নীল আকাশের নিষিদ্ধ রং – বাংলা উপন্যাস – Bangla Uponnash Download – Bengali Novel pdf

(সব চরিত্র কাল্পনিক নয়)

                                    ১
           পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া প্রায় নিভে আসা সূর্যটা ক্রমাগত সন্ধ্যা রাগিনীর জালে জর্জরিত হতে হতে ঘুমিয়ে পড়ছে রাত্রির কোলে।রবীন্দ্র সরোবরের শেষের দিকের একটা বেঞ্চে পলকহীন চোখে বসে আছে আকাশ।চোখ দিয়ে নোনা জল হয়তো ওর অজান্তেই চিবুক বেয়ে নেমে আসছে।মন টা বার বার চিৎকার করে বলতে চাইছে”কেন আমি সবার মতো নয় ?কেন? কেন?” কিন্তু ঠোঁট দুটো শিকল তুলে দিয়েছে বোধ হয়…সকালে ঠোঁট দুটোর অতি সাহসিকতার পুরস্কার স্বরূপ নীলের হাতের চড়টা সজোরে এসে পড়েছিল গালে।তারপর থেকেই রা কাড়ার ক্ষমতা নেই আর ওর।
হ্যাঁ,নীল ওর খুব ভালো বন্ধু,খুব ভালো,কিন্তু আকাশ যে আরো বেশি কিছু ভাবতে শুরু করেছিল,ভালোবাসতে শুরু করেছিল আকাশ নীলকে।চমকাবেন না,মনে মনে ছি ছি  বলবেন না,ভালোবাসা তো কোনো অপরাধ নয়,আর একটা ছেলে কেন আরেকটা ছেলেকে ভালোবাসতে পারবেনা!যদিও আমাদের সমাজের চোখে এখনও তো এটা গর্হিত অপরাধ..কিন্তু আকাশ তো মনে প্রানে ভালোবাসে নীলকে,নিজের মনের আকাশকে নীলিয়ে দিতে চেয়েছিল কিন্তু নীল পারেনি,সব প্রেম তো কিনারায় পৌঁছাতে পারে না,আকাশের জন্য এটাও সেইরকম একটা প্রেম যেটা জন্মলগ্ন থেকেই ছিল  ভীষণভাবে অপাংতেয়।
    ঠিকই করেছে নীল,এমন অলক্ষুনে আবদার করা মোটেই ঠিক হয় নি তার।কিন্তু দিনের শেষে, সকল ব্যস্ততার শেষে আর নিজেকে সামলে রাখার ক্ষমতা নেই আকাশের।নীল সত্যিই কখনও মেনে নেবে না,বুঝে গেছে আকাশ,তাই নিজের উপরই এক অকথ্য সহানুভূতির চাদর জড়িয়ে নিচ্ছে এই সন্ধ্যায়।সেই মুহূর্তে একটা হৃদ্যতাপূর্ণ হাতের ছোঁয়া এসে লাগলো ওর কাঁধে,একটি সৌম্যকান্তি পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছে তার পিছনে।তার পাশে বসার অনুরোধটুকু উপেক্ষা করতে পারলোনা আকাশ।সেই পুরুষ নাকি তাকে অনেকক্ষন থেকে লক্ষ্য করেছেন,তারপরই এসে বসেছেন তার পাশে।কথায় কথায় আকাশ তার নাম জেনে নেয়, পলাশ সেনগুপ্ত,অনামী চিত্রশিল্পী একজন।

                                     ২

                  সকালে আকাশের বাক্যবাণগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল নীলের মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলোকে।অফিসের প্রথম দিন থেকেই আকাশ ওর খুব ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিল ,সব কথাই শেয়ার করতো দুজনে,তাই বলে এরকম ভাবনা আকাশের মনে কবে থেকে বাসা বেঁধেছিল তা টের পায়নি নীল।এখনও খুব ভালোবাসে আকাশকে,তবে বন্ধু হিসাবেই।সকালে ওভাবে চড় মারাটা সত্যি একদম উচিত হয়নি নীলের।আকাশের ক্রাইসিসটা কেন বোঝার চেষ্টা করলো না ও!কিন্তু বুঝেই বা কি করবে? ও যে উপাসনাকে  ভীষণ ভালোবাসে,কদিনের মধ্যেই ভেবেছিল আকাশকে সব বলবে।আর কেউ না বুঝুক আকাশ অন্তত নীলকে বুঝবে এই আশা বুকে বেঁধে মনে প্রানে ভালোবেসে গেছে উপাসনাকে।রাস্তাটা ভীষণ দুর্গম,সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করা ওর জন্য সহজ হলেও উপাসনা কিছুতেই মানবে না,আর নিজের বাবা মাকেই বা কি বলবে! একটা বিধবাকে ও ভালোবাসে,তাকে ও জীবনসঙ্গিনী করতে চায়!কিন্তু ওর চোখে ,মনে, মস্তিষ্কে যে শুধু একটা  অতি সাধারণ নারীর ভেজা চোখের মলিন অবয়বটা ভেসে বেড়ায়।ছাদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত  সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে নীল।এই অসীম আকাশ যদি আজ ওকে বুকে টেনে না নেয় তবে কিভাবে কাল আবার রক্তমাংসে গড়া আকাশ নামক মানুষটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে সে।জীবনের এ কোন জটিল ধাঁধায় ও এসে পড়লো ভাবতে ভাবতেই চোখের কোন গুলো ভিজে উঠতে লাগলো।

                                 ৩

আর একটা দিন পর দোল। আকাশ ,বাতাস, মন সব কিছু রেঙে ওঠার দিন,আকাশ ভেবেছিল নিজেকে ওই দিন নীল অবিরে নীলিয়ে দেবে,তা হবার নয় ,খুব কঠিন স্পষ্টভাবে তা বলে দিয়েছিল নীল।কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় জীবনে আসা নতুন অতিথিকেও তো ও এর অগ্রাহ্য করতে পারছেনা।সেই পুরুষ যথার্থই মানুষ যে নীলের জন্য আকাশের মনের রক্তক্ষরণটা বুঝতে পেরেছে এবং যথাযথ মরমপট্টি করারও প্রয়াস করেছে।সেই পুরুষের আন্তরিকতা প্রমাণে সামর্থ হয়েছে যে বন্ধুত্ব শুধুমাত্র দীর্ঘসময়ের উপর নির্ভর করে না,একটা সন্ধ্যার ছোট্ট আলাপচারিতাও বন্ধুত্বের দাবি রাখতে সক্ষম।এইসব ভাবতে ভাবতেই অফিসে পৌঁছে গেছিলো আকাশ,হটাৎ পিছন থেকে ডেকে উঠলো নীল..
-“আকাশ দাঁড়া,কথা আছে তোর সাথে,”
নীলের সম্মুখীন হবার ভয় নাকি লজ্জা ওর পা গুলোকে ক্রমশ আড়ষ্ট করে দিচ্ছিল।তার সত্ত্বেও পিছন ফিরে দাঁড়ালো আকাশ,”বল,কি বলবি?”
-আমাকে ক্ষমা করে দিস, কাল তোকে চড় মারাটা একদম উচিত হয়নি আমার।
-না,না,কি বলছিস এসব,ঠিকই করেছিস।আমার শিক্ষা পাওয়াই উচিত।
-না রে,হটাৎ ওরকম কিছু শুনে মাথা ঠিক রাখতে পারিনি আমি।আর তুই যে ওরকম কিছু ভাবিস স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা কখনও।
-সত্যি রে।আমি কেন যে আর পাঁচজনের মতো হতে পারলাম না!তুইও আমাকে ক্ষমা করে দিস নীল।
-তুই আমার বন্ধু ছিলিস,আর ভবিষ্যতেও থাকবি।হয়তো তুই যেভাবে চেয়েছিস সেই ভাবে তোর সাথে থাকতে পারবোনা কিন্তু বন্ধু থাকবো আজীবন।
-বেশ,তাই হবে।আর শোন…আমাকে খারাপ ভাবিস না প্লিজ,নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থায় ছিলাম না।তাই হয়তো বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছি।
-প্লিজ,এসব বলিস না,তোকেও আমার কিছু বলার ছিল।মানে একজনের সম্পর্কে বলার ছিল।আগের মতো বন্ধুত্ব টা মনে রেখে যদি একটু শুনিস!এখন না বললে অনেক দেরী হয়ে যাবে রে!আমি হয়তো তার জন্যই তোর অনুভুতিটা কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারছি।
মৃদু একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে আকাশের মুখে,সেই রেশ ধরেই বলে”বল,কে সে?” শুনে আকাশ মাথাটা নিচু করে বলে,
-তোকে একবার উপাসনার কথা বলেছিলাম,মনে আছে?
-আরে সেই তোর ঠাম্মি যে অনাথ আশ্রমের সাথে যুক্ত সেখানের শিক্ষিকা তো?
-একদম ঠিক বলেছিস,ওই
–আচ্ছা ,তাহলে এই ব্যাপার,কিন্তু…
-,হ্যাঁ,ও বিধবা,তার জন্য তো ও কোনোভাবে দায়ী নয় বল?প্রেমের অধিকার তো সবার ,বল তুই?তাই নয়?
-সে তো অবশ্যই নয়।ওর সাথে কথা বলেছিস ?কি বলছে ও?
–ওকে কোনোভাবেই রাজি করাতে পারিনি, ও যদি একবার রাজি হয় আমাকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে আমি এই সমাজকে তোয়াক্কা করিনা,মা বাবা যদি নাও মেনে নেয় তাহলেও না।
নীলের কথা শুনে হেসে ফেলে আকাশ।মনে মনে ভাবে সেও তো নীলকে এভাবেই চাইতো,সমাজের তোয়াক্কা না করেই।কিন্তু ওর কপালটা সত্যি খারাপ।যায় হোক,নীল যার সাথে থাকুক, যেন খুশি থাকে।এটুকুই চায় ও।অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ টা ভিজে যায় আকাশের।নীলকে আড়াল করে চোখটা মুছে নিয়ে বলে
-যদি তুই সম্মতি দিস,বিশ্বাস করিস আমাকে,তাহলে একবার কথা বলতে পারি উপাসনার সাথে।
–সত্যি তুই বলবি?রাজি করাতে পারবি ওকে?
বলতে বলতেই আকাশকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে নীল।আকাশ পরম মমতায় কাছে টেনে নেয় নীলকে।মনে মনে ভাবে আজ উপাসনাকে নিয়ে সাজানো ভালবাসার পসরাকে নীল তুলে ধরেছে তার সামনে ।এমন এক পসরা যা আপন করে নেওয়ার মতো কিছুই নেই আকাশের তাও যেন নীল অনেকখানি আশা নিয়ে প্রকৃত বন্ধুত্বের দাবি রেখেছে সামনে, শুধু আকাশের সম্মতি দেয়ার অপেক্ষা।মনটা যেন অদ্ভুত এক বেদনায় ভরে যাচ্ছে আকাশের।তবুও নীলকে কথা দেয় পরের দিন দোল, সেই দিন ই সেও যাবে নীলের সাথে যাবে উপাসনার কাছে।প্রেম না হোক নীলের বন্ধুত্বটা কিছুতেই হারাতে পারবেনা ও।নীলের মুখও যেন অনুশোচনার মেঘ সরিয়ে খুশির রোদে উজ্জ্বল হতে ওঠে।তারপর দুজনেই ডুবে যায় কাজের ব্যস্ততার মাঝে।সন্ধ্যাবেলায় বাজারের পাশের রাস্তা দিয়ে বাড়ী ফেরার পথে নীল কিনে নেয় লাল রঙা আবীর, উপাসনার ওই বিবর্ণ বেশ লাল রঙে রাঙ্গিয়ে দেবে কাল,সমাজের তোয়াক্কা করে না ও,শুধু চায় উপাসনা যেন প্রতিবারের মতো ফিরিয়ে না দেয় ওকে।বিয়ের এক বছর পরই একটা এক্সিডেন্ট এ মারা যায় ওর স্বামী ,যথারীতি স্বামীর পরিবার ওই অলক্ষনে বউকে বাড়ী থেকে বের করে দিলে বাবার কাছে ফিরে আসে উপাসনা।তার কিছুদিন পরই এই ছোট্ট অনাথ আশ্রমে যোগ দেয়।আশ্রমের ছোটছোট বাচ্ছাগুলোই এখন ওর সবকিছু,বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ।নিজেকে বাইরের জগৎ এর জাঁক জমক,চাকচিক্য থেকে শত যোজন দূরে রাখলেও নীলের ঠাম্মি মারফৎ আলাপ হয় দুজনের।তারপর উত্তরাত্তর নীলের মনে উপাসনার প্রতি প্রেম চারাগাছ থেকে আজ মহিরুহতে পরিণত হতে সময় বেশি লাগেনি।উপাসনাকে বার বার বলার চেষ্টাও করেছে কিন্তু কোনো সদর্থক উত্তর যে সে পাবে না তা উপাসনা বুঝিয়ে দিয়েছে।নীল জানলই না যে উপাসনা মনে মনে নিগূঢ় ভাবে অনুধাবন করেছে  নীলের ভালোবাসাকে,সেও যে ডুবতে বসেছে নীলের প্রেমে ,কিন্তু মনে আশ্রয় দিলেও তার এই বৈধ্যব্যের ছায়ার কিছুতেই নীলকে বসতে দিতে পারবেনা।রক্তক্ষরণ তো তার মনেও হচ্ছে কিন্তু তা প্রকাশ করার অধিকার নেই তার মতো বিধবার,যাকে ভালোবাসে তার কাছেও না।
           পূর্বদিনের সায়াহ্নে  পলাশকে দেয়া কথা রাখতে আকাশ আবার হাজির হয়েছিল রবীন্দ্র সরোবরের ধারে।সেই জাদুকর যে এক লহমায় আকাশের দুঃখ গুলোকে ভ্যানিশ করে দিতে পারে।সেই পুরুষ যখন নির্ভরতার হাতটা রেখেছিল আকাশের হাতে সেই ছোঁয়া চিনতে এতটুকু দেরি হয়নি আকাশের।পলাশ তো সেই পুরুষ, যাকে এতগুলো দিন নীলের মধ্যে খুঁজে ফিরছিল আকাশ।কিন্তু এত সহজে কি মন থেকে নীলকে মুছে ফেলতে পারবে আকাশ!তবে পলাশ ভীষণভাবে বদ্ধপরিকর,আকাশকে সে নীলিয়ে দিতে না পারলেও পলাশের আগুন রঙে ভরিয়ে দিতে সে পারবেই।

                                     ৪
         ঘড়ির কাঁটা প্রায় সকাল ৮টা ছুঁই ছুঁই।রাধেশ্বরী  অনাথ আশ্রমের নির্দিষ্ট একটি ঘরের  খোলা দরজায় এসে দাঁড়ায় আকাশ।ভিতরে টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছেন এক ব্যক্তিত্ত্বময়ী নারী।খাতা পেন নিয়ে কাজে ব্যস্ত। চুলটা বেনী করা ,শান্ত কোমল মুখের দীর্ঘ কাজলকালো চোখগুলো খাতার উপর নিবদ্ধ।একটা আলগা গাম্ভীর্য ঝরে পড়ছে যেন তার  থেকে।দরজায় টোকা পড়তেই চোখ তুলে তাকায় উপাসনা।”যথার্থ নাম তোমার  “মনে মনে বলে ওঠে আকাশ।
-ভিতরে আসতে পারি?
–আসুন,বসুন বলে টেবিলের এই প্রান্তে রাখা চেয়ারটা দেখিয়ে দেয় উপাসনা।তারপর বেশ অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে বলে
–কিছু যদি মনে না করেন,একটু তাড়াতাড়ি বলবেন কি কারণে এসেছেন।বাচ্ছাদের নিয়ে আজ একটা দোল উৎসবের অনুষ্ঠান আছে।
–অবশ্যই, আগে আমার পরিচয় টা দি, তারপর কাজের কথায় যাবো।
-অবশ্যই ,বলুন
-আমি আকাশ,নীলের বন্ধু।
এতটুকু শুনেই চমকে ওঠে উপাসনা।গাম্ভীর্যতা আরও একটু বাড়িয়ে নিয়ে বলে
–কেন এসেছেন আপনি?নীলের হয়ে ওকালতি  করতে?আমি কিন্তু কখনোই ওর প্রস্তাবে রাজি হবোনা।
-আচ্ছা বেশ,আমি আর কিছু বলবোনা কিন্তু প্লিজ ,আপনি শান্ত হোন।আর যদি অনুমতি দেন তাহলে আর একজনকে ভিতরে ডেকে নিতে পারি কি?
-তাহলে একা আসেননি।সঙ্গে করে সাকরেদকেও এনেছেন।এসেই যখন গেছে তখন আর অপেক্ষা না করিয়ে ডেকে নিন।তাড়াতাড়ি যা বলার বলে ফিরে যান।আমি খুব ভদ্রভাবে বলছি আকাশ বাবু,দয়া করে আমাকে নীলের সঙ্গে জীবন জড়াবার পরামর্শ দেবেন না।কেন আমাকে আমার মতো থাকতে দিচ্ছেন না আপনারা?বিশ্বাস করুন আমি কারো করুনার পাত্রী হতে চাইনা।বলে দেবেন আপনার বন্ধুকে।
–বলে দেবো, যা যা বললেন সব অক্ষরে অক্ষরে বলবো,কিন্তু একবার আমার এই বন্ধুটির সঙ্গে একটু কথা বলুন।বেশী সময় নেবো না।
    বলেই ফোনের একটা নির্দিষ্ট নম্বর ডায়াল করে  আকাশ।সঙ্গে সঙ্গেই সেই আগন্তুক  দরজায় এসে দাঁড়ায়।দেখে প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে উপাসনা।আগন্তুক হাসতে হাসতে ঢুকে আসে ঘরের ভিতর।পাহাড়ী ঝর্ণার মতো কলকল করে ওঠে উপাসনা।কিছুক্ষন আগের গাম্ভীর্যতাকে ঢেকে দিয়ে বালিকাসুলভ আনন্দে ঝলমলিয়ে ওঠে উপাসনা।বলে
–আরে,তুই..কোথায় ছিলিস এতদিন,সেই যে কলেজ শেষ করে ডুব দিলি আর কোনো খোঁজ পেলাম না।সবাই অনেক চেষ্টা করেছিল ,কিন্তু তুই তো তোর বাড়ির ঠিকানাও বদলে নিয়েছিলিস।বিশ্বাস কর পলাশ,তোকে দেখে আজ এত আনন্দ হচ্ছে যে কিভাবে প্রকাশ করবে বুঝতেই  পারছিনা।
 –তেমনই তো কথা ছিল বন্ধু,পলাশের আগমন তো বসন্তেই হয়,বলে দু গালে টোল ফেলে হেসে ওঠে পলাশ।সেই হাসির দিকে চেয়ে এক অনাবিল মুগ্ধতায় ভরে যায় আকাশের মন।কিন্তু পলাশ যে উপাসনার কলেজের বন্ধু সেটা সে জানতোনা।শুধু নীলের  কথাগুলো বলতে বলতেই উপাসনার কথা কিছুটা বলেছিল পলাশকে।এবার পলাশ হাসতে হাসতেই উত্তর দেয় উপাসনার,
–ওই ঘটনার পর আর চেনা লোকজনের ভিড়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল না,অতোটা অপমান মনে হয় আমি ডিসার্ভ করিনি।স্যার আমাকে যেটা করেছিলেন সেটা তোদের সবাইকে বলেছিলাম,খুব বোকা ছিলাম,কেউ বিশ্বাস করলোনা, এমনকি তুই আমার মতো কাছের বন্ধু হয়েও করলি না।আসলে আমাকে বিশ্বাস করলে যে স্যারকে অবিশ্বাস করতে হতো যেটা তোদের কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।তাই কোনোমতে লাস্ট ইয়ারটা শেষ করেই দিল্লিতে বাবার কাছে চলে গেছিলাম।আচ্ছা পুরানো রক্তাক্ত অতীতকে আর না টেনে আনাই ভালো।আমি এখন যেমন আছি খুব ভালো আছি।
–সেতো দেখতেই পাচ্ছি।কি হ্যানসাম হয়ে গেছিস রে তুই,আচ্ছা এবার বলতো এই আকাশ বাবুর সাথে তোর আলাপ হলো কি করে!বলে চোখ পাকিয়ে তাকায় আকাশের দিকে।
–তুই আর ওই বেচারা কে ভয় দেখাসনা।ওর সাথে আমার আলাপ পর্ব পরে শোনাবো তোকে।আগে যে জন্য এসেছি সেটা বলি।আকাশের মুখে যখন তোর কথা শুনি আমি বুঝেই নিয়েছিলাম তোর কথাই বলছে ও।তোরা আমার খবর না জানলেও আমি কিন্তু তোদের সবার খবর রাখতাম।তোর বিয়ে, দুর্ঘটনা তারপর এই আশ্রমে চলে আসা।কিন্তু কারো চলে যাওয়া মনে তো এই নয় যে জীবন সেখানেই থমকে থাকবে!Life must go on…..শুধু যে খাত শুকিয়ে গেছে তাকে ছেড়ে অন্য খাতে জীবনকে প্রবাহিত করতে হবে।নদীকে তো মোহনায় আসে দাঁড়াতেই হবে তাহলে কেন সেই আসার পথ টা সুন্দর শস্য শ্যামলা করে তুলবেনা? নীলের প্রেম সেই গভীর খাত যাকে সঙ্গে নিয়ে তুই জীবনটাকে দিনের শেষে মোহনায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবি।নীল খুব ভালো ছেলে উপাসনা।ও তোকে সত্যি ভালোবাসে।কেন ওকে আপন করছিস না?
এই কঠিন প্রশ্নের সামনে নিজেকে আর দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে পারে না উপাসনা।জমিয়ে রাখা অশ্রুধারা দু চোখ ছাপিয়ে নেমে আসে।দু হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলে ও।কাঁদতে কাঁদতেই বলে..
-আমি তো বিধবা রে! নতুন করে কাউকে ভালোবাসার অধিকার নেই আমার।স্বামী মারা যেতে কম গঞ্জনা তো শুনতে হয়নি আমাকে!সবাই বললো,আমি অলক্ষুনে,তাই বিয়ের এক বছরেই স্বামীকে খেয়েছি।বিশ্বাস কর পলাশ আর সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলাম,পারলাম না রে,বাবা মায়ের মুখ টা ভেসে উঠলো চোখের সামনে।আমার জন্য তো ওদেরও কত অপমান সহ্য করতে হয়েছে,তাও ওরা আমার হাত ছেড়ে দেয়নি।কিভাবে নিজেকে শেষ করতাম ! কিভাবে ওই দুটো মানুষের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিতাম।এখন এই আশ্রম,এই ছোট্ট ছোট্ট ফুলের মতো অনাথ শিশু গুলোকে নিয়ে বেশ আছি।আর জীবনটাকে জটিল করতে চাইনা।নতুন করে কারও সাথে জীবনকে জড়িয়ে বাবা মাকে আর অপমানিত করতে পারবোনা রে। সমাজ আমাকে আবার রক্তচক্ষুর সামনে বসাক চাইনা আমি।
 বলে চোখটা মুছে নেয় উপাসনা।এই উপাসনাকে ভাঙা খুব মুশকিল।আঘাত পেতে পেতে কঠিন হয়ে গেছে বাইরেটা।বাইরের শক্ত অবরণটা ভেঙে বের করে আনতে হবে সেই পুরনো কোমল মেয়েটাকে।এতক্ষন আকাশ শুধু দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল।নীরবতা ভঙ্গ করে বলে উঠলো…”যে প্রেম তোমার সামনে আজ হাত পেতে দাঁড়িয়েছে তাকে ফিরিয়ে দিও না উপাসনা।ভালোবেসেও যদি বিনিময়ে অবজ্ঞা জোটে তবে তা একটা মানুষকে শেষ করার জন্য যথেষ্ট।এই কষ্ট আমি বুঝি।আর কিছু বলবোনা আমি।নীল খুব ভালোবাসে তোমাকে।নিজের হৃদয় নিংড়ে দিয়ে ভালোবাসে।আজ সে তোমার সামনে এসে দাঁড়ালে তোমার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিও তাকে।কেমন!” বলে চোখ মুছতে মুছতে ঘরের বাইরে চলে যায়।পলাশ  আকাশের বেরিয়ে  যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল এক দৃষ্টে।আকাশ চোখের আড়ালে চলে গেলে উপাসনার দিকে ফিরে তাকায় পলাশ।
–তুই কি সত্যি নীলকে গ্রহণ করতে চাস না? নাকি…
–আমি আমার মতো বাঁচতে চাই পলাশ।উপাসনা হয়েই বাকি জীবনটা কাটাতে চাই স্বাধীনভাবে,আত্মসম্মানের সঙ্গে….কারো বউ হয়ে বা প্রেমিকা হয়ে নয়।আশা করি উত্তরটা পেলি আমার…
–কি বলছিস উপাসনা? প্রকৃত প্রেম কখনও আত্মসম্মানকে নষ্ট করে না,স্বাধীনতা খর্ব করে না,বরং তাকে শান দিয়ে আরো বেশি ক্ষুরধার করে তোলে।কাউকে অবলম্বন করে নয়,কারো সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত ভালোবাসা।তুই যদি আজ নীল কে ফিরিয়ে দিস তাহলে নিনেই নিজেকে ঠকাবি।যাকে এত ভালোবাসিস তাকে শুধু সমাজের দোহাই দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখতে পরিসনা।
        পলাশের শেষ কথাটা শুনে চমকে ওঠে উপাসনা।যা এতদিন শুধু মনে ছিল,মুখে উচ্চারণ করতেও ভয় পেত ও,সেই কথাটাই আজ যেন আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে অনুরণিত হচ্ছে তার হৃদয়ে।এমন করে সত্যকে নগ্ন করতে পলাশই পারে।আর কিছু বলার ক্ষমতা নেই উপাসনার।টেবিলের উপর মাথাটা রেখে ডুকরে কেঁদে ওঠে ও।পলাশ বোঝে,এই কান্না দুঃখের নয়,হেরে যাওয়ার নয়,এ কান্না নীলের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার ।নাঃ,এবার উপাসনাকে  এক ছেড়ে দেয়া তা খুব দরকার।আত্মউপলব্দি না হলে ও কখনোই মন থেকে নীলের ভালোবাসাকে গ্রহণ করতে পারবে না।এটা ভাবতে ভাবতেই উপাসনার মাথায় একবার হাত বুলিয়ে বেরিয়ে আসে পলাশ।বাইরে দাঁড়িয়েছিল আকাশ।শক্ত করে ওর হাতটা ধরে পলাশ এগিয়ে যায় আশ্রমের অনুষ্ঠানের দিকে।

                                ৫

         আকাশ সত্যি আজ ভীষণ খুশি।নীল উপাসনার কাছে পৌঁছানোর আগেই যা করার করতে হবে ভেবেই সকাল সকাল চলে এসেছিল আশ্রমে,সে করতে পেরেছে যা করতে চেয়েছিল।অবশেষে উপাসনা কে রাজি করাতে পেরেছে।তার মনে নীলের জন্য বয়ে চলা প্রেমের ফল্গুধারাকে বাইরে টেনে বের করে আনতে পেরেছে।তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তার পলাশ জাদুকরই একমাত্র এই অসাধ্য সাধন করতে পারবে,তাইতো আগেরদিন সব কিছু খুলে বলেছিল পলাশকে।অনুরোধ করেছিল একটি বারের জন্য উপাসনার সাথে কথা বলার ,সেই পুরুষ করেছে সেই কাজ,উপাসনাকে তার কঠোর প্রতিজ্ঞা থেকে টলাতে পেরেছে।তারপরে যখন নীল এসে দাঁড়িয়েছিল উপাসনার সামনে ,নীলকে যাররপনাই অবাক করে ওর হাত দুটো জড়িয়ে ধরেছিল উপাসনা,তারপর নিজেকে নীলের কাছে বিলিয়ে দেয়ার জন্য অশ্রুসিক্ত চোখে দাঁড়িয়ে ছিল ও।কি এক অমোঘ আকর্ষণে মিলে গিয়েছিল দুজনের ঠোঁট।নীল শার্টের পকেট থেকে সেই লাল রঙা অবীরটা বের করে মুঠোভরে উপাসনার সিঁথি,কপাল ,চিবুক,গলা লাল রঙে রাঙিয়ে যখন দিল,উপাসনা বলে ওঠে”উঁহু ,নীল,আমি তো তোমার রঙে রাঙা হতে চাই,লাল নয়,নীলের সবটুকু নীল আমি মেখে নিতে চাই,কথা দাও তুমি আমাকে সেই সুযোগটুকু দেবে,কখনও ছেড়ে যাবে না আমাকে?” উত্তরে নীল উপাসনার কপালে এঁকে দিল এক গভীর পবিত্র চুম্বনরেখা।
       আশ্রমের চারিপাশে আমগাছগুলো মুকুলে ভরে আছে।তারই একটার নীচে বসে আছে আকাশ আর পলাশ।চারিদিকে রংবেরঙের অবিরে  পরিবেশ রঙিন হয়ে উঠেছে আশ্রমের।একটু দূরেই  দেখা যাচ্ছে,নীল উপাসনাকে লাল নয় নীল রঙে আভরিত করছে, উপাসনার মলিন বিবর্ণ মুখ, চোখ ,বেশ সব নীলিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত ।মনে মনে পলাশ যে আকাশকে কতখানি পছন্দ তা বুঝিয়ে দেয়ারও সময় এসেছে।পলাশ সত্যি আগুনরঙা অবিরটা এনেছে সঙ্গে করে,তা নিয়েই একটু একটু করে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে আকাশকে।আকাশের নীল রং একটু একটু করে ঢেকে যাচ্ছে আগুন রঙে।এ লালিমা সূর্যাস্তের নয়,এই রাঙা আবীর ছড়ানো আকাশেই উদয় হবে নতুন দিনের সূর্যের।পূর্ণতা পাবে পলাশ আর আকাশের তথাকথিত অন্যায়ের প্রেম।পূর্ণতা পাবে নীল উপাসনার প্রেমের অঙ্কুরিত বীজ।

                              সমাপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *