নিয়তি – বাংলা প্রেমের গল্প – Read Bangla Golpo Online

আমার প্রিয় ছাত্রীকে নিয়ে আজ আমি দেশ ছাড়া হয়েছি! রুপে গুণে বড় লোকের এক অনন্যা কন্যা আমার এই ছাত্রী। তারাহুরো করে এক বন্ধুর মেসেই উঠে পড়লাম। চিন্তা করে দেখলাম এরচেয়ে নিরাপদ জায়গা আর নেই । সাথী আমার জীবন সাথী। সাথী আহসান ওর নাম!

পিতা রিজভী আহসান। তার একমাত্র কন্যা এই সাথী আহসান । কোনদিক দিয়েই আমি ওর যোগ্য নই। কিন্তু তবুও ও আমাকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবেসে আমার হাত ধরে বাবার ঐশ্বর্য ফেলে ঘর ছাড়া হয়েছে।

তাই ওর প্রতি আমার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা অনেক বেশি বেড়ে গেল। আমি নিজেকে কষ্ট দিতে রাজি কিন্তু ওকে নয়।আমি আমার বাবা মায়ের স্বপ্ন লেখা পড়া শেষ করে বড় চাকরি করবো। এবং তাদের গরীবি ঘোচানোর দায়িত্ব নেব কিন্তু প্রেমের টানে যে দায়িত্ব আমি কাঁধে তুলে নিলাম।

তাকি সঠিক হলো কিনা তা ভাবার সময় বা অবকাশ আমি পেলাম না। তাও আবার এমন সময় যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল পরিক্ষা সামনে রেখে। কি করবো আমি পরিক্ষার চিন্তা করে যদি একাজ না করি তবে যে জীবনের পরিক্ষায় সারাজীবনের মতো আমি ফেল হয়ে যাবো।

সাথীর বাবা রিজভী আহসান তার বন্ধুর ছেলের সাথে যে তার মেয়ের বিয়েটা ফাইনাল করে ফেলেছেন। তাই একটা ফাইনাল মাথা থেকে ঝেড়ে আরেক ফাইনাল নিয়ে আমাকে ভাবতে হলো। যাক এখন আপাতত আমরা নিরাপদে আমার বন্ধু শাওনের মেসে আছি।

কিন্তু মাথায় চিন্তা পরিক্ষাটা কি করে দেই? নয়তো বাবা মায়ের স্বপ্ন যে একেবারে মিথ্যা হয়ে যায়! অনেক খবর নিয়ে জানতে পারলাম সাথীর বাবা! আমাকে ধরার জন্য সব রকম ব্যাবস্থাই করে রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রোজ আমার জন্য নিয়মিত পাহারার ব্যাবস্থা করা  হয়েছে। তারা ওঁৎ পেতে আছে কখন আমি ওদিকে যাই। আর আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের ইচ্ছে মতো শোধ নেবে।

মনে মনে এবার পরিক্ষা দেবার চিন্তা বাদ দিয়ে। বন্ধু শাওনের কাছে বললাম একটা চাকরির ব্যাবস্থা করে দেবার জন্য। পেট দুটি তো চালাতে হবে? বন্ধু আমার ভরসা না দিলেও আশ্বাস দিলো চেষ্টা করবে।

শাওনের রুমমেট চলে যাওয়াতে রুমটা এখন আমরা দুজনেই ব্যাবহার করছি। শাওন বলে, এখানে তো আর বেশি দিন থাকা যাবেনা। আর এভাবে বিয়ে করা ছাড়া  তোরা দুজন এভাবে এক ঘরে রাতকাটানো ঠিক কেমন দৃষ্টি কটু। আমি বললাম বিয়ে যে করবো তার টাকাও তো আমার নেই!

শাওন বিয়ের সব ব্যাবস্থা,করে দিলো। আমাদের বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ে তো হয়ে গেল কিন্তু সংসার কি করে চালাবো তার চিন্তাই আমার মাথায় ভর করতে লাগলো। আমাদের বাসর হলো একটা মেসে! ছোট একটা চৌকিতে। কয়েকটি ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে বাসর ঘরের ভাব ফুটানো হলো।

ভাবি, গরীবের বাসর এই ঢের! কিন্তু সাথী, সে চাইলে তার বাসর হতে পারতো শহরের আট দশটা বড়লোকের কন্যাদের মতোই। কিন্তু তাতেও ওর মুখে কোন অসন্তোষ প্রকাশ পায়নি। নিজেকে বড় ভাগ্যভান মনে হলো।

পরদিন শাওন এসে বলে,  তোর জন্য একটা চাকরির ব্যাবস্থা করেছি। এখান থেকে একটু দূরে। মতিঝিল। তোর জন্য এটাই সুবিধা হবে। তোর শ্বশুরের দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারবি। আমি খুসি হয়ে গেলাম। একটা ট্রাভেল এজেন্সি।
সেখানে সহকারী ম্যানেজার হিসাবে জয়েন করতে হবে।

তারা আমাকে প্রশ্ন করে বেশ সন্তুষ্ট হলো আমিও চাকরি পাওয়ার আনন্দে বাড়ি মানে মেসে যাবার জন্য উতলা হয়ে উঠলাম মনে মনে। কিন্তু তারা আমায় ছাড়লো অনেক রাতে। রাস্তায় তখন লোকজন কমে এসেছে। আমি ক্লান্ত দেহে অলস ভাবে হাটছিলাম বাড়ির পথ ধরে।

হঠাৎই একটা দৌড়া দৌড়ি শুরু হয়ে গেল রাস্তায়। আমি কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। দৌড় দিবো নাকি হেঁটে যাবো? ঠিক এমন সময় একটা লোক আমার দিকে একটা ব্যাগ ছুড়ে মারে। আমি ব্যাগটা হাতে নিয়ে লোকটাকে ডাকলাম কিন্তু সে ফিরে তাকালোনা। মূহুর্তের মধ্যে একটা অন্ধকার গলিতে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি হতবাক হয়ে ভাবছি ব্যাগটা কেন আমার দিকে ছুড়ে দিয়ে লোকটা চলে গেল?  কি আছে ব্যাগের ভেতর?  একবার ভাবলাম খুলে দেখি আবার ভাবলাম না দেখাই ভালো। কিন্তু ব্যাগটা কি করবো? এসব নিয়ে যখন দ্বিধা দ্বন্দ্ব এ ভুগছি। ঠিক তখনই কয়েকটি পুলিশ দৌড়ে চলে এলো আমার কাছে।

আমাকে তারা সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে বললো। ব্যাগের ভেতর কি আছে?  আমি সত্যি কথাটা ভললাম, জানিনা! তখন পুলিশের সন্দেহ আরও বেড়ে গেল আমার প্রতি। একজন বললো, মিথ্যা বলার আর জায়গা পাসনা। তোর হাতে ব্যাগ আর তুই বলছিস জানিনা। তাও আমাদের বিশ্বাস করতে হবে?

আমি বললাম সত্যি আমি কিছু জানিনা। ওরা বলে, তবে কি ব্যাগ আকাশ থেকে উড়ে এসে তোর হাতে পড়লো? আমি বললাম না! একজন লোক আমার দিকে ব্যাগটা ছুঁড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল।

তখন একজন পুলিশ ব্যাগটা হাতে নিয়ে খুলে ফেললো। আমাকে ছাড়া সবাই দেখে জিজ্ঞেস করলো। বল এগুলো কোথায় পেয়েছিস? আমি না দেখেই বললাম। আগেই তো বলেছি। তখন একটা পুলিশ আমার হাতে হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে ফেললো। এবং ব্যাগের ভেতরটা দেখিয়ে বলে, তুমি কিছু জানো না জানো চাদু তা একটু পরেই বোঝা যাবে।

আমি তো ব্যাগের ভেতরের জিনিস দেখে রীতিমতো ঘামতে লাগলাম। ব্যাগে একটা পিস্তল আর অনেক গুলো হাজার টাকা বান্ডিল!

আমাকে অনেক মারধর করা হলো। অবশেষে চালান করে দেওয়া হলো। আমি অনেক চেষ্টা করলাম ওদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য কিন্তু পারলামনা। শাওনের মোবাইল বারবার বন্ধ দেখাচ্ছিল।

আমার পক্ষে কোন তদবিরের লোক না থাকায়। আমার জেল হয়ে গেল। আমি যে হাতনাতে অস্ত্র নিয়ে ধরা পড়েছি। তাও আবার পিস্তল থেকে দুটি গুলিও করা হয়েছিল!  কোথায় কিভাবে কাকে গুলি দুটো করেছি তাই জানার জন্য পুলিশ মরিয়া হয়ে উঠে।
কিন্তু হাজার মারধর করেও ওরা কোন কিছু জানতে পারে না। আমি তখন পঙ্গু প্রায়!

একবার মনে হয়েছিল গ্রামে খবর দেই কিন্তু পরে ভাবলাম। আমার নিরীহ বাবা-মা, ভাই বোন একটা ঝামেলায় পড়ে যাবে কিন্তু কিছুই করতে পারবেনা। বরং আমাকে ছুটাবার জন্য ভিটে মাটি বিক্রি করে পথে বসবে! অথবা ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে হৃদয়ে কষ্ট নিয়ে ফিরে যাবে। কারণ আমি যে এখন দাগী আসামি।

তাই ললাটে যা ছিলো তাই মেনে নিলাম। মাঝে মাঝে সাথীর কথা মনে পড়ে। বসে ভাবি সাথী এখন কোথায় তার বাপের বাড়ি চলে গেছে নাকি শাওন আমার বাবা মায়ের কাছে তাকে রেখে এসেছে?

একদিন আমাকে আবার কোর্ট এ তলব করা হলো। এলজন আমাকে দেখে বললো হ্যা! এই লোকটাই হবে। অন্ধকারে সে আমাকে গুলি করে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়েছিলো। আমি বললাম আমি নই! কিন্তু কে আমার কথা বিশ্বাস করবে?

আমার শাস্তি পাকা পোক্ত হলো। অপরাধের পর অপরাধের চিহ্ন লাগলো আমার গায়ে। আমাকে কড়া পাহারায় রাখা হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার ভালো ব্যাবহার দেখে কড়াকড়ি কিছুটা শীতল হলো। অনেকেই বুঝতে পারলো আমি বিনা অপরাধ করে শাস্তি পাচ্ছি। কিন্তু তাতে লাভ কি। কোন প্রমাণ তো নেই যে আমি নিরপরাধ!

শহরের অনেক গুন্ডা পান্ডাদের সাথে আলাপ হলো। সকলে আমার ব্যাবহারে তুষ্ট হয়ে বলে, বের হয়ে প্রয়োজনে যেন তাদের সাথে দেখা করি।

এভাবে দিন যেতে লাগলো। বছর ঘুরে ঘুরে আট বছর পূর্ণ হয়ে গেল। আমি এভাবে বন্দী থাকতে থাকতে আশা ও কর্ম ক্ষমতা হারালাম। তার,সাথে হারালাম মনোবল! একদিন জেলার সাহেব সুসংবাদ নিয়ে এলেন। আমার শাস্তির মেয়াদ শেষ!

আমি ছাড়া পেয়ে আনন্দে ছুটে যাই সেই মেসে কিন্তু সেখানে তারা নেই। মুক্তি পাবার আনন্দে আমার মনেই ছিলোনা জীবন থেকে প্রায় একটা যুগ হারিয়ে গেছে! সব কিছু আর আগের মতো নেই। আশা করাও ঠিক নয়।

আমি অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করলাম ওদের কথা। কিন্তু কেউ বলতে পারলোনা ওদের কথা। সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারলাম না, সাথীর খবর নিতে তার বাবার কাছে যেতে।

তাই মমতাময়ীর কাছে ছুটে গেলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে মনে আরেক ধাক্কা খেলাম

 আমি যখন আমার বাড়িতে এলাম সাথীকে পাবো আশা করে তখন জানতে পারলাম আমি শুধু আমার সাথীকেই হারাইনি! সাথে হারিয়েছি আমার গর্ভধারিণী মাতা ও জন্মদাতা পিতাকে।

জীবনের বয়ে যাওয়া দশটি বছরের স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষদের। যাদের কে ছাড়া আমার জীবন আজ মূল্যহীন। পথহারা দিশে হারা মানুষের মতো হয়ে গেলাম। আমি আজ দিকভ্রান্ত পথিকের ন্যায় হয়ে গেলাম।

এমনিতেই আমি সমাজের চোখে মূল্যহীন হয়ে আছি কিন্তু তাদের মাঝে আমি সান্ত্বনা খুঁজে পেতাম। পেতাম স্নেহ ভালোবাসা! পেতাম বাকিটা জীবন চলার পথ নির্দেশনা। কিন্তু হায়! তারা সবাই আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে। আমি এখন সান্ত্বনা হীন ভালোবাসা হীন রাস্তার মানুষ হয়ে গেলাম।  জলের স্রোতে ভেসে  যাওয়া নিয়ন্ত্রণ হীন জিনিসের মতো বোধ হতে লাগলো। এখন সময় স্রোত আমাকে যেদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেদিকেই আমার ঠিকানা কারণ আজ যে আমি বৈঠা হীন মাঝি! নিজেকে প্রশ্ন করি কি ভুল আমি করেছি?

কি পাপ আমি করেছি?  যার ফল ভোগ করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত শ্রান্ত হতাশ!  নির্বাক পথহারা পথের মানুষ। হয়তো এখন সবাই আমাকে নিন্দার চোখে দেখবে। তবুও সাহস করে বলতে পারবোনা না আমি নিন্দনীয় কোন কাজ করিনি।

আমাদের বাড়ি আর সেই আগের বাড়ি নেই। টিনের ছোট ঘর থেকে আজ পাকা পোক্ত বাড়ি হয়েছে। বাড়ির সামনে লোহার গেইট লাগানো হয়েছে । গেইটের সাথে দেওয়ালে কলিং বেল!  এতকিছু কে কবে করলো? আমি কিছুটা চিন্তিত হয়ে ভাবলাম ওরা কি আর থাকে না এখানে। কাউকে দেখতে পাচ্ছি না কেন? কলিং বেল চাপতেই একটি ছোট্ট মেয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, কে আপনি?  কি চাই।

আমি তার প্রশ্ন শুনে চমকে উঠে ভাবি কি চাই আমি? ছোট্ট ফুটফুটে চঞ্চল মেয়েটি জিজ্ঞেস করে ও কাকু কি চাই তোমার?  বলো নয়তো চলে গেলাম!
আমি বলি না মা মনি যেওনা। এই বাড়ির মালিক কে? মেয়েটি ঝটপট উত্তর দেয় আমার বাবা! তোমার বাবা কোথায়?  বাবা দোকানে। তোমার বাবার নাম কি? লাল মিয়া! আমার চোখে আনন্দের এক ফোঁটা অশ্রু বিন্দু ঝড়ে পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। পাছে কেউ দেখতে পায় এই বলে, হাতের কব্জিতে মুছে নিলাম। যেন চোখের মাঝে পোকা পড়েছে এই ভান করে।

আমার ছোট ভাই লাল মিয়ার কি সুন্দর চটপটে একটা মেয়ে হয়েছে! লাল মিয়া আমার দুই বছরের ছোট। ভাবি আমারও এমনই একটা ছেলে অথবা মেয়ে থাকার কথা ছিলো। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস!  আমি আজ সর্বহারা! কোথায় আছে না জানি আমার সাথী।

আমি চোখ মুছে জিজ্ঞেস করলাম,
তোমার নাম কি মামনী? আমার নাম টিশা মনি! আচ্ছা তিশা মনি বাড়িতে আর কে কে আছে?  আমার মা! আর ছোট ভাই টুটুল! আমি ভাবি আমার ছোট বোন দুটি কোথায়? কিন্তু এই ছোট মেয়েটি কি এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে? তাই আর এই প্রশ্ন ওকে করলাম না। আর জেল খাটা এই আসামীর চেহারাটা নিয়ে ছোট ভাইয়ের বউয়ের সামনে দাঁড়াতে চাইলাম না!  তারচেয়ে  বরং লাল মিয়ার কাছেই যাই। এই চিন্তা করে বাজারের দিকে চললাম।

ও কাকু কোথায় যাও? চলে যাই মামনী!  ভালো থেকো। মনে মনে বললাম তোমাকে কিছু দেবো সেই সামর্থ্য আজ আমার নেই মামনী!

বাজারে  লাল মিয়ার দোকান খুঁজে পেতে বেগ পেতে হলোনা। লালমিয়া দোকানে নেই মাল আনতে শহরে গেছে। আমি প্রচন্ড ক্ষুদার্ত! তাই পাশের দোকান থেকে  গুড় মুড়ি কিনে খেয়ে পানি পান করলাম। ভাইটির মুখ দেখার জন্য বসে আছি। মনে বড় তৃষ্ণা!  নয়তো চলে যেতাম এতোক্ষণ।

দোকানের কর্মচারী জিজ্ঞেস করে লাল মিয়া ভাইজান কে কি দরকার?  আমি শুধু বলি আছে সামান্য দরকার আছে! তুমি কাজ কর আমি অপেক্ষা করছি। কতক্ষণ পরে লাল মিয়া মালপত্র নিয়ে চলে আসে। এসেই সব গোছগাছ করতে সে ব্যাস্ত হয়ে গেল ! আমাকে দেখেও সে কেন চিনতে পারলোনা বুঝতে পারলাম না? নাকি এতোদিনে জেল খেটে আমার চেহেরাটা আগের চেয়ে অনেক পাল্টে গেছে? তাই বলে ভাই হয়ে ভাইকে চিনতে পারবেনা!

আমি উঠে গিয়ে পিছন থেকে বলি লালু তুই আমাকে চিনতে পারিসনি? লাল মিয়া চমকে উঠে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, কে আপনি ? আমি বলি আমি!  লাল মিয়া এবার চিনতে পেরেও কাজে মন দিলো। অনেকক্ষণ পরে বললো, এতদিন পরে কি মনে করে?
ভাবি আগে আমায় ও মিয়া ভাই বলে ডাকতো। আজ কেন কোন সম্বোধন ও করছে না?

লাল মিয়া হাতের কাজ শেষ করে আমায় একটা চা স্টলের অন্ধকার নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গিয়ে বসালো। দুটি চা,দেওয়া হলো আমাদের সামনে। লাল মিয়া বলে, চা এরা ভালোই বানায় খেতে পার। আমি জিজ্ঞেস করি লালু!  লিলি আর মিলি কোথায়?  লাল মিয়া কিছুটা পরিহাসের সুরে বলে, যাক ওদের কথা তোমার মনে আছে দেখছি! পরিহাস করে বলে আমি মনে করেছি তোমার দুটি বোন আছে তা হয়তো তুমি জানোনা!

লাল মিয়া কেন আমার সাথে এমন আচরণ করছে আমি বুঝতে পারছি না। লাল মিয়া জিজ্ঞেস করে, বাড়িতে গিয়েছিলে? হুম!
আমার বউ তোমাকে চিনতে পারলো? জিজ্ঞেস করে লাল মিয়া কিছুটা তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে !  আমি ভিতরে যাইনি। গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে তোর মেয়ের সাথে আলাপ। খুব মিষ্টি হয়েছে মেয়েটা তোর। কিন্তু আমি এমনই নিঃস্ব হতভাগ্য তোর মেয়ের হাতে কিছু দিতে পারিনি। লাল মিয়া হেঁসে বলে দিতে পারোনি এটাই ভালো হয়েছে!  নয়তো বাড়ি গিয়ে আমি দেখলে তা ছুড়ে ফেলে দিতাম। আমার নিস্পাপ শিশু মেয়েকে কোন পাপিষ্ঠ এর জিনিস ছুঁতে দিতাম না!

আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করি , কেন এতো ঘৃণা আমার প্রতি তোর?  কেউ যদি তার দায়িত্ব পালন না করে নিজের স্বার্থে সংসার অকুল দরিয়ায় ডুবিয়ে দেয়। পৃথিবীতে   কে আছে এমন যে তাকে শ্রদ্ধা করবে? আমি যে এখনো তোমার সাথে বসে কথা বলছি তাতেই আমার বিবেক বাঁধা দিচ্ছে! তোমার সাথে কথা বলতে আমার কষ্ট হচ্ছে।   আমি হতবাক হয়ে গেলাম। নিজেকে সামলিয়ে জিজ্ঞেস করি কিন্তু কেন, আমি কি অপরাধ করেছি? কি এমন পাপে আমি পাপিষ্ঠ লালু!

লাল মিয়া অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলে, তুমি নিজের অপরাধ ধরতে পারছোনা? হাসালে আমায়! সত্যি বলতে আমার খুব হাসি পাচ্ছে। মনে হয় পৃথিবীতে নিজের দোষ নিজে সত্যিই ধরতে পারে না? মনে করে দেখো।  নিজের সুখের জন্য একটি বড়লোকের মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে গেলে অথচ একটি বার গরীব বাবা-মা, ভাই বোনের কথা চিন্তা করলেনা। কি হবে তাদের? যখন কিনা তুমিই ছিলে তাদের আশা ভরসা! কিছু পাবার একমাত্র উপায়।  কোথায় তাকে নিয়ে সুখের সংসার বাঁধলে তা একবার জানালেনা পর্যন্ত। কেন তোমার সুখের সংসারে যেন গরীব বাবা-মা ভাই বোন অশান্তি সৃষ্টি করতে না পারে, তাই ?  আমি কি জবাব দেব ভাবছি। শুনবে সে আমার কথা?  বিশ্বাস করতে চাইবে।

লাল মিয়া বলে, তোমাকে নিয়ে বাবা-মা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু আমাকে নিয়ে দেখেনি। কেন জানো তুমি ছিলে মেধাবী ছাত্র, আর আমি ছিলাম তোমাদের ভাষায় গাধা! অথচ দেখো বাবা মায়ের সেই গাধাটি তাদের মুখের অন্ন বস্ত্র যোগার করতে দিনরাত পরিশ্রম করেছে। নিজের শরীরের প্রতিটি রক্ত কণা ঘামে পরিণত করে  ছোট বোনদের লেখা পড়ার খরচ যুগিয়েছি। আর তাদের মেধাবী ছেলেটা কোন দিন তাদের খুঁজ খবর নিতে আসেনি তার সুখের রাজ্য ফেলে! একবার দেখতে আসেনি তারা মরলো কিনা বেঁচে আছে।

আমি নিজের হাতদুটো দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে অনুশোচনায় ডুবে রইলাম। ভাবি আমি সত্যি কি অপরাধী? লাল মিয়া বলে, আজ কেন এতোদিন পরে ফিরে এলে বুঝতে পারলাম না। কেন এসেছো? ভিটেমাটির ভাগ নিতে? পয়সার বুঝি খুবই টান পড়েছে? কেন লেখাপড়া জানা মানুষ চাকরি বাকরি করে তো ভালো পয়সার মুখ দেখার কথা।

চারিদিকে শুধু পরিহাস কটুবাক্য শুনতে হবে এখন আমাকে। তা উপলব্ধি করে শিউরে ওঠে মন প্রাণ। দেহের প্রতিটি রক্ত কণায় যেন বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেল।জীবনের প্রতি এক প্রকার ঘৃণা এসে যাচ্ছে আমার। ভাইয়ের প্রশ্নের জবাবে, বললাম না ভিটেমাটির ভাগ আমি চাই না! তবে কেন এসেছো? এসেছি তোদের দেখতে। লাল মিয়া অবাক হয়ে যায়, এতোদিন পর! আমি বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। আর বলতে পারলাম না আমার মনের কথা। কি লাভ বলে?

যা হারানোর তা তো হারিয়ে ফেলেছি। ভাবুক সবাই আমি নিকৃষ্ট নরাধম! তাতে কি আর এসে যায়?  আমি তো এখন ঠিকানা হীন মানুষ! পথের মাঝে পড়ে থাকা ঘৃণিত মানুষ। যাকে কেউ স্নেহের পরশ বুলাবে তো দূরের কথা। পাশ দিয়ে যাবার সময় ঘৃণায় কুঁচকে উঠে। আমি তো এখন তাই!

লাল মিয়া বলে, বাবা-মা মৃত্যুর সময় শুধু তোমাকেই খুঁজেছে। তুমি নিখোঁজ হবার বছর তিনেক পরে তারা একে একে চলে গেলেন। আমি জানি তারা তোমাকে হারানোর শোকে তিলে তিলে মরেছে! তাই আমি তোমাকে এতোটা  ঘৃণা করি! বল এটা পাপ নয়?

আমি দিনরাত পরিশ্রম করে তাদের মুখের অন্ন জুটিয়েছি ঠিক কিন্তু মুখের হাসি ফুটাতে পারিনি!  কেন বলতে পারো?  আমি এর উত্তর আজও পাইনি। লাল মিয়া বলে, আমার বউ তোমাকে কেমন করে নিবে জানিনা।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, চিন্তা করিসনা ভাই । আমি থাকতে আসিনি। লাল মিয়া আমার মুখের দিকে এই প্রথম ভালো করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। তোমার কি কিছু হয়েছে? এতোক্ষণ আলাপ করে বুঝতে পারলাম সাথীর কথা জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। যদি ও এখানে আসতো তবে লাল মিয়া আমাকে এমন করে ভুল বুঝতোনা। তবে তারা অনেক কিছু জানতে পারতো।

আমি এড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, লিলি আর মিলির খবরটা জানিনা। ওদের দিনকাল ভালোই চলছে নারে? লিলির বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামের চেয়ারম্যানের ছেলের সাথে। আর মিলির বিয়ে হয়েছে ঢাকায়। ওর বর সরকারি কর্মকর্তা। বেশ বড় পদেই আছে। লাল মিয়া গর্বিত স্বরে তার হাত দুটি দেখিয়ে বলে, এই মেহনতী হাত দুটি দিয়ে ওদের আমি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি।  একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বললাম, চলিরে! তোর অনেকটা সময় নষ্ট করলাম।

চলে আসছি অনেকটা পথ। দূর থেকে লাল মিয়া ডেকে উঠে, মিয়া ভাই! আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারলামনা। দাঁড়িয়ে পড়লাম।  লাল মিয়া দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার একটা কিছু হয়েছে মিয়া ভাই। কেন আমার কাছে লুকিয়ে রাখছো? আমাকে বল? কেন এমন ভাবে এসে মায়া লাগিয়ে চলে যাচ্ছো কিছু না বলে? আমাকে বল মিয়া ভাই!

আমি ওর পিঠে কয়েকটি আলতো চাপড় দিয়ে বললাম, তুই এখনো আগের মতোই গাধাটিই আছিস! কিছু হয়নি আমার। লাল মিয়া বলে, তবে কথা দাও আবার আসবে?
বললাম চেষ্টা করবো। মিয়া ভাই তুমি সুখে নেই! আমাকে একবার বলে যাও তোমার দুঃখের কথা। আমি চোখের জল মুছে বললাম অন্য আরেক দিন।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে গাঁয়ের অন্ধকার পথে হেঁটে চলেছি। ফসলের জমিতে পানি টুইটুম্বুর। তাতে ব্যাঙ অবিরাম ডেকে চলেছে কর্কশ শব্দে। এই সময় এই এলাকায় সাপের খুব উৎপাত বেড়ে যায়। প্রায় প্রতিদিনই কোন কোন লোককে সাপে কাটে! আমি অন্ধের মতো অন্ধকারে অনুমান করে হেঁটে চলেছি। আজ আর আমার কোন ভয় নেই! সাপ আর বাঘের মধ্যে কোন পার্থক্য আমার কাছে আজ আর নেই।

সত্যি যার থাকে শুধু তার তারই  হারাবার ভয় থাকে। কিন্তু যার আমার মতো কিছুই থাকে না সে মনে হয়  ভয় শুন্য হয়ে যায়। কি হারাবে সে? যা হারানো তা তো হারিয়ে গেছেই।
শুধু একটা আশা বুকের মধ্যে এখনো বেঁচে আছে তা হলো আমার সাথীকে খুঁজে পাওয়া।

কে যেন চোখের সামনে লাইট মারতে মারতে এদিকেই আসছে। কাছেই আসতেই চিনতে পারলাম কদম চাচা! তিনি আমায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, চলে যাও? হ্যা! চাচা। তিনিই আমাকে প্রথম বাবা মায়ের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছেন।

তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে । শাওনের গ্রামের দিকে চললাম। এখন একটাই আশা শাওন হয়তো বলতে পারবে সাথীকে কোথায় গেলে পাব। ওদের গ্রামের দুরত্ব আরও মাইল খানেক। ক্লান্ত দেহে ঘন্টা খানেক হাঁটার পরে ওদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলাম। একটা আশা শাওন আমার সব দুঃখের অবসান ঘটিয়ে দেবে শুধু একটি খবর দিয়ে। ডাকলাম শাওন! কিন্তু একি শাওন কোথায়?

আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অতিশয় বৃদ্ধ লাঠির উপর ভর করে আছে সে।তবুও যেন তার শরীরের ভারসাম্য সে ঠিক রাখতে পারছেনা। কাঁপছে!  আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন কে তুমি বাবা?

আমি বললাম আমি সবুজ! শাওনের ছোট বেলার বন্ধু।  আমাকে চিনতে পারলেন না কাকা বাবু?
আমি পাশের গাঁয়ের সবুজ!
ছোট বেলায় স্কুল ছুটির পরে শাওনের সাথে কতবার এসেছি আপনাদের এই বাড়িতে । কত পিঠে পায়েস খেয়েছি কাকিমার হাতে বানানো। এখন চিনতে পারলেন কাকা?  তিনি হাতের আলোটা আমার মুখের উপর ধরে ভালো করে দেখে বললেন, বুড়ো মানুষ ভালো করে দেখতে পারি না। হয়তো বা তাই হবে।

তা শাওনের কাছে কি জন্য এসেছো?  আমি বললাম ওর কাছে খুব দরকার !
ওকে একটু ডেকে দিবেন?  বৃদ্ধ একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন। ওকে তো খুব দরকার আমাদেরও কিন্তু কোথায় পাই বলতো তাঁকে?  ডাকলে সাড়া দেয়না! ওর ঘুম তো ভাঙে না। আমরা ডেকে ডেকে ক্লান্ত হয়ে গেছি! তোমার সাথে ওর দেখা হবে না! চলে যাও!

তুমি চলে যাও! আমি কাকুতি মিনতিতে ভরা কন্ঠে  হাত জোর করে বললাম, কাকু!  ওকে আমার অনেক দরকার। ওর কাছে যে আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা খবর রয়ে গেছে। আর সেই খবরের উপর নির্ভর করছে আমার আগামী দিনের পথচলা! দয়া করে একবার তাকে ডেকে দিন কাকু।আমি বেশি সময় নষ্ট করবোনা আপনাদের।

বৃদ্ধ আমার মুখের উপর আবারও হারিকেনের আলোটা ধরে জিজ্ঞেস করলেন,
তুমি সত্যি শাওনের বন্ধু? হ্যা কাকু আমাকে এখনো আপনি চিনতে পারলেন না! তোমার সাথে ওর কতদিন ধরে  যোগাযোগ নেই?  প্রায় দশ বছর। এতোদিন ধরে ওর সাথে দেখা করার প্রয়োজন মনে করনি আজ কি মনে করে এলে ?  কোথায় ছিলে তুমি এতোদিন?

জেল থেকে বেড়িয়ে এই প্রথম মিথ্যা কথা বলতে হলো। জ্বি আমি বিদেশে ছিলাম। কাকু আমাকে আবার ভালো করে দেখে বললেন, তোমার গায়ে তবে এমন ধুলো মাখানো মলিন পোশাক কেন?  ওখান থেকে এসে তো সবাই পয়সার ফুলঝুরি ফুটায়। তোমার অবস্থা এমন কেন?  সে অনেক কথা কাকু। শুধু একবার শাওনের সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দেন। আমি আপনাদের বেশি  সময় নষ্ট করবোনা। এখনই চলে যাবো কথা দিচ্ছি।

এমন সময় মুষল ধারে বৃষ্টি শুরু হলো। কাকু আমাকে বললেন ভিতরে এসো। তুমি তো ভিজে যাচ্ছো। আমি দেখলাম কোন উপায় নেই ভিতরে না গেলে ভিজে জুবুথুবু হয়ে যাবো। আর আমার বৃষ্টিতে ভিজার,একেবারে অভ্যেশ নেই। একফোঁটা বৃষ্টি আমার জ্বর নিয়ে আসতে পারে।  বাড়িতে কারেন্ট নেই তাই কুপিবাতির আলোয় তাদের রাতে চলতে হয় দেখতে পেলাম

ভাবলাম সারা গ্রামের মধ্যেই বিদ্যুৎ এর খুঁটি দেখতে পেলাম তবে, এদের বাড়িতে কারেন্ট নেই কেন? প্রশ্নটা মনে মনেই রইলো প্রকাশ করলাম না। ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম। ঘরের প্রতিটি কোন যেন দারিদ্র্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে। সমস্ত ঘরময় ভাঙাচোরা জিনিস পত্রে ঠাসাঠাসি। কোন এককালে নিত্য প্রয়োজনীয় ছিলো।

 জায়গায় জায়গায় টিন ফুটো তা দিয়ে পানি পড়ছে! ঘরে একটি মাত্র ছোট্ট চৌকিখাট। তাতে একটি মানুষ কোন মতো রাত্রী যাপন করতে পারবে।

আর পুরনো জিনিস পত্র!  আমার ছোট বেলায় দেখা ঘরের সাথে এর কোন মিল আমি খুঁজে পেলাম না। এটা অবশ্য তাদের থাকার ঘর নয়। আগে মেহমান আসলে এখানে থাকতো। এখন হয়তো ফেলে রাখা জিনিস পত্রের আবাস।

কাকু একটা গামছা এনে আমায় দিয়ে বললেন শরীরটা মুছে ফেল। তুমি অনেকটা  ভিজে গেছ। হঠাৎ করে খেয়াল করলাম একটা বাল্ব লাগানো এক কোনে। বললাম কারেন্ট নেই?  আছে কিন্তু আমার এখানে নেই। জিজ্ঞেস করলাম কেন?  উনি জবাব দিলেন, বিদ্যুৎ ব্যাবহার করতে হলে মাসে মাসে বিল দিতে হয়। কিন্তু সেই সামর্থ্য এখন আমার নেই!  তাই অফিস থেকে এসে লাইনটা কেটে দিয়ে গেছে। আমিও আর আনার চেষ্টা করতে পারিনি।

ভাবলাম এদের অবস্থা এতো শোচনীয় কেমন করে হলো, শাওন কি সংসারের কোন খরচ বহন করে না? আমি চাইছিনা,তাদের ব্যাক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে তাই মুখ বন্ধ রাখলাম। তিনি বললেন রাতে যেভাবে বৃষ্টি নেমেছে তাতে করে তুমি মনে হয় আজ  যেতে পারবেনা।

আমি বললাম, না কাকু যেমন করেই হোক আমি চলে যেতে পারবো। শুধু একবার শাওনের সাথে আমাকে দেখা করিয়ে দেন তাহলেই হবে। কাকু নিরাশার বাণী শুনালেন কিন্তু তার সাথে এখন তুমি সাক্ষাৎ করতে পারবেনা। এখন তো অনেক রাত! আমি বুঝতে পারলাম শাওন ঢাকাতেই থাকে। তাই মনে মনে বিরক্ত হয়ে ভাবলাম শুধু শুধু এতো দেরি করা কেন? শাওনের ঠিকানাটা আগে দিয়ে দিলেই তো আমি চলে যেতাম।

জিজ্ঞেস করলাম বুঝতে পেরেছি ও ঢাকায় থাকে, তাই না? কাকু জবাব দিলেন দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে না বাবা! ও এখানেই থাকে। জিজ্ঞেস করলাম কিছু করে না? না বাবা! বলে বৃদ্ধ কেঁদে ফেললেন!  আমি তার কান্না দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম! কি বলবো ভেবে পেলামনা। আমি তাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েও থেমে গেলাম।

তখন আমার মনে পড়লো তিনি একটু আগেই বলেছিলেন, আমরা ডেকে ডেকে ওর ঘুম ভাঙাতে পারিনা! তবে কি শাওন খুব অসুস্থ?  তাই তিনি আমাকে এই রাতে কথা বলতে দিচ্ছেন না। যাতে করে ওর শান্তি নষ্ট হয়? এবার বুঝতে পারলাম তাদের দারিদ্র্যের কারণ!  আমি বললাম কাকু শুধু মাত্র একটি কথা জিজ্ঞেস করে আমি চলে যাবো। একবার গিয়ে বলুন আমি এসেছি নয়তো আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন।

বৃদ্ধ বললেন, তবুও এতো রাতে আমি তোমাকে ওখানে নিয়ে যেতে পারবো না। তুমি তো ওর খুব কাছের বন্ধু তাই না? বাবা! তোমাকে কি ও কখনো বলেছে ওর কোন শত্রু আছে?  যে ওকে জানে মারতে চাইছিল!  আমি অনেক ভেবে বললাম না তো!  বুঝতে পারলাম আজ রাতে আর দেখা পাচ্ছি না শাওনের। তাই চুপ করে বসে পড়লাম একটা ভাঙা চেয়ারে। আর ভাবতে লাগলাম কি করবো।

কাকুকে কে যেন ইশারায় ডাকলো। তিনি ভিতরে গিয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরে এলেন খাবার নিয়ে। একটা ডিম ভাজি ও একবাটি ডাল সাথে একথালা ভাত!  আমি বললাম আমি এসে আপনাদের বিপদে ফেলে দিয়েছি বুঝতে পারছি। আমি কিছু খাবোনা আজ বরং চলে যাই। তিনি জবাব দিলেন এখন বিপদ আমার সবসময়!  তুমি চারটে ডাল ভাত খেলে তা খুব একটা বাড়বেও না কমবেওনা। তারচেয়ে বরং উপোস না করে খেয়ে নাও।

সত্যি বলতে ক্ষুধা আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছেলো তাই আর কথা না বাড়িয়ে খেতে বসলাম। কাকু একটা বালিশ আর কাঁথা দিয়ে বললেন, এই দিয়ে রাতটুকু কাটিয়ে দাও বাবা! এর বেশি সামর্থ্য আমার আজ নেই! ভাবি একসময় উনাদের অবস্থা বেশ সচ্ছল ছিলো। কি এমন ঘটে গেছে যে তাদের এমন অবস্থা হয়েছে ?

আমি আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে দেয়ে বিছানা পত্র গোছগাছ করে শুয়ে পড়লাম।  বৃষ্টির রাত ক্লান্ত শরীর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই।  যখন ঘুম ভাঙে তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। একটু লজ্জা করতে লাগলো তারা বলতে গেলে এখন আমার কাছে অপরিচিত। কি ভাববে আমাকে নিয়ে তাই ভাবছি? এতো বেলা করে ঘুম থেকে উঠলাম।

দরজাটা আলতো করে চাপানো ছিলো। আমি তা ফাঁক করে ভিতরে দেখতে লাগলাম। ভাবলাম কেউ আমাকে ডেকে দিলোনা কেন? এই ঘরের দুটি দরজা একটা দিয়ে বাড়ির ভেতর যাওয়া যায় আর অন্যটা দিয়ে বাড়ির বাইরে। আমি চাইলে বাইরেরটা দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারি কিন্তু খিদে পেয়েছে। আমি চাইছিলাম তাদের কারও নজরে পড়তে! তাই কয়েক বার দরজা ফাঁক করে বাড়ির ভেতর উঁকি দিতে লাগলাম।

দেখলাম একজন মহিলা মলিন একটা কাপড় পড়ে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কদম গাছের উপর দিকে তাকিয়ে আছে। তার পড়নের শাড়ীটি হয়তো অনেক পুরনো। সবকিছুর মাঝেই ফুটে উঠেছে তারা যে খুবই দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে দিনাতিপাত করছে। আমি একটু শব্দ করে দরজা খুলে আবার চাপিয়ে দিলাম যাতে তার নজরে পড়ে। মোটামুটি একটু শব্দ হলো।

কাজ হলো একটু পরে মহিলাটি মাথায় কাপড় দিয়ে আমার জন্য নাস্তা নিয়ে এলো। সে আমার সামনে যখন নাস্তা রাখলো তখন তার মাথার কাপড় অসাবধানে পড়ে গেল। আমার চোখের সামনে তার অপরুপ রুপ ধরা পড়ে গেল। আমি চোখ সরিয়ে নিতে চাইছিলাম কিন্তু চোখ সরতে চাইছে না!এ যেন গরীবের আন্ধার ঘরে চান্দের আলো।  সে তারাতাড়ি আবার মাথায় কাপড় দিয়ে দিলো। বললো আপনার নাস্তা। গরীব মানুষ কিছু মনে করবেন না। আপনার ঠিক মতো  যত্ন আমরা করতে পারলামনা।

আমি কি জবাব দেব?  বললাম আমি আপনাদের খুব কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছি জানি। না কি যে বলেন, মেহমান সৌভাগ্যের প্রতীক!  আমাদের কপাল মন্দ তার যত্ন নিতে পারছি না। দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বললেন, আগের দিন আমাদের নেই।

 কাকু কোথায় ওনাকে দেখতে পাচ্ছি না যে? মেয়েটি ঘোমটার আড়াল থেকে উত্তর দিলো। বাবা তো এই একটু ঘুরে আসছি বলে, বেড়িয়ে গেলেন। আমাকে বলেছে আপনি উঠলে যেন নাস্তা দেই। একবার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করি কে সে? আবার ভাবি শাওনের বউ নয়তো তবে এরকম বিধবার পোশাকে কেন ? ঐ যে বাবা আসছেন। এই বলে সেই বিধবা মেয়েটি ভিতরে চলে গেল।

শাওনের পিতা এসে বলে, উঠেছো। খাও নাস্তা খেয়ে নাও। আমি নাস্তা শেষ করে বললাম,  কাকু আর আপনাদের কষ্টের কারণ হতে চাইছিনা। এবার শাওনকে একটু ডেকে দিন  কথা বলি। কাকু বললেন সে তো আসতে পারবেনা। আমাদেরকে ওর কাছে যেতে হবে। ভাবলাম মনে হয় শাওন কোন গুরুতর অসুখে ভুগছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে ওর? এসো গেলেই দেখতে পাবে।

তিনি উঠোনে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকলেন। আমি বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলাম। আমি যে ঘরে ছিলাম সেটা ছাড়া বাড়িতে  আরও দুটি ঘর আছে একটা বিধ্বস্ত প্রায়। আর অন্যটি কোনভাবে থাকার উপযোগী করে নেওয়া হয়েছে। সেটার সাথে উন্মুক্ত একটা রান্নাঘর।

আমাকে আশ্চর্য করে কাকু কোন ঘরের দিকে না গিয়ে ওদিক দিয়ে একটু জঙলের মতো জায়গার দিকে আগাচ্ছে। আমি পেছন থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করি ওখানে কোথায় যাচ্ছেন?  বুড়ো বিরক্ত হয়ে বললেন শুধু প্রশ্ন করো কেন? তুমি শাওনের সাথে দেখা করতে চাও না? বললাম তার জন্যই তো এখনো অপেক্ষা করে আছি। তবে এসো আমার সাথে ওর কাছেই যাচ্ছি। ভাবলাম ওখানে হয়তো আরও ঘর থাকতে পারে। তাই তার পেছনে ছুটলাম। হঠাৎ করে বৃদ্ধের শরীরের স্পীড বেড়ে গেল।

তাকে আমি ধরতে পারছিনা। এতো জোরে কেমন করে হাঁটছেন তিনি?
জঙ্গলের ভেতর এসে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমি ভেবে অস্থির পাগলের পাল্লায় পরলাম নাকি। তবুও জিজ্ঞেস করলাম কাকু এখানে কেন? এখানে তো কোন ঘর বাড়ি নেই। বৃদ্ধ বলে উঠে  চুপ কর। শাওনের ঘুম ভেঙে না গেলেও কষ্ট হতে পারে। বুঝতে পারছোনা।

আমি হতাশ কন্ঠে বলে উঠলাম, কিন্তু কাকু কোথায় শাওন?  তিনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন ঐ যে ঘুমিয়ে আছে । আমি রোজ ডাকি কিন্তু আমার ছেলেটা আর আমার কথা শুনেনা। কোন সাড়া দেয়না। কোন সাড়া দেয়না!
তুমি যা বলার তারাতাড়ি  বলে চলে চাও।

বৃদ্ধ পাশাপাশি দুটি কবরের সামনে বসে পড়লেন। আমি শাওনের কবর দেখে খুবই দুঃখিত হলাম। আর তার পাশের কবরে কে ভেবে প্রায় জ্ঞান হারা হলাম। তবে কি সাথী আর বেঁচে নেই। কাকুর একটি প্রশ্ন আমার কানে বারবার প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো। তোমার জানা মতে কি শাওনের কোন শত্রু আছে যে প্রাণ নিতে পারে। তবে কি ওদের দুজনের সাথে একই ঘটনা ঘটেছে? আমি আর ভাবতে পারলাম না। সবকিছু আমার চোখের সামনে কেমন অন্ধকার হয়ে আসতে লাগলো।

পেছন থেকে সেই মহিলা আমার পতন রোধ করলেন। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। পাশের কবরটা কার?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *