ভালোবাসার তাজমহল – Valobashar Romantic Premer Golpo Bangla – Govir Premer Golpo

মিতার প্রবল জ্বর।গা পুড়ে যাচ্ছে,অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে,গোঙাচ্ছে পাশে বসে মায়ের মাথায় হাত রেখে বসে আছে সীমা,এবার সে মাধ্যমিক দেবে,তাই পাশে একটা বাংলা বই খোলা আছে।পড়তে আর পারছে কৈ!!!!মায়ের কষ্ট ওর সারা শরীরে সূচ বিদ্ধ করছে।বাবা গেছে ডাক্তার ডাকতে।দুর্যোগের দিন,বাইরে বেশ ঝড় ও বৃষ্টি চলছে, আবহাওয়া ঠাণ্ডা। মায়ের গোটা শরীর ঢেকে দিলো একটা কাঁথায়।

কাঁথাটা তৈরী করেছিলো সীমার ঠাকুমা।কী সুন্দর নকশা করতে পারতো।শাশুড়ি র মিতা অন্ত প্রাণ।ছেলের সাথে ওতো পটতো না।বৌমা ওনার বন্ধুরমতো,মেয়ে বলেই মনে করতো।বৌমার যত্ন দেখে অনেক পাশের বাড়ির চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে যেতো।কেউ বলতো, ঢং দেখে আর বাঁচি নে,আবার বলতো আদিখ্যেতা!নিকুচি সব! শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে শাশুড়ি বৌমার এক মধুর প্রেমালাপ চলতো। বলি সেটা কেমন; দুজনে দুপুরে খেয়ে রোদে পিঠ দিয়ে বসে। বৌমা পান সাজে,শাশুড়ি বৌয়ের ভেজা ছাড়া চুলে আঙুল চালায়,বলে বৌ, ভালো করে চুলটাও আচড়াস নি,সময় পাসনি? ছেলের তো আমার শুধুই ফ্যাচাং!সামলাতে তোর হাড় হিমসিম! বলি চিড়ুনি টা দে; আমি আচড়ে দিই,না হলে এবার তোর চুলে জটা হবে।ওমন সুন্দর একগোছা চুল! কতো সুন্দর লাগে বৌ তোকে।সত্যিই আমি মা লোখ্খী কে ঘরে এনেচি,দিয়ে নিজেই কপালে পেন্নাম ঠোকে।বৌ পান সাজা হলে বলে মা হাঁ করো দেখি, আজ তুমি ডান দিক দিয়ে চিবোবে,আর বাম দিক দিয়ে পিক্ ফেলতে হবে।আমি মাঝে হাঁ করিয়ে দেখে নেবো।না কথা শুনলে! তোমার এক দিন কী আমার।হাঁ রে বৌ কতা না শুনলে কী করবি? তুই আমাকে এক বিন্দু কষ্ট দিস নে,আগলে রাখিস।মহাদেবের বাপ্ চলে যাওয়ার পর ভেবে ছিলুম কী নিয়ে বাঁচবো! ছেলে তো আমার চণ্ডালে রাগ,কিচু বলার জো নাই,ভয়ে ভয়ে কেঁচো হয়ে থাকতুম।তুই এলি, আর এখন আমি খুব ভালোআছি রে,বৌ নিজের মুখে পান পুরে বলে, তা  মা হয়ে ছেলেকে ভয় পাও কেনো শুনি? তোমার সন্তান,তোমার হাজার জোড় আছে, তুমি গুরুজন কতা শুনবে না কেনো? আর বলিস নে,একদিন তোর শ্বশুড়ের কাছে বকা খাওয়ার পর আর আমি ওর সাথে মুখ তুলে কতা কই নি।ছেলেও তো তেমন! বলি বৌ তোর যেন একটা মেয়ে হয় নাম রাখবি, সীমা।

বলি কেনো?ছেলে হবেনেকো বুঝি….না রে মেয়ে হলে তোর মতো ওমন সুন্দর হবে,লোখ্খী  হবে।সবাই কে ভালোবাসবে,আগলে রাখবে।আর ছেলে হলেই তো মহাদেবের বাপের মতো!বাপ্ রে থাক।বলি শোন, পেটে এলেই আমি যা যা বলবো তাই তাই করবি।যে দিন সু খবরটা দিবি, আমি আমার জমানো টাকা থেকে মিষ্টি মুখ করাবো।আর ঘরে আরেক মা লোখ্খী   এলে তখন আমার বিয়ের ৫ ভরি হারটা ওর গলায় পরিয়ে দেবো।বাকী গুলোতো সবই তোর রে বৌ।বৌ এবার তেলের বাটি নিয়ে বলে, পা দাও দেকি, একটু তেল মালিশ করে দিই।আর শোনো কাল তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো ডাক্তার আসবে, তোমার চোখ টা একবার পরীক্ষা করতে হবে,ঝাপসা দেখোতো।আরে ধূর মেয়ে,  আমি বুড়ি মানুষ,যে টুকু দেখি ওতেই হবে,তুই একটু শরীরে যত্ন নে বৌ।আমি তোকে রান্না করে,খাওয়াবো।সব সেরে নিজের পেটে দেওয়ার জন্য তো কিছু রাখিস নে। সব এই ঝাপসা চোখে দেখি!  বৌ বলে অ এবার বুঝলাম, কেনো তুমি শেষে খাবার রেখে বলো, ও বৌ আমার পেসাদটা খাবি।আমি আর খেতে পাচ্ছি না।দাঁড়াও বুড়ি তোমার একদিন কী আমার একদিন, কোমরে কাপড় গুজছে এদিকে বুড়ি জড়িয়ে ধরে, আমার সোনা বৌ,আমার মনা বৌ বলে এই আদর।।বৌয়ের তো চোখে জল টপ্ টপ্ করে পড়ে।এই রকম ভালেবাসা সে তার স্বামীর কাছেও পায় না।যেন দুবছরে এনার জন্যই থাকা এই রকম অবস্থা।

যত রাত হয়, ততো কাতরানি বাড়ে,সীমা কী করবে ভেবে পায় না।কপালে হাত দেয়,একটু গরম জল খাওয়ায়।  মা,মা, মা,বলে ডাকে ঘোরের মধ্যে বলতে থাকে বৌ কে তুমি খুব ভালোবাসতে না! তুমি চলে গেলে কেনো মা.!আমাকে ছেড়ে,তোমার লক্ষ্মী নাতনী কে ছেড়ে? ভালো আছো! আমার যে আর কেউ নেই গো! ছোটো থেকেই নিজের মা,বাপ সব গেছে,৷ মামার কাছে মানুষ,সেই মামাও নেই! কে আসবে কে দেখবে গো! আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চলো মা, আমরা সেই তাজমহলের গল্পটা করবো!

তাজমহল, তাজমহল…আবার সংজ্ঞাহীন।আসলে বুড়ি মারা যাওয়ার পর থেকেই নিজের যত্ন না নিয়ে,মনঃকষ্টে তিলে তিলে নিজেকে একপ্রকার শেষ করেছে।বাবা এখন বেশ নেশা করে রাতে বাড়ি ফেরে, সীমা মা কে কোনোদিন তার বাবার সাথে চিৎকার করতে শোনেনি।বন্ধ দরজায় কান লাগিয়ে শুনেছে, ভিতরে আর্ত কান্না,কিন্তু বড় ক্ষীণ,বাবার উচ্চ স্বরে গালিগালাজ।সীমাও আজকাল থমকে থাকে।মায়ের শারীরিক অসুস্থতা কে বাবা গুরুত্ব দেয় না ।দিনের পর দিন জ্বর আসছে কোনো দিন দেখেনি বাবাকে মায়ের কাছে যেতে,কপালে হাত রাখতে,যত্ন করতে।তাই মেয়েটি যেমন পারে তেমন করে।ওর মায়ের কাছে কী শীত কী গ্রীষ্ম! ঐ কাঁথাখানা সাথে থাকে, মা বলে গায়ে লাগালে শাশুড়ি মায়ের স্পর্শ পায় সে। সীমা ভাবে যেটা তে মায়ের ভালো লাগে তাই করুক।ঠাম্মার সম্বল বলতে আছে এই নকশা করা কাঁথাটি,আর সোনাদানা সব বাবা উড়িয়েছে। কাঁথায় নাম লেখা- “আমার মিতা বৌ।”

এদিকে মায়ের মুখেই শুনেছে ঠাকুমা মাকে তাজমহলের গল্প বলেছিলো আর বলেছিলো, শাহজাহানের মমতাজ বেগমের প্রতি ভালোবাসার স্মৃতি সৌধ।বুড়ি নাকি রোজ ছবি তে দেখা তাজমহলে ঘুরে বেড়াতো।দেওয়ালে কান রেখে, মহাদেবের বাবার কন্ঠ শুনতে পেতো! বৌ কে সে বলতো বুঝলি বৌ৷ তুই ও স্বপ্নে কান পেতে দেখ, মহাদেবের ভালোবাসার কন্ঠস্বর বুঝতে পারবি। খুব হেসেছিলো মিতা আর বলেছিলো, তুমি আমার পাগল মা।বুড়ি না কী ফোকলা দাঁতে চশমা আঁটা চোখে খিল খিল করে হেসে বৌয়ের থুতনি ধরে চুমু খেয়েছিলো। গত দুবছর ধরেই সীমা মায়ের কাছে সব শোনে মা বলে আর লুকিয়ে কাঁদে।একদিন তো মাকে দেখেই ফেললো সীমা ঠাম্মার কাঁথাখানা দুহাতে জড়িয়ে বুকে চেপে অব্যক্ত যন্ত্রণাগুলোর আর্তনাদ ফুটে বেরোচ্ছে। সীমা মাকে আটকায় নি।।ও বড় হয়েছে বোঝে সব।ঠাম্মার ও লোখ্খী যে। তাহলে সংসারে এতো দুর্দশা কীসের? এই প্রশ্ন মাকে করাতে ওর গালে একটা সজোরে চড় দিয়েছিলো মা। দুজনেই কেঁদে ফেলেছিলো, দুজন দুজন কে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলো

বাইরে প্রবল ঝড় এই কয়দিনে মায়ের বিছানা নেওয়াতে বাবাও কেমন বোবা হয়েগেছে। দিন রাত বাড়িতেই থাকছে, আর মাথা ঘাড় গুজে দুই হাঁটুর মাঝে রেখে চুপ করে বসে আছে। আজকে প্রবল বাড়াবাড়িতে পাশের গ্রামের ডাক্তারের কাছে ছুটেছে,কখন যে আসবে!মাথায় জলপট্টি লাগায় সীমা কাঁথা দিয়ে আগাগোড়া ঢেকে দেয়, কাঁপুনি দিচ্ছে মায়ের।কী করবে? ভেবে কুল পায় না। মায়ের গলায় বেশ ঘর্ ঘর্ আওয়াজ।গত কয়েকদিনের ডাক্তারবাবুর ওষুধ চলছে, আজ সব ওষুধ দেওয়া হয়েছে,রাতে একটা বাকী মায়ের মুখে জল দিলে একটু যাচ্ছে তো বাকীটা গড়িয়ে পড়ছে, এরই মাঝে দু বার তাজমহল….তাজমহল বলেছে যদিও খুব স্পষ্ট নয়…..

বাবা সজোরে ঘরে ঢুকে পাঁজা কোলা করে তুলে নিল, সীমা কে বললো, তুই ছাতা নে.ডাক্তার আসবে না ভ্যানও এলো না! আমি হেঁটেই নিয়ে যাবো। তুই, মায়ের মাথা টুকু যেন না ভেজে লক্ষ্য রাখবি। মাকে কোলে তুলতে গিয়ে বাবাও কেঁদে ফেললো।সীমা নির্বাক নিস্তব্ধ। চললো….বৃষ্টি পড়ছে……
কিছুটা যেতেই মায়ের মুখ থেকে আওয়াজ,তারপর থেমে গেলো, বাবা কী বুঝলো!নামিয়ে কোলে মাথাটা রেখে বসে পড়লো জলকাদায়।সীমা ছাতা ধরে হাঁটু মুড়ে বসে, শেষ সব শেষ……বলে বাবা হঠাৎ ই নির্বাক,যেন মূক বধির।সীমা মায়ের মুখের দিকে ছাতাটা ভালো করে ধরে…..বাবার কোলে যেন নিশ্চিন্তে শুয়ে ঠাম্মার কাঁথা মুড়িয়ে তাজমহলে পৌঁছে গেছে……এর পর বাবার দিকে তাকাতে গিয়ে দেখে ভিজে একশা দেহ টা ধপাস্ করে পড়লো! কাদাজল ছিটকালো,কিছুটা সীমার গালেও, সীমা ছাতা ধরে বাস্তবের ভেজা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে,  ছাতার ওপর বৃষ্টি পড়া শব্দগুলো শুনতে শুনতে অন্ধকার দৃষ্টি নিয়ে………

1 thought on “ভালোবাসার তাজমহল – Valobashar Romantic Premer Golpo Bangla – Govir Premer Golpo

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *