দিন সকালবেলা, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে স্কুলে চলে যায়। স্কুলে যেতেই অদিতি, অদিতি হল চন্দ্রার খুব ভালো বন্ধু। দু’বছর ধরে চন্দ্রা আর অদিতির বন্ধুত্ব গভীর হয়ে গেছে।

__এই চন্দ্রা তোর জন্য একটা খুশির খবর আছে!!

__কি খবর বল, আমার আবার কি খুশির খবর হতে পারে?

__আমরা সব টিচাররা মিলে একটা বেড়ানোর প্ল্যান করেছি। সম্ভবত দশদিনের ট্যুর হবে।

__এতে খুব ভালো কথা ঘুরে আয় তোরা।

__শুধু আমরা না, আপনাকেও যেতে হবে ম্যাডাম। আমি কিন্তু কোনো রকম না শুনবো না।

__আমার আর যাওয়া হবে না রে। পরশু আমার এনগেজমেন্ট। সম্ভবত সামনের মাসেই বিয়ে।

__কি বলছিস? হঠাৎ করে বিয়ে? একবার জানালি না আমাকে?

__আমি নিজেই তো জানলাম পরশুদিন।

__কার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনি?

__অরিন্দমের সাথে। তুই তো চিনিস অরিন্দম কে মনে আছে?

__থাকবেনা কেন ? মনে আছে। কিন্তু তুই তো শুধু বন্ধুই বলেছিলি। ভেতরে ভেতরে যে এত কিছু চলছে আমি তো বুঝতেই পারিনি।

__সেসব কিছুই না রে, আমি এখনও ওকে শুধুই বন্ধুই ভাবি। কিন্তু মা আর বাবা কথা দিয়ে দিয়েছে আমাকে ওদের বাড়ির বউ করবে।

__ কোথায় থাকে যেন ওরা? না মানে কলকাতার বেশি দূরে হলে তোর তো আবার স্কুলে আসতে প্রবলেম হবে।

চন্দ্রা খানিকটা হেসে নেয়। তারপর বলে
__বিয়ের পর অরিন্দম আমাকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাবে। চাকরিটা হয়তো আমায় ছেড়ে দিতে হবে।

__কি বলছিস তুই এসব? পাগল নাকি। একজন শিক্ষিকা হয়ে এরকম কথা কি করে বলতে পারিস তুই?

__আমি জানি রে। আমি অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু কেউ কোনো কথাই শুনছে না আমার।

__আমি তোর জায়গায় থাকলে বিয়েটা করতাম না। সুব্রতর সাথে আমার তো প্রেম করেই বিয়ে,আমি ওকে পরিষ্কার বিয়ের আগে বলে দিয়েছিলাম ,চাকরি যদি আমাকে ছাড়তে হয় তাহলে আমি তোমাকেই ডিভোর্স দিয়ে দেবো। আর তোর তো এখানে আরো সহজ ব্যাপার, তুইতো অরিন্দমের সাথে প্রেম করে বিয়ে করছিস না। শুধু সবকিছু পরিষ্কার করে খোলসা করে বিয়েটা করাই ঠিক। মেয়ে বলে কি সব সময় আমাদেরই স্যাক্রিফাইস করতে হবে। আমি তো শুনেছি অরিন্দমের বাবার ভালো ব্যবসা। তাহলে ব্যাঙ্গালোরে যাওয়ার কি দরকার? আমার মনে হয় তুই ব্যাপারটা নিয়ে অরিন্দমের সঙ্গে ভালো করে কথা বল।আচ্ছা অনেক কথা কথা বলে ফেললাম, এখন যাই পরে কথা হবে।

চন্দ্রা মুখে কিছু না বললেও, অদিতির কথাগুলো ওর মনের মধ্যে বাঁধলো। সত্যি তো কেন নিজের চাকরি ছেড়ে দূর বিদেশে যাবে!! আর তাছাড়া বিয়ে করতে গেলে চাকরিই বা ছাড়তে হবে কেন? না এটা ও কিছুতেই করবে না।

__ও মা চন্দ্রা এসে গেছিস স্কুল থেকে!! যা তাড়াতাড়ি খাবার খেয়ে রেডি হয়ে নে অরিন্দম একটু পরে আসবে।

__কেন হঠাৎ অরিন্দম কেন আসবে?? কই আমাকে তো কিছু ফোন করে বলল না, এখন তো সবকিছু বাড়িতেই জানায়, আমাকে তো আগের মত কিছু বলেনা। আমি এই জন্যই বলছিলাম স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হয়ে গেলে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায়।

__আরে এনগেজমেন্টের জন্য তোর আঙ্গুলের মাপ নেবে, তারপর কিছু শপিং টপিং করবে বলছিল। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হলে তো ভালোই হবে রে, অরিন্দম ছেলেটা খুব ভাল আমার খুব পছন্দ । তুই আর না করিস না কিন্তু।

__মা আমার তোমার সাথে কিছু দরকারী কথা আছে। এক্ষুনি বলতে হবে সেটা।

__সেসব পরে হবে, এখন তুই যা তাড়াতাড়ি এক্ষুনি চলে আসবে।

এই সবের মাঝে হঠাৎ করে অরিন্দম চলে আসে। আসলে অরিন্দম ছেলেটি যে খারাপ সেরকম নয়, ছোটো থেকেই চন্দ্রা কে চেনে,জানে। চন্দ্রার প্রতি একটু বেশি দুর্বল বলতে গেলে। চন্দ্রার মুখ দেখে ও বুঝে গেল কিছু হয়েছে ওর মনের মধ্যে।

__কি হয়েছে রে চন্দ্রা মুখটা ওরকম শুকনো করে আছিস?

__ভালো করেছিস তুই এসে গেছিস অরিন্দম। আমার তোর সাথে খুব ইম্পর্টেন্ট কিছু কথা আছে। যেগুলো আমার মনে হয় বলে নেওয়া দরকার।

__আহা চন্দ্রা এসব থাক না এখন, ঘরে নিয়ে যা অরিন্দম কে।

__কেন থাকবে মা?? আমার যদি কিছু কথা বলার থাকে আমি কি সেটাও বলতে পারবো না!!

__আহা কাকিমা, ওকে বলতে দিন। বল চন্দ্রা তোর কি বলার আছে, তুই বলতে পারিস।

__আমি কিন্তু বিয়ের পর তোর সাথে ব্যাঙ্গালোর যেতে পারব না। কারন আমি আমার চাকরিটা তো ছাড়তে পারি না বল। বিয়ে করতে হলে চাকরি ছাড়তে হবে এমন তো কোথাও লেখা নেই!!

__এসব কি বলছিস তুই চন্দ্রা? তোর চাকরি করার শখ ছিল, করলি তো দুই বছর চাকরি। আবার কি? বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে, ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে কোন একটা কাজ করিস।

__প্লিজ মা, আমি অরিন্দমের সাথে কথা বলে নিতে চাই। আমি একজন শিক্ষিকা, আমার নিজস্ব মতামত থাকতেই পারে। তোমাকে কে বলল চাকরি করা আমার শখ!! ওটা আমার স্বপ্ন মা।

__এই নিয়ে তুই এত চিন্তা ভাবনা করছিস কেন চন্দ্রা ? সে রকম অসুবিধা হলে যাব না।তোর থেকে আমার কাছে বাঙ্গালোর যাওয়া তো বড় হতে পারে না বল।

চন্দ্রা এই উওর টা আশা করেনি অরিন্দমের কাছ থেকে।চন্দ্রা মেলাতে পারছে না,ও ভাবতেই পারিনি অরিন্দম যে ওকে এতটা বুঝবে। এক দৃষ্টিতে অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে আছে।যেন কোথাও চন্দ্রার মনের মধ্যে বিভিন্ন কৌতূহলী প্রশ্ন উঁকি মারছে। ছোটো থেকেই অরিন্দম সবসময় চন্দ্রার একটু বেশি খেয়াল রাখতো, কিন্তু সেই খেয়াল রাখার মধ্যে যে অফুরন্ত ভালোবাসা আছে ,সেটা চন্দ্রা কখনো বুঝতে পারেনি।

__তুই একটু বস, আমি রেডি হয়ে আসছি। মা ওকে কিছু খেতে দাও, ও মনে হয় সোজা অফিস থেকে এখানে চলে এসেছে।

__বাববা তোদের দুটির মধ্যে যে এত মিল, তারপরে বলিস নাকি ভালোবাসিস না তোরা দুজন দুজনকে।

এরপর চন্দ্রা রেডি হয়ে আসলে, চন্দ্রা আর অরিন্দম দুজন মিলে একটু বেরোই। চন্দ্রা কে ওর মা বলেছিল অরিন্দম নাকি ওকে শপিং করাতে নিয়ে যাবে। কিন্তু না অরিন্দম বাইকে করে চন্দ্রা কে একটা গঙ্গার ধারে নিয়ে এলো। চন্দ্রা তো অবাক, গঙ্গার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে নিয়ে বলল

__মনে আছে অরিন্দম, কলেজ থেকে আমরা এখানে এসে কত আড্ডা মেরেছি!! আমি, তুই দীপ্ত, ঐন্দ্রিলা ,শিখা। দারুন ছিল দিনগুলো তাইনা??

__মনে আছে, আর এটাও মনে আছে তুই এই জায়গাটায় আসতে কতটা ভালোবাসতিস। তাই জন্যেই এখানে আসলাম।

__তখনকার দিনগুলো খুব ভালো ছিল রে,যত দিন যাচ্ছে সম্পর্ক গুলো কেমন জটিল হয়ে যাচ্ছে। তুই তখন কেমন ক্যাবলার মত আমার পিছন পিছন ঘুরে বেড়াতিস। আমি কখনো বুঝতেই পারিনি যে তুই আমাকে———–

__আমি জানি তোর আমাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে অনেক প্রবলেম হচ্ছে, অবশ্য সত্যিই তো কখনো আমাকে ওরকম চোখে দেখিস নি। সব সময় আমাকে তোর ভালো বন্ধু, বেস্ট ফ্রেন্ড ভেবেছিস। লাইফে যত রকমের সমস্যা হয়েছে, সবকিছু তুই আমার কাছে শেয়ার করতিস। দীপ্ত তোকে পছন্দ করত, তুইও দীপ্ত কে একটু একটু পছন্দ করতিস। কিন্তু সেরকম ভাবে কিছু ভাবছিস না।

__দীপ্ত কে আমি পছন্দ করতাম এটা ঠিক। কিন্তু আমি কখনো কোনো সম্পর্কে জড়াতে চাইনি অরিন্দম। তোর আর আমার সম্পর্কটা পুরোটাই আলাদা ছিল, আমারতো এখনো মনে পড়লে হাসি লাগে সুচরিতা নামে ঐ ন্যাকা মেয়েটার প্রেমে পড়েছিলি। আর ছ্যাকা খেয়ে এসে আমার কাছেই আবার কেঁদেছিলিস। তুই বল আমি সেই মানুষটা কি করে স্বামী ভাববো??

__তবে আমি একটা কথা কিন্তু বিশ্বাস করি, স্বামী স্ত্রী হওয়ার জন্য সব থেকে আগে ভালো বন্ধু হওয়া দরকার। তবে আরেকটা কথা, তুই চাইলে কিন্তু আমি দীপ্ত কে তোর সামনে হাজির করতে পারি।

__সত্যি তোর সাথে দীপ্তর এখনো যোগাযোগ আছে?? আমার সামনে দীপ্ত কে হাজির করার কোন দরকার নেই, আমার মনে সেরকম কোনো ফিলিংস নেই দীপ্তর জন্য। আর এমনিতেও দীপ্ত ঐন্দ্রিলাকে পছন্দ করে শুনেছিলাম।

__আমরা দুজন দুজনার সম্বন্ধে কিন্তু অনেক কিছু জানি তাই না চন্দ্রা? আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, কোন কালার পছন্দ ,কোন জায়গাটা পছন্দ, কোন খাবার খেতে ভালোবাসি, সবই তো জানি আমরা। তুই আমাকে বন্ধু ভাবতে পারবি না বিয়ের পর??

__তুই ব্যাঙ্গালোর কেন যাবিনা? আমার জন্য? আমিতো তোর বাঁধা হতে চাইনা। তোর যদি ব্যাঙ্গালোর যেতে ইচ্ছে করে , তাহলে যাবি না  বা কেন?

অরিন্দম চন্দ্রার হাতটা একটু ধরে,তবে অরিন্দম এর আগেও চন্দ্রার হাত অনেকবার স্পর্শ করেছে। আজ কেন জানি না, চন্দ্রার স্পর্শটা খুব ভালো লাগলো। সত্যিই যদি কেউ খুব ভালোবাসে তার প্রতি মন এমনিতেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। চন্দ্রা ও যেন একটু একটু করে অরিন্দমের ভালোবাসাটা স্বীকার করতে শুরু করেছিল।

__সত্যি জানিনা আমি। শুধু এটুকুই জানি তোর সাথে থাকতে চাই। কিন্তু হ্যাঁ তুই যদি না চাস কিচ্ছু হবে না। বিশ্বাস কর, তুই যদি বিয়েটা করতে না চাস, আমাকে এখনো বলে দিতে পারিস। আমি বাবা-মাকে ঠিক বুঝিয়ে নেব।

চন্দ্রা চুপ করে থাকে, কিছু বলেনা। অরিন্দমের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলে,

__আমি জানিনা অরিন্দম তোর ভালোবাসার দাম কতটুকু দিতে পারব, তবে আমি চেষ্টা করব পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার। আমার পক্ষে এগুলো অতটা সহজ নয়। যাক ছাড় অনেক দেরি হয়ে গেল এবার বাড়ি চল।

অরিন্দম আর কোন কথা বলে না, চুপচাপ গিয়ে বাইকে স্টার্ট দেয়।আর চন্দ্রাও বাইকে গিয়ে বসে। চন্দ্রার এখন অতটা অস্বস্তি লাগছে না।

আজ চন্দ্রা আর অরিন্দমের এনগেজমেন্ট। চন্দ্রা কে পার্লার থেকে সাজানোর জন্য লোক এসেছে। খুব সুন্দর একটা লাল রঙয়ের শাড়ি পড়েছে চন্দ্রা, মিষ্টি পরীর মত লাগছে একদম। চন্দ্রার মা উপরে এসে মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।

__ওমা কি মিষ্টি লাগছে তোকে, আমার সেই ছোট্ট চন্দ্রা কবে এতো বড় হয়ে গেলি তুই বুঝতেই পারলাম না। তোর বাবা আমি খুশি, তুই আমাদের সিদ্ধান্তটা মেনে নিয়েছিস বলে।

__মা আমি একটু একা থাকতে চাই। একটু পর সবাই এলে আমাকে নিচে ডেকো।

চন্দ্রার মা বোঝেন, মেয়েকে সময় দেয়া উচিত একটু। আসলে কিছু কিছু ব্যাপারে আমাদের নিজেদের সঙ্গে অনেক লড়াই করতে হয়। তাই আর কোন কথা না বাড়িয়ে চন্দ্রার মা নিচে চলে যান।

চন্দ্রা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব ভালো করে দেখে, আর ভাবতে লাগে: বেশ ভালোই লাগছে আমাকে, কিন্তু আমি তো এটা চাইনি। আমার জীবনটা তো খুব সাধারন ছিল। কেন এতটা জটিল হয়ে গেল!!! কিন্তু এখন এখান থেকে ফেরার কোন রাস্তা নেই, অরিন্দম তো সত্যিই আমাকে ভালোবাসে। ওর সাথে আমার বিয়ে হলে আমাকে ও সবসময় ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবে, কিন্তু আমি কি ভালবাসতে পারব?? ভালো রাখতে পারব কি?

এমন সময় হঠাৎ দরজায় আওয়াজ হয়, কিরে চন্দ্রা দরজা দিয়ে আছিস কেন? অদিতি এসে ডাকছে চন্দ্রা কে। চন্দ্র দরজাটা খুলে বলে,

__ও অদিতি তুই আয়, আমি ভাবলাম আবার কে ডাকতে এল।

__তোকে দেখতে আজ খুব সুন্দর লাগছে। কিন্তু মুখটা ওরকম শুকনো করে রেখেছিস কেন? তুই কি এখনো বিয়েটা মন থেকে মেনে নিতে পারছিস না??

__না আমি মেনে নিয়েছি, পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করছি। শুধু একটু সময় লাগছে এই আর কি।

__আমার মনে হয় তোর আরেকটু ভেবে দেখা উচিত, যতই হোক এটা তোর জীবনের ব্যাপারে। কোন সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নিস না প্লিজ।

__এখন আর সময় নেই রে, যা হবার হয়ে গেছে। আর তাছাড়া, অরিন্দম আমাকে খুব ভালোবাসে অদিতি। ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আমি কি করে দুঃখ দেবো বল?? আমি এটুকু জানি ওর সাথে বিয়ে হলে আমি খুব ভালো থাকবো।

__তুই না হয় ভালো থাকবি, কিন্তু ওর সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারব? ওকে তো তুই ভালবাসিস না, কিভাবে টিকবে সম্পর্ক টা?

__আমি ওকে ভালো রাখার চেষ্টা করব।

__আমার আর কিছু বলার নেই ,তোর যা ইচ্ছা কর।

এরপর অদিতি নিচে চলে আসে, কিন্তু চন্দ্রার যেন নিজের সাথে লড়াই প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। চন্দ্রা হাঁফিয়ে উঠেছে আর পারছেনা, হতাশা হয়ে বিছানার উপর বসে পড়ে। এদিকে অরিন্দমরা সবাই এসে গেছে।

__ অদিতি তুই তাড়াতাড়ি যা চন্দ্রা কে নিচে নিয়ে আয়। ওরা তো এসে গেল সবাই।

__কাকিমা তুমি চিন্তা করো না, আমি যাচ্ছি।

অদিতি ওপরে যেতে গেলে, অরিন্দম বলে ওঠে

__কাকিমা আমি যায় , চন্দ্রা কে আনতে।

__না না তুই বস বাবা, অদিতি যাক ওকে আনতে।

__থাক কাকিমা অরিন্দমই যাক।

তারপর অরিন্দম ওপরে চন্দ্রার ঘরের দিকে যায়। ঢুকতে গিয়ে দেখে চন্দ্রা কাঁদছে। অরিন্দম বুঝতে পারে যে, চন্দ্রা এখনো তৈরি না রিয়েটা করার জন্য। কিংবা হয়তো কখনোই তৈরি না।

__আমি তোর খুব পর , তাই না চন্দ্রা??

__এসব কি বলছিস, তুই তো আমার বেস্ট ফ্রেন্ড রে।

__থাক থাক অনেক হয়েছে, তুই যদি আমাকে তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতিস, তাহলে এভাবে মনের মধ্যে কষ্ট চেপে রাখতিস না। আমি তো কতবার বলেছি, আমার কাছে তোর ভালো থাকাটা বেশি ইম্পর্টেন্ট, তোর আমার সাথে থাকাটা না রে।

__তেমন কিছু না, আমি মেনে নিয়েছি। পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাই।

__অনেক মানিয়েছিস । পাগলী একটা, এখুনি চল আমার সাথে নিচে।

তারপর অরিন্দম চন্দ্রার হাত ধরে ওকে নিচে নিয়ে যায়। চন্দ্রা আর কিছু বলতে পারে না, শুধু একভাবে অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে থাকে। এগুলো কিছুই চন্দ্রা আশা করেনি, অরিন্দম ওকে এতোটা ভালোবাসে। অরিন্দম কে দুঃখ দিয়ে চন্দ্রা কি নিজে ভালো থাকতে পারবে???
অরিন্দম চন্দ্রার হাত ধরে নিচে নিয়ে যেতেই সবাই অবাক হয়ে যায়। তারপর অরিন্দম চন্দ্রার কাধের উপর হাত দেয়, আর বলে

__আমরা ঠিক করেছি আজকে আমরা এনগেজমেন্ট করবো না,আমাদের সময় লাগবে নিজেদের পুরোপুরি ভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়ার জন্য।

অরিন্দমের কথা শুনে অরিন্দমের মা চিৎকার করে বলতে লাগলেন

__এসব কি বলছিস?? আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশী সবাই জেনে গেছে তোরা চন্দ্রার বিয়ে ঠিক হয়েছে।এখন যদি সবাই জানে যে তোদের বিয়েটা ভেঙে গেছে তাহলে আমি মুখ দেখাতে পারবো?? কালকে তুই বললি তুই নাকি ব্যাঙ্গালোর যাবিনা, সেটাও মেনে নিলাম। এখন বুঝতে পারছি কেন তুই ব্যাঙ্গালোর যাবিনা!! এই মেয়েই তোকে ফুঁসলিয়েছে। বিয়ের আগেই এই অবস্থা বিয়ের পর না জানি কত কিছু করবে।

__মা এটা সম্পূর্ণ আমার সিদ্ধান্ত, আমি সত্যিই চায়না ব্যাঙ্গালোর যেতে। আজকের সিদ্ধান্তটা আমরা দুজন মিলে নিয়েছি। সত্যিই তো হঠাৎ করে কোনো সম্পর্ক শুরু করা যায় নাকি? প্লিজ মা তুমি চন্দ্রাকে কিছু বলো না।

__না বলবেনা, পুজো করবে ফালতু মেয়ে, এই মেয়ে আমি কিন্তু বলে রাখলাম, আজ যদি এনগেজমেন্ট না হয়। তাহলে আমাকেও ভাবতে হবে, আমি তোকে আমার বাড়ির বউ করব কিনা!!

অরিন্দম চন্দ্রার কাঁধের উপর হাতটা আরও শক্ত করে ধরে, আর নিজের মার উদ্দেশ্যে বলে,

__মা তাহলে তুমি ভাবা শুরু করে দাও, কারণ আজকে আমার আর চন্দ্রার এনগেজমেন্ট হচ্ছে না।

অরিন্দমের বাবা-মা খুব রাগারাগি করে চন্দ্রাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে আসেন। বিমল বাবু মানে চন্দ্রার বাবা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেন নিরঞ্জনবাবু কে। কিন্তু কোনো ফল হয় না,সবকিছু দেখেশুনে চন্দ্রার মা অরিন্দমের কাছে হাতজোড় করে মিনতি করে, আর বলে

__তুইতো আমাদের ঘরের ছেলে, এরকম করিস না বাবা। লোকলজ্জায় আমরা কোথাও বেরোতে পারবোনা। আমার চন্দ্রা যদি তোকে কিছু বলে থাকে তার জন্য আমি তোর কাছে ক্ষমা চাইছি।

__কাকিমা প্লিজ এভাবে বলোনা,আমার প্রতি বিশ্বাস রাখো, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

এইসবের মাঝে চন্দ্রা পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে। কারোর কোন কথায়, কারোর কোন ব্যবহারে ওর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সবাইকে সব কিছু বোঝানোর পর অরিন্দম চন্দ্রাকে বলে,

__কোন চিন্তা করিস না, তুই যতদিন না চাইবি বিয়ে হবে না রে। ভালো থাকিস আমি এখন গেলাম।

অরিন্দম চলে যাওয়ার পরে, চন্দ্রার মা সামনে এসে ওকে ধরে। কিছুটা ঝাঁকিয়ে বলে,

__কি করলি এটা তুই?? তোর কাছে নিজের বাবা-মার ইচ্ছারও কোন দাম নেই।

তারপর কিছুটা ধাক্কা দিয়ে চন্দ্রাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতর চলে যান। অদিতি চন্দ্রা কে সামলে নেয়।

সবাই চলে যাওয়ার পরে, চন্দ্রা অদিতি কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে। অদিতি ওকে অনেক সান্তনা দেবার চেষ্টা করে।

__কিরে পাগলী কাঁদিস না। তাছাড়া তুই তো এটাই চেয়েছিলি।তবে আমার কেন জানিনা অরিন্দমের জন্য একটু কষ্ট হলো। ছেলেটা খুব ভালো।

__এটাতো আমি চাইনি, বাবা-মা সবাই খুব কষ্ট পেয়েছে। বিশ্বাস কর অদিতি, আমি এরকম কিছু চাইনি। আমার জন্য অরিন্দম নিজের মাকে কত কথা শোনালো। আমাদের সম্পর্কটা কেমন হয়ে গেল রে, বাবা আর নিরঞ্জন কাকু খুব ভালো বন্ধু। আমার জন্য মনে হয় ওদের বন্ধুত্বটাও নষ্ট হয়ে গেল।

__এত ভাবিস না তো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে। কাকু কাকিমাও বুঝতে পারবে।

__অদিতি অরিন্দম খুব কষ্ট পেয়েছে তাই না বল? যেভাবে এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল, খুব কষ্ট না পেলে এত উত্তেজিত হয় না জানিস।

__একটা সত্যি কথা বলবি? আমার কেন জানিনা মনে হয় অরিন্দম তোকে  ভালোবাসে। মাঝে মাঝে এটাও মনে হয় তুইও অরিন্দম কে ভালবাসিস। শুধু ভালোবাসাটা স্বীকার করতে ভয় তোর।

__ছোটো থেকেই আমাদের মধ্যে একটা অটুট বন্ধন আছে। তবে ভালোবাসার বন্ধন কিনা আমি বলতে পারবোনা। কিন্তু আমি এই তিন দিনে একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝে গেছি, অরিন্দম আমাকে ওর নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। ঐরকম নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমাকে অনেক কিছু ভাবতে বাধ্য করেছিল অদিতি।

__তাহলে তুই এখন কি করবি? বিয়ে কি আবার সম্ভব?

__একটু সময় দেবো নিজেকে, তাহলে সবকিছু আমাকে কাছে হয় তো পরিষ্কার হয়ে যাবে।

পরের দিন চন্দ্রা স্কুলে যাওয়ার জন্য রেডী হচ্ছে এমন সময় চন্দ্রার মা উপরে এসে বলেন,

__কাজটা কি তুই ভালো করলি? অরিন্দমের মত ছেলে আর তুই কোনদিন পাবিনা।

__আমি সব জানি মা, কিন্তু এটাও তো সত্যি সবকিছু মুখ বুঁজে সহ্য করলে পরিস্থিতি বিপরীত হয়ে যায়।

__আমি জানিনা তুই কি সিদ্ধান্ত নিবি,তবে এটুকু বলতে পারি আর যাই হোক তোর আর অরিন্দমের বিয়ে সম্ভব হবে না।

__আমি এখন আসছি মা দেরি হয়ে যাচ্ছে।

স্কুলে যখন থেকে এসেছে তখন থেকে চন্দ্রার মনটা খুব বিচলিত হয়ে আছে, বারবারই মনে হচ্ছে সবাই ওর জন্য কত কষ্ট পেলো।অনেক ভেবে কোন রাস্তা খুঁজে না পেয়ে, তাই ঠিক করলো অরিন্দমের বাড়ি গিয়ে কাকু-কাকিমার কাছে ক্ষমা চেয়ে আসবে। স্কুলের পর একটা অটো করে অরিন্দমের বাড়িতে গেল। বাড়ির কলিংবেলটা বাঁজাতে যাবে, এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেল। জানলার দিকে তাকিয়ে দেখল অরিন্দম কাকু কাকিমা কথা বলছি কিছু নিয়ে। কথা গুলো এরকম ছিল,

__মা তুমি সব কিছুতে এত উত্তেজিত হও কেন?

__উত্তেজিত হবো না, চন্দ্রার সাথে তোর এনগেজমেন্ট ভেঙে গেল। বিয়েটাও হবে কিনা তার কোন গ্যারান্টি নেই।

অরিন্দম একটু হেসে নেয়, মনে হচ্ছে জয়ের হাসি হাসছে। তারপর বলে,

__আরে মা এমন চাল চেলেছি না, চন্দ্রা কেন? ওর দাদুও বিয়েতে রাজি হবে। আর একবার বিয়ে হয়ে ওকে বাড়িতে আসতে দাও, তারপর সব তেজ আমি ওর বার করে দেবো।

__ওই মেয়ে খুব জেদী, নিজেকে কি মনে করে কে জানে? বিয়ের পরেই কিন্তু তুই তোর নিজের নামে ওর বাবার সম্পত্তি লিখিয়ে নিবি।

__সে আর বলতে, আমি সবকিছু জানি মা।

কথাগুলো শোনার পর চন্দ্রা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না, এটা সেই অরিন্দম যে কিনা ওর ছোটবেলার বন্ধু। না এটা ওর বন্ধু হতে পারেনা। এমন সময় হঠাৎ অরিন্দম জানলার দিকে তাকাই, আর দেখে চন্দ্রা দাঁড়িয়ে আছে। চন্দ্রা তখনই রাগে-অভিমানে ছুটে বেরিয়ে আসে, পিছন থেকে অরিন্দম মুখে দৌড়াতে দৌড়াতে হাত টেনে ধরে।

__চন্দ্রা আমার কথাটা শোন, প্লিজ এভাবে মাথা গরম করিস না। একবার আমার কথাটা শোন।

__আরো কিছু শোনার বাকি আছে বুঝি অরিন্দম!!! “ডোন্ট টাচ মি” একদম আমার কাছে আসার চেষ্টা করবি না। আমার তো তোকে নিজের বন্ধু বলে পরিচয় দিতেও ঘেন্না করছে।

__সেরকম কিছু না রে, মা খুব উত্তেজিত হয়ে গেছিল তাই আমি মাকে মার ভাষায় বোঝাচ্ছিলাম। তাই তোর নামে এসব কথাগুলো আমি বলতে হয়েছে।

__সিরিয়াসলি!! এত নাটক, তুই এখনো মিথ্যে কথা বলে যাচ্ছিস??

__আমিতো তোকে ছুঁয়ে বলছি বিশ্বাস কর। প্লিজ আমি তোকে ভালোবাসি।

__ভালোবাসার কথা তোর মুখে মানায় না অরিন্দম!! আমাকে ছাড় বলছি।

তারপর চন্দ্রা নিজের হাত অরিন্দমের থেকে ছাড়িয়ে নিতে যায়, অরিন্দম আরও জোরে চন্দ্রার হাত চেপে ধরে।

__তোর খুব জেদ তাইনা? নিজেকে কি মনে করিস বলতো!! আমি বলে রাখছি যে চন্দ্রা, আমি আমার বাড়ির বউ করে তোকে আনবো, আর তোকে দিয়ে আমি আমার সমস্ত স্বপ্ন পূরণ করুবো।

চন্দ্রা এমনিতেই উত্তেজিত হয়ে ছিল, তারপর নিজের ছোটোবেলার বন্ধুর এরকম কথা শুনে নিজেকে সামলাতে পারেনা। ঠাস করে অরিন্দমের গালে একটা চড় মারে।

__তোকে আমি আমার বন্ধুও মনে করি না আজ থেকে। এতটা খারাপ তুই, আমি বুঝতেই পারলাম না। এটাই আমার আফসোস থেকে গেল। আর কোনদিন যদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিস খুব খারাপ হবে।

__চন্দ্রা আমাকে ক্ষমা করে দে, সত্যি আমি তোকে ভালবাসি। প্লিজ একটা সুযোগ দে।

চন্দ্রা নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একটা অটোতে করে চলে আসে বাড়িতে। চন্দ্রার অসহ্য লাগছে, অরিন্দমের প্রতি ভালোলাগা শুরু হয়েছিল, কি করে জানবে ও বন্ধুত্বের পেছনে এত বড় শত্রুতা লুকিয়ে আছে। অজস্র কেঁদে চলেছে চন্দ্রা বাড়ি এসে।

“বিশ্বাস” নামক শব্দটা চন্দ্রার কাছে একটা আতঙ্ক হয়ে গেছে। অদ্ভুত তাইনা, ছোটোবেলার বন্ধু এতটা পাল্টে গেল হঠাৎ করে!! সত্যি আজ কাল কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না, কে কখন সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছে, কিছু বোঝা যায় না। চন্দ্রা নিজেকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করছে, অরিন্দম ভালো না। ততোবারই মনে হচ্ছে, কি করে সম্ভব!! এই কদিনে ওর জীবনে একটা বড় ঝড় বয়ে গেল, সবকিছু ওলট-পালট হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। এসব ভাবনার মধ্যেই ডুবেছিল চন্দ্রা, হঠাৎ মায়ের ডাকে সজাগ হয়।

__তাড়াতাড়ি নিচে আয় চন্দ্রা। দেখ কে এসেছে।

নিচে এসে চন্দ্রা পুরো অবাক হয়ে যায়, মানুষ যে কতটা নিচু হতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমান ওর সামনে দাঁড়িয়ে। অরিন্দম আর তার বাবা-মা এসেছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আবার।

__জানিস চন্দ্রা ওনারা কিছু মনে করেননি তোর ব্যবহারে, কত বড় মনের মানুষ। তুই ধন্য হয়ে যাবি এরকম শ্বশুরবাড়ি পেয়ে।

__যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, বিয়েটা সেরে ফেলাই ভালো। নাহলে আবার কোন রকম সমস্যার সৃষ্টি হয় যদি। অরিন্দমের বাবা বললেন।

__আপনাদের কে বলল আমি আপনার ছেলেকে বিয়ে করবো? আমি কি আপনাকে ফোন করে বলেছি, নাকি আপনাদের বাড়ি গিয়ে আপনাদের কাছে হাতজোড় করে বলে এসেছি যে আপনারা আমাকে উদ্ধার করুন। কিছুই তো করিনি, তাহলে কেন এসেছেন এখানে?

__কিরে চন্দ্রা তুই ওভাবে উনাদের সঙ্গে কথা কেন বলছিস? দেখ চন্দ্রা আর কিছু করিস না কিন্তু। এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করে ফেলছিস।

__আমি আপনাদেরকেই বলছি, আপনারা আসুন। আপনাদের সাথে আমাদের সম্পর্কটা অনেক পুরনো, তাই আমি চাই না কোন খারাপ ব্যবহার করতে। তাই দয়া করে আসুন।

__তুই কিন্তু আমার বাবা মাকে অপমান করছিস চন্দ্রা। মেয়ে দের এতটা দম্ভ কিন্তু ভালো না।ভেঙে চুরমার হয়ে যখন যাবি, তখন সামলাবার জন্য কেউ থাকবে না পাশে।

__এখনো কিছুই অপমান করিনি অরিন্দম। যাতে অপমান করতে না হয়, সে জন্যই তোকে বলছি বাবা মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যা। আর কোনো ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিস, যে মেয়ে তোদের কথায় উঠবস করবে।আর আমাকে নিয়ে তোকে চিন্তা না করলেও হবে অরিন্দম। এবার আসতে পারিস, রাস্তাটা ঐদিকে।

অরিন্দম দের সাহস দেখে চন্দ্রার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। কোন মানুষ এতটা বাজে হতে পারে!! তাও আবার সেরকম মানুষ যাদের কিনা ছোটো থেকে চন্দ্রা দেখে আসছে। সত্যিই বড়ই অদ্ভুত লাগে।এইসব বিমলবাবু সহ্য করতে না পেরে মাথাটা ঘুরে পড়ে যান। চন্দ্রা সামলাতে গেলে ওর মা ওকে দূরে সরিয়ে দেয়।

__খবরদার মানুষটার গায়ে তুই হাত দিবি না। যে মেয়ের কাছে বাবা-মার কোন কথার দাম নেই, সেই মেয়ে থাকার থেকে না থাকা অনেক ভালো।

__মা বাবার শরীরটা খারাপ, বাবাকে এক্ষুনি হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। এইসব নিয়ে পড়ে আমরা কথা বলবো।

তারপর চন্দ্রা আর ওর মা বিমল বাবুকে হসপিটালে নিয়ে যান। ডাক্তার বলেছে বিমল বাবু কোন কিছুতে শক পেয়েছেন। তাই উনাকে কোন চাপ দেওয়া যাবে না। চন্দ্রা না চাইলেও ওর মা অরিন্দম কে খবরটা জানায়। আসলে চন্দ্রা ওর মাকে সব কথা খুলে বলতে পারছেনা অরিন্দমের ব্যাপারে, অবশ্য বললেও যে বিশ্বাস করবে এমনটা তো নয়। খবরটা পাওয়ামাত্রই অরিন্দম চলে আসে, এমন ভাবে উত্তেজিত নিজেকে দেখায় যেন মনে হচ্ছে ওর কত কষ্ট হচ্ছে। চন্দ্রার এগুলো এখন অসহ্য লাগছে। অরিন্দম অনেকবার চন্দ্রার সাথে কথা বলার চেষ্টা, কিন্তু চন্দ্রা প্রতিবারই ওকে ইগনোর করার করে। আসলে অরিন্দমের প্রতি আর কোন ইন্টারেস্ট চন্দ্রার নেই। অবশ্য ঐসব কথা শোনার পর যে কোন মেয়েরই এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ডাক্তারবাবু চন্দ্রাকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে কিছু ওষুধ আনতে বলেন। চন্দ্রা নিজেই ওষুধগুলো আনতে যেতে গেলে, অরিন্দম ওর হাত থেকে ওষুধের প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে নেয়।

__তুই কোন চিন্তা করিস না, আমি ওষুধ গুলো নিয়ে আসছি। তুই এখানে বাবা-মার সঙ্গে থাক।

__লোকদেখানো নাটক কেন করছিস অরিন্দম? এগুলো করে লাভটাই বা কি!! আমার কিন্তু সহ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

__তোর যা মনে হয় তুই ভাবতে পারিস চন্দ্রা। তবে আমি তোকে আমার বাড়ির বউ বানাবোই। তুই মিলিয়ে নিস।

চন্দ্রা আর কোন কথা বাড়ায় না। আসলে চন্দ্রার এখন অরিন্দমের সঙ্গে কথা বললে নিজেকে অত্যন্ত ছোটো বলে মনে হয়। ফালতু কথা না বাড়িয়ে বাবাকে দেখতে ভেতরে যায়। দরজাটা একটু ফাঁক করতে গেলে শুনতে পাই বিমলবাবু আর চন্দ্রার মা কিছু কথা বলছে। বিমল বাবুর জ্ঞান ফিরে এসেছে উনি জিজ্ঞেস করছেন,

__চন্দ্রা কোথায়?? ওকে ডেকে দাও আমার কাছে।

__তুমি পারোও বটে, যার জন্য তোমার আজকে এই অবস্থা তাকে নিয়েই তুমি এত ব্যস্ত। ওই মেয়ে তোমার কথা ভাবে না। আসলে ভাবতেই বা কি করে!! রক্তের সম্পর্ক তো নেই। ভাবতে গেলে রক্তের সম্পর্ক লাগে।

__আহ, তুমি এসব কি বলছ টা কি? চন্দ্রা যদি শুনতে পাই এর খারাপ লাগবে। আর তাছাড়া চন্দ্রা আমাদেরই মেয়ে।

__ওটা তোমার ভুল ধারণা, আমার তো এটা ভেবেই আশ্চর্য লাগে ঐ রাস্তার মেয়েকে তুমি যদি আমাদের ঘরে না নিয়ে আসতে তাহলে ওকি এতো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কাটাতে পারত!! তাহলে আজকে ওর এত জেদ হতো না। সবাই ঠিকই বলে, লোকের উপকার করতে গেলে নিজের‌ই ক্ষতি হয়। আজ ওর জন্য তোমার এই অবস্থা।সারাটা দিন ওই মেয়েটার জন্য চিন্তা করে করে নিজের শরীরটা খারাপ করে ফেলেছো।

__ওটা যার যার কপাল, চন্দ্রার কপালেই ছিল আমাদের বাড়িতে আসবে। তুমি চিন্তা করোনা, আমি বুঝিয়ে বললে চন্দ্রা অরিন্দম কি বিয়ে করতে ঠিক রাজি হবে।

__তুমি ওই আশাতেই দিন কাটাও। তোমার আশাও কোনদিন পূর্ণ হবেনা, আর ওই মেয়ের মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের কোনদিন শান্তি দেবেনা। আমার তো খুব অসহ্য লাগে, তোমাকে সেদিন কত মানা করেছিলাম। নিজের সন্তান নেই পরের সন্তান নিও না, আমার কথা শুনলে না। আজ ভোগ করে যত জ্বালা। তুমি বলে এগুলো সহ্য করছো, তোমার জায়গায় আমি যদি ওকে একটু কিছু বলতে পারতাম না, খুব শান্তি পেতাম ।অন্তত একটা ঠাস করে চড় মেরে শান্তি পেতাম।

__এগুলো তোমার অভিমানের কথা।

__না না এগুলো আমার মনের কথা।

না আর কিছু চন্দ্রা শুনতে পাচ্ছে না, আর শোনার শক্তি ওর মধ্যে নেই। সত্যি তো এগুলো কি শোনার মত কথা। চন্দ্রার মনে হচ্ছে, এক মুহুর্তে মাথার উপর থেকে বড় ছাতাটা কেউ সরিয়ে নিল। দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে বাইরের সোফার ওপর বসলো, ছোটোবেলা থেকে আজ পর্যন্ত সব ঘটনা মেলানোর চেষ্টা করছে। না মানুষগুলো কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি, নিজের মেয়ের মতোই ভালোবেসেছে।এমনকি অরিন্দমের সঙ্গে বিয়েটাও যখন মানলো না তখনও কিছু বলেনি। এতক্ষণে অরিন্দম ওষুধ নিয়ে এসে পাশে দাঁড়ালো। অরিন্দমের পেছনে দূর থেকে চন্দ্রা দেখতে পেল ওর মা আসছে, কিন্তু কেমন যেন কোন ভাষা মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না।

__কাকুর জন্য ওষুধ গুলো কিনে নিয়েছি, কাকুকে দিয়ে যা।

__বাহ্  ভালই হয়েছে তোমরা দুজনেই এখানে আছো, উনি তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চান। ভেতরে গিয়ে ওনার সঙ্গে একটু কথা বলে এসো। আর হ্যাঁ চন্দ্রা, আমি তোর কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছি তুই আর মানুষটাকে কষ্ট দিস না। যা বলে মেনে নিস ।

__তুমি কোন চিন্তা করোনা মা, অনেক ভার হয়ে গেছে। এবার নিজেকে মুক্ত করে দেবো। সমস্ত ঋণ শোধ করে দেবো।

__ঋণশোধ করবি মানে !!কি বলছিস কি তুই?

__মা-বাবার কাছে তো সন্তানরা ঋণী থাকে মা সারাজীবন। বাবার কথা শুনে যদি একটু ঋণের বোঝা কমে।

বিমল বাবু বেডের উপর শুয়ে আছেন,অরিন্দম আর চন্দ্রা দুজন মিলে বিমলবাবু সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বিমল বাবু ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,

__আমার একটা শেষ ইচ্ছে রাখবি চন্দ্রা? আসলে এই ইচ্ছেটা পূর্ণ না হলে হয়তো আমি মরেও শান্তি পাব না।

__বাবা প্লিজ তুমি এভাবে বলোনা, তুমি আমার আদর্শ। তোমার সব কথা শুনব আমি শুধু একবার বলেই দেখো না।

__আমি চাই তোদের দুজনার চার হাত এক হোক। তুই আর মানা করবি নাতো চন্দ্রা?

__একদম করবো না বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো। তারপর দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের আশীর্বাদ করো।

বিমল বাবু চন্দ্রার  হাত অরিন্দমের হাতে দিয়ে বললেন,__আমার মেয়ের সারা জীবনের দায়িত্ব আমি তোমাকে দিতে চাই অরিন্দম। তুমি ওকে আগলে রেখো আমার মত করে।

__অবশ্যই কাকু আপনি কোন চিন্তা করবেন না, আমি সবসময় চন্দ্রার পাশে থাকবো।

চন্দ্রা জানে, অরিন্দমের বলা প্রতিটা কথা মিথ্যে।তাও আজ কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনা। এরকম জটিল পরিস্থিতি যেন কারো জীবনে সৃষ্টি না হয়, কতটা বাধ্য হয়ে যে চন্দ্রা কে আজকে পরিস্থিতি মেনে নিতে হচ্ছে। সেটা চন্দ্রা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারবেনা।

মাঝখানে একটা মাস কেটে গেছে। বিমল বাবু এখন যথেষ্ট সুস্থ, দুই পরিবার মিলে অরিন্দম আর চন্দ্রার বিবাহের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু সত্যিই কি বিবাহটা হওয়া ঠিক!! চন্দ্রা নিজের কাছে নিজেই হেরে গেছে, কীভাবেই বা বলবে? যে মানুষ গুলো ওকে ছোটো থেকে এতটা বড় করল এতোটা ভালোবাসলো, তারা শুধু একটা জিনিস ওর কাছ থেকে চায়। সেটাও যদি না দিতে পারে তাহলে কিসের মেয়ে। তাই নিজেকে শেষ করেও এই কথাটা রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়েছে। কিন্তু এর পরিণতি যে ভালো হবে না সেটা চন্দ্রা ভালো করেই জানে।

আজকে অরিন্দম আর চন্দ্রার বিয়ে। অরিন্দমের বাড়ি থেকে গায়ে হলুদ পাঠিয়েছে, অদিতি চন্দ্রাকে গায়ে হলুদের জন্য রেডি করছে। চন্দ্রা কে দেখে অদিতি বুঝতে পারছে, মেয়েটা যেন ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

__এইরকম ভাবে থাকলে কাকু কাকিমা তোর বিয়ে দিয়ে সুখী হবে!! নিজেকে কেন এভাবে শেষ করে দিচ্ছিস? বিয়ে যদি নাই করতে চাস তাহলে কাকু কাকিমাকে বললেই তো পারতিস।

__সবকিছু বলে বোঝানো সম্ভব নয় অদিতি। তাছাড়া বাবা-মার কাছে আমি ঋণী, নিজের জীবন দিয়ে হলেও বাবা-মার ঋণ আমি শোধ করবো।

__বাবা-মার কাছে তো আমরা সবাই ঋণী, ঐ ঋণ শোধ করা যায় না। কি সব বলছিস? পরিষ্কার করে আমাকে সব খুলে বলনা।

এরপর চন্দ্রা অদিতিকে পরিষ্কারভাবে সবকিছু খুলে বলে, এতদিন যা কিছু হয়েছে সবকিছু অদিতি কে জানায়। সবকিছু শোনার পর অদিতি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা, এতকিছু এই কয়দিনের মধ্যে ঘটে যেতে পারে।

__কি সব বললি? আর সবথেকে বড় কথা অরিন্দম যদি সত্যিই এতো খারাপ হয়, তাহলে তোর ওকে বিয়ে করে একদম উচিত নয়। কাকু কাকিমা তোকে মানুষ করলেও, নিজের মেয়ের থেকে কখনো কম ভাবেনি। উনাদের একটু বোঝালে হয়তো সমস্যা মিটে যাবে।

__নিরঞ্জন কাকু বাবার খুব ভালো বন্ধু, অরিন্দম বাবা-মার কাছে আদর্শ। ওদের নামে কোন খারাপ কথা বললেও বাবা-মা বিশ্বাস করবে না। এর মাঝে যদি বাবার শরীর খারাপ হয়ে যায় তাহলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।

__তাই বলে তুই নিজের জীবন নিজে হাতে শেষ করবি!! না এটা হতে পারে না। আমি তোর বন্ধু হয়ে এটা মানতে পারবোনা। দরকার পড়লে আমি কাকু কাকিমা সঙ্গে গিয়ে কথা বলব।

__না না প্লিজ অদিতি, বাবা-মাকে আর কষ্ট দিস না। আমার যা হয় হোক, বিয়েটা করবো আমি।

__বিয়ের পর যদি কষ্টে থাকিস কাকু ভালো থাকতে পারবে!! অরিন্দম ভালো না কাকু একদিন নিজেই ঠিক বুঝতে পারবে। প্লিজ তুই পালিয়ে যা, কাকু কাকিমাকে যা বোঝানোর আমি বুঝিয়ে দেব। কারণ অরিন্দম যখন খারাপ ও তোকে জোর করে বিয়ে করবে, আমরা কেউ হয়তো আটকাতে পারব না। তাই তুই পালিয়ে যা। কোনো বান্ধবীর বাড়ি গিয়ে থাক কলকাতায়। সবকিছু মিটে গেলে আমি তোকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবো। অন্ততপক্ষে তোর জীবনটা যত নষ্ট হবে না।

__কি সব বলছিস তুই? আমি চলে গেলে বাবা তো মরেই যাবে। আমি এটা কি করে হতে দেবো?

__আমি কথা দিচ্ছি কাকুর কিচ্ছু হবে না। প্লিজ তুই নিজের জীবনটা নষ্ট করিস না। আমি তোকে সময় সুযোগ মত ডেকে নেব।

চন্দ্রা কিছু বলতে পারেনা, অবশ্য বলতে চায় না। কারণ মনে মনে এটাই চায় এখান থেকে পালিয়ে যেতে, অদিতি যেন ওর মনের কথা বলে দিয়েছে।আত্মীয়স্বজন সবাই গায়ে হলুদের আয়োজন করতে ব্যস্ত, তার‌ই মাঝে অদিতি একটা ট্যাক্সিতে তুলে দেয় চন্দ্রাকে। চন্দ্রা জানেনা এখন কোথায় যাবে? কিন্তু এটা বুঝতে পারে, জীবনটা শেষ হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেল।

ট্যাক্সিতে আসার সময় চন্দ্রা পুরো ঘেমে গেছে,চন্দ্রার খালি এটাই মনে হচ্ছে পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে কি সত্যিই পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো রাস্তার কাছে খোলা ছিল না। কোথায় যাবে কি করবে কিছু বুঝতে না পেরে স্টেশনে এসে পৌঁছায়। যাইহোক কলকাতা থেকে পালাতে হবে। স্টেশনে আসতেই মদনপুরের একটা গাড়ি অ্যানাউন্স করে, সেই গাড়িটায় কিছু না ভেবে উঠে পড়ে। ট্রেনে উঠে একটা জানলার ধারে সিট পায়। সিটটায় বসে যেন অনেক শান্তি লাগছে। কিন্তু এই শান্তি কেবলমাত্র সাময়িকের, ট্রেন চলতে আরম্ভ করলে আবার মনের মধ্যে উতাল পাতাল শুরু হয়। প্রায় অনেকক্ষণ পর চন্দ্রা লক্ষ্য করে সামনে বসা মহিলাটি ওকে লক্ষ্য করছে। কিছুক্ষন এভাবে করার পর থাকতে না পেরে মনে হয় মহিলাটি প্রশ্ন করে বসেন,

__তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছে মা তুমি কোথায় যাচ্ছো? তোমার সঙ্গে কেউ নেই?

__আমি মদনপুর যাচ্ছি। না আমার সঙ্গে কেউ নেই।

__কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? 

__হ্যাঁ বলুন না কি কথা।

__তোমার হাতে শাঁখা পলা, কিন্তু সিঁথিতে সিঁদুর নেই। যদিও আজকালকার মেয়েরা এসব কিছুই মানেনা। তাও তোমাকে দেখে কেমন বিচলিত লাগছে।

__হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন আজ আমার বিয়ে ছিল। এগুলো এসবেরই চিহ্ন।

__ছিল মানে বিয়ে হয়নি?? তুমি বিয়ে বাড়ি থেকে একা একা বেরিয়ে এসেছো?

__হ্যাঁ। আমি বিয়ের দিনে বাড়ি থেকে একা একা পালিয়ে এসেছি।

__যদিও জিজ্ঞাসা করার কোন অধিকার নেই, তবু জানতে বড় ইচ্ছা হচ্ছে। কেন পালিয়ে আসলে মা? বাবা মা যে বড় কষ্ট পেল।

চন্দ্রা কিছু বলে না চুপ করে থাকে। কি বলবে কিছু বুঝতে পারছেনা। হঠাৎ করে কাউকে নিজের জীবনের কথা বলা ঠিক হবে কিনা সেটাও ব্যাপার। ভদ্র মহিলাটি চন্দ্রার অবস্থা বুঝতে পারেন।

__ সবকিছু বলতে সংকোচ হলে বলোনা। পরে বলো না হয়। তবে একটা কথা না বলে পারছিনা। তোমার মুখখানা আমার প্রিয় বন্ধুর মতো।

__ এটা হতেই পারে, আমি শুনেছি অনেক মানুষের মতো অনেক মানুষকে দেখতে হয়।

চন্দ্রার জীবন এবার কোন দিকে মোড় নেয় সেটাই দেখার। সত্যি কি চন্দ্রা ঠিক করল? নাকি চন্দ্রার উচিত ছিল পরিস্থিতি মেনে নেওয়া? কিন্তু ঠিক ভুলের হিসেবে করার সময় হয়ত থাকেনা এই রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে। ট্রেন এগিয়ে চলে সাথে সাথে চন্দ্রার মাথার ভিতরে চিন্তাগুলো দৌড়োদৌড়ি করতে থাকে, বাড়িতে এখন কি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এটা ভেবে।

এদিকে চন্দ্রার মা গায়ে হলুদের জন্য ডাকতে গেলে, অদিতি সবকিছু খুলে বলে। সব শোনামাত্রই চন্দ্রার মা খুব রেগে যান। অদিতি কে যা নয় তাই বলে অপমান করেন। এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় বাড়ির সব লোক এক জায়গায় জড়ো হয়ে যায়। সবকিছু শোনার পর বিমল বাবু নিজেকে সামলাতে পারেন না। আজ হয়তো সত্যিই বিমল বাবুর চন্দ্রা কে নিজের মেয়ে মানতে লজ্জা হচ্ছে। ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গিয়ে বিমল বাবু বলেন__আজ থেকে চন্দ্রা আমার কাছে মৃত!!!

মহিলাটির সাথে কথা বলতে বলতে চন্দ্রা নিজের জীবনের ঘটনা গুলো প্রায় ভূলেই গিয়েছিল। অদ্ভুত রকমের মায়া ছিল মহিলাটির কথার মধ্যে। এদিকে মহিলাটিও বুঝতে পারেন, চন্দ্রার জীবনে খুব গভীর ক্ষত আছে। তাই কোন বিষয়ে বেশি জিজ্ঞাসা না করাটাই ভালো বলে তিনি মনে করেন।

__তা মা তুমি এখন কোথায় মানে কার বাড়ি যাবে?

__জানিনা দেখি কোন একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।

__ওমা তাও আবার হয় নাকি!! অল্প বয়সী একটা মেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে নাকি!!
তার থেকে বরং তুমি আমার বাড়ি চলো। আমাদের জয়েন ফ্যামিলি, আমি কদিনের জন্য দিদির বাড়ি বেড়াতে গেছিলাম। আমার দিদি কলকাতায় থাকেন, অসুস্থ হয়েছিলেন তাই দেখতে গেছিলাম। তুমি আমার বাড়ি চলো, যতদিন না তোমার সমস্যার সমাধান হচ্ছে। তুমি নির্দ্বিধায় থাকতে পারো মা।

__তা কি করে হয় মাসিমা, হঠাৎ করে আমাকে চেনেন না জানেন না বাড়িতে নিয়ে গেলে বাড়ির লোক যদি উল্টোপাল্টা বলে??

__ওসব চিন্তা করোনা মা, আমার বাড়িতে আমিই কর্তৃ। আমার ওপর কথা বলার সাহস এখনো কেউ করতে পারে না গো। আমি আমার স্বামী, আমার বড় ছেলের বউ, আর আমার ছোটো ছেলে আর দু একজন দেখাশোনার লোক থাকি।

চন্দ্রা কি বলবে কিছু বুঝতে পারছেনা, হঠাৎ করে কাউকে বিশ্বাস করা ওর কাছে এখন খুব ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে।কিন্তু এদিকে কিছু না ভেবে হঠাৎ করে চলে এসে যে ভুল করেছে সেটাও এখন বুঝতে পারছে। অনেক ভেবেচিন্তে দেখল, মহিলাকে দেখে  মা মা ভাব লাগে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়, এই রকম মানুষ যদি ভালো না হয় তাহলে আর কে ভালো হবে? তাই সিদ্ধান্ত নিলো, আর একবার না হয় বিশ্বাস করলাম মানুষকে।

__কিগো মেয়ে চুপ করে আছো কেন? বিশ্বাস করতে বুঝি ভয় হয়? তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। তাছাড়া তোমাকে দেখে আমার বড় মায়া হচ্ছে, ছোটোবেলার বান্ধবী মণির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।

__আচ্ছা ঠিক আছে আমি যাব আপনার সাথে।

এদিকে বিমলবাবু নিজের মেয়ের এরকম কান্ডে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গেছে। কিন্তু তাও তো অরিন্দম দের বাড়িতে জানাতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে অরিন্দমের বাবা মানে নিরঞ্জনবাবু কে সবকিছু ফোন করে বলেন।সবকিছু শোনার প্রায় ঘন্টা খানেকের মধ্যেই নিরঞ্জনবাবু, অরিন্দম আর অরিন্দমের মা বিমল বাবুর বাড়িতে চলে আসে। যখন জানতে পারে অরিন্দম অদিতি পালাতে সাহায্য করেছে। তখন যা নয় তাই বলে অদিতিকে অপমান করে, মুখের ভাষা অতি জঘন্যতম পর্যায় চলে যায়। যতই হোক বিমল বাবু অদিতিকে মেয়ের মত স্নেহ করেন, অদিতি সঙ্গে এরকম আচরণ মেনে নিতে পারেন না।

__আহা অরিন্দম, অদিতির এতে দোষ নেই। আর তাছাড়া কেউ না চাইলে কাউকে দিয়ে কোনো কাজ জোর করে করানো সম্ভব নয় বলে আমি করি।

__দেখুন কাকু, আমি ওসব কিছু জানিনা। আমি এক্ষুনি চন্দ্রার খোঁজ চাই। না হলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।

__অরিন্দম তোমার কি মনে হয় আমরা চন্দ্রা কে লুকিয়ে রেখেছি? দেখো ওর জন্য আমার সত্যিই লজ্জা লাগছে।কিন্তু তোমরা এভাবে জোর জুলুম করলে তো সমস্যা মিটবে না।

বিমল বাবু অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেও অরিন্দম আর অরিন্দম এর বাবা-মা যা নয় তাই বলে বিমলবাবু আর ‌তার স্ত্রীকে অপমান করতে থাকেন। বিমল বাবু নিজের মেয়ের কাজ নিয়ে লজ্জিত হলেও, অরিন্দম দের এরকম ব্যবহার আশা করেন নি। তাই ওনার মনেও কোথায় একটা আশঙ্কা দেখা দেয়” সত্যিই কি এই বিয়েটা হলে ভালো হতো”। অনেক তর্কবিতর্কের পর অরিন্দম  যাওয়ার সময় বলে যায়,

__আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো, চন্দ্রা কে যদি আমি জব্দ না করতে পারি তাহলে আমার নাম অরিন্দম নয়।

অরিন্দমরা চলে যাওয়ার পর অদিতি সবকিছু বিমলবাবুকে খুলে বলে।বিমল বাবু প্রথমে বিশ্বাস করতে না চাইলেও সব শুনে আর আজকের পরিস্থিতি দেখে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। এদিকে চন্দ্রার মাও ঘটনাটা বিশ্বাস করেন যে অরিন্দম হয়তো ভালো ছেলে নয়।

__অদিতি তুই আমার চন্দ্রা কে ফিরিয়ে নিয়ে আয়। আমরা অনেক ভুল করে ফেলেছি। ওর কথা একবারের জন্যও শুনিনি।

চন্দ্রার মা অদিতিকে চন্দ্রাকে ফিরিয়ে আনার কথা বললেও, বিমল বাবু অবশ্য বলেন __না, তার কোন দরকার নেই। চন্দ্রা যথেষ্ট বুদ্ধিমতি মেয়ে, ওর জন্য কোনটা ঠিক কোনটা ভুল ও নিজেই বুঝতে পারবে।আর সবথেকে বড় কথা এখানে ফিরে এলে হয়তো ভালো থাকবে না। পরিস্থিতি বুঝে ওকে ডাকবো।

ওদিকে প্রায় দশটা নাগাদ ট্রেন গিয়ে মদনপুরের স্টেশনে থামে। চন্দ্রা মহিলাটির সাথে ট্রেন থেকে নামে আর দেখতে পায়, একজন অল্প বয়সীছেলে মহিলাটিকে নিতে এসেছে। ছেলেটিকে দেখে যতদূর সম্ভব মনে হচ্ছে উনিই হয়তো মহিলাটির ছোটো ছেলে।

__ছোটো খোকা তুই এসেছিস, আমি জানতাম তুই তোর মাকে নিতে ঠিক আসবি। জানিস এই মেয়েটি চন্দ্রা, খুব বিপদের মধ্যে পড়েছে। তাই আমি বললাম কোন চিন্তা নেই আমার বাড়ি চলো।

__ভালো করেছো মা, আজকের রাতটা না হয় উনি আমাদের বাড়িতেই কাটাবেন। চলো অনেক রাত হয়ে গেলো আমি বাড়ির গাড়ি নিয়ে এসেছি।

__ওমা ও কি বলছিস খোকা, মেয়েটি এখন কিছুদিন আমাদের বাড়ি থাকবে। তোকে আমি বাড়ি গিয়ে সব বুঝিয়ে বলবো।

চন্দ্রা বুঝতে পারে মায়ের কথা ছেলেটির একটু অপছন্দ হয়েছে। আসলে হঠাৎ করে কোন মানুষকে বাড়ি নিয়ে আসা কেউই হয়তো পছন্দ করবে না। ছেলেটি তার মায়ের সঙ্গে আড়ালে গিয়ে কিছু কথাবার্তা বলে। কিন্তু মহিলাটি এক জেদ ধরে বসে আছেন, চন্দ্রা কে উনার বাড়ি নিয়েই যাবেন। তাই উনার ছেলেও সবকিছু মেনে নিতে বাধ্য হয়। মহিলাটিকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে ছেলেটি চন্দ্রার দিকেই এগিয়ে আসলো।

__নমস্কার আমি দিপ্তেশ। মায়ের কাছে আমি সব কিছু শুনলাম। আপনার পরিস্থিতিটা আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি আমাদের বাড়ি থাকতে পারেন। আসলে আমি একটু স্পষ্ট বক্তা,তাই বলছিলাম, আজ কালকের দিনে কাউকে বিশ্বাস করতে খুব ভয় হয়। এইজন্যেই একটু সংকোচ বোধ হচ্ছিল। কিন্তু এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছি, ভুলটা আমারই। আপনি আসুন গাড়িতে গিয়ে বসবেন চলুন।

__হ্যাঁ সে তো জানি। আর সত্যিই তো হঠাৎ করে কাউকে, না শুধু হঠাৎ করে কেন!! অনেকদিন ধরে চিনেও জানা যায় না কে কেমন। আপনারা সত্যিই আমার অনেক উপকার করলেন। ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করবো না। আর নমস্কার আমার নাম চন্দ্রা।

এরপর চন্দ্রা গিয়ে গাড়িতে বসে, আর গাড়ি চলতে আরম্ভ করে। চন্দ্রার জীবনটা কি অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে? এখান থেকে কি নতুন কোন অধ্যায়ের সূত্রপাত হবে? সেটা এখনই বলা সম্ভব নয় হয়তো। কারন জীবনটা যে কখন কিভাবে পাল্টে যায় এক মুহূর্তে সেটা কেউ জানেনা। কিছুক্ষণের আলাপে একটা মানুষ এতোটা আপন হয়ে যেতে পারে,আবার ছোটোবেলার বন্ধুত্ব হঠাৎ করে পর হয়ে যেতে পারে। সবকিছুই অবাক করা ব্যাপার। আধঘন্টা পর গাড়িটা থামে, একটা বড় বাড়ির সামনে। যদি অন্ধকারে বাড়িতে অতটা বোঝা যাচ্ছে না কারণ রাত হয়েছে তো। তাও চন্দ্রা ভালো করেই বুঝতে পারল, মহিলাদের অবস্থা ভালোই। মহিলাটি চন্দ্রকে নিজের মেয়ের মত ধরে গাড়ি থেকে নামালেন। তারপর সামনের গেটটা খুলে দরজায় গিয়ে কলিং বেল বাজাতে লাগলেন।
ভিতর থেকে একজন মহিলা, এই ধরুন বয়স হবে 35-36। হাসিমুখে এসে দরজা খুলল।

__ওমা তুমি এসে গেছো, তোমাকে ছাড়া বাড়ি তো একদম ফাঁকা লাগে জানো। এই মহিলাটি কে মা?

__ও হলো চন্দ্রা বৌমা। কিছুদিন আমাদের বাড়িতে থাকবে বিপদের মধ্যে পড়েছে একটু।

__ও আচ্ছা এসো বোন ভেতরে এসো। ও মিনতি গেস্টরুমটা পরিষ্কার কর।

__কিন্তু বৌদি,গেস্ট রুম পরিস্কার করতে করতে সে তো অনেক রাত হয়ে যাবে।

__হ্যাঁ তাও তো বটে ঠিক বলেছিস, আচ্ছা আচ্ছা ও মা তাহলে আজকে আমার ঘরে থাকুক?

__তোমার এই রকম স্বভাবের জন্যই তো আমার এত ভালো লাগে তোমায়, আমার সোনা মেয়ে। চন্দ্রা তুই এই দিদির ঘরে থাক আজকে।

চলবে…
              পরবর্তী আপডেট আসছে খুব শীঘ্রই ..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *